সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৬
Raiha Zubair Ripti
সকালের আলো ফুটেছে অনেক আগেই। সিকান্দার ফজরের নামাজ পড়ে আবার শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে আসতেই বিরক্তিতে তার চোখ মুখ কুঁচকে আসে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো সেলিম মির্জা কে। বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো ঠোঁটের আগায়। দরজা থেকে সরে ঘুমঘুম চোখে সোফায় বসে বলল-
“ আপনি দেখছি আমাকে শান্তি দিচ্ছেন না। রাতে ঘুমাতে হয় আপনার সাথে কথা শেষ করে। আবার সকালে ঘুম ভাঙে আপনাকে দেখে। আবার কি বলতে এসেছেন? তাড়াতাড়ি বলুন। ”
সেলিম মির্জা মনে মনে ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হলেও তা প্রকাশ করলেন না। পাশে বসে বললেন-
“ সব কিছু কমপ্লিট। ”
“ সব কিছু কমপ্লিট মানে? কি কমপ্লিট?”
“ মানুষজন দাওয়াত দেওয়া শেষ। আমার সকল সহকর্মী বন্ধু বান্ধব দের আমন্ত্রণ করেছি। কমিউনিটি সেন্টারও বুকিং করা শেষ। তারা ১৩-১৫ তারিখের জন্য সব আয়োজন করে দিবে।”
সিকান্দার কপালে আঙুল দিয়ে স্লাইড করছিলো। সেলিম মির্জার এমন কথা শুনে বলল-
“ আমি কখন এসবের দায়িত্ব আপনাকে দিলাম? আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম শুধু বিয়ে ঠিক করা অব্দি। এত কিছু তো করতে বলি নি। আর কমিউনিটি সেন্টার বুকিং করছেন, আমার থেকে জেনে করছিলেন? ”
“ কি আশ্চর্য তোমার থেকে সব জেনে করতে হবে আমাকে?”
“ বিয়ে যেহেতু আমার। সেহেতু আপনি অবশ্যই জেনে করবেন সবকিছু। ”
“ কি ভুলটা করেছি আমি এখানে? আমার ছেলের বিয়ে আমি আমার সহকর্মী দের ইনভাইট করবো না? ছেলের বিয়ে ধুমধাম করে দেওয়ার জন্য কমিউনিটি সেন্টার বুক করবো না?”
“ আপনার সহকর্মী রা আমার বিয়েতে এসে কি করবে? আপনার সহকর্মী বলতে তো সব পুরুষ,এমপি, মন্ত্রী, মিনিস্টার। ”
“ আমার ছেলের বিয়েতে তারা আসবে না? ”
“ কেনো আসবে সেটা জিজ্ঞেস করছি। ”
“ আমার ছেলে আর ছেলের বউকে দেখতে। ”
“ আমার বউ তারা কেনো দেখতে আসবে?”
“ মানে? এটা কেমন কথা?”
“ আমার বউ কি কোনো ফার্নিচার যে তারা এসে দেখবে? আমার বউ তো আমি কাউকে দেখাবো না। দাওয়াত যখন দিয়েই ফেলছেন ফিরিয়ে নেওয়া তো সম্ভব না। আসবে,এসে খেয়ে দেয়ে দোয়া করে চলে যাবে। সেন্টার বুকিং করার তো কোনো দরকার ছিলো না। ”
“ তুমি বিয়ে করবে না? ”
“ করবো। ”
“ কোথায় করবে তাহলে সেন্টারে না করলে? আমেরিকায় গিয়ে?”
