হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে একেবারে পাজুকোলে করে রুমে নিয়ে চলে এসেছে মেহরাদ। শুভ্রতা তো ভয়ে শেষ। তার ভয় ছিল, কেউ দেখে ফেললে কি হতো? তাও ভাদ্য ভালো! তাদের আসতে বেজে গেছে দশটা। ততক্ষণে শুক্রবার হওয়ায় সকলে খেয়ে দেয়ে রুমে চলে গিয়েছে।
শুভ্রতা তো কলিজা শুকিয়ে খড়া হয়ে গিয়েছিল মেহরাদ যখন গাড়ি থেকে আবার কোলে তুলে নিয়েছিল। সে কতো অনুনয় টনুনয় করলো! কিন্তু, কিসের কি! তার কথা গুনায়’ও ধরেনি তার মেহরাদ ভাই।
শুভ্রতাকে খাটে বসিয়ে মচকানো পা ‘টা একটা বালিশের উপরে রেখে দিল মেহরাদ। শুভ্রতার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটা গাল ফুলিয়ে রেখেছে, সেই সাথে দুটো ফোলা ফোলা ঠোঁট। যেগুলো তার ছোঁয়ায় ব্যাথিত হয়ে ফুলে উঠেছে। এ ঠোঁট জোড়ায় লিপস্টিক ছিল যেগুলো তার পেটে চালান হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে।
শুভ্রতার গাল, ঠোঁট ফোলানো মুখশ্রী খানা দেখে মেহরাদের হাসি পেল খুব। তবু সে মুখের অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন করলো না। বরং গম্ভীর মুখে এগিয়ে গিয়ে বললো,,
“আজকের পর থেকে ঠোঁটে আর্টিফিশিয়াল কিছু লাগাবি না বুঝলি! ঠোঁটে রঙিলা করতে মন চাইলে আমার কাছে চলে আসবি। এই দেখ, তোর ঠোঁট গুলো কি সুন্দর কালার হয়ে রয়েছে আমার ছোঁয়ায়। এটা সুন্দর। এরকম কালারিই সব সময় তুর ঠোঁটে মানায়। আর এ কালারের জন্য তোর ঠিক কিসের প্রয়োজন বুঝতে পারছিস তো? ”
শুভ্রতা ফোলানো গাল মুখ নিয়েই পা’য়ের নিচে দেওয়া বালিশটা ছুড়ে মারলো মেহরাদের দিকে। নাক ফুসছে তার। লোকটা সব সময় নিজের আজেবাজে কথা নিয়েই ব্যাস্ত থাকে। আর সে কথাতে বহাল’ও থাকে। তার ইচ্ছে করছে চেচিয়ে এই বদ লোকটার নানে বিচার দিতে সকলের কাছে। এই লোক এত্তো পাজি!!
এই মেহরাদ ভাই তাদের চেনা সম্পূর্ণ উল্টো। তার একটা কথাও গুনায় ধরেনা। সে কতো করে বললো আরও আগে বাড়ি নিয়ে আসতে। কিন্তু, নাহ! তার কথা শুনলই না! বলে কি-না –‘বাড়িতে তুকে আদর করতে পারিনা শুভ্রা। আমার ভিতরটা হাফসাফ করে শুধু। এখন একটু আদর করতে দে।’
শুভ্রাই বা কি করবে! সে তো তার মেহরাদ ভাই যা-ই বলে তাতেই গলে গলে পরে। তাই সে-ও মেনে নিয়েছে তার মেহরাদ ভাইয়ের সকল নরম গভীর ছোঁয়া। কিন্তু এ নরম কোমলের মাঝেই লোকটার ছোঁয়া মাঝে মধ্যে এতো প্রখর হয়ে উঠে! যার ফলে ব্যাথিত তার কোমল ওষ্ঠ জোড়া। কি রকম ফুলে আছে! আবার এগুলোই না-কি সুন্দর! ব্যাটা বদ! আস্ত সয়তান তার এ স্বামী নামক মেহরাদ ভাইটা।
শুভ্রতার ছুড়ে দেওয়া বালিশটা ধরে ফেলেছে মেহরাদ। ভ্রু কুচকে শুভ্রতার সামনে বসে বললো,,
“কি হচ্ছেটা কি? নাগীনের মতো এরকম ফুসছিস কেন?”
