এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৯
নুসরাত ফারিয়া
কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মূহুর্ত, অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো এমনভাবে চোখের পলকে ঘটে যায় যে, আমরা কিছু বুঝে ওঠার সুযোগটুকুও পাই না। ঠিক তেমনই গতকাল সকালে স্যারের বলা বাক্যটি শুনে আলো এক মূহুর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। তারপর…তারপর থেকে গিয়েছে মানুষটার এক বাক্যে! নিজের বাবাকে কোনোমতে বুঝিয়ে রহিত ভাইয়ার হাত দিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে ওই বাড়ি থেকে। তাহমিনা খান এখনো পর্যন্ত জানে না সে খান বাড়িতে এসেছে। উনি আর কিছুদিন পর ফিরবেন। তারপর নিশ্চয়ই ছোট্টখাট্টো একটা ঝামেলা হবে। কারণ সে এতদিনে বুঝে গেছে, ওই মানুষটা তাকে ভীষণ অপছন্দ করেন। উনি চান না এই বাড়ির বউ হয়ে সে থাকুক। কিন্তু তাতে কি? সে তো এই বাড়ির বড় বউ! যেখানে স্যারের সমস্যা নেই তার থাকা নিয়ে সেখানে অন্য কারোর সমস্যা হলো নাকি হলো না, সেটা দেখার বিষয় তার নেই। সে সবার আগে নিজের খুশি, নিজের সুখশান্তির কথা ভাবে। অহেতুক অন্য কারোর জন্য নিজের মনকে কষ্ট দিতে পারবে না। অন্তত তার পক্ষে তো সম্ভবই নয়! কারণ সে খুব স্বার্থপর একটা মেয়ে।
-“এই যে মহারানী? কী ভাবছেন এত? নিশ্চয়ই স্বামীর কথা?”
বান্ধবীর কথা শুনে আলো ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলল,
-“স্বামীজান থেকেও আজ সিঙ্গেলের মতো ঘুরছি। এই দুক্কু কই রাখব রে তামা?”
তামান্না ফিক করে হেঁসে বলল,
-“সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে চলে যা পরাণের সোয়ামির কাছে।”
আলো হতাশ হয়। এদের তো আর আসল কথাটা বলতে পারছে না। যদি জানতে পারে, তাহলে তার মাথা-কাল্লা পচিয়ে খেয়ে ফেলবে। তাও নুন, তেল, ঝাল ছাড়াই!
-“এই আলো? আয় না রে আমার সাথে একটু।”
শালুক কই থেকে ছুটে এসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলে। আলো জুসের বোতলে চুমুক দিয়ে জানতে চাইল,
-“কোথায় যাবো?”
-“আগে আয়, তারপর বলব।”
-“ঠিক আছে…চল!”
আলো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে বান্ধবীর সাথে চলে গেল। পাঁচ তলায় উঠতে উঠতে পা লেগে গেল আলোর। লিফট থাকলেও সে ব্যবহার করে না। কারণ ছোট বেলায় একবার আঁটকে পড়েছিল লিফটের মধ্যে! তারপর থেকেই অজানা কারণে ভীষণ ভয় পায় সে। লিফট দেখা মাত্রই মনে হয়, এই বুঝি আঁটকে গেল নয়তো খুলে ধপাস করে পড়ে গেল। এত বড় হয়েও আর সে কখনো লিফটে ওঠার সাহস পায়নি। হয়তো ফোবিয়াতে রূপান্তরিত হয়েছে।
-“তুই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস বল তো?”
-“স্যারের কাছে।”
-“কেন? আর কোন স্যার?”
-“আমার ক্রাশ ওরফে আধার স্যার।”
একথা শুনে আলোর পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,
-“ওই বাঁশের কাছে আমায় কেন নিয়ে যাচ্ছিস? তোর যাওয়ার ইচ্ছে হলে যা। আমি নাই এসবে!”
