Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮
সাঞ্জেনা শাজ

নতুন দিনের সূচনা। শুভ্রতার শরীরটা বেশ ভালো লাগছে আগে থেকে। তবে মাথাটা ভার। উঠে সবার প্রথম শাওয়ার নিয়ে নিলো। হালকা লাগছে এবার।
আবারও বিছানায় উঠে বসলো শুভ্রতা হাটুতে মুখ গুজে৷ সেদিনের ঘটনা গড়িয়েছে আজ দু দিন। বাড়িতে সকলে স্বাভাবিক আচরণ করছে। মেহরাদ ভাই কিছুটা দূরে দূরে থাকছে। অবশ্য এর কারণ সে জেনে গেছে। কিন্তু তারপর ও তার মনে খটকা। তার মনে হচ্ছে মেহরাদ ভাই রেগে আছে তার উপর। কিন্তু কেন??
তবে, বলতে গেলে এতো সব ঝামেলার মাঝেও তার বেশ লজ্জা লেগেছে প্রথম দিন সকলের সামনে যেতে। কেউ যদি কিছু জিজ্ঞেস করতো! সে তখন কি করতো! ভাগ্যিস তার পরিবারের মানুষগুলো ভালো। তারা তার সাথে এমন আচরণ যেন সব স্বাভাবিক, সঠিক। মাঝখানে ঝড় তুফান কিছুই বয়ে যায় নি।

এতো সব ঠিক বেঠিকের মধ্যেও শুভ্রতার মনটা হাহাকার করে উঠে তার মা’য়ের জন্য। জ্ঞান ফিরার পর জেনেছে মা রাগ করে চলে গিয়েছে তার মামার বাসায়। যতই মা’য়ের সাথে সম্পর্ক ভালো না থাকুক,মা তো মা’ই হয়! সন্তানদের কারণে মা বাবা কষ্ট পেলে এর চেয়েও বেশি দুঃখ বুঝি এ দুনিয়াতে আর নেই!
শুভ্রতা শুধু তার বাবা আসার অপেক্ষায়। তার বাবা আসলে সে জানে, বাবা ঠিক একটা উপায় বের করবে। তবুও তার মনে ভয়! তার মা যদি মেনে না নেয়? তার জীবনে দেখা সবচেয়ে জেদি মা বুঝি উনিই!
শুভ্রতার আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনার মধ্যেই রুমে প্রবেশ করলো সোহানা। ঘড়িতে তখন সবে সাতটা বেজে ত্রিশ কি চল্লিশ। এ মেয়ে বেশ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়েছে তো!
সোহানা গিয়ে এক লাফে শুভ্রতার সামনে উঠে বসলো। অন্যমনস্ক শুভ্রতা ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। থু থু ছিটালো বুকে।
“তুই কি সোহানা? এক্ষুনি মে’রে দিতে তো। ”
“আর এ নাহ। ম’রবে তোর আমার দুষ্মন। তুই তো আমার ভাইয়ের বাচ্চা কাচ্চা পেলে পুশে বড় করবি। ”
“ফাজলামো করছিস??”

“তওবা, তওবা৷ বড় ভাবির সাথে কিসের ফাজলামো! ” দু গালে আঙুল ছুয়িয়ে অবাক হয়ে বললো সোহানা।
শুভ্রতা পাশে থাকা বালিশ দিয়ে বারি দিল একটা। কটমটিয়ে বললো,
“মা’র খাবি তুই। ফাজলামো করছিস কেন? ”
“আচ্ছা আর কিছু বলবো না। কলেজ যাবি না? কয়েকদিন পরই কিন্তু টেস্ট পরিক্ষা। ”
“যাবো। এখন শরীর ভালোই আলহামদুলিল্লাহ। ”
সোহানা হটাৎ ই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শুভ্রতার দিকে। শুভ্রতা ভ্রু কুচকালো। ভ্রু উচিয়ে শুধালো,
“কি হয়েছে?”

