Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৭

সে খলনায়ক পর্ব ৭

সে খলনায়ক পর্ব ৭
ফারহানা সানিয়াত

কাধে ব্যাগটা শক্ত করে ধরে পিচ ঢালার রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে প্রাণপ্রিয়া তার মুখে চমৎকার এক হাসি দৃষ্টি সামনে দিকে, সে দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবছে ছয় বছরে তার জীবনে ছোট ছোট প্রতিটা জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ,
তেমন তার পরিচিত প্রতিটা মানুষও,, আর তারমধ্যে তার কিশোরীকালের প্রথম বন্ধু ইভান যে এখন বন্ধুর থেকে ও বেশি ভাইয়ের মত তার জীবনের একটা অংশ যে আপাতত মেইন রাস্তায় তার জন্য অপেক্ষা করছে, প্রাণপ্রিয়া হাসে ,,,
কালো রঙের বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ২২ বছরের সুদর্শন ইভান, কিশোর কালে প্রথম ক্রাশ খাওয়া প্রাণপ্রিয়ার ওপর অনুভূতি ছয় বছরে তার ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে কিন্তু তারা ভালো বন্ধু কারন প্রাণপ্রিয়ার দিক থেকে তার প্রতি কিছুই নেই তাই অনুভূতিকে চেপে রেখে সিঙ্গেল জীবন চলছে কোনো রকম আর কি এটা তার মতে, তবে অন্য কেউ তাকে দেখলে বলবে না তার জীবন কোনরকম চলছে,, বুকে হাত গুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইভান, দুর থেকে প্রাণপ্রিয়া দৌড়ে আসছে,,

__ ইভান! ইভান! মিষ্টি কণ্ঠস্বরের ডাক প্রাণপ্রিয়ার,,
ইভান আলসে ভাবে সামনে তাকায়, প্রাণপ্রিয়া দুর থেকে মুখে হাসি নিয়ে হাত নাড়াচ্ছে তার পড়নের হালকা গোলাপি রঙের শার্ট আর স্কার্ট,, চুলগুলো সামনের কিছু বের করে বেনি করে রাখা যা মৃদু হাওয়ায় উড়ছে ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক,, যা দেখে ইভানের হার্টবিট ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে,,
__ ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছিস কেনো দ্রুত চল , সামনে এসে প্রাণপ্রিয়া হাপাতে হাপাতে বলে উঠে ,
ইভান ঢোক গিলে অন্যদিকে তাকিয়ে এক হাত বাম বুকে রেখে হালকা মাথাটা ঝাঁকায় এরপর আবার প্রাণপ্রিয়ার দিকে ঘুরে দাঁত বের করে হাসে,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ চল,

ধরণীতে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে আবরার মেনশন নানান আয়োজনের ব্যস্ত। ‌সার্ভেন্টদের যেন আজ দম ফেলার সময়টুকুও নেই,, তারা বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নাকে মুখে কাজ করছে, সোফায় বসায় রাইমা দায়িত্বের সাথে এসবের পর্যবেক্ষণ করেছে আর করবেই বা না কেনো তার কাছে দামিয়ান নিজ ছেলে আহনাফের মত ই কখনো দুজনকে সে দুচোখে দেখেনি তাই এত বছর পর দামিয়ানা আসছে তার অনুভূতিটাও মায়ের মতই,,
__ ম্যাডাম আজকে দুপুরের মেনুতে কি কি করব? একজন সার্ভেন্ট রাইমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,,রাইমা হাসি মুখে সামনের সার্ভেন্ট টির দিকে তাকান,,
__ ব্রাউন রাইস সওটেড ভেজিটেবল গার্লিক চিকেন স্লাই বিফ কারি, আপাতত এগুলো রান্না করো,
__ ওকে ম্যাডাম, সার্ভেন্ট টি সামনে থেকে চলে যায়,,
সিঁড়ি বেয়ে সারা মোবাইলে কথা বলতে বলতে নামছে তার কথা বলার ধরনে বোঝা যাচ্ছে ফোনের ওপাশে মিসেস চৌধুরী সারা তাকে জিজ্ঞেস করছে কখন আসবে তারা এই বাসায়,, ওপাশ থেকে মিসেস চৌধুরী কিছু একটা বললে সারা মাথা নাড়িয়ে ওকে বলে ‌ এরপর কান থেকে ফোন সরিয়ে সোফায় বসা রাইমা আন্টিকে দেখে তার দিকে এগোয়,,