শুভ্রতা আরও হিসহিসিয়ে উঠলো,,
“কি করেছেন এগুলো হে? এখন আবার কি সব বলছেন?আপনি একদম ভালো না, বুঝলেন?? ” নিজের ফুলো ফুলো ঠোঁট গুলো দেখিয়ে বললো শুভ্রতা।
মেহরাদ শুভ্রতার গাল টেনে ঠোঁটে আলতো করে আরও একটা চুমু খেয়ে বললো,
“এতো হাইপার হস না জান। পা’য়ে ব্যাথা হবে তো। আর এটাই একটু পরে সেড়ে যাবে। ”
“আমার পা’য়ে এতো ব্যাথা করছেনা যতটা এখানটায় জ্বলছে। ” আসলেই তার পা’য়ে তেমন ব্যাথা নাই বললেই চলে। তার ব্যাথার চেয়ে ‘ও এ লোক আদিগিল্লা পানাম করছে বেশি। আর যে যেখানে জ্বলছে সেখানে একের পর এক নিজের কার্যসিদ্ধি করে যাচ্ছে। পাজি লোক একটা!!
” আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি খাবার পাঠাতে বলছি কাউকে। রুমেই খেয়ে নে। নিচে যেতে হবে না আজ আর। আর ঔষধ গুলোও নিয়ে নিবি। না-হয় আমি তো আছিই!সেদিনের টা মনে আছে না? নিচে? ইউউ,ছিহহ! ঠিক সেটাই রিপিট করে খাওয়াবো। রিমেম্বার ইট। আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি। আর শান্তা’কেও পাঠিয়ে দিচ্ছি তুকে হেল্প করার জন্য। ” বলতে বলতে উঠে দাড়িয়ে রুমের বাহিরে হাটা দিল। যেতে যেতে শান্তার রুমে টুকা দিয়ে ওকে শুভ্রতার কাছে যেতে বলে গেল।
এদিকে ফুস করে নিশ্বাস ছাড়লো শুভ্রতা। তার পা’য়ে তেমন ব্যাথা ট্যাথা নেই এখন। সে নিজেই উঠে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে হাটা দিল। আর যেতে যেতে মেহরাদ ভাইকে হাজার খানেক বকুনি দিল। লোকটা অতিরিক্ত করে সব কিছু নিয়ে।নিজের টাই নিজে বলে যায়। মনে হয় ব্যাথা টা সে না উনিই পেয়েছে। আরেহ ভাই! আমি ব্যাথা পেয়েছি, আমার থেকে তুই বেশি বুঝবি ব্যাথা আছে কি নাই? আমি হাটতে পাড়বো কি না? ওভার প্রোটেকটিভের গোডাউন একটা!!
নতুন দিনের সূচনা। তালুকদার বাড়িতে আজ ব্যাস্ততা সকলের মাঝে। রান্নাঘরে তিন গিন্নির সরগোলের সাথে দুরন্ত হাতের কাজ চলছে। আজ দুপুরে রোজা আর জাবির আসবে বাড়িতে। কানাডা থেকে ফিরেই জাবিরের এক ফুফুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল জাবির আর রোজা ঢাকার বাইরে। আজ ফিরবে দুপুরে।
সকলের নাস্তার সময় হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে একে একে সকলে উপস্থিত হচ্ছে টেবিলে। শুভ্রতাও নামলো শান্তা সোহানার পিছু পিছু। শান্তা গিয়েছিল শুভ্রতার কাছে, ওকে সাথে করে নিয়ে আসতে। যাওয়ার আগেই দেখে শুভ্রতা রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। পা’ও নাকি ভালো এখন। ওর সমস্যা হবে না যেতে নিচে, জানালো।
তারা গিয়ে টেবিলে বসতেই একে একে সকল পদের নাস্তা টেবিলে পরিবেশন শুরু করলো তিন গিন্নিরা। জাহানারা বেগম হাতে খাবার নিয়ে টেবিলের দিকে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলো,,
“শুভ্রতা, মা আমার। পা’য়ে ব্যথার কি অবস্থা? শান্তা জানালো সকালে। রুমে গিয়ে দেখলাম দরজা লক করা। দরজা লক করে রেখেছিলি কেন??”
