শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৪
অনামিকা তাহসিন রোজা
মানুষ পরিকল্পনা করে। কিন্তু ভাগ্য নির্ধারণকারী আরেক পরিকল্পনা করে রাখতে পারে, আর এটাই স্বাভাবিক। ক্যাফে অবস্থানতালীন শ্রাবণ টের পেলো, আজ ধারা কে নিয়ে ঘুরতে আসা টা বিরাট বড় ভুল হয়ে গেছে। আজ যে এত সব ঝামেলা একসাথে হবে তা সে বুঝতে পারেনি। শ্রাবণ পুলিশের সাথে আরেক পাক কথা বলে এসে টেবিলে ধারার সামনে বসলো। ওয়েটার এসে দুই কাপ কফি দিয়ে গেলো দুজনের সামনে। ধারা আগ্রহের সাথে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণকে,
—” কী হয়েছে?”
শ্রাবণ হাসলো। পৃথিবীতে যতই অশান্তি আসুক না কেনো, হাজারটা বেদনার মাঝেও প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য একটা মানুষকে হাসিখুশি রাখতে সর্বদাই সক্ষম। এই উপলব্ধি টা শ্রাবণ বারবার করেছে। এইযে সে এত টেনশনে আছে। এতটা চিন্তা হচ্ছে তার। অথচ ধারার সামনে এসে, মেয়েটার মিষ্টি কন্ঠ শুনে বুক থেকে যেন সব ভার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এটা কে কী নাম দেয়া যায়? ভাবার সময় পেল না শ্রাবণ। চট করে মনে পড়লো, আরেহ, সে তো ভালোবাসে মেয়েটা কে। বউ হয় তার! এটা তাহলে ভালোবাসারই আরেক প্রভাব! ভেবেই ফিক করে হাসলো শ্রাবণ। দিনকেদিন পাগলাটে প্রেমিক হয়ে যাচ্ছে শ্রাবণ শেখ। সে নিজেও বুঝতে পারছে সেটা। এসব কিছুর দায়ী নিঃসন্দেহে ধারা।
শ্রাবণকে এভাবে হুট করে হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল ধারা। দুবার চোখের পলক ফেলে টেবিলে হাত রেখে আরো আগ্রহ নিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” কি আশ্চর্য! হাসছেন কেনো?”
শ্রাবণ এবার মুখে এক ঝলক হাসি রেখেই বলল,
—” তোমার কী মনে হয়, কেনো হাসছি?”
ধারা মিইয়ে গিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—” কি জানি! আমি কী করে বলব? আপনি সেই সকাল থেকেই কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করছেন!”
শ্রাবণ মাথা ঝাঁকালো। কফির কাপ হাতে নিয়ে বেশ চিন্তিত স্বরে বলল,
—” হুম হুম। আসলেই। লজ্জা পাওয়ার কথা আপনার। অদ্ভুত ব্যবহার টাও আপনার করার কথা। কিন্তু করছি আমি। সবই টেকনোলজি! বাট, আপনি মেবি গতরাতের কথা ভুলে গিয়েছেন, ঠিক না মিসেস শেখ?”
সাথে সাথে কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হলো ধারার। প্রেশার বোধহয় বেড়ে গেছে মেয়েটার। কি আশ্চর্য! সে আসলেই ভুলে গেছিল। ইশ রে! লোকটা চরম অভদ্র। পাবলিক প্লেসে আজেবাজে কথা বলছে। তাৎক্ষণিক ধারার গাল দুটো লাল হয়ে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হলো শ্রাবণ। টেবিলের কাছে একটুখানি ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
—” লজ্জা পেলে আপনাকে মারাত্মক সুন্দর লাগে ম্যাডাম। গতরাতেও বিষয়টা লক্ষ্য করেছি! তবে অন্ধকারে বুঝিনি যে গালও লাল হয়ে যায়। আপনি তো দেখছি, ভয়ানক লজ্জাবতী! ”
ধারা আবারো লজ্জা পেলো। এবারে হয়তো লালে লাল হয়ে টুকটুকে হয়ে গেছে। মাথা নিচু করে ওড়না খুটতে থাকলো বেচারি। মুখ লুকোনোর জায়গা নেই। পারলে মাটি ফাঁক করে পাতালে চলে যেত। ধারাকে আবারো লজ্জায় চুপশে যেতে দেখে ঠোঁট কাঁমড়ে হাসলো শ্রাবণ। চোখে দুষ্টুমি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আসলেই ভুলে গিয়েছেন ম্যাডাম?”
