Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৬

সে খলনায়ক পর্ব ৬

সে খলনায়ক পর্ব ৬
ফারহানা সানিয়াত

সময়ের সাথে পরিবর্তন ঘটে,,,দেখতে দেখতে ছয়টি বছর পার হওয়ার সাথে কত কি পরিবর্তন,, যেমন আশ্রমে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো এখন কিশোর কিশোরী, মিসেস সেলিনা আর রহমানের বয়স বাড়া আর সবথেকে দেখার মতো পরিবর্তন সেই ছোট প্রাণপ্রিয়ার যে এখন উনিশ বছরের যুবতী আর যুবতী হওয়ার সাথে সাথে তার সুন্দর্য গুণ আগে থেকে আরো ফুটে ওঠা, লোকমুখে তার সৌন্দর্য এতটাই যে আশ্রমের দূর দূরান্ত পর্যন্ত তার সৌন্দর্যের প্রশংসার শোনা যায়। আর গুণের দিক দিয়ে সে আগের থেকে আরো বেশি বুঝদার আর দায়িত্ববান , আশ্রমে নিয়ম অনুযায়ী কেউ যদি আঠারো বছরের পর আশ্রমে থাকতে না চায় তাহলে সে চলে যেতে পারে কিন্তু প্রাণপ্রিয়া বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজের একটা স্থান বানিয়ে ফেলেছে আশ্রমে,,,দায়িত্ব নিয়েছে সেলিনা আর রহমানের মত,,
প্রাণপ্রিয়ার জীবনে তার কিশোরী থেকে যুবতী হওয়ার মধ্যে সেই একদিনই কষ্ট আর অপমান হওয়ার পর এই পর্যন্ত আর তেমন কিছু হয়নি তার জীবন এই আশ্রমে সুখে হাসি খুশির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এই ছয় বছরে তবে এই পরের সময় গুলো!!

প্রকৃতি ঘেরা আশ্রমটি সব সময় মত আজও সকালটা শুরু হইচই এর মধ্য দিয়ে তার মধ্যে আজ শুক্রবার আশ্রমের কিশোর কিশোরীদের ছুটির দিন যার কারণে পুরো আশ্রমে তাদের ছোটাছুটি খেলাধুলায় ব্যস্ত,, এত বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটলেও বাচ্চাদের এই হইচই এর কোনো পরিবর্তন ঘটে নি,, সদর দরজার সামনে বেতের চেয়ারে বসা মিসেস সেলিনা আর রহমান দুজনেই হাতে গরম চা নিয়ে এইসব দেখছেন, রহমান চায়ে চুমুক দিয়ে খুক খুক করে কাশে বয়সের সাথে তার অসুস্থতা দেখা দিয়েছে,, তিনি নিজের কাশি থামিয়ে নিজেকে শান্ত করে বলে ওঠেন,,
__ সকাল থেকে প্রিয়াকে দেখছি না কোথায় ও ?
সেলিনা মৃদু হাসেন, কোথায় আর জঙ্গলে হবে দিন দিন বড় হওয়ার সাথে জংলীদের মতো জঙ্গলেই থাকা শুরু করে দিয়েছে,,
সেলিনার কথায়‌ রহমান হো হো‌ করে হেসে ওঠেন তিনি হাসতে হাসতে উঠোনের দিকে তাকাতেই দেখতে পান,, লম্বা চিকন চাকন যুবতী প্রাণপ্রিয়া মুখে চমৎকার হাসি নিয়ে এদিকে ছুটে আসছে, পরনে কালো রঙের স্কার্ট যা হওয়ার দুলছে উপরে ছোট হাতার সাদা শার্ট গলায় স্কার্ফ ঝুলানো,, চুলগুলো ছোটবেলা সেলিনার আদেশ অনুযায়ী বেনী করে কাধের একপাশে রাখা যা কোমর ছুঁইছুঁই,, হাতে মাঝারি সাইজের একটা ঝড়ি ,,সে দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে এসে হাপাতে হাঁপাতে বলে,,

__ অনেকগুলো আম পেরেছি আন্টি, এগুলো দিয়ে মোরব্বা বানানো যাবে দেখো, সামনে থাকা সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার কন্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান,, মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে প্রাণপ্রিয়া ঝুড়িটা হালকা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ,,
__ এই এত আম তুমি পেরেছো ? পাশ থেকে রহমান ‌জিজ্ঞেস করে ওঠেন,প্রাণপ্রিয় রহমান আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়,সেলিনা হাতের চায়ের কাপটা মেঝেতে রেখে হতাশার শ্বাস ফেলেন,,সে কি বলবে তবুও বলে উঠেন,
__ তুমি কি বড় হবে না প্রিয়া দিন দিন মনে হচ্ছে ছোট হচ্ছো কয়দিন পর কলেজ পার হয়ে ভার্সিটিতে যাবে এখনো গাছে ওঠে আম পাড়ো মানুষ কি বলবে,, প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে হাসি স্থির রেখে হাতে ঝুড়িটা নিচে রাখতে রাখতে বলে,,