“ মসজিদে করবো বিয়ে। আর ওয়ালিমার অনুষ্ঠান এ বাড়িতেই হবে। ”
“ বাড়িতে! এত কম সময়ে কিভাবে কি করবে? এজন্যই তো আমি সেন্টার বুক করেছিলাম। আর সালমানই বা কিভাবে কি করবে এত কম সময়ে? ওর দিকটা দেখবে না? ওর কি আমাদের মতো গাদা গাদা টাকা আছে? ”
“ কথায় কথায় টাকা শব্দ টাকে তুলে আনেন কেনো? কম টাকায় কি বিয়ে করা যায় না? কেউ করে না? সবার কি আপনার মতো অঢেল টাকা? চাচাকে ধুমধাম করে আয়োজন করতে মানা করেছি আমি। ঘরোয়া ভাবে হবে ও বাড়িতে মেহেন্দি, গায়ে হলুদ আর বিয়ের অনুষ্ঠান। আপনি কি বরযাত্রী হিসেবে দেশের সকল লোক নিয়ে যেতে চাচ্ছেন নাকি যে এত ঘেমে যাচ্ছেন সাধারণ বিষয় নিয়ে। আর তাছাড়া সব কিছু করা শেষ। বাহিরে তাকিয়ে দেখুন। ”
সেলিম মির্জা উঠে বাহিরে তাকিয়ে দেখলো বাহির থেকে লোকজন বাঁশ, ফুল,ঝাড়বাতি এসব নিয়ে আসছে ডেকোরেশনের জন্য।
“ তুমি আমাকে বলবে না যে তোমার বিয়ের সব তুমিই করছো? কতগুলো টাকা দিয়েছি সেন্টারে জানো?”
“ আপনার টাকা বেশি তাই আপনি দিয়েছেন আমার সাথে পরামর্শ না করেই। ”
“ তুমি দিনকে দিন অভদ্র হয়ে যাচ্ছ সিকান্দার। ”
“ সেটা কেবল আপনার আর আপনার বউয়ের কাছেই মনে হয় । মেবি আপনাদের চোখ ভালো কোনো ডক্টরের কাছে দেখাতে হবে। ভালো চশমা নিতে হবে চোখে। তাহলে আই থিংক আমাকে ভালো লাগবে আপনাদের। ”
“ আমার মানসম্মান টা আর রাখলে না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে কি না ছেলের বিয়ে ছোট পরিসরে দিব! ”
“ আপনি কোথায় দিচ্ছেন বিয়ে। আমার বিয়ের আয়োজন খরচ সব আমিই বহন করছি। কোনো কিছুর কমতি হলে মানসম্মান গেলে আমার যাবে। আপনার যাবে কেনো? ”
“ ছেলেটা কার তুমি, শুনি? তোমাকে ডাকতে হলে সর্বপ্রথম আমার নামটাই তাদের মুখে নিতে হবে। তাহলে আমার মানসম্মান জড়িয়ে রইলো না?”
“ ওয়েল। ভরসা রাখুন,আপনার সহকর্মী দের আপ্যায়নে কোনো কমতি হবে না। ”
“ তুমি ইচ্ছে করেই এমনটা করছো তাই না? পুরোনো ক্ষোভ গুলো এভাবে ঝাড়ছো। ”
“ আপনার সাথে তর্ক করে আর এনার্জি নষ্ট করতে চাই না। আপনি প্লিজ আসুন। সকাল সকাল আমার মুডের ১২ টা বাজিয়ে দিচ্ছেন। ”
“ তুমি ২৪ টা বাজিয়ে দিয়েছো আমার। যদি আমার মানসম্মান খুইয়েছ তুমি তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবে না। ”
সেলিম মির্জা চলে গেলেন। সিকান্দার হাই তুলতে তুলতে নিচে আসলো। ম্যানেজারের সাথে কথাবার্তা বললো। ম্যানেজার আস্বস্ত করে বললো তার পছন্দ মতোই সবটা হবে ডেকোরেশন।
দুপুরের দিকে মুনতাহাদের বাড়িতে একটা পার্সেল আসলো মুনতাহার নামে। নিচে নেমে পার্সেল টা রিসিভ করলো। বড়সড় একটা পার্সেল। পার্সেলের গায়ে সিকান্দার শাহ্ এর নাম লেখা। তারমানে উনি পাঠিয়েছেন এটা! কি আছে? রুমে নিয়ে খুলে দেখলো এক বক্স হিজাব। প্রায় সব রঙেরই হিজাব আছে। সাথে সাথে মেসেজ আসলো ফোনে-
“ সেদিন অনেকটা দেরি হয়ে যাচ্ছিলো,
আপনাকেও ক্লান্ত লাগছিলো বলে আপনার বাকি জিনিস গুলো আর কেনা হয় নি। আমি তারপরের দিন গিয়ে কিনে এনেছি। শুনুন পোশাকের সাথে হিজাব ক্যারি করবেন প্রতিটি অনুষ্ঠানে। আর হ্যাঁ সিম্পল ভাবে সাজবেন। মুখে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করতে নিষেধ করবেন। আপনার সাথে আমার দেখা হচ্ছে সরাসরি বিয়ের দিন। বুঝছেন?”
