Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ১১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১১
তানিয়া হুসাইন

ঘরের ভেতরে থমথমে নিস্তব্ধতা। কেবল কান্না আর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
দুদিন থেকে এটাই চলছে।
হঠাৎ করে তাদের সাজানো গোছানো সংসারে ঝড় কোথা থেকে আসলো, কেউ এখনো এগুলো মেনে নিতে পারছেনা।
সায়মা রহমান ইশায়ার রুমে বসে আছেন।
ওর বিছানা পড়ার টেবিল ওর পুতুল সবকিছু হাতড়ে হাতড়ে দেখছেন।
___ইশায়ার বিড়াল টা তার বিছানায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।
ও তো খুজে ইশুকে।
সারাটাদিন ওর কোলেই তো লেপ্টে থাকতো।
ও তো বুঝে না যে আর ইশুকে পাবেনা কখনো।
সারা বাড়ি জুড়ে পায়চারি করে আর শব্দ করে ডাকাডাকি করে।

____বারান্দা থেকে ইশায়ার টিয়া পাখি ডাকছে।
লাইট জ্বালানোয় ভাবছে ইশায়া এসেছে।
___কিন্তু ইশায়া যে আর কোনদিন ও আসবেনা।
এই ঘড়ে আসলে দম বন্ধ হয়ে যায় সায়মা রহমানের।
আদনান সাহেব কাল সারারাত এই রুমে ছিলেন।
___আদ্রিয়ানের সময় নানা ধরনের কমপ্লিকেশনের কারণে ডাক্তার বলে দিয়েছিল আর বেবি না নিতে,
অনেক রক্ত লেগেছিল তখন সায়মা বেগমের।
খুব-ই খারাপ অবস্থা ছিলো।
___এর অনেক বছর পর যখন ইশায়া পেটে আসে,
তখন সবাই বলেছিলো বাচ্চাটা না রাখতে।
আদনান ও বলেছিলো,
কিন্তু সায়মা বেগম শুনেন নি কারোর কথা,
ফলস্বরুপ ডেলিভারির সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

___ডাক্তার তো বন্ডে সই ও করিয়েছিল।
সাফ সাফ বলে দিয়েছে যে কোন একজনকে বাঁচাতে পারবে তারা।
কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে দুজনই বিপদ পেরিয়ে উঠেছে।
মেয়ে হয়েছে শুনে সবাই খুশি হয়।
একটা মেয়ের অনেক শখ ছিলো তাদের।
কিন্তু মেয়ের অবস্থা শুনে খুশি মুহূর্তে গায়েব হয়ে যায় সবার মুখ থেকে।
__আলাদা রাখা হয় বাচ্চাকে।
অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে,
ইনকিউবেটরে রাখা হয়।
মেয়ের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য সবকিছু করে তারা।
সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়।
সায়মা রহমানের রক্ত লাগে অনেক,সি সেকশন করা হয়েছিলো।

__মেয়ের অক্সিজেন সরবরাহ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে আসলে চার দিনের মাথায় তারা বাচ্চাকে মায়ের কাছে দিয়ে দেয়।
___ছোট থেকেই মেয়েটা নাজুক।
অল্পতেই অসুস্থ হয়ে পড়তো।
যার কারনে মেয়েকে নিয়ে অনেক সেনসেটিভ সায়মা রহমান।
সব সময় আগলে রেখেছেন।
বাবা-মা দুই ভাইয়ের জান সে।
কিন্তু হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো।
সায়মা আলমারি থেকে মেয়ের একটা জামা বের করে হাতে ধরে বসে আছেন।
বারবার জামাটা নিজের মুখে চেপে ধরে কাঁদছেন।
___এই জামাটা পরেই তো আমার সোনা ঈদের দিন সেজেছিল।
বলেছিল— আম্মু, আজ আমি প্রিন্সেস হয়েছি না?
আমি বলেছিলাম,
— আমার মেয়ে প্রিন্সেস না, রানী। এখন… এখন কে বলবে আমাকে ‘আম্মু’? কে কপালে চুমু দেবে?”
আমার মেয়েটার সাথে কেন এমন হলো আল্লাহ।

