শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৭
অনামিকা তাহসিন রোজা
সূর্য মামা উঁকি দিয়েছে পৃথিবীর জানালায়। শেখ বাড়ির ছাদের ফুলগাছগুলোও ঝলমলে রোদ পেয়ে হেসে উঠছে। সালমা বেগম প্রতিদিনের মতই রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আজ শনিবার। ছুটির আরেকটা দিন হওয়ায় কেওই উঠেনি এখন পর্যন্ত। সালমা বেগম ভেবেছিলেন যে ধারাও বোধহয় ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ছাদ থেকে টিপটিপ করে নেমে আসলো ধারা। আজ সালোয়ার কামিজ না পড়ে শাড়ি পড়েছে মেয়েটা। রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে শাড়ি পরিহিত ধারা কে দেখে আবারো অবাক হলেন সালমা। জোর গলায় বলে উঠলেন,
—” কীরে ধারা? আজ আবার শাড়ি কেনো পড়লি মা? কষ্ট হবেনা? গরম হবে আজ!”
কথা মিথ্যে নয়। আবহাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। গত রাতে প্রচুর বৃষ্টিতে চারপাশ ঠান্ডা আবহাওয়ায় ছেয়ে গেলেও আজ সূর্যের চালচলন দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে সারাদিন প্রচুর গরম হবে। তবে ধারা এসব ভাবেনি। সে ধীরপায়ে রান্নাঘরে ঢুকে রুটি বানাতে থাকা সালমা বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
—” আমি এখন থেকেই একটু একটু করে শাড়ি পড়া শিখে নিই মা। শাড়ি পড়তে ভালো লাগে এখন। বেশি গরম লাগলে বদলে নেব।”
সালমা বেগম মিষ্টি করে হাসলেন। ধারা এবার নিজে থেকেই রুটি বানাতে হাত লাগাতে চাইলো। বাঁধা দিলেন সালমা বেগম,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—”থাক থাক। রুটি আমি বানাচ্ছি। তুই বরং সোফা টা একটু ঝেরে দে তো। একটু পরেই তোর শ্বশুর এসে বসেবে।”
ধারা মাথা নেড়ে সায় জানালো। সালমা বেগম আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
—” ভালো কথা, শ্রাবণ উঠেনি? ওকে ডেকে আন তো যা!”
ধারা এবারে অসহায় মুখ করে তাকালো শ্বাশুড়ির দিকে৷ কি যেন একটা ভেবে মিনমিন করে বলল,
—” আমি ডাকতে পারব না মা।”
অবাক হলেন সালমা বেগম,
—” ওমা! সে কি কথা! কেনো?”
ধারা কিছু বলল না। ঠোঁট কাঁমড়ে মেঝেতে পায়ের নখ খুটতে থাকলো। মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সালমা বেগম আরো কিছু বলতে চাইবেন, তার আগেই দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো। ধারা আর সালমা বেগম দুজনেই তাকালেন দরজার দিকে। অবাক হলেন সালমা বেগম। এত সকাল সকাল বাড়িতে তো কারো আসার কথা নয়। কে এলো এখন? সালমা বেগম ইশারা করতেই ধারা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
ফর্মাল প্যান্টের সাথে একটা ওয়ান পিস টপ টাইপের পোশাক পড়ে ইয়া বড় ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। চুল খোলা, চোখে সানগ্লাস আর চেহারায় কৌতুহল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটি। এদিকে, অপরিচিত মেয়েলি মুখ দেখে পিটপিট করে তাকালো ধারা। এই মেয়ে আবার কোন খেতের সাদা মুলা? কখনো তো দেখেনি আগে। ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—” আপনি কে?”
আগন্তুক মেয়েটি ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবলো কিছু একটা। সেও মনে হয় ধারা কে নিয়ে চিন্তিত। এরপর চোখের সানগ্লাস টা খুলে জিজ্ঞেস করল,
—” সালমা আন্টি বাসায় নেই?”