মুনতাহা কেবল রিপ্লাই তে বলল-
“ জ্বি বুঝেছি। আপনার আমার পরশু দেখা হচ্ছে তবে। ”
মুনতাহা হিজাব গুলো আলমারিতে তুলে রাখলো। তার নানা বাড়ির লোকজন চলে এসেছে। বাহিরে একটা গরু আনা হয়েছে। বসার ঘরে মেহেন্দির অনুষ্ঠানের জন্য বসার জায়গা করা হয়েছে।
মুনতাহার মামিরা এসে থেকেই ঠেস মেরে মেরে কথা বলছে। সিমরানকেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এ বাড়িতে। সিমরান এদের কাউকেই দেখতে পারে না। মুনতাহার মামিরা বলছে-
“ বাহ্ মুনতাহা তো ভালোই বশ করতে জানে। ছোট ছেলের বউ হতে পারে নি বলে বড় ছেলের বউ হয়ে যাচ্ছে ও বাড়িতে! লোভী মেয়ে একটা। ও বাড়ির বউ হয়েই ছাড়লো! ”
সিমরান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে জবাব দিলো-
“ বিয়ে খেতে এসেছেন নাকি কুটনামি করতে এসেছেন বলুন তো? এসে থেকেই দেখছি এই একই পেঁচাল পারছেন। ভালো কিছু ভাবতে পারেন না? সব শুধু নেগেটিভ আর বাজে কথাবার্তা। ”
মামিদের মুখ কালো হয়ে গেলো। সিমরান কে শুনিয়ে শুনিয়েই তো বলছিলো কথা গুলো। ও মেয়ে তাহলে মুনতাহার সাপোর্ট নিয়ে কথা বললো কেনো?
পরের দিন টেইলার্স থেকে মুনতাহার ব্লাউজ আর পেটিকোট আসে। তবে সে তো ব্লাউজের হাতা কনুই অব্দি দিয়েছিল। এ তো ফুল হাতার ব্লাউজ। মা’কে জিজ্ঞেস করতেই মা জানালেন- সে ফোন করে বলেছিল ফুল হাতা দিতে।
মুনতাহা ব্লাউজ গুলো আলমারিতে রেখে মেহেন্দির জন্য রাখা গারারা ড্রেসটা বের করলো। হালকা সবুজ রঙের ওপর সূক্ষ্ম কাজ করা। চোখে পড়ার মতো, ভারী কোনো কাজ নেই। পোশাকটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে অন্যরকম লাগলো। একটু লাজুক, একটু শান্ত… আর খুব নিজের মতো। এর মাঝেই পার্লার থেকে দুইজন আপু এসে পৌঁছালো। ঘরের ভেতরেই তাদের বসানো হলো। বাইরের কোনো পুরুষ, বা কোনো অচেনা মানুষ নেই। তার কাজিন আর, ও বাড়ির লোকজন।
পার্লারের আপুরা সুন্দর করেই সাজাতে শুরু করলো মুনতাহাকে। ভারী মেকআপ না। হাল্কা ভাবেই সাজালো। হুকুম যে সেটাই দেওয়া। সাজানো শেষে মুনতাহা আয়নায় তাকিয়ে নিজেকেই চিনতে পারলো না কিছুক্ষণ। এত সাদামাটা সাজ, তবুও এত সুন্দর!
