সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৮
মৃধা মৌনি
দেয়ালের বিশাল ঘড়িটায় এখন ঠিক এগারোটা বাজতে চলেছে। বকুল সেই ঘড়িটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তার ছোট্ট মনে কী যে চিন্তা চলছে, তা শুধু সে-ই জানে। শীতের দাপট সামলাতে সে গায়ের চাদরটা আরেকটু ভালো করে টেনে নিলো।
তারপর দৃষ্টি ফেরালো জানালার দিকে। বাইরে এখনো হালকা কুয়াশার চাদর মোড়ানো। এ বছর শীত যেন জেঁকে বসেছে, এত ঠান্ডা কেন পড়ছে, এই চিন্তাই তাকে ভাবাচ্ছে। সূর্যদেবের এখনো দেখা নেই। গতকালেও খুব সামান্য সময়ের জন্য মুখ দেখিয়েছিলেন। বকুলের মনে হলো, এভাবে চলতে থাকলে হয়তো এই অঞ্চলে বরফ পড়াও শুরু হতে পারে।
এই সময় হঠাৎ বিছানার উপর একটা ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দ হলো। পুরোনো মেডিকেল বেড, সামান্য নড়লেই চিঁ-চিঁ করে আওয়াজ করে ওঠে। বকুল চোখ ঘুরিয়ে দেখল, তৃণা পিটপিট করে চোখ খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, আবার কড়া আলোর কারণে বন্ধ করে ফেলছে। সম্ভবত ঘরের উজ্জ্বল আলো সরাসরি চোখে লাগার কারণেই তার চোখ খুলছে না।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বকুল আলতো করে এগিয়ে এসে এমনভাবে দাঁড়াল, যাতে তার শরীরটা আলোর প্রতিবন্ধক হয়ে তৃণার চোখে সরাসরি আলো পড়তে না পারে।
এরপর পরই তৃণা ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
বিছানার পাশে লম্বা পাহাড়ের ন্যায় অটল বকুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ঘোলাটে দৃষ্টিতে। দুর্বল কণ্ঠে শুধালো, ‘কোথায় আমি?’
‘জাহান্মামে।’ উত্তরটা ধেয়ে এলো আ গু নের হলকার মতো করে। ওতেই ঘুম চটে গেল পুরোপুরি। চোখটাও ভালো করে মেললো তৃণা। ঠাহর করতে অসুবিধে হলো না, এটা যে হাসপাতাল। মাথার ভেতর একধরনের ভার অনুভব-ও টের পাচ্ছে মস্তিষ্ক এবার। তবে তার ভেতর দিয়েও বকুলের কাট কাট কথা শুনতে বেগ পোহাতে হলো না তার।
সে ব্যথিত চোখে চাইলো। ভোঁতা কণ্ঠে বলল, ‘আমার এমন অবস্থাতেও তোর এই ব্যবহার!’
রি রি করে রাগ চড়ল বকুলের, ‘তো কি তোকে চুমু দিবো আমি? যে কান্ড ঘটিয়েছিস, তোকে যে এত ভালো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাই শুকরিয়া কর।’
‘আবার কি করলাম আমি?’ তৃণা অবাক হলো ভারী।
বকুলের ধৈর্যে সইলো না, ‘এই তোর অভিনয় আমাকে দেখাতে আসবি না খবরদার, আমি বোকা নই। তোর এই ইনোসেন্ট ফেস তুই অন্য কাউকে দেখাবি যে তোকে চেনে না। তোর মতো শয়তানকে চিনতে আমার একদম ভুল হয়নি।’
‘আমি সত্যি বুঝতে পারছি না, কি হয়েছে আমার?’
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ তীরের ফলার মতো কানে এসে বিঁধল।
‘গর্ভে সন্তান বাজিয়ে… এই মেয়ে! তোর একটুও লজ্জা করল না? আপার এত বড় সর্বনাশ করেছিস, একটু তো দয়া করতি! একবার ভাব তো, আপার কেমন লাগছে? তোর কি সে হৃদয় আছে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!’
আকাশটা যেন আক্ষরিক অর্থেই তৃণার মাথার ওপর ভেঙে পড়ল।
হতভম্ব হয়ে গেল তৃণা, মাথার রক্ত চলাচল স্তব্ধ হয়ে গেছে যেন। কথাগুলো মস্তিষ্কে ঘোরার জন্য সময় নিচ্ছে। কী… কী বলছে এসব বকুল!
