হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৩
তামান্না ইসলাম শিমলা
মধ্যরাত, চাঁদের মৃদু আলোতে আলোকিত চারপাশ। ছাদের এক কোণে বসে আছে তনয়া, কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার।
তেহরাব আর দরজা খুলেনি, তাসলিমা ইরা বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও যখন কোনো উত্তর পেল না তখন তনয়াকে ইরার সাথে শুতে বলে তারা চলে গেলেন। তবে তনয়ার যে ঘুম নেই, তাই তো ফোনটা নিয়ে বসে আছে ছাদে।
চোখ মুখ ফুলে আছে তার, ফোনটা হাতে নিয়ে মায়ের নাম্বারে ডায়াল করে। হয়ত ঘুমিয়ে গিয়েছে, কিন্তু না ফোন কল রিসিভ হলো। তনয়া অনুভূতি শূন্য ভাবে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে,
“এত রাতে কল করলি যে? কিছু হয়েছে? “
তানিয়ার কথায় তনয়ার চোখ বেয়ে আবারও পানি গড়িয়ে পরল,
“আম্মু আমি আর পারছি না, এসব লুকাতে পারছি না আমি।”
তানিয়া সোজা হয়ে বসলেন, বিছানা থেকে নেমে বেরিয়ে আসলেন বাড়ির বাইরে।
“কি বলছিস এসব?”
তনয়া কেঁদে উঠল,
“আম্মু সব বলে দেব উনাকে, নিজেকে অপরাধী লাগছে আমার।”
তানিয়া কিছু গম্ভীর হলেন,
“চুপ কি বলছিস, কিচ্ছু বলবি না।”
তনয়ার রাগ হলো, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বলব না মানে? তোমার কথা মতো আজ আমি শিহাব ভাইয়ের সাথে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, আর উনি সবটা জানে। উনি খারাপ ভাবছে আমাকে, আমি এসব নিতে পারছি না আম্মু।”
তানিয়া চমকায়,
“জানে মানে? তুই বলিস নি সার্টিফিকেটের কথা?”
“বলেছি তবে বিশ্বাস করেন নি, আর আমি উনাকে আর মিথ্যা বলতে চাই না। আমি কালকেই সবটা বলে দেব উনাকে, আমি…..
তনয়াকে আর কিছু না বলে তানিয়া অস্থির কন্ঠে বলে উঠে,
“চুপ, একদম না তনয়া। এমনটা করিস না, সব শেষ হয়ে যাবে, রিপোর্ট গুলো আসতে দে। আসি জানি আল্লাহ রহমত করবে!”
তনয়া আরো শব্দ করে কেঁদে উঠে,
“প্লিজ আমাকে আটকিও না, যা হওয়ার হোক আমি আর কিচ্ছু লুকাতে চাই না। এতে যদি উনি আমাকে ছেড়ে দেয় তবে দেক, এভাবে আমি থাকতে পারব না।”
তানিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দিল তনয়া, হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। মিথ্যা নিয়ে বাঁচা যায় না, সে চাইও না।
ভোরের আলো চোখে মুখে এসে পরতেই চোখ খুলে তনয়া, রাতে এখানেই ঘুমিয়ে পরেছিল সে। সোজা হয়ে বসল, মাথায় ঘোমটা টেনে উঠে দাঁড়াল, পা বাড়াল নিচের দিকে।
নিজের রুমের সামনে আসতেই দেখে দরজা খোলা, অধর জোড়া প্রস্বস্থ হয় তনয়ার। দ্রুত রুমে প্রবেশ করে, সাথে সাথে মুখটা মলিন হয়ে যায়। তেহরাব নেই, কোথাও নেই। তবে কি চলে গিয়েছে?
বিছানায় বসে পরল তনয়া, আবারো কান্না পাচ্ছে তার।
“ক্ষমা করে দিন আমাকে, আমি ভুল করেছি।”
নিজেকেই নিজে বলল তনয়া, চোখের পানি মুছে ফোনটা হাতে নিল। কল করল তেহরাবকে, একবার দুবার করে বারকয়েক কল করল তবে লাভ হলো না৷ তেহরাব কল ধরছে না!