বিকেলের পর ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর জমে উঠলো ছোট্ট অনুষ্ঠান। মির্জা বাড়ি থেকে সিকান্দারের ফুফু ফুপাতো বোন লাবণ্য,দাদি মনোয়ারা মির্জা এসেছিল। মুনতাহার খালা, মামি, কাজিনরা সবাই মিলে এক উষ্ণ, আপন পরিবেশ। কোথাও কোনো উচ্চস্বরে গান নেই, ডিজে নেই, অশালীন কিছু নেই। বড় পুরুষরা বাহিরে বিয়ের অন্যসব কাজ করতে ব্যস্ত।
ইলা আসলো সন্ধ্যার আগ দিয়ে। সবুজ রঙের জামদানী শাড়ি পড়েছে। চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। তারও সিম্পল সাজ। ফোন টিপতে টিপতে ভেতরে ঢুকছিলো।
আর নাদিম বাবার ওয়ালেট টা নিয়ে বের হচ্ছিল। পথিমধ্যে দু’জনে জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেলো। ইলা মাথায় ব্যথা পেয়েছে। ইলার রাগ হলো। মাথা চেপে ধরে বলল-
“ অসভ্য কানা দেখে চলতে পারেন না?”
নাদিম চোখ তুলে তাকালো। ইলাকে দেখলো। তবে চিনলো না। হয়তো সেজে আছে সেজন্য।
“ আপনি অসভ্য কানা। ”
নাদিম চলে গেলো। ইলা ঘাড় ঘুরিয়ে নাদিমের চেহারাটা দেখেই চিনে ফেললো এটা শপিং মলের ঐ অসভ্য টা। কিন্তু এ বাড়িতে কি? মুনতাহার রিলেটিভ নাকি? যাক গে সে যাই হোক। বেয়াদব ছেলে একটা। ইলা ভেতরে এসে দেখলো মেহেন্দির অনুষ্ঠান অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। পিচ্চি পিচ্চি ছেলেমেয়েরা আনন্দ করছে। মেহেদী আর্টিস্ট এসেছে। সবাইকে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। ইলা গিয়ে পাশে বসলে মুনতাহার। পাশ থেকে আরেক মেহেদি আর্টিস্ট ইলার হাতেও মেহেদী লাগিয়ে দিতে লাগলো।
মুনতাহার দু হাত ভর্তি মেহেদী লাগানো হলো। হাতের মাঝখানে সিকান্দারের নাম লিখে দেওয়া হলো ছোট্ট করে। ইলাকে জিজ্ঞেস করলো তার হাতে কোনো নাম লিখে দিবে কি না? তার কেউ আছে কি না?
ইলা বললো-
“ বা হাতে লিখে দেন সিঙ্গেল লাইফ ইজ জিঙ্গালালা। মাই ফিউচার হাসবেন্ড ইজ লাপাত্তা।”
মেহেদী আর্টিস্ট সত্যি সত্যি সেটাই লিখে দিলো। মুনতাহার মামি রা হাত ভরে মেহেদী দিয়ে এখন পা ভরে মেহেদী দিচ্ছে। সিমরান সেটা দেখে বিরবির করে বলল- হাভাতের দল।
মেহেদীর অনুষ্ঠান শেষে ছবি তোলা হলো। ছবিটবি তোলা শেষ হতে হতে রাত ১০ টা বেজে গেলো। এত রাতে একা ইলা কিভাবে বাসায় যাবে! অন্যের বাসায় তো রাত থাকা এলাউ না তার। একা একা যাওয়াটাও রিস্কি। মুনতাহা তখন নাদিম কে ডাকলো। নাদিম বাগানে একটা লাইট লাগাচ্ছিলো,আগের টা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেজন্য। মুনতাহা ডাকায় হাতের কাজ টা শেষ করে যেতেই সে বলল-
“ ভাইয়া আপনি কি একটু ইলা কে বাসায় দিয়ে আসবেন? আঙ্কেল বাসায় নেই। তা না হলে আঙ্কেলই আসতো নিতে। ”
নাদিম নামটা বিরবির করলো। ইলা! শুনেছিল নামটা। মুনতাহার বান্ধবী!