ধারা খুবই সতর্কতার সাথে চোখ উঠালো। সেকেন্ডের মাঝে নামিয়ে নিয়ে মিনমিন করে বলল,
—” কী ভুলব?”
—” গতরাতের কথা।”
ধারার ইচ্ছে করল পায়ে ইন্জিন লাগিয়ে ধুম করে পালিয়ে যেতে, আর না হয় শ্রাবণকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে। তবুও কিছু করল না মেয়েটা। এখন লজ্জা পাওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে ভাবলো চুপ থাকবে। কিন্তু শ্রাবণকে এভাবে ঝুঁকে থাকতে দেখে সে আমতা আমতা বলল,
—” না মানে..!”
তাকে থামিয়ে দিলো শ্রাবণ। এক হাত উঠিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে ধারার চুল কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে চোখে একরাশ অনুভূতি নিয়ে বলল,
—” নো প্রবলেম ম্যডাম। ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। কোনো ব্যাপার না। আজ রাতে আবার মনে করিয়ে দেব। আফটার অল, হাজবেন্ড হিসেবে একটা গুরুদায়িত্ব আছে আমার!”
শ্রাবণের কণ্ঠে এমন ভয়ানক কথা শুনে ধারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। এই লোকটা কি একদমই ভয় পায় না! এক ফোঁটা সংকোচ নেই, অথচ সে লজ্জায় যেন গলে মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কফির কাপটা সামনে রেখেই দুহাত দিয়ে নিজের ঠোঁট ঢাকলো বেচারি। কেনো? হাসি কিংবা লজ্জার চিহ্ন কারো চোখে যেন না পড়ে।
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে হাসলো, আবারো হেলান দিয়ে চেয়ারে বসল। সামনের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু তার চোখ এখনো আটকে আছে ধারার মুখে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এই বোকাসোকা মেয়েটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সেই যে আগে চিরকাল সাদামাটা রয়ে যেত, এখন ছোটখাটো সৌন্দর্যের প্রতিটি ছোঁয়াতেই যেন তাকে অন্যরকম লাগছে। এইতো! তাদেরও সংসার হচ্ছে। তারাও স্বামী স্ত্রী! বুক ভরে সস্থির শ্বাস ফেলে চোখ বুঁজলো শ্রাবণ। মনে মনে শোকর করে কফিটা হাতে তুলে খাওয়া শুরু করল।
একটু পরে ধারা আস্তে করে কফির কাপ তুলল ঠোঁটে। কিন্তু হাত কাঁপতে লাগল তার। শ্রাবণ তাকিয়ে দেখল, মেয়েটার আঙুল কাপে ঠোক্কর খেয়ে টুং টাং শব্দ করছে। তবুও সে কিছু বলল না। কেবল হালকা হেসে কফি চুমুক দিলো। গোপন আনন্দগুলো বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখছে সে।
—” আপনার হাসিটা বড় ভয়ঙ্কর, জানেন?”
ধারা অবশেষে বলেই ফেলল। অনেকক্ষণ ধরেই কথাটা বলতে চাইছিল সে। কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না। তাই এটুকু বলতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠলো তার।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে চোখে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—” ভয়ঙ্কর? মানে প্রেমে পড়ার মতো ভয়ঙ্কর?”
ধারা সোজা তাকাতে পারল না। মনে মনে হাসি পেলো। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” আপনি না, অনেক বেশি… অভদ্র।”
শ্রাবণ কফির কাপ নামিয়ে রাখলো, টেবিলের ওপাশ থেকে ধীর হাতে ধারার হাতের আঙুল ছুঁয়ে দিলো। মিষ্টি করে বলল,
—” অভদ্র নয়, ম্যাডাম। এটা আদর।”
ধারার বুক কেঁপে উঠলো, নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে এলো। লোকটা তাহলে গাড়িতে বলা কথাটা মনে রেখেছে। ইশ রে! কি লজ্জা! ধারা তো সেই সময় মুখ ফঁসকে কথাটা বলেছিল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল মেয়েটা। এত মানুষের ভিড়ের মাঝেও শ্রাবণের ছোঁয়া তাকে অদ্ভুতভাবে কাঁপিয়ে তুললো। চারপাশে কোলাহল থাকলেও মনে হলো সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে।
ধারা সেভাবেই ঠোঁটের কোণের হাসিটা লুকোতে আবার কাপে চুমুক দিল। শ্রাবণের চোখ আটকালো সেখানটায়। কিছু একটা ভেবে ঢোক গিলে নিচু গলায় আবদার করে বলল,
—” তোমার কাপটায় আমায় একটু খেতে দেবে?”