___আদনান রহমান চুপ করে চেয়ারে বসে আছেন। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে, মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ ভাঙা গলায় বলে ওঠেন,
—আমি এত সফল মানুষ ভেবেছিলাম নিজেকে। সম্মান, সুনাম সবকিছু থেকেও কিছুই নাই আমার…
___নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে পারলাম না।
একটা বাবার ব্যর্থতা এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে।

চোখ লাল, বারবার ছটফট করছেন ফারজানা।
___কামরুল আহমেদ।
এক হাতে ফারজানাকে জড়িয়ে ধরেছেন, অন্য হাতে চশমা খুলে চোখ মুছছেন।
ওরা এখন রহমান বাড়িতেই আছেন।
আদ্রিয়ান যেতে দেয়নি ওদের।
এই অবস্থায় ওদের একা থাকা ঠিক হবে না বলেই রেখে দিয়েছে।

আদ্রিয়ান বারান্দায় একটা চেয়ারে বসা হাতে সাফার ডায়েরি।
সাইডেই সাফার একটা ওড়না।
সে তাদের সুন্দর মুহূর্ত গুলোর স্মৃতিচারণ করছে।
জীবনটা তো তাদের অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল, এখন হয়তো তোমার সাথে ফোনে কথা বলার কথা ছিলো,
আমাকে বিয়ের দিন কি করবে কি না করবে কোথায় সাজবে এগুলো নিয়ে আমার মাথা নষ্ট করতে।
আদ্রিয়ান ফোন হাতে নিয়ে সাফার আইডি চেক করে।
তার দেওয়া লাস্ট মেসেজ দেখে।
___অজান্তেই চোখে বেয়ে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পরে।
আদ্রিয়ান মেসেজ দেয় সাফার আইডিতে।
বাচ্চাদের মতো করছে সে।
কিন্তু সে তো জানে আর কোনদিনো এই আইডি থেকে সাফা তাকে আর মেসেজ দিবেনা।
সে যে আর নেই।
_____ কলিংবেলের শব্দে জান্নাত নিচে নেমে আসে।
ড্রয়িং রুমে কেউ নেই।
সে দরজা খুলে দেখে আবির এসেছে।
জান্নাতকে দরজা খুলতে দেখে আবির বলে,

__তুমি উঠে এলে কেনো।
জান্নাত কিছু বলেনা ধীরে ধীরে হেটে কিচেনে চলে যায়।
ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে নিয়ে আসে।
___আবিরের সামনে গ্লাস এগিয়ে দেয়।
—আবির কিছু না বলে পানিটুকু খেয়ে নেয়।
___এবার জান্নাত বলে,
কোথায় গিয়েছিলে?
— পুলিশ স্টেশন।
ঠান্ডা গলায় বলে আবির।
___কিছু বললো ওরা।
কিছু জানতে পেরেছে?

___আবির হতাশ কন্ঠে বলে,
___না!
ইনভেস্টিগেশন চলছে।
___একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জান্নাত।
___বাবা-মা, ফুফু খেয়েছেন?
___না।
___জান্নাতের কথা শুনে আবির উঠে দাঁড়ায়।
মায়ের কাছে যাবে এখন সে।
এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না।