__ গুড মর্নিং আন্টি, রাইমা পাশে ঘুরে তাকান, ওহ সারা গুড মর্নি কখন উঠলে?
__ এই তো কিছুক্ষণ হবে আন্টি,,
,, চলো তাহলে তোমাকে নাস্তা দেই, ব্যস্ত কন্ঠ রাইমার
সারা দ্রুত না সূচক মাথা নাড়ায় ,,না‌‌ না একদম না আন্টি খিদে নেই কাল রাতে বাইরে আহনাফের সাথে অনেক কিছু খাওয়া হয়েছে এখন খেতে পারব না।
রাইমা হাসেন ওকে ওকে তাহলে যখন খিদে লাগবে আমাকে বলো,, সারা মৃদু হাসে ঠিক আছে,,
__ আচ্ছা তোমার মা-বাবা কখন আসবে এ‌ ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলেছে,,
সারা মাথা নাড়ায় হ্যাঁ আন্টি দুপুরের আগেই চলে আসবে,,

রংয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রাণপ্রিয়া আর ইভান,,
প্রাণপ্রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে দোকানদারের দেওয়া অ্যাক্রোলিক ছোট ছোট রংয়ের কৌটা আর রংতুলি দেখছে,, পাশে ইভান ঘুরে দাঁড়ানো তার দৃষ্টি প্রাণপ্রিয়ার দিকে স্থির, সে ভাবছে এই মেয়ে কি তার অনুভূতি কখনোই বুঝবে না! সে কি সারা জীবন ই সিঙ্গেল রয়ে যাবে! ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ,
প্রাণপ্রিয়া রং আর রং তুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ইভানের দিকে তাকায়,,
__ ইভান আমার এগুলো পছন্দ হয়েছে ,,
ইভান হতাশার‌ শ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকায় আর বিড়বিড় করে বলে ,,আমাকে কবে পছন্দ হবে,
__ ওই দিকে তাকিয়ে কি বলছিস শুনি না, কপালে বাজ প্রাণপ্রিয়ার
ইভান ঠোঁট কামড়ে প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকায়,,বলেছি পছন্দ হলে নে নাহলে চল,,
__ না না হয়েছে দামাদামি করে দে,,
__ সিওর ?
__ হুম হুম হান্ড্রেড পার্সেন্ট,,
রুদ্র উজ্জ্বল আকাশে হঠাৎ ই কালচে মেঘের আনাগোনা, যার জন্য চারদিকে অন্ধকার হয়ে শীতল বাতাস বইছে,প্রাণপ্রিয়া আর ইভান কেনাকাটা শেষ করে দোকান থেকে বের হয়ে এখন একটা পার্কে বসা দুজনের হাতে চকলেট ফ্লেভার আইসক্রিম। তবে তারা আইসক্রিম খাওয়ার থেকে হাসাহাসি আর দুষ্টুমি মধ্যে ব্যস্ত ,,বয়সের গ্যাপ অনেকটা থাকলেও দুজনের কথাবার্তায়‌ সেটা বোঝা মুশকিল,,

