Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪০
অনামিকা তাহসিন রোজা

মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে শ্রাবণ। নির্বিঘ্ন মনোভাব তার। কোনোরকম অস্থিরতা নেই। অথচ এই নির্বিকার থাকা মানুষটাকে দেখে ধারা ভ্রু কুঁচকে রইলো। মুখ কুঁচকে চেয়েই রইলো শ্রাবণের দিকে। আজব! এই লোক কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না কেনো? এই যে ধারা মন খারাপ করে রয়েছে, রাগ করে কথা বলছে না। এসব কি এই লোকটা চোখে দেখে না? মনে মনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলো ধারা। সিদ্ধান্ত নিলো সত্যি সত্যিই কথা বলবে না। তাই বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে কাজে ব্যস্ত শ্রাবণকে মুখ ভেঙচালো। এরপর ঝট করে গটগট করে হেঁটে বাথরুমে চলে গেলো। যাওয়ার সময় ফেইসওয়াশও নিয়ে গেলো। এইতো কিছুদিন হলো ফেইসওয়াশ টা কিনেছে সে। কারন সালমা বেগম বলেছেন নিজের যত্ন নিতে, মুখ পরিষ্কার রাখতে। তাহলে ত্বকও সুন্দর থাকে।৷ ধারা ভীষন বাধ্য। তাই সে তিন বেলা করেই মুখ ধোয়। বাথরুমে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লাগলো ধারা। ঠাস করে হওয়া শব্দটা শুনেও শ্রাবণ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরালো না। তবে স্ক্রিনে চোখ রেখে লুকিয়ে মিটমিট করে হাসলো। বউ টা তাহলে রাগ করতেও পারে? নতুন রূপে ধারা কে তো চেনাই যাচ্ছে না।

কিন্তু একটু পরেই বাথরুমে থেকে ধপাশ করে একটা শব্দ এলো, সাথে ভেসে এলো ধারার গগনবিদারক চিৎকার— আআআ! শ্রাবণ চকিত নজরে তাকালো বাথরুমের দরজার দিকে। মস্তিষ্কে অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটা হানা দিতেই ল্যাপটপ ফেলে দৌঁড়ে গেলো বাথরুমের কাছে। লাগাতার দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে বলল,
—” ধারা! কী হয়েছে? পড়ে গিয়েছো.? এই মেয়ে, দরজা খুলো!”
ধারা আসলেই পিছলে পড়ে গেছে। মেঝেতে পানি জমে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল, সেখানে পা রাখতেই উল্টে পড়ে বেচারি। সাথে সাথে পড়ে গিয়ে বসে পড়ে। কোঁমড়ে ভালোই ব্যাথা পেয়েছে ধারা। একের পর এক কুফা লাগায় কাঁদতে মন চাইলো তার৷ এর মধ্যে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকা শ্রাবণের কন্ঠ শুনে আবেগও সামলাতে পারলো না। ঠোঁট উল্টিয়ে শব্দ করে কেঁদেই ফেলল। নাক টানতে টানতে অভিযোগ জানিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” খুলব না আমি দরজা। কথা বলবনা আপনার সাথে। চলে যান।”
শ্রাবণ এমনিতেই অস্থির হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে সে বুঝতে পেরেছে যে, তার একমাত্র মুরগির বাচ্চার মত বউটা বাথরুমে আঁছার খেয়ে পড়ে গিয়েছে এবং বেশ ভালোই ব্যথা পেয়েছে। তাই সে কোনোরূপ ঝামেলা বাঁধাতে চাইল না। দরজার আরো দুবার ধাক্কা দিয়ে মিষ্টি স্বরে বলল,
—” বউ আমার। লক্ষ্মী সোনা বউ! দরজা টা খোলো। কথা বলতে হবেনা আমার সাথে। শুধু ভেতরে যেতে দাও। তুমি পড়ে গেলে কীভাবে বলোতো! দেখি, দরজা খোলো!”
নারীরা যত্নে দুর্বল। আবেগের কাঙাল! কেও একজন নারীকে শক্তভাবে আঘাত করলে অনেক সময় ভেতরকার আত্মসম্মানবোধ আর প্রাকৃতিক ক্রোধে সে হয়ে ওঠে পুরুষের মতই যোদ্ধা। কিন্তু প্রিয় আপন মানুষটার ক্ষেত্রে, তারা হয় ভীষন দুর্বল। বিশেষ করে কেও যদি যত্ন, আদর দেয়, তাতে তারা আরো বেশি গলে গিয়ে হয়ে যায় ভেজা নরম মাটির মত।

