Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৪

সে খলনায়ক পর্ব ৪

সে খলনায়ক পর্ব ৪
ফারহানা সানিয়াত

নতুন দিনের শুরু, গ্রীষ্মকালের কাঠফাটা রোদে বাহিরে সকাল থেকে রৌদ্রের উত্তপ্ত তাপ,, সূর্যের তীব্র কিরণে চকচকে দিনটা বেশ ক্লান্ত কর তবে সেলিনা সকাল থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করছেন আর তাকে প্রাণপ্রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে, সেলিনা প্রতিদিনকার মত সকালে বাচ্চাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে নাস্তা করে স্কুলে পাঠিয়ে এখন ঘরের কাজ করছেন, প্রাণপ্রিয়া কিছুক্ষণ আগে সাহায্য করার কথা বললে কাঠ কাঠ কন্ঠে সে না বলে দিয়েছেন, সে হাতের কাজ খুব দ্রুত তার সাথে শেষ করেন এরপর সোফায় বসেন। এই সকাল সময়টা আশ্রমে সে আর প্রাণপ্রিয়া একই থাকে, সেলিনা পাশে প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকান খেয়াল করেন কাল বড় সাহেবের দেওয়া উপহার থেকে কলাপাতা রংয়ের একটা ফ্রক পড়েছে প্রাণপ্রিয়া,,

__ এটা কি তোমার উপহারের জামা?
প্রাণপ্রিয়া মিষ্টি হাসি নিয়ে ‌ওপর নিচ মাথা নাড়ায়, সেলিনা সুন্দর একটা হাসি ঠোঁটে টানে ,, খুব সুন্দর লাগছে, বলেই হঠাৎ থেমে কপালটা হালকা কুচকে ফেলেন , আন্টির এমন কপাল কুঁচকাতে দেখে প্রাণপ্রিয়া চোখ দুটো পিটপিট এক নজর নিজের দিকে তাকায়,,
সেলিনা বসা থেকে উঠে পা বাড়িয়ে পাশের একটা ঘরের দিকে চলে যান, প্রাণপ্রিয়া তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে,, কি হলো!!
কিছুক্ষণ পর,
পাশের ঘর থেকে সেলিনা হাতে একটা চিরুনি আর হেয়ার ব্যান নিয়ে প্রাণপ্রিয়ার সামনে এসে দাঁড়ান,,
__ পিছে ঘুরো প্রিয়া,
আন্টির কথা শুনে প্রাণপ্রিয়া বোকার মত সেলিনাকে দেখে সে বুঝতে পারছে না কিছু,,, তা দেখে সেলিনা হা করে শ্বাস ফেলেন এরপর তিনি নিজে ই প্রাণপ্রিয়ার কাঁধ ধরে পিছে ঘুরিয়ে দেন আর সুন্দর করে চুল চিরুনি করে পিঠ পর্যন্ত চুলগুলোকে বেণী করে এক পাশে রেখে প্রাণপ্রিয়াকে আবার নিজের দিকে ঘুরান,,

__ সব সময় পাগলের মত চুল এলোমেলো করে না রেখে এখন থেকে এমন করে বেঁধে রাখবে ঠিক আছে, সেলিনার আদেশ,,
প্রাণ প্রিয়া চোখ দুটো পিটপিট করে তার বেনী করা চুলে হাত দেয়, এভাবে কেউ কখনো তার চুল বেঁধে দিয়েছিল নাকি মনে নেই হয়তো অনেক ছোট থাকতে মা দিয়েছিল কিন্তু এখন!
প্রাণপ্রিয়া ছলছল চোখে সেলিনার দিকে তাকায়, সেলিনা নিজের মতো নানান আদেশ দিয়ে যাচ্ছে,, কিছুক্ষণ প্রাণপ্রিয়া তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ঠোট এলিয়ে হেসে সেলিনা কে জাপটে জড়িয়ে ধরে,,
সেলিনার সাথে সাথে কথা বন্ধ হয়ে যায় সে অবাক……
__ তুমি খুব ভালো আন্টি আমি সব সময় তোমার সাথে থাকতে চাই সব সময়, এই আশ্রম ছেড়ে তোমাদের ছেড়ে কখনো কোথাও যেতে চাই না, আর কখনো যাবও না,,
সেলিনা ছোট মেয়েটার কথা শুনে অনেকটা স্তব্ধ হয়ে যায় মেয়েটা তাদের ছেড়ে না যাওয়ার কথা বলছে এত সরল মনের,,, তবে সে যদি সত্যিই থাকতে চায় বড় হওয়ার পর তারাও তাহলে তাকে রেখে দেবেন,, সেলিনা মনে মনে ভেবে প্রাণপ্রিয়ার মাথায় হাত বুলান,,
প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে মিষ্টি হাসি নিয়ে সেলিনার দিকে তাকায় সেলিনা ও হাসেন,,