__ বৃষ্টি পড়বে রে ইভান বাসায় যাওয়া উচিত,,আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রাণপ্রিয়া বলে ওঠে, ইভান আইসক্রিমে কামড় দেয়,,
__ না আজ বৃষ্টিতে ভিজবো বছরের প্রথম বৃষ্টি, না ভিজলে হবে না ফিলিংসই আলাদা ,,প্রাণপ্রিয়া বসা থেকে উঠে,,
__ হ্যাঁ এমনই আলাদা ফিলিংস যে এক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে থাকা লাগে ,,
__ নাহ একদমই না বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় গিয়ে নাপা খেয়ে বসে থাকবো কোনো জ্বর আসবে না।
প্রানপ্রিয়া চোখ দুটো পিটপিট করে , তুই কি একচুয়ালি ডক্টর ইসরাফিল আঙ্কেলের ছেলে ইভান!
প্রাণপ্রিয়ার এমন কথায় ‌ ইভান চোখ ছোট ছোট করে ,, মানে!
__ মানে একটা ডক্টরের ছেলে জ্বর আসার আগে ওষুধ খাওয়ার কথা বলে কিভাবে! আমার তো সন্দেহ হচ্ছে তোর উপর, নাহ আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করতে হবে,,বলেই প্রাণপ্রিয়া মিটিমিটি হেসে অন্যদিকে তাকায়,,
ইভান তেতে ওঠে ‌কি বললি !!,,প্রাণপ্রিয়া এবার জোরে জোরে হাসা শুরু করে,,
দুজনে মাঝে এমন দুষ্টুমি চলতে থাকে কিছুক্ষণ এরপর রওনা হয় বাসার দিকে,,
অন্যদিকে পূর্বাচলের ব্যস্ত মেইন রোড পার হয়ে কালো রঙের গাড়ি নিরিবিলি দুপাশে গাছ গাছালি ঘেরা রাস্তায় ঢুকতে ই গম্ভীর কন্ঠে দামিয়ানা গাড়ির পেছন সিট থেকে বলে ওঠে,,

__ গাড়ি থামও বাকি পথ আমি হেঁটে যাবো। পাশে বসা ধবধবে সাদা চামড়ার একজন রাশিয়ান ছেলে অতি দক্ষতার সাথে বাংলা ভাষায় বলে,,
__ কিন্তু স্যার বাহিরে তো বৃষ্টি পড়ছে,দামিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে বাহিরের দিকে তাকায়,, এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে উঠার সময় কালচে মেঘলা আকাশ দেখেছিল তবে এখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি,,
__ সমস্যা নেই,তার ছোট করে উত্তর,,
ড্রাইভার উত্তর শুনে কিছুদূর সামনে গিয়ে রাস্তার একপাশে গাড়ি থামায়,,
গাড়ি থামাতে ই দামিয়ান সিটে রাখা কালো রঙের কোট হাতে নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে যায়,,
ফর্মাল গেটাপে দামিয়ান, সাদা শার্ট হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো সামনে দুটো বোতাম খোলা জিম করা চওড়া বডিতে একদম আঁটসাঁট, হাতে দামি ঘড়ি মুখের গম্ভীর্যতা আগে থেকে দ্বিগুণ চুলগুলো কাটার স্টাইল এর সাথে সেট করে উপরের দিকে উঠানো তবে কিছু চুল কপালে পড়া, সেই সুদর্শন যুবক দামিয়ান আগের থেকে বয়সের সাথে আরো সুদর্শন হয়ে গেছে তবে আপাতত সে বাহিরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে।

__ স্যার গাড়িতে ছাতা পেয়েছি , আকস্মিক পাশ থেকে সাদা চামড়ার রাশিয়ান ছেলে কালো রঙের ছাতা নিয়ে দামিয়ানের মাথার উপর ধরে,, দামিয়ান এক নজর ছেলেটির দিকে তাকায়, ছাই রঙা কোট পেন্ট পড়া নিকলাই যে দামিয়ানের এসিস্ট্যান্ট,,
__ স্যার আপনি আপনার কোট টা আমার কাছে দিন বলেই সাবধানতার সাথে দামিয়ানের হাত থেকে কোট নেয় এখন স্যার আপনি কমফোর্টেবল ভাবে হাঁটতে পারবেন।
মেইন রোডের পাশে ইভানের বাইক থামতে ই, পিছন থেকে প্রাণপ্রিয়া দ্রুত এক লাফে থেকে নামে কারন সে পুরো ভিজে গেছে, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলেও বাইকের গতিতে সে ভিজে চুবচুবা,, তবে ইভান বলছিল ভিজে যখন গেয়েছিস আয় আশ্রমের গেট পর্যন্ত দিয়ে আসি কিন্তু প্রাণপ্রিয়া না,,পথ অল্প হলেও সে আর ভিজতে চায় না তারমধ্যে বাইকের অতি গতিতে ঠান্ডা লাগছে, না ভাই না সে এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সামনে ঘুরে এক দৌড়,,