ধারার ক্ষেত্রেও তাই হলো। শ্রাবণের আদুরে ভঙ্গিতে কথা শুনে একদম গলে গেলো। কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারলো না। বোঝা গেলো পা টা মচকে গেছে। ধারার সহ্যক্ষমতা ভীষন শক্তিশালী। কিন্তু এ বাড়িতে আসার পর থেকে আর এই পুরুষটির সান্নিধ্য পাওয়ার পর থেকেই কেনো যে ফচফচ করে একটুতেই ভেঙে যায় সে, নিজেও বোঝেনা। এমন ব্যাথা তার কাছে ডাল-ভাত। তবুও এখন কেনো যেন কান্না পেলো। চোখ জ্বালা করলো। এটা কে কী বলা যায়? এমন ভাবে অনেকবারই পা মচকেছে ধারার। তবে এতটা যন্ত্রনা হয়নি। সে উঠে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলো বলে মেঝেতে বসেই একটু একটু করে এগিয়ে কোনোমতে বাথরুমের দরজা টা খুলে দিলো।
দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে ধারার নিকটে বসে পড়লো শ্রাবণ। ধারার গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় বিড়ালের ছানার মত আদুরে ভঙ্গিতে বুলিয়ে ধরল। চুলে হাত বুলিয়ে সারা শরীরে চোখ বুলালো। অস্থির ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল ধারাকে,

—” সোনা, কোথায় ব্যাথা পেয়েছো দেখি তো!”
আবারো একই ফর্মুলা খেটে গেলো। এত আদর করে কি কেও জিজ্ঞেস করে নাকি? আবেগী হয়ে আরো জোরে কেঁদে ফেলল ধারা। পায়ের দিকে আঙুল তাক করে দেখিয়ে বলল,
—” ডান পা নাড়াতে পারছি না। ”
শ্রাবণের চোখে একরাশ মায়ার ঝলকানি। সে ধারার দিকে কাতর নয়নে তাকিয়ে তার পায়ের দিকে তাকালো। ডান হাতটা এগিয়ে দিয়ে একটু করে ছুঁয়ে দিল জায়গাটা। সাথে সাথে ব্যাথা পেলো ধারা। আর্তনাদ করে উঠলো। শ্রাবণ চমকে পা থেকে হাত সরিয়ে নিল। ধারার মুখের দিকে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে চুমু খেলো মেয়েটার কপালে। ফট করে নির্দ্বিধায় কোলে তুলে নিলো তুলোর মত নরম শরীরটা। এরপর রুমে গিয়ে ডিভানে বসিয়ে দিলো।
গিরগিটিও বোধহয় এত তাড়াতাড়ি রূপ বদলায় না, যত তাড়াতাড়ি শ্রাবণ শেখ নিজের রূপ বদলেছে। ধারাকে ডিভানে বসিয়ে দিয়েই রামধমক দিলো বেচারিকে,

—” কতবার বলেছি দেখেশুনে চলাফেরা করো! বাথরুমে পিছলে গেলে কীভাবে হ্যাঁ? সাবধানে চলতে পারো না? বেয়াদব! হুটহাট আঁছাড় খাও কেনো তুমি? একটা কথা শোনো না আমার।”
ইচ্ছেমত বকাবকি করতে করতেই ধারার পরনের শাড়িটাও ঠিক করে দিয়ে টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছিয়ে দিলো শ্রাবণ। ধারা ঠোঁট চেপে গাল ফুলিয়ে তাকিয়েই রইলো। ইচ্ছে করছে কাঁদতে। কিন্তু তা না করে চোখের পানি মুছলো। দুটো চোখই ঘষে ঘষে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল। নিজেও রাগ দেখিয়ে বলার চেষ্টা করলো,
—” আপনারই তো দোষ! আপনি যদি আমাকে ভাব না দেখাতেন, তাহলে আমিও দ্রুত হাঁটতে যেতাম না। আপনারই দোষ। আমি সবসময় দেখে শুনেই হাঁটি!”