বলেই আলো পিছনে ফিরে চলে যেতেই শালুক তার ব্যাগ চেপে ধরে রিকোয়েস্ট করল,
-“প্লিজ দোস্ত! শুধু আমার পাশে থাক। আমি আজ অনেক কষ্টে সাহস জুগিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। প্লিজ তুই সেটা নষ্ট করে দিস না।”
-“আরে বালডা এর মধ্যে আমাকে টানছিস কেন? জানিসই তো ওই লোকটা আমাকে সহ্য করতে পারে না। সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলে মুড নষ্ট করে দেয়।”
-“জানি, আর এটাও জানি স্যার তোর সাথেই বেশি কথা বলে।”
আলো প্রচুর বিরক্ত হয়। সে চাচ্ছে না ওই লোকটার সামনে যেতে। এর জন্য সে আজ ক্লাসটাও মিস দিয়েছে। কারণ সে আজ সকালে একটা আকাম করেছে। স্বপ্নে দেখছিল সে সুজনকে থাপ্পড় মা’রছিল, কিন্তু ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দেখে সে সুজনের জায়গায় নিজের স্বামীকেই মে’রে বসে আছে। এই ঘটনার পর সে আর ওই লোকটার সামনে ভুলেও যায়নি। আর এখন এই পাগলটা তাকে টেনে নিয়ে সিংহের গোহাড় ভেতরই যাচ্ছে।
-“ভার্সিটিতে ক্লাস করতে নাকি ঘোরাঘুরি করতে এসেছো?”
আলোর ভাবনার মাঝেই আধার নিজের অফিস রুম থেকে বেরিয়ে এসে তাদেরকে দেখে থেমে যায়। তারপর আলোর দিকে তাকিয়েকেই উপরোক্ত বাক্যগুলো বলে৷ আলো বিরবির করে বলল,
-“দুটোই করতে এসেছি।”
আধার গম্ভীর মুখে তাকায়। কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করল—আলোর পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। এটা দেখে কপালের মাঝে চারটে চিন্তার ভাজ পড়ল। কারণ এই মেয়েটার হাবভাব মোটেও সুবিধার লাগছে না।
-“স্যার?”
শালুক কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে মিহি কণ্ঠে ডেকে উঠল। আধার গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
-“জ্বি বলুন?”
শালুকের হাতপা হালকা কাঁপছে। সে আজ একটা ভয়ানক কাজ করতে চলেছে। এর ফল কি হবে কেহ জানে। তবুও সে আজ এই রিস্কটা নিবেই। আর কতদিন নিজের মনের না বলা কথাগুলো লুকিয়ে রাখবে? আজ সবটা বলেই দিবে। তারপর যা হবার হবে।
শালুক জোরে শ্বাস নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে একটা চিঠি সামনে ধরল। ওটা দেখে আলো নিজের কপালে থাবা মে’রে বিরবির করে বলল,
-“শালু রে শালু….আজ তুই গেলু।”
আধার কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,
-“কী এটা?”
-“চ…চিঠি।”
-“তো আমাকে দিচ্ছেন কেন? বাই এনি চান্স, আমাকে দেখে আপনার ডাকপিয়ন মনে হচ্ছে?”
শালুক ঠোঁট কামড়ে আড়চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে ইশারা করল। কিন্তু আলো এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকল যে, চোখেই কিছু দেখে না সে।
-“চিঠি দেওয়ার হলে পোস্ট অফিসে গিয়ে দিন। এইভাবে ফালতু সময় নষ্ট করার মতো টাইম নেই আমার!”
একথা বলে আধার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“এটা আপনার জন্য স্যার!”
আধার পিছনে না ফিরে সামনে ঘামটি মে’রে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর দিকে তাকায়৷ তারপর একপা একপা করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
-“মিস…কালো? আপনার বান্ধবী একজন প্রফেসরকে চিঠি দিচ্ছে। তা এটার শাস্তি কাকে দেবো?”