ধীর গতিতে পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে দামিয়ান, তার দৃষ্টি বৃষ্টির মধ্যে আশেপাশের পরিবেশ দেখছে আর ছয় বছরের মধ্যে পরিবর্তন খুচ্ছে,, হ্যাঁ পরিবর্তন তবে আশপাশের কোনো কিছুর ই যেন পরিবর্তন নেই শুধু তার জীবন ছাড়া ভেবেই দামিয়ানা দাঁড়িয়ে যায় সাথে সাথে ছাতা ধরে রাখা পিছে নিকলাইও। ছয় বছর আগে সে যখন বিশ বছরের যুবক ছিল আশেপাশের সবকিছু ঘিরে জীবন একটা পারফেক্ট লাইনের মধ্যে যাচ্ছিল যেখানে তার সকল ইচ্ছা নিজের ছিল পকেটে হাত গুজে দামিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ,, তবে আশেপাশের পরিবর্তন না হলেও তার পারফেক্ট জীবনে পরিবর্তন হয়ে এখন সে নিজে একজন পারফেক্ট ‌ যা তার মা-বাবার ইচ্ছায়, পা বাড়িয়ে ছাতার ভেতর থেকে বের হয় । নিকলাই সাথে সাথে মাথার উপর ছাতা ধরতে নিলে হাত উঁচু করে দামিয়ান থামিয়ে দেয় । ছাতার বাহিরে হালকা হালকা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে,,

সে চোখ বন্ধ করে মাথা হালকা উঁচু করে আর চোখে ভেসে ওঠে সারার মুখ যার সাথে তার বাবা এংগেজমেন্ট ঠিক করেছে এটা একটা বিজনেস ডিল তারও সম্মতি আছে,, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে সবই বাবা-মার ইচ্ছা কিন্তু সে কি চায়, দামিয়ান গভীর ভাবনায় পড়ে তবে ‌হঠাৎ ছোপ ছোপ পানি শব্দ,,
এদিকে প্রাণপ্রিয়া মাথার ওপর সাইড ব্যাগটা ধরে দৌড়াচ্ছে, দৌড়ানোর সাথে সাথে রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমে থাকা সেখানে পা পড়তেই ছোপ শব্দ হয়ে তার স্কার্ট আরো ভিজে একাকার,, এমনিতেই হালকা গোলাপি রঙের শার্ট স্কার্ট পড়া হয়তো ভিজে সব ই দৃশ্যমান খুবই আনকম্ফোটেবল একটা সিচুয়েশন, প্রাণপ্রিয়া ভাবে ভাগ্যিস ‌ রাস্তায় কোনো মানুষ নেই কিন্তু তার এই ভাবনা কিছু ক্ষণের জন্য ই যখন সে সামনে ভালো করে তাকাতে ই দেখে দুজন লোক দাঁড়িয়ে যাদের মধ্যে একজনের হাতে ছাতা আরেকজন তার দিকে তাকিয়ে,,তা দেখে প্রাণপ্রিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে দৌড়ানোর মাঝে নিজের দিকে এক নজর তাকায় আর সাথে সাথে আরেক হাতে ধরে রাখার রঙ আর রং তুলির বক্স বুকের সাথে চেপে দৌড়ানোর গতি বাড়ায়,

সে খলনায়ক পর্ব ৬

পকেটে হাত গুজে দামিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দৌড়ে আসা মেয়েটিকে দেখছে তার দৃষ্টি আপাতত স্থির সে সরাতে পারছে না, মেয়েটির ভিজে যাওয়া আবেদনময়ী শরীর অত্যন্ত আকর্ষণীয়,,

সে খলনায়ক পর্ব ৮