হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২
সাঞ্জেনা শাজ
সন্ধ্যায় মেহরাদ স্যুটে ফিরলো হাতে ছোট্ট একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে।শুভ্রতা রুমেই ছিলো। সে ফোনে কথা বলছে সোহানা আর শান্তার সাথে। স্যুটের সাথে লাগোয়া প্রাইভেসি লকড সুইমিংপুলে পা ডুবিয়ে বসে আছে।
মেহরাদের দেখে মেজাজ খারাপ হলো। গায়ে জ্বর, অথচ পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে! সেও গেলো সেখানে। চারদিকে সন্ধ্যা ছেয়ে গিয়েছে তখন। মেহরাদকে দেখে শুভ্রতা পা গুটাতে চাইলো। পরক্ষনেই ভাবলো, থাক দেখেতো ফেলেছেই এখন আর লুকিয়ে লাভ কি! সে সেভাবেই রইলো। তার ভালো লাগছে। স্বচ্ছ নীল জলে তার শুভ্র পা দুটো আলোর ঝলকানিতে জ্বল জ্বল করছে যেন। প্লাজু প্যান্ট টা হাটুর কিছুটা নিচে তোলা।
“এখানে কি করছিস? মেহরাদ পিুছন থেকে রাশভারী স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
শুভ্রতা ঘার ঘুরিয়ে হাসি হাসি মুখে জবাব দিলো,
“সোহানাদের সাথে কথা বললাম। ওঁরা সাজেক গিয়েছে! আদনান ভাইয়া নিয়ে গিয়েছে। আপনি জানিতেন তাই না?”
সে গদোগদো হয়ে নিজের প্রসঙ্গ সব এড়িয়ে গেলো। মেহরাদ বিরক্ত হলো ওর চালাকি করতে চাওয়ার চেষ্টা দেখে। বিরক্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
“হ্যাঁ জানতাম। তাতে তোর কি? চালাকি কম কর। উঠ এখান থেকে। জ্বর গায়ে, ভুলে গিয়েছিস?”
শুভ্রতা নাখোশ হলো। অভদ্র লোক। সে কতো সুন্দর করে বললো আর তাকে কি বললো! পা দুটো উঠিয়ে বসলো সে, ভিজে পা’য়েই প্লাজু টেনে নামাতে দেখে মেহরাদ আরও বিরক্ত হলো।
“গবেট একটা, ভিজে পা’য়েই প্লাজু টানছিস। এটা ভিজে যাবে না? ” বলে সে নিজেই শুভ্রতাকে রুমে এনে বিছানায় বসালো। একটা টাওয়াল এগিয়ে দিলো। শুভ্রতা বিরক্তিতে কুচকানো মুখ ওয়ালা ক্যায়ারিং মেহরাদ ভাইকে দেখে খুব খুশি হচ্ছে। ধমকাবে আবার যত্নও করবে।
সকালে ঔষধের সাথে ওয়োনমেন্টও এনে লাগিয়ে দিয়েছিলো বিধায় ক্ষত গুলো থেকে আস্তে আস্তে লাল ভাব কাটছে। তবুও কিছু কিছুর দাগ তো থেকেই যাবে৷ সেই সাথে বিকেলে আবার নতুন করে হয়েছে কিছু।
“ওগুলোই অয়োনমেন্ট লাগিয়েছিস?”
শুভ্রতা বুঝতে পেরে মাথা নাড়াল। ঠোঁট চেপে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করলো। এর মধ্যেই মেহরাদ একটা বাক্স হাতে নিলো। শুভ্রতা ভ্রু উচিয়ে দেখলো মুখখানা চোখা করে। এক জোড়া সোনালী নুপুর দেখে বিস্মিত হলো। এর মধ্যেই মেহরাদ তার পা টেনে নিতে বিস্ময় ভাব কেটে হকচকালো। প্রশ্ন করলো,
“হটাৎ নুপুর? ”
“তোর পাওনা ছিলো। ”
শুভ্রতা ভাবুক হলো। তার কখনের পাওনা ছিলো! সে বুঝলো না। ঠোঁট উলটে মেহরাদের দিকে তাকাতে মেহরাদ জানালো,
“বলেছিলাম যেদিন আদরের চাদরে মোড়াবো, সেদিন নিজের কানের অয়াশে খুব পাশ থেকে নুপুরের শব্দ শুনবো। কিন্তু আফসোস! তুই সিডিউস করে এর আগেই…..”