নিজের দিকে এইভাবে স্যারকে এগিয়ে আসতে দেখে আলো শুকনো ঢোক গিলে পিছিয়ে যেতে শুরু করল।
-“আ…আমি কিছু জানি না এই বিষয়ে স্যার।”
-“তাহলে এখানে এসেছেন কেন? তামশা দেখতে?”
আলো পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে মিশে গেল। মনে মনে ইচ্ছে মতো বান্ধবীকে বকাবকি করল। শালীর জন্য সে আবারো ফেঁসে গেল।
-“স্যার? এখানে ওর কোনো দোষ নেই। আর ও এটার বিষয়ে জানতও না।”
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“যেখান থেকে এসেছেন সেখানে উল্টো পায়ে চলে যান। আর আপনার প্রতি বিন্দুমাত্রও ইন্টারেস্ট নেই আমার। সো এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মন দিন।”
-“বাট…আই লাইক ইউ স্যার!”
-“ঠিক আছে। তবে এটার প্রমাণ দিন!”
শালুকের চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
-“বলুন কি করতে হবে, আমি সবকিছু করতে রাজি।”
আধার সামনে ফিরে আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল,
-“এখান থেকে সোজা ছাঁদে যাবেন। তারপর ওখান থেকে টুপ করে নিচে ঝাপ দিবেন। দেন ফিরে এসে প্রপোজ করুন।”
মানুষটার এহেন কথা শুনে শালুক বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ছাঁদ থেকে ঝাপ দেওয়া মানে সোজা উপরে চলে যাওয়া একই কথা। অথচ হৃদয়হীন লোকটা কত সহজে বলে দিল।
-“আপনি আমার সাথে মজা করছেন?”
-“কে হোন আপনি আমার? যে আপনার সাথে মজা করব?”
-“ছাঁদ থেকে ঝাপ দিলে ম’রে যাবো।”
-“তো যান। কে বাঁধা দিয়েছে?”
-“আপনি একটা হার্টলেস!”
শালুক দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে ওখান থেকে হনহনিয়ে চলে গেল। শ্লার প্রেমের গুষ্ঠি কিলাই সে। বান্ধবীকে চলে যেতে দেখে আলো আঁতকে উঠে বলল,
-“আরে আরে ও তো চলে যাচ্ছে। এবার যদি সত্যি সত্যিই ছাঁদ থেকে ঝাপ দেয় তখন কী হবে?”
মেয়েটার কথা শুনে কেন জানি আধারের হাসি পেল। তবে সেটা বাহিরে প্রকাশ না করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনি এত বোকা কেন মিস…কালো? নিজের মাথার সাথে চোখ দুটোও খেয়ে নিয়েছেন? আমার জানা মতে, ছাঁদের পথ উপরে, নট নিচে!”
আলো ভালো করে খেয়াল করল শালুক নিচে নেমে গেছে। এটা দেখে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। যাক, আজকের পর থেকে এমন পাগলামি করার কথা মাথাতেও নিয়ে আসবে না। মেয়েটা আজ ভালোই শিক্ষা পেয়েছে! আলো এসব ভেবে চট করে স্যারের পাশ কাটিয়ে দৌড় দিতেই আর্তনাদ করে উঠল,
-“আয়ায়া….লাগছে স্যার। ছাড়ুন, ছাড়ুন! নয়তো বদদোয়া দিবো, আপনার বউ যেন তাড়াতাড়ি টাকলু হয়ে যায়।”
-“সমস্যা নেই। নকল চুল এনে দেবো।”
আলো দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাতে নিজের চুলের বিনুনি ধরে টানাটানি করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু উল্টো সে আরো ব্যথা পাচ্ছে। শয়তান লোকটা বাম হাতে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে তার বিনুনি। আলো একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
-“এখন কী আপনার আমার চুলেও সমস্যা?”
-“চুল কেটেছো কেন?”
-“আমার চুল, আমি কাটব নাকি খাবো সেটা আমার ব্যাপার। আপনি ছাড়ুন আমার বিনুনি!”
