৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৫
রুপান্জলি
ব্রেকিং নিউজ: গতকাল রাত আনুমানিক ২টার দিকে ঢাকা জেলার রমনা থানার শেষ প্রান্তে অবস্থিত Red Moob TG বারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বারটি আগুনে পুড়ে যায়।ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও এখনো পর্যন্ত কোনো জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, ঘটনার সময় রমনার বর্তমান সংসদ সদস্য সমিরন মন্ডল বারের ভেতরে মদ্যপানে ব্যস্ত ছিলেন।
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানানো হচ্ছে, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এমপি সমিরন মন্ডল নিহত হয়েছেন। আগুনের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেমে যাওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের দেহের কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেগুলো কার দেহের অংশ,,তা এখনো নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে দুঃখজনক আরেকটি ঘটনায় জানা গেছে, ডেমরার ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোডে এমপি সমিরন মন্ডলের একমাত্র পুত্র অজয় মন্ডলের ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তীব্র গাড়ি দুর্ঘটনায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাচ ঢুকে যায় এবং তিনি মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিলেন।
রাত আনুমানিক ১টার দিকে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
উভয় ঘটনার তদন্ত চলছে এবং বিস্তারিত ও নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।,,,
,,, মোবাইলের স্ক্রিনে এমন নিউজ দেখে লাফিয়ে উঠলো পরসি। সে ফজরের নামাজ পড়ে একটু ফেইসবুকে ঢুকেছিলো। ঢুকার সাথে সাথে সময় টিভির নিউজটা সামনে এলো। আর এক সেকেন্ড ও অপেক্ষা করলোনা পরশি,, মাথার ঘোমটা টা টেনে টুনে ঠিক করে রুম থেকে বেড়িয়ে সোজা হল রুমে চলে গেলো। যদিও আপাতত হল রুমে তেমন কেউ নেই কিন্তু এখোনি বাবা চাচা এবং ভাইয়ারা নামাজ থেকে ফিরে আসবে। তাই মোবাইল হাতে সোফায় ধাম করে বসে পরলো। তখোনি উপর থেকে ধীরো পায়ে নেমে এলো মেধা। এখন সে আর মুখ ঢেকে রাখেনা,, মুখে কয়কটা সেলাইয়ের ক্ষত রয়েছে আর বাকি ছোট ছোট ক্ষত গুলো সার্জারীর কারনে মিলিয়ে গিয়েছে সাথে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ফলে এখন আর জড়তা কাজ করেনা। পরসিকে এমন উসখুস করতে দেখে মেধা ওর সামনে এসে দাড়িয়ে বললো — কিরে, বেঙ এর মতো লাফালাফি করছিস কেনো? কিছু হয়েছে?
,,,পরশি আতঙ্কিত স্বরে বললো — আপু তুমি সকালে নিউজফিডে ঢুকেছো?
,,, মেধা ঠোঁট উল্টে মাথা ঝাকিয়ে না করলো। পরশি তারাহুরো করে বললো — আল্লাহ!! তুমি এখোনো জানোনা? এমপি সমিরন মন্ডল আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছে আর তার ছেলে রোড এক্সিডেন্ট করে হসপিটালে ভর্তি। অজয় মন্ডলের নিথর দেহের ছবি দেখে আমি খুব ভয় পেয়েছি জানো? শরীর এতো পরিমাণ ক্ষত বিক্ষত হয়েছে যে যেকেউ দেখলে ভয় পেয়ে যাবে। মুখ একদম কিমা কিমা হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ জানে বাচবে কি বাচবেনা। যদিও সমিরন মন্ডল ছোট আব্বুর বিপক্ষ দল, সেদিক থেকে আমার খুশি হওয়ার একটা বিষয় থাকলেও মানুষ হিসেবে বেশ কষ্ট হচ্ছে। আহারে, তাদের পরিবারের জন্য মায়া হচ্ছে। আল্লাহ তাদের হেফাজতে রাখুন। আমার বেশ মায়া হচ্ছে।
,,, মেধা ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো, পরপর সদর দরজার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো — আমার হচ্ছেনা। সয়তান জাহান্নামে যাবে এটাই স্বাভাবিক,, এখন সারা জীবন সাথে সাথে থেকেছে বলে কি সয়তানের জন্য ও আফসোস করতে হবে?
,,,বিরবির করে বলায় পরশি মেধার কথাটা ক্যাচ করতে পারেনি। সে বিপরীতে কিছু বলতে নিবে তখনি সদর দরজা দিয়ে চার পুরুষ আগমন ঘটলো। চার জনের হাতেই জায়নামাজ,, মাথায় টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবী। সবাইকে দেখে চোখ জুড়ালো দুই বোনের। এরকম সময় তারা বহুদিন পর দেখছে,, ছয়-সাত বছর আগে প্রতিদিন দেখা হতো।তখন অবশ্য চার পুরুষ নয় বরং পাঁচ পুরুষ ছিলো এখন তো মাহিদ মির্জা চাইলেও নামাজে যেতে পারেন না অথচ একটা সময় ছিলো যখন তিনি সবাইকে ডেকে ডেকে নামাজে নিয়ে যেতেন। মেধা আর পরশিকে দেখে ওদের কাছে এগিয়ে এলো চারজন। শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা সোফায় গা হেলিয়ে বসলেন,, বিহান এগিয়ে গিয়ে মেধার সামনে দাড়ালো। আসার সময় অনেক দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে এসেছিলো সেসব একসাথে করে মেধার দু গালে হাত রেখে চোখে মুখে ফু দিলো। স্বামীর আগ্রহ , যত্ন আর নৈকট্যতায় আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো মেধা। জীবনে এটুকু সুখ পেলে আর কি লাগে? এইযে প্রতিদিন বিহান এসে তার চোখে মুখে ফু দেয় এতে কতোটা ভালোবাসা প্রকাশ পায় সেটা কি বিহান জানে? জানেনা। তবে এবার নাহয় জানুক । আর কতো দূরে দূরে থাকবে তারা? বৈবাহিক জীবনের চার বছর সাত মাস পেরুতে যাচ্ছে,, এবার তো সংসারটা সাজাতে হবে। একটা কিংবা দুটো বাচ্চা কাচ্চার ও তো দরকার আছে নাকি? বাচ্চার কথা ভাবতে গিয়ে লজ্জা পেলো মেধা,, চোখ বুঝে এরকম লজ্জালু হাসতে দেখে বিহান ঠোঁট উল্টালো। এভাবে লজ্জা পাওয়ার কি হলো? সে তো সবসময় ই বউটার কল্যানের জন্য দোয়া দরুদ পড়ে ফু দেয়। কই আগে তো এতো লজ্জা পায়নি? আজ আবার বউটার কি হয়ে গেলো? বিহান মেধার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আছতে করে জিজ্ঞেস করলো — কি হয়েছে রানি? এরকম লজ্জা পাচ্ছেন কেনো?