নিজের প্রতি রাগ হচ্ছে তার,
“একটাবার কলটা ধরুন, প্লিজ একটা বার।”
হাত পা বাঁধা অবস্থায় পরে আছে তেহরাব, কপালের আঘাতপ্রাপ্ত স্থান শুকিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। মাথা ভন ভন করছে, ঝাপসা দেখছে সব কিছু, রিংটোনের শব্দে টিপটিপ করে তাকায় তেহরাব।
মাথা টনটন করছে, জ্বিভ ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে আশপাশটা দেখল, আপাতত সে ব্যতিত আর কেউ নেই। কিন্তু সে এখন কোথায়? মনে করার চেষ্টা করতে লাগল তেহরাব। জায়গাটা চেনা চেনা লাগছে।
গত রাতে তার কাছে একটা কল আসে, সেই ভিক্ষুকের ফোন। ফোন দিয়ে বলে মাহিম নাকি অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পরে আছে, এ কথা শুনে তেহরাব সেই রাতেই বাইক নিয়ে চলে আসে সেখানে। তবে সেখানে ভিক্ষুক বা মাহিম কেউই ছিল না, তারপর? তারপর কি হলো? তার মাথায় আঘাত লাগল, তারপর? উহু আর কিছু মনে পড়ছে না তো, তেহরাবের টনক নড়ে। বিড়বিড়ায়,
“মাহিম! মাহিম কোথায়?”
এমন সময় দরজা খোলার শব্দ আসে তেহরাবের কানে, চোখ মেলে তাকায় সেদিকে। সাসরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিকে দেখে প্রচুর অবাক হয় তেহরাব, তার সামনে সাদা লুঙ্গি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিজু। তারমানে সবটা জেনে গিয়েছে??
আরো কয়েকজন লোক আসল ঘরে, তেহরাবকে সোজা করিয়ামে বসিয়ে দিল৷ মিজু তেহরাবের সামনে এসে দাঁড়াল, শক্ত করে লাথি বসালো বুকে। তেহরাব ব্যথায় চোখ বন্ধ করে নিল, মিজু কলার চেপে ধরল,
“আগেই বলছিলাম ছোকরা আমার সাথে লাগতে আইসো না, কে শুনে কার কথা? তুমি তা ব্যাডা আমর নাতিনরেই বন্দি বানাই রাখছিলা, বুকে সাহস আছে মাইরি।”
তেহরাব চোখ খুলে, চোখ দিয়ে যেনো লাভা ঝড়ছে,তবে অধরে বাঁকা হাসি বিদ্যমান। বাঁধা পা দিয়েই আঘাত করল মিজুকে, মিজু পরে গেল নিচে। সাথে সাথে লোক গুলো তেহরাবের দিকে তেরে আসতে নেই, তবে মিজুর হাতের ইশারায় থেমে যায় সে। পানের পিচকি ফেলে বলে,
“উঁহু, এই বান্দারে আমি নিজে দেখমু! তা বল এহন, আমার মাহিমরে আটকায় রাখছিলি কেন?”
তেহরাব কিছু বলে না, শুধু অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিজুর দিকে। মিজু ঠাঁস করে চড় বসিয়ে দেয় তেহরাবের গালে,
“বাইন**দ কথা বল, এত্তগুলা দিন আমার নাতিটারে কম অত্যাচার করছস?”
তেহরাব আবারো হাসে, ঠোঁট কামরে বলে,
“মেরে যে ফেলিনি তাই তো বেশি!”
মিজুর রক্ত চড়ে যায় মাথায়, উঠে দাঁড়িয়ে আবারো লাথি মারে বুকে।
“শালা সাহস মাইরি, মন এহন। তোর লাশ আমি কুত্তা দিয়া খাওয়ামো শু**বাচ্চা, আর যেই মা*গির লিগা এত কিছু ওইটারে যে কি করমু। শালিরে বাঁচায় রাইখাই ভুল করছি, আর তুই তো হুদাই বাও হাত ঢুকাইলি।”
এতসময় নিজেকে বলা কথাগুলো মানতে পারলেও তনয়াকে নিয়ে বলা কথাটা হজম হলো না তেহরাবের, ঝংকার তুলে বলল,
“ওই কুত্তার বাচ্চা কারে গালি দেস তুই? তেহরাব সরকাররে তুই চিনস না, তনয়াকে নিয়ে আর একটা কথা বললে তোরে কবর চিনাইয়া নিয়া আসুম শু**র!”