-“আমার হাত দিয়ে কিছু ধরব নাকি ছাড়ব সেটা আমার ব্যাপার।”
আলোর ইচ্ছে করল, ছুটে গিয়ে দেয়ালের সাথে নিজের মাথা ঠুকে দিতে। এই লোকটা এমন কেন…ওহ্ গড!
-“কী চাই আপনার?”
-“নেক্টস টাইম চুল কাটবে না আর।”
-“ঠিক আছে ভাই, কাটব না আর বা ল। দরকার হলে আপনার বা ল কেটে দিবো, তবুও আমি কাটব না পাক্কা প্রমিস।”
-“ইশশশ….কী জ’ঘন্য মুখের ভাষা।”
আধার নাকমুখ কুঁচকে বিনুনি ছেড়ে দিল। স্যারের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আলো দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে পিছনে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
-“জ’ঘন্য নয়! বলুন মধু, মধু।”
বাড়িতে ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে দাদাজানের সাথে খাওয়াদাওয়া করে লম্বা একটা ঘুম দিয়েছে আলো। এক ঘুমেই দুপুর, বিকেল পার করে সন্ধ্যার দিকে ওঠে। বিছানা ছেড়ে ঘুমু ঘুমু চোখে ঢুলতে ঢুলতে ওয়াশরুমের দিকে যায়। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভরকে গেল। একহাতে দেয়ালে ভর দিয়ে মাথা নিচু করে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আধার স্যার। কোমরে শুধু ঢিলে করে রাখা তোয়ালে। যেটা যেকোনো সময় খুলে যেতে পারে! গৌড় বর্ণের সুঠাম দেহের প্রতিটা মাংসপেশির খাঁজ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মানুষটা বাম হাতে নিজের মাথার চুলগুলো উপরে তুলে দিচ্ছে।
আলো লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে মানুষটার গোসল করা দেখছে৷ এর আগেও অনেকবার লোকটাকে উদোম শরীরে দেখেছে। এমনকি ওই শরীরের মাঝে থেকেছেও৷ কিন্তু আজ কেন জানি মানুষটাকে ভীষণ অন্যরকম লাগছে! এই ক’দিনে কী লোকটার সৌন্দর্য বাড়ল নাকি সে আজকাল চোখে বেশি দেখছে?
আধার শরীর ছুঁয়ে হট শাওয়ার নেওয়ার সময় কারোর অস্তিত্ব অনুভব করল। সে তড়াক করে ঘাড় ঘুরিয়ে ডান পাশে তাকিয়ে দেখে—আলো বড়বড় চোখে তাকিয়ে আছে। আধার কপাল কুঁচকে মেয়েটার পায়ের দিকে তাকায়। নূপুর জোড়া নেই! এইজন্যই সে প্রথমে বুঝতে পারেনি মেয়েটা এখানে এসেছে। আধার ভেজা দৃষ্টি তুলে আলোর ফোলা ফোলা চেহারার দিকে তাকায়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘুম থেকে উঠেই এসেছে। আধার তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। এই নির্লজ্জ মেয়েটার জন্য এখন ওয়াশরুমের দরজা খুলে রাখাটাও রিস্কের। ভাগ্যিস তোয়ালে পরে ছিল, নয়তো আজ এক বিচ্ছু মেয়ের সামনে তার মানইজ্জতের ইন্না-লিল্লাহ হয়ে যেত।
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের আঁজলায় পানি নিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর মুখের ওপর ছুঁড়ে মা’রল। আচমকা আক্রমণে আলো হকচকিয়ে উঠে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করল। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে চেহারার পানি মুছে খেঁকিয়ে উঠল,
-“এ্যাই আপনি আমার মুখে পানি ছুড়লেন কেন?”
-“বের হও এখান থেকে…নির্লজ্জ মেয়ে!”
-“সেটা ভালো করে বললেই তো হতো। এইভাবে ভিজিয়ে দিলেন কেন?”