,,, মেধা চোখ তুলে তাকিয়ে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে কিছুনা বুঝালো। পরপর গাল থেকে বিহানের হাত টা সরিয়ে রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো — ভাইয়া!! তোমায় কি দিবো? কফি নাকি গ্রিন টি?
,,, দ্বীপ পরশীর পাশে বসে মেধার উদ্দেশ্যে বললো — কফি দিস,, (পরপর পরশির উদ্দেশ্যে বললো) তুই মুখটা এমন করে রেখেছিস কেনো? কিছু হয়েছে?
,,,দ্বীপের সাথে সাথে বিহান ও এসে পরশির অপর পাশে বসলো, মাথাটা এক হাতে এদিক ওদিক ঘুড়িয়ে দিতে দিতে বললো — মুখ দেখে মনে হচ্ছে হাসবেন্ড মারা গিয়েছে। কিরে তর জামাই মরেছে?
,,, ভাইয়াদের মজা বুঝতে পেরে পরশি মাথা থেকে বিহানের হাত সরিয়ে সিরিয়াস কন্ঠে সবটা খুলে বললো। সব শুনে প্রত্যেকেই নিরব হয়ে গেলো। মুখ জুড়ে এমন একটা ভাব যেনো তারা এই নিউজ শুনে বড্ড ব্যাথিত হয়েছে। সবার ব্যাথিত মুখ দেখে পরশিও ব্যাথিত হলো। সে খুব নরম মনের মানুষ কিনা? তাই তো মানুষের কষ্ট দেখলে তারো কষ্ট লাগে অনেক্ক্ষণ নিরবতা পালন করার পর দ্বীপ বিহানের উদ্দেশ্যে বললো — ডেকোরেশনের লোকজন কখন আসবে? বিষয়টা নিয়ে আমি বড্ড সিরিয়াস,, এসব মুহুর্ত বার বার আসেনা।
,,,বিহান বললো — এখন সকাল মাত্র,,নাস্তার পর আসতে বলেছি।
,,সবকিছু টাইম মাফিক না হলে?
,,,হবে।
,,, শিউর?
,,,৯৯%।
,,, আর ১%?
,,, সেটা তর পারফরমেন্সের উপর নির্ভর করে।
,,, তর কি মনে হয়? পারফরম্যান্স খারাপ হবে?
,,, আল্লাহ মালুম।
,,, দুই ভাইয়ার আলাপ আলোচনার মানে বুঝলো না পরশী। সে বিহানের কাধে মাথা রেখে উদাস ভঙ্গিতে বললো — ভাইয়ো!! তোমরা কি নিয়ে আলোচনা করো? আজকে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে? আমাকেও বলো,,, ছোট বলে আমাকে কেউ পাত্তাই দেওনা।
,,, মেধা সবার জন্য চা কফি নিয়ে এলো। মাহিন মির্জা রিমোট খুজে টিবি ছাড়লেন। জমুনা টিবিতে রেড মুন ক্লাবের ধ্বংসাবশেষ লাইভ দেখাচ্ছে। এখনো সেখান থেকে মৃধু মৃধু ধোয়া বের হচ্ছে। নিচে খুব ছোট ছোট করে শিরোনাম লেখা,,
শিরোনামঃ শতো খুঁজাখুঁজির পর দেখা মিলছে নিহতদের দেহের জীর্ণ শীর্ণ পুড়ে যাওয়া টুকরো। কোন অংশটা কার এখনো শনাক্ত করা যাচ্ছেনা।
,,, বিহান ও সেদিকে মন দিলো,, পরশি নিজের কথার উত্তর না পেয়ে আবারও ঠোট উল্টালো। হঠাৎই নজর পরলো দ্বীপের হাতে,, হাতের অনেক পাশ কেটে লাল হয়ে আছে। পরশি ভাইয়ার হাত ধরে বললো– বড়ো ভাইয়া!! তোমার হাতে কি হলো? ঔষধ লাগাওনি? দাড়াও আমি ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে আসি।
,,,দ্বীপ বাধা দিয়ে বললো — লাগবেনা। যার জন্য হয়েছে সে এসে ঔষধ লাগালে ঔষধ লাগবে নয়তো দরকার নেই। সে ভালোবেসেও যদি মায়া না করে এড়িয়ে যেতে পারে তাহলে আমি নিজের জন্য মায়া করবো কেনো? আমি তো নিজেকে ভালোবাসিনা,,,যে ভালোবাসে, ভালো রাখার দায়িত্ব তার।
,,,ভাইয়ের কথায় স্পিচলেস পরসি,, কি বলবে ভেবে পায়না। এমনি ভাইয়া ভাবিকে বাড়িতেও আনবেনা আবার ভাবি ঔষধ না লাগিয়ে দিলে ঔষধ ও লাগাবেনা। এসব প্রেম টেম এজন্যই বোরিং লাগে তার কাছে। একজন বুঝলে আরেকজন বুঝেনা আবার দ্বিতীয় জন বুঝলে প্রথম জন বুঝেনা। যত্যসব ভালোবাসা!! পরসীর ভাবনার মাঝে শাহিন মির্জা বললেন —
,, পরশ!! যাও তো আম্মু, বড়ো আব্বুকে নিয়ে আসো। ভাইজান উপরে বোর হচ্ছে নিশ্চয়ই? যাও!!