“ব্যাথা নেই এখন বড় মা।চিন্তা করো না। ” মনে মনে দরজা লকের বিষয়টা চেপে গেল শুভ্রতা। সে লক করে রেখেছিল তার গুনধর স্বামীর জন্য। সত্যি সত্যিই গিয়ে যদি আবার ঔষধ খাওয়া নিয়ে পরতো! তার আবার এসব ঔষধ খেতে টেতে ভালো লাগে না।
“কখন ব্যাথা পেয়েছে ও ভাবি? কই পেয়েছে? আমি যে জানলাম না। ” বড় জা কে জিজ্ঞেস করলো রিমা বেগম।
ওনার কথায় শুভ্রতা সহ টেবিলে উপস্থিত সকলেই একবার তাকালো তার দিকে। মনে মনে হতাশার শ্বাস ফেললেন জাহানারা বেগম। __নিজের মেয়ের খবর নিজেই রাখে না। জানবে কিভাবে তাহলে? মেয়ে রাতে সোহানা, শান্তার সাথে ফিরেনে দেখেও একবারও এরপর জিজ্ঞেস করেনি কখন আসবে বা কোথায়,কার সাথে আছে ও? ছোট জা কে ঠিক কি বলবে ভাষা পেলনা তিনি।
সকলের চাহনি দেখে রিমা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। তবে গায়ে মাখলেন না তেমন। মেয়ের ব্যাপারে তার তেমন আহামরি ভাবনা চিন্তাও দেখা গেল না। জবাব না পেয়ে নিজের মতোই আবার কিচেন রুমে চলে গেলেন তিনি।
সাত সকাল বেলায় শুভ্রতার মন কোনে ব্যাথারা হানা দিল। স্বাভাবিক, নিজের ব্যাপারে নিজের জন্মদাত্রী’র এমন নির্বিগ্নতা সত্যিই এক সন্তানের কাছে পীরাদয়ক। শুভ্রতার এ পীরা বুঝি আজীবনের জন্য!
একেক জনের একেক মন ভাব চিন্তাভাবনার মাঝে মেহরাদ উপস্থিত হলো ডাইনিং এ। তাকে দেখে বিরিক্তিতে কিছুটা চোখ মুখ কুচকালেন আলতাফ তালুকদার।। চেয়ারে বসতে বসতে বাবার মুখশ্রী দেখে ভ্রু কুচকালো মেহরাদ। সাথে সাথেই তা মিলিয়ে গেল। সে বোধহয় আন্দাজ করে ফেলেছে এই হাস্যকর টাইপ মুখভঙ্গিমার কারণ। সে ডোন্ট ক্যায়ার ভাব নিয়েই চেয়ার টেনে বসে পড়ল। বসতে শুভ্রতার দিকে তাকালো এক পলক। শুভ্রতার মুখে ব্যাথার ছাপ দেখে এবার সত্যি সত্যিই কপালে প্রগাঢ় ভাজ পড়ল। সেই সাথে রাতের কথা মনে পড়ল। রাতে সে গিয়েছিল মেয়েটার কাছে, কিন্তু ফাজিলটা দরজা লক করে রেখেছিল। ভাবা যায়? কত্তো বড় ফাজিলের ফাজিল! তার উপর মোবাইলের কল গুলোও রিসিভ করেনি। সে কতটা টেন্সড ছিলো মেয়েটা জানে? আপাতত সেসব বাদ দিয়ে গম্ভীর স্বরে শুধালো,
“পা’য়ের ব্যাথা কমেনি শুভ্রা? মেডেসিন নিয়েছিলি? নিতে বলেছিলাম যে। ”
আস্তে করে একটা ঢুক গিললো শুভ্রতা। মা’য়ের কথা ভুলে মেহরাদ ভাইয়ের গম্ভীর স্বর নিয়ে চিন্তিত হয়ে গেল সে। সে ঘুমিয়ে ছিল রাতে মোবাইল সাইলেন্ট করে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে ৪৫+ কল একই নাম্বার থেকে। সেটা আর কারো না। তার মেহরাদ ভাইয়ের। সে তো ভয়েই শেষ। তা-ও অনেক সাহস নিয়ে বের হয়েছে রুম থেকে। সে আস্তে করেই বললো,,
“হ্যাঁ,নিয়েছি। ব্যাথা নেই এখন। ”
শুভ্রতার পর পর মেহরাদ কিছু বলবে তার আগেই আলতাফ তালুকদার কিছুটা রাগী চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“ও কথা শুনে তোমার মতো অবাধ্য না। তুমি কি করেছো গতকাল? এতবার বলার পরেও মিটিং শেষ করার আগেই কোথায় চলে গিয়েছিলে। ”
“কি করেছি? আমার যতটুকু দেখার আমি ততটুকু হ্যান্ডেল করেই গিয়েছি। এরপর আর কি বাকি থাকে?”
“তোমাকে ওর সাথে শুধু মিটিং এর কথায় বলা হয়েছিল? ”
“মিটিং এর বাহিরে আর যা-ই বলা হয়েছে বা ছিল, আমি একটাতেও কোন পজেটিভ সাইন দেইনি। সো,তুমি এরকম চিন্তা কিভাবে করলে বাবা?আমি আগেই বলে ছিলাম বিজনেস ডিলের বাহিরে কোন কথা হবে না। নাথিং। ”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৯
“এরকম ভাবে কতো দিন চলবে শুনি? ”
“যতদিন আমার ইচ্ছে। ”
ছেলের কথায় মুখ তেতো হয়ে উঠলো আলতাফ তালুকদারের। ছেলেটা এতো ত্যাদড় হয়েছে!!নিজের কথার বাহিরে এক চুল’ও নড়ানো যায়না।
