Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৪ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৪ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৪ (২)
রুপান্জলি

কিছুক্ষন আগেই অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে।অনুষ্ঠান শেষ হতেই সব নেতারা বিশ্রাম নিতে অফিস কক্ষে চলে গিয়েছেন। স্টেজের কিছু ঝামেলা মিটমাট করে স্টেজ থেকে নেমে এলো অর্পনা। প্রথমে ভেবেছিলো টিসির জন্য ভিসির কক্ষে যাবে কিন্তু সে আপাতত দ্বীপের মুখোমুখি হতে চায়না তাই আদ্রিয়ানকে বলেছে যেনো সে অর্পনার অভিভাবক হয়ে টিসি প্যাপারটা নিয়ে আসে। অর্পনাকে নামতে দেখে এগিয়ে এলো চার যুবক যুবতি,, সবার নজরে আটকে অর্পনার মুখ খানি। মেয়েটাকে দেখে একটু বেশি ই স্বাভাবিক লাগছে,, ওর এতোটাও স্বাভাবিক থাকা মানায়না। এরকম একটা ঘটনার পর কোনো সাধারন মানুষ ঠিক থাকতে পারেনা,,থাকা সম্ভব না। ওর এই স্বাভাবিক আচরন মানতে পারছেনা বন্ধু মহল,, অরুন এখনো রাগে জ্বলছে। ইরা এগিয়ে এসে অর্পনার হাত ধরতেই অর্পনা মুচকি হেসে বললো —

প্যারা নিসনা মামা, আ’ম ওকে। তরা থাক, আমি খুব টায়ার্ড বাড়ি যেতে চাই।
,,, স্টেজের বিষয়ে আপাতত কেউ আর কিছুই বললো না।এই মুহুর্তে অর্পনাকে কিছু বলা আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া একই কথা,, যা বন্ধু হয়ে তারা কখনোই করতে পারবেনা তবে মন ভালো করার জন্য কিছু তো একটা করাই যায়। রাত্রি এগিয়ে গিয়ে অর্পনার হাত ধরে বললো — দোস্ত!! জানিস? অরুন টা আমাকে প্রপোজ করেছে,, আমি এখনো হ্যা না কিছুই বলিনি। কি করবো বলতো? এই ছেলেটাকে কি কোনোভাবে বিয়ে টিয়ে করা যায়? মানাবে আমার সাথে? নাকি রিজেক্ট করে দিবো?
,,,অর্পনা জানে তার ফ্রেন্ডরা ভাবছে তার মন খারাপ তাই মন ভালো করতে এতো কথা বলছে। তাই সে রাত্রির উদ্দেশ্যে হালকা মজা করে বললো– বিয়ে করার কি দরকার? লিওনেল মেসির মতো দুই, চারটা বাচ্চা হোক তারপর নাহয় ভেবে দেখিস বিয়ে করবি কিনা?

,,, অর্পনার কথায় কেউ হাসলো না, তবুও নিজে নিজেই হাসলো মেয়েটা। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর বহু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অর্পনা কিন্তু সব ধরা পরে যাচ্ছে। অতিরিক্ত অভিনয় বলে একটা ব্যাপার থাকেনা? অর্পনার বেলায় ও তাই হচ্ছে। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করতে করতে আচরন গুলো অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছপ। এদিকে অর্পনার বলা কথাটুকুতে হঠাৎই রাত্রির মুখটা কালো হয়ে গেলো, ঘন অন্ধকার নামলো মন জুড়ে। বুকের ভিতরটা কেমন ধ্বক করে উঠলো,, তার দ্বারা আদেও কি সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব? যদি সেই ঝড়টা এসে সব উলট পালট করে দেয়? অরুন যদি সেসব মেনে না নেয়? তাহলে? তখন কি হবে? রাত্রি তো অরুনকে পাগলের মতো ভালোবাসে,, এই ভালোবাসা থেকে দূরে সরা এতোটাও সহজ হবেনা আবার আকরে ধরাও কঠিন। রাত্রির নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে,, নিজের অস্তিত্ব জানা সত্ত্বেও কিভাবে সে এরকম একটা ভুল করে ফেললো? তার পক্ষে ভালোবাসা শব্দটা নাজায়েজের কাতারে পরে,, সম্পর্কে জড়ানো তো একদমি অনুচিত। রাত্রির ভাবনার মাঝে অর্পনা সবার উদ্দেশ্যে বললো — আমি খুব টায়ার্ড, বাড়ি যাই কেমন? তরা থাক! ”

,,,, অরুন নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে বললো — আদি স্যারের ফ্লাটে যাবি তো? চল আমরা পৌঁছে দিচ্ছি।
,,,অর্পনা মলিন হেসে বললো — আমি একাই যেতে পারবো। বাই দ্যা ওয়ে, তদের একটা কথা বলার ছিলো, সকালেই বলতাম, বলা হয়নি। আগামিকাল সন্ধা ৬ টায় আমার ফ্লাইট। দোয়া রাখিস যেনো ভালো থাকি।
,,,আগামিকাল সন্ধা ছয়টায় ফ্লাইট কথাটা কর্নকূহর হতেই চারজন চমকে তাকালো,, ইরা অর্পনার বাহু ধরে অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — কিসের ফ্লাইট? কোথায় যাবি তুই? কি বোকা বোকা কথা বলছিস অর্পন?
,,, অর্পনা মুচকি হেসে বললো– বোকা কথার কি হলো? আমি আগামীকাল অস্ট্রেলিয়া চলে যাবো,, এটুকু হওয়ারি ছিলো। এই শহরে আমার দায়িত্ব ফুরিয়েছে,, সাথে মুল্য ও ফুরিয়েছে। মুল্য হীন শহরে অর্পনারা থাকেনা,, তাদের আত্মসম্মান তাদেরকে থাকতে দেয়না। এখানে থাকলেই তার মুখোমুখি হতে হবে। তখন সেও অপ্রস্তুত হবে আর আমিও অপ্রস্তুত হবো। তাই চাইনা আমার জন্য কারোর প্রবলেম হোক।

,,, কথাটা বলার সাথে সাথেই অর্পনার গালে চর পরলো,, চরটা এতোটাও জোরে ছিলোনা তবে ওপাশের ব্যাক্তি যে খুব কষ্ট করে নিজেকে কন্ট্রোল করেছে সেটা বুঝতে পেরেছে অর্পনা। অর্পনা চোখ তুলে তাকালো,, সে ভেবেছিলো চরটা অরুন মেরেছে কিন্তু চোখের সামনে পল্লবকে দেখে বেশ অবাক হলো। পল্লব খুবি ঝামেলা মুক্ত চরিত্রের অধিকারি, সে খুব সহজে রাগেনা। মন চাইলে একটু হাসি ঠাট্টা করে, আর বাকি সময় অরুন রাত্রির পিছনে লাগে। এটুকুই, এর বাহিরে পল্লবকে কোনোদিন রাগতে কিংবা রিয়্যাক্ট করতে দেখা যায়নি। অর্পনাকে অবাক চোখে তাকাতে দেখে পল্লব ফুসে উঠে বললো — এখোনো তার তার করে যাচ্ছিস কেনো? ঐ দ্বীপ মির্জা এসবের যোগ্য? এই মেয়ে, তুই একবার নিজেকে আয়নায় দেখেছিস? আমি নিজেই তো তকে চিনতে পারিনা। আগের অর্পনা আর বর্তমান অর্পনার মাঝে বিস্তর ফারাক। এতোটা দূর্বল তো তুই ছিলিনা? একটা কাপুরুষের জন্য তুই শহর, দেশ, আমাদের ছেড়ে দূরে চলে যাবি? ঐ দ্বীপ মির্জাই তর কাছে ইম্পর্ট্যান্ট? আর আমরা? আমরা কেউ না অর্পন? আমরা তকে ছাড়া কিভাবে থাকবো সেটা একবার ভেবেছিস?

,,, অর্পনা কিছুটা উদাস ভঙ্গিতে বললো — আই নিড স্পেস পল্লব, আমি একটু নিজেকে স্থির করতে চাই। ইউ নো না? অর্পনা খুব স্ট্রং,, আমি নিজেকে শক্ত করতে যাচ্ছি,, এসব জুট ঝামেলা ভালো লাগছে না,, নিজেকে রিফ্রেশ করা প্রয়োজন। আর কে বললো? আমি তদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি? তদের সাথে আমি সবসময় যোগাযোগ রাখবো তো। হয়তো ফিরেও আসবো কোনো একদিন,, যেদিন তদের সবার একটা একটা সংসার হবে,, তদের বাচ্চা কাচ্চারা আমাকে ফুপিম্মু , খাম্মি বলে ডাকবে সেদিন ফিরবো। তারপর আবার সবাই মিলে আড্ডা দিবো, চা খাবো, টিসি চত্বর থেকে শুরু করে পুরো ইউনিভার্সিটির কোনায় কোনায় ঘুরে বেড়াবো,,হয়তো সবাই তখন বুড়ো বুড়ি হয়ে যাবো তবে ভালোবাসাটুকু তো একি থাকবে তাইনা?
,,,ফুপিয়ে উঠলো রাত্রি, অর্পনাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো — তুই রুল্স ব্রেক করছিস অর্পন,, তুই একটা ফেইক। তুই বলেছিলি যতো খারাপ পরিস্থিতি ই আসুক না কেনো, আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাবোনা,, কখনোই না। তাহলে আজ তুই রুল্স ব্রেক করছিস কেনো? এতোটা সার্থপর হোসনারে,, তর যেমন আমরা ছাড়া কেউ নেই, আমারও তো তরা ছাড়া কেউ নেই বোন।

,,, অর্পনা রাত্রিকে টেনে সামনে এনে চোখ মুছে দিয়ে বললো — ইমোশনাল গার্ল,, এতো ইমোশনাল হতে হবেনা, আপনার জন্য অরুন আছে তো? যে আপনাকে সব দিক থেকে আগলে রাখবে,, ভালোবাসবে। আর হে!! বাচ্চা হওয়ার আগেই বিয়েটা করে নিস,, তদের যা আচরন, বিয়ে করার আগেইনা ছেলে মেয়ের বাবা মা ডাক শুনে ফেলিস। রাত্রি আবারও ঝরঝর করে কেদে দিলো,, ইরার চোখ জোড়া চিকচিক করছে,, মেয়েটা খুব সহজে কাদেনা,, অতিরিক্ত কথাও বলেনা। খুব শান্ত মেজাজি,, অরুন রাগান্বিত দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আছে। আপাতত সে এই মেয়ের সাথে কোনো কথাই বলতে চায়না। যে বুঝ নিতে চায়না তাকে বুঝানো টা মুল্যহীন। অর্পনা চোখ তুলে অরুনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো —

,,,রাত্রিকে ভালো রাখিস, ও কিন্তু খুব ইমোশনাল। একদম কাদাবি না,, আগলে আগলে রাখবি। ইরাদকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিবি। আঙ্কেল আন্টি হয়তো তাদের মন মতো একটা ছেলে খুজে বের করে দিলেই ইরাদ চোখ বন্ধ করে বিয়ে করে নিবে কিন্তু তরা সেসব মানবিনা। আগে ছেলের ডিটেল্স চেক করবি তারপর ইরাদকে বিয়েতে রাজি হতে বলবি। আর এইযে রিলেক্স বয় পল্লব!! এক্সের সংখ্যা আর বাড়াস না, যাকে পারমানেন্ট মনে হবে তার সাথেই সম্পর্কে জড়াবি। আর আজকেই তো আমাদের শেষ দেখা নয়,, কাল সকাল সকাল আদি স্যারের ফ্লাটে চলে আসিস,, সারাদিন প্রচুর আড্ডা দিবো। কিন্তু তদেরকে এয়ারপোর্টে নিবোনা,, তরা গেলে,, আ, আমি,, তরা কেউ আমার পিছু পিছু আসিসনা, অনুরোধ!!

,, কথাটা বলে আর দাড়ালো না অর্পনা, চোখ বুঝে হাটা দিলো গেইটের দিকে। কষ্টে তার বুক ভেঙে আসছে,, এই চারটা মানুষ তার কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট। চোখ মেলে তাকালেই চোখ ছাপিয়ে জল গড়াবে, যেটা অর্পনা চায়না। আর কতো কাদবে সে? ছোট থেকে জীবনটা তো কাদতে কাদতেই পার করলো,, মাঝে হয়তো নিজেকে শক্ত খোলসে বন্ধি করতে পেরেছিলো কিন্তু এখন সে খোলসটাও ছিড়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসাটা বড্ড অন্যায় হয়েছে অর্পনার,, এটুকু না হলেও পারতো। গেইটের কাছে এসে বড়ো বড়ো দম নিলো অর্পনা,, নাকের ডগায় হালকা মাসাজ করতেই চোখে জমা পানিটুকু মিলিয়ে গেলো। এগুলো অর্পনার তৈরি কিছু টেকনিক যেগুলো দ্বারা নিজের অনুভুতিকে অন্যের সামনে থেকে লুকানো যায়। আরও একটা বড়ো সরো দম নিয়ে গেইট পেরিয়ে রাস্তায় পা দিতেই সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত যুবক কে দেখতে পেলো,, সে এক দৃষ্টিতে অর্পনার দিকেই তাকিয়ে আছে। আশেপাশে আর কাউকে দেখা যাচ্ছেনা, বিষয়টাতে বড্ড অবাক হলো অর্পনা। মিনিট পাঁচেক আগেও গেইটের বাহিরে অসংখ্য মানুষ, যানবাহন, রিকশা, রাজনৈতিক চেলা পেলাদের আনাগোনা ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে তারা এরকম উধাও হয়ে গেলো কি করে? অর্পনা এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা রিকশার খোজ করলো।

তার সাথে যেহেতু গাড়ি নেই অগত্যা তাকে রিকশায় করেই ফিরতে হবে, আর রিকশা নিতে গেলে দ্বীপকে ক্রস করে মানে দ্বীপের সামনে দিয়ে যেতে হবে। অর্পনা নিজেকে কঠিন করে নিচের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হাটা দিলো। হাটতে হাটতে যখন দ্বীপকে ক্রস করতে নিবে তখনি কোমরে হেচকা টান লাগলো আর সেকেন্ডের গতিতে পিঠে কোমরে আঘাত পেয়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা। চোখ মেলে তাকাতেই মুখের উপরে ঝুকে থাকা দ্বীপকে দেখতে পেলো,, অর্পনার হাইট কম হওয়ায় অনেকটা ঝুকতে হয়েছে দ্বীপকে, তবে অর্পনা সেসবে পাত্তা দিলোনা। সে পিঠ আর কোমরের ব্যাথাকে উপেক্ষা করে দ্বীপের সামনে থেকে সরে যেতে চাইলে দ্বীপ গাড়িতে এক হাত রেখে বাধা প্রয়োগ করলো,, পরপর অর্পনা অন্যদিক দিয়ে যেতে চাইলে দ্বীপ ঐপাশেও হাত রেখে দুহাতের মাঝে অর্পনাকে বন্দি করে দিলো। বিষয়টাতে বড্ড বিরক্ত হলো অর্পনা, চোখ তুলে দ্বীপের চোখে চোখ রেখে শাসিয়ে বললো — হোয়াটস প্রবলেম? নাটক চলছে এখানে? নিজেকে নায়েক আর আমাকে নাইকা ভাবছেন? যে এভাবে ধরবেন আর আমি ভয়ে মিন মিন করতে করতে বলবো– ক,ক,কি করছেন দ্বীপ!! ল,লোকে দেখলে কি ভাববে? এরকম মেয়ে মনে করেন আমাকে? অতো লো- ক্লাসের এক্টিং আমি করতে পারিনা। সামনে থেকে সরুন,, সেইম ল্যাস কাপুরুষ একটা।

,,, দ্বীপ অর্পনার ঠোটের ভাজে আঙুল চেপে হিসহিসিয়ে বললো– হুস!! চুপ, একদম মুখ বন্ধ। অনেক্ষন যাবত তোমার উড়োউড়ি দেখে যাচ্ছি। আমার সাথে ত্যাজ দেখাও? নিজে দোষ করবে আর আমার সাথে তাপ নিবে,, রাইট? কখন থেকে তোমার পিছন পিছন ঘুড়ছি? পাত্তাই দিচ্ছোনা,, এই এতো বড়ো একটা দ্বীপ মির্জাকে তোমার নজরেই আটকাচ্ছেনা। আমি যে এখানে দাড়িয়ে ছিলাম দেখতে পাওনি? দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলে কেনো? তোমার কি মনে হয়? আমি এখানে এমনি এমনি দাড়িয়ে আছি? এমনি এমনি একটা পাবলিক প্লেইসকে প্রাইভেট প্লেইস বানিয়েছি? শুনো মেয়ে, প্রাইভেট জায়গায় শুধু প্রাইভেট মানুষের সাথে প্রাইভেট আলোচনা করা হয়। যেটা আমি বর্তমানে করতে চাচ্ছি তাও তোমার সাথে,, কারন তুমি আমার অত্যন্ত প্রাইভেট।
,,,অর্পনা ঠোট থেকে দ্বীপের হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বললো — নো! ” আ’ম ইউর মেইড। একজন মেইডের সাথে প্রাইভেট আলোচনা মানে ন**ষ্টামি করা। এসব আপনি করতে রাজি হলেও আমি করবোনা,, কারন আপনাকে আমার রুচিতে ধরেনা। সরুনতো!!

,,৷ বলেই দ্বীপের বুকে ধাক্কা দিলো অর্পনা তবে দ্বীপকে সরাতে পারলো না। অর্পনার কথায় রাগ বাড়লো দ্বীপের। এক হাতে অর্পনার কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে দুহাত শক্ত করে ধরে, দাতে দাত চেপে বললো — স্টপ!! আমার সাথে গলা উচু করবেনা। এসব পছন্দ না আমার। বাই দ্যা ওয়ে,, কার পারমিশন নিয়ে উপস্থাপনা করতে গিয়েছিলে? এইযে এতোগুলা ছেলের সামনে নিজের রুপ দেখালে,, এই সুন্দর কন্ঠটা সবার সামনে তুলে ধরলে, এসব করার পারমিশন কে দিলো তোমায়? সকাল সকাল হাসবেন্ডকে বিছানায় ফেলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছো,, এটা কেমন ওয়াইফের কাজ? আমাকে হাসবেন্ড মনে করো তুমি? দাম দেও আমায়? চার আনার মুল্য ও তো দেওয়া। ইউ নো? হাসবেন্ড ওয়াইফের মাঝে যতোটা আন্ডাস্টেন্ডিং থাকে তারচেয়েও বেশি হাসবেন্ডের প্রতি ওয়াইফের অনুগত্য থাকতে হয়। কোথায় তোমার অনুগত্যতা? তুমি কোন মুখে স্ত্রীর পরিচয় চাও? যেই মুখে স্বামীর জন্য সামান্য পরিমাণ সম্মান টুকু ও নেই। আমি যে তোমায় বললাম স্টেজ থেকে নেমে আসতে,, নামলে না কেনো? আমি চাই আমার স্ত্রী আদুরে থাকবে,, আমার রাজ্যে রাজ রানি হয়ে থাকবে, কোনো বিপদ তাকে ছুতে পারবেনা। সবার কুচিন্তা, কু-চাহনি থেকে দূরে থাকবে,, অথচ আমার চাওয়ানুরুপ কিছুই হচ্ছে না। তুমি বরাবরই অত্যন্ত ঘাড় ত্যারা এবং অবাধ্য। তুমি কি বুঝতে পারছো আমি তোমার প্রতি কতোটা অসন্তুষ্ট?

,,, দ্বীপের কথার প্রেক্ষিতে অর্পনা ঝাজালো স্বরে বললো — সকাল সকাল হাসবেন্ডকে বিছানায় ফেলে আসাটা অন্যায় অথচ বর্তমান ওয়াইফের বুক থেকে মাথা তুলে, বর্তমান ওয়াইফের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথম ওয়াইফের নাম উচ্চারণ করাটা অন্যায় নয়। ওয়াইফ বেড়িয়ে যাচ্ছে দেখেও তাকে না আটকানোটা অন্যায় নয়? ভালো না বেসে জাস্ট কবুলের খাতিরে একটা মেয়ের উপর অধীকার খাটানোটা অন্যায় নয়? প্রতিটি কথার বিপরীতে আমি তোমায় ভালোবাসিনা এই কথাটা বলাটা অন্যায় নয়? পুরো ভার্সিটির সর্বসমক্ষে নিজের ওয়াইফকে কাজের মেয়ে বলাটা খুব গর্বের? গর্ব হচ্ছে আপনার? ইউ নো, মিস্টার মির্জা!! তিনটে, শুধু তিনটে কবুল বললেই স্বামী হওয়া যায় কিন্তু প্রকৃত স্বামী হতে গেলে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। আপনি শুধু উন্মাদ প্রেমিক হতে পেরেছেন,,কিন্তু স্বামী হওয়া শিখেননি। স্বামীর দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারেননি। বাই দ্যা ওয়ে!! আপনার মাঝে স্বামীত্ব দেখার কাঙাল আমি নই। আপনি তখন বললেন না? আমি আট মাস আপনার বাড়ির কাজের মেয়ে ছিলাম? তার বিনিময়ে তো কিছুই দিলেন না। এবার দিন,, আমি চাচ্ছি, আমায় মুক্তি দিন,, আমায় তালাক দিন!! আমি আমার ফেরারি জীবনে বিন্দাস ছিলা,,

,,, কথা শেষ করার আগেই গাড়ির সাথে অর্পনার মুখ চেপে ধরলো দ্বীপ,, রাগে তার চোয়াল থরথর করে কাপছে। তার সব সহ্য হয় শুধু তালাক শব্দটা সহ্য হয়না। এতো ব্যাথায় ও এক টুকরো শব্দ করলো না অর্পনা । এই বাহ্যিক ব্যাথাটার চেয়েও হাজার গুন ব্যাথা বুকের বাম পাশে হচ্ছে। সেই ব্যাথা গুলো তো আত্মচিৎকার হয়ে বেরুতে পারছেনা তাহলে এইটুকু ব্যাথায় কি চিৎকার করবে সে? অর্পনাকে শক্ত হয়ে ব্যাথা সহ্য করতে দেখে দ্বীপের রাগ বাড়লো, সে হাত সরিয়ে গাড়ির দরজায় সজোরে ঘুষি বসালো। এই মেয়েটা যদি তাকে একটু বুঝতো তাহলে কি খুব ক্ষতি হতো? তখন রাগ করেছে বুঝতে পেরে কতোবার কথা বলতে চাইলো কিন্তু মেয়েটা ফিরেও তাকালো না। এখন সবাইকে নিজ উদ্দমে দূরে সরিয়ে একটা পাবলিক প্লেসকে প্রাইভেট প্লেস বানিয়েছে,, তারপরেও শান্তিতে একটুখানি কথা বলার যো নেই। দ্বীপের ভাবনার মাঝেই পিছন থেকে ধাক্কা দিলো কেউ,, অর্পনার সামনে নরম হয়ে দাড়িয়ে থাকায় শক্ত পোক্ত ধাক্কাটা সামলাতে হিমসিম খেয়ে অনেকটা দূরে সরে গেলো দ্বীপ। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঠাস করে চরের শব্দ হলো। দ্বীপ চরের উৎস ধরে তাকাতেই অর্পনার গালে আরও একটা চর পরলো। পরপর আরেকটা চর দিতে নিতেই ধমকে উঠলো দ্বীপ —

,,, ডন্ট!! ডন্ট ডেয়ার টু টাচ হার এগেইন। আরেকটা চর যদি ওর গালে পরে তাহলে আমি ভুলে যাবো আপনি বয়সে আমার মুরব্বি। লিভ হার, জাস্ট লিভ!!
,,, দ্বীপের কথায় ফুসে উঠলেন আরশাদ জামান। মোবাইলে লাইভ নিউস দেখার পর গোটা ৪ ঘন্টার রাস্তা তিনি তিন ঘন্টায় ক্রস করে এখানে পৌছেছেন। আর এসে দেখলেন, মেয়েটা যাকে আগলে রাখবে বলে উনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছে সেই মানুষটির হাতেই নির্যাতিত হচ্ছে। আরশাদ জামান অর্পনার হাত টেনে নিজের পিছনে নিয়ে দ্বীপের থেকেও দ্বীগুন ত্যাজ নিয়ে বললো, — ডন্ট ডেয়ার টু সি মাই ডটার। আমি আমার মেয়েকে মারবো, কাটবো, কেটে নদিতে ভাসিয়ে দিবো। আমি ওর পাপ্পা!! আমি ওকে যা খুশি তাই করতে পারি। এখানে তুমি বলার কে? ও কি হয় তোমার? তোমার ভাস্যমতে ও তোমার দাসী,, কোনো দাসী বান্দির জন্য এতো মায়া দেখানোকে লোক সমাজে খুব নিচু চোখে দেখা হয়। তাই আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকো।

,,,পরপরি অর্পনার হাত ধরে টানতে টানতে বললো– তোমার নাটক আমি যথেষ্ট দেখেছি,, আর না, আজ এই মুহুর্তে তোমার সব নাটকে সমাপ্তি ঘটাবো আমি। আজকের পর এই ছেলের আশেপাশেও যেনো তোমায় না দেখি। তোমায় সুযোগ দিয়েছিলাম,, তুমি ব্যার্থ হয়েছো। অনার্থক সময় নষ্ট করেছো,, আর নয়। দরকার পরলে তোমায় নিজ হাতে মেরে ফেলবো তাও যার তার কাছে অপমানিত হতে দিবোনা। আমি কি মরে গিয়েছি? আমার শক্তি নেই নাকি সামর্থ্য নেই? তোমাকে আগলে রাখার জন্য তোমার পাপ্পাই যথেষ্ট। কোনো দ্বীপ মির্জা কিংবা আদ্রিয়ান কাইসারের প্রয়োজন নেই।

,,, আরশাদ জামান মেয়েকে নিয়ে টানতে টানতে নিজের পার্ক করা গাড়িটির দিকে এগুতে লাগলো। তখনি তেড়ে গিয়ে অর্পনার হাত টেনে ধরলো দ্বীপ। আরশাদ জামানের উদ্দেশ্যে কর্কশ ধ্বনিতে বললো —
,,,, লিভ হার,, সি ইজ মাই ওয়াইফ। আমার ওয়াইফকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার রাইট আমি কাউকে দেই নি। আল্লাহ ব্যাতিত ওকে কেউ আমার থেকে দূরে সরাতে পারবেনা। ভেলোরা!! তোমার পাপ্পাকে হাত ছাড়তে বলো। আমার কিন্তু খুব রাগ হচ্ছে,, তুমি কিন্তু জানো আমি এখনো পুরোপুরি ফিট না। হুট করেই মাথা বিগরে গেলে কখন কি করে ফেলি নিজেও জানিনা। সুতরাং, তুমি তোমার বাবাকে হাত ছাড়তে বলো আর তুমি দুই সেকেন্ডের মাঝে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। কুইক, ভেলোরা!” ভেলোরা কাম!!

,,,, দ্বীপের অধিকার, মায়া ভরা ডাক গুলো অর্পনাকে বড্ড টানছে,, ভিতর থেকে দূর্বল করে দিচ্ছে কিন্তু অর্পনা টলবে না। সে জানে এই ডাকে কোনো ভালোবাসা নেই শুধুই বিয়ে নামক বন্ধন আর অর্পনার দূর্বলতার সুযোগ নিতে চাচ্ছে লোকটা। তাই অর্পনা এসবে কান দিবেনা। এসব আবেগ নামক মায়া জালকে দূরে সরিয়ে অর্পনা দ্বীপের উদ্দেশ্যে কাট কাট গলায় বললো — আপনি হাত ছাড়ুন, আমি আমার পাপ্পার সাথে যাবো। আপনি আজ থেকে মুক্ত দ্বীপ। এখন থেকে আপনার আর আমার পথ আলাদা,, হয়তো আর কখনোই আমাদের দেখা হবেনা। ভালো থাকবেন। আমার কোনো তালাকের প্রয়োজন নেই,, আমি তো আর বিয়ে টিয়ে করতে যাবোনা তাইনা? তবে আপনি চাইলেই বিয়ে করতে পারেন। পুরুষ মানুষের চার বিয়ে করা জায়েজ,, এক বউ রেখে আরও বিয়ে করা যায়। আমি আপনাকে অনুমতি দিলাম,, চাইলে নিজেকে সাজিয়ে নিতে পারেন। হাত ছাড়ুন,, আমি যাবো।
,,, দ্বীপ ছাড়লোনা বরং অর্পনার দিকে এগিয়ে গেলো,, গালে দুহাত রেখে আদুরে কন্ঠে বললো — ভেলোরা!! এই, রাগ করেছো? আচ্ছা সরি, আমি আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিবোনা। অনেক আদর করবো,, অনেক অনেক কেয়ার করবো। তোমার পাপ্পাকে বলো হাত ছাড়তে,, আমার হাত পায়ে জোর পাচ্ছিনা সোনা,, চলো আমরা আমাদের বাড়িতে চলে যাবো। আর এই দূরত্ব দূরত্ব খেলাটা আমার ভালো লাগছেনা। হাত ছাড়ো না সোনা বউ,,আমার লক্ষি বউ, আমার কাছে ফিরে আসো। তুমি তো জানো আমি সিক,, তুমি চলে গেলে আমি আরও সিক হয়ে যাবো। যেওনা বউ, ও বউ,, বউ!! যেওনা প্লিজ!!

,,,আরশাদ জামান এতোক্ষণ শক্ত হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন কিন্তু আর পারলেন না। এসব সিনেমাটিক নাটক তার অনেক দেখা হয়েছে। এই পৃথিবীতে সব সার্থপর আর ঠকবাজ তার সরল নিশ্পাপ মেয়েটার জীবনে এসেই পরে। নাহ!” আর কারোর হাতে মেয়েকে ছাড়বেন না তিনি। প্রয়োজনে মেয়েকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে তবুও না। আরশাদ জামান রাগের মাথায় একটা জোরে সোরে ধাক্কা দিলেন দ্বীপের বাহুতে,,, কাতর দ্বীপ আবারও দূরে সরে গেলো,, পিছনে গাড়ি থাকায় গাড়ির জানালায় কনুই বারি খেলো। আরশাদ জামান আর কোনো সময় ব্যায় না করে মেয়েকে টানতে টানতে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলো,, ভঙ্গুর অর্পনাও হেটে গেলো পাপ্পার পিছু পিছু। হঠাৎই কাচ ভাঙার শব্দ হলো,, তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকালো অর্পনা। কালো চকচক করা গাড়িটির অতিবো ফ্রেস জানালাটা ভেঙে চুর্ন চুর্ন হয়ে মাটিতে পরে আছে। দ্বীপের হাতে তরতাজা র*ক্ত, যা ক্ষরশ্রোতার ন্যায় বয়ে যাচ্ছে। অর্পনার বুকটা মুচর দিয়ে উঠলো, দ্বীপ তার দিকেই তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। অর্পনার ভয় হলো,, লোকটা তো এখোনো সুস্থ নয়। আবার যদি প্যানিক অ্যাটাক হয়? এভাবে শ্বাস নিচ্ছে কেনো?

শ্বাস কষ্ট হচ্ছে? অর্পনার চোখে পানি জমলো, দূর থেকে দ্বীপের চোখ জোড়া ও লাল আর ঝাপসা দেখাচ্ছে। কেদে দিবে নাকি এই লোক? অর্পনার জন্য কাদবে নাকি শরীর খারাপ করছে? টেনশনে মাথা ফেটে যাচ্ছে অর্পনার। কি জ্বালা হলো তার? না পারছে ধরতে আর না পারছে ছাড়তে। পরোক্ষনেই বিহানের কথা মনে হলো,, বিহান ভাই কোথায়? উনি নিশ্চয়ই দ্বীপকে সামলে রাখবেন? অর্পনা এদিক ওদিক তাকিয়ে বিহানকে খুজলো কিন্তু পেলোনা। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ওকে টানতে টানতে গাড়ির বেক সিটে ছুড়ে ফেললেন আরশাদ জামান। তারপর নিজে উঠে বসে সামনে থাকা যুবকটির উদ্দেশ্যে বললেন– গাড়ি স্টার্ট করো আদি,, টিসি নেওয়া ডান? কালকেই ওকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে মাস খানিকের মাঝে আমিও চলে যাবো। এই শহর কেনো এই দেশেই আমি থাকবোনা । এই সার্থপরদের মাঝে আমার মেয়েটা মরে যাবে,, সবাই মিলে শেষ করে দিচ্ছো তোমরা। এতোদিন মেয়েদের উপর থেকে ভরসা উঠে গিয়েছিলো আজকাল ছেলেদের ও ভরসা করা যায়না। আমার মেয়ে আমি আগলে রাখবো, সারাজীবন। মরে গেলেও মরার আগে ওর একটা ব্যাবস্থা করে দিয়ে যাবো যেনো তোমাদের মতো সার্থপর রা আমার মেয়ের দুঃখের কারন না হতে পারে।
,,, আদি কিছু বললো না,, সে এসব প্রাপ্য, এর চেয়েও কঠিন কঠিন কথা প্রাপ্প সে। তবুও ভালো সে অর্পনার কাছে কাছে থাকতে পারছে, যদি সেটাও না পারতো তাহলে? তখন তার কি হতো?

( নিচে কিছু কা*টা,ছি*ড়া সিন আছে,, ভয় পেলে পড়ার দরকার নেই, যদিও তেমন ভয়াঙ্কর না। তবুও বলে দিলাম,, এই বর্ডারের পর আরও লেখা আছে,, ভয় পেলে এটা স্কিপ করে পরের টুকু পড়ো)
,,,,,সময়টা আনুমানিক ১২ টার কাছাকাছি। ডেমরার শীতলক্ষ্যার দিকের ফাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোডের উত্তর পাশে একটি অর্ধভাঙা গাড়ি পরে আছে। গাড়িটি এক্সিডেন্ট করেছে আনুমানিক ২০-২৫ মিনিট হবে। জায়গাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল হওয়ার দরুন অন্যান্য সময় এদিকটায় মানুষের আনাগোনা থাকলেও আজ কোনো এক কারনে সকল ফয়াক্টরি বন্ধ,, লোকজনরের আনাগোনা নেই,, চারপাশ নিস্তব্ধ,, দূর থেকে পেচার ডাক আর অলক্ষুণে কু- পাখির কু কু কু শব্দে জায়গাটা আরও ভয়াঙ্কর করে তুলেছে। এই নিস্তব্ধ রাতে, লোক বিহীন রাস্তায় পা পরলো এক শক্ত মানবের। তার পরনে কালো হুডি, হাতে গ্লাব্স, পায়ের সুজে ফুট প্রিন্ট প্রোটেক্টর , মুখটা ঢেকে আছে হুডির আড়ালে । মানবটির কদমে কদমে রাস্তায় পরে থাকা ধুলোবালি অল্প অল্প করে উড়ছে তবে চলনে কোনো শব্দ হচ্ছেনা,, যেনো বাঘ নিরবে তার বড়ো বড়ো কদম ফেলে শিকার ধরতে যাচ্ছে। ভাঙা গাড়ির দরজাটি চির চির শব্দ তুলে খেলে গেলো। ড্রাইভিং সিটে পরে আছে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পরে থাকা এক সুষ্ঠব পুরুষ,, গাড়িটির সামনের, দুপাশের ঝকঝকা জানালার কাচ চুর্ন চুর্ন হয়ে পুরুষটির শরীরে গেথে আছে,, মুখেও গেথে আছে কয়েকটা, তবে এটকু আঘাতে যেনো মন ভরলো না হুডিধারী মানবটির। সে সযত্নে গাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা কাচ গুলোর মধ্যে থেকে একটি ধারালো কাচ তুলে নিলো। কাচটি বেশ মোটা এবং ধারালো, চামড়ায় লাগলেই ঘ্যাচ করে কেটে যাবে, নিশ্চিত।

হুডিধারী মানবটি কাচটি চোখের সামনে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখে পৈশাচিক হাসলো,, নিস্তব্ধ রাতে পেচার কর্কশ ধ্বনির ডাকের সাথে মানবটির ফ্যসফ্যাসে হাসি সম্মিলিত হয়ে বড্ড ভয়াঙ্কর শুনালো। মানবটি এক হাতে কাচ রেখে অন্য হাতে পকেট থেকে ফোন বের করলো। স্ক্রিন অন করতেই তাতে ভেষে উঠলো এক হাস্যজ্জল রমনির ছবি,, মানবটি মোবাইলটা নাকের কাছে নিয়ে বড়ো করে শ্বাস টানলো যেনো ছবিটি থেকে সে ঐ নারীর শরীরের মিষ্টি ঘ্রান শুষে নিচ্ছে। অনেকটা সময় ঘ্রাণ নেওয়া শেষ হলে ছবিটিতে অধর ছুয়ালো। চুমুতে চুমুতে ভিজিয়ে দিলো মোবাইল খানা। ওয়াটার প্রুফ মোবাইল হওয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপে যেতে নখুব একটা অসুবিধা হলো না,, মানবটি ফোন ঘেটে গ্যালারিতে পৌছালো,, খুজে খুজে একখানা কাঙ্ক্ষিত মানবীর ছবি বের করলো, ছবিটিতে থাকা মেয়েটি চেহারা বড্ড বিদ্ধস্ত। মানবটি হাতে থাকা কাচটির সুচালো অংশ দিয়ে মেয়েটির মুখে তৈরি হওয়া আঘাত গুলো কাউন্ট করতে লাগলো। কাউন্ট আপ ১,২,৪,৬,৮,১২,১৬ এ এসে থামলো ,, আরও কিছু ছোট ছোট কা*টা ছিড়া আছে সেগুলো ও গননা করলো,, এই গননাটা ২১ এ এসে থামলো। মানবটি ঠোঁট নাড়িয়ে আঘাতের সংখ্যা গুলো দ্বীগুন করলো,, বড়ো আঘাত ৩২টি, ছোট আঘাত ৪২ টি।

এতোগুলো আঘাত মুখের এক পাশে নেওয়া বোধয় সম্ভব না তাই কষ্ট করে দুপাশেই বসাতে হবে। ভেবেই আফসোস হলো মানবটির,, মুখের দুপাশ ক্ষত বিক্ষত হয়ে পরে থাকলে নিশ্চই খুব বিশ্রী দেখাবে? ইসস!! আফসোস!! আফসোস করতে করতে আবারও ফ্যাসফ্যাসে হাসলো মানবটি। এক হাতে মোবাইলে থাকা রমনির ছবি অন্য হাতে কাচ,, ছবিটিতে দেখাচ্ছে, রমনিটির চোখের নিচ থেকে গালের মধ্যভাগ পর্যন্ত একটা গাড়ো ক্ষত,, মানবটি সেই অনুযায়ী কাচটি রাখলো আহত পুরুষটির এক গালে পরপরি চাপ প্রয়োগ করে চোখের এক ইঞ্চি নিচে দাবিয়ে দিলো,, সাথে সাথে ঘ্যাচ করে শব্দ হলো। পরপরি ঘ্যাচ ঘ্যাচ শব্দ তুলে চামড়া সহ ভিতরের মাংস পর্যন্ত কে*টে গালের মধ্য ভাগে এসে পৌছালো। গালের মাংস ফাক হয়ে ভিতরের সাদা অংশ দৃশ্যমান হলো আর সেই সাদা অংশ হতে প্রথমে ফোটা ফোটা পরপর ক্ষরস্রোতার ন্যায় রক্ত ঝড়তে লাগলো। এরুপ দৃশ্য যেনো হুডিধারীর মনকে প্রলোভন করলো,, সে মেতে উঠলো কা*টা ছে*ড়ার খেলায়। একটা একটা কাচ তুলছে আর ছবিতে থাকা রমনির ক্ষত বিক্ষত মুখ খানায় থাকা ক্ষত অনুযায়ী ঘ্যাচ ঘ্যাচ শব্দ তুলে আহত লোকটার মুখে ক্ষত তৈরি করছে। মুখের এক পাশে গুনে গুনে ২২ টি বড়ো কাচ আর ৩৩ টি ছোট কাচ দাবিয়ে ক্ষান্ত হলো মানবটি।

পরপর ঠোঁট কামরে হেসে একটা আঙুল এগিয়ে দিলো আহত মানবটির ক্ষত বিক্ষত মুখদ্বয়ে। মুখে আঙ্গুল লাগতেই গালটা তুলোর মতো নরম মনে হলো। গালের মাংশ একদম কি*মা হয়ে গিয়েছে,, ধরলেই কেমন কেমন ক্যা*চ ক্যা*চ করছে। ইসস!! এই মুখ সার্জারী তো বাদ, একটু সেলাই করার ও সিস্টেম নেই। লোকটার জন্য হুডিধারীর বেশ মায়া হলো। সারাজীবন এই অসুন্দর,, বিশ্রী মুখ নিয়ে বাচতে হবে। হুডি ধারীর খুব ইচ্ছা করছে লোকটার চোখ দুটো উপড়ে নিতে কারন সে তার জিনিসে নজর দেওয়ার মতো সাহস দেখিয়েছে। কিন্তু এই চোখ উঠানো যাবেনা, চোখ উঠিয়ে ফেললে নিজের এই ভয়াঙ্কর চেহারা দেখবে কি করে? শুধু চেহারা দেখানোর জন্য হলেও চোখ দুটো রাখা উচিৎ। কিন্তু এটুকুতেই শান্তি পাচ্ছেনা হুডি মানব। তার আরও ধ্বংস যোগ্য চালাতে মন চাচ্ছে,,, গলা থেকে শীরটা আলাদা করে দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা ঝমলো বাট সেটা করলে মুক্তি পেয়ে যাবে। সব অপরাধের শাস্তি মৃত্যু হতে পারেনা,, কিছু শাস্তি মানুষের বেচে থাকায় ও নিহিত থাকে।

,,,জ্বলেরে,, জ্বলেরে , জ্বলেরে,,
,,,হিয়া জ্বলে প্রিয়ার দরদে,,
,,,এমন পিরা আসবে জেনে
প্রেম পুকুরে নাইতে চাইনিরে,,
,,জীবনের এই সাত সকালে,,
মনের মানুষ হইতে চাইনিরে।
,, ওরে পরান যদি দুইটা হয়রে,
একটা গেলে একটা রয়যে,,
পরান যদি দুইটা হয়রে,,, এএ
জ্বলেরে,,, জ্বলেরে,, জ্বলেরেএএ
,, হিয়া জ্বলে প্রিয়ার দরদে
,,,প্রেম যে বোবা, প্রেম যে কালা,,
,,,তাই প্রেমে এতো জ্বালা,,
,,এই জ্বালায় পরান পুড়ে রে,,

,,,শখের গিটারটা জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠলো অর্পনা,, তার সব কিছু ফাকা ফাকা লাগছে,, মরে যেতে মন চাচ্ছে। এতো যন্ত্রণাময় কেনো তার জীবনটা? সবসময় তার সাথে এমন কেনো হতে হয়? যেই ডালে শখ করে বাসা বাদতে যায় সেই ডালটাই ভেঙে যায়। সে এতোটা অবহেলিত কেনো? তখন যদি দ্বীপ এতো এতো অপশনের মাঝে একবার বলতো, তোমায় ভালোবাসবো তাহলে সব উপেক্ষা করে ছুটে যেতো অর্পনা। তার এখন নিজেকে জোকার মনে হয়,, এতো এতো অপমান করার পরেও ভালোবাসা কোন বুঝে আশা করে তার পাপি মনটা? ভালোবাসা এতোই সহজ? সবাই পায়? পাওয়ার হলে প্রথমটাই পেতো। সেসব না পাক, মায়ের ভালোবাসা টুকু ও তো পেতে পারতো। নাহ!! তার জন্য ভালোবাসা না। তার জন্য নির্বাসন ই ঠিক আছে,,, আমরন নির্বাসন গ্রহণ করবে অর্পনা। পরিচিত শহর, পরিচিত দেশ,,পরিচিত মুখ,, প্রিয় মানুষ,, সব ছেড়ে অনেক দূর চলে যাবে। আর কখনোই ফিরবেনা এই দেশে,, এমনকি মরার পরেও না। অর্পনার ভাবনার মাঝে মোবাইলে টুং করে মেসেজের টোন বেজে উঠলো। অর্পনা জানে মেসেজ টা কার,, একমাত্র সে ই টাকা খরচ করে কন্টাক্ট নম্বরে মেসেজ পাঠায়। অর্পনা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলো,, মেসেজটা দেখতে মন চাচ্ছে তবে সাহস হচ্ছেনা। কি লিখেছে কে জানে? হয়তো এমন কোনো কথা লিখেছে যেটাতে অর্পনা আরও হাজার গুন ক্ষত বিক্ষত হবে। অনেকটা সময় পর স্ক্রিন অন করলো অর্পনা। মেসেজ অপশনে গেলোনা, সাটার নামিয়েই দেখলো সেখানে খুব সুন্দর করে লিখা,,

,,, চলে গিয়েছিস না? ভালো করেছিস,, আর আসবিনা আমার কাছে। কি ভেবেছিস তুই না ফিরলে আমি মরে যাবো? মরে গেলেও ফিরবিনা। আমি মরলে আমার লাশের কাছেও আসবিনা তুই। কেনো এসেছিলি আমার জীবনে? বলেছিলাম তকে দয়া দেখাতে? আমাকে সুস্থ করতে বলেছিলাম? বে*য়াদবের বাচ্চা!! তকে যেনো আর কখনো আমার চোখের সীমানায় না দেখি। দেখলে একদম খু*ন করে ফেলবো।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৪

,,, মেসেজটা পড়ে আবারও ডুকরে উঠলো অর্পনা। তার মন বিচ্ছেদ চায়না,, সে একটু ভালোবাসা চায় যেটা সে কোনোদিন পায়নি। পাপ্পা ছাড়া কেউ তো কখনো ভালোবাসেনি তাকে,,, এবার যদি সে বাসতো। কিন্তু তা হওয়ার নয়। সে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলো,, সে সব দিবে,, সংসার, সুখ, সাচ্ছন্দ্য সব দিবে শুধু ভালোবাসা ছাড়া। অর্পনা অনুভব করলো তার শরীরটা অবশ হয়ে আসছে,, কা*টা হাতটার রক্ত ও শুকিয়ে গিয়েছে। যদিও হাত কাটা তার কাছে নতুন কিছুনা তবুও আজ নিজেকে দূর্বল লাগছে। গুটিশুটি মেরে শুয়ে পরলো মেঝেতে,, আজকের রাতটা এই বাংলাদেশে তার শেষ রাত।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৫