সোহানা কোন জবাব দিলো না। শুভ্রতার আরেকটু কাছে এগিয়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো। শুভ্রতা অবাক হলো।
কিছু বলবে তার আগেই সোহানা বলে উঠলো,
“তুই সত্যিই ইচ্ছে করে খাসনি ঐ ঔষধ গুলো তাই না?”
ফুস করে শ্বাস ছাড়লো শুভ্রতা। এ নিয়ে ক’বার শুনলো এ প্রশ্ন। এরা বিশ্বাস করছে না৷ সে তার একি বুলি আবার আওড়াল,
“আরেহ না রে বোন। আমি বুঝিনি ওগুলো এতো পাওয়ারের হবে। আর তোরা তো জানিস, অতিরিক্ত স্ট্রেসে আমার মাথা কাজ করে না। কি করি আমি নিজেও বুঝি না। ভেবেছি, দু একটা বেশি খেলে ঘুম বুঝি বেশি হবে। এমন হবে বুঝিনি।”
সোহানা ছেড়ে দিল শুভ্রতাকে খুশি মনে। সেও নেমে গেল খাট থেকে শুভ্রতাকেও নামালো বিছানা থেকে।
“চল নিচে গিয়ে নাস্তাটা সেড়ে আসি। তারপর রেডি হবোনে।”
শুভ্রতাও মাথা নাড়িয়ে, দুজন এক সাথে বেড়িয়ে গেল।

সকালের নাস্তার টেবিলে একে একে সকলে হাজির হলো। আজ সকলের শেষে এসেছে মেহরাদ। শুভ্রতার পাশের চেয়ারটাই টেনে বসে পড়ল।
আলতাফ তালুকদার একবার ছেলের দিকে তাকালেন, মুখ কেমন গম্ভীর করে আছে। সাত সকাল এরকম মুখ অবয়বের মানে কি? তিনি বুঝলেন না! তবে তার না বুঝার মধ্যেই মেহরাদ তার সামনে অপর পাশে বসা বরাবর বাবার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে কপালে গুটিকয়েক ভাজ ফেললো।
আলতাফ তালুকদার গলা খাকাড়ি দিয়ে উঠলেন। তারপর আবার খাবারে মন নিবেশ করলেন। ছেলেটা ইদানীং তার সাথে কথা বলে কম। অফিসেও কম কথা বলে। তা বলুক। কিন্তু, এভাবে চোখ মুখ গম্ভীর করে রাখলে দেখতে ভালো লাগে?

ছেলে তাকে ভিলেন বানিয়ে দিয়েছে, তার প্রেমে। অথচ,সে শুধু বলেছে ; সবার সম্মতি হোক বিয়েতে তারপর এ বিয়ে মানা হবে বাড়িতে। তার ভাই জানিয়েছে এ সপ্তাহের মধ্যেই আসবে বাড়িতে, এসে সব বিষয়ে আলোচনা করবে। সে-ও রাজি সায় জানিয়েছে।
শুভ্রতা আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে মেহরাদের দিকে। লোকটা গম্ভীর মুখে নাস্তা সাড়তে ব্যাস্ত। সে বুঝলো না, গত দু দিন ধরে এ লোক তার সাথে ঠিক মতো কথা বলছে না কেন? বড় বাবা না করেছে, আচ্ছা তাহলে ওনার সামনে কথা না বললেই তো হলো। কিন্তু বান্দা তো আড়ালে সামনে কোন সময়ই ফিরে তাকাচ্ছে না।
সকলের টুকিটাকি কথার আড়ালে শুভ্রতা তার সামনে থেকে একটা নাস্তার পদ মেহরাদের সামনে এগিয়ে দিল। তার কথায় আড়াল হলেও সকলের চোখেই তা পড়লো। তবে তারা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তা দেখেও না দেখার মতো চোখ সড়িয়ে নিল।
উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রতা মেহরাদের দিকে। তার বাড়ানো খাবারটা নেই কি-না তা দেখতে। কিন্তু তা কে হতাশ করে দিয়ে, মেহরাদ তা ছুলো না। এমনকি ফিরেও সেটা দেখলো না।
মেহরাদ নাস্তা পুরোটা শেষ করার আগেই উঠে দাড়ালো। অফিসের জন্য একেবারে রেডি হয়ে এসেছে সে। তাকে দাড়াতে দেখে সোহানা বললো,