আবরার মেনশনের বিশাল বড় গেটের সামনে সাদা রঙের দুটো গাড়ি আসতেই দারোয়ান দ্রুত গেট খুলে দিলে গাড়ি দুটো ধীর গতিতে গেটের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
সদর দরজার সামনে হুমায়ূন হাবিব আর রাইমা দাঁড়িয়ে, সাদা রংয়ের গাড়ির দুটো তাদের সদর দরজা বরাবর এসে থামতে ই হুমায়ুনের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে,, গাড়ি দরজা খুলে ভেতর থেকে একজন পুরুষ আর মহিলা বের হন সাথে আরেকটি গাড়ি থেকে যুবক একটি ছেলে আর ষোল বছরের একটি মেয়ের বের হয়,,
হুমায়ূন অত্যন্ত খুশি মুখে সামনে এগিয়ে জড়িয়ে ধরেন পুরুষটিকে,, ওয়েলকাম মিস্টার চৌধুরী অবশেষে আমাদের অপেক্ষার অবসান ঘটলো,,
__ আমরা দুঃখিত মিস্টার আবরার আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে আপনাদের,,,দুজন দুজনকে ছাড়েন
__ কোনো দুঃখিত ফরমালিটি না মিস্টার চৌধুরী
নাহলে এত বছরের পার্টনারের সম্পর্ক ফর্মালিটিতেই থেকে যাবে,, এখন ভিতরে চলুন অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছেন,,

সুবিশাল বসার ঘর রাইমা আগে থাকতেই গেস্ট আসবে বলে সার্ভেন্টদের দিয়ে সবকিছু ব্যবস্থা করে রেখেছেন, মিস্টার চৌধুরীরা বসার ঘরে সোফায় বসতেই কয়েকজন সার্ভেন্ট এসে কিছু নাস্তা আর কোল্ড ড্রিংকস রেখে যায়।
বসার ঘরে একপাশের সোফায় মিস্টার আদনান তার স্ত্রী শায়লা বসা আরেক পাশে ছেলে রিহান আর মেয়ে সারা ,
হুমায়ূন আবরারের ব্যবসায়িক পার্টনার এই আদনান চৌধুরী ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নতুন ডিল হচ্ছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো বলে ফ্যামিলিগত ইনভাইট এর মাধ্যমে ডিল করবে।
আপাতত বসার ঘরে দু পরিবারের মধ্যে নানান ‌কথা চলছে,, তাদের কথোপকথনের মধ্যে উপস্থিত হয় দামিয়ান আর আহনাফের, দুজনের হাতে শিকার করার বন্দুক,,
__ কি অবস্থা তোমাদের ইয়াং ম্যান,, মিস্টার চৌধুরী তাদের দুজনকে দেখে জিজ্ঞেস করে ওঠেন,অতঃপর তাদের দুজনের হাতে বন্দুক দেখে বলেন,, তোমরা শিকার করতে যাচ্ছ বুঝি ?
দামিয়ান সৌজন্যমূলক হাসে, জি আঙ্কেল, পাশ থেকে আহনাফ বলে ওঠে,, আপনি যাবে আঙ্কেল?
সোফায় বসা হাবিব ছেলের দিকে কড়া করে তাকান,