,,, পরশি সব বাদ দিয়ে ধেই ধেই করে উপরে চলে গেলো। সে যতটা সরল সাদাসিধা ততোটাই চঞ্চল। খুব একটা নিজেকে স্থির রাখতে শিখেনি,, সবসময় উড়াউড়ি করা স্বভাব। অর্থ মন্ত্রীর একমাত্র মেয়ে বলে কথা, তার উপর ভাইরা বড়ো বড়ো নেতা। তার ডিমান্ড ই আলাদা। পরশি যেতেই মাহিন মির্জা বললেন —
,,, কি হয়েছে বলোতো? হুট করেই সব এরকম মটকা মেরে গেলো কি করে?
,,, দ্বীপ কফির কাপে চুমুক বসিয়ে বললো — এতো ভাবনা ভেবে মাথা খারাপ করোনা, ইলেকশনের জন্য রেডি হও।
,,,মাহিন মির্জা অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো –মানে? বুঝলামনা।
,,, মানে আবার কি? বর্তমান এমপি মারা গিয়েছে,, তার ছেলেও আধ মরা। এই মুহুর্ত একটাই রাস্তা, হয় সিলেকশনে এমপি নির্বাচিত হবে নয়তো ফের ইলেকশন। তবে আমার সিলেকশন পছন্দ না,, হলে ইলেকশন হবে,, চারদিকে তোমার নামে স্লোগান হবে, ভোটাভোটি হবে তারপর তুমি আবারো এমপি হবে।
,,, শাহিন মির্জা বললেন– আচ্ছা!! এখন সেসব রাখো। আগে এটা বলো, তোমরা কি চিতায় যাচ্ছো? আমার যেতে হবে মাস্ট,, নয়তো এটা নিয়েও মিডিয়া তোলপাড় হয়ে যাবে।
,,, বিহান বললো– কিসের চিতা হবে? সব তো এমনি পুড়ে ছাই।
,,, মাহিন মির্জা বললেন– কিছু কিছু অংশ পাওয়া গিয়েছে, সেসব নিয়েই আবার পোড়ানো হবে।
,,,দ্বীপ কফি রেখে হাত দুদিকে ছড়িয়ে টানা দিয়ে বললো– তাহলে সবাই মিলে যাও, আমি একটু ঘুমাবো। কাল সারা রাত ঘুম হয়নি।
,,, ততোক্ষণে পরসি মাহিদ মির্জাকে নিয়ে হাজির।তিনি ছেলের কথা শুনে মুখ বিকৃতি করে বললো– ঘুম হয়নি কেনো? রাতে চুরি ডাকাতি করেছো নাকি?
,,, দ্বীপ এক হাতে চুলে বেক ব্রাস করে বললো — আমি চুরি করবো কেনো? আপনার চোর বউমা আমার ঘুম চুরি করেছে। সব দোষ তার,, যা বলার তাকে গিয়ে বলুন।
,,, ছেলের ভাব দেখে বিরক্ত হলেন মাহিদ মির্জা ধমকে বললেন– মশকরা করো আমার সাথে? কালকের লাইভ নিউজ আমি দেখিনি ভেবেছো? তুমি ওকে মেইড বললে কোন সাহসে?
,,, বেশ করেছি,, ও আমার বউ। যা মন চায় তাই ডাকবো,, মেইড, কাজের মহিলা, কামলা বেডি, জান, বাবু, কলিজা, ফ্যাকসা, গুরদা, যা মন চায় তাই ডাকবো। তোমার বউমা রিয়্যাক্ট করবে কেনো? সে আমার জীবনে আসার কালে জানতো না? দ্বীপ মির্জা ভালো মানুষ নয়? ডাইরিতে সবার আগে আমার খারাপ গুন গুলো লেখা ছিলো,, সেসব জেনে আসেনি? এখন এতো নাটক করতে হবে কেনো?
,,,ছেলের নির্লিপ্ত জবাবে ফুসে উঠলেন মাহিদ মির্জা,, কপালে ভাজ ফেলে বললেন– তোমাকে না সেদিন বললাম আমার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে? গেলেনা কেনো? পায়ের চটি খোলার আগে এখোনি বের হও।
,,, দ্বীপ বললো– এই বাড়িতে মেঝো আব্বু আর ছোট আব্বুর ও অংশ আছে,, তাই চাইলেই আপনি আমাকে বের করে দিতে পারেন না।
,,,তোমার মেঝো আব্বু আর ছোট আব্বুকে সবার আগে বাড়ি থেকে বের করবো আমি।
,,, মাহিন মির্জা বিচলিত হয়ে বললেন– ভাইজান!! আমরা কি করলাম? তোমরা বাপ ছেলেতে সব সময় আমাদের টানো কেনো? বুঝিনা।
,,, মাহিদ মির্জা ফের মুখ বিকৃত করে বললেন — এতো নিশ্পাপ সেজো না, এই ছেলেকে তোমরা লাই দিয়ে দিয়ে এমন বানিয়েছো।
,,, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা অবুঝ সাজলেন, দ্বীপ কফিটা এক টানে শেষ করে বললো — আব্বু!! এতো কুটনৈতিক কথাবার্তা না বলে দোয়া রাখুন যেনো আপনাকে সামনের দুমাসের মধ্যে দাদু ডাক শুনানোর ব্যাবস্থা করতে পারি।
,,, ভালো হবেনা?