“ভাইয়া তুমি চলে যাবে এখন? আমাকে আর শুভ্রতাকেও নিয়ে যেতে না-হয়! ” সে ইচ্ছে করেই বললো এটা। কারণ মেহরাদ ভাই যে শুভ্রতার প্রতি কিছুটা রেগে সে বুঝতে পাড়ছে। অবশ্য সে না সকলেই তা বুঝতে পেড়েছে।
রাগ হওয়ারই কথা। কিন্তু শুভ্রতা তো বারবার বলছে সে এগুলো ইচ্ছে করে খায়নি, এখন তো রাগ ঝেড়ে ফেলে দিলেই পারে তাই-না? কি জানি! তাদের ভাইতো আবার রাগে পি এইচ ডি করা। রাগ কখন ভাঙে কে জানে!
“বাড়ির গাড়ি আছে না! ওটাতে যাও। আমার সময় হবে না। ” কন্ঠে উপচে পড়া গম্ভীরতা।
শুভ্রতা বুঝলো এটা তার জন্যই। তা না হলে এরকম টা কখনো বলতো না তার মেহরাদ ভাই। সে চিন্তিত বদনে খাবার নাড়াচাড়া করতে থাকলো। চেয়ে চেয়ে দেখলো মেহরাদ ভাইয়ের উপরে উঠা৷ তার অন্যমনস্কতার মধ্যেই সুরাইয়া বেগম বলে উঠলেন,

“রিমার সাথে কি কোন ভাবে যোগাযোগ করা যায়নি ভাবি? নিজেদের মধ্যে এগুলো মিটিয়ে নিলেই ভালো, আমি যা মনে করি। যেখানে ছেলে মেয়ে দুটো একে অপরকে ভালোবাসে সেখানে এরকম জেদ ধরাটা ঠিক না। ”
“ও বরাবরই খুব জেদি মেঝো। সেটা এতো দিনে বুঝে ফেলা উচিৎ তোর। জেদি না হলে মা বাবা ভাই সকলের অবাধ্য হয়ে নিজেদের শত্রুদের বাড়ি তালুকদার বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করতো না। আমার এখনো মনে পড়ে, তখন তালুকদার আর খান বাড়িদের মধ্যে দা কুমড়োর সম্পর্ক ছিলো।” জাহানারা বেগম বললেন।
“হুম ভাবি। আবার শুভ্রতা গর্ভে থাকা কালিনও তো কতো জেদ ধরে পি এইচ ডি’র জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে গেল। তারপর এলো তিন বছরের ছোট্ট মোট্ট শুভ্র একটা পরিকে নিয়ে। ও জেদ না ধরলে তো আমরা কেউ যেতেই দিতাম না ওকে। ” মাথা নাড়িয়ে সুরাইয়া বেগম বললেন।
“ও খুব জেদিরে মেঝো। ওকে মানাতে খুব কাটখড় পোড়াতে হবে। তারউপর মেয়েটার জীবন নিয়ে কেনো এতো সমস্যা…!” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন তিনি।
ওনাদের কথায় শুভ্রতা আরও মিয়িয়ে গেল। আর গলা দিয়ে কোন খাবার নামলো না। চুপ চাপ শুনে গেল শুধু। চোখে মুখে ব্যাথাতুর অভিব্যক্তি। সকলের মা’রা কতো ভালো! তার মা টা কেন এমন? তার বুঝি অন্যায়ের মাত্রাটা বেশি? তাই-ই এমন?