বকুল এখন আগ্নেয়গিরি, অবিরাম লাভা উদগীরণ করে চলেছে।
‘আপার ঘর ভাঙলি, মন ভাঙলি, এখন তাকে জীবন্ত ভাঙার পরিকল্পনা! এসব চোখে দেখে কেউ সহ্য করতে পারে? পারে কোনো মেয়ে সইতে? হ্যাঁ রে তৃণা, তোর বিবেকে এইটুকুও সইলো না? যে বোনটা তোকে ছোট থেকে এত ভালোবেসেছিল, নিজের সবটা উজাড় করে দিয়েছে সবসময়- তুই তার জীবন কীভাবে কেড়ে নিস? শিশির নাহয় পরের ছেলে, তার নাহয় হৃদয় নেই; কিন্তু তুই তো আমাদের আপন ছিলি! তুই কীভাবে পারলি? তুই প্রেগন্যান্ট, তাও কি না তোর আপার বরের! ছিঃ ছিঃ ছিঃ, আমার উচ্চারণ করতেও ঘেন্না পাচ্ছে!’
‘কী… কী বলছিস এসব… বকুল!’
বিস্ময় আর আতঙ্কে তৃণা এখন হতবিহ্বল। কথাগুলো গলায় যেন আটকে আসছে, শ্বাস নেওয়াও কঠিন।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর ফিসফিস করে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল, ‘আ… আমি… আমি প্রেগন্যান্ট?’
‘হ্যাঁ! হ্যাঁ! প্রেগন্যান্ট! আপন বোনের সতিন হয়ে সাধ মেটেনি, তার সঙ্গে পাল্লা দিতে এখন নিজেও মা হওয়ার বাসনা! ইশ! আমার না তোকে দেখলেই মাথা বিগড়ে যাচ্ছে! আমি তোকে খু ন করব রে তৃণা! তুই একটা কলঙ্ক, নারী জাতটার কলঙ্ক!’ বকুলের কণ্ঠস্বর এখন উন্মত্ত চিৎকারের মতো।
‘না… এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না!’ তৃণার কণ্ঠস্বর এখন ভয়াবহ কাঁপুনিতে নিমজ্জিত।
বকুল যেন প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে উচ্চারণ করল, ‘কেন হতে পারে না? তোরা এক ঘরে থাকিসনি?’
‘কিন্তু…’ বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল তৃণা। তারপর প্রায় কান্নার তোড়ে ভেসে যাওয়া স্বরে আর্তনাদ করে উঠল, ‘আপাকে ডাকো! আপাকে ডাক দাও!’
‘এই! খবরদার! জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব! কিসের আপা? কে তোর আপা? ওই ডাকের মান রেখেছিস?’ বকুল যেন শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।
‘যা ইচ্ছে কর, কিন্তু আপাকে ডেকে আন! প্লিজ বকুল, আপাকে ডাক… এই বাচ্চা… ও শিশিরের নয়।’
সেই মুহূর্তে, বিস্ময়ে এবার আসমান ভাঙলো বকুলের মাথার উপরে!
কী বলছে এই মেয়ে? শিশিরের নয়? তবে কার? এই নতুন তথ্যে বকুলের শরীর যেন চক্রাকারে ঘুরে উঠল… এক মুহূর্তে সব অভিযোগ, ঘৃণা এবং ক্রোধ যেন থমকে গেছে…
শীতের নরম রোদ কাঁচের জানালা ভেদ করে গাড়ির ভেতরে ঢুকছে। চারপাশের আবহাওয়া ঝকঝকে হলেও ভেতরের পরিবেশ ভারী। হাসপাতাল অভিমুখী রাস্তায় গাড়ির চাকা মসৃণভাবে গড়িয়ে চলেছে।
অরুণিমাভ স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর পাশে বসা দীক্ষা। ভোরবেলা বকুলকে হাসপাতালে তৃণার সঙ্গে রেখে অরুণিমাভ ফিরেছিলেন, একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের আগে আগে আবার ফিরবে, সেই কথা দিয়ে। কিন্তু দীক্ষার পীড়াপীড়িতে তাঁকেও আবার সাথে করে নিয়ে আসতে হয়েছে।
দীক্ষা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তাঁর চুলগুলো কেমন অগোছালো, চোখে গভীর এক বিষণ্ণতার ছায়া। যেন খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে, আর সেই ক্লান্তি তাঁর শরীর ও মনে এখনও লেগে আছে। দু’জনই দীর্ঘ সময় ধরে চুপচাপ।
অরুণিমাভ আড়চোখে একবার দীক্ষাকে দেখলেন। এই নীরবতা ভাঙা দরকার। এই মনমরা ভাবটা কাটানো দরকার। খুব হালকা কিছু দিয়ে শুরু করলেন তিনি।
‘আপনার প্রিয় রঙ কী, দীক্ষা?’
দীক্ষা চমকে উঠল যেন এতক্ষণ অন্য কোনো জগতে ছিল তার বিচরণ। আস্তে করে মুখ ঘুরিয়ে অরুণিমাভর দিকে তাকিয়ে শুধালো, ‘আমার? কেন?’
‘এমনিই। জানতে ইচ্ছে করল। বলুন না।’
‘ওহ,’ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল দীক্ষা, নীল। একদম গভীর নীল। আকাশের গাঢ় নীল।’ তাকাল আকাশ পানে যা এখন হালকা ধূসর রঙে ছেয়ে রয়েছে।
‘সুন্দর। গভীরতা আছে। জানেন, নীল রংটা স্থিরতা আর অনন্তের প্রতীক। ঠিক যেমন আকাশ আর সমুদ্র। তারা সবকিছু দেখে, সব ধরে রাখে, তবুও নিজেরা শান্ত থাকে।’
একটু থামলেন অরুণিমাভ। দীক্ষা আবারও ফিরে চাও।
অরুণিমাভ বলে চলেছেন, ‘জীবনের দিকে তাকালে দেখবেন, মাঝে মাঝে মনে হয় সব থেমে গেছে। কিছুক্ষণের জন্য আপনার পৃথিবীটাও হয়তো থমকে গেছে, তাই না? কিন্তু, এই থমকে যাওয়াটা আসলে একটা ভুল ধারণা। নদীকে দেখেছেন? সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কোনো পাহাড়, কোনো বিশাল পাথর, এমনকি তার প্রিয় বালুকাময় তীর, কারো জন্য সে থমকে যায় না। সে সব ভাসিয়ে চলে যায়। চলার পথে তার স্রোত কখনও বাড়ে, কখনও কমে, কিন্তু বয়ে চলাটা তার ধর্ম। সে জানে, স্থির হয়ে গেলেই পচে যাবে। তার অস্তিত্ব বিলীন হবে। আমাদের জীবনটাও ঠিক সেই নদীর মতো, দীক্ষা। যা কিছু কষ্টদায়ক, যা কিছু আঘাত করে, তাকে ভাসিয়ে দিতে হয়। নদীর মতো চলতে হয়। পথ হয়তো ভাঙবে, স্রোত হয়তো তীব্র হবে, কিন্তু ভেঙে পড়ার পর আবার নতুন করে পথ তৈরি করা যায়। কারণ, আপনি যদি থেমে যান, তবে আপনার চারপাশের ভালো জিনিসগুলোও আপনার কাছে পৌঁছাতে পারবে না।’
দীক্ষার চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জল। সে বোঝাতে চায় না। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
‘আমি জানি। কিন্তু কীভাবে… এত শক্ত হওয়া যায়?’
‘শক্ত হতে হয় না বরং শিখতে হয়। শক্ত হওয়াটা একটা আর্ট, একটা অভ্যাস। যেমন ধরুন, এই যে এখন আমরা তৃণার জন্য চিন্তিত। এই চিন্তাটা স্বাভাবিক। কিন্তু, আপনাকে শিখতে হবে, এই চিন্তার ভারে যেন আপনার ভেতরের শান্তি চাপা না পড়ে যায়। অন্যের চিন্তায় চিন্তিত হবেন অবশ্যই তবে আগে নিজেকে নিশ্চিন্ত রেখে। অত উতলা হতে হয় না দীক্ষা, নাকি নিজেকে এত এলোমেলো করতে হয়। দিনশেষে আপনার আপনি ছাড়া আর কেউ কি আছে?’
তিনি হাসলেন। দীক্ষা নিশ্চুপ, মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রয়েছে পাশে বসা মানুষটির দিকে। তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কোথাও না কোথাও এক ফালি আলোকরশ্মি।
‘মানুষের মনটা আসলে একটা কাঁচের ঘর নয়, যে সামান্য আঘাতেই চুরমার হয়ে যাবে। এটা একটা ইস্পাতের কাঠামো। যতবার আঘাত আসে, ততবার সেটাকে নতুন করে ঝালাই করার সুযোগ আসে। আপনি নিজেকে বলুন, আমি তো এই প্রকৃতির সন্তান, যে তৈরি করেছে গভীর সমুদ্র এবং বিশাল আকাশ, তাদের মতোই শক্তিশালী আমি… আমি থামবো না।’
দীক্ষা ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সে হাসার চেষ্টা করল। মনটা সত্যিই অনেক হালকা লাগছে। চারপাশের শীতের রোদটা যেন এখন একটু উষ্ণ মনে হচ্ছে।
‘খুব সুন্দর কথা বললেন। ধন্যবাদ, অরুণিমাভ। আমাকে মনে করিয়ে দিলেন… আমাকে চলতে হবে।’
‘চলতে হবে এবং হাসতে হবে। হাসবেন। দেখবেন, আপনার হাসিটা আপনার ভেতরের মেঘগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। জীবন তো এমনই, এক পশলা বৃষ্টি, তারপরই ঝলমলে রোদ।’
ঠিক সেই মুহূর্তে, দীক্ষার ব্যাগের ভেতরে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো বকুলের নাম।
দীক্ষা আর অরুণিমাভ দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকালেন।
বিশাল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে অরুণিমাভর বাড়িতে প্রবেশ করেই খালেদা হতবাক হয়ে গেলেন। গত রাতে বকুলের ফোনে তৃণার অসুস্থতা ও অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের খবর শুনে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। দুপুর নাগাদ এসে পৌঁছলেও, অরুণিমাভ যে এমন এক বিশাল প্রাসাদের মতো সম্পত্তির মালিক হতে পারেন, সেই কল্পনা তাঁর ছিল না। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী এবং কাঁচ-মার্বেলের ব্যবহার বাড়িটিকে এক অসাধারণ বিলাসিতা দিয়েছে।
হাসপাতাল থেকে তৃণার ছুটি হয়ে গেছে। তার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল। ডাক্তার নিশ্চিত করেছেন, পেটের সন্তানটিও নিরাপদ আছে। দীক্ষা ও অরুণিমাভর তত্ত্বাবধানে তৃণা এখন লিভিং এরিয়ার আরামদায়ক সোফায় একটি কম্বল জড়িয়ে বসে আছে।
আরহাম এবং আয়ান এই মুহূর্তে তাদের নিজেদের ঘরে ঘুমোচ্ছে। তাই পরিবেশটি শান্ত, কিন্তু চাপা উদ্বেগে ভারী।
লিভিং এরিয়ায় এখন সবাই উপস্থিত- খালেদা, দীক্ষা, তৃণা এবং অরুণিমাভ। অরুণিমাভ সবার মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন, তাঁর শান্ত উপস্থিতি যেন এই কঠিন পরিস্থিতিতে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। সবার চোখেই এখন অপেক্ষা, এই অপ্রত্যাশিত জটিলতার উৎস ও পরিণতি জানার জন্য।
লিভিং এরিয়ায় গভীর নীরবতা। তৃণা মাথা নিচু করে বসে আছে। খালেদার চোখে উদ্বেগের পাশাপাশি এখন জমে উঠেছে সীমাহীন ক্রোধ। দীক্ষার নীরবতা এবং অরুণিমাভর শান্ত উপস্থিতি- এই পরিবেশে খালেদার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
তিনি হঠাৎ সোফা থেকে উঠে তৃণার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর চোখে-মুখে আ গু ন, হাত দুটো যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে এসেছে মারতে।
‘এই দিন দেখানোর জন্য তোকে আমি নয়মাস পেটে ধরেছিলাম? অসভ্য মেয়েলোক, জা নো য়া র পশুর চাইতেও তুই যে অধম, নীচ…তোকে আজ আমি…’
তিনি তৃণার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে অপ্রত্যাশিতভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াল বকুল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে খালেদার হাত চেপে ধরল।
‘থামো ফুপি, থামো।’
বকুল শক্ত করে তাঁর হাত ধরে তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে দিল।
খালেদা অসহায়ের মতো চেঁচালেন, ‘কী বলছিস তুই! থামবো আমি, হ্যাঁ? এই মেয়েটার জন্য আজ সব কিছু নষ্ট হলো! ওকে তো মে রে ফেলা উচিত!’