__ না না তোমরা যাও শিকার করার দক্ষতা আমার মধ্যে নেই, মিস্টার চৌধুরী কিছুটা হেসে বলেন,,
হুমায়ুন ছেলের দিকে তাকান,, তোমরা শিকারে যাচ্ছ যখন রিয়ানকে ও সাথে নিয়ে যাও,দামিয়ান বাবার কথা মাথা নাড়ায়,সোফায় বসে থাকা ‌রিয়ান বসা থেকে উঠে দামিয়ানের সামনে এসে হ্যান্ডশেক করে দুজনের ঠোঁটে হালকা হাসি তাদের মধ্যে পরিচয় আগে থেকেই আছে,,
__ আমি খুশি হব শিকারিতে আমাদের সাথে জয়েন হলে দামিয়ান বলে ওঠে,,
রিয়ান হাসে ‌ তোমার সাথে শিকারিতে হারবো তবুও অবশ্যই জয়েন হব।
প্রাণপ্রিয়া তার ড্রয়িং খাতা আর কিছু রং পেন্সিল নিয়ে দু তলার সিঁড়ি বেয়ে হেলেদুলে নামেছে তার ঠোঁটে স্বচ্ছ হাসি সে এখন বাহিরে গিয়ে ড্রইং করবে , কিন্তু কি ড্রইং করবে বুঝতে পারছে না আর এটা ভাবতে ভাবতে বসার ঘরে যায় সেখানে বাচ্চারা সেলিনার সাথে গল্প করছিল কিন্তু প্রাণপ্রিয়া কে দেখে সবগুলো হই হই করতে করতে তাকে ঘিরে ধরে,,

__কোথায় যাচ্ছ প্রিয়া আপু আর তোমার হাতে কি,? , বাচ্চাদের কৌতুহল ভরা দৃষ্টি,
__ প্রাণপ্রিয়া মুচকি হাসে এটা ড্রইং খাতা,
__ ড্রইং খাতা!! একত্রে সবগুলো বাচ্চা বলে ওঠে,
__ হুম ড্রইং খাতা আমি এখন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছি কিছু ড্রইং করার চেষ্টা করব তোমাদের এসে দেখাবো নে কি ড্রয়িং করেছি ঠিক আছে,
বাচ্চারা একে অপরের দিকে তাকায়, অতঃপর আবার হই হই বলে ঠিক আছে, ঠিক আছে আমরা অপেক্ষায় থাকবো।
প্রাণপ্রিয়া মুচকি হাসে এরপর পাশে সেলিনার থেকে বলে সদর দরজা দিয়ে বের হয় যায়। বাহিরে উত্তপ্ত রোদ কমে নি সূর্য এখন মাথার উপর,, প্রাণপ্রিয়া কপালে হাত দিয়ে আকাশে তাকানোর চেষ্টা করে অতিমাত্রায় সূর্যের কিরণ‌ চোখ জ্বলছে যাওয়ার মত তাই সাথে সাথে নিচে তাকায় আর আশ্রমের পিছে জঙ্গলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাটা ধরে কিন্তু কিছু পথ হাঁটার পর কানে জঙ্গল থেকে বিকট বিকট শব্দ আসে,, সে দাঁড়িয়ে যায় খেয়াল করে প্রতিটা বিকট শব্দের সাথে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ তার মানে!! তার মানে ওই ভয়ংকর ছেলে আজও জঙ্গলে পাখি মারছে,, কথাটা ভেবে মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে উঠে প্রাণপ্রিয়া, ছোট মনে ভেবে পায় না মানুষ কতটা খারাপ আর নিষ্ঠুর নির্দয় হলে পাখি মারতে পারে,, নাহ তাহলে এখন আর জঙ্গলে যাওয়া যাবে না তার চলে যাওয়া উচিত ভেবেই পিছে ঘুরে প্রাণপ্রিয়া আবার আশ্রমের দিকে ছুটে,,