মেহরাদ রুম থেকে বেড়িয়ে নিচে নামতে নামতে সোহানা আর শুভ্রতা গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার গাড়ির কাছে। তাদের উদ্দেশ্য, শুভ্রতা কোন রকম একটু মেহরাদ ভাইয়ের সাথে কথা বলতে চায়। আর সোহানা কথা বলিয়ে দেওয়ার ব্যাবস্থা করে দিবে, ব্যাস।
মেহরাদ বাহিরে এসে দেখলো দু’জন দাঁড়িয়ে তার গাড়ির সামনে। পাশে আরেকটি গাড়ি যা ওদের কলেজে রেখে আসার জন্য বরাদ্দ। সেটা থাকার পরও তার গাড়ির সামনে এদের কি সে বেশ বুঝতে পাড়লো। তবুও তার মুখে কোন অভিব্যক্তি দেখা গেল না। সে ঘার এপাশ ওপাশ করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। চোখে সানগ্লাস, এক হাতে অফিস ব্যাগ আর কোট৷
“ভাইয়া চলো তোমার সাথেই যাই। ” উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো সোহানা।
মেহরাদ আঙুলের ইশারায় পাশের গাড়িটাকে দেখালো। দেখিয়েই বললো,
“গাড়িতে গিয়ে উঠে বস। রাইট নাউ৷ ”
মেহরাদের উপচে পড়া গম্ভীর কন্ঠে সোহানা মানে মানে করে কেটে পড়লো। শুভ্রতা হতাশ চোখে নিরাশ হয়ে তাকিয়ে আছে সোহানার যাওয়ার পথে যে ইতিমধ্যে অপর গাড়িতে উঠে বসেছে৷ সে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে রইলো ভাসা ভাসা চোখ দুটো নিয়ে। যদি একটু গলে!
কিন্তু মেহরাদ তাকালোই না! সে পাশের গাড়ির ড্রাইভারকে বিভিন্ন ইন্সট্রাকশন দিতে দিতে নিজের গাড়ির দরজা খুলে কোট আর অফিস ব্যাগটা ভিতরে রেখে দিল। এরপরে যে-ই নিজে ঢুকবে শুভ্রতা এক অভাবনীয় কাজ করে বসলো।

মেহরাদের গাড়ির দরজায় রাখা হাতের নিচ গলিয়ে শুভ্রতা টুপ করে ভিতরে ঢুকে গিয়েছে। ঢুকে কোন রকমে ড্রাইভিং সিট পেড়িয়ে পাশের সিটে গিয়ে বসেছে। সেখানে থাকা কোট, ব্যাগ পিছনে ট্রান্সফার করে।
শুভ্রতা আর এদিক সেদিক তাকালো না। সাথে সাথেই সিট বেল্ট লাগিয়ে পাশের জানালার দিকে বাহিরে মুখ করে তাকিয়ে রইলো। সে ভুলেও মেহরাদের দিকে তাকালো না। তাকানো যাবে না। ভুলেও না!

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৭

অপর গাড়িতে বসে সোহানা ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসছে। আর মনে মনে বোন কে বাহবা দিচ্ছে। বাব্বাহ! তার বোনটা তো বেশ বুদ্ধিমান! তার এরকম গম্ভীর রাগ চটা ভাইয়ের জন্য এই শুভ্রা সুন্দরীই পার্ফেক্ট কম্বিনেশন।
মেহরাদ কিয়কপল শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর পাশের ড্রাইভার কে বেরিয়ে যেতে বলে নিজেও গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। কেউ কারো সাথে কোন কথা বললো না। গাড়ি তালুকদার বাড়ির গেট পেড়িয়ে শহরের ব্যাস্ততম রাস্তায় ছুটলো কলেজের উদ্দেশ্যে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