হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতার পায়ের ব্যাথা কমেছে কিছুটা। তবুও বিছানা থেকে নামার কোন অনুমতি নেই মেয়েটার। সারাদিন বিছানায় গড়াগড়ি করলো। তারা আগামীকাল চলে যাবে বোধহয়!
মেহরাদ আজ ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং এ ব্যাস্ত। তবুও ক্ষনে ক্ষনে খবর নিচ্ছে মেয়েটার। দুপুরে নিজ হাতে খায়িয়ে দিয়েছে। কিছুর প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে কল করতে বলেছে।
শুভ্রতা অলস বিকেল কাটিয়ে মাগরিবের ওয়াক্তে উঠে গেলো। স্যুটের সব গুলো লাইট অন করে আস্তেধীরে পা ফেলে ওজু করে নামাযে দাড়ালো। মনটা হুট করেই কেমন যেন মেঘে ঢেকে গেলো। ভিতরে অস্থিরতা টের পাচ্ছে। হটাৎ এমন হওয়ার কারণ কি? সারাক্ষন একা ছিলো বিদায়!
মেহরাদ আসলো সন্ধ্যার পর। সে এসে দেখলো শুভ্রতা মোবাইল চাপছে কিন্তু মুখটা কিঞ্চিৎ অখুশি। কেমন যেন মন মরা। ফর্মাল গেট আপে ছিলো সে। টাই খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার, পা’য়ে ব্যাথা বেড়েছে? মুখ অন্ধকার কেন?“
শুভ্রতা যেন চমকে উঠলো। সে খেয়ালই করে নি মেহরাদের উপস্থিতি। কখন এসেছে! অবাকই হলো নিজের বেহালাত বেখেয়ালিপনা দেখে। চটজলদি প্রশ্ন ছুড়ল,
“কখন এলেন? সব মিটিং শেষ? না-কি আরও আছে?“
মেহরাদ ভ্রু গোটাল। নেভি-ব্লু রঙা ইন করা শার্ট টা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে শুভ্রতার দিকে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার সামনে বিছানায় বসতে, শুভ্রতা পা গুটিয়ে বসলো। মেহরাদ শুধালো,
“শরীর খারাপ লাগছে? আর কোন মিটিং নেই। ডক্টর এর কাছে নিয়ে যাবো? দেখি এদিকে আয়…”
শুভ্রতা সঙ্গে সঙ্গেই মেহরাদের দিকে গিয়ে গা ঘেঁষে বসলো। কাধে মাথাও রাখলো। মেহরাদ কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা চেক করলো। একটু গরম গা-টা। কিন্তু অস্বাভাবিক না। মাথার উপরিভাগে ঠোঁট চেপে বললো,
“মন ভালো না? একা একা খারাপ লেগেছে?“
শুভ্রতা জবাব দিলো না। চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইলো কিছুক্ষন। তারপর বললো,
“কেমন যেন লাগছে। কিছুই ভালো লাগছে না। এখানে আর থাকবো না। “
“আচ্ছা, আর থাকবো না। আগামীকালই চলে যাবো।”
শুভ্রতা চুপ করে গেল। ভিতরে চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে। হাফসাফ লাগছে। এমন কেন লাগছে?
