Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৯
অনামিকা তাহসিন রোজা

—” হুট করে কাওকে কিছু না বলে এভাবে চলে আসলি কেনো? সব কাজ শেষ করেই আসতি।”
কথা টা বলেই চায়ে চুমুক দিলেন সামিউল শেখ। সালমা বেগম মুখ কুঁচকে তাকালেন। এত কষ্ট করে গরম গরম রুটি গুলো করলেন তিনি। শেষে কিনা সামিউল শেখ ড্রয়িং রুমে এসে ইকরা কে দেখেই আগে চা চাইলেন। সালমা বেগম ধারা কে নিয়ে সোফায় বসলেন। সামিউল শেখের প্রশ্নে ইকরা না চাইতেও একটু থতমত খেলো। একবার সামিউল শেখের পাশে বসে থাকা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,

—” আসলে সারপ্রাইজ দিতে এসেছিলাম বাপ্পি। কিন্তু এসে তো নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম। শ্রাবণের বিয়ে দিয়ে দিলে হুট করে। আমাকে জানালেও তো পারতে বলো!”
সামিউল শেখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। ইকরাও কেমন যেন হাসির দীর্ঘ করে তাকালো। দুজনের মাঝে দৃষ্টি বিনিময় হলো খুবই রহস্যজনক ভাবে। সালমা বেগম খেয়াল করলেন বিষয়টা। দুজনের দিকে একপলক করে তাকিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন যে কী হয়েছে। কিন্তু শ্রাবণও কিছু জানে না। সে ঠোঁট উল্টে ঘাড় উঁচালো। ধারাও কেন যেন সামিউল শেখ আর ইকরার এমন দৃষ্টি দেখে চোখ সরু করলো। গুরুতর ভঙ্গিমায় তাকিয়েই রইলো। অনেকক্ষণ নীরবতার পর সামিউল শেখ বলে উঠলেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” এত দ্রুত দেশে আসার কারন?”
ইকরা সহজভাবে বলল,
—” অধিকার ছিনিয়ে নেয়া।”
সাথে সাথে বজ্রপাত পড়লো শেখ বাড়ির বসার ঘরে। তৎক্ষনাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন সামিউল শেখ, গর্জন করে বললেন,
—” মানেহ?”
সামিউল শেখের সাথে সাথে বাকিরাও হতবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালো। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো ইকরার দিকে। সালমা বেগম আর ধারা দুজনেই চোখ বড় করে রইলো। বোঝা গেলো না পরিস্থিতি টা এমন হলো কেনো। ইকরা একমাত্র নির্বিকার রইলো। সবাইকে এমন চমকে যেতে দেখে ফিক করে হাসলো। এরপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
—” রিলেক্স বাপ্পি! আমি তো ঠিকই বলেছি বলো। কত বছর ধরে তোমাদের ভালোবাসা, স্নেহ, আদর থেকে বঞ্চিত আমি। এসব তো অধিকার আমার। সেগুলোই ছিনিয়ে নিতে এসেছি। মজা করেই বললাম। এমন চমকে যাওয়ার কী আছে?”
সালমা বেগম নিতান্তই সহজ সরল মানুষ। অনেকটা ধারার মত। তাই তিনিও ভাবলেন ইকরা মজা করছে। তিনিও এবারে ফিক করে হেসে সায় দিয়ে বললেন,

—” হুম হুম। নিস। তোর অধিকার বলে কথা। না দিয়ে কি উপায় আছে?”
বলে তিনিও আরেক দফা হাসলেন।
তবে সহজ সরল উপাধি পাওয়া ধারা আজ অবুঝ হলো না। সে একটুও নড়লো না তার জায়গা থেকে। আগের মতোই ভ্রু কুঁচকে রইলো। শ্রাবণ আর সামিউল শেখের ক্ষেত্রেও তাই। শ্রাবণের এবার ভীষন অস্থির লাগলো। কেনো তা টের পেলো না। তবে ভালো লাগছে না। সে ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারার দিকে তাকিয়ে বলল,

