Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৩

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৩

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৩
রুপান্জলি

ফোনের বিরক্তিকর শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো অর্পনার। এরকম ভোর রাতে কে কল দিতে পারে সেই ধারনা তার নেই। হয়তো কোনো আর্জেন্ট হতে পারে তাই এমন সময় কল দিয়েছে কেউ। অগত্যা ঘুমঘুম চোখে হালকা করে তাকানোর চেষ্টা করলো অর্পনা কিন্তু ব্যার্থ হলো। এমনিতেই রাতে ঘুম হয়নি,, মাঝরাতের দিকে চোখে লেগেছিলো,, কাচা ঘুম হওয়ায় সহসা চোখ বন্ধ রেখেই বালিশের তলা থেকে ফোন বের করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা গম্ভীর স্বরে গাওয়া গান।

,,, নিশি নির্জনে,, বসে দুজনে,, তুমি আমি খেলবো প্রেমের লাই। তোমার ঐ দে,,
,,,স্টপ!! স্টপ দ্যা লেইম সং।
,,, পরের লাইন গাওয়ার আগেই ঘুম ঘুম কন্ঠে ধমকে উঠলো অর্পনা। সে যানে এর পরের লাইন টুকু খুব খুবি খারাপ মিনিং দাড় করায়, এবার গানটা কে গাইলো, ওপাশে কে আছে সেসব বিবেচনা না করেই ধমকে উঠলো। সাথে সাথে ওপাশ থেকে শুনা গেলো হালকা গম্ভীর হাসির স্বর। অর্পনা যেনো থমকে গেলো,, এরকম হাসির স্বর তার চেনা, এই হাসি সে আগেও শুনেছে,, হয়তো খুব কাছ থেকে শুনেছে তাই অর্পনা দিন দুনিয়ার ধ্যান খয়িয়ে মোহিত হয়ে সেই হাসির স্বর শুনতে লাগলো। তবে সেই মোহ বেশিক্ষণ স্থায়ি হলো না। মোহ কাটিয়ে তা অবাকতার রুপ ধারন করলো যখন ওপাশের ব্যাক্তিটি হাসি থামিয়ে গম্ভীর কন্ঠে ফিসফিস করে বললো — সফ্ট মরনিং মাই লিটল পিয়াশা।
,,, কোনো অচেনা কন্ঠে এরকম অদ্ভুত নাম শুনে ভ্রু কুচকালো অর্পনা, এতোক্ষণ ঘুমের মাঝে কল ধরায় কে কল দিয়েছে তার নম্বর চেক করা হয়নি। এবার কৌতুহল বসত মোবাইলটা সামনে আনতেই স্ক্রিনের নম্বরটি আননোন দেখালো। এবার রাগ হলো অর্পনার, মুগ্ধতা, অবাকতা কাটিয়ে হালকা রাগত স্বরে বললো — কে আপনি? আমাকে এসব উদ্ভট নামে ডাকছেন কেনো আজব?