ধারা চমকালো। ভাবলো ভুল শুনেছে। তাই কাপটা হাতে ধরেই চোখ পিটপিট করে তাকালো। শ্রাবণ বুঝলো মেয়েটা বোঝেনি। তাই একটু এগিয়ে এসে চোখের ইশারায় বলল,
—” আপনার ঠোঁটের ছোঁয়া পাওয়া কাপটায় একটু কফি টেস্ট করে দেখতে চাইছি। জিজ্ঞেস করবেন না কেনো। এমনিতেই ভীষন হিংসে হচ্ছে।”
ধারার ভেতরটা আরও অস্থির হয়ে উঠলো। সে কাপের ভেতরের কফির দিকে তাকিয়ে রইলো। চাইছে ওখানেই সব মনোযোগ আটকে রাখতে। অথচ গোপনে সে জানে, তার হৃদস্পন্দন এখন শুধু শ্রাবণের ছন্দেই বাজছে। ধারাকে এভাবে পাথরের মত থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,
—” দেবে না?”
ধারা মোটেই অবাধ্য নয়। শুরু থেকেই ভীষন স্বামীভক্তি তার। কখনোই অমান্য করেনি নিজের স্বামীর কথায়। তাই এবারো সাহস নেই। এমনিতেই শ্রাবণের গমগমে কন্ঠে সে ভয় পেয়েছে। তাই ভদ্র বাচ্চার মত টেবিলে কাপটা রেখে একটু একটু করে আঙুল দিয়ে ঠেলে দিল শ্রাবণের দিকে। একবারো তাকিয়ে দেখল না লোকটাকে। লজ্জায় মরিমরি অবস্থা!
শ্রাবণের ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠলো। একদম ধীর ভঙ্গিতে কাপটা নিজের দিকে টেনে নিলো সে। চোখ নামিয়ে রেখেছে ধারা, তবু তার নিঃশ্বাসের শব্দ যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। কাপটা ঠোঁটে তুলেও শ্রাবণ চোখ সরালো না ধারার দিক থেকে। কফির স্বাদে কোনো নতুনত্ব নেই, কিন্তু তবুও চুমুকটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর মনে হলো। গলা ভিজিয়ে আস্তে করে রাখলো কাপটা। তারপর ভ্রু তুলে ফিসফিস করে বলল,
—” আজকে স্ট্রবেরি ফ্লেভারের লিপবাম দিয়েছো। ভেরি ব্যাড চয়েজ ম্যাডাম। আই লাইক দ্যাট চকলেট ফ্লেভার।”
ধারা শিউরে উঠলো। এই রে! কি সর্বনাশ! বুঝে ফেলল কীভাবে? অপ্রস্তুত হলো মেয়েটা।অজান্তেই ঠোঁটে হাত রাখলো। এরপর কাচুমাচু করে হাতের আঙুলের নখ টেবিলে আঁচড় কাটতে থাকলো। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এমন বেড়ে গেছে, মনে হলো কফিশপের আশেপাশের সবাই শুনে ফেলবে।
শ্রাবণ আবারো একটু ঝুঁকে এলো। চোখ সরু করে বলল,
—” তুমি হঠাৎ লিপবাম দিয়েছো কেনো হুম? হাবভাব তো ভালো লাগছে না মিসেস শেখ! আপনি তো এসব কখনো করেন না। আজ কি আবারো গতরাতের মত কাওকে খুন করার মস্তবড় ষড়যন্ত্র করে এসেছেন? সত্যি সত্যি বলে দিন। তাহলে বেশি কাঁমড় দেব না।”
ধারা শ্বাস আটকে গেলো। ঠোঁট কাঁপছে তার। শ্রাবণের গলা যেন কফিশপের ভিড়ের মাঝেও শুধু তার কানে বাজছে। গভীর, দুষ্টুমি মেশানো অথচ অদ্ভুত কাঁপন জাগানো অনুভূতি চারপাশে আবেশ ছড়াচ্ছে। ধারা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
—” আমি… আমি তো শুধু… একটু সেজে সুন্দর দেখাতে চেয়েছিলাম।”
শ্রাবণের চোখ চকচক করে উঠলো। ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেললো,
—” ওহ, সো… এটা কনফেশনই তো হলো, রাইট? আমার জন্য সুন্দর দেখাতে চেয়েছিলেন?”