আধো আধো স্বরে হিঁচকি তুলে কথাগুলো বলল ধারা। তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। বোঝা গেলো কাঁদতে চাইছে, কিন্তু বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত রাখার প্রবল চেষ্টা করছে। অথচ ভেতরে ভেতরে ধমক খেয়ে তীব্র ভয় পেয়েছে মেয়েটা।
ধারাকে এভাবে হিঁচকি তুলতে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না শ্রাবণ। ধারা আবারো চোখের পানি মুছলো। শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফট করে জড়িয়ে ধরলো ধারাকে। একদম শক্ত করে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। নাক ডুবিয়ে দিলো ধারার চুলে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নেশালো ঘ্রানটা টেনে নিল নির্বিঘ্নে। দুহাতে পরম আবেশে ধরে থাকলো প্রিয়তমাকে।

ধারা প্রথমে চমকে গেল। কিন্তু পরে নিজেও কান্না আটকাতে পারলো না। শ্রাবণ কে জড়িয়ে ধরলো সেও। আঁকড়ে ধরলো টি শার্ট। শ্রাবণ সেভাবেই থেকেই ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—” সরি। আর বকব না। তুমি একটু দেখেশুনে চলাফেরা করবেনা হুম? এভাবে ওয়াশরুমে পিছলে পড়ে যাওয়া কতটা ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে, জানো তুমি? পা টা যদি ভেঙে যেতো? কী হতো হুম? তুমি ব্যাথা পেলে, হাত পা ভেঙে বসে থাকলে,আমার খুব ভালো লাগবে নাকি?”
ধারা ওভাবেই শ্রাবণের বুকের কাছে লেপ্টে থেকে দুদিকে মাথা নেড়ে অস্ফুটস্বরে বলল,

—” উহু!”
শ্রাবণের কন্ঠ আরো নরম হয়ে এলো,
—” বকেছি বলে রাগ করেছো?”
—” উহু!”
—” তাহলে আর কেঁদো না!”
বলেই সরে এলো শ্রাবণ। ধারার চোখের পানি মুছিয়ে দিলো দুহাত দিয়ে। কপালে গুনে গুনে তিনটে চুমু খেয়ে বলল,
—” কী হয়েছে, না বললে বুঝব কীভাবে? এত জেদ করছো কেনো? ঠাসঠুস করে দরজা আটকালে, মুখ ভেঙচালে, ভ্রু কুঁচকে থাকলে কি আমি বুঝব? বলো, কী হয়েছে?
ধারা মাথা নাড়ালো সজোরে। বলল,
—” কিছু হয়নি। আপনি আমার সাথে কথা বলছিলেন না বলে রাগ করেছিলাম!”
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ,
—” কিন্তু, তুমিই তো কথা বলা বন্ধ করলে! তুমি তো আগে রাগ দেখালে!”
ধারা হতবাক হয়ে বলে উঠলো,

—” আমি না হয় করলাম। তাই বলে আপনিও এমন করবেন? আপনিও কথা বলবেন না?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ধারার দিকে। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো, তার বউ দিনকে দিন বড় না হয়ে ছোট বাচ্চাতে পরিণত হচ্ছে। অবশ্য এর পেছনে যৌক্তিক কারনও রয়েছে। বাস্তবতা লক্ষ্য করলে, আশেপাশের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করলে খুব সহজেই ধরা ফেলা যায় কারনটা। সবার মতে, প্রেমে পড়লে পুরুষেরা হয়ে যায় ভীষন স্মার্ট, ম্যাচিইউর্ড, স্ট্রং পার্সোনালিটির। আর অন্যদিকে একইভাবে প্রেমে পড়লে নারীরা হয়ে যায় নিতান্তই শিশু। একটুতেই কান্না করা, ভীষন রকম আবেগী হয়ে পড়া টা এখন একজন প্রেমিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক এক বিষয়। বেচারি ধারার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাই এসবে আর খাটতে গেলো না শ্রাবণ। কিছুক্ষণ ধারার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো। আর যাই হোক না কেনো, সে নিজের বউয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করবে না। এতে যদি কথা বলার চোটে, অতিরিক্ত কথা শুনে ধারা বিরক্ত হয়ে মূর্ছা যায় তাতেও পাত্তা দেবে না শ্রাবণ শেখ।

সকাল থেকে খুঁজে খুঁজে অবশেষে চায়না গোলাপ ফুলের গাছ পেয়েছে সাদিক। লাল টুকটুকে বড়সড় ফুলের সদ্য চারা হাতে নিয়ে মাটির রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে সে। অবশেষে দিনের প্রথম হাসিটা মুখে আনলো সাদিক। ছোট্ট সদ্য ফুটন্ত গোলাপের লাল পাপড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়লো কনিকার কথা। মেয়েটা নিশ্চয়ই খুশিতে পাগল হয়ে যাবে এই ফুল দেখে? সে কি খুশিতে সাদিকের দিকে তাকিয়ে হাসবে না? সে কি আনন্দে আত্মহারা হয়ে সাদিককে ধন্যবাদ জানাবে না?
সাদিকের একটা বাটন ফোন আছে। শহর থেকে আসার সময় সে অনেক ভিডিও সেই বাটন ফোনে ডাউনলোড করে নিয়ে এসেছিল। গতরাতে সেই ফোন থেকে একটা ভিডিও দেখছিল কনিকা। হুট করেই তার চোখ আটকে যায় একটা ক্লিপে। সে দৌঁড়ে টিউবওয়েল চেপে মুখ ধুতে থাকা সাদিকের দিকে ফোনটা দিয়ে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

—” এইডা কি ফুল?”
সাদিক গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছে তাকালো ভালো করে। এরপর মুখভরে হেসে বলল,
—” ওমাহ! তুমি চিনতে পারতাছো না? এইডা তো চায়না গোলাপ। হাইব্রিড! কয়েক বছর আগে আমার ফুফুর বাড়িত আছিল, পরে কাইট্টা ফেলছে!”
কনিকা আর কোনো কথা শুনেনি। সে চকচক করা চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইলো সেই ছোট্ট স্ক্রিনে। এরপর ভীষন আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
—” আমি কখনো দেখি নাই। অনেক সুন্দর এইডা। কি চমৎকার! এত বড়, টকটকা লাল! রক্তের মত লাগতাছে। এই ফুল কি এইখানে পাওয়া যাইবো না? শহরেই আছে শুধু?”

সাদিক চোখে একরাশ কাতরতা নিয়ে কণিকার কৌতূহল, আবেগ মন ভরে দেখলো। মেয়েটা তার সাথে আগের থেকে একদম মিশে গেছে। এখন আর কোনো জড়তা নেই মেয়েটার মাঝে, যা দেখে অত্যন্ত ভালো লাগে সাদিকের। কিন্তু তার মনে পড়লো যে এই ফুল শুধু এই গ্রামে কেনো, পাশের কোনো গ্রামেও হয়তো পাওয়া যাবে না। একটা সময় ছিল যখন গ্রামের প্রতিটা বাড়িতেই বড় বড় হাইব্রিড চায়না গোলাপ গাছ থাকতো। বড় বড় এ গোলাপ গুলো প্রতিটি বাড়িরই সৌন্দর্য বহন করত। কিন্তু আজকাল এসব গাছ কেউ লাগায় না, আর লাগালেও যত্ন করতে পারে না, ফলে এখন এসব গাছ গ্রামে দুর্লভ বললেই চলে। যদিও মাঝে মাঝে দেশি গোলাপের গাছ দেখতে পাওয়া যায়।
তবে এই ফুল যে সাদিক কনিকা কে এনে দিতে পারবেনা, বিষয়টা ভেবেই মন খারাপ হলো তার। কিন্তু তার মধ্যেও একটা জেদ কাজ করেছিল। সাহস করে কনিকা কে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল,