মেহরাদ ওর মাথাটা বুকে টেনে নিলো। সে আগামীকাল চলেই যাবে। এয়ার টিকেট ও কাটা হয়ে গিয়েছে অলরেডি। গাড়িতে আসতে মেয়েটার খুব অসুবিধা হয়েছে আসার সময়। এটা আর করা যাবে না। এমনিতেও আগামীকাল বিশেষ দিন একটা। গত দুই দিনের যাতাকলে মেয়েটা ভুলেই বসেছে হয়তো দিনটা। কিন্তু নিজের অজান্তেও চাপা কষ্ট ঠিকিই অনুভব করছে।
“আগামীকাল উনিশে নভেম্বর! “
“হু….“ বলেই শুভ্রতা চুপ করে গেল। তারপর হুট করেই কিছু মনে পড়লে মাথা তোলার চেষ্টা করলে মেহরাদ ওর মাথাটা বুকেই চেপে রাখলো। ক্রমাগত হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।
শুভ্রতা নিজের ভিতরে চাপা কষ্টের হেতু খুঁজে পেলো বুঝি এতক্ষনে। দুই ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো চোখ খসে। মেহরাদের শার্ট ভেদ করে মসৃণ ত্বকে শ্বেত অনুভব হলো।
মেহরাদ ওঁকে উঠিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
“কাদে না। আমরা আগামীকাল চলে যাবো বাড়িতে। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছে। বাড়িতেও দোয়া অনুষ্ঠান করাবো ওর জন্য, হু?“
শুভ্রতা এ বিষয়ে যথেষ্ট বুঝদার। যাকে রব নিয়ে যায় তাকে ফিরিয়ে আনার কোন রাস্তা নেই। তবুও প্রতিটি বছর তার বুক পুড়ে ভাইয়ের জন্য। তার আদুরে ভাইটা! আবারও ঠোঁট ভেঙে আসে মেয়েটার। চাপা ভোভা শব্দ হয় অস্পষ্ট। ভেঙে ভেঙে আওড়ায়,
“শুভ্র থাকলে তো সাফির মতো হতো এখন তাইনা? আমার কারণে এমনটা হলো না? “ নিশ্বাস ভারি হলো মেয়েটার৷ মেহরাদ ওঁকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো।
“ওয়াও দ্বীপ ভাই, আপনার পিক গুলা তো সেই হইছে। একদম সেই! এয়েস্থেটিক একদম! “ বলে উচ্ছ্বসিত হলো সোহানা।
দ্বীপ আর সে পাশাপাশি বসে রেস্টুরেন্টে। ক্যামেরায় ছবি দেখছে। তাদের পাশে আছে শান্তা আর আদনান। কিন্তু সেদিকে দুজনের কারোই খেয়াল নেই। রাতের ঝলমলে আলোয় আলোকিত সম্পূর্ণ রেস্টুরেন্ট।চারিপাশে মানুষের সমারহ।
দ্বীপের ক্যামেরা দিয়ে সারাদিন ফটোশুট করেছে দু’জন। খুব এঞ্জয় করেছে। রাতের খাবারের জন্য রেস্টুরেন্ট এসেছে।
“নাহ দ্বীপ ভাই, নাহ! অন্তত আপনার মতো এরকম ফটোগ্রাফার না হলে সেই ছেলের প্রেম করবো না। “ আবারও বিজ্ঞের মতো ঠোঁট চোখা করে বললো সোহানা।
শান্তা তীক্ষ্ণ চোখে দেখে, শুধালো,
“কোন ছেলে?“
“আরেহ, ভার্সিটি উঠলে নতুন নতুন অনেক ছেলের প্রপোজ পাবো না? তখনের গুলার কথা বলতেছি। “
“তুই জানিস পাবি? আর মেহরাদ ভাই দিবে?“
“আলবাত পাবো। এখনই কতো পাই জানো? আর মেহরাদ ভাই সব জানবে কিভাবে? তোমরা না জানালেই হলো। “ বলেই আবারও ক্যামেরাই নজর দিলো মেয়েটা। ওর সব ধ্যায়ান ওখানে।
আদনান ফোসফাস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে দমাচ্ছে। এই মেয়েটা এত্তো পাজি! কিভাবে জোট হয়ে বসে আছে দেখো? এর মাঝখানেই দ্বীপ বললো,
“আমার সিট টা বুকিং হয়ে গিয়েছে বুঝলা? নয়তো তোমায় ওয়েলকাম ছিলো। “
সোহানা এক আশ্চর্যজনক হা করে বলল,
“ওহ্ মাই গড, দ্বীপ ভাইইইইই! সিট বুকিং মানে! আপনি রিলেশন শীপে আছেন? কে সেই ভাগ্যবতী, আমাদের হবু ভাবি? “
হাত নাড়িয়ে সোহানাকে গুরুত্বহীন বুঝালো ব্যাপারটা, দ্বীপ। তাচ্ছিল্য কন্ঠে বলল,
“এ মেয়ে জন্মের গাধা বুঝলে সোহানা? উনি ভাগ্যবতী হতে চায়না। তাই রিজেক্ট করছে বারবার। “ বাকা চোখে একবার শান্তার দিকে চেয়ে বললো দ্বীপ।
চোয়াল শক্ত করলো শান্তা। আর একটা বারতি কথা শুনলে সে এখান থেকে উঠে যাবে। এদিকে আদনান সরু চোখে চেয়ে। তিবে স্বস্তি কিছুটা। এঁদের মধ্যে কিছু হওয়ার নয় তাহলে! পরক্ষনেই নিজে অবাক হলো। তার স্বস্তি লাগছে কেন? কেন লাগছে?