“ ঠিক আছে। আসুন। ”
মুনতাহা ইশারায় যেতে বলল। ইলা বিরবির করে জিজ্ঞেস করলো-
“ এটা কে হয় তোমার? উনি অনেক বদলোক। তার সাথে কেনো পাঠাচ্ছ? আর কেউ নেই?”
“ কি বলছো এসব? উনি নাদিম ভাইয়া। বদলোক কেনো বলছো? ”
ইলা যেন আকাশ থেকে পরলো।
“ এটা তোমার ঐ সৎ ভাই! এজন্যই এত পাঁজি। বদের হাড্ডি। ”
“ কি হলো আসুন?”
নাদিম যেতে যেতে ডেকে উঠলো।
“ যাও। রাত হচ্ছে তো। ”
ইলা বেরিয়ে গেলো। নাদিম তার বাইকটা বের করে বলল-
“ উঠুন। ”
ইলার চোখ কপালে।
“ আমি বাইকে বসবো! ”
“ না আমার কোলে বসবেন। আসুন বসুন। ”
ইলা বিরবির করলো- বেয়াদব।
“ কি হলো উঠুন। না গেলে বলুন। শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়?”
ইলা উঠে বসলো। দুজনের মাঝে মনে হলে এক হাত দূরত্ব। নাদিম বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল-
“ বাইক থেকে পরে হাত পা ভাঙলে তখন আমার দোষ দিলে খবর আছে। বাইক উঠিয়ে দিব শরীরের উপর দিয়ে বলে রাখলাম। ”
ইলা সাথে সাথে তাল সামলাতে না পেরে নাদিমের উপর পরে গেলো।
“ আপনি তো ভারী অসভ্য লোক। মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না? আর এভাবে খবিশের মতো বাইক টান দিলেন কেনো? ”
“ না জানি না কিভাবে মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়। আপনি শেখাবেন? আর আমি বাইক এভাবেই চালাই। ”
ইলা সরে আসলো। বাইকের পেছনে হাত রেখে মুখ ভেঙিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বলল-
“ ধীরে সুস্থে চালাবেন বাইক। ফেলে দিলে আসলেই আপনার খবর আছে। ”
নাদিম আয়নায় ইলাকে দেখলো। মাইয়া বাইকে পায়ের উপর পা তুলে বসছে! ওরে নবাবজাদীর বংশধর! বাঁকা হেসে আরো জোরে স্পিড বাড়ালো। ইলা চেপে ধরলো নাদিমের কাঁধ। ভয়ে চিৎকার করে বলল-
“ ওরে আল্লাহ! এই খবিশ,জাউরা বেডা,আস্তে চালান। আমার কলিজা উড়ে গেলো রে। ”
নাদিম ফুল মাস্তিতে বলল-
“ আপনি উড়ে যেতে পারেন না? বাইকে কেউ এভাবে বসে? বসতে হয় আঁটসাঁট করে জড়িয়ে ধরে। ধরুন তো আমাকে তারপর দেখুন কালবৈশাখী ঝড় আসলেও আপনাকে উড়িয়ে নিতে পারবে না। ”
“ আমার এখনো বিয়ে হয় নি। ”
“ বিগ আসস সিস্টার। ”
“ আস্তে চালান ভাই। অকালে মরতে চাই না। ”
নাদিম স্পিড কমিয়ে দিয়ে বলল-
“ ভালো ভাবে বসুন তাহলে। ”
ইলা ভালো ভাবে বসলো। নাদিমের কাঁধে এক হাত রেখে শার্ট চেপে ধরলো। বাড়ির কাছে আসতেই ইলা বলল-
“ সাইডে রাখুন। এসে গেছি। ”
নাদিম বাইক থামালো। ইলা গাড়ি থেকে নেমে বলল-
“ থ্যাংক’স। ”
নাদিম বাইক টা ঘুরিয়ে একটানে চলে যেতে যেতে বলল-