-“একটু ভিজিয়েছি, বেশি কথা বললে পুরোটাই ভিজিয়ে দিবো।”
-“আর আমি আপনাকে সমুদ্রের পানিতে ফেলে দেবো।”
একথা বলে আলো বেরিয়ে গেল। আধার এগিয়ে এসে ধরাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। নয়তো এই অসভ্য মেয়েটা আবারো চলে আসতে পারে।
সকাল হতেই ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকে সর্বপ্রথম চোখে পড়ল এক বাসন্তী রঙের মেলা। ঝকঝকে রোদে সবাই সেজেছে নিজের মতো করে। ছেলেদের পরনে হলুদ, কমলা রঙের পাঞ্জাবি, আর মেয়েরা কেউ গাঢ় হলুদ, কেউবা কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে। বেশিরভাগেরই মাথায় গোঁজা তাজা গাঁদা ফুলের টায়রা, কপালে বড় একটা টিপ। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ আজ নতুন রঙে সেজেছে।
রোদের তেজ থাকলেও বসন্তের দখিনা বাতাস সেই উত্তাপকে ম্লান করে দিয়ে এক অন্যরকম সতেজতা বিলিয়ে দিয়েছে।
“আহা, আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে, কত পাখি গায়…”
ফুলে সজ্জিত স্টেজে একদল মেয়ে হলুদ শাড়ি আর পায়ে নূপুর পরে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করছে। আলো, তামান্না, ফারাহ্ ভিন্ন পোজে ছবি তুলে গল্প, হাসাহাসি করছে। তাদের তিনজনের পরণে সেম ডিজাইনের সেম কাঁচা হলুদের শাড়ি। বাঙালিয়ানার মতো শাড়ি পরেছে। কারণ তারা আজ নৃত্য প্রদর্শন করবে। একসাথে চার বান্ধবীর নাচার প্ল্যান থাকলেও শালুক গতকালকের ঘটনার জন্য লজ্জায় আসেনি। মেয়েটা ওই হার্টলেস স্যারের সামনে পড়তে চায় না।
আলো হালকাপাতলা সেজেছে। লম্বা চুলে রুপাঞ্জেলের সেই ফুলের সাহায্যে বানানো বিনুনি হেয়ারস্টাইলটা। কোমরে উঁকি দিচ্ছে চমৎকার একটা কোমরবন্দী! দু’হাত ভর্তি রেশমি, গাজরা চুড়ি। সে গতবছর গান গেয়েছিল, আর এ বছর নৃত্য করবে। এটা বান্ধবীদের সাথে অনেক আগেই প্ল্যান করে রেখেছিল। সে আজ ভীষণ খুশি!
-“এই চল চল! এখন আমাদের নাম ডাকবে।”
তামান্না স্টেজের দিকে ইশারা করে বলল। সেখানে একজন রমণী গান গাইছে। সিরিয়াল অনুযায়ী এখন তাদের পালা। কিন্তু আলো আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মে’রে কাউকে একটা খুঁজছে। মানুষটা আজ সকাল সকাল ভার্সিটিতে এসেছে। ফলস্বরূপ সকালে দেখা হয়নি। এক বাড়িতে থাকলেও লোকটা কখন হুটহাট করে চলে যায় আবার আসে সেটা বুঝতে পারে না।
বান্ধবীকে কাউকে খুঁজতে দেখে ফারাহ্ কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,
-“কাকে খুঁজছিস?”
আলো চমকে উঠে সামনে তাকিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
-“না মানে নির্ঝর আর মারুফ কই? ওদের তো দেখছি না।”
-“একজন সিনিয়র ভাইদের সাথে কাজে ব্যস্ত আরেকজন নিজের গার্লফ্রেন্ডকে সময় দিতে ব্যস্ত।”
-“ওওও!”
