শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৭ (২)
অনামিকা তাহসিন রোজা
কথায় আছে বাঙালি মেয়েরা শাড়িতেই সুন্দরী। নারীর অতি যত্নের বস্তু হলো শাড়ি। তাই শাড়ি পরিহিত একটি বাঙালি নারীর সৌন্দর্য অবর্ণনীয় হয়ে ওঠে সবসময়। অন্যরকম দীপ্তি ছড়ায় চারপাশে। ধারা একজন বাঙালি নারী বলেই হয়তো আজও তেমনটা হয়েছে। শাড়িতে তার বয়স লুকিয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ সবে সতেরো পেরিয়ে আঠারোর কাছাকাছি যাওয়া ধারার বয়স আন্দাজ করতে পারেনি ইকরা। সরল মুখটা দেখে বাচ্চা বাচ্চা মনে হলেও শাড়িতে ধারাকে পরিপূর্ণ নারী লেগেছে তার। এই কারনেই সালমা বেগমের মুখে ধারার সাথে বিয়ের পুরো কাহিনী শুনে কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে ছিল ইকরা।
সেই সময় কথোপকথন শেষ করে ধারা শ্রাবণকে ডেকে তুলতে ঘরে গিয়েছে। আর ইকরা মুখ কালো করেই সালমা বেগমের সাথে রান্নাঘরে ঢুকেছে। সালমা বেগমের মুখ থেকে তো হাসি সরছেই না। ধারাকে নিয়ে দুনিয়ার সকল কথা শোনাচ্ছে ইকরাকে। প্রশংসার কোনো কমতি নেই। ইকরা কথায় কথায় শুধু হু হ্যাঁ করছে।
এদিকে ঘরে শ্রাবণ কে ডাকার উদ্দেশ্যে আসলেই দরজায় ছিটকিনি দিয়ে ঠেস দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ধারা। হ্যাঁ, সে ছোট বয়সে। হয়তো একটু কম বয়সী। কিন্তু ম্যচিউরিটি তার মাঝেও এসেছে। একটু হলেও এসেছে। ইকরা শ্রাবণের পাশের ঘরটা তেই থাকতো? কেনো? কে সে? কীসের সম্পর্কের ভিত্তিতে ছোট থেকেই এখানে থাকতো? এখন আবার ফিরে আসলো কেনো? আর বিয়ের কথা শুনতেই মুখ গোমড়া করল কেনো? ধারা রীতিমতো আকাশ পাতাল ভাবনা শুরু করেছে। সে এতটাই অন্যমনস্ক ছিল যে বিছানা যে ইতোমধ্যে ফাঁকা! ঘরের মালিক যে উঠে পড়েছে সে তা খেয়ালই করেনি।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শ্রাবণ ঘুম থেকে উঠে পাশে ধারা কে না দেখে প্রতিদিনের মত ভ্রু কুঁচকেছে। মেয়েটাকে জবোরদস্ত একটা শাস্তি দেয়ার মনোভাব নিয়ে হেলেদুলে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গিয়েছে। মুখহাত মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই ধারাকে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হয় শ্রাবণ। সর্বপ্রথম থমকে যায় শাড়ি পরিহিত মেয়েটাকে দেখে। পিচ্চিটা আবারো শাড়ি পড়েছে! এক মুহুর্তের জন্য চোখ স্থির হয় শ্রাবণের। মনে মনে মুগ্ধ হয়ে একটু আগে ধারাকে পানিশমেন্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত টা বাতিল করে ফেলে সহসা। নাহ! এই রমনীকে শাস্তি দেয়া টা অন্যায়! বহুত অন্যায়। শ্রাবণ শেখ তো জেন্টেলম্যান। সে বউকে শাস্তি দেয়না, আদর দেয়। সেটাই দেবে আবার। দেয়ার ক্ষেত্রে শ্রাবণ শেখের মনও ভীষন বড়। কারন কবি বলেছেন,— ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ!
কিন্তু এত সুন্দর শাড়ি পরিহিত মেয়েটাকে দেখেই কেনো যেন শান্তি পেলো না শ্রাবণ। কিছু একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগলো। ভালো করে তাকাতেই লক্ষ্য করল, রমণীর ঠোঁটে হাসি নেই। মুখে রাজ্যের সব আঁধার নেমেছে। এবারে চিন্তিত হলো শ্রাবণ। তোয়ালে টা চেয়ারের উপর রেখে ধারার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
—” ধারা কী হয়েছে? ঘুম থেকে কখন উঠেছো?”
অন্যদিকে তাকিয়ে চিন্তায় মগ্ন ছিল ধারা। শ্রাবণের গলা শুনতেই চমকে গিয়ে কোনোমতে বলল,
—” কে যেন এসেছে। আপনি চিনেন হয়তো। মা ডাকছে আপনাকে।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো,
—” সেটা পরে হবে। আগে তোমার কী হয়েছে সেটা বলো? মন খারাপ? মুখের এই অবস্থা কেনো?”
ধারা এড়িয়ে যেতে চাইলো বিষয়টা। তাই আমতা আমতা করে বলল,
—” না না, আমার আবার কী হবে? কিছুই হয়নি!”