__ কি বলবে সেটা ভেবে আমার কি লাভ কিন্তু এই আমের মোরব্বা বানিয়ে বিক্রি করলে আমার লাভ বুঝলে আমার কিউট আন্টি,,সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার কথা শুনে নিজের মাথায় নিজেই চাটি মারে, এই মেয়ের লাভ লাভ সে কয়েক বছর ধরে শুনে আসছে, কি যে হবে এই মেয়ের,,
পাশ থেকে রহমান হেসে বলেন,, আমাদের প্রিয়া কি বড় হয়ে ব্যবসায়ী হবে নাকি হুম ,,
প্রাণপ্রিয়া হেসে না সূচক‌ হাত নাড়ায়‌,, না না আঙ্কেল আমি একজন ড্রয়িং টিচার হব এইচএসসি এক্সামের পর আমাদের প্রাইমারি স্কুলের হেড স্যারকে বলে রেখেছি সে ও রাজি ড্রয়িং টিচার নেওয়ার জন্য,,
__ আরে বাহ তাহলে তো খুব ভালো,,, শুনে খুশি হলাম দোয়া করি জীবনে অনেক বড় হও,,
প্রাণপ্রিয়া মিষ্টি করে হাসে নিচে রাখা ঝুড়িটা হাতে নিয়ে সদর দরজা দিয়ে হেলেদুলে ‌ভিতরে প্রবেশ করতে করতে মনে মনে ভাবে,, তার জীবনে কিছু না থেকেও অনেক কিছু আছে সে ভাগ্যবতী উপরওয়ালা তার ভাগ্যটা যেন ভবিষ্যতেও এমনই রাখে ,, প্রাণপ্রিয়া মনে মনে ভেবে মুখের হাসিটা আরো চওড়া করে।

ছয় বছর আগেই গ্রীষ্মকাল দিয়ে শুরু হয়েছিল,,
ছয় বছর পর ও সেই গ্রীষ্মকাল তবে এখন গ্রীষ্মের শেষ, মাঝে মাঝে আকাশে মেঘের ‌ ঘুরাঘুরি দেখা যায় যেমন এখনো দেখা যাচ্ছে সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে প্রাণপ্রিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে,,
সময়ের সাথে সব পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন পরিবর্তন হয় না আর প্রাণপ্রিয়া বড় হওয়ার সাথে সাথে এই সুন্দর্যের প্রতি আরো আসক্ত হয়ে পড়েছে তাইতো কিশোরী থাকতে একবেলা জঙ্গলে আসলেও এখন দুই বেলা আসা পরেই আর জঙ্গলে এসে তার অভ্যাস অনুযায়ী শেষ মাথায় ঝিলের কাছে চলে যাবে যেখানে একটা পুল তৈরি হয়েছে আগে সেটা ছিল না তবে কয়েক বছর ধরে হয়েছে যে পুল দিয়ে আবরার ম্যানশন থেকে এই জঙ্গলে আসা যায়, আপাতত প্রাণপ্রিয়া সেদিকেই যাচ্ছে,,

বিকেলে সময় হাঁটতে হাঁটতে প্রাণপ্রিয়া তার কাঙ্খিত জায়গায় চলে আসে সামনে বিশাল বড় ঝিল তার মাঝে লোহার চওড়া পুল,, সে সেখানে গিয়ে একদৃষ্টিতে সামনে রাজকীয় আবরার ম্যানসিনের দিকে তাকায় যেখানে আজকাল তার খুব যাওয়া আসা চলে তবে তার মনে আছে প্রথম যেদিন গিয়েছিল সারা নামের একটি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল যে তাকে অপমান করলেও মনের দিক দিয়ে খারাপ ছিলনা এটা আগে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝে কারণ তার সাথে মাঝে মাঝে এখনো দেখা হয় যখন সে আবরার মেনশনে যায় তবে! তবে প্রাণপ্রিয়ার ভাবনা মাঝে হঠাৎ থেমে ঢোক গিলে তার চোখে ভেসে ওঠে সেই ভয়ংকর সুদর্শন ছেলে যাকে শেষ ওই সন্ধ্যায় দেখেছিল এরপর আর দেখা হয়নি হ্যাঁ আর দেখা হয় নি সে আশাও করে আর কখনই দেখা না হোক,,
অন্যদিকে আবরার মেনশনে ঝিলের পাশে গেস্ট হাউস তৈরি করার কাজ শেষ হয়ে সেটা পরিষ্কার করার কাজ চলছে,, হুমায়ূন বারান্দায় দাঁড়ানো সে আশেপাশের সব ওপর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন, পাশে হাবিব খুব হাসি মুখে ফোনে কারো সাথে কথা বলা শেষ করে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন,,

