হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতা পায়ে ব্যাথা পেয়েছে বেশ। ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছে একদম। শুভ্রতা কতক্ষণ নাকের পানি চোখের পানি ফেলেছে, এখন আপাতত চুপ আছে। পা’য়ে বরফ দিয়ে দিয়েছে মেহরাদ। সেই সাথে স্প্রে করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ জ্বলে এখন ঠান্ডা লাগছে। সরু নাকে একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ করা।
মেহরাদ শুভ্রতার কপালে একটা চুমু খেয়ে রুম ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। রুমের বাইরে ছিলো রাসেল সাহেব। তাকে সাথে নিয়ে কন্ট্রোলার রুমে গেলো। নিজের সন্দেহ সঠিক হলে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে সে।
রাসেল সাহেব মেহরাদের ক্ষিপ্ত কদমের সাথে তাল মিলাতে হিমশিম খাচ্ছে। দরদরিয়ে ঘামছে। তার স্যার কি করতে চাইছেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
হোটেলের সি সি ক্যমেরা কন্ট্রোল রুমে গিয়ে লোকদের সাথে কথা বলে ক্যামেরা চেক করলো মেহরাদ। যা দেখলো তাতে রাসেল সাহেবের চোখ কপালে উঠলো। কন্ট্রোলার জিজ্ঞেস করলেন,
“স্যার লিগ্যাল একশান নিবেন?“
“নো। যে যেমন তাকে তেমন ওয়ে তেই স্বাস্থি দিতে হবে। এসব লিগ্যালেটি এঁদের তুড়ি বাজালেই ভেঙে যাবে। “
বেরিয়ে আসলো রুম ছেড়ে। রাসেল সাহেবকে দিয়ে খবর নেওয়ালো কোন রুমে আছে আয়রারা। শুভ্রতাকে কিভাবে পড়েছে জিজ্ঞেস করতে বললো, কিভাবে পড়েছে খেয়াল নেই কিন্তু দ্রুত নামতে যাচ্ছিলো ও। আর কেমন যেন হটাৎ ই ধাক্কার মতো লেগেছে। ব্যাস এতটুকুই।
আয়রার রুমের সামনে এসে কলিং বেল চাপালো মেহরাদ। মিনিটের মধ্যে দরজা খুললো আয়রা। আশ্চর্যজনিত এক ভাব ধরে বললো,
“মিস্টার মেহরাদ আপনি? আসুন আসুন, ভিতরে আসুন। আপনার ওয়াইফের কি খবর? আহা রে মেয়েটা কিভাবে যে পড়ে গেলো! জানেন আমি নিজেও ধরতে গিয়েছিলাম ওঁকে কিন্তু কপাল খারাপ বেচারির এর আগেই পরে গিয়েছে। “
আয়রার কথা শুনতে শুনতে রুমে ঢুকে চারিপাশ পর্যবেক্ষণ করলো মেহরাদ। মেহরাদ ঘুরে কি খুজছে বুঝতে পারলো না আয়রা। ভিতরের একটা ভয় ঝেকে আছে। যদি মেহরাদ ধরে ফেলে কিছু!
“কি দেখছেন মি. মেহরাদ? বসুন না বসুন। আপনিও বসুন।”
মেহরাদ বসলো না। রাসেল সাহেবকে কিছুর জন্য ইশারা করতে রাসেল সাহেব বলল,
“ম্যাম, ক্যান আই ইউজ ইউর ওয়াশরুম? “
“ইয়াহ, অফকোর্স। “
রাসেল সাহেব ওয়াশরুমে চলে গেলেন। মেহরাদ আশেপাশে দেখে বললো,
“এখানে কোন সি সি ক্যামেরা নেই। গুড। “
আয়রা সামান্য হাসলো। হেসে বললো,
“রুমে সি সি ক্যামেরা…”
হটাৎ করেই চুপ করে গেলো মেয়েটা। সি সি ক্যামেরার কথা মনে আসতেই বিস্ফোরিত নয়নে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে একে একে সব মিলালো। যে লোক আজ দু দিনেও একটা বার্তি কথা অব্দি বলেনি। সে হটাৎ করেই তার রুমে কেন আসবে!