মিজু দাঁত বের করে হাসল, চু চু শব্দ করে মাথায় লাথি মারে।
“মা*গির লিগা কত দরদ মাইরি, হেই তো মেনষের ছুঁয়া জিনিস।”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে নেয়, এসব সে শুনতে পারবে না।
“যেদিন থিকা শুনছি তুই তনয়ারে বিয়া করছস ওইদিন থিকায় মনটা কেমন করতাছিল। তাইতো লোক লাগাইছিলাম তোর পিছে, তোরে পরান বাড়ি যাইতে দেইখা আমারে বলছে। তহনও জানতাম না আমার নাতিরে তুই এমনে বন্দি কইরা রাখছছ। কালকের আগের দিন আমার লোকেরা ওই বাড়িতে গেলে দেহে আমার মাহিমটা কি অবস্থায় পইরা আছে, ইশ আমার ভাইটা। ফকির বেডারে আটকায় রাইখা কল দেওয়াইছি তোরে, এহর মর শালা। আমার নাতিডার কি অবস্থা, হাসপাতালে ভর্তি, কথা কইতে পারে না ভালা মতো। পাগল বানাই ছাড়ছস, কি করছিল তোর লগে? কোন এক মা*গির লিগা তুই কিনা আমার নাতিরে এমনে পাগল বানাইলি? শালা বাই*****দ।”
একদমে কথা গুলো বলে থামল মিজু, পাশে থাকা লোকদেরকে ইশারা করে বলল,
“এমন মাইর মারবি এর যেন দম না থাকে, থুতমা জানি চেনা যায় না, তার নদীর পারে ফালাই আসবি। নিজের মরন নিজে লেখছে, লগে ওই মা*গিরও।”
তেহরাবের কপালের রগ গুলো ফুলে উঠেছে, চিৎকার করে বলল,
“আমাকে যা ইচ্ছা কর, তনয়ার যদি কিছু হয়রে মিজু তোর পুরা বংশ নির্বংশ করে ছাড়ব।!”
মিজু শব্দ করে হাসল,
“তা করিস, তনয়াও তো আমাগই, ওরে দিয়াই শুরু করি কি কস?”
“কুত্তার*বাচ্চা, সাহস থাকলে হাত পায়ের বাঁধন খুলে দে, কে কি করে দেখাবো।”
তেহরাবের কথায় কিছুটা মজা পেল মিজু, মুখ দেখে তাইতো মনে হচ্ছে।
“যারে জসিম, খুইলা দে, দেহি কি করে।”
মিজুর কথা মতো হাত পা খুলে দিল জসিম, সাথে সাথে লাথি মারল জসিমকে৷ উঠে দাঁড়িয়ে মিজুকে পেটে একটা লাথি মারতেই সে পরে যায়, তবে বাকি লোক গুলো এসে তেহরাবকে ধরে ফেলে।
সবাই মিলে মারতে থাকে তেহরাবকে, তেহরাব কি করবে বুঝতে পারছে না। সে একা এত গুলো মানুষের সাথে পারবে না, সে কোনো গল্প সিনেমার হিরো নয় যে একাই পাঁচ ছয়জন মানুষের মোকাবেলা করতে পারবে, সে মানুষ। সাধারণ মানুষ।
তেহরাব আলগোছে ফোনটা বের করে ফাহিমের নাম্বারে কল করে, ফাহিমের বাসা মিজুর গোডাউনের পাশেই। ফোনটা ছুঁড়ে মারে নিচে, লোকগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করে চিল্লিয়ে বলে,
“ফাহিম, মিজুর গোডাউনে আয় এখুনি, জলদি পুলাপান নিয়ে।”
ওপাশ থেকে ফাহিম অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেও জবাব দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই তেহরাবের। মিজু ততক্ষণে চলে গিয়েছে বাইরে, তেহরাব আর পারছে না। সে একলা কতক্ষণ পারবে এদের সাথে। তার উপর মাথা থেকে রক্ত ঝড়ছে, ইতিমধ্যে একজনকে বলতে শুনে,
“এত না মাইরা চাক্কু মার, তাই তো হয়।”
জসিম মাথা নেড়ে বলে,
“হো নিয়া আয়, শালার শইল্লে মেলা শক্তি।”
সাথে সাথে ছেলেটা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, তেহরাব বসে পরল নিচে, কেউ একজন বাঁশ দিয়ে মাথায় আঘাত করছে। এতসময় তাদের আটকাতে পারলেও এখন আর জোর নেয়, তার সামনে ভাসছে তার মৃত্যু৷ আর কিছু সময়ের মাঝেই হয়ত সে শেষ হয়ে যাবে, তেহরাব মাথায় হাত রাখে। মনে মনে বিড়বিড়ায়,
“তনয়া শেষ দেখা কি হবে না? কালকে তোকে খুব জোরে মেরেছি তাই না? ক্ষমা করে দিস জান।”
এমন সময় একটু ছুড়ি এসে লাগে তেহরাবের পেটে, পরপর চারবার। পঞ্চমবার আঘাতটা লাগে তেহরাবের বুকে, নাহ সে বোধহয় আর বাঁচবে না। এই বুঝি সব শেষ? পুরোপুরি ঢলে পরল তেহরাব,প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। শ্বাস নিতে পারছে না তো, ঝাপসা হয়ে আসছে সব।
এসন সময় নজরে পরল ফাহিম সহ তার কিছু লোকদের, ফাহিম দৌড়ে আসল তেহরাবের কাছে। তবে তেহরাব কিছু বলতে পারল না, তার কানে বিপবিপ শব্দ হচ্ছে। আশে পাশের কোনো আওয়াজ কানেই যাচ্ছে না, তার বুঝি সময় ফুরিয়ে এলো?
মনে মনে বলল,
“ শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে একটা বার কি তোকে দেখতে পারতাম না? ভালোবাসি তনয়া, দেখ আমি তোর ধর্ষনকারীকে শাস্তিও দিয়েছি, আমাকে ক্ষমা করে দিস?”
“তেহরাব, এই তেহরাব, তাকা বলছি তাকা।”
তেহরাব টিপ টিপ করে তাকাল ফাহিমের দিকে, ঝাপসা দৃষ্টিতে ভালোই চিনতে পারল। অধর জোড়া প্রস্বস্থ হলো কিঞ্চিৎ, ফাহিম এখনো ডেকে চলছে,তবে তেহরাব তো কিচ্ছু বলছে না। সে তো ভাবছে, তনয়াকে ভাবছে। শুনেছে মৃত্যুর আগে নাকি শেষ সাত মিনিট মস্তিষ্ক সব স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য দেখায়, তেহরাবও তার এলোকেশীকে দেখছে। চোখের সামনে ভাসছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছু, আর যদি দেখা না হয় তখন? তখন কি হবে? তনয়া কি অন্য কারো হয়ে যাবে? পারবে? কই তেহরাবতো পারত না, নিজের উপর হাসল তেহরাব। এমন সময়ে এসেও সে কিনা স্বার্থপর চিন্তাভাবনা করছে?
ফাহিম সহ কয়েকজন মিলে তেহরাবকে কখন গাড়িতে তুলেছে সে খেয়ালও তেহরাবের নেই। এখন গাড়ি চলছে, তেহরাব শক্ত করে চেপে ধরল নিজের বুক, যেখান থেকে এখনো রক্ত পরছে। ফাহিমের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ ত তন তনয়ার যেন ক কিছু না হয়, না নাহলে আ আমি কিন্তু ম মিজু মিজুকে ছাড়ব না।”
ফাহিম এক হাত দিয়ে তেহরাবের পেটের আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে চেপে ধরে রেখেছে, অস্থির কন্ঠে বলল,
“কিচ্ছু হবে না, তুই চোখ খুলে রাখ। বন্ধ করিস না, ভাই প্লিজ বন্ধ করিস না। এই মামা জোরে চালাও না অটো।”
ফাহিমের চোখেও পানি, তেহরাবযে তার বেস্ট ফ্রেন্ড। ভালো খারাপ সব পরিস্থিতির সঙ্গি, এই ছেলে চলে গেলে কি হবে তার?
ফাহিমের কথায় অটোওয়ালা গাড়ির টান বাড়াল, তবে তেহরাবযে চোখ খুলে রাখতে পারছে না।বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার, তেহরাব ফাহিমের হাতের উপর হাত রাখল,
“ঘুম পাচ্ছে, একটু ঘু ঘুমায়? ত তনয়াকে ব বলিস ভালোবাসি, অ অনেক ভালোবাসি। আর আর অ অনেক গুলো সরি!”
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩২
“এই ভাই এসব কেন বলছিস, ভাই প্লিস আবুল তাবুল বলিস না।”
ফাহিম এবার কেঁদেই ফেলে, তেহরাব হাসে, আস্তে আস্তে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে আসে তার। শেষ বারের মতো বিড়বিড় করে একটি বাক্য,
“ভালোবাসি জান, ভালোবাসি।”