“উনি মানে? আপনায় রিজেক্ট করছে? আসলেই বোকাা মনে হয়! নয়তো আমাদের চার্মিং দ্বীপ ভাইয়াকে রিজেক্ট করে! চশমা লাগাতে বলুন চোখে ওনাকে।“ তেতো মুখে, মুখ বাকা করে বললো সোহানা।
শান্তা ধমকালো ওকে। বললো,
“তোর সিনিয়র হতে পারে মেয়েটা! এটা কোন ধরনের কথা বলার স্টাইল? উঠ এখান থেকে, অনেক হয়েছে খাওয়া দাওয়া । “
দ্বীপ থামালো। সোহানাকে বললো,
“গিভ হার রেসপেক্ট জুনিয়র। তোমার উডভি ভাবি আমারও সিনিয়র। সো…” বলেই এক চোখ টিপ মারলো ।
সোহানা যেন আরও আশ্চার্জনিত হলো। পরক্ষণেই আবার থাম্বস আপ দেখিয়ে বললো,
“জিওহ ভাই, জিওহ! এখন তো এই ট্রেন্ডই চলে দ্বীপ ভাই! সিনিয়র জুনিয়র জুটি খুব হাইপড! ভালো হলো, আমার চোখের সামনেও দেখিতে পাবো। “ পরক্ষণেই আবার বললো,
“এটাই ঠিক আছে। বুড়ো বুড়ো লোক গুলো ছোট ছোট মেয়ে গুলোকে শুধু বিয়ে করতে চায়। এঁদের উচিৎ নিজের থেকে বয়সে বড়দের বিয়ে করা। আপনার থেকে শেখা উচিৎ তাদের দ্বীপ ভাই।” দ্বীপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো মেয়েটা। আড়চোখে আদনানকেও দেখতে ভুললো না। খোচাটা যাকে দিয়েছে সে বুঝলেই হলো!
আদনানের ভিতরে চিরবির করে উঠলো ইঁচড়েপাকা মেয়েটার কথা শুনে। সরু চোখে দেখে গেলো মেয়েটার কর্মকাণ্ড। মেহরাদ কি দিয়ে এটাকে কড়া রকমের একটা থ্রেট দেওয়াবে বলে মনে মনে কল্পনা করে রাখলো।
মেহরাদ শুভ্রতা বেরিয়েছে স্যুট ছেড়ে। শায়ান তালুকদারের কাছে আজকের রাতটা থাকতে চেয়েছে মেয়েটা। মেহরাদ নিজেও চাচ্ছিলো আজকে না-হয় তারা ওখানে থাকুক। এমনিতেও চাচ্চুর সাথে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিলো। শুভ্রতারও ওর বাবার সাথে একটু মন খোলা করে কথা বলা হলো!