বলতে বলতেই আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো ধারা।
শ্রাবণের কপাল সংকুচিত হলো। সে মোটেই বোকা নয়। আর সে এটাও জানে যে তার ধারা এভাবে মুখ গোমড়া করে থাকার মেয়ে নয়৷ সরল একটা আভা সবসময় ধারার চেহারায় চকচক করে, যা মুগ্ধ করে শ্রাবণকে। সেটা তো এখন খুঁজে পাচ্ছেনা। ধারা মনে হয় বুঝলো। তাই আমতা আমতা করে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—” দেখি, আমি নিচে যাই। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন।”
বলেই ধারা ছিটকিনি খুলার জন্য হাত বাড়ালো। ধারার এমন পালাই পালাই ভাব দেখে অস্থির হলো শ্রাবণ। দরজা খোলার জন্য ধারার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ফট করে নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল। মেয়েটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
ধারার পিঠ ঠেকলো শ্রাবণ শেখের বুকে। হুট করে এমন ছিটকে কাছে টেনে নেয়াতে অপ্রস্তুত ধারা শুকনো ঢোক গিলল। খেই হারিয়ে নিজেকে ছেড়ে দিল পুরুষটির বুকে। শ্রাবণ এবার শাড়ির উপর দিয়েই ধারার পেট চেপে ধরল। ঘাড়ের কাছে মুখ এনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—” এভাবে কষ্ট দেবেন না মিসেস শেখ। আপনি জানেন না? আপনাকে ছাড়া আমি কতটা অসহায়। দেখুন, শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। সকাল সকাল আপনার স্নিগ্ধ চোখজোড়া না দেখিয়ে এভাবে গোমড়ামুখে থাকলে তো আমার কষ্ট হয়। বোঝেন না সেটা?”
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে মিইয়ে গেলো। কানের কাছে লোকটার শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে তীব্রগতিতে। নেয়াটা অসহ্যকর হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন গুটিয়ে এলো মেয়েটা। বিড়বিড় করে সেও বলল,
—” ছেড়ে দিন। আমি নিচে যাব।”
শ্রাবণও আরো কাছে এগিয়ে এলো। মুঠোয় থাকা ধারার হাতটা আরেকটু চেপে ধরে ধারার কানের কাছে এসে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” উহু, বউকে ছাড়তে নেই। বলো না সোনা, কী হয়েছে তোমার? কেও কিছু বলেছে? আমার কোনো কথায় মন খারাপ করেছো? আমি কিছু করেছি? হুম? আমায় বলো লক্ষ্মী বউ!”
ধারার কেনো যেন কান্না পাচ্ছে। কি আশ্চর্য! কান্না পাওয়ার মত কোনো ঘটনা হয়নি। কিন্তু ধারার মন কু ডাকছে। ভালো লাগছে না তার। তাই নিজেকে কোনোমতে সামলিয়ে এবারে ধারা মিনমিন করে বলে উঠলো,
—” কিচ্ছু হয়নি আমার। আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি নিচে যান। ইকরা নামের একটি মেয়ে এসেছে। আপনাদের কেও হবে। আমি তো চিনিনা। তার সাথে দেখা করার জন্য মা আপনাকে ডাকছে।”
ঘটনা কী হলো জানা নেই ধারার। কিন্তু ইকরার নামটা শোনামাত্রই নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা ধারার হাতটা ফট করে ছেড়ে দিল শ্রাবণ। কিছুটা সরে গিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
—” ইকরা? কখন এসেছে?”
যন্ত্রের মত জবাব দিল ধারা,
—” একটু আগে।”
—” এত সকালে?”
—” হুম!”
শ্রাবণ বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। মেয়েটা বোধহয় এয়ারপোর্ট থেকে ডিরেক্ট এখানেই এসেছে। শ্রাবণ এতক্ষণ কিছু না বুঝলেও এবার মনে হয় কিছু একটা বুঝতে পারলো। ফট করে ধারার দিকে তাকিয়ে এক রাশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো,
—” ইকরা কি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে?”
শ্রাবণের কন্ঠে হঠাৎ এমন শক্ত কথা শুনে ধারা কিছুক্ষণ চুপ রইলো। তারপর ভেবে মাথা নেড়ে বলল,
—” না!”
শ্রাবণ মনে হয় সস্থি পেলো। ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গায়ে থাকা টি শার্ট টা বদলে নিয়ে একটা শার্ট পড়লো। ধারাকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রেখেই নিজের চুল আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঠিক করলো। এরপর ধারার কাছে এসে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
—” তুমি যে কোনোকিছু নিয়ে আপসেট তা বুঝেছি। আগে নিচে গিয়ে ইকরার সাথে দেখা করে আসি। তোমার কেইস টা পরে দেখছি আমি। হুম.? এসো, পরিচয় করিয়ে দেব!”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৭
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শ্রাবণের কথাগুলো শুনলো। তারপর মাথা নেড়ে শ্রাবণের সাথেই নিচে চলে গেলো। কিন্তু কিছু একটা আবারো চোখে পড়লো ধারার। কিছু একটা আবারো মনে খটকা দিয়ে গেলো। কিন্তু ধরতে এবারো অক্ষম বেচারি। আর যাই হোক না কেনো, ধারা একজন মেয়ে, আবার একজন স্ত্রী। তাই একটুখানি সন্দিহান হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আবার অতিরিক্ত কোনোকিছুই তো ভালোও নয়। প্রাকৃতিক ভাবেই সবকিছুর ভারসম্য রয়েছে। তাই উচিত হবে সেই ভারসম্য টা বজায় রাখা।
