Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪
সাঞ্জেনা শাজ

শায়ান তালুকদার তার জিপ ছুটিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়েছে। অনবরত বেজে যাচ্ছে অপর পাশের ফোনটা।কিন্তু কেউ তুলছে না। চিন্তায় অস্থির তিনি।
বিচক্ষণ মেজর তিনি, সাথে সাথেই লোকেশন ট্রাক করলেন। নিজের ক্যান্টনমেন্টের বিপরীত রাস্তায় লোকেশন পেয়ে ভিতরে শংসয় আশংকা বাড়লো। তার চেয়ে বেশি বাড়ল যখন, লোকেশন স্থীর দেখলো।
ফোন তুলছে না। গাড়ি চালাচ্ছে না। লোকেশন তো একই জায়গায় দেখাচ্ছে । ওইদিকে করছে কি ছেলে মেয়ে দুটো! “ চিন্তায় অস্থির তিনি মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতেই সেদিকে ছুটলেন।

নিস্তব্ধ ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে মিনিট বিশেকের মধ্যেই লোকেশনের কাছে পৌছে যাচ্ছে শায়ান তালুকদার। যত এগচ্ছে, মনের ভিতর ভয়েরা ততই প্রগাঢ় হচ্ছে। গাড়িতে থাকা অবস্থাতেই দূরের আবছা দৃশ্য চোখে বাজছে। ল্যাম্পপোস্ট এর দূরবর্তী কোন স্থানে ম্লান আলোয় ভাঙ্গা চোরা কিছুর অস্থিত্ব। চারদিকের জঙ্গলী বন পাখিদের ডাক যেন ওই জায়গাটায় বিচিত্র রকম ভাবে বাড়া।
গাড়ি যত এগচ্ছে, পেট্রলের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তিনি, অতি শিগগিরই খবর পাঠালেন ক্যান্টনমেন্টে। গাড়ি আরও কিছুটা এগোতেই মস্তিষ্ক ভিন্ন কিছু আচ করলো। একজন সেনা কর্মকর্তার মন যেন নিমেষেই সব জেনে গেলো।তবুও মানতে নারাজ। হাত দুটো অনবরত কাপছে। ফোন করছে পরিচিত নাম্বারটাইয়। নাহ, এখনো কেউ রিসিভ করলো না।
গাড়ি এসে কাঙ্খিত স্থানে থামতেই পরিচিত গাড়িটি চিনে ফেললো তিনি। চারদিকের অন্ধকার ভয়াল নিস্তব্ধ রাত যেন তাকে চেপে ধরে কন্ঠঃ রোদ করে ফেলেছে। শুধু স্থির হয়ে রইলো কিছুক্ষন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মনকে মানাতে পাড়ছে না।
একটি নীল রঙা লিমিটেড এডিশনের গাড়ি যেটা সবসময় তালুকদার বাড়ির আভিজাত্য বহন করতো তা আজ রাস্তার ধূসর বালিতে ভেঙে চোরে মিশে আছে। সেই সাথে মিশে আছে দুটো দেহ। দুটো প্রান।তার বাড়ির প্রান। তাদের দুনিয়া।