—” ঘরে চলো। কথা আছে। বাবা, মা, আমরা একটু ঘরে যাচ্ছি। কাপড় গোছাতে হবে।”
বলেই ধারাকে আসার ইশারা দিয়ে উপরে ধপধপ করে চলে গেলো শ্রাবণ। তার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো ইকরা। কেমন যেন অসহায় চোখে তাকালো। শুকনো ঢোক গিলল। চাহনি টা লক্ষ্য করলো ধারা। পাত্তা দিলো না। শ্রাবণের কথামতো সালমা বেগমের অনুমতি নিয়ে ধীর গতিতে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করলো। এবারে বসার ঘরে শুধু রইলো সামিউল শেখ, সালমা বেগম আর ইকরা।
সালমা বেগম স্বামীর গম্ভীর মুখ দেখে ভীত হলেন। কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে রইলেন। ইকরার মুখেও শুধু হাসি। তার থেকে কিছুই নেই। এক মুহুর্তের জন্য তিনি সাহস জমিয়ে সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বললেন,

—” ওগো, কী হয়েছে? তুমি ইকরার সাথে এভাবে কথা বলছো কেনো? এসেছে, ভালোই হয়েছে তো। কেনো এসেছে, এ আবার কেমন কথা।”
সামিউল শেখ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলেন। এক মুহুর্তের জন্য দৃষ্টি না সরিয়ে কঠিন গলায় বললেন,
—” ও দেশে ফিরে এসেছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই আমার সালমা। কিন্তু যেই মেয়েকে আমি খাওয়ালাম, পড়ালাম, বড় করলাম, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠালাম। সেই মেয়ে যদি নিজের বাপ, যে কিনা বাপের কোনো কর্তব্য পালনই করেনি, তার সম্পত্তির ভাগ চাইতে আমার কাছে আসে তবে সেটা খুবই লজ্জাজনক। ”
আঁতকে উঠলেন সালমা বেগম। হতবাক হয়ে তাকালেন ইকরার দিকে। ইকরা এবারো শুকনো ঢোক গিলে চোখ সরালো। তবে দৃঢ় রাখতে চেষ্টা করলো নিজের মুখভঙ্গি। জোর করে আত্মবিশ্বাস রাখার প্রয়াস। সালমা বেগম যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,

—” এসব কী বলছো শ্রাবণের বাবা! ধুর, ইকরা এসব কেনো বলবে? ও তো…
সালমা বেগমের কথা শেষ করতে দিলেন না সামিউল শেখ। তার আগেই গর্জন দিয়ে বলে উঠলেন,
—” তোমার বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করো ওকে। জিজ্ঞেস করো! ওকে আমি কী দিইনি? খাওয়াইনি? পড়াইনি? নিজের মেয়ের মত রাখিনি ওকে? কীসের অভাব ছিল ওর? কেমন মানুষ করেছি আমি ওকে? শেষে কিনা, কালসাপ হয়ে উঠলো। কতটা নিকৃষ্ট মনমানসিকতা হলে সে বিদেশ থেকে এসে বাপের সম্পত্তির ভাগ চাইছে।”
সালমা বেগম এবারো অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে তাকালেন ইকরার দিকে। আঁতকে উঠে শাড়ির আঁচল বুকে চেপে ধরে এগিয়ে আসলেন। ইকরার সামনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

—’ কী রে মা? এসব কী বলছে তোর বাপ্পি? এগুলো কি সত্যি? তোর সম্পত্তি লাগবে?”
ইকরা চুপ রইলো। অন্যদিকে মুখ করে তাকিয়েই রইলো। একটুও নড়লো না। সালমা বেগম অসহায় মুখ করে দুজনের দিকে তাকালেন। চোখের কোণে পানি এসে ভিড় করেছে।যেকোনো সময় গড়িয়ে পড়ব। সালমা বেগম কখনো ভাবতেও পারেন নি যে ইকরা কোনদিন এমন আবদার করবে। এমন অধিকার চাইতে দেশে ফিরে আসবে। ছোট থেকে নিজের মেয়ের মতো আদর যত্ন করে বড় করার এই প্রতিদান দিল? কি আজব দুনিয়া! কি আজব যুগ! তিনি কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আঁচল দিয়ে মুখ নাক মুছে বললেন,
—” তোর কি টাকা লাগবে ইকরা? লাগলে বল সমস্যা নেই। কত টাকা লাগবে, আমরা দেব। তুই তো আমাদের মেয়ের মতোই। সন্তানকে টাকা দিতে আবার সমস্যা কোথায়। তুই বল মা, তোর কি টাকাপয়সা লাগবে?”
ইকরা এবারেও চুপ রইলো। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে এক নিমিষে বলল,