গত দু রাত ধরে দেখছে মেয়েটা ঘুমের ঘরেও এটা সেটা বকে। অর্ধেক কথাই শুভ্রকে ডাকাডাকি নিয়ে থাকে। ওঁকে নিয়ে এবার বাহিরের কোন সাইকোলজিস্ট এর স্মরণাপন্ন হবে বলে ভেবেছে ও। এ বিষয়েই কথা বলবে।
আধার রাতের প্রকৃতি কেমন শান্ত নিস্তব্ধ আর শীতল। ঠান্ডা বাতাস ছুয়ে ছুয়ে যাচ্ছে শুভ্রতাকে। মেয়েটা সাই সাই করে পিছু ফেলে চলে যাওয়া গাছ গুলোর দিকে চেয়ে। ভিম্রম, বেখেয়াল সেই দৃষ্টি। আনমনা কি ভাবছে সে নিজেও জানে না!
শুভ্রতা হুট করেই বলে উঠলো,
“আমি মারা গেলেও তো আপনার জীবন থেমে থাকবে না তাইনা? যেমন ধরেন, শুভ্র চলে যাওয়াতে আমাদেরও কিছু থেমে নেই। কষ্ট হয়, বাট থেমে তো কিছু নেই।”
হুইলে থাকা মেহরাদের হাতটা একটু থমকালো বই কি! হ্যাঁ, থমকালো। সেই সাথে হৃৎস্পন্দনও। গাড়ি থামালো না এখন। সামনের একটা ফার্মেসীর সামনে থামালো একটু পর। কিছু কিনে আবার ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। একটা মাম পানির বোতল এগিয়ে দিলো শুভ্রতার দিকে। মুখে কোন রা নেই। নির্বিকার সে।
শুভ্রতা হাসলো আনমনা কিছুটা। পানিতে একটু গলা ভিজিয়ে বললো,
“এতো সিরয়াস হবেন না, বুঝলেন? পারতপক্ষে বাস্তবতা সকলকেই মেনে নিতে হয়৷ আপনারও হবে আমারও হবে। সকলকেই মানতে হবে। আজকে বাবার কাছে থাকবো না আমরা?“
মেহরাদ ছোট করে জবাব দিলো —”হু”
গাড়ি চলতে শুরু করলো আবারও। এযাত্রায় নীরবতা ভাঙ্গলো মেহরাদ,
“আমি খুব করে চাই, আমার অবর্তমানে তোর জীবনে কেউ না আসুক। তুই ছাড়া আমার এ পৃথিবী ঠিক কতটা বিষাদ ঠেকবে সেটা কল্পনা করতে গেলেও আমার নিশ্বাস আটকে আসে। সেখানে,বেচে থাকা দায়। আবার, আমি না থাকলে তোর এ জীবন কিভাবে কাটবে সেটা ভাবতে গেলেও চারদিক অন্ধকার লাগে আমার। হতে পারে চাল্ডিশ, বাট আমি খুব করে চাই, এ দুনিয়া কিংবা আখিরাহ, আমাদের যাত্রা সব সময় এক সাথেই হোক। আল্লাহর দুনিয়ায়, কোন কিছু চাইতে তো বাধা নেই? কবুল করা, না করা, সেটা নাহয় উপর ওয়ালাই ঠিক করুক!“
দৃষ্টি স্থীর সামনেই এখনো। শুভ্রতা মেহরাদের দিকে তাকিয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিলো। ঠোঁট কামড়ে ভেতর থেকে বের হতে চাওয়া চাপা শব্দ টুকু আটকে রেখেছে। একটা মানুষ ঠিক কতটা ভালোবাসলে এরকম চাইতে পারে? সে নিজে কখনো এরকম চেয়েছে? মনে পড়লো না তার।
তবে মেহরাদের মতো দোয়া সঙ্গে সঙ্গেই রবের দুয়ারে ফরিয়াদ করে বসলো। অস্ফুট স্বরে বললো,
“আপনি আমায় ভালোবসার জালে ঠিক কতটা গভীরে আটকাচ্ছেন জানেন? নতুন নতুন অনুভূতিতে মাতাল হচ্ছি আপনাতে আরও।ভবিষ্যতে আরও এমন হবে? এর বেশিও ভালোবাসা যায়?“
“তোর যদি মনে হয়, আমি তোকে গভীর জালে আটকাচ্ছি। দ্যান, ক্যান ইউ ইমেজিন আমি ঠিক কতটা গভীরে অবস্থান করে তোর জন্য জাল বুনছি?“
শুভ্রতা আসলেই ইমেজিন করতে পাড়লো না। তার মাথাতেই সম্পূর্ণ কথা আটলো না। মেহরাদ ওর নীরবতায় বুঝলো যে মেয়েটা আটকে গেছে ব্রেন খাটাতে গিয়ে। দৃষ্টি চলন্ত রাস্তাতে স্থীর রেখেয় ওঁকে বাহুতে টানতে গেলো কিন্তু এর আগেই বড়সড় এক ধাক্কা অনুভব করলো গাড়িতে।
আৎকে উঠে চেচিয়ে উঠলো শুভ্রতা। খামচে ধরলো মেহরাদের বাহু। গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে মিররে পিছনে তাকালো মেহরাদ। একটা কালো রঙা গাড়ি তাদের পিছুই দুর্বার গতিতে এগিয়ে আসছে। এটাই ধাক্কা মেরেছে শিউর মেহরাদ। পাহাড়ি এলাকার রাস্তা, ক্যান্টনমেন্টে যেতে আরও কিছুটা পথ বাকি। কাদের গাড়ি এটা? ডাকাতের?
গাড়ির স্পিড শ’য়ের উপরে তুলে দিলো মেহরাদ। এদিকে শুভ্রতা ভয়ে কুকড়ে জাপ্টে ধরে আছে মেহরাদকে। পিছনের গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে আবারও মেহরাদের গাড়ির সমান সমান আসার চেষ্টা করছে। কালো গাড়িটির কাচ নামানো। দুটো লোক, মুখ কালো টুপিতে ঢাকা। পাশাপাশি আবারও আঘাত করলো। অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে এক প্রকার। মেহরাদ দিশেহারা। এদিকে শুভ্রতা কান্না করছে।
“কি চাই তোদের? কেন পিছু নিচ্ছিস? “ চেচিয়ে জিজ্ঞেস করলো মেহরাদ। লোক দুটো কোন জবাব দিলো। তারা শুধু তাদের কাজ খতম করতে এসেছে। এবং তাদের কাছে আজই শেষ সময় হাতে। এতো টাকার ডিল কিছুতেই হাত ছাড়া করা যাবে না।
আদেশ এসেছে, শুধু একজনকে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু কাউকে তো একা পাচ্ছেয় না। সমস্যা নাই, এরকম খু/ন কতোই করলো, একটার সাথে আরেকটা টপকালেই কি! এমনিতেও যা মাল হাতে আসবে, এতে সারাজীবন খুন/খারাবির ধারে না গেলেও চলবো।
গাড়ির একটা হেডলাইট ভেঙেছে ধাক্কায়। সামনের রাস্তা আবছা অন্ধকার ঠেকছে। মেহরাদ শুভ্রতাকে আদেশ দিলো মোবাইল বের করে শায়ান তালুকদারকে কল করতে।
কাপা কাপা হাতে, শুভ্রতা ফোন বের করে ডায়াল করলো বাবার ফোনে। একবার দু’বার এরপরের বার গিয়ে রিসিভ হলো কল। ওপাশ থেকে হ্যালো বলার সাথে সাথেই, মেহরাদ কথা বলতে চাইলো,
“চাচ্চু কেউ আমাদের গাড়ির উপর…”
পাশের গাড়ির লোক গুলো মেহরাদকে ফোনে কথা বলতে দেখে রেগে গেলো। আর সময় দেওয়া যাবে না। আরও সামনে গেলে ধরা পরে যাওয়ার চান্স। সামনে আর্মির সংরক্ষিত এলাকা। দ্রুত কাম খালাস করতে হবে।
একটা গান বের করলো। গাড়ির জানালায় এক হাতে গান তাক করে রইলো একজন,আরেকজন তুমুল স্পিডে গাড়ির গতি ধরে রাখলো।
তীব্র গাড়ির ঘর্ষণের শব্দে শায়ান তালুকদার কোন কথাই বুঝছেন না ভালো করে। বারবার হ্যালো হ্যালো করছেন। মেহরাদ এপাশ থেকে চেচিয়ে বলতে শুরু করলো এবার। তবে কিছু বলে, আবার পাশে তাকিয়ে দুস্যদের হাতে গান দেখে আৎকালো কিছুটা। শুভ্রতার মাথাটা নুয়িয়ে চেপে ধরতেই তীব্র গুলির শব্দ হলো। চারিপাশের পাখি গুলো যেন ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটানো শুরু করলো।
মেহরাদের গাড়ির কাচ ভেদ করে গুলি ছুটেছে অপর কাচ দিয়ে। দু’পাশের কাচ’ই ভেঙে গিয়েছে। উন্মুক্ত এখন জানালা। গাড়ি এলো মেলো ছুটছে। কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে। এইরকম হলে খুব শিগগিরই এক্সিডেন্ট ঘটবে যেকোনো সময়।
বারবার শুভ্রতাকে নিজের সাথে চেপে ধরছে। নিজের থেকেও বেশি মেয়েটার জন্য ভয় হচ্ছে তার। নিজের মস্তিষ্ক হাতড়েও এতো বড় শত্রু কে ধরতে পারছে না সে। তবে যেটুকু বুঝতে পারছে, এরা কোন ডাকাত দল নয়। তাদের মৃত্যুর সুপারি নিয়েই এসেছে। কিন্তু কার থেকে?
এই মূহুর্তে গাড়ি থামালেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হবে না থামালেও করতে হবে বোধহয়! কি করবে এখন মেহরাদ? সে শুভ্রতাকে বারবার সাহস রাখতে বলছে। মোবাইলটা পরে গিয়েছে নিচে কোথায় যেন! শুভ্রতা অন্ধকার হাতড়ে খুজার চেষ্টা করছে। যদি একটু বাবার সাথে যোগাযোগ করা যায়!
একটু পিছু ফেলে আসা গাড়িটা আবারও সামনে চলে আসছে। রাস্তা এলোমেলো হয়েছে। গন্তব্য এখন বেমালুম। আবারও গুলি ছুড়ার শব্দ হলো। এবার গুলি বুঝি টায়ারে মেরেছে! গাড়ি অচল প্রায় হয়ে যাচ্ছে। স্টেরিয়াং এ রাখে হাত দুটো এযাত্রায় থরথর করে কাপতে শুরু করলো। সামনে অথৈ সাগর দেখলো শুধু।
শুভ্রতা পারছে না এ-সব কিছু মিথ্যে প্রমান করতে। তার কাছে এগুলো সব ইলিউশন লাগছে। ব্রেন যেন কার্যক্ষমতা হাড়াচ্ছে!
তীব্র হুংকার ছেড়ে আরও একটি বুলেট ফুরে বের হলো গান থেকে। সেই সাথে শুভ্রতার তীব্র চিৎকার। হুইল ছেড়ে দিয়েছে মেহরাদ। ডান বাহুতে এসে লেগেছে গুলি৷ তড়তড়িয়ে তরতাজা রক্ত বের হচ্ছে গলগল করে। সমস্ত দেহ অসার হয়ে আসছে যেন। দেহের প্রত্যেকটা নিউরন তীব্র এ ব্যাথা ধারন করতে মিনিট খানেক সময় নিলো। শুভ্রতা গলা ফেড়ে আহাজারি করছে। মেয়েটা মনে হচ্ছে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখছে। একবার মেহরাদকে ধরছে তো আরেকবার হুইলে ধরছে। গাড়ি কোথায় যাচ্ছে অজানা তার। যেকোনো মূহুর্তে কোন গাছের সাথে লেগে যেতে পারে। সুনসান জায়গা হওয়ায় হয়তো গাড়িরও তেমন আনাগোনা নেই।
মেহরাদ এক হাতে কোন রকম আবারও হুইলে চাপালো। শুভ্রতাকে নিভু নিভু স্বরে বললো,
“আমার জান, কান্না করে না। তোকে ঠিক চাচ্চুর কাছে পৌছে দিবো।তুই আমার ব্রেভ গার্ল,না? মোবাইল টা কোথায় দেখ। বন্ধ হতে দিবি না। ট্র্যাকার আছে মোবাইলে। গাড়ি কন্ট্রোলের বাইরে যাচ্ছে। ওপাশের দরজাটা খুল জাম্প করবি হু? মোবাইলটা খুজ আগে। ওটা সাথে নিয়ে জাম্প কর। ওদের আমি ডাইভার্ট করছি। তোর দিকে যেন ধ্যায়ান দিতে না পারে। গো…”
“নাহ…নাহ…নাহহহহ। কি বলছেন এসব? আমি কোথাও যাবো না। যাচ্ছি ন আমিা। আপনায় ছাড়া কোথাও না..“অনবরত বিলাপ করতে করতে বললো শুভ্রতা।
মেহরাদ শুনলো না ওর কথা। সে জানে, গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না। সামনে কি হবে তা অনিশ্চিত। কিন্তু, মৃত্যু…
সে আর ভাবলো না গাড়ির অপরপাশের দরজা খুলে দিলো। শুভ্রতা ওঁকে জাপ্টে ধরে নিলো। সে কিছুতেই যাবে না। মেহরাদ ভেবেছিলো আক্রমণ করা গাড়িটা বুঝি তাদের মৃত্যুর জন্য ছেড়ে দিয়ে, পিছু ছেড়েছে। কিন্তু সে ভুল। তাদের নিঃশেষ করে দিতে, শেষ বারের মতো আবারও গাড়িতে পিছন থেকে হামলা হলো। বড়সড় এক ধাক্কায় মেহরাদদের গাড়িটি উল্টিয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে গাছের সাথে বারি খেলো প্রচন্ড আঘাত হেনে।
সাথে সাথেই থেমে গেলো, লন্ডবন্ড হয়ে যাওয়া গাড়ির ভিতরের একজোড়া কপোত-কপোতীর ভালোবাসার প্রেমময় আদেশ অনুরাগ। শুভ্রতাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে চাওয়া মেহরাদের মনোভাব। মেহরাদকে ফেলে কোথাও না যেতে চাওয়া প্রবল অনুরাগী শুভ্রতা।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২ (২)
এ কি হলো দু’জনের? কি অবস্থায় এখন আছে দু’জন? ওদের জন্য কি ১৯ ডিসেম্বরটা বেশিই অলুক্ষনে? ওঁদের তো জানা হলো না ওঁদেরও বিয়ের কথা হচ্ছিলো বাড়িতে নতুন করে। আলতাফ তালুকদারের তো ছেলেকে আরও কথা শুনানো বাকি ছিলো। তার গম্ভীর ছেলেটার এখন কি অবস্থা? মোবাইলটা কোথায়? ওটাও কি গাড়ির মতো, গাড়ির মালিকদের মতো চূর্নবিচূর্ন হয়ে গিয়েছে!
অপরদিকে, নিজের কাজের ইস্তফা দিয়ে কালো রঙা গাড়িটা সাই সাই করে পিছু ছুটিয়ে আবার চলে গেলো। যেতে যেতে নিজেদের কাজের ইস্তফা জানিয়ে খবর পৌছে দিলো উপর মহলে।
