Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৪৫

সে খলনায়ক পর্ব ৪৫

সে খলনায়ক পর্ব ৪৫
ফারহানা সানিয়াত

প্রাণপ্রিয়ার আসার খবর সারার কানে যেতেই সবার মাঝ থেকে উঠে দুজন সার্ভেন্ট মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাহিরে যাওয়ার জন্য সদর দরজার দিকে হাটা ধরে।
তার ঠোঁটে কোণে বাঁকা হাসি, হাঁটার ভঙ্গিতে অত্যাধিক রুক্ষতা প্রকাশ পাচ্ছে। সদর দরজা দিয়ে সারা বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামার মাঝে দুজন সার্ভেন্ট মেয়েদের থেকে একজনকে তার ঘর থেকে বাধাই করা ছবির বক্স নিয়ে আসার আদেশ দেয়। তার আদেশ পেয়ে মেয়েটি ঘুরে সদর দরজা দিকে ছুটে।
গার্ডেন সাদা গোলাপ বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রানপ্রিয়া। তার পড়নে কালো রঙের সোয়েটারের সাথে কালো স্কার্ট, চুলগুলো বেনী করে একপাশে রাখা। সামনের কিছু চুল শীতল বাতাসে উড়ছে। তার দৃষ্টি বাগানের সতেজ গোলাপ ফুল গুলো দিকে। মাঝে মাঝে গভীর নিশ্বাস ফেলছে। আচ্ছা সে কি ভাবছে? তার কি ভাবার মধ্যে কিছু আছে? না না তার ভাবতে ভয় লাগে আজকাল তার ভাবনায় শুধু যন্ত্রণাদায়ক জঘন্য স্পর্শ গুলো ঘুরে যা সে চায় প্রতিবার গোসলের সাথে ধুয়ে মুছে একদম স্মৃতি থেকে চলে যাক।
হিলের জুতোর ঠকঠক শব্দের সাথে হেঁটে সারা প্রানপ্রিয়ার কাছে এসে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়ায়। তার পেছনে সার্ভেন্ট মেয়েটি খকখক করে ওঠে তাদের উপস্থিতি জানানোর জন্য।
কিন্তু প্রানপ্রিয়া শূন্য দৃষ্টিতে বাগানের দিকে তাকিয়ে। তার সামনে যে সারা এসে দাঁড়িয়েছে তার তাল নেই । সারা ভ্র যুগোল কুঁচকে হালকা ঘাড় কাত করে হাত বাড়িয়ে তার মুখের সামনে টুরি বাজায়, সঙ্গে সঙ্গে প্রানপ্রিয়া চমকে ওঠে ।

__ ভাবনার গভীরতা কি এতটাই, আমি দাঁড়িয়ে আছি তুমি বুঝতেও পারছো না।
প্রানপ্রিয়া অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সারাকে এক নজর দেখে।
__ দু,,,দুঃখিত আপু। সে দৃষ্টি নত করে ।
সারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখে অতঃপর চোখ ঘুরিয়ে তাকে পাশ কেটে যেতে যেতে বলে,
__ আমার সঙ্গে এসো।
ম্যানশনে আত্মীয়-স্বজন ভরপুর এতো মানুষদের সামনে প্রানপ্রিয়াকে নিয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই সারার । তার চেয়েও বড় কথা দামিয়ান আছে আর তার সামনে তো কোনভাবে ই না। সারা হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁট বাকিয়ে হাসে আপাতত সে গেস্ট হাউজের দিকে যাচ্ছে। এই দিকটায় এখন কেউ আসবে না দামিয়ান ও না কারন সে তার কাজিনদের সাথে ব্যস্ত।
প্রানপ্রিয়ার‌ ভেতর অশান্তি অস্বস্তি মিলে একাকার। সারা তাকে কেনো গেস্ট হাউসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? মনের ভেতর প্রশ্ন কিলবিল করছে। তার পা আগে বাড়ছে না, কেমন গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বার বার। আচ্ছা সারা কি জানে তার বাগদত্তা র সাথে তার কেমন সম্পর্ক? আচ্ছা যদি জানে? নাকি সে ইতিমধ্যে জেনে গেছে। কি হবে? কি হবে? তাকে কি এর জন্যই ডেকেছে? নানান প্রশ্নে প্রানপ্রিয়ার ভেতর ছটফট করে উঠছে । সে আরো একবার, আরো একবার, ওই নিষ্ঠুর লোকের প্রতি চরম পর্যায় ঘৃণায় শরীর জ্বলে উঠে। জীবনে তাকে এমন দিনের‌ মুখোমুখি ও হতে হবে তার জন্য,

গেস্ট হাউসের সদর দরজা দিয়ে সারা ভেতরে প্রবেশ করেসোজা বসার ঘরে দামিয়ানের বসার সিঙ্গেল সোফায় গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে। তার সাথে আসা সার্ভেন্ট মেয়েটি তার পিছনে এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রানপ্রিয়া ধীর গতিতে এসে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে থেমে যায়। সব সময় মত দুই হাত সামনে বেঁধে রাখা এবং দৃষ্টি নত।
সারা প্রানপ্রিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে কিঞ্চিৎ হাসে।
__ একটু বেশি ব্যস্ততার মধ্যে হয়তো দিনকাল কাটছে তাই না?
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে কয়েকবার চোখের পলক ফেলে।সারা সোফায় গা এলিয়ে মাথা দুলায়।
__ হুমমম বেশি ব্যস্ততার কারণেই তোমাকে আর দেখা যায়।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা টানে
__ আ,,,আসলে আমার আন্টি হাসপাতালে ভর্তি,
স্কুল এসব নিয়ে একটু ব্যস্ত।
__ ওহহহ! আমি তো অন্য কিছু ভাবছিলাম। তো তোমার আন্টি কেমন আছে? শুনেছি দামিয়ান নাকি সব খরচে বহন করছে?
প্রানপ্রিয়া গভীর শ্বাস ফেলার সাথে ওপর নিচ নিজ মাথা নাড়ায়।
সারার চোখ আগে থেকে আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।, তার ভাবনাতে শুধু সন্দেহ এর থেকে বেশি কিছু না তাই সরাসরি জিজ্ঞেস করছে না।

__ এটা কি অদ্ভুত নয়, দামিয়ান আবরারের মতো একজন পুরুষের এতো দরদ। আমি যতটুক জানি সে নিজের লাভ ছাড়া সাহায্য করে না সেটা ছোট লোকদের জন্যই হোক না কেনো ।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে অপমানে দৃষ্টি তার আরো নত হয়ে যায়। হ্যাঁ এটা ঠিক যে সারা তাকে সব সময় অপমান করে। কিন্তু আজ, আজ সে অপমান হওয়ার যোগ্য সেটা কোন কারনে ‌বাধ্য হয়ে হোক বা আর যাই।
সারা বসা থেকে উঠে ধীর পায়ে প্রানপ্রিয়া দু কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায়।
__ এভাবে নিচের দিকে চেয়ে আছো কেনো? আমার দিকে তাকাও। কিছুটা ভারি কণ্ঠে বলল,
প্রাণপ্রিয়া উপর দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে তার দিকে তাকায়। সারার ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে প্রানপ্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

__ নজর লুকায় তারা যারা কিছু গোপন করে বা অপরাধবোধ থাকে। অবশ্যই তোমার আর আমার মধ্যে এমন কিছু থাকা বা হওয়ার মতো কিছু নেই। তাই না?
প্রানপ্রিয়ার ভেতরটা চেপে ধরে তবুও হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। কিন্তু মনে মনে নিজের উপর তার ছি ছি। সে দ্বিতীয় নারী, হ্যাঁ সে দ্বিতীয় নারী তাদের সম্পর্কে পিঠ পিছে থাকা দ্বিতীয় নারী। তার বাগদত্তা হালাল করা ভোগ করার পাত্রী । এত বড় গোপন, এত বড় অপরাধবোধ নজর মিলাতে কতটা কষ্ট হচ্ছে কাকে বোঝাবে। কিন্তু কিছু করার নেই সে পারবে না মুখ খুলতে কোনভাবেই না।
সারার তার মাথা থেকে হাত সরিয়ে হালকা ঘুরে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে সার্ভেন্টি কে তার জন্য পানি নিয়ে আসতে বলে।
অতঃপর ফের প্রাণপ্রিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেলে।

__ যাইহোক তোমাকে এখানে আসার ,,,,
বাকি কথা বলা আগেই সার্ভেন্ট বাধাই করা ছবির বক্স তাদের সামনে টেবিলের ওপর রাখে।
আহ কারণ চলে এসেছে। সারা ঠোঁটে হাসি নিয়ে বক্স থেকে একটা ছবি বের করে।
দেয়ালের টানাবো ছবিগুলো, আমার আর দামিয়ানের এনগেজমেন্টের ছবি। তুমি তো জানো তোমার কাজ আমার কতটা পছন্দ।
প্রানপ্রিয়া বক্সের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে। নিজেকে তার আরো, আরো বেশি নিচু মনে হচ্ছে।
__ তো শুরু কর, এই পাশে দেয়ালে ই সব টানাবে। খেয়াল রেখো আমার যাতে পছন্দ হয়। বলেই সারা হাতের ছবিটা প্রাণপ্রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
প্রাণপ্রিয়া হা‌ করে শ্বাস ফেলে ছবিগুলোর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। অতঃপর বাড়িয়ে দেওয়া ছবি নেওয়ার জন্য কম্পিত হাত বাড়ায় । তখনই হঠাৎ সারার চোখ পড়ে তার হাতের দিকে, না না হাত না হাতের অনামিকা আঙ্গুলের দিকে যেখানে ডায়মন্ডের আংটি চকচক করছে।
সারা ভ্র যুগোল কুচকে আচমকা তার হাত শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করে ওঠে,,
__ কে দিয়েছে তোমাকে? তার রুক্ষ কন্ঠে,
প্রানপ্রিয়া দৃষ্টি নত করে। হাতের কম্পন আগে থেকে দ্বিগুণ,
সারার চোখে মুখের রং বদলে যাচ্ছে। ডায়মন্ড চিনতে তার ভুল নেই সচরাচর সে ডায়মন্ড ব্যবহার করতে পছন্দ করে।

__ কে দিয়েছে তোমাকে এই ডায়মন্ডের আংটি? তার কণ্ঠস্বর রুক্ষ থেকে রুক্ষ প্রাণপ্রিয়ার নরম হাতে তার নখ ঢুকে যাওয়ার উপক্রম।
প্রাণপ্রিয়া ছটফট করে উঠে, ব্যথায় হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।
__ তোমার মত একটা মেয়ের এই আংটি কেনার সামর্থ্য নেই জানা আছে। ডক্টরের ছেলে ইভানের কথাও বলা যাবে না তাহলে কে দিয়েছে।
সারা প্রাণপ্রিয়ার দিকে ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকায়।
প্রানপ্রিয়ার চোখের জল এসে পড়েছে,
__ আমার ব্যাথা লাগছে সারা আপু ছেড়ে দিন দয়া করে।
__ ছেড়ে দেব, আমি ছেড়ে দেব কিন্তু আগে এটা বলো কাকে নিজের শরীর দিয়ে এই আংটি পেয়েছ।
সারার হাত আরও শক্ত হয়।
প্রানপ্রিয়া আরেক হাত দিয়ে মুখ চেপে কেঁদে ওঠে।
সারার শরীর জ্বলে যায়। চিৎকার দিয়ে বলা শুরু করে,,
__ বলতে পারবি না তাই না তোর বা***** কে। এতটা সিক্রেট রাখতে হচ্ছে ব্য*** বাজারো‌ মেয়ে কোথাকার বলেই সারা প্রাণপ্রিয়াকে ধাক্কা মেরে বসে।সে সময় পিছন দিক থেকে সার্ভেন্ট মেয়ে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে আসছিল। ধাক্কার ফলে প্রাণপ্রিয়া তাঁর উপরে গিয়ে পড়ে । ফলস্বরূপ কাচের পানির গ্লাস নিচে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ। সার্ভেন্ট মেয়েটি নিজেকে সামনে নেয়। তবে প্রাণপ্রিয়া তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতেই কাচের টুকরো তার হাতে ঢুকে ফ্লোরে পড়া পানির সাথে তার রক্ত মিশে একাকার।
প্রাণপ্রিয়া ব্যথাতুর কান্না মাখা কন্ঠে, আহ শব্দ করে উঠে।
সারা হাত মুষ্টিবন্ধ করে রাগে ফসফস করছে। তার জানতে হবে আংটি দেওয়ার মালিক কে কোন বা*** কে রূপ দেখিয়ে শরীর দিয়ে পেয়েছে। সে তার দিকে পা বাড়ায় আরো কিছু বলার জন্য, তৎক্ষণাৎ পুরুষালী ভারি কণ্ঠ,

__ what’s going on here?
আকম্মিক কন্ঠস্বরে সারা কিছুটা চমকে ওঠে তবে মনে মনে। উপস্থিত মেয়ে সার্ভেন্ট দুটি জোড়ো সোড়ো হয়ে দৃষ্টি নত করে ফেলে।
প্রানপ্রিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে রক্তে ভেজা হাত দুটি ঘুরিয়ে দেখতেই আতকে ওঠে।, কাঁচের টুকরো বিঁধে দু হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে ।
__ আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি সারা। তার উচ্চ হুংকার কন্ঠ।
উপস্থিতি সবাই কেঁপে ওঠে। সারা প্রাণপ্রিয়া দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকায়।
দামিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তার শক্ত তীব্র দৃষ্টি প্রানপ্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ। পাশে আহানাফ হতাশ চোখে তার দিকে চেয়ে।
__ তোমার সাহস কি করে হলো তুমি আশ্রম থেকে মেয়ে এনে তাদের সাথে এরূপ আচরণ করার।
সারা নিজের রাগ সংযত করার জন্য চোখ বন্ধ করে বড় নিঃশ্বাস ফেলে ফের খুলে।
__ এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে কাজের জন্য এনেছি ওকে।
দামিয়ান সারার দিকে দৃষ্টি ফেলে। জঙ্গলে কাজিনদের সাথে আজ পাখি শিকার করতে যাওয়ার জন্য বন্দুক নিতে এসেছিল । এটা অবশ্য বাহানা, তার কানে খবর পৌঁছে গিয়েছিল প্রানপ্রিয়া আর সারা গেস্ট হাউসে।
__ কাজের জন্য? তুমি এই সাহসী বা কোথা থেকে পেয়েছো আশ্রম থেকে মেয়ে এনে তুমি কাজ করাবে। তোমার জন্য কি সার্ভেন্ট বরাদ্দ করা হয়নি। তার উচ্চস্বর।
সারা দৃষ্টি নত করে, তার শরীর কাঁপছে রাগে স্পষ্ট এই মেয়ের জন্য তার দরদ।
দামিয়ান সারার দিকে পা বাড়ায়, অবশ্যই বাবা তোমাকে এর পারমিশন দেয়নি বা আমি দেইনি। নিজের সীমা হয়তো ভুলে যাচ্ছ তাই না।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আহনাফ পরিস্থিতি বেগদিকে যাওয়ার আভাস পাচ্ছে।
দামিয়ান সারার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আবরার কিন্তু এখনো হও নি সারা হয়তো হওয়ার ইচ্ছাও নেই।
সারা কথাটা শোনা মাত্রই জ্বলন্ত চোখে দামিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

__ তুমি এটা বলতে পারো না দামিয়ান।
__ চোখ নিচে, একদম সাহস টেনে ছিড়ে ফেলবো আর কখনো আমার দিকে এভাবে তাকালে আর আমি কি বলতে পারি, কি করতে পারি তোমার কোনো ধরনা ও নেই।
সারা অপমানের চোখ নামিয়ে নেয়।
__ মাফ চাও,
সারা বিস্ময়ের সাথে দাঁতে দাঁত চাপে।
__ আমি মাফ চাইতে বলেছি। বারবার এক কথা বলা আমার পছন্দ না সারা ।
সারা ঠোঁট কামড়ে ধরে, তাদের আশ্রমের আশ্রিতার জন্য যে এই দরদ না সারার বুঝতে বাকি নেই। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। এক নজর আহানাফের হতাশ মুখের দিকে তাকায় অতঃপর ধীর কন্ঠে বলে,
__ I am really sorry pran Priya,

কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না, হনহন করে গেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে যায়। তার পিছনে আহানাফ ছুটে,সার্ভেন্ট মেয়ে দুটো ও মাথা নত করে দ্রুত পায়ে চলে যায়।
প্রানপ্রিয়া এখনো স্থির হয়ে নিচে বসা। তার দৃষ্টি তার হাতের দিকে, রক্তে মাখামাখি ভয়ংকর অবস্থা হাত।
দামিয়ান তার দিকে তাকায় মুখে আগের থেকে অত্যধিক গম্ভীরতা। সে এগিয়ে যায় তার দিকে অতঃপর শক্ত হাতে বাহু চেপে টেনে দাঁড় করিয়ে কয়েক কদম হেঁটে তাকে সোফায় বসায় এবং পাশে নিজে ও বসে।
প্রানপ্রিয়া কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। তার চোখ দিয়ে জল পড়তে পড়তে এখন আর জল বের হচ্ছে না। তবে কানে সারা বলা ব্য***** আর বাজানো মেয়ে কথা দুটো খুব বাজছে।
দামিয়ান তার হাত টেনে নিজের কাছে এনে নির্দয়ের মত কাঁচ গুলো বের করতে করতে বলে,,
__ ব্যাথা হলেও কিছু করার নেই সহ্য করো।
__ হচ্ছে না ব্যাথা আমার। সঙ্গে সঙ্গে তার জবাব তবে খুব ধীর কণ্ঠস্বরে।
দামিয়ান তার মুখের দিকে তাকায়। ফ্যাকাসে মুখখানা কেমন একদম শুকিয়ে গেছে। যা দেখে সে বিরক্ত হয়, ইচ্ছে করে কাঁচ খুব জোরে টান মেরে বের করে।
প্রানপ্রিয়া হাসে, এই অল্প ব্যথায় আমার কিছু হচ্ছে না। যত ব্যথা, যন্ত্রণা, ক্ষত সব আগে দিয়ে ফেলেছেন ওইগুলোর সামনে এগুলো কিছু না।

__ এখনো কি অনুভব করছো সেই যন্ত্রণা, ব্যথা ক্ষতগুলো। সে প্রশ্ন করে।
প্রানপ্রিয়া মাথা নাড়ায়, হু প্রতি মুহূর্ত করি।
__ তারমানে যন্ত্রণার সাথে তুমি প্রতি মুহুর্ত আমাকে ও অনুভব করো। দামিয়ান ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলে ।
প্রানপ্রিয়া চোখ মুখ শক্ত করে তার দিকে তাকায়। হ্যাঁ করি অনুভব করি আমি আপনাকে না হলে ঘৃণার পাল্লা ভারি হবে কিভাবে।এই যে এখনো আমি আপনাকে অনুভব করছি মস্তিষ্কে বারবার জানান দিচ্ছে দেখ ব্য***** আরেকজনের বাগদত্তা,,, বাকি কথাগুলো শেষ করতে পারে না প্রানপ্রিয়া।
দামিয়ান তার গাল চিপে ধরেছে,
__ কথা ঠিকঠাক ভাবে বলো প্রানপ্রিয়া, না হলে
যন্ত্রণা কত রকম হতে পারে বুঝাতে কিন্তু সময় নিব না । বলেই তার গাল ছেড়ে দেয়। এক প্রকার ছুড়ে ফেলার মত।
প্রানপ্রিয়া এখনো তার দিকে শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকম্মিক তার রক্তমাখা হাত দিয়ে দামিয়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে।
__ তুই জানোয়ার, তুই একটা অমানুষ, তোর মধ্যে কোনো হৃদয় নেই। তুই আমাকে কোন জায়গায় দাঁড় করিয়েছিস মরে যেতে ইচ্ছা করছে আমার। এই জীবন আমার চাই না, চাই না আমার এই জীবনে মরে যাব আমি, মরে যাব।

দরজা লাগিয়ে নিজের ঘরে বসে আছে সারা। তার চোখে মুখে রক্তিম ভাব তার ভিতরে অবস্থা বোঝা যাচ্ছে। প্রথম থেকে সে যা হালকাতে নিয়েছিল সেটাই সত্যি হলো। দামিয়ান কিভাবে পারল তার সাথে এমনটা করতে। তাদের দুজনের বিয়ে ঠিক হয়ে থাকা অবস্থায় ওই মেয়ের সাথে শুধু সম্পর্ক না শারীরিক সম্পর্কের লিপ্ত হয়েছে।তার কাছে দু’জনকে নিয়ে কোনো প্রমাণ না থাকলেও সে ভাল করে বুঝতে পারছে তার পিঠ পিছে কি হচ্ছে। তার মনে আছে সে একবার ভেবেছিল দামিয়ান অন্য কোন মেয়ের সাথে থেকে আসলে তাহলে সে কি করবে? হ্যাঁ সে কি করবে এখন? এটা ঠিক তার অন্য কোন মেয়ে হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু প্রাণপ্রিয়া কখনই মারবে না, কখনোই না আর ওই মেয়ের প্রতি তার এত দরদ। সারা দু হাত দিয়ে নিজের চুল টেনে ধরে। । কি করবে সে ?এত কাছাকাছি দরদ যে তার এই‌ বাড়ির বৌ হওয়া থেকে আটকে যাবে।, কিভাবে মানবে এটা? ওই এতিম ছোটলোক মেয়ের সৌন্দর্য তাকে হারিয়ে দিবে। চিৎকার দিয়ে উঠে সারা, সাউন্ড প্রুভ ঘর বলে চিৎকারের শব্দ বাহির পর্যন্ত যেতে পারে না। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। ছাড়বে না ওই মেয়েকে কখনোই সে ছাড়বে না। চুল ছেড়ে দ্রুত হাতে সে বিছানা থেকে ফোন নিয়ে মেসেজ অপশনে কিছু একটা টাইপিং করা শুরু করে।
আহানাফ দরজার বাহির থেকে কিছুক্ষণ পরপর নক দিচ্ছে বারবার ফোন করছে। টেনশন হচ্ছে তার, বাড়ির কাউকে বলতেও পারছে না দেখা যাবে পরিস্থিতি অন্য পর্যায়ে চলে যাবে। আহানাফ সামনের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে পায়েচালী করা শুরু করে।
খানিকক্ষণ পর,

__ তোমাকে তোমার মম নিচে ডাকছে আহানাফ।
আকম্মিক মিসেস চৌধুরীর কণ্ঠ। আহানাফ কিছুটা চমকে তাকায়।
হালকা বেগুনি রঙের শাড়ি পড়া তার মার বয়সী মহিলাটি মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে।
__ কি হলো যাও ,
আহানাফ এক হাত দিয়ে তার মুখটা ঘষে মাথা নাড়ায়।
মিসেস চৌধুরী তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে দরজার কাছে গিয়ে কয়েকবার নক করতে ই সারা দরজা খুলে।
এই দৃশ্য দেখে আহানাফ কপাল কুঁচকে ফেলে, এতক্ষণ ধরে সে নক করছে ফোন করছে টেনশন করছে সারার কাছে কোনো মূল্য ই ছিল না।
মিসেস চৌধুরী ঘরে প্রবেশ করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিছানায় গিয়ে বসে ঘরের আশে পাশে দেখে। সাজানো পরিপাটি ঘর পুরো তছনছ করে ফেলেছে সারা। সে বিরক্তির শ্বাস।
সারা তার সামনে দাঁড়িয়ে অশান্তিতে ছটফট করছে।

__ সমস্যা কি তোমার এত রিয়েক্ট করছ কেন? বাসায় যে মেহমান আছে সেটা কি ভুলে গেছো? আর মেসেজে এত বড় রচনা লেখার কি আছে। তার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ভাব।
সারা চিৎকার দিয়ে ওঠে,, আমার ভেতর জ্বলে যাচ্ছে মম। কেনো আমার দামিয়ানের সাথে বিয়ে ঠিক করলে সেটা বলো? আমি তো সহ্য হচ্ছে না আমি ওই অনাথ মেয়েকে কিভাবে মানবো।
মিসেস চৌধুরী বসা থেকে উঠে ঠাস করে সারার গালে চড় বসিয়ে দেয়।
__ সেট আপ ইডিয়েট মেয়ে কোথাকার। এসব ফালতু বিষয় নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি ভাঙচুর সিরিয়াসলি। মাথা কি ঠান্ডা রাখা যায় না।
সারা গালে হাত দিয়ে চোখ বুজে রুক্ষ নিশ্বাস ফেলে।
মিসেস চৌধুরী নিজেকে শান্ত করে সারার কাঁধে হাত রাখে।
__ তোমার জেদের কারণ সব বরবাদ হয়ে যাবে সারা ।দামিয়ান কেমন তুমি কি জানো না। আর কি হয়েছে ছেলেমানুষ হতেই পারে এমন তার জন্য তো বিয়ে ভেঙে যায়নি ।
__ তো তুমি কি বলতে চাইছো সে ওই মেয়ের সাথে
ফুর্তি করবে আর আমি সহ্য করি।

__ আরেকবার চড় খেতে না চাইলে মুখ বন্ধ রাখো সারা। আমি কি একবার ঐ কথা বলেছি। নিজেকে স্বাভাবিক রাখো এটাতেই মঙ্গল স্বাভাবিক থেকেও অনেক কিছু করা যায়। ভুলে যেওনা দামিয়ান দুদিন পর রাশিয়া যাচ্ছে।
সারা কপাল কুঁচকে তার মমের দিকে তাকায়। মিসেস চৌধুরী মেয়ের যে গালে চড় মেরেছিল সে গালে হাত রাখে।
___ এই বাড়ির বউ হতে হবে সারা ।বৌদের সব ব্যাপারে এত তেজ থাকতে হয় না। নিজেকে এত বড় ভাবতে হয় না যেনো সব সে একাই সামলে ফেলবে। কিছু জিনিস দূরে রাখার জন্য, জায়গা ঠিক রাখার জন্য বড়দের সহায় হতে হয় বুঝতে পেরেছ আমার সোনা।

দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে কাটিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে হলেও প্রানপ্রিয়া সেলিনা আন্টির সাথে হাসপাতালে দেখা করতে ভুলে না। আজ ও তাই, সেই দুপুরবেলা এসেছে সে কিছুক্ষণ পর মাগরিবের আজান দিবে। সেলিনা শরীর আগের থেকে অনেকটা সুস্থ। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন। এবং আগের মত কথায় কথায় হাসেন, রাগ করেন, শাসন করেন, আর প্রাণপ্রিয় দুচোখ ভরে এসব দেখে। এর জন্যই তো এখানে এসে পড়ে থাকে । নিজ ঘরের শান্তি যেন এখানে খুঁজে পায়। সেলিনার এক হাত ব্যান্ডেজ করা পায়ে, ব্যান্ডেজ করা মাথায় ব্যান্ডেজ করা যে হাত ভালো আছে প্রাণপ্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
__ দিন দিন এমন শুকিয়ে গেছো কেনো‌? চোখের নিচে কালি পড়েছে রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে দুর্বল লাগছে। তুমি কি অসুস্থ? আর হাতে ব্যান্ডেজ কেনো?
এই প্রশ্ন সেলিনা দুদিনই প্রাণপ্রিয়াকে করছেন। প্রাণপ্রিয় জবাবে শুধু হাসে আজও হাসছে। মাঝে মাঝে একটা হাসি সবকিছুর জবাবের জন্য যথেষ্ট যে যেটা ভেবে নিতে পারে।
সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে। ছোট্ট মেয়েটা কে এখনো আর ছোট্ট মনে হয় না। বয়সের তুলনায় বড় বড় ভাব ধরে থাকে। তিনি কিছুটা বিরক্ত হন।
__ বয়সে তুলনায় যারা বড় সেজে থাকে তাদের পাকা বলে প্রিয়া । এমন স্বভাবের মেয়ে আমার পছন্দ না।
প্রানপ্রিয়া আবারো হাসে,

__ মাঝে মাঝে পাকা হতে হয় আন্টি না হলে দিন দুনিয়া বুঝবো কি করে। এতিমদের দিন দুনিয়া বুঝতে হয় না হলে জীবন কঠিন হয়ে পড়ে।
সেলিনা হা করে শ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ায়,
__ আমার নরম সরম মেয়েটা শক্ত হয়ে গেছে খুব।
__ পরিস্থিতি বানাচ্ছে ,শক্ত হচ্ছি, বুকে পাথর জমাচ্ছি না হলে মানুষ সুযোগে পা রেখে যায় এতটা নির্মম রাখে যে না তাদের খোদা মনে থাকে না মনুষ্যত্ব। কথাটা বলতে বলতে প্রানপ্রিয়া চোখমুখ শক্ত করে হয়ে ওঠে।
সেলিনা আর কিছু বলে না।
প্রাণপ্রিয়া বসা থেকে ওঠে ঠোটে মলিন হাসি টেনে বলে,
__ আজ তাহলে উঠি আজান দিয়ে দিবে । বাহিরে কিছু
কাজ আছে শেষ করে আবার আশ্রমে আবার ফিরতে হবে।
সেলিনা মাথা নাড়ান। প্রানপ্রিয়া ঠোঁটের হাসি চওড়া করে ঘুরে হাঁটা ধরে।

সে খলনায়ক পর্ব ৪৪ (২)

ব্যস্ত সময় দিন কেটে যেতে যেন সময় নেয় না। কিভাবে যেন সারাদিন কেটে যায়। এই যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে পড়েছে ধরণীতে। কিছুক্ষণের মধ্যে মাগরিবের আযান দিবে আর আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে পড়বে।
প্রানপ্রিয়া হাসপাতালের বাহিরে গেটের সামনে দাঁড়ায়। প্রাইভেট হাসপাতাল শহরের দিকে বলে আশেপাশে মানুষদের গমগম পরিবেশ লাইটের আলোয় আলোকিত চারপাশ। গাড়ি হর্নের শব্দ সাথে মানুষদের চেঁচামেচি। প্রানপ্রিয়া গভীর শ্বাস ফেলে তৎক্ষণাৎ তার সামনে কালো রঙের একটা গাড়ি এসে থামতে ই সে
কোন রকম কথা ছাড়া সে গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসে।

সে খলনায়ক পর্ব ৪৫ (২)