—” টাকা পয়সা লাগবেনা আন্টি। বাপ্পিকে বলো, যেন বাবার ভাগের সম্পত্তি টা আমায় দিয়ে দেয়, আমি চলে যাব। আর কোনোদিন কোনো কিছুর আবেদন নিয়ে আসব না!”
দু পা পিছিয়ে গেলেন সালমা বেগম। হতবাক হয়ে নিজের স্বামীর দিকে তাকালেন। সামিউল শেখ ইতোমধ্যে সোফায় বসে পড়েছেন। তিনি ভীষণ ক্লান্ত। সালমা বেগম আরো ভয় পেলেন। তিনি তড়িঘড়ি করে ইকরার কাঁধ ধরে তাকে আদর করে দিলেন, তার গালে হাত রেখে মিষ্টি সুরে বললেন,
—” এমন করিস না মা। কী হয়েছে বল আমাদেরকে। তোকে কেউ কিছু বলেছে? কোন সমস্যা হয়েছে? টাকা পয়সা লাগলে বল আমাদের! তবুও সম্পত্তি চেয়ে নিকৃষ্ট মন মানসিকতার পরিচয় দিস না। তোর বাপ্পিটা সইতে পারবেন না। এত বড় অকৃতজ্ঞতা সইতে পারবে না রে। এমন করিস না মা। পড়াশোনা করেছিস,শিক্ষিত মানুষ হয়ে উঠেছিস। বিবেক দিয়ে চিন্তা ভাবনা কর। আমাদের এভাবে কষ্ট দিস না!”
ইকরা নিজেও এবারে চোখের পানি আটকাতে পারল না। সরু রেখায় চোখের কোণে আসা সদ্য পানি টুকু আঙুলে মুছে নিয়ে কোনমতে বলে উঠলো,

—” আমি এই জীবনে তোমাদের কাছে অনেক আবদার করেছি। ছোট থেকে সবকিছুই দিয়েছিলে আমায়। বিদেশে যাওয়ার আগে যখন জিজ্ঞেস করেছিলে, আমার কী লাগবে? তখন কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমার যেটা লাগবে সেটা আমি সময়মত ঠিক চেয়ে নেব আর তোমার.. তোমরাও কথা দিয়েছিলে যে সেটা তোমরা আমায় দেবে। অথচ তোমরা নিজেই বেইমানি করেছো আন্টি। তাই..!”
থেমে গেলো ইকরা। গলা ভেঙে আসছে কান্নায়। কোনোমতে চোখ মুছলো। সালমা বেগম অবুঝের ন্যায় তাকালেন সামিউল শেখের দিকে। কিন্তু ভদ্রলোক নিজেই কপালে আঙুল চেপে হতাশ হয়ে বসে আছেন। সালমা বেগম আবারো জিজ্ঞেস করলেন,

—” আমরা কখন বেইমানি করলাম রে ইকরা। সম্পত্তির কথা…
সালমা বেগমকে থামিয়ে দিয়ে ইকরা এবার জোর গলায় বলে উঠলো,
—” কোনো সম্পত্তি চাইনা আমি আন্টি। আমি কোনো কিছু চাইনা। আমি টাকা পয়সা সম্পত্তি.. এসবের কোনো লোভ নেই আমার। আমার শুধু একটা জিনিসের লোভ ছিল। একটা জিনিসেরই তীব্র লোভ ছিল আমার। এই বাড়িটার, এই পরিবারটার, এই পরিবেশ, এই ঘর, তুমি, বাপ্পি আর… আর শ্রাবণ। তোমাদের প্রতিই আমার লোভ ছিল আন্টি।”
সালমা বেগম সন্দিহান দৃষ্টিতে চাইলেন। ইকরা এবারে নিজে থেকেই কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
—” আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, যখন থেকে বড় হয়েছি, তখন থেকেই চেয়েছি সারাটা জীবন এই বাড়িতে থাকতে। তোমাদের ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে হবে, ভাবলেই আমার বুকটা ধপ করে উঠত। আমি কখনো চাইনি তোমাদের রেখে চলে যেতে। তোমাদের প্রতি মায়া এসেছিল আন্টি। সবচেয়ে বেশি কার মায়ায় পড়েছি জানো? শ্রাবণের। শ্রাবণের মায়ায় পড়েছি।”

