হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৭
সাঞ্জেনা শাজ
রায়হান এগিয়ে গেল শুভ্রতার দিকে। ঘড়ির কাটার টিক টিক শব্দ আর দুই মা মেয়ের কান্নার গুনগুনানি বাধে চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। গুমোট এক আবহাওয়া যেন গিলে খাচ্ছে তালুকদার বাড়িটাকে।
জাহানারা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন শুধু। তার শক্ত পোক্ত ছেলেটা শরীর ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের চাহনিতে হাজারো ব্যাকুলতা। মা হয়ে ছেলের চোখের ভাষা তার বুঝতে দেরি হলো না। তার মনে হলো, সে যদি ছেলেটাকে সেই ছোট্ট বেলার মতো বুকে আগলে নিতে পাড়তো!
“শুভ্রতা…” রায়হান গিয়ে জিজ্ঞেস করতে নিয়েছিলো কিছু শুভ্রতাকে।
আলতাফ তালুকদার থামিয়ে দিলেন। বললেন,
“আমার বাড়ির মেয়ের সাথে আমাকেই কথা বলতে দাও রায়হান। তুমি আশা করি বুঝবে। ”
রায়হান কিছু বললো না। আলতাফ তালুকদার আবারও রয়ে সয়ে শুভ্রতার দিকে প্রশ্নের বান ছুড়ে দিলেন,
“শুভ্রতা মা? কিছু বলো! তুমি ভালোবাসো মেহরাদ কে? বিয়েতে তোমার মত ছিল?”
মেহরাদ তৃষ্ণার্তের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মাথা নুয়িয়ে রাখা ঝির্নশির্ন ছোট্ট দেহের মেয়েটার দিকে। এই মেয়েটার নীরবতা তার বুকে ছুড়ির মতো বিধছে। অন্তস্থলে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। _মেয়েটা কি তাকে সত্যি সত্যিই হাড়িয়ে দিবে? নিঃশেষ করে দিবে তাকে?
নিশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে সকলে শুভ্রতার দিকে চেয়ে। দুজন মানুষ ব্যাতিত সকলের চাওয়া শুভ্রতার ‘হ্যাঁ’ স্বীকারোক্তি টুকু। সকলের বিশ্বাসও শুভ্রতা ‘হ্যাঁ’ ই বলবে। তারা শুভ্রতার চোখে মেহরাদের জন্য ভালোবাসা দেখেছে। আর মেহরাদের মতো এমন পাগল, বেপরোয়া প্রেমিক কে কে ভালোবেসে থাকতে পারে? আর এটাতে ওর মেহরাদ ভাই! সুপার হিরো!
রিমা বেগম অধৈর্য হলেন। তিনি জানে মেয়েটার কি মত হতে পারে। কিন্তু সে এটা মানবেই না। কখনো না। এই হাটুর বয়সী ছেলে তাকে যে অপমান করেছে, এরপর তো ভুলেও না!
তিনি এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার হাত খানা খাবলে ধরলেন। চড়া গলায় বললেন,
“ওকে কিচ্ছু বলতে হবেনা। আমি ওকে নিয়ে আর এক মূহুর্তও এখানে থাকবো না। ” বলেই তিনি শুভ্রতাকে টেনে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
মেহরাদ স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আজ সে এ মেয়েটাকে কিচ্ছু বলবে না। সে দেখতে চায়, তার এতোদিনের তিলে তিলে সঞ্চিত করা ভালোবাসা পা’য়ে মাড়িয়ে কিভাবে এই মেয়ে চলে যায়। কিভাবে, ঠিক কতো ভাবে তাকে হারিয়ে দিয়ে যায়। ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়।
শুভ্রতার মা যখন শুভ্রতাকে টেনে দরজার কাছে নিয়ে যাবে শুভ্রতা নেতানো নিস্তেজ দেহটাকে নিয়েই অটল দাঁড়িয়ে রইলো। রিমা বেগম চোখ পাকিয়ে তাকালেন মেয়ের দিকে কিন্তু মেয়ে কান্নারত মুখেই মৃদু মাথা নাড়াল দু পাশে। অর্থাৎ, সে যাবেনা। মায়ের শক্ত মুঠোয় থেকে নিজের বাহুটা ছাড়ালো কিছুটা কসরত করে।
তারপর ঘুরেই এক ছুটে মেহরাদের বুকে আছড়ে পড়লো। মেহরাদ চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। তার দেহে যেন প্রান ফিরে এসেছে। নিজের ভালোবাসা কে দু বাহু জোড়া দিয়ে আরও খানিকটা মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। এক হাতে মাথাটা দৃঢ় ভাবে বুকে চেপে ধরলো।
শুভ্রতা ধীরে ধীরে বুক থেকে মাথা তুললো। চোখ গুলো নিভু নিভু। অস্ফুট স্বরে বললো,
“আপনি ভেবেছিলেন আমি বেঈমানি করবো, তাই না?” বলতে বলতেই অবচেতন হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল মেহরাদের বুকে।
মেহরাদ বুঝলো নিজের বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটা জ্ঞান হাড়িয়েছে। সে আরও ভালো ভাবে বুকটায় চেপে ধরে রাখলো শুভ্রতাকে। সরাসরি চোখ রাখলো রায়হানের দিকে। ঠোঁট নাড়িয়ে বাকা হেসে মৃদু স্বরে বললো, “সী, পাওয়ার অফ মাই লাভ!” তারপর তাকালো শুভ্রতার মায়ের দিকে।
রিমা বেগম রণমুর্তি ধারন করে তাকিয়ে আছেন বেলেল্লাপনা করা মেয়ের দিকে। তার আজ আবারও মনে হলো, এই মেয়েটাকে জন্ম দেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল তার জীবনের। নিজের গর্ভজাত মেয়ে একটা হাটুর বয়সী ছেলের কাছে ছোট করে দিলো তাকে। তার অহংকার ধূলিসাৎ করে দিলো।
সে আবারও চেচিয়ে উঠলো,
“আমি এই বিয়ে কিছুতেই মানবো না।কিছুতেই না। ” বলেই হন হন করে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। সাথে সাথে রায়হানও চলে গেল।
পুরো ড্রয়িং রুম নিস্তব্ধতা নেমে এলো। একেক জনের মনে একেক রকম অভিব্যক্তি। তবে মেহরাদ কারো কোন কিছুরই ধার ধারলো না। শুভ্রতাকে পাজুকোলে তুলে নিল। উপরে উঠার উদ্দেশ্যে। তবে বাধা দিলেন আলতাফ তালুকদার। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তুমি ওকে?”
“রুমে। সারাদিনের স্ট্র্বেসে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। রেস্টের দরকার ওর৷ ” অকপটে বলে দিলো মেহরাদ।
“করবে ও রেস্ট। আগে তুমি ছাড়ো ওকে। আরও মানুষ আছে ওকে রুমে নিয়ে যাওয়ার। খবরদার ওর আশেপাশে যেন তোমায় না দেখি। ”
মেহরাদ কপালে ভাজ ফেললো।
“আমার যুদ্ধ করে পাওয়া বউয়ের আশেপাশে আমি থাকবো না? আজিব!”
“রাখো তোমার আজিব। আমার বাড়িতে অশান্তি লাগিয়ে দিয়েছো তুমি বদ ছেলে। আগে ছোট বৌমা কে বাড়িতে ফিরিয়ে আনি, তারপর তোমায় দেখছি। আর বিয়ে করেছি, বিয়ে করেছি বললেই হয়ে যায় না। আইন, শরিয়ত অনুযায়ী তা গ্রাহ্য হওয়া লাগে। এই বিয়ে কোন বিয়ে নয়। আমরা মানি না। সোজা কথা,তুমি ওর আশেপাশে থাকবে না, এখন থেকে। ব্যাস। ”
এবার কপালে আরও গুটি কয়েক ভাজ পড়লো নেহরাদের। সে গম্ভীর স্বরে বললো,
“বিয়ে তো বিয়েই। মানা না মানা তোমাদের ব্যাপার। আমি এসব ধার ধারতে যাবো না। সরিহহ।”
ছেলের দিকে কটমট করে তাকালেন আলতাফ তালুকদার। রাগী গলায় বললেন,
“বড্ড বেয়াদব হয়েছো তুমি। মেহরাদের আম্মা, তোমার ছেলেকে বুঝাও, আমার বাড়িতে অশান্তি না মিটিয়ে আমি এ বিয়ের কথা কারো মুখে উচ্চারণ করতেও যেন না শুনি। যা হওয়ার হয়েছে। এখন কিভাবে সব কিছু সামাল দেওয়া যায় সেই চিন্তা করতে হবে। আর তুমি, তুমি ছেলে তোমার মুখটা বন্ধই রাখবে বলে দিলাম। নির্লজ্জ ছেলে।” বলেই তিনি হনহনিয়ে চলে গেলেন রুমে।
জাহানারা বেগম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ছেকের দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেকেকে কি বলবেন তিনি বুঝলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। মেহরাদ ফুস করে নিশ্বাস ছাড়লো। ছেড়েই বললো,
“মা বহুত কষ্টে পাওয়া বউ আমার। তোমরা এখন অন্তত ভিলেন হয়ো না। ” ওর কথা শুনে উপস্থিত সকলে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো। সোহানা তো কিছুটা শব্দ করেই হেসে ফেললো। সে তৎক্ষনাৎ মুখে হাত চেপে ফেললো।
মেহরাদ আবার বললো,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। থাকবো ওর থেকে দূরে। কিন্তু দূরে থেকেও আগলে রাখবো। সেখানে কেউ বাধা দিতে আসলেও আমি গুনায় ধরবো না। এবার সে কোন আওলিয়া,ধরবেশ বাবা হলেও না। এখন আপাতত ওকে রুমে রেখে আসি?”
জাহানারা বেগম কটমট করলেন ছেলের কথায়। বাহুতে মৃদু চাপড় মেরে বললেন,
“পাজি ছেলে,বাবা যে এসব কে বলে! যা ওকে রুমে রেখে আস। অনেক ধকল গিয়েছে সকলের উপর। একটু রেস্ট নে। ”
মেহরাদ ঠোঁট চওড়া করে হেসে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। তার পিছু পিছু সোহানা, শান্তা, রোজাও গেলো গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করতে করতে।
শুভ্রতাকে বিছানায় শুয়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেহরাদ। শুভ্র মুখশ্রী খানা কেমন লাল টকটকে হয়ে আছে। নাক মুখ ফুলে আছে। মুখে ব্যাথার ছাপ হলেও মেহরাদ মুগ্ধতায় মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো।
সেভাবেই এগিয়ে গিয়ে ললাটে ওষ্ট জোড়া চেপে ধরলো।
চোখ জোড়া বন্ধ মেহরাদের। তার মনে হচ্ছে, সময়টা এখনিই থমকে যেতো! তাদের আর কোন বাধা বিপত্তি না আসতো। নিজেদের গুছানো একটা সুন্দর জীবন শুরু হয়ে যেত!
দরজায় পা’য়ের শব্দে মেহরাদ সড়ে আসলো শুভ্রতা থেকে। উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার তিন বোন হাজির। উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে বাহির থেকে। মেহরাদ কদম বাড়িয়ে সেদিকে গেল। গিয়ে ওদের উদ্দেশ্যে বললো,,
“এখানে থাক ওর সাথে। কোন সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে জানাবি। আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি। ”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬
সকলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। মেহরাদ চলে গেল রুম ছেড়ে নিজের রুমের দিকে। তার পাজড়ে আজ সুখ পাখির বসবাস। শরীরের ক্লান্তি এগুলো কিছুই না।
সে খুশ মেজাজেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে বলিষ্ঠ দেহ ভিজে গেল। চোখ জোড়া বন্ধ করে মেহরাদ কল্পনায় বিভোর হলো। আজ সারাটাদিন সে কতটা উন্মাদ হয়েছিল এ মেয়েটার প্রতি।
মনে হতেই হেসে দিল মেহরাদ। আজ বুঝি মেহরাদের খুশির দিন। খুশির দিনই তো! সে তো আর জানেনা ভাগ্য তার জন্য কি ঠিক করে রেখেছে সামনে!