__ অবশেষে ছয় বছর পর আমাদের দামিয়ান কাল বাংলাদেশ আসছে ভাইজান,,
হুমায়ূন ছোট ভাইয়ের কথা শুনে হাসেন ,তিনি গেস্ট হাউজের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন তার জন্যই তো এত আয়োজন, হাবিব ভাইয়ের দৃষ্টি বরাবর নিচে গেস্ট হাউজে দিকে তাকায়, এই গেস্ট হাউস শুধু দামিয়ানের পার্সোনাল ভাবে থাকার জন্য হুমায়ুন বানিয়েছে,, হাবিব হাসি মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তবে হঠাৎ চেঁচামেচির শব্দ কানে আসতেই তিনি বাড়ির গার্ডেনের দিকে তাকান ,,

সেখানে সবুজ ঘাসের উপর সাদা চাদরে বালিশে হেলান দিয়ে চব্বিশ বছরের আহানাফ বসা আর তার বরাবর অতি সুন্দরী ২২ বছরের সারা। ছয় বছরে সারার এই বাড়িতে আসা যাওয়ার কারন খুব পারিবারিক,, সময়ের সাথে সাথে তারমধ্যে ও‌ পরিবর্তন হয়েছে যেমন এখন সে ম্যাচুয়ার বুদ্ধিমতী আর সুশীল তবে আপাতত আহানাফ আর তার মাঝে চেচামেচির কারণ কার্ড খেলা দুজনের মাঝে বেশ ভালো বন্ধুত্ব ,,, দূর থেকে হাবিব দুজনকে দেখে হতাশার শ্বাস ফেলেন,,
এদিকে নিচে আহনাফ কার্ড নিয়ে সারাকে ভুলভাল বুঝিয়ে জেতার চেষ্টা করছে কিন্তু সারা নিজের বুদ্ধি দিয়ে প্রতিবার বোঝাচ্ছে আহানাফ ভুল,, দুজনের মাঝে এ নিয়ে তুমুল তর্ক বিতর্ক অতঃপর এক পর্যায়ে
আহনাফ মেনে বলে ওঠে,,

__ ওকে ওকে আমি ভুল ,,বুঝতে পেরেছি আমার মা,,
সারা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে নিচের কার্ডগুলো একত্রে হাতে নিয়ে আহানাফের দিকে তাকায়,, কি বললে ‌আমি তোমার মা?
আহানাফ সাথে সাথে জিভ কামড় দেয়, না‌ না এটা তো কথার কথা বেবি, সারা ছোট ছোট চোখ করে বেবি!!
__ Yes babe, you are my bad babe girl,, আহানাফ কিছুটা সারার কাছে আসতে আসতে বলে ওঠে,, সারা সাথে সাথে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যায় don’t forgot that I’m yours brother fiance বলে বাঁকা হাসে সারা।
আহানাফও বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে শীতল চাহনিতে পকেটে হাত গুজে,,yes I didn’t forgot, that you are my brother fiance babe,

ধরণীতে সূর্য উঠার সাথে সাথে ছুটির দিন শেষ হয়ে ব্যস্ত দিনের শুরু,, আশ্রমের বাচ্চারা স্কুল ড্রেসে এক এক করে দ্রুত পায়ে আশ্রমের গেট দিয়ে বের হয়েছে,, সদর দরজার সামনে দাঁড়ানো সেলিনা সবার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে,, এইতো কয়েক বছর আগে তাদের স্কুলে গিয়ে দিয়ে আসতে হতো কিন্তু এখন,,,, সেলিনা মনে মনে ভেবে মৃদু হাসেন,
__ কি দেখছ আন্টি, আকস্মিক পেছন থেকে প্রাণপ্রিয়ার কন্ঠ,,সেলিনা ঘাড় ঘুরিয়ে ‌পিছে তাকান তবে সাথে সাথে তার কপালটা কুঁচকে যায়,, কোথায় যাচ্ছ তুমি? তোমার কলেজ নেই ,
প্রাণপ্রিয়া হাতের ঘড়ি পড়তে পড়তে বলে,, না আন্টি আজ কলেজ নেই তাই ভাবলাম মার্কেটে যাই,,রং শেষ হয়ে গেছে সেগুলো কিনে নিয়ে আসি,,
সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার কথা শুনে বলেন,, একা যাবে? প্রাণপ্রিয়া না সূচক মাথা নাড়ায়,, নাহ
__ তাহলে!

সে খলনায়ক পর্ব ৫

প্রাণপ্রিয়া হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসে, কোথায় যাওয়ার হলে কি আর একা যাওয়া হয় আমার,,
সেলিনা কপাল দ্বিগুণ কুচকায়‌ প্রিয়ার কথাটা বোঝেনি তবে কিছু একটা মনে আসতে ই সাথে সাথে ‌ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে কপালে চাটি মারেন,,
ওওওও আচ্ছা… আচ্ছা ..ঠিক আছে সাবধানে যেও,,
প্রাণপ্রিয়া চোখ তুলে আন্টির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে, ঠিক আছে বলে সাইড ব্যাগ নিয়ে বের হতেই সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে হাসেন,,

সে খলনায়ক পর্ব ৭