শুভ্রতা চোখ উলটে খুব বড় এক কাজ করে ফেললো। মেহরাদের চলন্ত মুখ চেপে ধরেছে। লোকটা তার কান দুটো জাঝা পালা করে দিচ্ছে একের পর একে নির্লজ্জ কথা বলে।
মেহরাদ শব্দ করে হেসে ফেললো। তা দেখে শুভ্রতাও লজ্জায় মুখ লুকিয়ে হাসলো।
শান্তা তারা আজ এসে পৌচেছে সাজেক। সোহানা খুব উচ্ছ্বসিত।সে একজন সঙ্গী পেয়েছে। এতেই সে বিন্দাস আলাপ জমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শান্তা থমথমে মুখ নিয়ে আছে। সারা রাস্তা এক আপদের সাথে এসেছে সে। এই অভদ্র ছেলেকে কেন নিলো আদনান ভাই? সে যদি আগে জানতো, যাওয়াই ক্যানসেল করে দিতো তাহলে।
দ্বীপ আর সোহানা একের পর এক কথা বলে হাসাহাসি করছে। এতো কি হাসার আছে তারা দু জনের কেউ-ই বুঝলো না। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন কাপল।
শান্তা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আর আদনান কপাল কুচকেই তাকিয়ে রইলো। মনে প্রশ্ন জাগলো,
“এতো মাখো-মাখো মিঠে-মিঠে সম্পর্ক কবে হলো? কই তার সাথে মেয়েটা দুনিয়ার বেয়াদবি করে, কিন্তু দ্বীপের সাথে তো ভালোই হিহি হাহা করছে! কি চলে এদের ভিতর? আবেগী বয়স দু’জনের।”, এটা মাথায় আসতেই আদনানের মাথার চান্দি জ্বলে উঠলো। শক্ত চোখে দ্বীপকে পরখ করতে থাকলো। ঠাটিয়ে দিলো এক ধমক সোহানাকে। আশেপাশের কিছু লোকও তাকালো সাথে সাথেই এদিকে।
এতো জোরে ধমক খেয়ে সোহানা হতভম্ব। রাগে নাক ফুসলো। সে-ও চেচিয়ে উঠলো,
“অযথা এমন করলেন কেন? কেন করলেন?“
শান্তা ব্যায়াক্কেল বলে বোনকে থামাতে চাইলো।
“চুপ। তোমায় একা দিয়েছে? দু জনকেই দিয়েছি। হাসাহাসি ঢলাঢলি বাড়িতে গিয়ে করো পাব্লিক প্লেস এটা। “ বলেই হোটেলের রুমের দিকে এগুলো।
শান্তা বোনকে নিয়ে তাদের জন্য ঠিক করা রুমে গেলো। সোহানা তখনো ফুসছে। রাগে দুঃখে মেয়েটার চোখেও জল জমেছে। দ্বীপ ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে ঝাকড়া চুল গুলো ঠিকঠাক করতে করতে আদনানের ঢুকা রুমে ঢুকলো। সে আর আদনান থাকবে এক রুমে।
শিষ বাজিয়ে গুন করে বললো,
‘যাক,মেহরাদ ভাইয়ের হাতে আমি একাই ভর্তা হবো না। আরেক জনও সঙ্গী হচ্ছে তার। ‘
সে রুমে ঢুকে দেখলো আদনান বিরক্ত ভঙ্গিতে শুজ টুজ খুলছে। সে সুর তুলে গান ধরলো,
“প্রেম কইরাছো তো ফাসিয়াছো মামা…
আহা…প্রেমে পইরাছো তো ডুবিয়াছো মামা…
আবার মাইয়া যদি হয় তালুকদারের…
তোমার আমার জীবন যাইবো অকালেই.. অকালে..
হেই হেই হ…”
ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজা লাগালো আদনান। দ্বীপ শব্দ করে হেসে ফেললো। নিজেকে বাহবা দিলো। বেশ সুন্দর গান বানাতে পাড়েতো সে! এই গুন সিনিয়রের সামনে প্রকাশ পাওয়া দরকার! হ্যাঁ, খুব শিগগিরই….
শুভ্রতারা রাতের ডিনারের জন্য রুফটপে এসেছে। পায়ের নুপুর দুটো হাটার তালে তালে ঝুমঝুম শব্দে বাজছে। মেহরাদের কানের সাথে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হচ্ছে এতে। এমন আগুন সাথে নিয়ে ঘুরাও রিস্ক৷ নিজের জন্যই।
ডিনার সেড়ে কিছুক্ষণ হোটেল নিয়ে কথা বললো দুজন। তাদের খুব ভালো লেগেছে। সেই সাথে ঠিক করলো আগামীকাল ফরেইনারদের সাথে মিটিং শেষ হলে শুভ্রতাকে নিয়ে পতেঙ্গা যাবে। শুভ্রতার বায়না। মেয়েটা যেমন তাকে পেয়ে বসেছে রাতের পর। এটা সেটা নিয়ে নিজের মর্জি জাহির করছে। মেহরাদ কপাল চুলকে শুভ্রতার মর্জি মেনে নিলো। এক রাতের আদরেই বাদর হয়ে বসে আছে। সারা জীবন কি করবে?
গতকাল চেয়েও নিজেদের কাপাল পিক তুলতে পাড়েনি মেয়েটা। আজ আবার তুলতে চেয়ে দেখলো মেহরাদের মোবাইলটাই আনে নি। মেয়েটা চঞ্চল পায়ে বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে বললো,
“আপনি বসেন মেহরাদ ভাই, আমি রুম থেকে নিয়ে আসি। “
মেহরাদ চোখ রাঙ্গিয়ে শাসালো। —” ভাই? রাতে ডোজ বেশি পাবি এটার জন্য।”
শুভ্রতা জিব কাটলো। আস্তে করে ‘সরিহ’ বলে আবারও বললো,
“আমি গিয়ে নিয়ে আসছি হু?“
“দরকার নেই আমি-ই যাচ্ছি। তুই বস।”
শুভ্রতা মানলো না। সে আগেই ছুটে রুফটপ থেকে নেমে বের হয়ে আসলো। এর নিচ তলাতেই তাদের রুম। লিফট নেওয়ার কোন ঝামেলা নেই। সে পাশের সিড়ির দিকে এগোতেই কারো পিছু ডাকে দাঁড়ালো। আয়রা ডাকছে তাকে। মেয়েটাকে দেখে শুভ্রতা সংকোচে পড়ল। এখন আবার কি বলবে কে জানে!
“কি ব্যাপার কোথায় যাচ্ছো দৌড়ে? তোমরা রুফটপে ছিলে?“ বলতে বলতেই শুভ্রতার নিকট এগলো আয়রা। তীক্ষ্ণ চোখে খেয়াল করলো মেয়েটাকে।
“জ্বি আপু। আমরা এদিকেই। একটু রুমে যাচ্ছি। মোবাইলটা রুমে রেখেই চলে আসছে।”
“কে?“
“মেহরাদ ভাইয়া। “ আবারও কথার পরিপেক্ষে ভাইয়া বলে ফেললো মেয়েটা।
“ভাইয়া কে সাইয়া বানিয়ে এখন আবার ভাইয়া ডাকছো কেন, মেয়ে?“ দাত চেপে স্বাভাবিক ভাবেই বললো আয়রা।
শুভ্রতা কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে পরে গেলো। তার মানে জানে উনি? কিভাবে জানলো? গতকালও তো জানতো না! তাহলে?
মেয়েটা অস্বস্তিতে ঘেমে উঠেছে। কপালের আঙুল ছুয়াতেই আয়রার গলার ঘাড়ের হালকা লালচে স্টেইন গুলো ধরা পড়লো। সরু পাতলা ঠোঁট দুটোর একটু কাটা ভাবও নজরে আসলো। মেয়েটার ভিতরটা জ্বলে গেলো। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে ব্যার্থ হলো যেন। কদম এগিয়ে শুভ্রতার দিকে এগিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“আদর দিয়ে রাগ ভাঙ্গিয়েছে বুঝি তোমার ভাইয়া?“
শুভ্রতার লজ্জিত হলো। এভাবে কথা বলছেন কেন উনি আজ? কন্ঠটাও কেমন যেন লাগছে। চোখ দুটো ফোলা ফোলা। মেয়েটা দু কদম পিছিয়ে সিড়ির হাতল ধরে বলল,
“আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে আপু। পরে কথা হবে আপনার সাথে। আমি রুমে যাই..“
সিড়ির দু’ধাপ পের হতেই এক ভয়ানক চিৎকার বেরিয়ে এলো শুভ্রতার কন্ঠ নালী ফুরে। মেহরাদের সচকিত হলো। ভালো ভাবে ধরতে পাড়েনি কন্ঠ। আওয়াজ ক্ষীণ পৌচেছে তার কাছে। তবুও অনেকেই ছুটেছে নিচের দিকে।
মেহরাদ যেতেই দেখলো শুভ্রতা হাটু জড়িয়ে কান্না করছে। তার পাশে আয়রা৷ মেয়েটার নাক ছিলে রক্ত ঝড়ছে। হাতও।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
মেহরাদের দুরন্ত গতিতে ঝড়েরবেগে সিড়ি ডিঙিয়ে শুভ্রতাকে পাজুকোলে তুলে নিলো। বুকের সাথে মিশিয়ে রুমের দিকে ছুটলো। শুভ্রতা মেহরাদকে দেখে আরও জোরে কান্না কাটি শুরু করলো। মেহরাদের মস্তিষ্ক তখন ব্লকড। একটু চোখের আড়াল হলেই মেয়েটা এতো এতো বিপদ কিভাবে বাধায়….