ধারা কিছু বলার আগেই সালমা বেগম রান্নাঘর থেকে হাঁক ছুঁড়লেন,
—” কীরে ধারা, কে এসেছে?”
আগন্তুক মেয়েটি সালমা বেগমের কন্ঠে শুনল। মেয়েটির মুখে এবার হাসি দেখা গেলো। সে নিজেও জোরে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো,
—” আন্টি, আমি ইকরা।”
সালমা বেগম কিছুক্ষণ তব্দা মেরে থাকলেন। এরপর মাথায় আঁচলটা গুঁজে দ্রুত বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। সদ্য বানানো গরম রুটি, বেলন-চাকিটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে গেলেন দরজার কাছে। চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস আর বিস্ময়ের মিশ্র ছাপ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে যেন তার মুখ হেসে উঠলো নিজে থেকেই,
—” আরে ইকরা যে! তুই! কি আশ্চর্য! হুট করে চলে এলি? কিছু জানাস নি তো?”
বলে একদম এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েটিকে। ইকরাও হাসিমুখে সালমা বেগমকে শক্ত করে ধরে বলল,
—” অভিমান করবো কিন্তু, আন্টি! আমি এতবার কল করেছি। আমার কোনো কলই ধরলেন না তুমি!”
সালমা বেগম হেসে গাল টিপে দিলেন,
—” এই বুড়ো বয়সে কাজের ভিড়ে কে আর কাকে ফোন দেয় বল! আমি তো ফোনই দেখি না। আয়, আয় ভেতরে আয়! আচ্ছা তুই জানাস নি কেনো? ”
ধারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একপাশে। চোখে ছিল অদ্ভুত বিস্ময়। এই ইকরা নামের মেয়েটা কে? এতদিনে তো কখনো নামও শোনেনি। অথচ সালমা বেগম তাকে এমন করে কাছে টেনে নিচ্ছেন যেন বহুদিনের আপনজন। ধারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে কৌতূহল আর মনের মধ্যে ছোট্ট এক দ্বিধা।
এই মেয়েটি ঠিক কী সম্পর্ক রাখে শেখ পরিবারের সঙ্গে?
সালমা বেগমের কথার প্রতিত্তোরে ইকরা মিষ্টি হেসে বলল,
—” একচুয়ালি, আই ওয়ান্টেড টু সারপ্রাইজ ইউ অল। বাট এসে তো নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেছি। ইনি কে?”
ধারার দিকে ইশারা করে সালমা বেগমকে প্রশ্ন ছুঁড়লো ইকরা। সালমা বেগম আগের থেকেও খুশিখুশি চোখ নিয়ে ধারাকে একবার দেখে নিলেন। তারপর রহস্য রহস্য ভাব নিয়ে বললেন,
—” ও আমার মেয়ে।”
ধারা হাসলো। ইকরা মুখ কুঁচকালো,
—” ধ্যাত, তা আবার হয় নাকি। ছোট থেকে ছিলাম এখানে। তোমার মেয়ে থাকলে কি জানতাম না?”
বলতে বলতেই ঘরে ঢুকলো ইকরা। ধারা দরজায় ছিটকিনি লাগালো। সালমা বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো ব্যপার টা। ইকরা এদিকে ঘরে ঢুকতেই প্রাণবন্তভাবে বলল,
—” বাহ, এখনও ঘরটা আগের মতই! কিচেনের দিক থেকে রুটির গন্ধ আসছে। আহ! কতদিন তোমার হাতের খাবার খাইনি আন্টি। আচ্ছা, মানে তুমি এখনো নিজের হাতে রান্না করো আন্টি!”