“ আপনার ধন্যবাদ আপনার ভ্যান্টি ব্যাগে ভরে রাখুন মিস ঢিলা। আমার কোনো কাজে আসবে না এটা। ”
ইলা রাগে কিড়মিড় করে উঠলো। তার এত সুন্দর নামটাকে এভাবে নাম ভেঙানো! নাদিমের দিকে তাকিয়ে রেগে বলল-
“ বাইক নিয়ে খাম্বার সাথে বাড়ি খা বেয়াদব। বাইক তো নয়, এ যেন এরোপ্লেন। ”
পরের দিন সকালে গায়ে হলুদ ছোঁয়ানো হলো মুনতাহাকে। বসার ঘরেই করা হলো। হলুদ লাগানো শেষে গোসল সেরে বের হতেই তাকে বিয়ের জন্য সাজানো হলো।
গতকাল রাতে সুনেহরা এসেছে মির্জা বাড়িতে। সেলিম মির্জা গিয়ে নিয়ে এসেছে। সিকান্দার কে হলুদ লাগানো হয়েছিল সকালে। তবে খুব বেশি লাগাতে দেয় নি। বেশি লাগালে দাগ বসে যাবে শরীরে এজন্য। সে গোসল সেরে বিয়ের জন্য আনা পাঞ্জাবি আর কোটি টা পড়ে নিলো। মাথার ভেজা চুল গুলো শুকিয়ে সেট করলো। শরীরে আতর মাখলো। শেষে পাগড়ি পরলো মাথায়। তারা সরাসরি মসজিদে যাবে। সেখানেই বিয়ে পরিয়ে তারপর বিয়ে বাড়ি যাবে।
সিকান্দার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলো শেষবার। বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেলিম মির্জা মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছেন। এত বড় মানুষ, অথচ আজ ছেলের কথায় সবকিছু ছোট করে ফেলতে হয়েছে। মনলর ভেতর রাগ ভরা। অর্নব মায়ের সাথে দাঁড়ানো। সুনেহরা আর লাবন্য গাড়িতে বসে আছে। সিকান্দার গাড়িতে উঠলো। সাথে তার বাবা ফুপা ও কয়েকজন নিকট আত্মীয়। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো মসজিদের দিকে। আর মেয়ে সদস্য রা যাবে ও বাড়িতে।
ও বাড়ি থেকে নাদিম, সালমান মির্জা,মুনতাহার খালু আর এক মামা আসলো মসজিদে।
মসজিদের ভেতরটা নিরিবিলি, প্রশান্ত। সাদা দেয়াল, মেঝেতে সবুজ জায়নামাজ বিছানো। ইমাম সাহেব ইতোমধ্যে বসে আছেন। সিকান্দার গাড়ি থেমে মসজিদের ভেতর ঢুকল সামনের সারিতে বসলো। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে… ১৩ বছরের অপেক্ষা, আজ যেন এক বিন্দুতে এসে থেমেছে।
ওদিকে, মুনতাহা নিজের ঘরে বসে আছে। বিয়ের লালচে আভাযুক্ত সাদামাটা শাড়ি, মাথা ঢেকে রাখা হিজাব। তার উপর দোপাট্টা। পাশে সিকান্দারের দাদি আর তার নানি। সামনে কাজি সাহেব।
মুনতাহা জানতো না যে তাদের বিয়েটা এভাবে হবে। সিকান্দার মসজিদে যাবে।
কাজি সাহেব সেলিম মির্জা কে ফোন করে জিজ্ঞেস করলো-
“ মোহরানা কত বাঁধবো? ”
সেলিম মির্জা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন। সিকান্দার জবাবে বলল-
“ আমার ৯ বছর ধরে জমানো সবটা সেভিংস। ”
“ পরিমান?”