ধারার বুক কেঁপে উঠলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। ধরা পড়ে গেছে। সে একঝলক শ্রাবণের চোখে তাকিয়ে দ্রুত মাথা নিচু করে নিলো আবার। ঠোঁট কামড়ে গোপনে মিনমিন করে বলল,
—” আপনাকে কে বলল এরকম কথা?”
শ্রাবণ মৃদু হেসে টেবিলে রাখা তার হাতের কাছে আবারো আঙুল এগিয়ে দিলো। এবারও ছোঁয়নি, কিন্তু এত কাছে যে ধারার মনে হলো ছুঁয়ে ফেলেছে।
—” তোমার চোখ বলেছে, তোমার লজ্জা বলেছে। এমনকি… এই স্ট্রবেরির ঘ্রানটাও বলে দিয়েছে। মিসেস শেখ, আপনি কিন্তু ভীষণ বাজে লায়ার!”
ধারার কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠলো। চোখে জল টলমল করলো, কিন্তু সেটা লজ্জার, দুঃখের নয়। এমন এক অদ্ভুত কাঁপন, যেটা আগে সে কখনো অনুভব করেনি। শ্রাবণ এবার চেয়ার থেকে সামান্য হেলে এসে আস্তে করে বলল,
—” জানেন, আমার সবচেয়ে বড় ভয় এখন একটাই।আপনি এসব করা বন্ধ করবেন না যেন। তখন আমি কাকে দেখে পাগল হবো, বলুন? আমারো একটা অধিকার আছে। ইউ ক্যারি অন! আমার ভালো লাগছে। আপনাকে বউ বউ লাগছে। ”
ধারা গলা শুকিয়ে গেলো, কথা আটকে গেলো তার। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো। সে কাপ আঁকড়ে ধরে চুপচাপ বসে রইলো, শুধু ঠোঁটের কোণে কাঁপতে থাকা একটুখানি হাসি তার মনের সব কথাই বলে দিলো। হাতের কাপটা আরো জোরে আঁকড়ে ধরে বসে রইলো সে। মনে মনে আশ্রয় খুঁজছে ধারা। অথচ ভিতরে ভিতরে সে জানে, আশ্রয় খুঁজতে হলে একজনকেই ভরসা করতে হবে—শ্রাবণ শেখকে।
মস্ত বড় একটা বিশাল আলোকোজ্জ্বল শাড়ির দোকানের কাছে দাঁড়ালো সাদিক। চারদিক ঝলমল করছে আলোয়, দোকানের কাঁচের ভেতরে রঙিন শাড়িগুলো যেন তাকিয়ে থাকা চোখে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তার ঠোঁটে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা ছোট্ট হাসি খেলে গেল। চোখ বড় করে তাকিয়ে খুশিতেই হাসলো। বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল। বুকের ভেতরে জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত দুঃখ এই এক নিঃশ্বাসে একটু হালকা হয়ে গেল।
সাদিক নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে যত্নে গুছিয়ে রাখা টাকাগুলো বের করে তালুতে বিছিয়ে একএক করে গুনে নিল। হ্যাঁ, ঠিকই আছে, চার হাজার টাকা। গুনে গুনে ঠিক চার হাজার টাকাই রয়েছে। টাকার অঙ্কটা বড় নয়, কিন্তু সাদিকের চোখে এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অল্প বয়সের আত্মসম্মানটা তাকে কতবার ভেতর থেকে নীরব করে দিয়েছে তা সে জানে। শহরে এসে শ্রাবণের সাথেই যোগাযোগ করে একটা চাকরির খোঁজ পেতে পারতো সে। ছোটবেলার এত ভালো বন্ধু। নিশ্চয়ই জোগাড় করে দিত। তবু তার কাছে চাকরি চেয়ে মুখ খোলার সাহস হয়নি। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত অহংকার বলেছিলো, “বন্ধুত্বের কাছে ভিক্ষা চাইতে নেই।” তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে শহরে এসে পড়েছিলো সে।
আজ হুট করেই আবার ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাদিক। কনিকার কথা ভীষন মনে পড়ছে। মেয়েটা কে দেখার ইচ্ছে করছে। আগামী মাস থেকে এখানেই থাকতে হবে। মনে মনে ভাবলো সাদিক, খুব তাড়াতাড়ি একটা মোবাইলও কিনতে হবে। তবে এখন পনেরোশো টাকার একটা ফোন কিনলেও কনিকার জন্য শাড়ির বাজেটে কম পড়ে যাবে। তাই মোবাইল কেনার কথা পরে ভাববে সাদিক। এতটা অভাবে মনে মনে একটু কষ্ট পেলেও উপরওয়ালার প্রতি বিশ্বাস রাখল সে। এই টাকা দিয়ে নিশ্চয়ই কাজটা হয়ে যাবে।
আসলে সাদিক অসহায়। শহরের অচেনা রাস্তায় কতদিন যে পেট শূন্যে হেঁটেছে, ক’জনের তাচ্ছিল্য সহ্য করেছে, তা শুধু সে-ই জানে। তবুও হাল ছাড়েনি। অগণিত ব্যর্থতা শেষে অবশেষে একটা চাকরি জুটেছে। বেতন আট হাজার টাকা। প্রথম মাসে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছে ওরা। সেই টাকার এক হাজার চলে গেছে ভাত-ডাল খেতে, অচেনা শহরের ছোট্ট এক চায়ের দোকানে দিন গুনতে গুনতে। বাকি চার হাজার টাকা এই মুহূর্তে তার হাতে। এবার মনে হলো বুকটা কেমন ভরে আসছে। কান্না আর আনন্দের এক অদ্ভুত মিশেল বুকের ভেতরে ঢেউ তুলছে। আজ সে কারো কাছে কিছু ধার করছে না, কারো দয়ার পাত্র হচ্ছে না। আজ সে নিজের কষ্টার্জিত টাকায় কণিকার জন্য একটা শাড়ি কিনবে। নিজের হাতে দেওয়া উপহারে স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটানোর যে স্বপ্ন বহুদিন ধরে গোপনে জমিয়ে রেখেছিল, আজ সেটাই পূর্ণ হতে চলেছে।
কাঁচের ভেতরে ঝলমলে শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে সাদিকের চোখ ভিজে এলো। মনে মনে বিড়বিড় করল সে,
—” হয়তো দামি কিছু দিতে পারব না তোমায়। কিন্তু এই শাড়িটা হবে আমার ঘামের দাগ মাখা ভালোবাসার চিহ্ন। হয়তো তুমিই বুঝবে, এই চার হাজার টাকার পেছনে আমার না-পাওয়া রাতগুলো, আমার ক্ষুধার্ত দিনগুলো, আমার চোখের পানি লুকোনো সন্ধ্যাগুলো জমে আছে।”