,,, ওপাশের লোকটি আবারও ফিসফিস করে বললো — ইয়্যুর সু হেন্ডসাম এন্ড পিওর হাসবেন্ড!!
,,, এতোক্ষণ ঘুমের ঘোরে থাকলেও এবার পুরোপুরি সজাগ হলো অর্পনা। ইয়্যুর হাসবেন্ড!! এবার শিউর হলো অর্পনা। সে আগেই ধারনা করতে পেরেছিলো এটা দ্বীপ, প্রথম দিকে ক্যালকুলেসন টা বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে ঠিকি বুঝতে পেরেছে। সে জানতো দ্বীপ মির্জা তাকে কল করবে,, খুজবে, কাছে পাওয়ার চেষ্ঠা করবে,, কিন্তু অর্পনা গলবেনা। সে এতোটাও সস্তা নয় যে চাইলেই ফেলে দেওয়া যায় আবার চাইলেই কুড়িয়ে নেওয়া যায়। ওভাবে ফেলে যাবার পর টানা ১০ দিন একটা খোজ নেয়নি, অথচ এখন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসতেই এসব নাটকিয় ঘটনা শুরু করে দিয়েছে। থাকুক একা,, অর্পনাকে যেমন একা ফেলে চলে যাবার আগে একবারো ভাবেনি, অর্পনাও ভাববেনা। তাই নিজের মাঝে হালকা রাগ জমিয়ে দাতে দাত চেপে বললো— আপনি দ্বীপ মির্জা তাইনা? গতকাল ওই লেইম এস এম এস গুলো আপনারি ছিলো, রাইট? প্রথমেই বুঝেছিলাম। আপনি নাটক করেছেন, আমিও সাথে অংশ নিলাম। একটু ইচ্ছা করেই বোকা বোকা কথা বললাম যেনো আপনি আমাকে আর পাঁচটা মেয়ের মতো বোকা ভাবেন। বাট ইউ নো হোয়াট? অর্পনা ততক্ষন ই বোকা, যতক্ষণ সে সাজতে পছন্দ করে। কিন্তু বলতে হচ্ছে, আপনার ওয়াইফ, আমার হাসবেন্ড খেলাটা কিন্তু দারুন ছিলো। অনেকদিন এন্টারটেইন হইনা, এতো বড়ো এন্টারটেইনমেন্ট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। হোয়াট এভার ,, ওসব চাল আমার কাছে চেলে লাভ নেই,, আমি আপনার কাছে ফিরবোনা। একটা সময় মায়া হয়েছিলো তাই দায়িত্ব নিয়েছি,, এখন সুস্থ হয়েছেন নিজের মতো ফিরে এসেছি। আপাতত এসব হাসবেন্ড ওয়াইফ খেলায় আমি বিরক্ত, তালাক দিবেন কখন সেটা বলুন।

,,, দ্বীপ বরাবরই এই হাফ ফুটের দেমাগে বিরক্ত তার উপর তালাক দেওয়ার কথাটা বলতেই রাগটা যেনো তিরবিরিয়ে উঠলো। সে সকল কোমলতা দূরে সরিয়ে ধমকের স্বরে বললো– এই মেয়ে? ত্যাজ দেখাও? দ্বীপ মির্জাকে ত্যাজ দেখাও? তোমার ত্যাজের ধার ধারি আমি? মুখটা বেশি চলে। বাজারের সবচেয়ে মোটা শুই চিনো? গরুকে ইনজেকশন দেওয়ার কাজে লাগে। সেই শুই দিয়ে মুখ একদম শেলাই করে ফেলবো। আমি দ্বীপ মির্জা, ওকে? সন অফ মাহিদ মির্জা। আমার বংশ সম্পর্কে ধারনা আছে তোমার? আমরা কারোর কথায় চলিনা বরং সবাই আমাদের কথা মতো চলে। আমার ইচ্ছা হলে তোমায় কাছে রাখবো,, ইচ্ছা হলে দূরে সরিয়ে রাখবো,, আবার ইচ্ছা করলে কাছে টানবো তারপর যদি আবারও ছুড়ে ফেলতে ইচ্চা হয় তাহলে আবার ছুড়ে ফেলবো,, এখানে তুমি নাক গলানোর কে? তোমার কাজ হচ্ছে চুপচাপ মেনে নেওয়া,, বেশি ফটর ফটর করলে একদম জ্যান্ত কবর দিয়ে দিবো।
—দ্বীপের অহংকার ভরা কথা গুলো গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলো অর্পনার, সে আবারও দাতে দাত চেপে বললো — কেনো জানতে পারি? কেনো করবেন এসব? আর আমি আপনার এসব কেনো মানবো বলুন তো? আমাকে আপনার সস্তা মনে হয়? রাস্তার মেয়ে আমি? বাবার পরিচয় হীনা জারজ মনে হয়? যে আপনি একবার কাছে টানবেন আবার ছুড়ে ফেলবেন? আর কেউ কিছু বলবেনা? আপনার ভাগ্য ভালো আমার পাপ্পা এখোনো আপনার মুখোমুখি হয়নি। ইউ নো হোয়াট? আমার পাপ্পা একজন ডিটেকটিভ। সে ধনী না হলেও ছোট লোক নয়। আমার পাপ্পা আমায় রাজকন্যার মতো লালন পালন করেছে। সু, আমায় যা তা মনে করা বন্ধ করুন।