পিছন থেকে সাইরেন ভেসে আসছে। এতো তাড়াতাড়ি পুলিশের গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে তার ক্যাপ্টেন বিষয়টি আশ্চর্যের। তবুও ভালো। গাড়ির সাইরেনেও হুশ ফিরল উনার। হয় না কিছু মানুষ এমন, অতিরিক্ত শকে সাময়িক ভারসাম্যতা হাড়ায়? বর্তমানে তিনিও তেমন অবস্থাতেই আছেন।
শায়ান তালুকদারের আন্ডারে থাকা ক্যাপ্টেন তুহিন সহ পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসলো দৌড়ে। তারা ভেবে নিলো এক্সিডেন্ট ডেথ কেস। রিপোর্ট শুরু করে দিলো না চেক করেই হকিটকি দিয়ে। এম্বুলেন্স পাঠাচ্ছে জানিয়ে দিলো। তুহিন গিয়ে তার স্যারকে ডাকলো বার দুয়েক। সারা না পেয়ে গা’য়ে হাত ছুয়াতেই যেন হুশ ফিরলো ওনার। তুহিন বলে চলছে তখন,
“স্যার এক্সিডেন্ট কেস মেইবি। বডি বের করবে এখন। আপনি যেন কোথায় যাচ্ছিলেন! আমি এদিকটা সামলে নিচ্ছি।”
শায়ান তালুকদার ওর কথাগুলো আবছা শুনলো, পাগলের মতো চিৎকার করে উঠে দৌড়ে গেলো ভাঙা চোরা গাড়িটার কাছে। ঘড়ি পড়া একটা হাত বের হওয়া। উল্টিয়ে আছে গাড়িটি। মেহরাদের জখমি রক্তাক্ত একটি হাত।
“মেহরাদ এ মেহরাদ? মেহরাদ রে? চাচ্চু আমার? কি হলো এটা? এই কথা বল চাচ্চুর সাথে? আমার মেয়েটা কই রে বাবা? কই আমার মেয়েটা? চাচ্চুর সাথে কথা বল ব্যাটা? “

তুহিন হতবাক হয়ে গেলো যেন। সেও পিছু পিছু গিয়ে হাটু গেড়ে বসলো তার স্যার এর সাথে৷ জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার পরিচিত স্যার? এঁদের উদ্দেশ্যেই কি বের হচ্ছিলেন?“
“তুহিন… তুহিন আমার ছেলেটা…আমার মেয়েটা এ কি অবস্থায় আছে বলো…ও..ওঁদের কথা বলতে বলো।বের হচ্ছে না কেন ওরা? সাড়া দিচ্ছে না কেন…?“
তিনি যেন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য। গাড়ির ভাঙ্গা দড়জা টেনে খুলার চেষ্টা করছেন। মেহরাদের রক্তাক্ত হাতটা বার বার ঝাকাচ্ছেন। কিন্তু কোন রেসপন্স পাচ্ছেন না৷ অপর পাশে আবারও ছুটলেন। তার মেয়েটার তো সাথেই থাকার কথা!
অপর পাশে গিয়ে দেখলেন, শুভ্রতা আকরানো মেহরাদের এক বাহুর কাছটায়, শেষ অব্দি বুঝি মেয়েটামে আগলে রাখতে চেয়েছে ছেলেটা! তার কথা রেখেছে। মেয়েটা কেমন বিদ্ধস্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে আছে উল্টিয়ে। একটা হাত শুধু ভালো করে দৃশ্যমান, এটাও রক্তাত্ব।
পুলিশের মধ্য থেকে দুটো অফিসার এসে বিনম্র গলায় তখন বলে উঠলো,

“স্যার, আমাদের চেক করতে দিন। বের করার ব্যাবস্থা করছি। প্রচুর প্যাট্রোল লিক হচ্ছে। যেকোনো সময় আগুন ধরে যেতে পারে। “
“তাড়াতাড়ি করুন অফিসার, যত দ্রুত সম্ভব করুন। ওঁদের হাসপাতালে নিতে হবে তো! তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ, তাড়াতাড়ি করুন। শুভ্রতা…এই শুভ্রতা? দেখ মা বাবা…বাবা এদিকে। অফিসার সাহেব? তাড়াতাড়ি করুন না প্লিজ৷ তাড়াতাড়ি করুন… “
শায়ান তালুকদার যেন উন্মাদ তখন। এরকম পরিস্থিতি তে সকলেরই একিই অবস্থা হওয়ার কথা৷
দু’জন অফিসার মিলে ভাঙা গাড়ির দরজাটা টেনে খুলে ফেললো বহু কষ্টে। চ্যপ্টা হিয়ে ছিলো। দরজাটা খুলতে পেরেই শায়ান তালুকদার হুর মুর করে মেহরাদকে টেনে বের করলেন। পালস রেট চেক করে পালস পেলেন না। আহাজারি করে উঠলেন। দু চোখ বেয়ে আশ্রু গড়াচ্ছে।
অফিসার দু’জন মৃত ঘোষণা করতে চাইলে তুহিন চোখের ইশারায় আটকালো। শায়ান তালুকদারকে বলে দ্রুত হসপিটালাইজড করতে হবে জানালো। তাহলেই সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।
একিই ভাবে শুভ্রতাকে বের করলো। মেয়েটার পালস আছে খুবই ক্ষিন। শায়ান তালুকদার হন্যে হয়ে গাড়ি ছুটাতে বললেন ক্যান্টনমেন্টের হসপিটালের দিকে। গাড়ি চললো সেদিকে যেখানে আর্মিরা চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে।