দোকানের ভেতর ঢোকার আগে একবার আকাশের দিকে তাকাল সাদিক। চোখ বুজে ছোট্ট একটা দোয়া করল যেন এই শাড়িটার রঙেই তার সংসার ভরে ওঠে সুখে। তারপর দৃঢ় পায়ে ভেতরে ঢুকে গেল। খুব দেখেশুনে ভেবে চিন্তে একটা লাল রঙের শাড়ি বেছে নিল সাদিক। হাতে নিয়ে মনে মনে ভাবলো পিচ্চি টাকে এই শাড়িতে কেমন লাগবে। ভেবেই হাসলো সাদিক। অবশ্যই খুব সুন্দর লাগবে তার বউকে। এত মিষ্টি একটা বউ তার! কোনো কিছুতেই বেমানান হবেনা।
খোদা সহায় হলো। সাদিকের পছন্দ করা শাড়িটা তিন হাজার টাকার। তাই সে খুশি মনে মনে মনে শোকর আদায় করে শাড়িটা নিয়ে নিলো৷ বাকি এক হাজার দিয়ে আপেল, কমলা আর আঙুর নিল। কনিকা কে খাওয়াবে এসব। ভাবতেই গর্বে বুক ফুলে যাচ্ছে তার। নিজেকে একজন স্বামী মনে হচ্ছে। কাজ শেষ করেই ট্রেনে উঠলো সাদিক। গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল হাসিমুখে। ট্রেনে বেশি সময় লাগেনা। আশা করা যায়, দুই ঘন্টার মধ্যেই গ্রামে পৌঁছে যাবে সে।
—” জা”নোয়ার টার নাম তানভীর। ওই কা*পুরুষের বাচ্চাই আমার মুনিরাকে তুলে নিয়ে গেছে। ভার্সিটির পাশে থাকা গোডাউনে ওরা আড্ডা জমাতো। ওটাই ওদের জাহান্নাম। আমি যদি খুব একটা ভুল না করি, তবে মুনিরাকে ওরা ওখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। প্রতিশোধ নিতে চাইছে ওরা। আমি সব জানি।”
অস্থির হয়ে কথাগুলো বলল জিহান। ওর কথা শুনে অবাক হলো শ্রাবণ। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিহানের ঘাড়ে হাত রেখে বলল,
—” তুই একটু শান্ত হ ভাই। একটু বোস। আমি সব শুনছি।”
বলতে বলতেই জিহানকে সোফায় বসালো শ্রাবণ। ধারাকে নিয়ে সে একটু আগেই বাড়িতে ফিরেছে। সন্ধ্যা হয়নি এখনো। হুট করেই ঝড়ের গতিতে শ্রাবণের বাড়িতে এসে পাগলামো শুরু করলো জিহান। বারবার শ্রাবণকে বলতে থাকলো আমি জানি ও কোথায়। ওকে নিয়ে আসি চল। অথচ এসব দেখে অসহায়বোধ করল শ্রাবণ। ঠান্ডা পানি খাওয়ালো জিহানকে। শান্ত করিয়ে ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করল,
—’ তুই কীভাবে নিশ্চিত যে ওই গোডাউনে মুনিরা আছে?”
জিহান আরো অস্থির হলো। বুক ওঠানামা করছে দ্রুততর শ্বাসে। শ্রাবণকে বোঝানোর জন্য কাঁপা কণ্ঠে হাত দুটো নেড়ে বলতে থাকল সে,
—” শ্রাবণ, তুই বুঝছিস না? আমি চোখে দেখেছিলাম। ওই জানোয়ার তানভীর আগে ভার্সিটির পাশে ছেলেগুলার সাথে ঢুকতো ওই গোডাউনে। তোর কি মনে হয়, ওরা শুধু আড্ডা দেয়? ওই জাহান্নামে কী হয় আমি জানি! অনেক স্টুডেন্ট কে রেগও দিত ওখানে। আমার ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। মুনিরা নেই কোথাও, কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তবু মন বারবার শুধু ওই জায়গাটাই দেখাচ্ছে। আমার ভেতরটা চিৎকার করছে, ও সেখানে, ওখানেই আছে!”