মাফিয়া সানকচুয়ারিতে ছয় ফুট লম্বা টেবিল ঘিরে বসে আছে ভীর, নিকো, ডিয়েগো এবং আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় গার্ড। ঘরের বাতাস ভারী, দেওয়ালের ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে চলা মাফিয়া কার্যক্রম লাইভ ট্র্যাক হচ্ছে। ঘরে শুধু হালকা লাল আলো, একেকজনের মুখে ভয়ঙ্কর রূপ।
___ভীর অন্য মনস্ক।
তার এসব কাজে কোন ধ্যান নেই।
___সে অন্য ছক কষতে ব্যস্ত।
–নিকো গম্ভীর কণ্ঠে বলে
—তুমি কি জানো তুমি কি করছো ভীর? একটা মেয়ে, একটা সাধারণ মেয়ে. আর তুমি তার জন্য এই পরিমাণে রিসোর্স ব্যবহার করছো?
___ভীর চুপচাপ সিগার জ্বালিয়ে একবার চোখ তুলে তাকায়। তার কপালে ভাঁজ যেন চিন্তায় ভারী।
____নিকো আবারো বলে,
কি করতে চাইছো তুমি, তোমার পরিকল্পনা কি?
তোমাকে এতটা ডেস্পারেট হতে আমি কখনো দেখিনি।

___আমাদের সামনে অনেক বড় একটা মিশন আছে।
কিন্তু তুমি সবকিছুতেই বেখেয়ালি।
এভাবে চললে হবে না।
আমাদের উদ্দেশ্য কি সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।
তুমি পিছিয়ে পড়লে আমাদের আগে অন্য কারো যেতে সময় লাগবে না।
আমাদের কোন পিছুটান থাকতে নেই ভুলে গেলে নাকি তুমি।
___ভীর নিকোর কোন কথার উত্তর না দিয়ে,
ডিয়েগোকে বলে,
—এই মেয়ের পরিবারের ওপর নজর রাখতে বলেছিলাম রেখেছো?
কে কখন কোথায় যাচ্ছে, কাকে ফোন করছে, কার সঙ্গে দেখা করছে—সব। প্রতিটি ফ্রেম দরকার। ইভেন ঘরের ভিতরেরও ভিডিও লাগবে।
সবার,
সব কিছুর ব্যবস্থা করো।
___ডিয়েগো জানায় যে সে আগে থেকেই লোক লাগিয়ে রেখেছে।
এবং সবকিছু ব্যবস্থা করছে ভিডিও ক্লিপের ও।
___নিকো চিৎকার করে ওঠে,
ওই মেয়ের জন্য ভীরের এতো চিন্তা নিকোর রাগের কারণ।
___তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো ভীর?
এতোটা কনসার্ন?
এতটা কনসার্ন সামান্য একটা মেয়ের জন্য রাজভীর আলভারেয এর।
ওর কী আছে যে তুমি এমন করছো?

___ভীর এবার ধীর স্বরে বলে,
“এই মেয়েকে কন্ট্রোলে আনবো আমি, দরকার হলে ভেঙে ফেলবো ওকে।
তবুও ওকে মানতে হবে আমায়।
আমার রাজ্যে আমারও অবাধ্যতা চলবে না।
ওকে হাতের মুঠোয় আনতে আমার যা কিছু করতে হয় আমি করব।
ওকে ভাঙতে হবে।
মানতে হবে,
মানিয়ে নিতে হবে।
___আমার বশ্যতা স্বীকার করতে হবে, আমি যা চাইবো তাই হবে।

ইশায়ার জ্ঞান ফিরেছে অনেকক্ষণ আগে।
চারপাশটা যেন কুয়াশাচ্ছন্ন।
শরীরে জোড় নেই।
গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,
কিন্তু এক ফোঁটা পানি খাওয়ার ইচ্ছা ও তার মধ্যে নেই।
বাঁচতে চায় না সে আর।
গার্ডরা ওকে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখ ভেজা, ঠোঁট শুকনো, চোখের পাতা ভারি। স্যালাইন নিজ হাতে ছিঁড়ে ফেলে দেয়।
___ কেউ কাছে আসতে নিলেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।
আর একটাই কথা তাকে কেউ ছুবে না।
তার কাছে কেউ ঘেসবে না।
___কিছু চাই না তার।
মরে যেতে চায় সে।
ওদের সাথে পেরে উঠবে না সে বুঝে গেছে তাহলে এভাবেই মরে যাবে।