আলতাফ তালুকদার ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েও ব্যার্থ হচ্ছেন বারবার। মেজাজ হারাচ্ছেন তিনি। রাসেল সাহেবকে কল করলেন শেষ মেষ। আগামীকাল দোয়া অনুষ্ঠান রাখিতে চাচ্ছে শুভ্র’র জন্য। ছেলেটার সাথে পরামর্শ ছিলো এ বিষয়ে। অথচ কল’ই ধরছে না!
বিরক্ত তিনি স্ত্রী কে বললেন,
“তোমার ছেলে কি রাজকার্জ সামলাচ্ছে বলোতো মেহরাদের মা? মোবাইল বন্ধ কেন?“ বলতে বলতেই রাসেল সাহেব কল রিসিভ করে ওপাশ থেকে সালাম জানালেন।
আমজাদ তালুকদার জানালেন,
“তোমার স্যার কোথায় রাসেল? মোবাইল কনটিনিউয়াসলি বন্ধ আসছে। “
“স্যার কে আমিও পাচ্ছি না বড় স্যার। উনারা তো ছোট স্যারের কাছে যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন সেই কখন।” আমতা আমতা করে বললো রাসেল সাহেব। বেচারা নিজেও চিন্তিত। তার স্যার কল ধরেন নি আগে। এখন আবার বন্ধই করে রেখেছে মোবাইল।
আমজাদ তালুকদার কল রেখে দিলেন। ভাইকে কল করেও পেলেন না। রাগে গজ গজ করলেন কিছুক্ষন।

শুভ্রতাদের হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে স্ট্রেচারে ভিতরের দিকে টেনে নয়ে গেলো নার্সরা। হুলুস্থুল লাগিয়ে দিয়েছে শায়ান তালুকদার। দুজন ডক্টর দৌরে এসে চেক করলো ওঁদের। শুভ্রতাকে এক দিকে পাঠিয়ে মেহরাদকে নিয়ে যাচ্ছে আরেক দিকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পোশাকের রঙ ধরা গেলো না। একজন ডক্টর বেডে উঠে অনাবরত CPR দিতে থাকলো।
একবার দু’বার পরপর কয়েকবার চেষ্টার পর হার্টবিট পেলো। দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে ঢুকালো দু’দিকে দুজনকে। শুভ্রতা গাড়িতে থেকেই কিছুটা রেসপন্স করেছিলো বিদায় ওর আরো আগেই অপারেশন থিয়েটার রেডি করে রাখতে বলে ছিলো।

ওঁদের ভিতরে নিয়ে যেতেই শায়ান তালুকদার দিশেহারা হলেন। শরীর ছেড়ে দিয়ে পরে যেতে নিলেই তুহিন আগলে নিয়ে বেঞ্চিতে বসালো ওয়েটিং এরিয়ার। সান্তনা দিতে থাকলো। এরকম ক্রিটাক্যাল পরিস্থিতে তার সান্ত্বনাও নিজের কাছেই খুব লেইম লাগলো। ছেলেটার জন্য জোর টেনশন হচ্ছে। আল্লাহ হায়াত রাখলেই হয়।
আবারও বাজতে থাকলো শায়ান তালুকদারের ফোনটা। হুশ ফিরলো যেন। কাউকেই তো খবর জানানো হয়নি। মোবাইল উচিয়ে দেখলো বড় ভাইয়ের ফোন। বুক ভেঙে আসলো তার। চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো বাচ্চাদের মতো।কি জবাব দেবে ভাইকে? চাকরি রতো জীবনে এতো ভঙ্গুর তার স্যারকে তুহিন কখনো দেখেনি। দেখেছে এক স্ট্রিক্ট মেজরকে। যার আন্ডারে বহু অপারেশন চালিয়েছে তারা দেশে বিদেশে। সে মানুষটার আজ পরিবার শোকে কি হাল!
কল রিসিভ করে কানে চাপলেন তিনি। ওপাশ থেকে ভেসে এলো আমজাদ তালুকদারের কর্কশ কন্ঠঃ,
“কি ব্যাপার? চাচা ভাতিজা করছো টা কি? কল তুলছো না কেন?“
ঢুকরে উঠলেন শায়ান তালুকদার। ওনার চাপা কান্নার শব্দ শুনে হকচকিয়ে গেলেন তিনি। চিন্তিত হলেন,

“কি ব্যাপার, কথা বলছো না কেন? শায়ান? হ্যালো.. হ্যালো? “
এবারেও শায়ান তালুকদার কোন রেসপন্স করতে পারলেন না। তার কথা জড়িয়ে আসতেই অস্থির হলো আলতাফ তালুকদার । প্রশ্ন ছুড়লেন,
“কি হয়েছে শায়ান? কথা বল? আমার ছেলেটা কোথায়? ওঁকে ডাক। তোর কাছে নাকি বলে গিয়েছে?“
শায়ান তালুকদার প্রথমেই জবাব দিরে পারলেন না। শক্ত ঢোক চেপে আবারও কেদে উঠলেন। কান্নারত স্বরে জানালেন,
“ভাই…ভাই আমাদের ছেলে মেয়ে দুটো যে ভালো নেই ভাই। ওরা যে মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে আছে ভাই। ওঁকে কিভাবে ডেকে দেই ভাই?কিভাবে…? “ কান্নায় ভেঙে পরলেন আবারও তিনি।
আমজাদ তালুকদার বুঝি কানে ধোয়াশা কিছু শুনলেন? স্থীর হয়ে দাড়িয়ে রইলেন কেবল। ওনাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাহানারা বেগম কাধে ধাক্কা দিলেন। হুশ ফিরতেই ভাইকে শুধালেন,
“কি…কি বলছিস…ওঁরা ওঁরা কোথায়? ডাক মেহিরাদকে। তোর কথা আমি বুঝছি না। আমার ছেলেটাকে ডাক। তোর কাছে যাবে বলে নাকি রওনা দিয়েছিলো? ডেকে দে ওঁকে… “

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩ 

“ভাই, ছেলেটাকে কিভাবে ডেকে দিবো ভাই? আপনি দোয়া করুন ভাই, আল্লাহ যেনো ছেলে মেয়ে দুটোকে রেখে দেয় আমাদের কাছে। দোয়া করুন..“ বলতে বলতেই কথা জড়িয়ে আসলো। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
ওপাশ থেকে নার্স এসে হম্বিতম্বি করে ডেকে নিয়ে গেলো। আলতাফ তালুকদার এই প্রথম বুঝি ছেলের জন্য অসহায় বোধ করলেন! হয় না এরকম? গম্ভীর মানুষ গুলো বরাবরই অনুভূতি প্রকাশে ব্যার্থ হয়! তিনিও বরাবরই সেরকম। সন্তানদের ক্ষেত্রে অনুভূতি প্রকাশে ব্যার্থ। তবে আজ দিশেহারা হয়ে গেলেন।
বিছানার হাতল ধরে বসে পড়তেই জাহানারা বেগমের চিন্তার মাত্রা বাড়ল। স্বামীকে অস্ফুট স্বরে বিরবির করতে শুনেই তার পা’য়ের নিচের জমিন সড়ে গেলো যেন….

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (২)