জিহানের গলা ভেঙে এলো। দু’চোখ লাল, শিরা-উপশিরা টনটন করছে রাগে আর ভয়ে। সে আবারও হাত মুঠি করে সোফার হাতলে আঘাত করল।
—” আমি বাঁচতে পারব না যদি ওকে ওখান থেকে না আনি, শ্রাবণ। ওরা যেভাবে মেয়েদের সাথে আচরণ করে, আমি জানি, আমি জানি! আমার মুনিরা কেমন ভয়ে আছে এখন ভাবতেই পারছিস? আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে, চোখ বন্ধ করলেই ওর মুখটা দেখি।”
শ্রাবণ নিঃশব্দে সব শুনছিলো। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল সে। জিহানের প্রতিটা কথাই তার বুকের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। বাইরে হালকা আলো নামছে, সন্ধ্যা নামার আগে চারপাশটা ধূসর হয়ে উঠেছে। শ্রাবণ চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ভেতরেও অস্থিরতা জমে উঠলো। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে জিহানের কাঁধে চাপ দিলো। চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
—” তুই ভুলও হতে পারিস, আবার ঠিকও হতে পারিস। কিন্তু এভাবে বসে থাকলে কিছুই হবে না। মুনিরাকে যদি সত্যিই ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে দেরি মানে বিপদ।”
শ্রাবণের বুকেও এক অজানা আতঙ্ক ঢুকে পড়লো। হঠাৎ যেন নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল তার। নিজের মনকেও সে থামাতে পারছে না, মনে হচ্ছে জিহানের কথাই সত্যি। সে গভীর দৃষ্টিতে জিহানের দিকে তাকাল।
—” আমাদের তাহলে পুলিশ নিয়ে ওখানে যাওয়া উচিত এখনই।”
শ্রাবণের ঠোঁটের কোণ শক্ত হয়ে উঠল। ভেতরে যে ভয়, সেটা ঢাকা দিলো দায়িত্বের চাপা দৃঢ়তায়। জিহানের অস্থিরতা যেন তার ভেতরের আগুনও জ্বালিয়ে দিল। শ্রাবণের কথা শোনার সাথে সাথে জিহান আর স্থির থাকতে পারলো না। এক লাফে উঠে দাঁড়ালো সে। চোখে একরাশ অস্থিরতা, ভেতরে অগ্নিগর্ভ অশান্তি। যেন এখনই ছুটে গিয়ে মুনিরাকে ফিরিয়ে আনবে।
শ্রাবণ সোফার পাশে রাখা টেবিলে হাত বাড়িয়ে গাড়ির চাবিটা তুলে নিল। হঠাৎ পিছন থেকে ধারা ভয়ে কাঁপা গলায় ডাক দিল। সে এতক্ষণ লুকিয়ে সব কথা শুনেছে। আতঙ্কিত হয়ে সে বলল,
—” আপনি কি সত্যিই ওখানে যাচ্ছেন? জানেনও না ভেতরে কতজন আছে, কেমন বিপদ অপেক্ষা করছে। এটা কি সহজ কিছু ভাবছেন? এভাবে যাবেন না!”
চোখে আতঙ্কের ছায়া, ঠোঁট কাঁপছে ধারার। এতক্ষণ চুপচাপ শোনার পর এবার ভয়টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।
শ্রাবণ গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ধারার দিকে। স্বরটা ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় করে বলল,
—” আমি জানি বিপদ আছে। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকলে বিপদ আরও বড় হবে। মুনিরা যদি ওখানে থাকে, তবে এক মুহূর্ত দেরিও মানে না। তুমি চিন্তা করো না, সাবধানে যাব।”
ধারা চোখ নামিয়ে নিল, তবু বুকের ধকধকানি থামাতে পারল না। মনে হলো, শ্রাবণ যদি ফিরে না আসে,তবে সেই চিন্তাতেই তার গলা বুঁজে এলো। জিহান তাড়াহুড়ো করে বলল,
—” চল, শ্রাবণ! দেরি করার সুযোগ নেই।”
শ্রাবণ দ্রুত আলমারির ড্রয়ার খুলে কিছু খুঁজলো। পুরনো একটা টর্চ আর হাতের কাছে থাকা ছোট্ট লোহার রডটা বের করে নিল। পকেটে রাখলো মোবাইল, সঙ্গে ছোট্ট ফার্স্ট এইড বক্সও নিয়ে নিলো। সব দেখে জিহান আরও তাড়া দিল। গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শ্রাবণ গম্ভীর গলায় বলল,
—” তুই জানিস, ওরা কেমন। ওরা এখনো ওখানে থাকলে ভেতরে গিয়ে বুদ্ধি খাটাতে হবে। শুধু হঠকারি রাগ দেখালে কাজ হবে না।”
জিহান দাঁত চেপে উত্তর দিল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৩
—” বুদ্ধি-টুদ্ধি পরে আসুক। আমার মুনিরাকে বাঁচাতেই হবে।”
গাড়িতে উঠে দু’জনেই নিঃশব্দে বসলো। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই শহরের আলো-ঝলমলে রাস্তা এক অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া লাগলো। গন্তব্যে শুধু অন্ধকার, আতঙ্ক আর অজানা বিপদের ছায়া। পাশের সিটে বসা জিহানের চোখ টলমল করছে। আর শ্রাবণের মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। ওরা জানে না, ভেতরে কী অপেক্ষা করছে। তবু মন বলছে, এই যাত্রাই হয়তো সবকিছুর মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