এ পর্যায়ে ইকরার কাঁধে রাখা নিজের হাতটা ছিটকে সরিয়ে নিলেন সালমা বেগম। চোখ বড় বড় করে অনুভূতিশূন্য হয়ে তাকালেন ইকরার দিকে। সামিউল শেখ মেঝের দিকে চোখ রেখে বিড়বিড় করে বললেন,
—” এক ছেলে জন্ম দিয়েছি আমি। ভুল করে নায়কের মত হয়েছে। না জানি আরো কত মেয়ে মনে মনে পছন্দ করে বসে আছে! ”
সালমা বেগমের হাত সরিয়ে নেয়া দেখে নিজের কাঁধের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো ইকরা। চোখে পানি নিয়েই তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
—” বিশ্বাস করো আন্টি, এই কথা শুনে বাপ্পিও ঠিক একই ভাবে আমার কাঁধ থেকে ভরসার হাতটা উঠিয়ে নিয়েছি। কিন্তু তোমরা বুঝলে না.. আমার অনুভূতি বুঝলে না। সারাটা জীবন এতো কিছু দিয়ে এসেছো, শেষ সময়ে নির্লজ্জের মত এমন একটা জিনিস চাইলাম যে তা না পেলে সবকিছু বৃথা! ”
সালমা বেগম এখনো কিছু বলতে পারলেন না। হতবাক হয়ে তাকালেন স্বামীর দিকে। এই সময়ে এসে তিনি বিভ্রান্তিতে পড়লেন।মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল এক মুহুর্তের জন্য। এসব কী হচ্ছে?

সত্যিকারের ভালোবাসা আর ক্ষনিকের মোহ— দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। কেউ যদি কাউকে সত্যিকারের ভালোবেসে থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসাকে ধরা হয় সবকিছুর থেকে আলাদা। ভালবাসলেই যে কাছে পেতে হবে এমন তো কোথাও লেখা নেই। আমরা তো চাইলে নব্বই দশকের মতো হাজার মাইল দূরে থেকেও ভালবাসতে পারি। যদিও আজকালকার যুগে এসব দেখাই যায় না। কাউকে কাছে না পেলে কেউ যেন ভালোবাসার মর্ম টা ধরতেই পারে না। কিন্তু আজও যারা মন থেকে ভালবাসে, তারা প্রিয় মানুষটার সুখে থাকা, ভালো থাকা এবং খুশি থাকাটার দিকে তাকিয়েই দূর থেকে ভালোবেসে যায়।

কথায় বলে, পৃথিবীতে মাত্র ত্রিশ পার্সেন্ট মানুষ নিজেদের ভালোবাসার মানুষের সাথে সংসার করার সুযোগ পায়। বাকিরা তাহলে কী করে? তারা কি নিজেদেরকে খুইয়ে দেয়? ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে তারা যখন ভেঙে পড়ে, তারা কি মনে মনে চায় যে অপর মানুষটিও ভেঙে পড়ুক! হয়তো কেউ চায়, হয়তো কেউ চায় না। অন্তত যারা সত্যি সত্যি কাউকে ভালোবাসে, তারা প্রিয় মানুষটার ভালো থাকা এবং সুখটুকু দেখে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে।

বলা বাহুল্য, ছোট থেকে এক অন্যরকম মোহে আকর্ষিত হয়ে নিজেকে খুইয়ে ফেলা ইকরা সত্যি সত্যি শ্রাবণকে ভালোবেসেছিল। সে বিশ্বাস করে কেউ কাউকে ভালবাসলে সে ভালোবাসার মর্যাদাটা দূর থেকেও দেওয়া যেতে পারে। তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজেকে নিষ্ঠুর প্রমাণিত করে সবার কাছে খারাপ হয়ে সম্পত্তি চেয়ে এ বাড়ি থেকে চিরজীবনের জন্য চলে যাবে, আর কখনো শ্রাবণের সামনে আসবে না। তবে মুখোশের আড়ালে থাকা আসল ব্যক্তিত্বটা তো সে লুকোতে পারল না। অঝোরে কেঁদে দিল। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কান্না করলো। তার চোখের পানি এবার লক্ষ্য করলেন সালমা বেগম। তিনি বুঝলেন মেয়েটা মোটেই ঠিক নেই। তবে এখানেও তার কিছু করার নেই। কারণ জন্ম মৃত্যু বিয়ে, সবই আল্লাহর হাতে।
সামিউল শেখ আগে থেকে বুঝতে পেরেছিলেন,, অনেক আগে থেকে জানতেন তিনি এই বিষয়ে। ঠিক তাই তিনি ইচ্ছে করেই শ্রাবণের বিয়ের কথাটা ইকরাকে জানান নি। তিনি এটাও ভাবেননি যে ইকরা এত তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে আসবে। শেষে সামিউল শেখ একটুখানি নরম হলেন, ইকরার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,

—” মনের চাওয়া-পাওয়া সবসময় পূর্ণ হয়না ইকরা। ভাগ্যের খেলা রয়েছে। আমি চাইলেই এমন কিছু করতে পারতাম যা তুই চাস। কিন্তু এটা ঠিক হতো না। কেনো ঠিক হতো না, এটা তুইও জানিস মা!”
সালমা বেগম মাথা নাড়ালেন। সামিউল শেখ আবারো বললেন,
—” তুই চাইলে আমি তোকে সত্যি সত্যি তোর বাবার ভাগের সব সম্পত্তি দিয়ে দিতে পারি। তবে আমার উপর কোনঁ অভিযোগ রাখিস না মা। নিজের মেয়ের মতো করে রেখেছিলাম তোকে। কখনো ভাবি নি যে তুই আমার ভাতিজি। শুধু বাবা-মা ডাকতে পারিস নি আমাদের। কিন্তু সত্যি করে বল তো মা, আমরা কি তোর বাবা মা নই?”
ইকরা এবারে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো। জাপটে জড়িয়ে ধরলো সামিউল শেখ কে। এতদিন পর বাবার বুকে আশ্রয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—” আমার কিচ্ছু লাগবেনা বাপ্পি। তোমরা ভালো থেকো। আমি এবার বুঝতে পেরেছি তুমি কেনো আমাকে বাড়িতে আসতে দিতে চাইছিলে না। তুমি ভেবেছিলে, আমি শ্রাবণের বউকে অবহেলা করব। শ্রাবণের সুখে বাগড়া দিতে এসেছি আমি? মোটেই না! আমি চাই তোমরা সবাই ভালো থাকো। আমি চাই শ্রাবণ ভালো থাকুক!”
এটা বলেই ইকরা সামিউল শেখের বুক থেকে সরে আসলো। একবার সালমার বেগমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো, এরপর আবারো সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে জোর গলায় বলে উঠলো,
—” তুমি চিন্তা কোরো না বাপ্পি। আমি কখনো তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে কোনো সম্পর্কে ঢুকবো না। আমার জন্য তোমাদের সুখে আগুন লাগবেনা, এটুকু ভরসা রাখতে পারো তো!”

বাঙালিদের একটা অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে। বিয়ের সময়ে, বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান আসলেই সবাই অস্থির হয়ে পড়ে। মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বিশেষ করে মেয়ের বাড়ির লোকদের থাকে বিরাট ঝামেলা। যেমন এখন মমিনুর সাহেব ভীষণ চিন্তিত হয়ে বসার ঘরে সোকায় বসে বসে চা খাচ্ছেন, চোখ স্থির হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। মেয়ের বিয়ে দেবেন তিনি। অনুষ্ঠান করবেন। একমাত্র মেয়ে বলে কথা। সবকিছু নিয়ে ভীষণ চিন্তিত তিনি। সবচেয়ে বেশি চিন্তিত জিহান কে নিয়ে। সকাল থেকে তিনি বারবার চেষ্টা করছেন, শপিং করার জন্য তার হবু জামাইকে কল করে ডেকে নিতেম কিন্তু কেনো যেন অস্বস্তিবোধ হচ্ছে! এটা অবশ্য অযৌক্তিক। তিনি তো শ্বশুর! তিনি কেন ভয় পাবেন? জামাই হিসেবে জিহানের ভয় পাওয়ার কথা। তাই তিনি শেষে এক বুক সাহস নিয়ে ফোন উঠিয়ে কল করলেন জিহানকে।

মাত্রই জিহান নিজের হবু বউ, ছন্টুমন্টু মুনিরার সাথে আলাপ করে বিছানায় ল্যটকায় পড়েছিল। শ্বশুরের কল পেয়ে রীতিমতো লাফ দিয়ে বিছানায় বসে পড়লো সে। পিটপিট করে কিছুক্ষণ হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো ফোনের দিকে। হিটলার হবু শ্বশুর নিজে থেকে কল করেছে? আয়হায়! নাম দেখেই শরীরের সব হাস্যরস যেন শুকিয়ে গেলো। —”ইন্নালিল্লাহ!” বলে নিজেই মুখে হাত চাপা দিলো জিহান। প্রথমে ভয় পেলো। কিন্তু পরে টুপ করে কলটা ধরে কানের কাছে নিয়ে ধরল জিহান। লম্বা করে সালাম দিল ভদ্রতার সহিত,
—”আসসালামু আলাইকুম, হিট..থুক্কু সম্মানীয় শ্বশুর মশাই!”
ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসলো,
—”ওয়ালাইকুম সালাম। ব্যস্ত নাকি?”
মনে মনে বাঁকা হাসলো জিহান। ব্যস্ত! সেটা আবার কী জিনিস? এ জন্মে কখনো ব্যস্ত থাকেইনি সে। শুধু মুনিরার সাথে প্রেম করার সময় টা আলাদা। তাই জিহান তৎক্ষণাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—” না না, আমি একদমই ব্যস্ত না। কী যে বলেন না! আমি তো আসলে আপনার ফোনের অপেক্ষাতেই বসে ছিলাম। এইমাত্র ভাবছিলাম, আমার প্রিয়তম শ্বশুর যদি একটা ফোন করতেন! কতই না ভালো হতো!”
মমিনুর সাহেব ওদিক থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নাক মুখ কুঁচকে বললেন,

—” তুমি কি কম কথা বলতে পারো না?”
জিহান সহজ সরল হেসে বলল,
—” জ্বি না।”
অবাক হলেন ভদ্রলোক,
—” সবসময়ই এত কথা বলো?”
লাজুক ভঙ্গি জিহানের,
—” জ্বি হ্যাঁ! ”
এবারে বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছালেন মমিনুর সাহেব,
—” আমার মেয়ে সামান্য গাড়ির হর্ন সহ্য করতে পারে না, সে তোমার এত বকবকানি কীভাবে সহ্য করে?”
জিহান বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—” প্রেমে পড়লে তেঁতুলও রসগোল্লা মনে হয়।”
বিড়বিড় করে বলেছিল জিহান। কিন্তু শুনে ফেলেছেন মমিনুর সাহেব। তিনি বিষম খেয়ে চুপ করে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর গলা পরিষ্কার করে বললেন,
—” আজকে তোমাকে একটু আমার সঙ্গে যেতে হবে। কিছু কেনাকাটা করতে হতো!”
জিহান হাসি চেপে রেখে গম্ভীরভাবে বলল,

—” না মানে শিউর আঙ্কেল। কিন্তু, আমাকে? মানে, আপনি নিজের ইজ্জতের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন আঙ্কেল!”
—”মানে?”
জিহান ঘাড় চুলকালো,
—” না মানে, এইমাত্র বললেন যে বেশি কথা বলি। আমি তো ছোট থেকেই আমার মুখ বন্ধ রাখতে পারি না। না জানি কখন কি উল্টোপাল্টা কথা বলে ফেলি, আপনার মান সম্মানের ব্যাপার আছে তো!”
মমিনুর সাহেব দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
—” তোমার মুখে আঠা লাগিয়ে দেব আমি। অশভ্য ছেলে! তাড়াতাড়ি চলে এসো বিকেলে। বসুন্ধরাতে থেকো!”
জিহান তাড়াহুড়ো করে বলল,

—” জ্বি আঙ্কেল অবশ্যই। মুনিরাকেও আনবেন প্লিজ। না মানে একটু চয়েজ করে দিত যা যা দরকার! জানেনই তো, ওর পছন্দ অনেক ভালো আঙ্কেল! ”
এবারে মমিনুর সাহেব হেসে বললেন,
—” হ্যাঁ, আমার মেয়ের চয়েজ খুব ভালো।”
জিহান সুযোগ লুফে নিলো, ফট করে বলল,
—” এজন্যই তো আমাকে পছন্দ করেছে। কি সুন্দর ব্যপার, তাই না আঙ্কেল! ”
ওপাশে মুহূর্তের নীরবতা। তারপর একখানি ভারী নিশ্বাস। মমিনুর সাহেব হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন,
—” তুমি কি সবসময়ই এমন ফাজলামো করো। একটু সিরিয়াস হও না কেনো?”
জিহান কণ্ঠে নরম দুষ্টুমি মেশালো। বলল,

—”আঙ্কেল, কথার মধ্যে একটু কমেডি না রাখলে জীবন টক হয়ে যায়, একদম লেবুর চেয়েও টক!”
মমিনুর সাহেব একদমই গম্ভীর, তবু হালকা মুচকি হাসি যেন ফোনের অপর প্রান্তেও লুকিয়ে গেল। তিনি আরো কিছুক্ষণ কথা বলে কল কাটলেন। বুঝলেন ছেলেটা একটু বেশিই সহজ সরল। খুব সাদা মনের মানুষ। একজন বাবা হিসেবে তিনি এটাই সব সময় চেয়েছিলেন যেন তার মেয়ে একজন সঠিক মানুষের হাত পায়। জীবনসঙ্গী হিসেবে যেন একজন যোগ্য মানুষকে পায়, নইলে পুরো জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

ধারা ইকরা কে যতটা খারাপ ভেবেছিল, ততটা খারাপ নয়। আবার ততটা ভালোও নয়। দুটো বিষয়ে গড়াগড়ি খাওয়ার দুটো কারনও রয়েছে। প্রথমত ধারার সাথে ভালো ব্যবহার করার জন্য আর কুটনী গিরি না দেখানোর জন্য। আবার অন্যদিকে সালমা বেগমের সাথে অতিরিক্ত আহ্লাদ দেখানো টাও সহ্য হচ্ছে না ধারার। ইকরার সাথে এত ভালো সম্পর্ক টা কেন যেন ঈর্ষান্বিত করছে ধারাকে। সে ভাবলো এ বিষয়ে এমন মনমানসিকতা আনা টা ছোট মনের পরিচয় দেবে। তবে সেও তো একটা মেয়ে। তারও তো মন আছে। তাই বাচ্চামো করেই ঠোঁট কাঁমড়ে উঁকি দিল সালমা বেগমের ঘরে। সালমা বেগম ঘরে ছিলেন না। তাই ঠোঁট কাঁমড়ে ধারা নিজের ঘরে ফিরে গেলো।

এসে দেখলো শ্রাবণ ল্যাপটপে কি যেন করছে। সে এবারে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়ালো। উঁকি মেরে শ্রাবণের ল্যাপটপ টা দেখার চেষ্টা করল। শ্রাবণ খেয়াল করলো তা। আড়ালে মুচকি হাসল। আসলে হয়েছে কি, তখন থেকেই তার বউ তার সাথে কথা বলছে না। ধারা সেই সময় সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছে যে সে শ্রাবনের সাথে গোটা দুইদিন কথাই বলবে না। কিন্তু কেনো? এর কোনো কারণ দিতে পারেনি বেচারি। কিন্তু কথা বলবে না এটা নিশ্চিত করে জানিয়ে দিয়েছে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৮

জীবনে প্রথমবার বউয়ের এমন উড়নচণ্ডী রূপ দেখে শ্রাবণ তেমন কিছুই বলেনি। মুচকি হেসে মেনে নিয়েছে। জীবনে সবকিছুরই অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। সহজ সরল বউটার মিষ্টি রূপটা দেখেছে সে। এবার একটু উড়নচণ্ডী রূপটাও দেখুক। সবদিকই তো ভালো লাগে। এই রূপটাও মন্দ নয়।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪০