হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩২
তামান্না ইসলাম শিমলা
ভোরের মৃদু আলো ধীরে ধীরে অন্ধকার সরিয়ে দিয়েছে, হালকা কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে ।
শিশিরভেজা পাতায় রোদের সোনালি ছোঁয়া, পাখির মৃদু ডাক সব মিলিয়ে নতুন একটি দিনের সূচনা। টিপটিপ করে চোখ খুলে তাকায় তনয়া, মাথাটা অসহ্যকর যন্ত্রণা করছে।
চোখ খুলতেই অনুভব করল সে তেহরাবের বুকের সাথে মিশে আছে, একটু সড়ে আসল তনয়া। চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে উঠে দাঁড়াল, সারা শরীর ব্যথা। অসহায় মুখ করে তনয়া তাকাল তেহরাবের ঘুমন্ত মুখের দিকে, কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে দেখো!
তনয়া এদিক ওদিক তাকাল, তার ফ্রেশ হতে হবে। কিন্তু ওয়াশরুম কোথায়? আর জামাকাপড়ই বা কোথায় পাবে? আবারও বিছানায় বসে পরল, নিজের লম্বা চুল গুলো সারা শরীর ছড়িয়ে আছে। পেটে কোনো কিছু স্পর্শ পেতেই চমকায় তনয়া, ঘুরে দেখে তেহরাব তার দিকেই তাকিয়ে আছে ঘুম ঘুম চোখে।
তনয়া চোখ নামিয়ে নেয়, ভিষণ লজ্জা করছে তার।
“উঠলি কেন? আরেকটু ঘুমা, আমার তো আরো ঘুম পাচ্ছে, সারারাত একটুও ঘুমাতে দেসনি তুই।”
তনয়া ভ্রু কুঁচকায়, সে ঘুমাতে দেয় নি? কি মিথ্যুক লোক রে বাবা। তনয়াকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তেহরাব উঠে বসে, তনয়া তাকায় তার দিকে। বাহুতে, পিঠে অসংখ্য নখের আঁচড়, তনয়ার অনুশোচনা হচ্ছে, ইশ অজান্তেই এভাবে আঘাত করে বসল সে?
“ড্রেস পরে নে, বাড়ি যাব।”
তনয়ার ঘোর ভাঙে,
“ড্রেস পরব মানে? গোসল করব না?”
তেহরাব বিছানা থেকে নেমে মেঝে থেকে নিজের শার্টটা তুলে গায়ে জড়ায়। বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
“বাড়ি গিয়ে করিস, জলদি কর।”
“আমি এইভাবে বাড়ি যাব, ছিহ ছিহ নাহ.”
তেহরাব ভ্রু কুঁচকায়,
“ছিহ ছিহ করার মতো কি হলো? এখানে ওয়াশরুম নেই, আর ড্রেসও নেই৷ জলদি ড্রেস পরে নে এগুলোই!”
তনয়া বুঝল বিষয়টা, কিন্তু এভাবেও যে তার অস্বস্তি হচ্ছে। কিছু না বলে জামাটা হাতে তুলে নিয়ে তেহরাবের দিকে তাকাল,
“আপনি বাইরে যান, আমি চেঞ্জ করে আসছি।”
তেহরাব যেন তনয়ার কথা শুনল না, উল্টো গিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। তনয়া চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে তার কর্মকাণ্ড দেখছে,
“কি হলো বাইরে যান।”
“পারব না।”
তেহরাবের সাদাসিধা জবাব, তনয়া বিরক্তি নিয়ে বলে,
“পারবেন না মানে? আমি চেঞ্জ করব তো।”
তেহরাব তনয়ার পা থেকে মাথা অব্দি পর্যবেক্ষণ করল, ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“তো কর, আমি না করেছি নাকি?”
তনয়া আশ্চর্য হযে তাকিয়ে থাকে,
“আপনার সামনে চেঞ্জ করব নাকি?”
“হ্যাঁ অবশ্যই, সমস্যা কি?এমনিতেও তোর শরীরের এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই যা আমি ছুয়ে দেখিনি। এত লজ্জা কীসের?”
তনয়া পিছন ঘুরে দাঁড়াল, মনে মনে বিড়বিড়াল,
“অসভ্য লোক!”
“নে নে জলদি কর, সময় নেই।”
তনয়া ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই বলে,
“প্লিজ যান না।”
তেহরাব হায় তুলল, আরো খুটি গেড়ে বসল যেন।
“যাচ্ছি না, আমার সামনেই যা করার কর।”
তনয়া ঠোঁট উল্টায়, লজ্জায় কান্না পাচ্ছে তার। এমন সময় রিংটোনের শিব্দ ভেসে আসে তাদের কানে, তেহরাবের ফোন বাজছে। তেহরাব বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নেয়, স্ক্রিনে মায়ের নাস্বার দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে৷ বিড়বিড় করে বলে,
“এত্ত সুন্দর একটা দৃশ্য মিস করিয়ে দিলে।”
তেহরাব উঠে দাঁড়াল,
“জলদি চেঞ্জ করে বাইরে আয়।”
তেহরাব দরজা খুলে চলে গেল, তনয়া হাঁপ ছেড়ে বাঁচল৷ লোকটা চরম মাত্রার নির্লজ্জ!!
তনয়া দ্রুত ড্রেস পরে নেয়, চুল গুলো খোঁপা করে ওড়না পেচিয়ে বেরিয়ে আসে। তেহরাব বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কানে ফোন।
তনয়া দাঁড়িয়ে পরল, হাঁটতে পারছে না সে। পেটে প্রচুর ব্যথা করছে, যেন নাড়িভুড়ি জট পাকিয়ে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে সে,একহাত দিয়ে পেট চেপে ধরল।
তেহরাব ফোন রেখেপিছন ঘুরতেই দেখে কিছুটা সামনেই তনয়া দাঁড়িয়ে আছে, তনয়াকে দেখে তেহরাবের স্বাভাবিক লাগল না। দৌড়ে গেল তার কাছে, তনয়াকে একহাতে জড়িয়ে নিল,
“কি হয়েছে তোর? ঠিক আছিস তো?”
তনয়া অসহায় ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তেহরাবের দিকে তাকায়,
“পেট ব্যথা করছে আমার, অনেক বেশি।”
তেহরাবকে অস্থির দেখাল,
“বাইকে যেতে পারবি? নাকি অটো ভাড়া করব?”
তনয়া হুট করে জড়িয়ে ধরে তেহরাবকে, তেহরাব কিছুটা অবাক হয়। পরমুহূর্তে তনয়ার পিঠে হাত রাখে,
“বেশি কষ্ট হচ্ছে? সরি জান।”
“উঁহু, যেতে পারব।”
তেহরাবের খারাপ লাগছে, তার জন্যই বুঝি মেয়েটার এই অবস্থা!
“একটা কথা বলি?”
তেহরাবের ধ্যান ভাঙে, তনয়াকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করে,
“কি বলবি? বল।”
তনয়া মাথা নিচু করে বলে,
“সরি আপনাকে এত অপেক্ষা করানোর জন্য। “
তেহরাব হাসে, আলতো করে চুমু খায় তনয়ার কপালে।
“চল এখন, বাড়ি গিয়ে ওষুধ খেয়ে নিস ব্যথা কমে যাবে।”
তনয়া মাথা নাড়ে, অতঃপর দুজনেই রওনা দেয় বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ঘন্টা খানিক বাদে তারা বাড়ি পৌঁছায়, নিচে কাউকে না দেখতে পেয়ে দুজনেই নিজের রুমে চলে আসে৷ তেহরাব প্রথমে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে আসে, এখন তাকে মিলে যেতে হবে। তনয়াও ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসে, ততক্ষণে তেহরাব চলে গিয়েছে, তনয়া বারান্দায় আসে, গামছা মেলে দিয়ে রুমে আসতেই দেখে টি টেবিলের উপর খাবার ও মেডিসিন রাখা, সাথে একটু চিরকুট। তনয়া প্রথমেই চিরকুটটা হাতে নেয়,
“খেয়ে দেয়ে মেডিসিন নিবি, তারপর রেস্ট নিবি৷ নিচে যাওয়ার দরকার নেই, আম্মুকে বলে রেখেছি। ভালোবাসি!”
তনয়ার অধর প্রস্বস্থ হয়, মনে মনে নিজেও বলে,
“ভালোবাসি।”
ধরণীতে সন্ধ্যা নেমেছে, চারপাশে রক্তিম আভা। তাসলিমার ঘরে বসে আছে ইরা ও তনয়া, আর তাসলিমা গিয়েছে নিচে।
“এইযে ভাবি, গতরাত কেমন কাটলো হুমমম??”
ইরার দুষ্টু স্বরে বলা কথায় কিছুটা লজ্জা পেল তনয়া, মুচকি হেসে মাথা নিচু করে ফেলল। ইরা তনয়া হাত ধরে বলে,
“এত লজ্জা রাখো কোথায় বলোতো? আমার তো বাপু একটুও লজ্জা লাগে না।”
তনয়া আবারও হাসে, মনে মনে বলে,
“ভাই যেমন বোনও তো তেমনই হবে।”
“সে যায়হোক, রেজাল্টের পরে কি করবে কিছু ভেবেছ?”
ইরার কথায় তনয়া তার দিকে তাকায়,
“এখনো কিছু ভাবিনি, রেজাল্ট দেক আগে!”
“হেই বোকা মেয়ে, এখন থেকেই তো প্রিপারেশন নিতে হবে। কোন কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা আছে? বা কি হওয়ার?”
তনয়া নিশ্চুপ হয়ে গেল, কিছু একটা ভাবছে সে। আনমনে জবাব দিল,
“মানুষ অন্যায় করলেও টাকা থাকলে পার পেয়ে যায়, টাকার মূল্য মানুষের জীবনের থেকেও বেশি তাইনা?”
তনয়ার মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে ইরার হাসি মুখটায় ভর করে অবাকতা,তনয়ার এসব কথার মানে বুঝল না সে।
“হঠাৎ এমন কথা বলছ যে? কিছু হয়েছে তনয়া?”
তনয়া চমকায়, দ্রুত মাথা নাড়ায়,
“নাহ নাহ, কি হবে! যায়হোক, ইচ্ছা ছিল মেডিকেলে পড়ব, বাকিটা আল্লাহর হাতে।”
ইরা হাসল,
“অবশ্যই, তোমার রেজাল্ট ভালোই হবে। সাহিল তো প্রায় তোমার কথা বলে, পড়াশোনায় নাকি অনেক ভালো৷ আর মেডিকেলে যেহেতু পরতে চাও তবে এখন থেকেই আবারো পড়াশোনা শুরু করো, বিভিন্ন ভালো লেখকের বই আছে এগুলো পড়তে পারো। ভাইয়াকে বলে দেখো, বই এনে দিবে নি।”
তনয়া মাথা নাড়ে, ভালো লাগছে না তার। এমন সময় ঘরে প্রবেশ করে তাসলিমা,
“ইরা তোর আব্বারে কল করতো, বল আমার প্রেসারের ঔষুধটা আনতে। আর তনয়া, তুই মা এক কাজ কর। তেহরাব চলে আসবে এখুনি, ওর জন্য নুডুলস রান্না কর।”
ইরা ইউসুফকে কল করে ফোনটা তাসলিমার হাতে ধরিয়ে দেয়, তনয়ার কাছে এসে বলে,
“চলো দুজনে মিলে করি, নুডুলস না পাস্তা রান্না করব। চলো চলো!”
তনয়া উঠে দাঁড়ায়, তার আশেপাশের মানুষগুলো এত চমৎকার কেন? সে এতই ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে?
তনয়া আর ইরা মিলে রান্না ঘরে আসে, তনয়া পাস্তা সিদ্ধ করতে বসিয়ে দেয়। ওদিকে ইরা চিজ বের করছে, কিছু সময়ের মধ্যেই ঝটপট পাস্তা রান্না করে ফেলল তারা৷ বাটিটা টেবিলে রাখতেই কলিং বেল বেজে উঠল।
“আমি যাচ্ছি।”
ইরার কথায় তনয়া পা বাড়ায়, বলে
“তুমি বসো, আমি যায়।”
তনয়া এসে দরজা খুলে দিল, ইউসুফ এসেছে। হাত ভরতি তার শপিং ব্যাগ, বাবার হাতে এত ব্যাগপত্র দেখে ইরা দ্রুত এসে সোফায় বসে।
“কি এগুলো?”
ইরা বসে পরে ইউসুফের পাশে, ইউসুফ মুচকি হাসে,
“বলছি, তার আগে একটু পানি খাওয়াও তো তনয়া।”
তনয়া মুচকি হেসে পানি এনে ইউসুফকে দেয়, পানি পান করে গ্লাসটা টেবিলেই রাখে।
“তিনটে শাড়ি এনেছি, ভালো লেগেছিল তাই। একই ডিজাইনের শুধু কালার ভিন্ন, গোলাপিটা তোর মায়ের, বেগুনিটা তোর আর নীলটা তনয়ার!”
ইরা চট করে নিজের শাড়িটা হাতে তুলে নেয়, খুলে দেখে ঢাকায় জামদানী শাড়ি। বেশ পছন্দ হয়েছে তার, তনয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইউসুফ তার শাড়ির প্যাকেটটা তনয়ার দিকে এগিয়ে দেয়।
“তোমারটাও খুলে দেখো, ভালো লেগেছে কিনা।”
তনয়া হাতে নিল, খুলে দেখল নিজেরটাও। শাড়িটা সত্যি সুন্দর, হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
“সুন্দর হয়েছে।”
ইউসুফ হাসে, তাসলিমার জন্য আনা শাড়িটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়,
“থাক তোরা,আমি তোদের মায়ের শাড়িটা দিয়ে আসি।!”
ইউসুফ চলে যায়, ইরা তনয়ার সামনে এসে দাঁড়াল,
“কালকে দুজনে পরে ছবি তুলব ঠিক আছে?”
তনয়া মকথা দুলায়, এই পরিবারটা তার। সে মিশে গিয়েছে মানুষ গুলোর মাঝে, অথচ একটা সময় সে ভাবত এই মানুষগুলো হয়ত তাকে মেনেই নিতে পারবে না। আর আজ এই মানুষ গুলোই তার আপন, একটু বেশিই আপন। কাছের কেউ!
আবারো কলিং বেল বেজে উঠে, এবার ইরা গিয়ে দরজা খুলে। তেহরাব এসেছে, অথচ তেহরাবকে প্রচুর রাগান্বিত দেখাচ্ছে, ইরাকে পাশ কাটিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়েই গট গট করে উপরে চলে গেল। ইরা ও তনয়া দুজনেই অবাক হলো,ইরা দরজা বন্ধ করে তনয়ার কাছে আসল,
“ভাইয়ার আবার কি হলো বলোতো? এত রেগে আছে কেন?”
তনয়া উপর থেকে দৃষ্টি সড়িয়ে ইরার দিকে তাকায়,
“কিজানি, আমিও তো বুঝতে পারছি না।”
“তুমি উপরে যাও।”
তনয়া এক পলক তাকিয়ে উপরে চলে আসে, দরজা সামনে এসে দাঁড়ায়৷ বিছানায় হাতের উপর ভর দিয়ে বসে আছে তেহরাব, মাথা নিচু করে। তনয়া ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ হলোটা কি? ভয় নিয়ে নিজেও ভেতরে আসল, তেহরাবের সামনে এসে দাঁড়াল,
“কি হয়েছে আপনার?”
তেহরাব জবাব দিল না, ওভাবেই বসে রইল। তনয়া সাহস করে তেহরাবের কাঁধে হাত রাখল,
“শুনছে…..
বাকিটা বলার আগেই তনয়ার গালে এসে পরল তেহরাবের শক্ত হাতের থাপ্পড়, আকস্মিক আঘাতে তনয়া ছিটকে পরল নিচে। গালে হাত রেখে ছলছল দৃষ্টিতে তাকাল তেহরাবের দিকে, তেহরাব দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, তনয়া বুঝল না কেন তেহরাব তাকে মারল। সে তো কিছু করেনি।
তেহরাব বসে পরে তনয়ার সামনে, চেপে ধরে তনয়ার গাল। হিসহিসিয়ে বলে,
“কেন আমাকে সব লুকাচ্ছিস? কি ভেবেছিস কিছুই জানব না?”
তনয়া ভয় গেয়ে যায়, বুঝতে পারে না তেহরাবের কথার মানে। নিজের গালের উপর থাকা তেহরাবের হাতের উপর হাত রাখে তনয়া,
“কি বলছেন এসব, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি।”
তেহরাব আরো শক্ত করে চেপে ধরে তনয়ার গাল,
“একদম নাটক করবি না, একদম মেরে ফেলব। বালিয়া কেন গিয়েছিলি? শিহাবের সাথে দেখা করতে?”
তনয়া চমকায়, তেহরাব জানল কি করে? শুঁকনো ঢোক গিলে তনয়া, চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে,
“লাগছে আমার, ছাড়ুন প্লিজ।”
“চুপ, একদম চুপ। মেরে ফেলব তোকে আমি, তুই যেখানে খুশি যখন খুশি যার সাথে খুশি যা আমার কোনো সমস্যা নেই,কিন্তু আমাকে লুকিয়ে? কেন তনয়া কেন? বল?”
তেহরাবের ধমকে তনয়া কেঁপে উঠে, সাথে সাথে কান্না করে দেয়। তেহরাব ছেড়ে দেয় তনয়াকে, চেপে ধরে নিজের মাথার চুল। তনয়া নিজের গালে হাত রেখে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকায় তেহরাবের দিকে,
“ আ আসলে…
পুনরায় তেহরাবের অগ্নিদৃষ্টি দেখে কথা আঁটকে যায় তনয়ার, মাথা নিচু করে ফেলে তৎক্ষনাৎ। হিচকি তুলতে তুলতে বলে,
“আ আমার এ এসএসসির সার্টিফিকেটে ভুল ছিল, উনার মানে শ শিহাব ভাইয়ের কাছে ঠিক করতে দিয়েছিলাম। সেটাই দিতে এ এসেছিল আমাকে, আ আর আমি বুঝতে পারিনি একুটুর জন্য আ আপনি এত রাগ করবেন!”
তেহরাবের অধরে ফুটে উঠে তাচ্ছিল্যের হাসি,
“তনয়া তুই মিথ্যেটা অন্তত আমার সামনে বলতে আসিস না, তোকে আমি খুব ভালো করে চিনি, জানি। শুধু আফসোস একটাই, তুই আমাকে বিন্দু মাত্র চিনিস নি।”
তনয়া আমতাআমতা করে বলে,
“ মা মানে?”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে করে কপাল চেপে ধরে, ঠোঁট ফাঁক করে শ্বাস ফেলে।
“আমার সামনে থেকে যা প্লিজ।”
“এমন করছেন ক কেন, আম আমি সত্যি বলছি!”
তেহরাব অতি শীতল কন্ঠে আবারও বলল,
“ভালো করে বলছি তনয়া, আমি দ্বিতীয়বার তোর শরীরে হাত তুলি তার আগে তুই বেরিয়ে যা।”
তনয়া তেহরাবের কাছে আসল,
“আমাকে বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি……
তেহরাব ধপ করে চোখ মেলল, তনয়ার বাহু ধরে দাঁড় করাল। দরজার সামনে এসে তনয়াকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়,
“যেদিন সত্যিটা বলার সাহস পাবি, সেদিন আমার সামনে আসবি। তার আগে না, মাইন্ড ইট।”
বলেই ধপ করে দরজা লাগিয়ে দেয় তেহরাব, তনয়া মুখে হাত রেখে কান্না করতে থাকে। তেহরাব তাকে ভুল বুঝছে, হয়ত উনি ভাবছে শিহাবের সাথে কোনো খারাপ সম্পর্ক আছে, কিন্তু এটাতো সত্যি না। আসলে তো…..
তনয়ার ভাবনার রেশ কাটে ভেতর থেকে ভাঙচুরের শব্দ পেয়ে, শব্দ পেয়ে ইরা ইউসুফ তাসলিসাও ছুটে আসে। তনয়াকে বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে সবাই অবাক হয়,
“কি হয়েছে তনয়া? তেহরাবের কি হয়েছে? “
তনয়া জবাব দেয় না তাসলিমার কথায়, মনে মনে বলে,
“এই কারনেই আমি চাইনি আপনার হতে,আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারে না।”
ঘরের ভেতর থাকা একের পর এক জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে তেহরাব, তার মাথা কাজ করছে না। তার রাগ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, তবে এর জন্য না যে তনয়া শিহাবের সাথে দেখা করেছে, কারনটা একটাই তা হচ্ছে তাকে লুকানো। তেহরাব নিচে বসে পরে, হেলান দেয় বিছানার সাথে। রাগে, দুঃখে আপনাআপনি চোখ দিয়ে পানি পরছে তার,
“তুই কি ভেবেছিস তনয়া আমি কিছুই জানি না? এই পৃথিবীতে তোকে সবচেয়ে বেশি যদি কেউ চিনে ও জেনে থাকে সেটা হলাম আমি। এই তেহরাব সরকার, তবে আমি চাই তোর মুখ থেকে জানতে। তুই না বললেও আমার কোনো যায় আসত না, আমার খারাপ লাগার দিকটা হচ্ছে তুই আমাকে না বলে শিহাবকে বলছিস। তোর বিষয়ে বাইরের একটা ছেলে জানছে, অথচ আমি তোর স্বামী, আমাকে তুই কিচ্ছু বলতে পারছিস না। এত ভয় পাস? বিশ্বাস নেই আমার উপর? তবে থাক তুই, যেদিন তোর মসে আমার প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস, আস্থা আসবে সেদিনই আসিস তুই আমার সামনে৷ আমার ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে তোর মনে খুঁতখুঁত আছে তাই তো ভাবছিস সত্যিটা বলার পর আমি তোকে ভুল বুঝব, তুই সত্যি বোকা তনয়া। আর তোর এই বোকামির জন্য আমাকে যন্ত্রণা পোহাতে হয়, আর কত?”
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩১
তেহরাব চোখ বন্ধ করে নেই, সময় পেরোতে থাকে, ধীরে ধীরে দরজার ওপারে থাকা মানুষ গুলোর ডাকাডাকিও কমে আসে। তবে কমে না দুটি মানুষের যন্ত্রণা, দুজনেই পুড়ছে তার ভালোবাসার মানুষের দহনে। গোটা রাতই বুঝি এভাবেই যাবে? নাকি গোটা জীবন?