—” আমি কালকেই তোমার জন্য এই ফুল আনবার যাব। তুমি চিন্তা কইরো না।”
শুধু কথা টা শুনেই কনিকা কত সুন্দর করে যে হেসেছে, সেই হাসি এখনো চোখে ভাসছে সাদিকের।
কনিকা কে দেয়া কথা রাখতেই ভোরে ঘর থেকে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু ভাবনা অনুযায়ী আশেপাশের কোনো গ্রামেই এই ফুল পায়নি। শেষে পাশের গ্রামের বড় বাজারে সে একটা বড়সড় নার্সারি খুঁজে পেলো। আর সেখানেই দেখলো এক তলা বাড়ির সমান বড় এক চায়না গোলাপের গাছ। মুখে হাসি আসলো তার। পুরো গাছটাই কিনে নিতে চাইলো কনিকার জন্য। মেয়েটা নিশ্চয়ই ফুলের বদলে আস্ত গাছটা দেখে পাগল হয়ে যাবে।

কিন্তু সাদিকের আশা ভেঙে গেলো গাছের দাম শুনে। এত টাকা তার কাছে ছিল না তখন। কিন্তু কনিকার জন্য হলেও সে যে করেই হোক এই ফুলের গাছ নিয়ে যাবে বলে প্রতিজ্ঞা করলো। শেষে কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছালো সে। সেই নার্সারির পাশেই একটা হোটেল দেখতে পেলো। বড়সড় হোটেল বলা চলে। কোনো কিছু চিন্তাভাবনা না করেই সেই খাবারের হোটেলে কাজ করলো সাদিক। সারাটা দিন থালাবাসন মেজে, টেবিল পরিষ্কার করে, মানুষদের খাবার সার্ভ করে টাকা পেলো যথেষ্ট। তড়িঘড়ি করে সেই ফুল গাছেরই একটা মাঝারি চারা কিনে নিলো। বাকি টাকা দিয়ে কনিকার জন্য সেই হোটেল থেকে সিঙারা আর নিমকি নিয়ে নিলো।

মাঝে মাঝে মানুষ নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। কখন কীভাবে সুখ চলে আসে, তা নিজেও জানে না। এই যে সাদিক সারাদিন খেটে টাকা উপার্জন করল। গায়ের ঘাম ফেলে এই কয়টা টাকার জন্য খাবারের হোটেলে কাজ পর্যন্ত করল। এতে তার কষ্ট হয়েছে ভীষণ। পরিশ্রম করতে হয়েছে অনেকটা। কিন্তু ফুলের গাছটা কেনা মাত্রই তার মুখে হাসি চলে এসেছে, তৃপ্তির এক সুখের হাসি। কণিকার জন্য কিছু করতে পেরে তার মনটা শীতল হাওয়ায় দোল দিচ্ছে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৯

নিমকি আর সিঙ্গারা কণিকার পছন্দের খাবার। নিশ্চয়ই সাদিকের হাতে এই খাবার দেখে কণিকা বাচ্চাদের মত দৌড়ে এসে খাবে। নিশ্চয়ই সে খুব খুশি হবে। কণিকাকে মন ভরে খেতে দেখলে কি সাদিক খুশি হবে না? অবশ্যই হবে। এতেই তার সুখ। আর যখন সেই কাঙ্খিত ফুলের গাছের চারাটা কণিকা দেখবে, তখন কি সদ্য ফোঁটা ফুলের মতোই হেসে উঠবে না মেয়েটা? সেই হাসি কি দেখতে খুব সুন্দর লাগবে না? সেই সৌন্দর্য কি সাদিকের মনকে ছুঁয়ে দেবে না? সেই ছোঁয়া পেতেই তো এত পরিশ্রম!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪১