Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩১
রুপান্জলি

,,, শরীরে কিছুটা আড়াম অনুভুত হতেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। নিজেকে সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় আবিস্কার করতেই খেয়াল হলো সে বর্তমানে কোনো এক হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। হাত নাড়াতে চাইলে বুঝলো তার হাতে এখোনো স্যালাইন চলছে। কিছুটা খটর খটর শব্দ কানে যেতেই বাম দিকে ফিরে তাকালো অর্পনা। একজন নার্স উল্টো দিকে ঘুরে ঔষধের বক্স নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। অর্পনা চোখ মুখ কুচকে হসপিটালের রুমটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতেই বুঝতে পারলো সে লেভ-এইড হাসপিটালে এডমিট। এরপর গতকালকের কথা মনে করতে চাইলো,, সে এখানে কিভাবে এসেছে? কে নিয়ে এসেছে? সে তো ঐ ছেলেগুলোকে মারছিলো তারপর হঠাৎ হুস জ্ঞান হাড়িয়ে ফেলে ঐ ছেলেটাকে পাথর দিয়ে আঘাত করতে নিলে একটা শক্ত হাতের মালিক ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলো কিন্তু অর্পনা সেই লোকটাকে দেখতে পায়নি। তাহলে কি সেই অজ্ঞাত লোকটি ই ওকে হসপিটালে এডমিট করিয়েছে? কে হতে পারে লোকটা? অর্পনা হুসে না থাকলেও এটুকু খেয়াল করেছে, ঐ লোকের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর সে আরও ভেঙে পরেছিলো। নিজেকে ভেঙে চুড়ে প্রকাশ করেছিলো একজন দূর্বল মানবী রুপে। লোকটাকে খুব আপন মনে হয়েছিলো,, যেনো তার স্পর্শে অর্পনা আদুরে বাচ্চার রুপ নিয়েছিলো। কে হতে পারে মানুষটা? বিষয়টা নিয়ে আপাতত আর ভাবলোনা অর্পনা,, সে হালকা গলা খাকারি দিয়ে নার্সটির আকর্ষণ পেতে চাইলো। পছন থেকে গলা খাকারির শব্দ পেতেই ফিরে তাকালো নার্সটি। হাস্যজ্জল মুখ করে বললো —

,,, আমি জানি তোমার জ্ঞান ফিরেছে,, তাইতো ঔষধ রেডি করছিলাম। খেয়ে ঔষধ খেতে হবে না?
,,,নার্সটির মুখ দেখে অবাক হলো অর্পনা, এটা তো সিমি। ওকে দেখেই শুষ্ক ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটলো অর্পনার। সে সবিনয়ের সাথে বললো — সিমি আপু!! ভালো আছো? তোমাকে এই আট মাসে কতো খুজলাম, তবে পেলাম না।
,,,সিমি এগিয়ে এসে অর্পনার স্যালাইনের স্পিড আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বললো– কেনো খুজছিলে? তোমার ওয়াচের জন্য?
,,,, না না আপু!! ওসব কিছু না। পারু আপুর সাথে রিলেট প্রতিটি ব্যাক্তির সাথেই আলাপ করার ইচ্ছা ছিলো তাই আরকি। সেবার তো কথাই হলোনা।
আচ্ছা আপু!! আমি এখানে কিভাবে এলাম? কে ভর্তি করিয়েছে আমাকে?
,,,, সিমি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, হাসিটা কেমন রহস্যতক ঠেকলো অর্পনার কাছে। সে ভ্রু কুচকে নিতেই সিমি তারাহুরো করে বললো — তোমার বাড়ি থেকে লোক এসেছে,, দেখা করবেনা? ওনার সাথে দেখা করে নেও, আমি খাবার নিয়ে এসে একসাথে অনেক আড্ডা দিবো।
,,,অর্পনা থমকালো, বাড়ি থেকে লোক এসেছে মানে? কোন বাড়ি? মির্জা নাকি জামান? নাহ!! পাপ্পা তো আসবেনা, তাহলে কি মির্জা বাড়ির কেউ এসেছে?ওর ভাবনার মাঝেই সিমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে কিছু একটা বলতেই দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো আদ্রিয়ান।
ওকে ভিতরে রেখে সিমি খাবার আনতে চলে গেলো। হসপিটালে আদ্রিয়ানকে দেখে ভ্রু গুটালো অর্পনা। তাহলে কি আদ্রিয়ান ওকে এখানে নিয়ে এসেছে? ঐ লোকটা আদ্রিয়ান ছিলো? ওহুম, হতেই পারেনা। ঐ স্পর্শটা খুব আপন মনে হয়েছিলো অথচ আদ্রিয়ানের স্পর্শ কখনোই আপন মনে হয়নি বরং বিরক্ত লাগতো। শিউর হতে মনে জমা প্রশ্ন টুকু জমিয়ে না রেখে সরাসরি প্রশ্ন করলো —

,,, গতকাল আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন?
,,,কথাটা বলে সরাসরি আদ্রিয়ানের চোখে তাকালো। চোখ দুটো লাল, প্রতিদিনের দগ্ধতা, কান্নাকাটি, নির্ঘুম রাত কাটানো, সব মিলিয়ে আদ্রিয়ানের চোখ মুখের অবস্থা খুবি করুন। চোখের নিচে কালসিটে দাগ পরে গিয়েছে। অর্পনার খুব করে মনে পরলো আদ্রিয়ান তাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর টানা একটা বছর সে ট্রমায় ছিলো,, সারাক্ষণ চুপচাপ থাকতো,, আড়ালে কান্না করতো,,নিজের মাথায় নিজে আঘাত করতো,, রাগ সামলাতে না পেরে নিজের হাত নিজে কামরাতো,, এমন একটা রাত যায়নি যেই রাতে অর্পনা শান্তিতে ঘুমিয়েছিলো। সেই সময়টায় অর্পনা একা ছিলো, তাকে সামলানোর জন্য পাপ্পা ছাড়া আর কেউ ছিলো না। অর্পনা বার বার রিয়্যালাইজ করেছে পাপ্পা না থাকলে এই ছন্নছাড়া অর্পনাকে কবেই শেয়াল কুকুরে টেনে নিয়ে যেতো। এখন আদ্রিয়ানের অবস্থা কিছুটা সেরকমি লাগছে,, অর্পনা না চাইতেও প্রকৃতি কেমন রিভেঞ্জ নিয়ে নিলো তাইনা? এটাকেই বোধহয় রিভেঞ্জ অভ ন্যাচার বলে। ওর ভাবনার মাঝেই শুনা গেলো আদ্রিয়ানের মলিন স্বর — নাহ!! আমি নয়। ভোর রাতের দিকে হসপিটাল থেকে আঙ্কেলের ফোনে কল দেওয়া হয়, সেখান থেকেই জানতে পারি তুমি এখানে ভর্তি। জানার পরপরি ছুটে এসেছি। এখানে আসার পর রিসেপশনিস্ট আমার হাতে তোমার ট্রলিটা তুলে দিলো। তুমি কি মির্জা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছো? দ্বীপ মির্জা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ? তুমি আর ওই বাড়ি যাবেনা? বলোনা জানেম,, তুমি কি আমার কাছে ফিরে এসেছো? বিশ্বাস করো আমার কোনো প্রবলেম নেই। তুমি আট মাস কেনো আট বাচ্চার মা হয়েও যদি আমার কাছে ফিরতে চাও আমি তোমায় গ্রহন করতে রাজি। একবার বলো, আমার কাছে ফিরেছো তুমি। আমি তোমায় সানন্দে গ্রহণ করবো।

,,,আদ্রিয়ানের অতসব কথা কানে তুললো না অর্পনা, সে অনর হয়ে প্রশ্ন করলো — আমাকে এখানে কে এনেছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন?
,, আদ্রিয়ান মাথা ঝাকিয়ে নাকোচ করে বললো — কে এনেছে জানিনা তবে হাসপাতাল থেকে জানিয়েছে, রাত দু’টার পর এক অচেনা লোক তোমাকে এখানে নিয়ে আসে। তার পরিচয় জানতে চাইলে সে কিছুই জানায়নি। লোকটার গায়ে রেইনকোট আর মুখে মাস্ক থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে যাওয়ার আগে সে শুধু এটুকুই বলেছে, সে নাকি তোমার বাবার পরিচিত। সাথে আঙ্কেলের নম্বরটা দিয়ে গিয়েছে, যেনো হসপিটাল থেকে তোমার বাড়িতে যোগাযোগ করতে পারে। রিসেপশনিস্ট এর থেকে এটুকুই জানতে পেরেছি।
,,, অর্পনা মনোযোগ দিয়ে শুনলো প্রতিটি কথা। পরপর ধীরগতিতে উঠার চেষ্টা করতেই আদ্রিয়ান এগিয়ে এসে সাহায্য করতে নিলে অর্পনা ইশারায় না করে দিলো।ঠিকঠাক ভাবে উঠে বসে নরম স্বরে প্রশ্ন করলো — পাপ্পা আসেনি তাইনা?

,,,আদ্রিয়ানের মুখটা মলিন হয়ে এলো, সে অনেকবার রিকোয়েস্ট করেছে কিন্তু আরশাদ জামান আসতে চাননি। হয়তো অর্পনার উপর উঠা রাগ থেকেই এমন আচরণ করেছেন। তবে সেটা অর্পনাকে ডিটেলে বলতে চাইলোনা,, মেয়েটা শুনলে খুব কষ্ট পাবে। অর্পনা বোধহয় উত্তরটা জানতো। তাই আদ্রিয়ান প্রতিত্তোর করার আগেই মলিন হেসে বললো– ইট্স ওকে, আমি কিছু মনে করিনি। আচ্ছা!! আমি রিলিজ পাবো কখন,, সে বিষয়ে কিছু জানেন?
,,, ১০ টার পর মেবি। তারপর আমরা বাড়ি ফিরে যাবো, কেমন?
,, নাহ!! আমি পাপ্পার কাছে ফিরবোনা। পাপ্পা যখন আমায় চায়না তখন আমিও তাকে ঝামেলায় ফেলতে চাইনা। আর এই শহরে আমি আছি ই আর কিছুদিন,, এই কটাদিন কোনো একটা হোটেলে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবো। ইউ নো হোয়াট? অর্পনা সব পারে, নিজেকে যেমন মখমলের ন্যায় নরম বানাতে পারে তেমনি কনকৃটের ন্যায় কঠিন ও বানাতে পারে।
,,,এই শহরে আর কটাদিন আছি, এই কথাটা ঝঙ্কার তুললো আদ্রিয়ানের কানে। সে ব্যাতিবেস্ত হয়ে অর্পনার বাম হাতটা নিজের হাতের ভাজে নিয়ে বিচলিত কন্ঠে সুধালো — কি বলছো তুমি? কোথায় যাবে? অন্য কোনো শহরে চলে যাবে? নাকি,

,,আদ্রিয়ানের কথা শেষ করার আগেই অর্পনা নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কোলের উপর রেখে বললো — এব্রোড চলে যাবো ভাবছি। দুদিন পর ফাস্ট সেমিস্টারের রেসাল্ট দিবে, পরপরি টিসি নিয়ে চলে যাবো। আর বোধহয় বাংলাদেশে ফিরা হবেনা।
,,,, অর্পনার কথায় অবাক হয়ে গেলো আদ্রিয়ান, অর্পনা এব্রোড চলে যাবে? কিন্তু কোথায়? মনের প্রশ্ন টুকু উগ্রে দিলো আদ্রিয়ান — কোথায় যাবে? মানে কোন দেশ? আর এই কদিনে এজেন্সি মিট, ভিসা প্রসেসিং, টিকিট এতোসব কিভাবে কি? অর্পনা!! আমায় একটু খুলে বলবে?

,,, অর্পনা মুচকি হাসলো, বাম হাতে একটা বালিশ তুলে বেডের পিছনে সোজা করে রেখে তাতে হেলান দিয়ে শুয়ে স্যালাইন লাগানো হাতটা সোজা করে রেখে বললো– অস্ট্রেলিয়া চলে যাবো। ভিসা নিয়ে প্রবলেম নেই, এখোনো অস্ট্রেলিয়ায় আমার সাত মাসের ভিসা আছে। দ্বীপকে বিয়ে করার পরপরি এজেন্সিতে যোগাযোগ করেছিলাম, তার মাস তিনেক পরেই ভিসাটা কনফার্ম হয়ে যায়। যেহেতু আগে থেকেই জানতাম এই শহর আমায় ছাড়তে হবে ।তাই আগে থেকেই নিজের ব্যাবস্থা করে রেখেছি। এখন শুধু টিকেট কাটা বাকি, টিসিটা নিয়েই টিকেট কেটে সোজা অস্ট্রেলিয়া। এরপর ওখানে টুকটাক জব করে নিজেকে আর পড়ালেখাটাকে সামলে নিতে পারলেই চলবে। দোয়া রাখবেন আমার জন্য, আমি যেনো সফল হই। বেচে থাকলে কোনো একদিন আবারও দেখা হবে,, না হলেও সমস্যা নেই। অভদ্র, অসভ্যদের সাথে যত কম দেখা হবে ততোই ভালো থাকবেন।

,,,,অর্পনার বলা শেষের কথা গুলো যেনো তীরের ফলার মতো আদ্রিয়ানের বুকে এসে বিধলো। মেয়েটা আজো তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। আজো তার ব্যাবহারে কষ্ট পায়, হয়তো এখোনো অভিমান পুষে রেখেছে। চোখ জোড়া জ্বালা করে ভিজে উঠলো, আবারও বেহায়ার মতো অর্পনার হাত টেনে তাতে গাল ঠেকিয়ে বললো — আমার একটা লাস্ট রিকোয়েস্ট রাখবে জানেম? ভালোবাসা তো দিলেনা,, কখনো চাইবোনা এমন কথা দিতে পারবোনা। আমি যদি সুযোগ পাই, তাহলে মরার এক সেকেন্ড আগেও শুধু তোমার ভালোবাসা চেয়ে যাবো।তবে তুমি হয়তো আমায় সেই করুনাটা করবে না। কিন্তু এই শেষ বেলায় একটা রিকোয়েস্ট রাখো, প্লিজ!!
,,, অর্পনা কিছুই বললো না, শুধু তাকিয়ে রইলো। আদ্রিয়ানের সাথে তার বিনিময়ের সম্পর্ক কখনোই তৈরি হয়নি,, যখন সে চেয়েছিলো তখন আদ্রিয়ান দেয়নি তারপর অর্পনা দেয়নি। তাই সেই দেওয়া নেওয়ার সম্পর্কটা গড়ে উঠেনি। অর্পনাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আদ্রিয়ান কাতর স্বরে বললো — যেই কটাদিন বাংলাদেশে আছো, ততো গুলো দিন আমাকে তোমার পাশে থাকতে দিবে? হোটেলের পরিবর্তে আমার ফ্লাটে থাকবে? ট্রাস্ট মি জানেম,, আমি খারাপ ছেলে নই,, তোমার থেকে নিজেকে ১০০ হাত দূরে রাখবো। আল্লাহ এর কসম। নিষেধ করোনা জানেম,, এটুকু দাও, লাস্টবার। আর কখনো, কোনো আবদার নিয়ে তোমার সামনে দাড়াবোনা। প্লিজ জানেম, প্লিজ!!

,,,, সূর্যের প্রখরতায় মুখোরিত চারিপাশ,, প্রচন্ড গড়মে মানব জীবন অতিষ্ঠ প্রায়। সময়টা ১১ টার ঘরে হলেও, বাহিরের তপ্ততা সূর্যের মাথায় উঠার মতো তাপদহ সৃষ্টি করেছে। এই তপ্ত গড়মেও রোদে দাড়িয়ে মির্জা বাড়িকে পাহারার আওতায় রেখেছে অনেক খেটে খাওয়া গার্ড। এটাকেই বোধহয় জীবিকার জন্য লড়াই হিসেবে গন্য করা হয়।
,,,শাই শাই করে মির্জা বাড়ির গেইটে দুটো রোলস-রয়েস সুইপটেইল কার আর একটি হাইয়েস্ট এসে থামতেই গেইটে দাড়িয়ে থাকা গার্ডগুলো সতর্ক হয়ে দাড়ালো,, যেনো একটুখানি নরচর করলেই মালিক পক্ষ তাদের জান নিয়ে নিতে প্রস্তুত। যদিও তারা বিশ্বস্ত সুতরাং কাউকেই কখনো মৃত্যুর সম্মুখে পড়তে হয়নি তবুও মেইন গার্ড পজিশনে থাকা গার্ডটির পা থরথর করে কাপছে। যখন থেকে জানতে পেরেছে গতকাল মির্জা বাড়ির বড় বউ সারাজীবনের জন্য বাড়ি ত্যাগ করেছে,, আর সে দেখতে পেয়েও তাকে আটকায়নি তখন থেকে তার আত্মার পানি শুকিয়ে যাবার জোগার। দুজন গার্ড এগিয়ে গিয়ে সামনের গাড়িটির দরজা খুলে দিতেই ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এলো দ্বীপ আর অপর পাশ থেকে নামলো বিহান। বাকি গাড়ি গুলো থেকে গার্ডরা নেমে যে যার পজিশনে দাড়িয়ে পরলো। দুপাশ থেকে নানান ফুলে সজ্জিত বাগানের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া কনকৃটের পথ দিয়ে হেটে যাচ্ছে দুজন। দ্বীপের প্রতিটি কদমে কদমে গাম্ভীর্যতা আর ক্ষমতার বড়াই। দীর্ঘ সারে ছয় বছর পর দ্বীপের আগের রুপ দেখে প্রতিটি গার্ডের মুখে হাসির ঝিলিক। সেই সাথে কিছুটা আতঙ্ক ও কাজ করছে,, গতকাল সবাই অর্পনাকে যেতে দেখেছে কিন্তু তারা মেইন গার্ডের ইশারা ব্যাতিত কিছুই করার ক্ষমতা রাখেনা।

,,,,,হাটতে হাটতে সদর দরজার কাছে পৌঁছাতেই গাড় বাকিয়ে মেইন গার্ডের দিকে তাকালো দ্বীপ,, সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিলো গার্ডটি। দ্বীপ কিছুই বললো না বরং এগিয়ে গেলো বাড়ির ভিতরে। হলরুমে পোছাতেই সবার মলিন মুখশ্রীর সন্ধান পেলো। মাহিদ মির্জা গালে হাত দিয়ে হুইল চেয়ারে বসে আছেন,, উনার পাশাপাশি সোফায় বসে আছেন শাহীন মির্জা আর মাহিন মির্জা,, দুজনের মুখ গম্ভীর। সিরির এক কোনার হাতল ধরে দাড়িয়ে আছে মেধা, তার পাশে পরশি। আরিব ভাইদের দেখে দৌড়ে গেলো,, পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যকে এগিয়ে আসতে দেখে হাটু ভেঙে বসে ওকে কোলে তুলে নিলো দ্বীপ। সাথী বেগম তরিহরি করে এগিয়ে এসে বললেন —
,,,, কি করছো আরিব? এতো বড়ো ছেলে হয়ে ভাইয়ার কোলে উঠে কেউ? ওকে নামিয়ে দাও দ্বীপ,, তুমি এখোনো অসুস্থ।

,,,দ্বীপ নামালো না,, ওকে কোলে নিয়েই মুচকি হেসে বললো — ওর যখন তিন বছর তখন থেকে আমি অসুস্থ,, কোলে নেওয়ার সুযোগ পেলাম কই? চাচি মনি!” আম্মু কই? এখানে সবাই আছে আম্মুকে দেখতে পাচ্ছিনা যে?
,,, ছেলের নির্লিপ্ত ভাব দেখে মাহিদ মির্জা হালকা ধমকের স্বরে বললেন– যেই কান্ড করেছো এরপর আমরা কেউ তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইনা,, বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলে খুশি হবো।
,,,দ্বীপ একবার বাবার দিকে তাকালো,, বাবাটা তার শোকে নিজের কি অবস্থা করেছে,, দেখলেই তার বুক কাপে। তার অনুপস্থিতিতে সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে পরেছে। গোছাতে হবে,, সবটা ধৈর্য সহকারে গুছিয়ে তারপর,,,, ভাবনা রেখে কিছু পথ এগিয়ে গিয়ে আরিবকে নামিয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো — যে যাবার সে চলে গিয়েছে আব্বু। থাকার হলে নিজের থেকেই থাকতো। সে যখন আমার জন্য ১১ টা দিন অপেক্ষা করতে পারেনি আমিও তাকে ফিরাতে যাবোনা। এখন সবাই যদি এরকম মুখ গুমরা করে বসে থাকতে চাও তাহলে থাকতে পারো। আমার কিছু এসে যায়না।

,,,ছেলের কথা শুনে মুখ ফিরিয়ে নিলেন মাহিদ মির্জা,, দাতে দাত চেপে বললেন — তিন কবুল পরলেই স্বামী হওয়া যায়,, কিন্তু প্রকৃত স্বামী হতে গেলে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেটা তোমার মতো অযোগ্য ছেলেরা কোনোদিন পারবেনা। নিমোখ হারাম একটা। তুমি আমাকে আব্বু বলে ডাকবেনা,, আর না নিজের এই মুখটা নিয়ে আমার সামনে আসবে।
,,,ভাইয়ের মুখে এহেন কথা শুনে মাহিন মির্জা বললেন– ভাইজান!! দ্বীপ ছোট মানুষ, কি থেকে কি করবে বুঝতে পারেনি। আপনি দয়া করে আমাদেরকে অনুমতি দিন, পুরো দেশ তোলপাড় করে হলেও মেয়েটাকে খুজে বের করে বাড়ি ফিরিয়ে আনবো। ইনশাআল্লাহ!!
,, মাহিন মির্জার কথায় ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে ভাইদের দিকে তাকালেন মাহিদ মির্জা। সাথে সাথে চুপসে গেলো দুই ভাই। শাহিন মির্জা আমতা আমতা করে বললেন — আমাদের দিকে এভাবে তাকাও কেনো ভাইজান? আমরা কি করলাম? আমি আর মাহিন ও তো দ্বীপের উপর রেগেই আছি,, আর তুমি আমাদের রাগ দেখাচ্ছো। কই যাই বলোতো আমরা?
,,, মাহিদ মির্জা মুখ বিকৃত করে বললেন– কেউ খুজতে যাবেনা ওকে। ওর কি কোনো দাম নেই? যে যেচে পরে এখানে পড়ে থাকতে যাবে? যার বউ তাকে বলো খুজে আনতে। নয়তো তার জন্য মির্জা বাড়ির দরজা আজীবনের জন্য বন্ধ। এই পরশী আম্মু!! ( পরশীর দিকে তাকিয়ে) আমাকে একটু রুমে নিয়ে যাওতো। এসব আর সহ্য হচ্ছেনা,, অমানুষ জন্ম দিয়েছি আমি,, কু*লাঙ্গার হয়েছে একটা।
,,, পরশি বাধ্য মেয়ের মতো এগিয়ে এসে মাহিদ মির্জার হুইল চেয়ার টেনে লিফ্ট এর দিকে চলে গেলো,, উনি অসুস্থ হওয়ার পর পরি বাড়িতে লিফ্ট সিস্টেম করা হয়েছে। ভাইকে চলে যেতে দেখো শাহিন মির্জা মুখ ভোতা করে বসে রইলেন। বাবাকে চলে যেতে দেখে দ্বীপ ও রেগে মেগে ঘরের দিকে চলে গেলো।দ্বীপকে যেতে দেখে মাহিন মির্জা হালকা রাগ মিশ্রিত দৃষ্টিতে বিহানের দিকে তাকিয়ে শাসিয়ে বললেন– এখানে দাড়িয়ে আছো কেনো? যাও গিয়ে ভাইকে বুঝাও। তখন দায়িত্ব নিয়ে মেয়েটাকে আনতে পেরেছো, এখন আগলে রাখতে পারোনি কেনো? সবকয়টা অকৃতজ্ঞ। কখন থেকে মেয়েটাকে কল দিচ্ছি, বরাবর ফোন বন্ধ বলছে। আল্লাহ জানে মেয়েটা কেমন আছে,,

,,,, অপ্রিয় দ্বীপ মির্জা!!
,, ঘন্টা চারেক আগেও আপনাকে ভালো নজরে দেখা এক পাপি আমি, বাট আপনি আমার সেই নজর ডিসার্ভ করেন না। আর যে যা ডিসার্ভ করেনা তাকে সেটা দেওয়া প্রিথা জামান একদমি পছন্দ করে না। আজকের পর আপনি আমার অপ্রিয়র খাতায় নাম লিখালেন। আপনাকে ঘৃণা করি আমি,, স্রেফ ঘৃণা । আপনি কি ভেবেছেন আমি আর পাঁচটা নারীর মতো সাধারণ কেউ?যে আপনার পায়ে ধরে বলবে,, আমায় মেনে নিন স্বামী, আমায় মেনে নিন। জাস্ট ইরিটেটিং ওয়ার্ড্স, আর এসব ওয়ার্ড্স অর্পনার মুখে মানায়না। আপনাকে আমি এক হাজার টাকা দেনমোহর নিয়ে বিয়ে করেছিলাম। কোনো কাগজে কলমে সাক্ষর হয়নি, শুধু কবুল বলাবলি হয়েছিলো। বিহান ভাইয়ার থেকে ডিটেলে জেনে নিবেন। বাই দ্যা ওয়ে,, ডিভোর্স লেটার ফেটারের দরকার নেই,, সময় করে বিহান ভাইয়ের ফোন দিয়ে ভিডিও কলে এসে তিনবার তালাক দিয়ে দিবেন, তাহলে এই সো কল্ড সম্পর্ক থেকে মুক্তি। আজকের পর, যেই মুহুর্তে আপনি চিঠিটা পড়ছেন, এই সময়ের পর ভুলে যাবেন আপনার জীবনে অর্পনা নামক কোনো মেয়ের অস্তিত্ব ছিলো। আই নো!” আই নো দেট,, আপনি আমাকে খুজবেন,, কাছে পেতে চাইবেন,, হয়তো পাগলামি ও করবেন কিন্তু আমি ফিরবোনা। কজ!! আমি যার থেকে একবার মুখ ফিরিয়ে নেই সে মরে গেলেও ফিরে তাকাইনা, হোক সে যতই পেয়ারের লোক। প্রেম ভালোবাসা ততক্ষণ ই স্থায়ি থাকে যতক্ষণ প্রিথা জামানের মন স্থির থাকে। হোয়াট এভার!! আপনার বাড়ি থেকে যা যা দেওয়া হয়েছে সবটা রেখে গেলাম,, শুধু নাকের ফুলটা রাখা হয়নি,, এটুকু আমার থাক। এর পরিবর্তে আমার চারটা ওয়াচ রেখে যাচ্ছি,, এখানে থাকা প্রতিটি ওয়াচের প্রাইজ 67k+ আশা করি নাকের ফুলের দাম মিটে যাবে, না মিটলে বিহান ভাইকে দিয়ে জানাবেন, আমি ক্যাস পাঠিয়ে দিবো।
পরিশেষে : মরুন, বাচুন, পাগল হয়ে যান, সবটা আমার আড়ালে থেকে, একদম কাছে ঘেষার চেষ্টা করবেন না। জ্বালাতে আসলে একদম মাটির নিচে গেড়ে দিবো, মাইন্ড ইট।

,,, প্রিথা জামান!!
,,,চিঠিটা পড়ে ক্রুর হাসলো দ্বীপ, কোনা চোখে বিহানের আতঙ্কিত মুখটা অবলোকন করে ঠোঁট কামরে জিজ্ঞেস করলো — মেয়েটা কি আমার সাথে ত্যাজ দেখালো বিহান? দ্বীপ মির্জার সাথে ঘার ত্যাড়ামি?
,,, বিহান বিরক্তিতে ভ্রু কুচকালো, এই ছেলে এখোনো বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেনা? বউ চলে যাবার পরেও এতোটা নির্লিপ্ত মানুষ কিভাবে থাকতে পারে ভাই? সে হলে তো এতোক্ষণে মেধা রানীর নামে কাদতে কাদতে গঙ্গা জমুনা বহিয়ে দিতো। দ্বীপ নির্লিপ্ত থাকলেও বিহান আফসোসের স্বরে বললো — বুঝবি রে বুঝবি, অর্পনা কি জিনিস সেটা তুই নিজেও জানিস না। এতোদিন তো ভালো রুপ দেখেছিস, এবার আড়ালে থাকা রুপটা দেখ। কতো করে বললাম বাড়ি ফিরে চল, ফিরলি না। বিয়ে করেছিস আট মাস, এখোনো বাসরটাও করতে পারিসনি, তর জন্য বড্ড আফসোস হচ্ছে জোহান,, তর কপালে বোধহয় আর বাসর টাসর জুটবেনা। বউ থাকা সত্তেও বাসর করতে না পারার আফসোস তর আজীবন থেকে যাবে ভাই। বড্ড মায়া হচ্ছে তর জন্য।
,,,বিহানের কথায় ভ্রু কুচকে এলো দ্বীপের। চোখ মুখে তিক্ততা ছড়িয়ে প্রশ্ন করলো — তুই জানিস কিভাবে? আমাদের বাসর হয়েছে নাকি হয়নি?

,,, বিহান ঠোট কামরে হাসলো, পরপর এক পা এক পা করে পিছাতে পিছাতে বললো — কিভাবে আবার? তদের রুমের কোনায় কোনায় সিসি ক্যামরা লাগানো ছিলো, কিছু হলে জানতে পারতাম।
,,, তেতে উঠলো দ্বীপ, হাতে থাকা নিজের ফোনটা বিহানের মাথা বরাবর ছুড়ে মারতেই বিহান সেটা ক্যাচ নিয়ে নিলো। ওর কান্ড দেখে দ্বীপ দাতে দাত চেপে বললো– দাড়া বে*য়াদবের বাচ্চা!! কতক্ষন পালিয়ে বাচবি? সামনে পেলে একদম খুন করে দিবো, আমার রুমে সিসি ক্যামেরা সেট করার সাহস দেয় কে? দাড়াতে বললাম না, দাড়া!!
,,,বিহানকে আর পায় কে? বাঘের গুহায় ঢুকে বাঘিনীকে নিয়ে টানাটানি করার মতো ভুল করার পর সেই গুহায় প্রান হারানোর মতো ভুল সে করবেনা। বিহান তাড়াহুড়ো করে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে বললো — আমার কোনো দোষ নেই ভাই,, আমার উদ্দেশ্য সৎ ছিলো। তুই যদি অর্পনাকে না মেনে নিস তাহলে যেনো এগুলো দেখিয়ে তর মন গলাতে পারি। সেজন্যই আরকি, কিন্তু বিশ্বাস কর। তর আর তর বউয়ের একটা ভিডিও আমি দেখিনি, আমি তো এমনি এমনি বললাম।

,,,, বিহান রুম থেকে বেরুতেই দ্বীপ হালকা গলা উচিয়ে বললো–ফুটেজ গুলো আমাকে সেন্ড কর।
,,, দ্বীপের কথা কর্নকূহর হতেই ফিরে এলো বিহান,, দরজার হাতল ধরে ভিতরে উকি দিয়ে বললো — কেনো? ফুটেজ দিয়ে কি করবি? আর দিলেও তার বিনিময়ে আমি কি পাবো?
,,, ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ,, ওয়াসরুমে যেতে যেতে বললো — ক্ষমা!! তকে ক্ষমা করা হবে। এইযে আমার আর আমার বউয়ের প্রাইভেট মোমেন্টের ভিডিও করেছিস তার জন্য তকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ফ্রেস হয়ে এসে যেনো ঠিকঠাক পেয়ে যাই,, না পেলে মেধাকে পরশীর ঘরে পারমানেন্টলি পাঠিয়ে দেবার ব্যাবস্থা করবো।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩০

,,, কথাটা বলেই ওয়াসরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো দ্বীপ। ঠোঁট উল্টালো বিহান,, কথা হচ্ছিলো ওদের ওদের নিয়ে অথচ এর মাঝে তার নিশ্পাপ বউটাকে টেনে আনা হলো। বিহান তার বউটাকে ছাড়া থাকতে পারবে নাকি? ওহুম,একদমি পারবেনা। তার চেয়ে ভালো মানে মানে ফুটেজ গুলো সেন্ড করে দেওয়া নয়তো তাকে আবার বউ ছাড়া থাকতে হবে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩২