সে খলনায়ক পর্ব ৪৪ (২)
ফারহানা সানিয়াত
বিকেল সময়। জানালা দিয়ে উত্তরের হিম বাতাস ঘরের ভেতর ঢুকেছে। এতে প্রানপ্রিয়ার শরীরে মৃদু কম্পন এখনো সে এলোমেলো অবস্থায় ফ্লোরে সোয়া। সে পলকহীন দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে যেন জীবন্ত লাশ প্রান আছে তবুও নেই। পাশে দামিয়ান চোখ বুজে তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তার উষ্ণ শরীর তার কম্পন টের পাচ্ছে।
__ বিছানায় চলো লিটল বার্ড।সে ভারী কন্ঠে বলল,
প্রানপ্রিয়া নির্বিকার। নড়াচড়া করছে না, মাঝে মাঝে শুধু গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। হয়তো জীবনের ওপর তার বিতৃষ্ণা চলেছে এসেছে। কোনভাবে দমটা আটকে গেলে এই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেত তার আগে হয়তো নয়।
দামিয়ান প্রাণপ্রিয়াকে চুপ থাকতে দেখে চোখ খুলে তাকায়। অনেকটা সময় ধরে তারা ফ্লোরে শুয়ে আছে। প্রানপ্রিয়ার শরীর ও ঠান্ডা হয়ে পড়ছে। সে সোয়া থেকে উঠে কোনো কথা ছাড়া তাকে কোলে তোলে বিছানায় দিকে এগোয়। প্রানপ্রিয়ার দু চোখে জল টলমল করছে তবুও আটকে রেখেছে, একদম প্রতিক্রিয়াহীন। অবশ্যই যার কিছু করার নেই তার কিছু করেও লাভ নেই। সে মানে, মানতে হবে।
দামিয়ান প্রানপ্রিয়াকে বিছানার কাছে নিয়ে গিয়ে তাকে শুইয়ে দেয়। তার পড়নে শুধু প্যান্ট গায়ে কিছু নেই। প্রাণপ্রিয়াকে এভাবে চুপচাপ প্রতিক্রিয়া হীন দেখে সেও পাশে বসে। কিছুক্ষণ সরু দৃষ্টিতে তাকে দেখে, অতঃপর ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে।
__ কিছু জিনিস মেনে নেওয়া ভালো লিটল বার্ড।
হাত বাড়িয়ে তার মুখের সামনে পড়ে থাকা চুল গুলো অতি যত্নে সরিয়ে দেয়।
সেটা নিজের জন্য হোক বা খুব কাছের কারো জন্য। নিজের ভালো তো পাগল ও বুঝে। অবশ্যই তুমি চাইবে না তোমার জন্য এমন কেউ কষ্টে থাকুক যাকে তুমি দেখে কষ্ট পাবে।
প্রানপ্রিয়া বাহিরের দিকে দৃষ্টি রেখে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নেয়। মুখের ভাব ভঙ্গিতে পরিবর্তন চলে আসে।
দামিয়ান হাসি চওড়া করে ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
নিজের মনকে নিজের শরীরের মত করো প্রাণপ্রিয়া। যে এক পর্যায় আমাকে পাওয়ার জন্য ছটফট করে।
দামিয়ান কথাটা ফিসফিস করে তার কানের কাছে গিয়ে বলে। তাদের ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে প্রানপ্রিয়া যখন নিজের জিদ কে আর ধরে রাখতে পারে না এবং এক সময় কাবু হয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
প্রানপ্রিয়া চোখ মুখ শক্ত করে তার দিকে ঘুরে তাকায়। তার ফর্সা আবেদনময়ী শরীরের এলোমেলো ব্লাউজ পেটিকোট, চোখে মুখে ক্রোধ।
দামিয়ান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকে দেখে ।
প্রানপ্রিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলে ,,
__ গা গুলিয়ে আসছে আমার আপনার কথা শুনে, সত্যি বলছি। একটা মানুষ এতোটা জঘন্য! এতটা জঘন্য কিভাবে হতে পারে সব দিক দিয়ে।
__ আমার চাওয়ার মাঝে যদি আমি জঘন্য হয়ে থাকি তাহলে তাই। তুমি যা ভাবার ভাবো। কথাটা বলতে বলতে প্রানপ্রিয়ার মাথায় এমন হাত বুলায় যেন সে তার পোষা প্রাণী।
প্রানপ্রিয়া ফের মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আপনার শারীরিক সুখের আনন্দ চাওয়ার ছিল। আপনার হবু স্ত্রী আছে, আপনি চাইলে ওই ধরনের নারীদের থেকেও সুখ নিতে পারতেন। কেনো আমার মত অসহায় এতিম মেয়েকে এই পর্যায় নিয়ে আসলেন? আমার তো কিছু ছিল না আপনি আমাকে আমার ভেতর থেকেও নিঃস্ব করে দিলেন। দোষ কি এটাই আমি আপনার থেকে সাহায্য চেয়েছিলাম?
প্রাণপ্রিয়ার কণ্ঠস্বর কাঁপছে কান্নায় ভেঙে পড়তে চাইছে কিন্তু না।
দামিয়ান ঠোঁটে কামড়ে কপালে ভাঁজ ফেলে,
__ আমি বিরক্ত হচ্ছি প্রানপ্রিয়া। বারবার এক কথা বলে আমাকে বিরক্ত করো না । তোমার জন্য এটাই ভালো তুমি সব কিছু মেনে চুপচাপ নিজের মত থাকো। তোমাকে আমার নাম দিয়েছি রক্ষিত বানানোর হলে হলাল বানাতাম না। তোমাকে আমি চেয়েছি হ্যাঁ, অনেক কিছু পাওয়ার ছিল, এখন আমি পাচ্ছি ।অধিকার করতে চেয়েছিলাম আমি তোমাকে আর অধিকার এক দুই দিনের জন্য হয় না।
প্রানপ্রিয়া তাচ্ছিল্য হাসে। দুঃখিত ছোট সাহেব এভাবে বলা আমার ঠিক হয় নি মাফ করবেন। কিন্তু চরিত্রহীন পুরুষদের আমার সহ্য হয় না। একজন নারী রেখে আরেক নারী কে বৈধ ধর্ষণ অধিকার বানিয়ে।
দামিয়ানের মুখ থেকে হাসি সরে গেছে, সে বসা থেকে উঠে গম্ভীর মুখে বিছানার পাশে রাখা ফোন আর সিগারেটের প্যাকেট নিতে নিতে বলে।
__ মেনে নিতে পারলে ধর্ষন মনে হবে না। আর মেনে নিতে না পারলে আমার কিছু করার নেই ।চাহিদা মত আমি সবকিছু আদায় করে নেব। আশা করি আজ বুঝে গেছো। আর সারার বিষয়, যে যার যার জায়গায় থাকবে তোমরা। আগেও বলেছিলাম একজন নারী থাকা অবস্থায় আরেকজন নারীর প্রতি আকর্ষণ আমার কাছে ভুল না।
প্রানপ্রিয়া চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মনে হচ্ছে কেউ তার শরীরের বিশ ছিটিয়ে দিচ্ছে।
__ , এমন ভাবনার পুরুষকে চরিত্রহীন পুরুষ বলে,
চরিত্রহীন পুরুষ বুঝতে পেরেছেন। শেষের কথাটায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে ।
দামিয়ান বারান্দা দিকে যেতে যেতে বলে,,
__ নিজের ভালো বোঝা প্রাণপ্রিয়া, নাহলে জীবনে এর থেকে খারাপ কিছু হতে সময় নিবে না।
বিশাল বড় খোলা বারান্দার চারপাশে সবুজে ঘেরা। যার ফলে সময়ের সাথে সাথে অন্ধকার দ্রুত নেমে পড়ছে মনে হচ্ছে। দামিয়ান বারান্দার এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাহিরে ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে কোনো প্রভাব পড়ছে না তার কাছে এই আবহাওয়া স্বাভাবিক লাগছে। সে দক্ষতার সাথে সিগারেট ধরিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে এরপর হাতের ফোনের দিকে এক নজর তাকায়। সারার অনেকগুলো মিসড কল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। তৎক্ষণাৎ আবারো ফোন, সাইলেন্ট বলে শব্দ হচ্ছে না। দামিয়ান ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে ফোন রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে সারার আহ্লাদে কণ্ঠ,
__ কখন আসবে দামিয়ান, আমি অপেক্ষা করছি তো। ভুলে গেছো আজ আমাদের যে আমার বাসায় যাওয়ার কথা।
দামিয়ান সিগারেট টান দিয়ে ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
__ ভুলিনি তবে তুমি যাও আজ আমি ব্যস্ত।
কথাটা শোনা মাত্রই সারা কপাল গুটিয়ে ফেলে,
__ ব্যস্ত মানে! তুমি তো ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে গেছো তাহলে।
__ এখন কি তোমাকে আমার এর জবাব দিতে হবে? যা বলেছি তাই। দামিয়ান বিরক্ত মুখে ফোন কেটে দিয়ে ধুমপান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এদিকে সারা দাঁত কিড়মিড় করে ঠাস করে বিছানায় ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে। শরীর জ্বলে উঠেছে তার। এমনটা কিভাবে সে করতে পারলো। আজকাল তার গা ছাড়া ব্যবহার সে কি ভেবে নিবে? উপেক্ষা, অপমান করতে একবারও ভাবছে না। আর আজ, আজ তো তার বাড়ি থেকে ইনভাইট করাকে ও গুরুত্ব দিলো না।
__ তোমার ভাইয়ের মতিগতি আমার ঠিক লাগছে না আহানাহ । রুক্ষ কণ্ঠে সারা বলে ওঠে,
আহনাফ তার ঘরেই ছিল। কফি মগ হাতে সে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হা করে শ্বাস ফেলে। কিছু বলার নেই তার এই ব্যাপারে, সবকিছু চোখে পড়ার পর ও।
সারা আহনাফের দিকে দৃষ্টি ফেলে,,
__ আমি যা ভাবছি তা যদি সত্যি হয় আমি কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে না আহানাফ। আমি মানবো না এবং নিজ জায়গা ও কখনো ছাড়বো না।
আহানাফ হতাশ গলায় বলে
__ তুমি বেশি ভাবছো সারা। ,
সারা শব্দ করে হেসে ওঠে,, সিরিয়াসলি আহানাফ, তুমি এটা বলছো? দামিয়ান তোমার ভাই বলে কিছু চোখে পড়ছে না তাই না? ভুলে গেছো কয়েকদিন আগে দেখা তার পিঠে নখের আঁচড় গুলো।
আহানাফ ঠোঁট কামড়ে ধরে। দু আঙ্গুল দিয়ে কপাল ঘষে। মনে আছে তার কয়েকদিন আগে যখন তারা গেস্ট হাউসে দামিয়ানের সাথে কথা বলতে গিয়েছিল, নিজেদের মধ্যে সময় কাটানোর জন্য। দামিয়ান কথা বলার মাঝে সাওয়ার নেওয়ার পড়নের শার্ট খুলে ওয়াশরুমে ঢুকার সময় তাদের চোখে পড়েছিল স্পষ্ট ফর্সা পিঠে অসংখ্য ঢাবানো নখের আঁচড় ।
এসব দেখে সারা তখন নিজেকে সংযত রেখে চুপচাপ বসেছিল মনে আছে আহানাফের।
সারা আহানাফের দিকে পা বাড়ায়।
__ তোমার কি মনে হয় আমি বোকা? আমি কিছু বুঝিনা। তোমার ব্রো যে ধোঁকা দিচ্ছে আমি বেশ বুঝতে পারছি কিন্তু জানো আমার না কিছু যায় আসে না। এসবে তবে এখন যায় আসছে। কেন জানো আমি দেখছি আমার জায়গার নড়েচড়ে যাবে। আর এটা আমি কখনোই হতে দেব না। যদি আমি যেটা ভাবছি সেটা সত্যি হয়, সত্যি বলছি তোমার ভাই ও আমাকে চেনে না আমিও ঠান্ডা মাথায় জায়গা মত কাজ করবো।
আহানাফ বিরক্ত হয়, সারা তার ভালোবাসার মানুষ হলেও তার ভাবনাকে তার কি বলা উচিত? একজন মেয়ে এমনটা কিভাবে বলতে পারে? একগুঁয়ে পাগলামো নিজের জায়গা ধরে রাখা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।
খারাপ ভাবে পাওয়ার মধ্যেও যদি নিয়ত ভালো থাকে উপরওয়ালা ভাগ্যে সবকিছু এমনি রাখে। আর তোমার নিয়ত তো প্রথম থেকেই ভালো না। আহানাফ অনেকটা বিরক্ত কণ্ঠে বলে গদগদ করে হেঁটে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সারা চেঁচিয়ে ওঠে,।
___ তো তোমার ভাই আমার সাথে অনেক ভালো কিছু করছে? তুমি কি এটা বলতে চাইছো?
শীতকালে সময় সাথে রাত গভীর একটু দ্রুতই হয়ে যায়। তার মধ্যে শহরের ভেতর গ্রাম সাইড এলাকা ঠান্ডাটা ও বেশ পড়েছে। প্রানপ্রিয়া আশ্রমের থেকে অনেকটা দূরে অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি থেকে নামে।
দামিয়ান গাড়ির ভেতর থেকে অন্ধকারের মধ্যে প্রানপ্রিয়া কে দেখছে। ফার্ম হাউস থেকে আসার পথে তার গায়ে ব্লেজার জড়িয়ে দিয়েছিল চাদর ভুলে রেখে এসে পড়েছে ।
প্রানপ্রিয়া ব্লেজার খুলে ফেলে ফেরত দেওয়ার জন্য দামিয়ান বলে ওঠে,,
__ গাড়ির ভেতর থেকে বাহিরে বেশি ঠান্ডা, পড়ে থাকো।
প্রাণপ্রিয়া অন্ধকারের মধ্যে নাক মুখ কুঁচকে অন্যদিকে ঘুরে গভীর শ্বাস ফেলে,
__ প্রয়োজন নেই ধন্যবাদ।
__ যা বলছি তা করো। দামিয়ান শক্ত কণ্ঠে বলে,
প্রানপ্রিয়া তবুও ব্লেজারটা গাড়ির ভেতর রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়,
__ এই ব্লেজার থেকে আপনার শরীরের স্মেল আসছে যা আমার কাছে বিষের মতো আর কিছুক্ষণ পড়ে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত। আর আমি মরে গেলে আপনি বিনোদন সুখ কোথা থেকে পাবেন বোঝা উচিত আপনার।
দামিয়ান দৃষ্টি সরু করে।
__ আহ তুমি কি কোন ভাবে বলতে চাইছো তুমি ছাড়া আমাকে কেউ বিনোদন আর সুখ দেওয়ার মত নেই। আমি এসব পাওয়ার জন্য তোমাকে নিজের করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি কি ভেবে নিব তুমি আমার দিক বুঝতে শিখছো। কিন্তু এটা কবে থেকে মাই লিটল বার্ড আজ থেকে নাকি সেদিন রাত থেকে। কন্ঠে রসিকতা মিশ্রিত, অন্ধকার সে যে মজা নিচ্ছে প্রাণপ্রিয়া বুঝতে পারছে।
প্রাণপ্রিয়ার গা জ্বলে ওঠে, কথা না বাড়িয়ে ঠাস করে গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে সোজা রুক্ষ ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে নরমাল তাঁতের শাড়ি ই তার জন্য যথেষ্ট বিরক্তিকর।
গাড়িতে বসা দামিয়ান শব্দ করে হাসছে। মন খুলে তার হাসি। আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে তার সাথে সাহস বা রুক্ষতা দেখিয়েছে নাকি ভেবে দেখার বিষয়। তার অপছন্দ বলে চোখ তুলে কেউ তার সাথে কথা বলতে পারেনা। সে জায়গায় এই ছোট মেয়ে সব সময় তাকে এবং এত কিছুর পর ও এখনো তেজ দেখায়। আজ চড় ও মেরেছে। দামিয়ান হাসতে হাসতে সিটে গা এলিয়ে বসে নিলয় কে ধীরগতিতে গাড়ি চালাতে বলে।
ড্রাইভিং সিটে বসা নিলয় অবাক চোখে দামিয়ানকে দেখার মাঝে গাড়ি স্টার্ট করে। সচরাচর দামিয়ানের মুখে অতটা হাসি দেখা যায় না তবে সে হাসে কিন্তু এভাবে মন খুলে না।
আশ্রমের সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে প্রাণপ্রিয়া সোজা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। সোফায় বসে থাকা দুজন মহিলা নতুন কেয়ারটেকার কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকে দেখে। প্রানপ্রিয়া বিষয়টা বুঝতে পারে, কিন্তু কিছু বলার নেই। কি বলবো সে, তারা যদি কিছু ভেবে থাকে তা তো সত্যি।
প্রানপ্রিয়া নিজের ঘরে ঠুকে দেয়ালে হাতরে লাইট অন করে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে মেঝেতে ব্যাগ ফেলে বিছানায় গিয়ে বসে। লোকে বলে সব থেকে শান্তির স্থান নাকি নিজের ঘরে।কিন্তু কই প্রাণপ্রিয়ার কাছে তো লাগছে না। এই যে সে ঘরে এসেছে মনের অশান্তি গুলো যন্ত্রণা গুলো কিলবিল করে উঠছে। সারাদিন কি কি করে এসেছে, তার সাথে কি হয়েছে সব চোখে ভেসে উঠছে। নাহ এবার আর নিজেকে আটকে রাখা ঠিক হবে না। সে দুহাত দিয়ে শক্ত করে চাদর খিঁচে দূরে হুহু করে কেঁদে ওঠে। দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ শরীর ঝাকুনি দিচ্ছে বরাবর। আয়নার নিজের সাথে চোখ মেলাতে সাহস পাচ্ছে না। কেনো এমন জীবন পেলো সে ? কেন পেলাম? উপরওয়ালা দয়া করে তার জন্য মৃত্যু কবুল করুক না । যন্ত্রণা যে নিতে পারছি না পরবর্তী দিনগুলো সহ্য করবে কি করে। প্রাণপ্রিয়া দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকে কান্নায় ভেঙে পড়ে । ওই নিষ্ঠুর লোকের সামনে না কাঁদলে একাকীত্ব তাকে জড়িয়ে ধরেছে এবার।
অতঃপর কিছুক্ষণ এভাবেই বসে কাঁদে সে । চোখ মুখ লাল হয়ে হেঁচকি উঠে গেছে তার, ধীরে ধীরে মুখ থেকে হাত সরিয়ে হাতের আঙ্গুলের দিকে তাকায়। অনামিকা আঙ্গুলে পাথরের আংটি চকচক করছে। অবশ্যই এটা পাথর বলতে ডায়মন্ড হবে দামিয়ান আসার আগে দ্বিতীয়বারের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে পড়িয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল।
যদি আঙুল থেকে আংটি খুলে তাহলে তোমার এই সুন্দর হাতে একটা ও আঙুল থাকবে না।
প্রাণপ্রিয়া কান্নার মাঝে এবার হেসে ওঠে, সে যা ভাবে যা চায় নিকৃষ্ট জঘন্য উপায়ভাবে হলেও সে অবলম্বন করতে একবারও ভাবেনা। আর এটাকে সে সবথেকে বেশি ঘৃণা করে । প্রানপ্রিয়া বিছানায় গা ছেড়ে দেয়। জীবন এভাবে কিভাবে কাটবে সে জানে না মেনে নিয়েছে সে তবুও মন মানে না।
চোখ বুজে নেয় সে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে কষ্ট যন্ত্রণা সবকিছু নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে পাড়ি দেয়।
প্রতি শুক্রবার যে আশ্রম বাচ্চাদের চেঁচানো হইচই খেলা আনন্দে মেতে উঠতো ।এখন আর তেমনটা হয় না । সবাই আশ্রমে থাকলেও চুপচাপ নিজেদের মতো থাকে। সময়ের সাথে আশ্রমের পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে, না না আশ্রম বললে ভুল হবে সময়ের সাথে সব কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এটাই তো জীবন, জীবনের অংশ এত পরিবর্তনের মাঝে প্রাণপ্রিয়ার ভেতর টাও কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন। এই যে এখন আর সেই হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল আবেগপূর্ণ প্রানপ্রিয়াকে দেখা যায় না। মলিন মুখে সবসময় গম্ভীরতার দেখা মিলে। সব সময় চুপচাপ একা একা থাকে।
আশ্রমের বাচ্চা গুলো মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে চায়।
প্রিয়া আপু! প্রিয়া আপু! তুমি এমন হয়ে গেছো কেনো?
জবাবে প্রাণপ্রিয়ার কি বলবে বুঝতে পারে না। শুধু দৃষ্টি লুকিয়ে ফেলে। ছোট ছোট বাচ্চাদের কি বলবি কারো হাতের পুতুল হয়ে গেছে? জীবন নিয়ে তার ভাবার কিছু নেই তাকে কেউ জঘন্যভাবে ভোগ করছে সেও ভোগের পাত্রী হতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের কি এসব বলা যাবে একদমই না।
যাইহোক শুক্রবার দিন অনেক কাজ আন্টিদের সাথে রান্নাঘরে কাজে হাত লাগাচ্ছে প্রাণপ্রিয়া।দুজন আন্টির মধ্যে একজনের নাম রুমা, আরেকজনের নাম শিল্পী। দেখতে বয়সে অনেকটা সেলিনা আন্টির মতোই
দুজনের মাঝে আপাতত আশেপাশের মানুষদের নিয়ে সমালোচনা চলছে। সমালোচনা বিষয়টা ছিল সৌন্দর্য নিয়ে সুন্দর মানুষের ভাগ্য অন্যরকম । সমাজে একটা ডিমান্ড থাকে তাদের। এসব বলার মাঝে মাঝেসাঝে প্রাণপ্রিয়া কেউ ও ভাগ্যবতী বলছে তারা সুন্দর নিখুঁত হওয়া নিয়ে। প্রাণপ্রিয়া চুপচাপ শুনছিল এতক্ষণ কিন্তু কেন যেন কথাগুলো খুব গায়ে লাগছে। ভাগ্যবতী কথাটা শরীরটা জ্বলে উঠছে তাই খুন্তি দিয়ে তরকারির পাতিলে নাড়াতে নাড়াতে বলে ওঠে,,
__ সুন্দর নিখুঁত মানুষ বলতে সুন্দর হওয়াকে বুঝায় না আন্টি। সুন্দর মানুষ তারা যাদের ভাগ্য ভালো হয় তাদের সৌন্দর্য মুখে ফুটে ওঠে। সেটা একজন কুৎসিত ব্যক্তি হোক না কেনো। দেখুন আপনারা বলছেন আমি কত সুন্দর কিন্তু থাকি কোথায় এতিম অনাথ আশ্রমে কি হলো এই সৌন্দর্য দিয়ে প্রমাণ হিসেবে দেখুন আমি কতটা ভাগ্যবতী। এই সৌন্দর্য দিয়ে যদি কিছু পাওয়া যায় সেটা হল বিষাক্ত জীবন। যে সমাজের কথা বলছেন একটু ভাল করে খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন আশা করি সমালোচনার বিষয় বদলে যাবে।
কথাগুলো বলে প্রাণপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে। মিসেস রুমা আর শিল্পী চুপ হয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। প্রাণপ্রিয়া মলিন হাসি নিয়ে আরো কিছু বলার জন্য তাদের দিকে ঘুরে তখনই বাহির থেকে প্রাণপ্রিয়া নাম ধরে ডাকাডাকির শব্দ,
__ প্রাণপ্রিয়া!এই প্রানপ্রিয়া! কোথায় তুমি?
বাহির থেকে হঠাৎ অপরিচিত কন্ঠে নিজের নাম শুনে কপালে ভাজ ফেলে প্রাণপ্রিয়া দ্রুত চুলো নিভিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে।অতঃপর সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে ই আবরার ম্যানশনে দুজন তার বয়সী মেয়ে সার্ভেন্ট কে দেখতে পায়।
__ তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সারা ম্যাম আমাদের পাঠিয়েছে । দ্রুত চলো আমাদের সাথে।
আবরার ম্যানশনে আজ গমগম পরিবেশ কাল রাতে হুমায়ূন আবরার চায়না থেকে এসেছেন । তাই আজ কাছের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সারার পরিবার তাকে দেখতে এসেছেন। আপাতত সবাই বসার ঘরে মিলে খোশ মেজাজে কথা বলছেন। দামিয়ান তার বাবার পাশে বসা। তার অনুপস্থিতিতে ছেলে কতটা দায়িত্বের সাথে তার ব্যবসা সামাল দিয়েছে সবাইকে বলছেন কতটা খুশি তিনি দামিয়ানের ওপর। তাদের এসব কথার মাঝে দ্রুত সারা আর দামিয়ানের বিয়ের প্রসঙ্গ ব্যাপারটা ও উঠাচ্ছেন।
সে খলনায়ক পর্ব ৪৪
সারা পায়ের উপর পা তুলে বুকে হাত গুঁজে বাবা মার মাঝে বসা। তার দৃষ্টি বরাবর দামিয়ানের দিকে। সে মনোযোগ দিয়ে তার সব প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছে। তাদের বিষয় নিয়ে কত গুরুত্বপূর্ণ কথা চলছে
তবে তার মুখে সব সময় মত গম্ভীরতার ছাপ ছাড়া কিছু নেই। সারার মনের ভেতর আগুন জ্বলছে, সব কিছু সে হালকাতে নিয়েছিল এটাই কি তার ভুল ছিল? চোখ সরিয়ে নেয় সারা, অবশ্য সে এখন সন্দেহ করছে কিন্তু কোনো ভাবে যা ভাবছে যদি সেটা সত্যি হয়। তার ভালো করে জানা আছে তার কি করতে হবে।