আলো আর কিছু না বলে গুটিগুটি পায়ে বান্ধবীদের সাথে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎই কিছু একটা ভেবে পিছনে ফিরে পাঁচ তলায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ঠিক তখনই ওখান থেকে একটা মানবের ছায়া সরে গেল। আলো উঁকি দিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে স্টেজের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের নাম ডাকা হলেও অপ্রত্যাশিত ভাবে আলোকে ডাকা হলো না। শুধু ফারাহ্ ও তামান্নার নাম ম্যাম নিয়েছেন।
-“এটা কি হলো? তোর নাম কই?”
বাকিদের সাথে আলোও বেশ অবাক হলো। কারণ গতকাল ভার্সিটি থেকে ফেরার আগেই তিনজন মিলে সিনিয়রদের কাছে নিজেদের নাম লিখিয়েছিল। তাহলে এখন তার নাম হুট করে কোথায় গায়েব হয়ে গেল?
অন্যদিকে, ম্যাম বারবার তাদের দুজনকে ডাকছে। ফারাহ্, তামান্না নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কারণ এটা নিয়ে সবথেকে বেশি এক্সাইটেড আলোই ছিল। অথচ শেষে এসে কি-না মেয়েটার নামই কেটে দেওয়া হয়েছে।
-“ফারু? ম্যামকে গিয়ে বল আমরা নাচবো না।”
তামান্নার কথা শুনে আলো হাসার চেষ্টা করে বলল,
-“নাচবি না কেন? যা তোরা নাচ! নয়তো এটা খারাপ দেখাবে।”
-“কিন্তু তুই?”
-“পরের বার ইনশাআল্লাহ।”
একথা বলে আলো উল্টো ঘুরে দ্রুত পায়ে চলে গেল। তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছে না তার নাম কে সরিয়ে দিল। আর কেন-ই বা এমনটা করল?
-“উফফ….তুমি আর ভালো হলে না বেয়াদব।”
আধার দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল। আলো জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে চট করে স্যারের শার্ট ছেড়ে দিল। আধার একপলক নিজের দিকে তাকায়। মেয়েটা তার শার্টের দুটো বোতাম ছিঁড়ে ফেলেছে। সেটা খেয়াল করে আলো রিনরিনিয়ে বলল,
-“স…সরি। আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি!”
শাড়ির সাথে উঁচু জুতা পরেছিল আলো। অন্যমনস্ক হয়ে সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উপরে যাচ্ছিল। তখনই শাড়ির সাথে জুতো বেঁধে হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়ে। হাতের সামনে যা পেয়েছে ওটাকেই আঁকড়ে ধরে নিজেকে পড়া থেকে বাঁচিয়েছে। নয়তো আজ তার সুন্দর থোবড়াটা বিগড়ে যেত।
-“চোখ থাকতেও যদি কানার মতো চলাফেরা করো তাহলে ওটাকে দান করে দাও। অন্য কারোর কাজে আসবে!”
-“আমি না-হয় কানা! কিন্তু আপনি? আপনি তো চোখে বেশি দেখেন! তাহলে এইভাবে মাঝপথে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?”
-“আমি কোথায় দাঁড়িয়ে থাকব নাকি শুয়ে থাকব, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার।”
-“সামান্য দুটো বোতামই তো ছিঁড়েছে। পুরো শার্ট তো আর ছিঁড়ে ফেলিনি। আপনি এমন করেছেন কেন? বাড়িতে ফিরে ছিলাই করে দেবো। তবুও আমার মাথা খেয়েন না। এমনিতেই মন ভালো নেই!”
আধার প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কেন? ছ্যাকা খেয়েছো?”
-“ছ্যাকা খেলেও হয়তো এত খারাপ লাগত না, যতটা এখন লাগছে। জানেন স্যার? আমি না আজ বান্ধবীদের সাথে বসন্তের লাগে নাচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোন খচ্চর ব্যক্তি আমার নাম কেটে দিয়েছে।”
-“সো স্যাড! বাট…যা হয় ভালোর জন্যই হয়।”
-“মানে? কী বলতে চাচ্ছেন?”