,,,অর্পনার কথায় ঠোটনকামরে হাসলো দ্বীপ, বেঙ্গ করে বললো — বাহ!! ডিটেকটিভ বাবার দেমাগি মেয়ে। তো তোমার বাপ তোমায় দেমাগ দেখানো শিখিয়েছে হাসবেন্ডের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা শিখায়নি?
— হে শিখিয়েছে তো। ঠক যোচ্চর, অকৃতজ্ঞদের মুখের উপর কল কেটে দেওয়া শিখিয়েছে। তবে আমি বোধয় আমার বাবার দেওয়া শিক্ষাটা পুরোপুরি গ্রহন করতে পারিনি। তাই এখনো আপনার সাথে অহেতুক বকবক করে যাচ্ছি।
,,, এভাবে মুখে মুখে তর্ক করাটা পছন্দ হচ্ছেনা দ্বীপের। এখন কি এই মেয়ের কথায় তাকে চলতে হবে? সুবিধা অসুবিধা বুঝেনা, শুধু দেমাগ দেখাতে জানে। দ্বীপ নিজেকে সংযত করে গম্ভীর স্বরে বললো — তোমায় আর তোমার এই ত্যাজ আমি পরে দেখে নিচ্ছি। ফজরের আজান দিয়েছে,, আমি আপাতত নামাজে যাচ্ছি,, উঠে নামাজ পড়ো। ইউ নো না? বেনামাজি মেয়েদের আমি পছন্দ করিনা?

,,, দ্বীপের বলা কথাটা কর্নকূহর হতেই একটু নরম হলো অর্পনা, তবুও ঘাড়ত্যারামি করে বললো — আপনার পছন্দ আর অপছন্দের জন্য নামাজ পরবো আমি? হু আর ইউ? আপনি যেমন আমাকে কিছু মনে করেন না তেমনি আমিও আপনাকে কিছু মনে করিনা। আপনার মতো একজন জীবনে না থাকলে অর্পনারা মরে যাবেনা, ওকে? হোয়াট এভার,, মুসলিম রা নামাজ পড়ে আল্লাহ এর সন্তুষ্টির জন্য। আজান দিয়েছে, শুনতে পাইনি। শুনতে পেলে ঠিকি উঠে পরতাম। ডেকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কল দিয়ে থাকলে ধন্যবাদ। এর পর থেকে দিবেন না। আমি নিজেই এলার্ম সেট করে রাখতে পারবো।

,,,দ্বীপ আবারও ঠোট কামরে হেসে ফিসফিস করে বললো — যতই এলার্ম সেট করোনা কেনো উঠতে পারবেনা। সারা রাত আমার জন্য ছটফট করলে ফজরের ওয়াক্তে সজাগ পাবে কি করে? বোকা মেয়ে!!
,,, থতমত খেয়ে গেলো অর্পনা, দ্রুত বিষয়টাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো– মুখ সামলে কথা বলুন,, আপনার জন্য আমার কখোনোই ওসব হয়না ।
,,, দেখা আছে আমার,, ঘন্টা খানিক আগেও তো বালিশ জড়িয়ে কাদতে কাদতে আমায় বকাঝকা করছিলে। মেয়ে তোমায় একবার হাতের কাছে পাই,, সবার আগে তোমার জবানটা বন্ধ করবো আমি। এটা একটু বেশি চলে।
,,,সব সত্যি পাস হয়ে যেতে দেখে চোখ মুখ কুচকে নিলো অর্পনা। এসির মধ্যে থেকেও তার ঘাম হচ্ছে, চোখ মুখ দিয়ে গরম দোয়া বের হচ্ছে। অর্পনা নিজেকে সামলে রাগ দেখিয়ে বললো– দেখুন!!
,,, দেখবো পরে,, এখন দেখলে অজু ভেঙে যাবে। আপাতত নামাজে যাচ্ছি, কোনোভাবে যদি তোমার ফজরের নামাজ মিস গিয়েছে তাহলে তোমার দিন আর আমার রাত। মাইন্ড ইট!!