____গার্ডরা ওকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করে।
কিন্তু তাদের উপর থেকে নির্দেশের কারণে তারা কিছু করতে পারছে না।
____একসময় চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ইশায়া।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সে।
সাফার এই অবস্থা সে মেনে নিতে পারছে না।
সাফা নেই কথাটা যতবার মনে হচ্ছে নিজেকে শেষ করে যেতে ইচ্ছে করছে তার।
___. আমার আপু কোথায়! আমার সাফা আপু কই!”
___কেউ ই যখন পারছে না।
তখন পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে দেখে , শেষ পর্যন্ত খবর যায় ভীরের কাছে।
___ভীর তখন তাদের নেক্সট টার্গেট নিয়ে আলোচনা করছিল।
এর মাঝে একজন গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে এই কথা জানায়।
____ভীর রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
ওকে মনিটরিং রুমে নিয়ে আসো। এখনই।”
___তারপর ডিয়েগো কে কিছু একটা ইশারা করে।
__ডিয়েগো বুঝে যায় তাকে কি করতে হবে।

ইশায়াকে জোর করে নিয়ে আসা হয় মনিটরিং রুমে। সে আসতে চায়নি।
তাকে জোর করে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে।
রুমের মধ্যে এনেই ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়,
___আমি কোথায়? আমাকে ছেড়ে দিন.।
এটা কোন জায়গা।
গ্লাসের বাইরের দৃশ্য দেখেই ইশায়া বুঝে গেছে এটা বাংলাদেশ না।
___ইশায়াকে জোড় করে একটা চেয়ারে বসানো হয়।
সামনে বসা ভীর।
পায়ের উপর পা তুলে।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছে ইশায়াকে,
___বাকি সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
ডিয়েগোর হাতে রিমোট।

__হঠাৎ ক্র্রিন জ্বলে উঠলো,
____স্ক্রিনে আবিরের লাইভ ভিডিও।
আবির কে দেখে ইশায়া অবাক চোখে তাকায়।
___সে বাসায় ফিরছে বাইকে।
তার পিছন পিছন একটা ট্রাক।
ইশায়া চোখ বড় বড় করে তাকায়।
দাড়িয়ে যায় সে।
অস্ফুটে শব্দ করে বলে,
__বড়দাদাভাই।
____ হঠাৎ ট্রাকটি তার সামনে গিয়ে ব্রেক কষে।
এমন ভাবে যায় যেন মুহূর্তে একটা মর্মান্তিক এক্সিডেন্ট ঘটে যেত।
___ইশায়া দাঁত কাঁপতে কাঁপতে বলে,
না… না… আমার ভাই… না… থামান… প্লিজ…
____আবির গাড়ি থেকেই ড্রাইভার এর উদ্দেশ্যে গালি দেয়।
এভাবে গাড়ি চালানোর জন্য।

___কিন্তু ওপর পাশ থেকে কিছু না শুনে সে আবার গাড়ি চালানো শুরু করে।
___ট্রাকটি আবারও তার পিছু নেয়।
___এবার আবির বুঝে যায় এটা কোন ট্র্যাপ,
সে ভয় পেয়ে যায়, আরো জোরে গাড়ি চালাতে শুরু করে।
____ইশায়া চিৎকার করে বলে,
প্লিজ প্লিজ এমন করবেন না।
আমার ভাই কি করেছে।
দয়া করুন।
আল্লাহ বলে কাঁদতে শুরু করে সে।
__ভীর ঠাণ্ডা গলায় বল,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১০

তোমার প্রতি মুহূর্তের অবাধ্যতা একটা করে বিপদ ডেকে আনবে ওদের উপর।
____ইশায়া তাকায় ভীরের দিকে।
তার চোখের দৃষ্টি শান্ত কিন্তু কঠোর।
___নিকো হেসে বলে,
হেইই লিটল প্রিন্সেস সামান্য জিনিস ভয় পেয়ে গেলে চলবে,
এখনো তো পুরো গেম রয়ে গেছে।
তাকাও সামনে।
___ইশায়া নিকোর কথা মতো তাকায় স্ক্রিনের দিকে।
আর…

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১২