-“এটাই যে, ওমন বাঁদরের মতো লাফালাফি করে শুধু শুধু নিজেকে সবার সামনে হাসির পাত্রী বানাতে।”
মূহুর্তেই আলো ভীষণ রেগে গেল। সে তেড়ে এসে দু’হাতে শার্টের কলার খামচে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে আওরাল,
-“আমি যদি বাঁদর হই তাহলে আপনি….আপনি একটা আস্ত জলহস্তী!”
আধার মেয়েটার মুখের সামনে ঝুঁকল। তীক্ষ্ণ চোখে পুরো চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে একসময় তার নজর গিয়ে আঁটকায়—ঠোঁটের বাম দিকে নিচে থাকা ছোট্ট কালো কুচকুচে তিলটার ওপর। ওখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বিরবির করল,
-“আর এই আস্ত জলহস্তীই আপনার স্বামী!”
আলোর দৃষ্টি শীতল হয়। খেয়াল করল তারা অজান্তেই একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এতটাই কাছাকাছি যে মানুষটার গরম নিঃশ্বাস তার চেহারার ওপর আছড়ে পড়ছে। মূহুর্তেই আলো হাসফাস করে উঠল। তড়িঘড়ি করে শার্টের কলার ছেড়ে দিয়ে পিছনে পা রাখতেই চমকে উঠল। সে তো ভুলেই গেছে তারা এখন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। ফলস্বরূপ সে নিজের ব্যালেন্স হারিয়ে চিৎ হয়ে পিছনে পড়তে যাবে তারআগেই আধার খপ করে মেয়েটার হাতের কব্জি চেপে ধরল।
মেয়েটার অর্ধেক শরীর পিছনের দিকে হেলে আছে। বুকের ওঠানামার গতি অস্বাভাবিক! ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বারবার শুকনো ঢোক গিলছে। এখান থেকে পড়লে নির্ঘাত হাসপাতালে পৌঁছে যাবে। সে স্যারের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করল,
-“প…প্লিজ স্যার হাত ছাড়বেন না। নয়তো হাসপাতালে পৌঁছে যাবো!”
আধার ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“অকারণে শার্টের বোতাম ছিঁড়েছো। এটার শাস্তিস্বরূপ হাতটা ছেড়ে দেই?”
-“নাআআআ….এমনটা করবেন না। দরকার হলে আমার শাড়ি, চুল যা ইচ্ছে হয় ছিঁড়ুন। তবুও হাত ছাড়বেন না। নয়তো…নয়তো আমি পুলিশের কাছে গিয়ে বলব আপনি ইচ্ছে করে ধাক্কা মে’রেছেন আমায়।”
-“ঠিক আছে। আমিও দেখব, তোমার কোন পুলিশ এসে আমাকে এরেস্ট করে!”
একথা শুনে আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সামান্য কিছু কারণের জন্য এইভাবে তাকে ছেড়ে দিবে? একটুও কী হাত কাঁপবে না লোকটার? এতটা নিষ্ঠুর হৃদয়ের কেউ হতে পারে? উমম…পারে তো। এই যে প্রমাণ তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আলো অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৮
-“আমাকে ফেলে দিয়ে যদি আপনার শান্তি লাগে, তাহলে দিন। কোনো অভিযোগ করব না!”
তার বলতে দেরি হলেও হাত ধরে হ্যাচকা টান মে’রে নিজের উত্তপ্ত বুকের ওপর ফেলতে একটুও দেরি হলো না আধারের। আলো ভয় পেয়ে দু’হাতে শার্ট খামচে ধরে বুকের মাঝে নুয়ে পড়ল। সে তো এক মূহুর্তের জন্য ধরেই নিয়েছিল, লোকটা তাকে ফেলে দিবে। কিন্তু এখন তার সব ভুল ধারণা ভেঙে গেল। একই সাথে শুনতে পেল—
-“ছাড়তেই যদি হতো, তাহলে আপনাকে আঁকড়ে ধরতাম না, মিস….কালো!”

Protidin episode diben plz.
Next part plz
plz next part
Next episode kokhon diben?