“ ৩২ লাখ একশত এক টাকা। আর আমি এটা আজই পরিশোধ করে দিব। ”
কাজি সাহেব মাশাল্লাহ বলে উঠলেন। মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বললেন-
“ পিতা শরিফুল ইসলাম,ও মাতা ময়না বেগমের কন্যা,মুনতাহা মুন। আপনি কি পিতা সেলিম মির্জা, মাতা হুমায়রা বেগমের পুত্র সিকান্দার শাহ্ মির্জা কে ৩২ লাখ একশত এক টাকায় নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করছেন? করে থাকলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি। ”
মুনতাহার বুক কেঁপে উঠলো। যাকে সে কোনোদিন দেখে নি। বাবা বলে ডাক দেয় নি। সেই লোকটার মেয়ে হিসেবে ডাকা হচ্ছে। সেই লোকটার নাম উল্লেখ করা হচ্ছে! অদ্ভুত জীবন।
চোখ ভিজে এলো মুনতাহার। ঠোঁট কাঁপছে। পাশ থেকে দাদি নানি ইলা সবাই সাহস যোগাচ্ছে। অথচ এই সময় টাতে দরকার হয় মায়ের শক্ত হাতের ভরসা। অথচ তার মা আজও নেই তার কাছে। সেলিম মির্জার ফোন টা লাউডস্পিকারে থাকায় কথাবার্তা সব কানে আসছে। সিকান্দার মাথা নিচু করে রেখেছে।
মুনতাহা লম্বা করে শ্বাস টেনে ধীর কণ্ঠে বলল-
“ আলহামদুলিল্লাহ … কবুল করছি। ”
“ আবার বলুন। ”
“ আলহামদুলিল্লাহ.. কবুল করছি। ”
“ আর একবার।”
“ আলহামদুলিল্লাহ.. কবুল করছি। ”
মসজিদের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো এক মুহূর্ত। কাজি সাহেব রেজিস্ট্রার পেপার টা মুনতার দিকে বাড়িয়ে দিলো। মুনতাহা কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করলো। কি আশ্চর্য তার মা এবারও আসলো না তার কাছে! একটুর জন্যও দেখা পেলো না মায়ের!
কাজি এবার মসজিদে চলে গেলো। সিকান্দারের সামনে বসে বললেন-
“ পিতা সেলিম মির্জা। মাতা হুমায়রা বেগমের পুত্র সিকান্দার শাহ্, আপনি কি পিতা শরিফুল ইসলাম মাতা ময়না বেগমের কন্যা মুনতাহা মুন কে আপনার নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন? কবুল করলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি। ”
সিকান্দার চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিলো। তারপর বলল-
“ আলহামদুলিল্লাহ… কবুল করছি। ”
তিনবার কবুল বলা শেষ হতেই কাজি রেজিস্ট্রার পেপার এগিয়ে দিলো। সিকান্দার সাইন করলো। কাজি এবার বললেন-
“ আলহামদুলিল্লাহ… উভয়ের সম্মতিতে এই নিকাহ সম্পন্ন হলো। এখন থেকে আপনারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে বৈধ হালাল ও সম্মানিত বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। ”
কাজি সাহেবের বলা কথাটা শোনা মাত্রই সিকান্দার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সোজা সিজদায় লুটিয়ে পড়লো। কাঁপা কণ্ঠে রবের উদ্দেশ্যে বলল-
“ ইয়া রব… ১৩ বছরের ধৈর্যের প্রতিদান আজ দিলেন…আপনার রহমতে আমি তাকে হালালভাবে পেলাম…আলহামদুলিল্লাহ…আলহামদুলিল্লাহ। আমি আপনার কাছে আজীবন ঋণী থাকবো রব। ”
সিকান্দারের চোখ ভিজে গেছে। তার একতরফা ভালোবাসা অবশেষে আজ জিতে গেছে।
মসজিদের ভেতর মিষ্টি একটা আবহ ছড়িয়ে পড়লো। একজন খেজুর ভর্তি থালা এনে সামনে রাখলো। সিকান্দার নিজ হাতে খেজুর তুলে নিলো। তারপর হালকা করে চারদিকে ছড়িয়ে দিলো। খেজুরের টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়লো জায়নামাজের ওপর। সবাই হাসিমুখে তা কুড়িয়ে নিলো।