‘আহ! চুপ করো তো! মা র লে কি সব ঠিক হয়ে যাবে? তাছাড়া…’ উশখুশ করে শেষ কথাটি বলে দিলো বকুল, ‘ওই সন্তান নাকি শিশির ভাই নয়।’
বকুলের কথায় খালেদা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তাঁর ক্রোধ মুহূর্তে পাল্টে গেল গভীর বিস্ময়ে। দীক্ষা ও অরুণিমাভও স্থির চোখে তাকিয়ে।
‘শিশিরের নয়? তবে কার? কী বলছিস এসব!’
বকুল তৃণার দিকে তাকালো। তৃণা তখন থরথর করে কাঁপছে, মাথা আরও নিচু করে নিয়েছে সে।
‘তৃণা, সবাইকে সত্যিটা বল। সব বল। তুই হাসপাতালেও কিছু খোলাসা করিসনি। এখন অন্তত আর চাপা দিয়ে রাখিস না। তোর কারণে অনেকগুলি মানুষের জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। আর এলোমেলো করিস না। প্লিজ।’
ঠকঠক করেই কাঁপছে সে। কি বলবে, কীভাবে বলবে, ভেতরে ভেতরে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অবশেষে কাঁপা কণ্ঠে মাটির দিকে চেয়ে নিজেকে প্রায় সোফায় মিশিয়ে নিতে নিতে আওড়ালো, ‘এই বাচ্চা… এটা শিশিরের নয়। এটা আমার… আমার এক গোপন অধ্যায়ের ফল।’
লিভিং এরিয়ার বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে শুনছে।
‘আমরা একসাথে এক ছাদের নিচে থেকেছি ঠিকই কিন্তু শিশির আমাকে বিয়ে করছিল না। তাই… আমি তাকে আমার কাছে আসতে দিইনি। আমাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়নি।’
‘তবে? তবে এটা কার?’ খালেদা শুধালেন।
তৃণার মুখটা দুঃসহ যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল।
‘রাসেল আর বিজয়। আমি… আমি তাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলাম। এই সন্তান তাদেরই।’
তৃণার কণ্ঠস্বর প্রায় ফিসফিসানির মতো শোনালেও, প্রতিটি শব্দ যেন বো মা ফাটার মতো তীব্র ছিল।
সেই মুহূর্তে পুরো ঘর নিশ্চুপ। এই ভয়াবহ স্বীকারোক্তি যেন সকলের চিন্তা ও অনুভূতির গতি থামিয়ে দিয়েছে। বকুলের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল, দীক্ষার চোখ দুটি বিস্ময়ে বিস্ফারিত। অরুণিমাভ শান্তভাবে বসে থাকলেও তাঁর চোখে এখন গভীর উদ্বেগ। এই কঠিন সত্য, যা কল্পনারও অতীত ছিল।
তৃণার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ভয়াবহ সত্যে পুরো লিভিং এরিয়া জমে গিয়েছে যেন। রাসেল এবং বিজয়ের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ফল এই সন্তান- এই কথাটি হজম করতে সকলেরই সময় লাগল। তৃণা প্রবলভাবে কাঁপছে, তার অপরাধবোধ ও যন্ত্রণায় সে যেন গুটিয়ে গেছে।
সে দীক্ষার দিকে তাকালো। দীক্ষার মুখমণ্ডল পাথরের মতো কঠিন, সেখানে কোনো রাগ বা করুণা- কোনো কিছুরই প্রকাশ নেই, কেবল এক স্থির, শীতল দৃষ্টি।
তৃণা মাথা নামিয়ে বলল ফের, ‘আমি পারতাম… আমি পারতাম এই কথাটা লুকিয়ে শিশিরের ওপর সব দোষ দিয়ে দিতে। এই সন্তানের ভার তাকে দিতে। সমাজও হয়তো বিশ্বাস করত। কিন্তু তাতে আমার পাপের বোঝা বাড়তোই শুধু। আমি যা করেছি, তার কোনো ক্ষমা নেই, জানি। তবু… আপা..’ কাঁপা গলায় উচ্চারণ করে ও, ‘তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস।’
তার স্বর কান্নার তোড়ে ভেসে যাচ্ছে এইবার।
‘আমি বুঝেছি গতকালকেই… নিজের জিনিস কেউ ছিনিয়ে নিলে বুকের ভেতরে কতটা যন্ত্রণা হয়। আমার ভুল হয়ে গেছে আপা। খুব বড় ভুল। আমি… আমি তোর বরকে ভালোবেসে ভুল করেছি। সেই ভালোবাসায় এতটাই অন্ধ ছিলাম যে তোর সব কষ্টকে তুচ্ছ মনে করেছি। তোকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছি বলতে গেলে। তোর সাজানো সংসারে আমি আমার সংসার খুঁজেছি। নিজের বোনের সঙ্গে এ কেমন ব্যবহার করেছি! তোর অনাগত সন্তানকে কষ্ট দিয়েছি… আমি… আমি তোর জীবনটা কে ড়ে নিতে চেয়েছিলাম!’
তৃণা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, ‘আমাকে ক্ষমা করে দে আপা। আমার পাপের ক্ষমা নেই জানি, তবু একটা সুযোগ দে। একবার… একবার আমার দিকে তাকা। আমি সত্যিই বুঝতে পেরেছি আমার ভুল। এই আঘাতের পর আমার চৈতন্য ফিরেছে… আমি তোর ঘর ভেঙেছি, তোর মন ভেঙেছি… আমার মতো খারাপ বোন পৃথিবীতে আর একটাও নেই।’
দীক্ষা অটল, এক বিন্দুও নড়ছেও না। তার চোখের স্থিরতা তৃণার যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিল।
তৃণা আর স্থির থাকতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে সোফা থেকে মেঝেতে নেমে এলো এবং দীক্ষার পা দুটো চেপে ধরল।
‘প্লিজ আপা। তোর পায়ে পড়ছি। একটা সুযোগ দে আমাকে। আমি তোর দাসী হয়ে থাকব, সব করব… শুধু একবার বল, তুই আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিস। প্লিজ!’
দীক্ষার পা ধরে সে কাঁদতে লাগল। দীক্ষার ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শরীরটা শিরশির করে কাঁপছে। তার বোন, আদরের বোন, আজ তার পায়ের কাছে….ক্ষমা চেয়ে কাঁদছে পাগলের মতো। দীক্ষা যেন নিজেকেই বলল, আমার কি ক্ষমা করা উচিত? জবাব দিলো মন, তীব্র চিৎকারে বলছে সে, না না না… কোনোভাবেই না। তার এই কান্না, এই দুঃখ, এই যন্ত্রণার চাইতেও হাজার হাজার গুণ বেশি যে দীক্ষা নীরবে দাফন করেছে হৃদয়ের আঙিনায়…
সে ধীরে ধীরে নিজের পা ঝেড়ে তৃণার স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত করে। এই প্রত্যাখ্যান ছিল তীরের ফলার চেয়েও তীক্ষ্ণ।
দীক্ষা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার কণ্ঠস্বর কড়া, শীতল, এবং দৃঢ়- সেখানে কোনো আবেগের জায়গা নেই।
‘মা, আমি ওকে ক্ষমা করতে পারছি না।’ গমগমে সুরে বেরোলো কথাগুলি, ‘আমার মন কিছুতেই ওকে ক্ষমা করতে চাইছে না। আর মনের ওপর জোর খাটানো যায় না। এই মুহূর্তে আমি ওকে ক্ষমা করলে, এই পাপের গুরুত্বটা আমার কাছেই কমে যাবে।’
তার দৃষ্টি ফিরল তৃণার দিকে, যে তখনও মাটিতে বসে কাঁদছে।
‘আমি মহান রবের দরবারে দোয়া করি, তিনি তোর মতো বোন যেন কাউকে না দেয়, কাউকে না।’
দীক্ষা এক মুহূর্তের জন্যও আর দাঁড়াল না। সে অরুণিমাভর দিকে একবার মাথা নেড়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিলো। সেই পদক্ষেপে ছিল কঠোরতা এবং নিজেকে সামলে রাখার এক নীরব প্রতিজ্ঞা।
অরুণিমাভ শান্তভাবে বসে শুধু এই কঠিন পারিবারিক ঝড়ের সাক্ষী হয়ে রইলেন।
দীক্ষা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর লিভিং এরিয়ায় আরও একবার নীরবতা নেমে এল। তৃণা তখনও মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসা। খালেদা যন্ত্রণায় কপাল চেপে ধরে সোফায় বসে আছেন। বকুল পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।
এই ভারী পরিবেশের মাঝে অরুণিমাভ নড়ে উঠলেন। তাঁর দৃষ্টি এবার তৃণার দিকে, ‘তৃণা, তুমি যে দু’জনের নাম বললে, রাসেল আর বিজয়। তাদের ঠিকানা বা ফোন নাম্বার কি তোমার কাছে আছে?’
তৃণা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো। তার মুখে ভয় আরও স্পষ্ট হলো, ‘বিজয়? তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। সে রাসেলের পরিচিত। কিন্তু… রাসেল, সে আমার কলেজের বন্ধু ছিল। ওর নাম্বার আমার ফোনে আছে।’
‘সে কীভাবে এই কাজ করার সাহস পেল? সে কি তোমাকে কোনো ভয়ভীতি দেখিয়েছিল?’
‘ও আমাকে দেখা করার জন্য ডেকে নিয়েছিল। তারপর এই কাজ করেছিল। আর বলেছিল, এই কথা যদি কাউকে বলি, তাহলে আমার খারাপ ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে। ভয়ে… ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলিনি।’ একটু থেমে যুক্ত করল, ‘শিশিরকেও না।’
তৃণা এখন জড়োসড়ো। সে অরুণিমাভর চোখে যে শীতল দৃঢ়তা দেখল, তাতে আরও ভয় পেল।
‘তোমার ফোনটি দাও আমাকে। রাসেলের নাম্বারটি দরকার।’
তৃণা কোনো দ্বিধা না করে তার ফোন বের করে লক খুলে অরুণিমাভের দিকে এগিয়ে দিল। অরুণিমাভ দ্রুত ফোনবুক থেকে রাসেলের নম্বরটি নিয়ে নিজের ফোনে তুলে নিলেন। এরপর ফোনটি ফেরত দিলেন তৃণার হাতে।
অরুণিমাভ সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল না, তাঁর মনে কী চলছে।
‘আমি একটু আসছি।’
অরুণিমাভ লিভিং এরিয়া ছেড়ে দ্রুত পা বাড়ালেন।
তিনি চলে যেতেই লিভিং রুমে থাকা বাকি তিনজনের ওপর যেন এক গভীর হতাশা নেমে এল। খালেদা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে আছেন, তাঁর শরীর মৃদু কাঁপছে। তৃণা এখন সোফায় বসে, তার চোখে রাজ্যের শূন্যতা।
এক মুহূর্তের নীরবতার পর, বকুল ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি সরাসরি তৃণার দিকে। তার কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ বা ঘৃণা নেই, বরং আছে এক ধরনের অপ্রিয় সত্যের উপলব্ধি।
‘জীবনটাকে কোথা থেকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছিস, নিজেই ভাব তৃণা। কতগুলো মানুষের জীবন তুই এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছিস… সব তোর ভুল সিদ্ধান্তের ফল।’
বকুল এক পা এগোল, ‘একটা কথা মনে রাখিস। একের ও এক হয়। তুই যা করেছিস, তাই ফিরে আসবে। তোর পাপের ফল তোকে ভোগ করতেই হবে। সময় আছে, বিশ্বাস করে নে। নিজের করা ভুলের অনুশোচনা কর।’
এই কথাগুলো বলে বকুলও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। সে দ্রুত পা ফেলে লিভিং এরিয়া থেকে বেরিয়ে গেল।
লিভিং রুমে শুধু পড়ে রইল অসহায় খালেদা এবং অপরাধী তৃণা। বাইরের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে নামছে, আর ভেতরের ঘরের পরিবেশেও নেমে এল এক গভীর, অন্ধকারময় অনিশ্চয়তা।
ঘরের বিশাল জানালা দিয়ে বাইরের সন্ধ্যার ধূসর আলো এসে পড়ছে। দীক্ষা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। বাইরে ও পাথরের মতো কঠিন ছিল, কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতরে তার ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। দীক্ষা দু’হাতে বুক চেপে ধরে। যে ক্ষমা সে দিতে পারল না, সেই প্রত্যাখ্যানের তীব্রতা যেন এখন তারই হৃদপিণ্ডকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
দীক্ষা অনুভব করছে, যার কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়, কখনও কখনও তার যন্ত্রণা ক্ষমা চাওয়া ব্যক্তির চেয়েও বহুগুণ বেশি হয়। কারণ, ক্ষমা করা মানে কেবল অন্যকে মুক্তি দেওয়া নয়, তা নিজের ভেতরের ক্ষতকে ভুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া। আর দীক্ষার ভেতরের সেই ক্ষত যে এখনও দগদগে। একটু স্পর্শ করলেই টাটকা র ক্ত ঝরে!
দীক্ষা মনে মনে শুধোলো, ‘ক্ষমা? কাকে করব? যে আমার সবকিছু কে ড়ে নিল এভাবে? যে আমাকে আমার স্বপ্নে সাজানো সংসার থেকে বের করে দিলো? আমার সুন্দর জীবনের ধ্বংসকারী যে…আমার সেই আদরের বোন, যে আজ আমার পায়ে ধরেছিল… আমি তাকে ক্ষমা করতে পারলাম না! আমার মন… আমার ভেতরের কোনো এক কোণ চিৎকার করে বলছে, ‘না!’ এবং এই না মানে যে না-ই…’
সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে এবার নীরবে জলের ধারা নামছে।
‘বিধাতা! কেন এমন করলেন? এই সত্যটা শোনার পর… আমার সব রাগ যেন কোথায় চলে গেল। তৃণার ওপর রাগ করার অধিকারও যেন চলে গেছে আমার। কিন্তু ওর অপরাধ? শিশির… ওর প্রতারণা… আমার সব স্বপ্নের খু ন… সেগুলো কি মিথ্যে হয়ে যাবে? এই যন্ত্রণার ভাগ আমি কাকে দেব?’
সে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের মুখ দু’হাতে ঢেকে ফেলে। তার ভেতরে এখন হাজারো অনুভূতির ঘূর্ণিঝড়। বোনের করুণ পরিণতি তার মনকে নরম করে তুলছে, কিন্তু শিশিরের বিশ্বাসঘাতকতা আর ঘর হারানোর বেদনা তাকে ক্ষমা করতে দিচ্ছে না। এই দ্বন্দ্বে দীক্ষার আত্মা গুমরে ম র ছে।
নিজের ওপর জোর খাটানো যায় না। দীক্ষা জানে, সে মিথ্যা ক্ষমা দিতে পারত না। কিন্তু সেই কঠিন সত্য বলার পর যে কষ্টটা বুকে চেপে বসেছে, তা যেন সব আঘাতের চেয়েও গভীর। এ কষ্ট কাউকে বোঝানোর নয়। এই দাহ শুধু তারই।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৭
অন্ধকার বাড়ছিল। বাইরের আলো ম্লান হয়ে আসছে। দীক্ষা মাথা নিচু করে শুধু একটি কথাই বিড়বিড় করে চলল।
‘আমি পারছি না… আমাকে ক্ষমা কর না, তৃণা। আমি বড্ড দুর্বল… আমি প্রতিশোধ চাই না, শুধু শান্তি চাই… আর সেই শান্তি আমাকে কেউ দিতে পারবে না… না তুই, না শিশির, না এই পৃথিবীর আর কেউ…’
আর ঠিক সেই সময়ে দরজায় দুটো টোকা পড়ল। দীক্ষা চমকে চাইলো। দরজার ফাঁক দিয়ে খুব আলগোছে উঁকি দিয়ে আছে একটি মাথা- অরুণিমাভ, মোটা কণ্ঠে তিনি অপ্রস্তুত গলায় জানতে চাইছেন, ‘আমি কি পারব? আই মিন ভেতরে আসতে পারব?’