,,,, ভালো হলে টাকা পয়সা আসবে? যেখানে আয় নেই সেখায় ব্যায় করার কোনো মানেই হয়না।
,,, মাহিদ মির্জা তাচ্ছিল্য হেসে বললেন — তোমাকে তো তোমার বউ পাত্তাই দেয়না। দেখলাম তো গতকাল লাইভে,, কিভাবে অসহায়ের মতো বউয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলে,, কথা বলতে চাচ্ছিলে কিন্তু তোমার বউ তোমার দিকে ফিরেও তাকায়নি।
,,, বাবার কথায় থতমত খেয়ে গেলো দ্বীপ,, আব্বু যেহেতু বুঝে গিয়েছে তার মানে অনেকেই বুঝেছে বিষয়টা। ইসস!! মানসম্মান আর থাকার নয়। দ্বীপ উপরের দিকে হাটা দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো — দোষ করেছি তাই বউ পাত্তা দেয়নি,, এটুকু তার বউগত অধীকার। এখানে এতো খোটা দেওয়ার কি হলো,?
,,, দ্বীপের সরল স্বীকারোক্তিতে অবাক হলো সবাই, দ্বীপ মির্জা তার দোষ স্বীকার করছে? এমন দিন ও দেখা লাগবে তাদের? বাপরে,, কি থেকে কি হচ্ছে কেউ ই ধারনা করতে পারছেনা।
,,,সময়টা বিকালের শেষ প্রান্তে,, গোছগাছ শেষ করে হাফ ছেড়ে বাচলো অর্পনা। ছেড়ে যাবার বেলায় এতো তোরজোর করে যেতে হয় বুঝি? জানা ছিলোনা। আদ্রিয়ান এগিয়ে এসে হেয়ার ড্রায়ার টা অর্পনার দিকে এগিয়ে দিয়ে ব্যাগে ভরে নিতে বললো। অর্পনা মানা করলো না,, মানুষ মারা যাওয়ার পর তাকে কাঠের খাটিয়ায় নেওয়া হোক কিংবা লোহায়,, তাতে লাসের কি এসে যায়? “” অর্পনার নিজেকে এখন সেই লাশ মনে হয়,, মনটা তো কবেই মরে গিয়েছে এবার তার দেহটা যার মাধ্যমেই পারসেল করা হোকনা কেনো? তার কিছু এসে যায়না। রাত্রির ফোপানো স্বরে বিরক্ত হলো অর্পনা, মেয়েটা এতো কাদে কি করে? অর্পনা বিরক্তিকর চোখে সবাইকে একবার করে দেখলো। ইরা নিরবে চোখ মুচছে, রাত্রি ইরার কাধে মাথা রেখে ফোপাচ্ছে,, পল্লব মন খারাপ করে অর্পনার ফেভারিট কিউবটা মিলানোর চেষ্টা করছে,, অরুনটা বোধয় বারান্দায় মন খারাপ করে বসে আছে। এই ছেলেটা বন্ধু বান্ধব নিয়ে বেশ পসেসিভ সাথে অত্যন্ত রাগি,, রাগ সামলাতেই পারেনা। অর্পনার ভাবনার মাঝে আরশাদ জামান একটা টিফিন বক্স এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে, নরম স্বরে বললেন– প্লেনের খাবার খেতে পারবেনা, এটা সাথে রাখো,, খিদে পেলে খাবে।
,, অর্পনা মাথা ঝাকালো,, মিনিট দশেকের মাঝেই বেড়িয়ে যাবে সে,,সাথে শুধু আদ্রিয়ান আর পাপ্পার কিছু লোক যাবে আর বাকিদের মধ্যে কাউকেই নিবেনা সাথে।এমনকি পাপ্পাকেও নিবেনা। অর্পনা বরাবরই দূর্বল জিনিস গুলো থেকে দূরে থাকে,, এইযে চারজন আর পাপ্পা!! যাদের ঘিরে তার পৃথিবীটা তৈরি হয়েছে,, এদেরকে কাছে রেখে বিমানে উঠা খুব কষ্টকর,,,হয়তো কেদেই ফেলবে, তাই তাদেরকে সাথে নেওয়া যাবেনা। অর্পনা এগিয়ে গিয়ে রাত্রির মাথায় হাত রেখে আদুরে কন্ঠে বললো — কাদিস না রাত,, তর কান্না অরুনের সহ্য হচ্ছেনা তাই তো বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়ে আছে। অরুন তকে খুব ভালোবাসে,, এরকম ভালোবাসা হুটহাট পাওয়া যায়না। আগলে রাখিস।
,,, অর্পনার কথা শুনে বারান্দা থেকে রুমে এলো অরুন তার চোখ জোড়া লাল,,কান্নার ফলে নয় রাগলে যেমন লাল দেখায় তেমন। এগিয়ে এসে অর্পনার মাথায় হালকা জোড়েই ধাক্কা মেরে বললো — হে, রাতের জন্যই মন খারাপ। তুই কি ভাবিস তুই চলে যাচ্ছিস বলে আমি কষ্ট পাচ্ছি? এসব নির্বোধ দের জন্য আমার কষ্ট হয়না।
,,,অর্পনা মলিন হাসলো, কে চায় নিজের আপন মানুষ, আপন শহর, আপন সংসার ছেড়ে দূরে চলে যেতে? কেউ ই চায়না। ইদানীং অর্পনা বুঝতে পারে পারু কেনো এতো সংসার সংসার করতো। আসলেই সংসারে একটা আলাদা ব্যাপার আছে,, যা একটা মেয়েকে প্রকৃত নারীতে পরিনত করে। সত্যিকারের সুখ বোধয় সংসার জীবনেই নিহত থাকে। অর্পনা বললো– কষ্ট না পাওয়াটা ভালো,, তদের কষ্ট পেতে দেখলে আমার ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে।
,,, অর্পনার সরল স্বীকারোক্তিতে চার জনেই অবাক চোখে তাকালো, অর্পনা কখনোই এরকম সরাসরি কষ্টের কথা স্বিকার করেনা। অরুন হাত উচিয়ে অর্পনার মাথায় হাত ভুলিয়ে দিলো,, সাথে সাথে একপেশে জড়িয়ে ধরলো অর্পনা পরপরি রাত্রি ও এসে এক পেশে জড়িয়ে ধরলো অরুনকে,, ইরা এসে অর্পনার কাধের উপর মাথা রেখে তিনজনকে জড়িয়ে ধরলো,, এই বিদায় বেলায় সবার মিলনে পল্লব এসে পূর্ণ করলো,, অরুনের কাধে মাথা রেখে চার জনকে নিয়ে নিলো লম্বা হাতের ভাজে। এবার শব্দ করো ফুপিয়ে উঠলো ইরা,, বহু কষ্টে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে সে,, আর কতো আটকানো যায়? জড়িয়ে ধরার মাঝেই হঠাৎ পল্লবের চোখ গেলো রাত্রির কান্না মাখা মুখের দিকে পরপরি নজর সরিয়ে নিলো সে। সবার এই উষ্ণ আলিঙ্গনে অর্পনার চোখ গড়িয়ে দু ফোটা গরম জল বের হলো। আল্লাহ তাকে কিছু দিক আর না দিক চারটা মানুষ দিয়েছে যারা সর্বক্ষণ তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করে। অনেকটা সময় পেরুলো এভাবেই , তাদের এই মিলনমেলা ভঙ্গ হলো আদ্রিয়ানের ডাকে। আদ্রিয়ান তাড়া দিতেই পাচ জন আলাদা হয়ো গেলো। পল্লব অর্পনার দু বাহু শক্ত করে ধরে বললো — বি স্ট্রং!! শক্ত হতে হতে হার্টলেস হয়ে যা যেনো তকে কেউ আঘাত করতে না পারে। মনের সুক্ষ অনুভুতি গুলোকে এমন ভাবে মাটি চাপা দিয়ে দে যেনো কেউ তর চোখ কেনো মস্তিষ্ক হিবনোটাইজ্ট করেও সেটা ধরতে না পারে।
,, পল্লবের কন্ঠ আর চোখে কিছু একটা ছিলো,, অর্পনার কেমন সন্দেহ হলো। পল্লবের দ্বারা এতো কঠিন কথা কিভাবে সম্ভব? তাহলে কি পল্লব ও মনের মাঝে কোনো সুক্ষ অনুভুতিকে মাটি চাপা দিয়ে রেখেছে? যা তার এই মজার ছল আর শক্ত আবরনের জন্য তারা কেউ টের পায়নি? অর্পনাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে পল্লব ভ্রু নাচালো। অর্পনা চোখ মুছে শান্ত কন্ঠে বললো — দুদিন যাবত অবাকের সাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছিস মামা, তকে চিনতেই পারিনা।
,,, পল্লব অর্পনার কপালে তিন আঙ্গুলের সাহায্যে টোকা মেরে বললো — ধূর!! যাতো, তর লেইট হয়ে যাচ্ছে।
,,, ইরা এগিয়ে এসে অর্পনার বাহু ধরে কান্না বেজা কন্ঠে বললো — খুব ভালো থাকবি,, একদম অগোছালো হবিনা। রাগ হলে হাত কাটা কাটি বন্ধ। গোসল করে ঠিক ঠাক চুল শুকাবি,, নিয়মিত খাবার খাবি,, খুব মন খারাপ হলে গ্রুপে কল দিবি। কান্না পেলে একটু কাদবি, এভাবে পাথর হয়ে বাচবিনা। ঠিক আছে?
,,, অর্পনা জল জল চোখে মাথা নাড়ালো,, আদ্রিয়ান আবারও তাড়া দিলে সবাই নিচের দিকে হাটা দিলো। সামনের গাড়িতে অর্পনা আর আদ্রিয়ান যাবে পিছনের গাড়িতে আরশাদ জামানের ডিপার্টমেন্টের কিছু অফিসার। অর্পনা লাস্ট বারের মতো সবাইকে একবার করে জড়িয়ে ধরলো,, সবশেষে আরশাদ জামানের কাছে পৌছালে তিনি মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন — আমার মা!! আমায় ভুল বুঝো না। আমি দ্বীপকে সুযোগ দিয়েছিলাম,, সেদিন বৃষ্টির রাতে আমি চাইলেই তোমায় বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারতাম তবে আমি চেয়েছিলাম দ্বীপ তোমার কাছে আসুক। সে আসেনি,, তোমায় ফিরিয়ে ও নেয়নি। এমন একজন মানুষের কাছে কখনোই আমি তোমায় ছাড়তে পারবো না প্রিন্সেস। এই পৃথিবীতে আর কেউ তোমায় দাম দিক আর না দিক তুমি তোমার পাপ্পার রাজকন্যা। আজ চলে যাও আমি আগামী এক মাসের মধ্যে জব ছেড়ে তোমার কাছে চলে যাবো তারপর আবারো আমরা বাবা মেয়েতে মিলে একসাথে বাচবো। আবারও একটা ড্রিমি ওয়াল্ড বানাবো সেখানে রাজা হবে তোমার পাপ্পা আর তুমি হবে তার প্রিন্সেস,, আমাদের লাইফে আর কেউ আসবেনা। ওকে মাম্মা?
,,,আজ বোধয় অর্পনার অবাক হওয়ার দিন,, সে একের পর এক অবাক হচ্ছে,, তারমানে সেদিন পাপ্পাই ওকে বৃষ্টির রাতে বাচিয়েছিলো? তারপর অপরিচিত সেজে হসপিটালে ভর্তি করিয়ে নিজের নম্বর নিজেই দিয়ে এসেছিলো যেনো অর্পনা ধরতে না পারে ওটা তার পাপ্পা। এজন্যই সেদিন স্পর্শটা চেনা লেগেছিলো,, পাপ্পার গায়ের ঘ্রাণ পেতেই নিশ্চিন্তে অজ্ঞান হতে পেরেছিলো সে? অর্পনা আরও অনেকটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার পাপ্পাকে,, তাদের মাঝে যতোই ঝামেলা হোক পাপ্পা কখনোই অর্পনার থেকে দূরে সরে যায়নি। আড়ালে থেকে সর্বোক্ষন আগলে আগলে রেখেছে,, জীবনে এমন একটা মানুষ থাকতে কিসের শুন্যাতা? অর্পনা তার পাপ্পার সাথে বাচবে,, সারাটা জীবন।
,,, অর্পনা গাড়িতে উঠতে উঠতে একবার পিছু ফিরে সবাইকে দেখে নিলো, আরশাদ জামান দাড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি চোখ মুছুতে মুছতে ভিতরে চলে গেলেন। আদ্রিয়ান তাড়া দিতেই অর্পনা গাড়িতে উঠে ডোর লক করে দিলো,, দেরি করলো না আদ্রিয়ান। সে সাথে সাথে গাড়ি স্টার্ট দিলো। অর্পনা আর পিছু ফিরে তাকালোনা, তাকালেই তার কদম আর হৃদয় দুটোই থমকে যাবে। সে ভাবতেও পারেনি কোনো একদিন এদের থেকে তাকে দূরে সরে যেতে হবে।
,,, অর্পনারা চলে যেতেই ইরা সবার উদ্দেশ্যে বললো — আমার একটু কাজ আছে, আমি আসছি।
,,পল্লব বললো— কি কাজ? চল আমরাও যাচ্ছি।
,, ইরা মানা করে বললো — নানা!! এই কাজটা আমার একান্ত দোস্ত ,, শেষ করে তদের জানাবো। আমি আসি ওকে?
,,, বলতে বলতে ইরা সামনের দিকে হাটা দিলো,, ইরাকে যেতে দেখে রাত্রি পল্লবের উদ্দেশ্যে বললো– পল্লব!! আমায় একটা রিকশা করে দে,, সন্ধা হয়ে গেলে মাম্মা বকাঝকা করবে।
,,, পল্লব অরুনের দিকে তাকালে অরুন বললো — রিকশা ডাকতে হবেনা আমার সাথে বাইকে চল। তকে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে আমার বাড়ি যাবো।
,, রাত্রি নাকোচ করে বললো — আমার বাইকে যেতে ইচ্ছা করছেনা,,,পল্লব একটা রিকশা এনে দিবি নাকি একা চলে যাবো?
,,, পল্লব হতাশ হলো, এখন সে কি করবে ভেবে পায়না তাই বললো — অরুনের সাথে যা, তরা তরাই তো। প্রেম করতে করতে চলে যাবি।
,,, পল্লবের কথাটা মনমাফিক হলো না রাত্রির, সে হালকা রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বললো — আমরা প্রেমিক প্রেমিকা নই পল্লব । আমরা জাস্ট বেস্ট ফ্রেন্ড, এর মধ্যে এসব টানবি না।
,,,রাত্রির কথায় দুজনেই অবাক হলো,, এই মেয়ে বলে কি? এতোকিছুর পর তারা শুধুই বেস্ট ফ্রেন্ড? অরুণ তেড়ে এসে রাত্রির বাহু ধরে শাসিয়ে বললো — নতুন করে কাহিনি শুরু করেছিস? মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো।
,,,রাত্রি ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো — বার বার এরকম ছুতে আসবিনা, ঘৃনা লাগে দূরে থাক।
,,, রাত্রির কথায় অরুন কি রিয়্যাকশন দিবে বুঝে পাচ্ছেনা। কিছুটা অবাক কন্ঠে বললো — আমার ছোয়ায় তর ঘৃণা লাগে?
,,,, রাত্রি মাথা ঝাকিয়ে বললো — খুব,, এরকম হুটহাট কাছে আসবিনা,, বিষয়টা আমার একদম পছন্দ না। বাই দ্যা ওয়ে, পল্লব রিকশা ডাকা লাগবেনা, আমি আসছি।
,,বলতে বলতে রাত্রি ও রাস্তার উল্টো পথে হাটা দিলো। অরুন এখোনো আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। গতকালও যেই মেয়েটা তার স্পর্শের টানে আবেশে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলো সে আজ বলছে তার স্পর্শ ঘৃনা লাগে? বিষয়টা মানতে পারছে না সে।
,,, অর্পনা উদাস ভঙ্গিতে রাস্তার ধারে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। গাছগুলো কেমন দোড়ে দৌড়ে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে আর অর্পনা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই তো আপন মানুষ গুলো পিছিয়ে গেলো অর্পনার জীবন থেকে আর অর্পনা সবাইকে ফেলে চলে যাচ্ছে ভবিষ্যতের খোজে। আদেও সেখানে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে,, কেমন হতে যাচ্ছে তার জীবন, জানা নেই। এক ভাবে তাকিয়ে থাকার মাঝেই চোখ থেকে পানি গড়ালো অর্পনার,, মুছার চেষ্টা করল না,, মুছলে কি হবে? সেই তো ঝড়বেই। কাধে কোনোকিছুর স্পর্শ পেয়ে ফিরে তাকালো অর্পনা, আদ্রিয়ান তার দিকে টিস্যু এগিয়ে রেখেছে,, অর্পনা সেটা নিতে অস্বীকার জানালে আদ্রিয়ান মলিন হেসে বললো — দ্বীপকে কতোটা ভালোবাসো জানেম? আমাকে যতটা বাসতে ততোটা নাকি তার থেকেও বেশি? নাকি কয়েকগুণ বেশি?
,,,অর্পনা ভনিতা না করে সরল ভাবে বললো — কতোটা বাসি জানিনা তবে উনার সাথে লড়াই করার ক্ষমতা আমার নেই। আপনাকে ছেড়ে দেওয়ার পর আপনি দুই বছর আমার সাথে থাকার পরেও আপনাকে ক্ষমা করতে পারিনি,, ভেঙে যাইনি অথচ উনি সামনে এলেই আমি ভেঙে পরি। হাজারটা চিন্তা আসে মাথায়,, উনার অসুস্থতা,, জেদ, অসহায়তা, কাতর চোখ, মায়াবী ডাক গুলো ভিতরটা চৌচির করে দেয়। আপনার সাথে একই বাড়ি একই ভার্সিটিতে থেকে লড়াই করতে পারলেও উনার সাথে এক শহরে থেকে লড়াই করা ক্ষমতা আমার নেই। তাই দেশ ছাড়ছি,, সাথে নিজের দূর্বলতা।
,,,আদ্রিয়ানের চোখে জল জমলো সে অর্পনার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে অর্পনা চোখ সরিয়ে নিলো। সংসার করুক আর না করুক সে এখন বিবাহিত,, অন্য পুরুষের চোখে তাকানো মানে হাসবেন্ডের হক নষ্ট করা। আদ্রিয়ান দ্রুত নজর সরিয়ে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিলো। ড্রাইভ করতে করতে আদ্রিয়ান হঠাৎই খেয়াল করলো তাদের পিছনে অনেক গুলো গাড়ি সমান তালে ছুটে চলেছে। অন্যপথে যাবে ভেবে বিষয়টাতে প্রথমে পাত্তা দিলোনা, তবে অনেকটা রাস্তা যাওয়ার পর যখন খেয়াল হলো তাদের সাথে আসা অফিসার গুলোর গাড়িটা মিসিং এবং পিছনে আসা গাড়ি গুলো তাদের পিছন পিছন ছুটছে তখনি গাড়ো সন্দেহ বসিভুত হলো। গাড়িগুলোর দিকে ঠিকঠাক নজর রাখতে গিয়ে ড্রাইভিং এ ভুল হয়ে যাচ্ছে,, বার বার গাড়ি এদিক থেকে উদিক যাচ্ছে তে উদিক থেকে এদিকে। আদ্রিয়ানকে এরকম অস্বাভাবিক ভাবে গাড়ি চালাতে দেখে ভ্রু কুচকালো অর্পনা,, গাড়ির ডেসবোর্ডে হালকা চাপর মেরে বললো — আদি কি হয়েছে? এভাবে ড্রাইভ করছেন কেনো? আর ইউ ওকে না? হেই!!
,,,, আদ্রিয়ান গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুড়াতে ঘুড়াতে বললো — আমি ঠিক আছি, বাট আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ফলো করছে। আঙ্কেলের পাঠানো গাড়িটাও পিছনে নেই।
,,, বিচলিত হলো অর্পনা, একবার মিররের দিকে তাকিয়ে পিছনের গাড়ি গুলো দেখে হালকা আতঙ্কিত কন্ঠে বললো — কি বলছেন? কে আমাদের ফলো করবে? ওকে!! এতো চিন্তা না করে স্পিড বাড়ান নয়তো অন্য রোড ধরুন।
,,, আদি নাকোচ করে বললো — নো!! একটা নয়, একাদিক গাড়ি মিলে ফলো করছে আমাদের। কোনটা থেকে পালাবো? বুঝতে পারছিনা তাদের উদ্দেশ্য কি?
,,,কি আবার হবে? নির্ঘাত কেউ পাপ্পাকে ভয় দেখাতে কিংবা ব্লাকমেইল করতে আমার পিছনে ছুটছে। সমস্যা নেই আপনি এগিয়ে যান,, যা হবার পরে দেখে নিবো।
,,,অর্পনার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলা কথাগুলোতে ভয় পেলো আদ্রিয়ান,, যদি লোক গুলো তার জানেমের ক্ষতি করে দেয়? যদিও সে বেচে থাকতে কেউ তার জানেমের ক্ষতি করতে পারবেনা কিন্তু সে তো একা। একা এতোগুলো লোককে প্রতিহত করতে পারবে তো? আদ্রিয়ানের ভাবনার মাঝেই মাথার উপর ঘড় ঘর শব্দ হতে লাগলো। মনে হচ্ছে খুব কাছেই কোনো এরোপ্লেন কিংবা হেলিকপ্টার উড়ছে। সেকেন্ডের গতিতে তীব্র বাতাসে ধুলোবালি একাকার হয়ে উঠলো। আপাতত এই রোডে আর কোনো যানবাহনের দেখা মিলছেনা,, শুধু ফলো করা গাড়ি গুলো আর হেলিকপ্টারের পাখা ঝাপটানোর শব্দ। তীব্র বাতাসে রাস্তার দুলোবালি উড়ে চারপাশ ধুলোময় অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে। এতো ধুলোবালির মাঝে গাড়ি সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে আদ্রিয়ান । সে হতচকিত হয়ে বললো — এবার গাড়ি থামাতেই হবে, নয়তো এক্সিডেন্ট হবে মাস্ট।
,,, মনে মনে আতঙ্কিত হলেও নিজেকে শক্ত করলো অর্পনা,, শায় জানিয়ে বললো– ওকেহ!! ওকে থামান। আমিও দেখতে চাই এরা কারা? যারা আমার পিছনে পরেছে।
,,, অর্পনা বললেও গাড়ি থাকালোনা আদ্রিয়ান, সে বহু প্রচেষ্টা করছে যেনো তার জানেমকে প্রটেক্ট করতে পারে কিন্তু শেষ অবধী পারলো না। হুট করেই একটা গু*লির শব্দ হলো আর সাথে গড় গড় শব্দ করে গাড়িটি থেমে গেলো। খুব সম্ভাবত বু*লেট টা গাড়ির টায়ারে লেগেছে। অর্পনা ক্ষিপ্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামতে চাইলে আদ্রিয়ান অর্পনার হাত ধরে কাছে টানতে চাইলো,, কিন্তু বাধা মানলো না অর্পনা। সে কঠোরতার সাথে গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো,, আদ্রিয়ান ও তরিহরি করে ওপাশের দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো। সেকেন্ডের গতিতে পাখা ঝাপটে রোডের মাঝখানে একটি হেলিকপ্টার লেন্ড করলো,, অর্পনা এখনো তিক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সামনের সিটে বসে আছে একজন পাইলট আর তার পাশের সিটে বিহান। বিহানকে দেখেই অর্পনার তিক্ষ্ন চোখ আরও তিক্ষ্ন হলো। বিহান তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, হাসিটা বড্ড অচেনা,, বিহানের মতো সরল সাদাসিধা লোকের মুখে এমন হাসি আশা করেনি অর্পনা। অর্পনার অবাকতাকে আরও অবাক করতে দুজন কালো পোষাক ধারী লোক এসে পিছনের ডোর খুলে দিতেই পিচ ঢালা রাস্তায় লাফিয়ে নামলো এক শক্ত পোক্ত পুরুষ। তার পরনে কালো শার্ট যা কনুই পর্যন্ত গুটানো, কালো পেন্ট যা শার্টের সাথে ইন করে পরা,, হাতে সিলভার কালার ওয়াচ, শার্টের তিনটে বাটন খোলা যার ফলে হেলিকপ্টারের বাতাসে তার প্রসস্থ বুকের ভাজ দৃশ্যমান,, লোকটার হাতের মুষ্টিতে কালো রঙের কিছু একটা আছে যা তিনি শক্ত করে ধরে রেখেছেন যেনো তার কপালের মধ্যভাগে উঠা রাগ টুকু এই বস্তুটার উপর মিটাচ্ছেন। অর্পনা খেয়াল করলো দ্বীপের দৃষ্টি তার হাতের দিকে যা এই মুহুর্তে আদ্রিয়ানের হাতে বন্ধি। অর্পনা টললো না, জেদ দেখিয়ে আদ্রিয়ানের হাত ধরে রাখলো, এতে যেনো দ্বীপের রাগ আরও বাড়লো,, সে হাতে থাকা ছোটো রিভলবার টা সুনিপুণ ভাবে দুজনার মাঝখানে তাক করলো আর সাথে সাথে বু*লেটের তিব্র শব্দে দুজন দুদিকে সরে গেলো। বুলেটের তোপে গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে চুড়মুর হয়ে নিচে পরলো। অর্পনা একবার গাড়ির কাচের দিকে তাকিয়ে পরপর ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকালো। দ্বীপ ঠোঁট বাকিয়ে হেসে এক হাতে ঘাড় ডললো তারপর ভারি ভারি কদম ফেলে অর্পনার সামনে এসে দাড়ালো। সেকেন্ডের গতিতে দ্বীপের কলার চেপে ধরলো আদ্রিয়ান শাসিয়ে বললো
— এখানে কি? অর্পনার কাছে কি চাই? মুক্তি দিয়েছে না তকে? আবার ওর কাছে এসেছিস কেনো?
,,, দ্বীপ পাত্তা দিলো না, সে ঘাড় বাকিয়ে আদ্রিয়ানের মাথার ফাক দিয়ে অর্পনার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো — বউ!! আমার সমন্ধিকে বলোনি তুমি আমার বউ হও? বউয়ের কাছে আসতে কারোর পারমিশন লাগে? লাগলেও আমার লাগেনা। দ্বীপ মির্জা কারোর পারমিশনের পরোয়া করেনা। ( দাতে দাত পিষে)
,,,, আদ্রিয়ান দাতে দাত চেপে দ্বীপের ঘাড় বরাবর নিজের ঘাড় বাকিয়ে বললো — তর বউ তকে চায়না, এবার তুই কি পরোয়া করলি আর না করলি তাতে আমাদের কিছু এসে যায়না।
,,,দ্বীপের ঠোঁটে তখনো বাকা হাসি, সে হাত উচিয়ে আদ্রিয়ানের কাধে ময়লা ঝাড়ার মতো করে অন্য হাতে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে আদ্রিয়ানের মুখে চেপে ধরলো। কলার চেপে ধরে থাকার কারনে আদি সেটা প্রতিহত করতে পারেনি,, সাথে সাথে দ্বীপের বুকে ঢলে পরলো আদ্রিয়ান । দ্বীপ একজন গার্ডকে ইশারা করে বললো — নিয়ে যাও,, যেই বয়সে বউ বুকে নিয়ে ঘুমানোর কথা সেই বয়সে সমন্ধি বুকের উপর ঢলে পরে। মানবিকতা আজ কোথায়?
,,, ইশারা অনুযায়ী তিনজন গার্ড এসে আদ্রিয়ানকে সযত্নে আগলে নিলো। রাগে ফুসছে অর্পনা, গাড়ির ভাঙা কাচ থেকে একটা মাঝারি সাইজের কাচ নিয়ে তেড়ে গিয়ে দ্বীপের গলায় কাচ চেপে ধরে বললো —
,,, কাছে আসলে একদম খুন করে ফেলবো।
,, অথচ অর্পনা হুমকিটা দ্বীপের কাছে এসেই দিয়েছে,, হাইট ডিফারেন্ট বেশি হওয়ায় গলায় কাচ ধরলেও বেশ একটা সুবিধা করতে পারছেনা অর্পনা। দ্বীপ জ্বীব দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে অর্পনার কোমর চেপে ধরে মাটি থেকে এক হাত উচুতে তুলে নিয়ে বললো — মার ডালো,, তোমার হাতে মরবো বলেই তো এলাম। মেরে দাও বউ, একেবারে মেরে দাও।