ওদিকে, মুনতাহার চোখ দিয়ে ননস্টপ টুপটুপ করে পানি পড়ছে। তার এখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারছে না। এত এত মহিলা রয়েছে তার রুমে।
মসজিদ থেকে সিকান্দাররা বেরিয়ে সালমান মির্জার বাড়িতে আসলো। বর এসেছে বর এসেছে শুনে মুনতাহার রুম থেকে মানুষ একে একে সরে যেতে লাগলো।
মুনতাহার কানে যখন গেলো বর এসেছে বর এসেছে তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। রুম আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে লাগলো।
কেউ শেষবারের মতো ঘোমটা ঠিক করে বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে।
পায়ের ধুপধাপ শব্দ বাড়ছে…আর সেই শব্দ শুনেই যেন মুনতাহার শ্বাস আটকে আসছে।
সে চুপচাপ বসে আছে, হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরেছে নিজেরই। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী। হঠাৎ দরজার বাইরে থামলো পায়ের শব্দ। তারপর দরজাটা আস্তে করে খুলে গেলো।
সিকান্দার ভেতরে ঢুকলো। সাদা পাঞ্জাবি, পাগড়ি, চোখে স্থিরতা। তার সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী কে একনজর দেখার তৃষ্ণা চোখ মুখে স্পষ্ট।
দরজা দিয়ে ঢুকেই সিকান্দার প্রথমে সালাম দিলো মুনতাহাকে। কণ্ঠটা ভারী, কিন্তু শান্ত।
মুনতাহা মাথা নিচু করে এক হাত ঘোমটা টেনে বসে আছে। তার চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু পড়ছে না। ঠোঁট কাঁপছে। কোনো রকমে সালামের জবাব টা দিলো।
সিকান্দার ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। পেছন পেছন দাদি আর মুনতাহার নানিও আসলো। দাদি বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“ বউয়ের ঘোমটা সরা ছ্যামড়া। বউয়ের রাঙা মুখটা দেইখা কলিজা ঠান্ডা কর। ”
সিকান্দার হাত বাড়িয়ে মুনতাহার ঘোমটা তুললো। সাথে সাথে লাজুকলতা নারীর রাঙা মুখটা নজরে আসলো। তার ঠোঁট কাপছে তরতর করে। চোখের পাপড়ি ফেলছে ঘনঘন। সিকান্দার ঠোঁটে কোণে আওড়ালো সদ্য বিয়ে করা বউয়ে মুখ দেখে- “ মাশা-আল্লাহ! ” তার রবের সৃষ্টি এই নারীটা এখন কেবল সিকান্দারের! শুধুই সিকান্দারের। আর কোনো ভয় নেই হারানোর। নেই কোনো সংশয়। মুহূর্তে তৃষ্ণা যেন আরো বেড়ে গেলো। দাদির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ দাদিজান,স্পর্শ করতে পারবো এখন? নাকি আরো অপেক্ষা করবো? ”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৫
“ আর অপেক্ষা করবা ক্যান? একটা চুমু খাও বউয়ের গালে। তোমারই তো বউ এখন। একেবারে হালাল বউ। ”
সিকান্দার এগিয়ে গিয়ে মুনতাহার গালে আলতো করে হাত রাখলো। এই তাকে সিকান্দারের প্রথম স্পর্শ করা। অদ্ভুত শান্তি আছে এই ছোঁয়াতে। বুক কলিজা জুড়িয়ে যায়। মুনতাহা বুঝি কেঁপে উঠলো এই স্পর্শে। সিকান্দার মুনতাহার কাঁপুনির মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো। সেই সাথে বিরিবির করে বলল-
❝ আমার আমানত। আমার হালাল.. আমার ১৩ বছরের ধৈর্যের একমাত্র পুরষ্কার..আমার স্ত্রী… আজ থেকে আমার সকল সুখ আপনার। আর আপনার সকল দুঃখ কেবল আমার। ❞