আশ্রমে সদর দরজার বাহিরে একজন ভদ্রলোক সাথে ১৬-১৭ বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে,, মিসেস সেলিনা রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সদর দরজার কাছে এসে হাসিমুখে বলে ওঠেন,,
__ আরে ডক্টর ইসরাফিল আপনি, বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ভিতরে আসুন?
বাহিরে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটি সৌজন্যমূলক হাসেন,
__ না না সেলিনা খুব দ্রুততার মধ্যে আছি ভেতরে আজ আসব না তুমি রহমানকে ডেকে দাও তার সাথে আমার কিছু দরকারি কথা আছে,,
__ তা হয় কিভাবে ডক্টর আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে অসম্মানীয় হবে আপনি ভিতরে আসুন দরকারী কথা হলে ভিতরে গিয়ে বলুন আমি রহমান ভাই কে ডেকে দিচ্ছি বলেই সেলিনা পিছে ঘুরে রহমানকে ডাকতে ডাকতে ভেতরে চলে যান। ডক্টর ইসরাফিল কোনো উপায় না পেয়ে পাশে দাঁড়ানো তার সাথে আসা কিশোর ছেলে যে তারই একমাত্র ছেলে ইভান তার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন,,

__তুমি কি আমার সাথে ভিতরে যাবে?
কিশোর ছেলেটি না সূচক মাথা নাড়ায় সে বলে,, আমি বাহিরে আছি তুমি তোমার কথা শেষ করে আসো।
ইসরাফিল ছেলের কথা শুনে হা করে শ্বাস ফেলেন এরপর ভিতরে ঢুকে যান,, ইভান বাবাকে ভিতরে ঢুকে যেতে দেখে সে ও উঠানে যাওয়ার জন্য পিছে ঘুরে তবে পিছে ঘুরতেই সামনে দাঁড়ানো এক মেয়েকে দেখে তার হৃদয় যেন মুহূর্তে ই থমকে যায়,, যে মেয়ে আপাতত বুকে হাত দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ‌কপাল কুঁচকে হাঁপাচ্ছে,,, ইভান মনে মনে ভাবে এই মেয়েকে কে! আগে তো আশ্রমে দেখেনি,, কে এই মেয়ে!
এদিকে ইভানের সামনে দাঁড়ানো মেয়ে,সে আর কেউ না এই আশ্রমে ছোট নব কিশোরী প্রাণপ্রিয়া জঙ্গলের সামনে থেকে দৌড়ে এসে সদর দরজার সামনে অচেনা ছেলেকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে নিজেও দাঁড়িয়ে আছে,,

__ আপনি কে ভাইয়া?
প্রাণপ্রিয়ার মিষ্টি কন্ঠস্বর কিশোর ইভান বুকে হাত দিয়ে হেলে ‌পড়ে যাওয়ার মত ‌অবস্থা,, তার ষোল বছর বয়সে প্রথম এমন অবস্থা হচ্ছে সে কি এই ছোট মেয়ের উপর ক্রাশ খেলো!!
প্রাণপ্রিয়া চোখ পিটপিট করে অচেনা ছেলের অদ্ভুত আচরণ দেখে সে মনে মনে কয়েকবার অদ্ভুত ,আশ্চর্য, পাগল নাকি বলে ফেলেছে কিন্তু মুখে তো আর কিছু বলা যায় না তাই উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে ,, পিছে পিছে ইভান ও যে কিছুক্ষণ আগে নিজের বাবাকে বলেছে ভেতরে যাবে না,
ছোট প্রাণপ্রিয়া হাতে ড্রইং খাতা ঝুলাতে ঝুলাতে ভেতরে ঢুকে সোফায় গিয়ে বসে আর বসেই দেখে পায় বাহিরের অচেনা ছেলেটি ও ভিতরে এসে তার বরাবর সোফাতে বসছে,,

সে খলনায়ক পর্ব ৩

__ আপনি ভিতরে আসলেন কেনো অচেনা ভাইয়া?
কিশোর ইভান দাঁত বের করে হাসে তুমি আমাকে অচেনা ভাইয়া বলো না তো লিটার বিউটিফুল গার্ল
বলেই পায়ের উপর পা তুলে বসে হালকা ভাবসাব নিতে থাকে,,, সে প্রথম কোনো মেয়ের উপর ক্রাশ খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেছে ,তার ১৬ বছর বয়সে প্রথম এমন অনুভূতি যেভাবেই হোক এই মেয়ের সাথে খাতির লাগাতে হবে,,

সে খলনায়ক পর্ব ৫