দরদর করে ঘামতে লাগলো আয়রা। চোরের মতো চোখ লুকালো৷ পিছনে গিজার থেকে জগ ভর্তি ধোয়া উঠা গরম পানি নিয়ে হাজির হয়েছে রাসেল সাহেব৷ তার স্যার কি করতে যাচ্ছে সেটা ভেবেই তার কলিজা ধুকপুক করছে।
আয়রা কিছু বুঝে উঠার আগেই টগবগ করা গরম পানিতে আয়রার হাত চেপে চুবিয়ে ধিরলো মেহরাদ। হিসহিসিয়ে বললো,
“হাউ সিলি হাহ? ছাড় পেয়ে যাবেন ভেবেছিলেন ম্যাডাম? মেহরাদের কলিজায় হাত দিয়ে সেড়ে যাবেন? আপনার হাত মেহরাদ আস্ত রাখবে? “
চিৎকার করে কাদছে আয়রা। হাত ছুটাতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্যার্থ মেয়েটা। হাত ঝলসে ধোয়া উঠছে যেন। পাক্কা দশ মিনিট সময় নিয়ে ছেড়েছে মেহরাদ। নিজেও হাপিয়েছে। পিছু ঘুরে শার্ট ঝারলো। চুল গুলো পিছনে ঠেলে দাতে দাত চেপে আবারও আয়রার দিকে এগলো। মেয়েটা হাত চেপে আহাজারি করে ফ্লোরে বসে গিয়েছে।
হাতের চামড়া ছিলে গিয়েছে। গলা কাটা মুরগির মতো ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রাসেল সাহেব বার বার ঢোক চাপছে। মনে মনে মনে শুধু একটা কথাই আওড়াচ্ছে —’কি হিংস্র, কি হিংস্র!’
মেহরাদ এক হাটু ভেঙে আয়রার সামনে বসে বললো,
“এই ভুল দ্বিতীয় বার হবে?“
আয়রা চিৎকার করে তড়িৎ মাথা নাড়াল। মেহরাদ আবার জিজ্ঞেস করলো,
“আমার ওয়াইফের আশেপাশে দ্বিতীয় বার দেখা যাবে?“
মেয়েটা আবারও স্বীকারোক্তি দিলো। তাকে আর দেখা যাবে না।
“আজ থেকে চৌধুরীদের সাথে তালুকদারের সকল কোপারেশন ক্যানসেল, গট ইট?“
“এরকম করবেন না প্লিজ। আমি পাপাকে কি জবাব দিবো তাহলে?“
“সেটা আগে ভাবার প্রয়োজন ছিলো মিস।”
উঠে দাড়িয়ে রাসেল সাহেবের দিকে তাকালো।
“ওনার ট্রিটমেন্ট এর ব্যাবস্থা করুন। আর আপনার দায়িত্বে যেটা থাকে সেটা পূরণ করে আসবেন। গেলাম আমি।”
বেড়িয়ে গেলো মেহরাদ। রাসেল সাহেবের কপালের ঘাম পাল্লা দিয়ে বাড়ল। তার দায়িত্ব কি? থাপ্পড় মারা? থাপ্পড়ও মারতে হবে? শাস্তি কি কম হলো? বেচারা
তাকে সব সময়ে থাপড়া থাপড়িতে টানার মানে কি?
পার্টি অফিসে বসে এক নাগাড়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে রায়হান। মাথার চুল এলোমেলো। দেখতে কেমন হিংস্র উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছে। একটা ছেলে এসে ডাকলো,
“ভাই? ভাই?“
“বল।”
“আপনি যা করতে বলেছিলেন সব সেট হয়ে গিয়েছে ভাই। এখন শুধু সঠিক সুযোগের পালা। আমাদের ছেলেরা ওখানে পৌছে গেছে। “
রায়হান সিগারেট ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। সিগারেট পা দিয়ে পিষতে পিষতে দাতে দাত পিষে বললো,
“ওই জা’নোয়ারটার গায়ে ঢাকার বাতাস যেন এ জনমে আর না লাগে। তবে সাবধান, মেয়েটার যেন কিছু না-হয়। সব গুলার কল্লা কাটবো নয়তো। আমার বাবা তালুকদারদের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে হেড়েছে। আমি নারীর লড়াইয়ে জিতে দেখাবো। ভালোবাসা না পাই, বন্ধি করে রেখে দেখিয়ে দিবো।”
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো অফিস ছেড়ে। তাদের স্যারের যে কি হয়েছে! আগে কখনোই এরকম কাজের দায়িত্ব তাদের উপর আসে নি। কিন্তু আসছে। সেটাও বড় সড়ই দায়িত্ব। তাদের কলিজা কাপে এ দায়িত্ব কাধে তুলতে। তবুও করতে হবে। বাধ্য যে।
তালুকদার বাড়ি যেন পানিতে ডুবে আছে। বাচ্চাদের কিচিরমিচির ছাড়া বাড়িটা কেমন খা খা করছে। সাফি মুখ গুমড়া করে আছে। তাকে কেউ নিলো না। এ নিয়ে একদফা কান্নাকাটি গিয়েছে তার। তারপর তার বাবা তাকে পার্ক থেকেও ঘুড়িয়ে এনেছে। কিন্তু বেচারার পার্কে মন ভালো থাকলেও বাড়িতে এসে আবার মন খারাপ করছে। বোনদের ছাড়া তার কাউকেই ভালো লাগে না।
“আচ্ছা! শুভ্রতা আপুর যেমন মেহরাদ ভাইয়ার সাথে বিয়ে হওয়ায় আর কোথাও যেতে হবে না। যদি মেহরাদ ভাইয়া আর শুভ্রতা আপুর আরও ভাই থাকতো তাহলে তো আমার আপু দুটোরও আর কোথাও বিয়ে দিতে হতো না। তারা বাড়িতেই থাকতো আমার সাথে। কতো ভালো হতো তাই না?“
বিষন্ন মনে বলা সাফির কথাটা যেন রাতের ডাইনিং টেবিলে বিষ ফোড়ন হলো। সককের খাওয়া থেমে গিয়ে এক যোগে চাইলো সাফির দিকে। থমথমে চেহারা সকলের। এতটুকু ছেলে বললো কি এটা? সাফি ঘাবড়ালো একটু। বোকা হেসে বললো,
“না মানে এমনিই বললাম আর কি! খাও তোমরা, খাও। আপুরা নেই তো, মাথা আউট হয়ে গিয়েছে শোকে।”
সকলে আবার খাবারে নজর দিতে সুরাইয়া বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে চোখ রাঙ্গালেন । বড় ভাই কি একটা লজ্জায় পড়লো ওর কথায়? দ্বিতীয় দফায় খাবার খাওয়া শুরু হতেই এবার জাহানারা বেগম মুখ খুললেন। কাইকুই করে স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“মেহরাদ আর শুভ্রতার বিয়ের অনুষ্ঠান টা সেড়ে ফেললে ভালো হতো না? এভাবে আর কতো? বিয়ে করেও আমার ছেলেটা অবিবাহিতের মতো থাকে। এমন হলে নাতি নাতনীর মুখ দেখবো কবে..?“
শেষের কথাটা খুবিই নিচু স্বরে বললেন তিনি স্বামীর ভয়ে। কিন্তু আলতাফ তালুকদার ঠিকই শুনলেন। আর শুনেই ব্যাঙ্গ করে বললেন,
“ছেলের জন একদম্য বুক ফেটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে? তোমার বুড়ো ছেলের সাথে সংসার করার বয়স হয়েছে মেয়েটার? ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে বিয়ে করেছে তো কি হয়েছে, এটা বয়স মেয়েটার? শান্তার এখনো বিয়ে দেখছি না আর কলেজে পড়া এতটুকু মেয়েকে সংসার করতে দিবো হ্যাঁ? “
জাহানারা বেগম থমথমে চেহারায় তাকালেন স্বামীর দিকে। তার ছেলেকে বুড়ো বললো? কি এমন বয়স তার ছেকেটার?
সুরাইয়া বেগম অপছন্দ করলেন বড় ভাইয়ের কথা। সে আর বড় ভাবি মিলেমিশে বুদ্ধি করেই আজ কথা তুলেছে ভাবি। এভাবে এক বাড়িতে থেকেও ছেলে মেয়ে দুটোর এ দুরত্ব মানা যায় না। তারা তো দেখে শুভ্রতাটা কি ছটফট করে মেহরাদটার জন্য। এভাবে আলাদা করে রাখার মানে কি?
“আমার ছেলেটা কে আপনার কোন দিক দিয়ে বুড়ো বলে মনে হলো? আর শুভ্রতাকে সংসারের কোন ঝায় ঝামেলা পোহাতে হবে কোন? আমরা নেই? ও শুধু আমার ছেলেটার দেখা শুনা করবে…খেয়াল…..”
“কেন তোমার বুড়ো ছেলের হাত পা নেই? নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পাড়বে না? কচি খোকা ও? ত্রিশ বছর হতে চলেছে, অথচ কোন জ্ঞানে আমার এতটুকু ভাতিজিটাকে ফাসিয়ে বিয়ে করলো? মেয়ের অভাব ছিলো? “ মাঝখানে ফোড়ন কেটে বিরক্তি মুখে বললেন আলিতাফ তালুকদার।
মাজাজ খারাপ হলো জাহানারা বেগমের। টেবিল ছেড়ে উঠে দাড়ালো। এমনিতেও উঠতো। খাওয়া শেষ।শাফি তো সেই কখনোই উঠে গিয়েছে, বেফাস কথা বলে।জাহানারা বেগম এখন একটু ভাব নিয়েই বিরক্তি প্রকাশ করলো। ছোট জা’য়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“এই ভদ্রলোক আমার ছেলের পিছনে এভাবে পরে থাকে কেন বলত? ছেলেটাকে কি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম? নিজে থেকেছে বিয়ের পর বউ ছাড়া যে আমার ছেলে থাকবে এখন? এমন হলে আমি আগামীকাল এক মাসের জন্য বাপের বাড়ি যাবো। বিয়ের পর দিয়েছে দুটো দিন থাকতে একা? এখন থেকে দেখুক। উনি যদি থাকতে পারে, বল, তাহলে আমার ছেলের টাও আমি মেনে নিবো। “
আলতাফ তালুকদারের চোখ বেড়িয়ে আসার উপক্রম। তার লক্ষি মন্ত বউটা এই পাজি ছেলের জন্য হাটে তার হাড়ি ভাঙ্গলো! সুরাইয়া বেগম আকরাম তালুকদার মুখ টিপে হাসলেন। বড় ভাইয়াকে তো আর কম ভালো বাসতে দেখেনি! নিজের বেলায় তো ষোলো আনা, তাহলে ছেলেটার সাথে নাখোশ কেন?
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২
“এ্যা….এ্যা..তুমি তোমার ছেলের জন্য এতো আজেবাজে কথা বলছো? এটা কি ঠিক? এটা তো ঠিক না!“
“আমি আজেবাজে বলছি? আমার কথা এখন শুনছেন না, না? যখন নাতি নাতনী নিয়ে ছেলে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন তখন মানুষের কাছ থেকে আজেবাজে কথা কি বুঝবেন। “ বলেই তিনি বিরক্ত ভঙ্গিতে চলে গেলেন।
আলতাফ তালুকদার চোখ কপাল কুচকে স্ত্রীর কথা ব্রেনে খাটালেন। নাতি নাতনী কোথা থেকে আসবে? পরক্ষণেই কিছু ভেবে তিনি স্ত্রীর পিছু গেলেন মেহরাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে। মনে রইলো না সে নিজেই বাবা ছেলেটার। সাথেও এ-ও ঠিক করলেন শায়ান তালুকদারের সাথে ভালো ভাবে কথা বলে আনুষ্ঠানিক বিয়ের কথা সাড়বেন।