সালমা বেগম হেসে উত্তর দিলেন,
—” এই হাতের রান্না ছাড়া তো তোর আঙ্কেল মুখে কিছুই তোলে না মা। যতদিন সুস্থ আছি, রান্নাবান্না করে খাওয়াই।”
ধারা অবাক দৃষ্টিতে একবার সালমা বেগমের দিকে, একবার ইকরার দিকে তাকালো। ওদের এই পুরনো পরিচিতি যেন এক রহস্য হয়ে তার সামনে খুলে গেল। সালমা বেগম এবার ধারা’র দিকে ঘুরে বললেন,
—” ধারা, এ হলো ইকরা। তুই যে আগে শ্রাবণের পাশের ঘরটাতে থাকতি। ওই ঘরটা ইকরারই ছিল। ছোট থেকে থাকতো এখানে। পরে, বিদেশে চলে গিয়েছিল। অনেকদিন পর এলো আজ।”
ধারা কেনো যেন জোরপূর্বক হেসে বলল,
—” আচ্ছা মা!”
ইকরা সোফাতে বসে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করছিল। ধারার মুখে “মা” ডাক শুনে চমকে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—” আসলেই ইনি তোমার মেয়ে আন্টি? তুমি কি দত্তক নিয়েছো?”
এ পর্যায়ে হো হো করে হেসে ফেললেন সালমা বেগম। ধারা কে কাছে টেনে থুতনি ধরে আদর করে দিলেন। ইকরার উদ্দেশ্যে ভাব নিয়ে বললেন,
—” অবশ্যই আমার মেয়েই। কিন্তু, অন্যভাবে বলা যায়, শ্রাবণের বউ ও। ভাবি হয় তোর!”
বলেই আরেক দফা হাসলেন ভদ্রমহিলা।
ইকরা চমকে গেল কিনা এক মুহুর্তের জন্য বোঝা গেলো না। তবে মুখটা অন্ধকার হলো খানিক। স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে রইলো ধারার মুখের দিকে। এরপর যন্ত্রের মত ঠোঁট নেড়ে বলল,
—” শ্রাবণের বিয়ে দিয়েছো আন্টি? ”
সালমা বেগম খুব খুশি খুশি মনে বললেন,
—” হ্যাঁ রে। তুই তো দেশের বাইরে ছিলি বলে জানিস না। সত্যি বলতে অনেকেই জানে না রেম সে আরেকটা ঘটনা আছে বিয়ে নিয়ে বুঝলি। পরে বলব সব। তবে ধারা ভীষন লক্ষ্মী। জানিস, প্রথমে তো শ্রাবণ মেনেই নেবে না এমন এক ভাব। তখন তোর ঘরে থাকতে দিয়েছিলাম ধারা কে। ছেলে আমার ঠিক সময়ে সুবুদ্ধি অর্জন করেছে। এখন আর বউ ছাড়া কিছু বোঝেই না!”
বলে আবারো হাসলেন সালমা বেগম।
ধারা ঠোঁট চেপে আবারো জোরপূর্বক হাসলো। কিন্তু তারও মেয়েলি চোখ ইকরাকে পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটা এতক্ষণ এতটা প্রাণবন্ত ছিল। এখন এতো মিইয়ে গেলো কেনো? সে কি কোনোভাবে শ্রাবণের বিয়ের কথা শুনে হতাশ হয়েছে? ধারার ভাবনা এখানেই আটকালো। আর কিছু ভাবতে মন চাইলো না।
এদিকে ইকরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ রইলো। এরপর ধারার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে কোনমতে বলে উঠলো,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৬
—” ভীষন মিষ্টি মেয়ে তুমি। শ্রাবণকে সুখী রেখো।”
ধারাও জোরপূর্বক হাসলো৷ তবে দুজনের দৃষ্টিই এক অন্যতে কিছুক্ষণের জন্য স্থির রইলো। বোঝা গেলো না দ্বন্দ্বের কিনা। তবে কিছু একটা টের পাওয়া গেলো। ধারার চোখে একরাশ সন্দেহ আর ইকরার চোখে অন্যকিছু। ব্যাপার টা বোঝার মত হলো না। তবে হ্যাঁ, যেমন জল আর তেল কখনো এক হতে পারে না, তেমনই মোম আর আগুন একসাথে রাখতে হয়না।