,,, কথাটা বলেই ওপাশ থেকে কল কেটে দিলো দ্বীপ। কল কাটতেই থম মেরে বসে রইলো অর্পনা।অনেক গুলো দিন পরে লোকটার কন্ঠস্বর শুনতে পেলো সে। এখন মনটায় একটু একটু শান্তি লাগছে। কিন্তু দ্বীপের বলা শেষের কথাটা বুঝলো না অর্পনা, তোমার দিন আমার রাত মানে কি? অর্পনা কি দিনকে দিন বোকা হয়ে যাচ্ছে? মানুষ ঘুড়িয়ে পেচিয়ে কথা বললে সেটার সমাধান চট করে ধরে ফেলতে পারছেনা। এটা ঠিক নয়। ওর উচিৎ সবকিছু বুঝে নেওয়া। একটু ব্রেইনে চাপ দিতেই এই কথার মানে যা দাড়ালো তাতে না চাইতেও লজ্জা পেলো অর্পনা। পরোক্ষনেই দ্বীপের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলা কথাগুলো মনে পরতেই মাথায় রাগ তিরবিরিয়ে উঠলো। আর সে এই লোকের কথা ভাববে না। নিজেকে কি মনে করে? সবাই উনার হাতের পুতুল? বলবে আর নাচবে। নাহ!! সবাই পুতুল হলেও সে পুতুল হবেনা। বিছানা ছেড়ে উটে বসলো অর্পনা। উড়নাটা ভালো মতো গায়ে জড়িয়ে ভেসিনের দিকে চলে গেলো। উঠতে পেরেছে যখন নামাজটা পড়ে নেওয়া উচিৎ।

,,,, মাথায় কারোর নরম হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা,, বাহির থেকে অনেক্ষন যাবত সোনালী রৌদ্রের আভা এসে মুখের উপর ঝাপটা দিচ্ছিলো যার ফলে অনেক আগেই ঘুম হালকা হয়ে গিয়েছিলো।চোখ মেলার পর পাশে ইরাকে বসে থাকতে দেখে হালকা চমকালো অর্পনা। যদিও গতকাল সে নিজেই ওদেরকে আদ্রিয়ানের ফ্লাটে থাকার কথা জানিয়েছিলো। সেজন্যই বোদয় সবাই একসাথে ছুটে এসেছে। উঠে বসলো অর্পনা, দরজার দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে কৌতুহলি চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো — বাকিরা আসেনি?
ইরা মুচকি হেসে সায় জানিয়ে বললো — এসেছে, আদ্রিয়ান স্যারের সাথে বসার ঘরে বসে আছে। আমরা সবাই একসাথে আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু উনি আসতে দিলেন না। বললেন,, তর শরীর খারাপ, তকে হুট করে জাগিয়ে দিলে তুই বিচলিত হয়ে পরবি। তাই আরকি!!

,,, অর্পনা বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো,,বিছানা ঠিক ঠাক করে ব্লাঙ্কেট টা ভাজ করতে নিতেই কেউ সেটা টেনে নিলো। ব্যাক্তিটির দিকে চোখ পরতেই দেখলো আদ্রিয়ান সেটা নিতে চাচ্ছে। অর্পনা ইশারায় কি হয়েছে জানতে চাইলে আদ্রিয়ান হাস্যজ্জল মুখে বললো — তুমি সরো, আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।
,,, অর্পনা কিছু বললো না, নিজের মতো ব্লাঙ্কেট টা টেনে গোছাতে লাগলো। আদ্রিয়ানের পিছু পিছু ইতিমধ্যে বাকিরাও এসে হাজির। অর্পনা যতটুকু গুছিয়েছিলো তার সবটা পন্ডল করে পল্লব এক লাফে বিছানার মাঝখানে বসে পরলো। বিরক্ত হলো অর্পনা, ব্লাঙ্কেট ভাজ করতে করতে বললো — তরা সবাই এখানে কি করছিস? ভার্সিটি নেই?
,,, আসতেই পারি, তর নিজের বাড়িতে তো কখনোই ডাকিসনি আবার শ্বশুর,, বলতে গিয়ে থেমে গেলো পল্লব। শ্বশুর বাড়ির কথা উঠতেই ফুসে উঠলো অরুন, দাতে দাত চেপে বললো — হাজার বার নিষেধ করেছিলাম ঐ দ্বীপ মির্জাকে বিয়ে না করতে। কিন্তু কে শুনে কার কথা? তর তো রগে রগে ঘাড় ত্যারামি। এতো সেবা যত্ন করে কি লাভ হলো? তর এক আকাশ সমান ভালোবাসা মাটিতে ছুড়ে ফলেছে। বিশ্বাস কর, ঐ দ্বীপ মির্জাকে আমি দেখে নিবো। আমাদের কলিজায় হাত দেওয়া।

,,, অরুনের কথায় রাত্রি মন খারাপ করে বললো– আমি কখনো ভাবতে পারিনি দ্বীপ ভাই এমন কিছু করবে। উনাকে যথেষ্ট ভরসা করতাম আমি।
,,,রাত্রির কথায় রাগ বাড়লো অরুনের,, সে দাতে দাত চেপে বললো– হুম তর কথায় ই সব হয়েছে, সবার আগে বিহান ভাইয়ার কথায় তুই শায় দিয়েছিস। তর কথাতেই অর্পনা সেদিন এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
,,, রাত্রি অবাক চোখে অরুনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো– এখন সব দোষ আমার?
,,, তাই তো দেখতে পাচ্ছি।

,,, অরুনের রিপিট কথায় চোখ ছলছল করে উঠলো রাত্রির,, এখন সব দোষ তার হলো? সে তো আবেগি মানুষ। পাগল বেশে থাকা দ্বীপ ভাইয়াকে দেখে খুব মায়া হয়েছিলো তাই অর্পনাকে রাজি হতে বলেছিলো। কিন্তু অর্পনা তো মানুষের কথা শুনে কাজ করার মেয়ে না। সে নিজের ইচ্চায় ই তো বিয়েটা করেছিলো। এখন সবাই তাকে অপরাধী ভাবছে। রাত্রির ছলছল করা চোখ নজরে পরতেই থমকে গেলো অরুন। সে কাকে কি বলতে গেলো? এখন আবার রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। ওফ্ফ!! তার মাথাটাও দিনকে দিন বিগরে যাচ্ছে। নয়তো কেউ ষাঁড়ের সামনে লাল কাপর দেখিয়ে নাচানাচি করতে যায়। অরুণ এগিয়ে গিয়ে রাত্রির হাত ধরতে নিলে সে ছিটকে দূরে সরে গেলো। সাথে সাথে চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়ালো। ওদের ড্রামাটিক কান্ড দেখে না চাইতেও ঠোঁট টিপে হেসে দিলো অর্পনা,, ওকে হাসতে দেখে আদ্রিয়ান ও হাসলো। আর আদ্রিয়ানের ঠোঁট হাসি দেখে ইরা কাতর হয়ে চেয়ে রইলো। এই পুরুষটাকে সে কোনোদিন পাবেনা। তার ভালোবাসায় বাধার উপর বাধা পরে আছে। ধর্মের বেড়াজাল ফেলে আসা এতোটাও সহজ না। অরুন আবারও রাত্রির দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতে চাইলো। এবারেও সরে গেলো রাত্রি। ওদের এসব নাটক দেখে সবার হাসি পেলেও পল্লবের পেলোনা। সে বেড থেকে উঠে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে হামি দিতে দিতে বললো — স্যার!! আপনার ডাইনিং স্পেসে কোনো বাথরুম নেই? আসলে এখানকার নাটক দেখতে দেখতে আমার হা** পেয়ে গিয়েছে। এই মুহুর্তে হা**তে না পারলে শান্তি পাবোনা।

,,, আদ্রিয়ানের উত্তরের আশা করলো না পল্লব । সে সত্যি সত্যি রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। এদিকে ওর মুখে এরকম আঞ্চলিক ভাষায় হা** শব্দ শুনে উপস্থিত সবাই হেসে দিলো। এর মধ্যে কান্না করতে থাকা রাত্রিও বাদ যায়নি। এই বিষয়টা সহ্য হলোনা অরুনের,, রাত কেনো পল্লবের কথায় হাসবে? হাসার হলে তার কথায় হাসবে নয়তো হাসার দরকার নেই
,,, পল্লব ডাইনিং স্পেচে আসতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। ওদিকে সবাই আড্ডা দিচ্ছে তাই নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই একজন রমনীর দেখা পেলো,, পরনে লাক্স কালারের সুতি থ্রি পিস, সাজসজ্জা বড্ড সাদামাটা, চেহারাটা বড্ড মায়াবী তবে গায়ের রং শ্যামলা। পল্লব মৃধু হেসে সুধালো– কাকে চাই?
,,, সামনে একটা অচেনা যুবককে দেখে ভ্রু কুচকালো সিমি,, ছেলেটাকে দেখতে অনেকটাই বাচ্চা বাচ্চা ঠেকছে। ভাবলো হয়তো সম্পর্কে আদ্রিয়ানের ভাই হবে তাই মুচকি হেসে বললো — এটা আদ্রিয়ান ভাইয়ার ফ্লাট না?
,,, পল্লব মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো, সিমি বললো — অর্পনার সাথে দেখা করতে এসেছি,, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?

,,, পল্লব ভিতরে আসতে বলে সরে দাড়ালো,, শব্দের উৎস খুজে অর্পনার রুমে পৌছালো সিমি। ঘরের ভিতর অনেক মানুষের আনাগোনা দেখতে পেয়ে একটু নার্বাস হলো সে। যদিও সবকয়টা তার চার বছরের জুনিয়র। কথা বলার ফাকে সিমির দিকে নজর পরলো অর্পনার,, সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সিমির হাত টেনে নরম স্বরে বললো — সিমিপু!! কেমন আছো তুমি? আসো বসবে চলো।
,,, অর্পনার সৌজন্যতা দেখে বিগলিত হলো সিমি, গালে গলায় হাত ঠেকিয়ে বললো — নাগো, বসবোনা। মাত্রই নাইট ডিউটি শেষ করে ফিরলাম। ভাবলাম রুমে যাবার পথে তোমায় একবার দেখে যাই। জ্বর তো নেই দেখছি,, রেগুলার ঔষধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।
,,,অর্পনা মুচকি হেসে বললো — চিন্তা করোনা আপু,, ওসব অসুস্থতা আমাকে টলাতে পারেনা।
,,, ওদের কথা বলার মাঝে আদ্রিয়ান বললো — সিমি!! বসো। আমি সবার জন্য কফি বানিয়ে আনছি।
,,,, আদ্রিয়ানের কথায় বাধ সাধলো ইরা,, উঠে দাড়িয়ে আদ্রিয়ানের উদ্দেশ্য বললো — আপনি থাকুন আমি বানিয়ে আবছি,, এটুকু বলে দিন কোথায় কি রাখা আছে।
,,,আদ্রিয়ান প্রথমে রাজি হলোনা, তার বাড়িতে অতিথি এসে নিজেরা কফি বানিয়ে খাবে বিষয়টা খারাপ দেখায়। কিন্তু ইরা মানলো না, অগত্যা আদ্রিয়ান ওকে সবটা বলে দিতেই ইরা রান্না ঘরে চলে গেলো। ইরার সাথে রাত্রি ও গেলো,, যদিও যাবার আগে অরুণের দিকে অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে গিয়েছে।

,,,, সারাদিন সবার সাথে সময়টা ভালো কাটলেও সন্ধায় যে যার মতো বাড়ি চলে গিয়েছে। বর্তমান সময়টা সারে ৮ টার ঘরে,, এই সময় টুকু বড্ড যন্ত্রণা দায়ক। এই সময়েই তো প্রতিদিন একটা বনমানুষের মুখে খাবার তুলে দিতো অর্পনা। তার ছোট ছোটা হাতের সেই ছোট ছোট লোকমায় কখনো অভিযোগ করেননি তিনি বরং তৃপ্তির সাথে গলদকরন করেছেন। আজ সব পাল্টে গিয়েছে। সেই সরল সাদাসিধে দ্বীপ মির্জা এখন অহংকারিতে পরিনত হয়েছে। ওকে তো মানুষ ই মনে করেনা। এমন ভাবে সকালে কথা বললো যেনো সে কোনো বাজারের পন্য। কিনে এনেছে এবার যেভাবে খুশি ব্যাবহার করবেন। অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝেই হাত থেকে বইটা টেনে নিলো কেউ। ধ্যন চুত্ত হয়ে সামনে তাকাতেই আদ্রিয়ানকে দেখতে পেলো। ওকে দেখে অর্পনা মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলো — কিছু বলবেন?

,,, কি করছিলে?
,,, বই পড়ছিলাম।
,,, আদ্রিয়ান বুকে হাত ভাজ করে মজার স্বরে বললো– মানুষ বই উল্টো করে পড়তে পারে জানা ছিলো না। এটা বোধহয় তোমার দ্বারাই পসিবল। হোয়াট এভার, তোমার জন্য একটা অফার আছে, আশা করি তোমার পছন্দ হবে।
,,, কিরকম অফার? ( ভ্রু কুচকে)
,,, আদ্রিয়ান উৎসায়িত কন্ঠে বললো — বাইক রাইড করবে জানেম? একদম আগের মতো, যদিও ওটা ঝগড়া কিংবা ইগনোর থেকে হতো। এবারের টা কম্পিটিশন,, তাও বাজি ধরে। তুমি জিতলে আমার এটি এম কার্ড একদিনের জন্য তোমার। আর আমি জিতলে তোমার এটিএম কার্ড একদিনের জন্য আমার। রাজি?
,,,অফারটা মন্দ না বাট আমার বাইক তো পাপ্পার ফ্লাটের পার্কিং লটে। এই মুহুর্তে,,
,,, নো প্রবলেম, আমার তিনটে থেকে যেকোনো একটা চুজ করতে পারো।
,,, আপনার বাইক?
,,, এনি প্রবলেম?

,,, ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো অর্পনা, তাচ্ছিল্য স্বরে বললো– কাইসারদের দামি বাইক অর্পনার পোষাবেনা। বাই দ্যা ওয়ে,, আমি অরুন কিংবা পল্লবকে কল দিচ্ছি। একটু ওয়েট করুন তাহলে,, ১০ টার দিকে বের হবো।
,,, আদ্রিয়ান আর কিছু বলতে পারলো না, বলতে চাইলো ও না। এখন কথা বাড়ালে হয়তো অর্পনা রাগ করবে কিংবা মন খারাপ করবে। কিন্তু সে তো অর্পনাকে খুশি রাখতে চায়,, একটু ভালো রাখতে চায়। তাই চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো। অর্পনানার যা মর্জি হবে তাই করবে সে।

,,,বসুন্ধরার ৩০০ ফিট রাস্তার দুপ্রান্ত ধরে দুটো বাইক ছুটে চলেছে,, বাইকের গতি এতোটাই তীব্র ছিলো যে বাতাসের তোপে গায়ের ব্লাক শার্ট টা ধপ ধপ করে শব্দ তুলছে ক্রমাগত। অর্পনা আর আদ্রিয়ান দুজনেই রাইড ড্রেস পড়ে বেড়িয়েছে,, গায়ে ব্লাক শার্ট, পেন্ট, হাতে গ্লাব্স, পায়ে রাইডিং স্যুস, মাথায় হেলমেট। দুটো বাইক যখন একি নিয়মে চলছিলো তখনি স্পিড বাড়িয়ে দিলো অর্পনা। ছুটতে লাগলো নিজের নিয়মে। বাইক রাইড করার সময় অর্পনা এতোটাই স্পিড রাখে যে রাস্তা ও স্পষ্ট ভাবে চোখে ধরা দেয়না। এক প্রকার চোখ বন্ধ করে রাইড করা যাকে বলে। এমতাবস্থায় কোনো ভাবে যদি বাইক সামান্য ইটের সাথে ঘর্ষণ হয় তাহলে বাইক ছিটকে, কম করে হলেও ১৫০ হাত দূরে গিয়ে পরবে। আর এই রিস্ক নেওয়াটা খুব ইন্জয় করে অর্পনা। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে ফিরে আসার মাঝে একটা আনন্দ পাওয়া যায় যাকে অনাবীল সুখ বললেও ভুল হবেনা। অরপনার বাইকটি যখন পূর্বাচল মেইন টাউন ক্রস করে নির্জন জায়গায় পোছালো হঠাৎ করেই বাইক গর গর শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেলো। চরম আশ্চর্য হলো অর্পনা, আসার আগেও বাইকটা সম্পূর্ণ চেক করে এসেছে অথচ ৫-৬ কিলোমিটার পথ পারি দিতেই বন্ধ হয়ে গেলো। অর্পনা বাইকের পেটের মোটা অংশে ঘুষি বসিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে খুজতে লাগলো। কিছু সময় পার হতেই খুব জোরে একটা বাইক এসে অর্পনার পাশাপাশি থামলো । আদ্রিয়ানকে দেখতে পেয়ে বাইক থেকে নেমে পরলো অর্পনা। মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে বাইক চেক করতেই বুঝতে পারলো পিছনের চাকার হাওয়া চলে গিয়েছে। অর্পনা ঝুকে বাইকের চাকাটা পরিক্ষা করতে নিবে তখনি একটা শক্তপোক্ত হাত ওর কোমর পেচিয়ে ধরলো আর সেকেন্ডের বিনিময়ে বাইকের উপর বসিয়ে দিলো। বিষয়টা এতো দ্রুত ঘটেছে যে অর্পনা কি রিয়্যাকশন দিবে ভেবে পাচ্ছেনা। কিন্তু কিছু সময় পেরুতেই যখন নিজেকে আদ্রিয়ানের বাইকের সামনে টের পেলো ফুসে উঠলো অর্পনা। আদ্রিয়ানের শার্টের কলার খামচে ধরে উগ্র কন্ঠে বললো — হাও ডেয়ার ইউ আদ্রিয়ান? আমাকে ছোয়ার মতো অপরাধ করার আগে একশো বার ভাবা উচিৎ ছিলো তুই কার গায়ে হাত দিতে যাচ্ছিস। বাস্টার্ড!! আমার কোমর থেকে হাত সরা নয়তো একদম খুন করে ফেলবো।

,,,কথাটা বলে কলার ছেড়ে কোমর থেকে হাত সরাতে চাইলে আরও শক্ত করে টেনে নিলো আদ্রিয়ান। টান টা এতোটাই জোরে ছিলো যে অর্পনা আদ্রিয়ানের বুকে হুমরি খেয়ে পরলো। আরও রেগে গেলো অর্পনা দাতে দাত চেপে কিছু বলতে নিলে ওপাশ থেকে নরম স্বরে ডাকলো — ভেলোরা!!!
,,,, ডাক শুনে থমকে গেলো অর্পনা। থমকে যাওয়ার সাথে সাথে শ্বাস প্রশ্বাস ও আটকে গিয়েছে। এমন কিছু সে আশা করেনি,, একদমি না। হঠাৎই পিঠে শক্ত পোক্ত হাতের আভাস পেলো। দ্বীপ অর্পনার পিঠে আলতো মাসাজ করে নরম স্বরে বললো — নিশ্বাস নাও,, দম আটকে যাবে তো।
,,,লম্বা করে শ্বাস টানলো অর্পনা,, অস্ফুট স্বরে আওড়ালো — দ্বীপ!!
,,,, দ্বীপ অর্পনাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এক হাতে মুখের উপর থেকে হেলমেট টা খুলে চুলের ভাজে হাত গলিয়ে শারা দিলো— বলো ভেলোরা,, শুনছি।
,,, এহেন স্পর্শে এলোমেলো হয়ে গেলো অর্পনা,, শক্ত ঢোক গিলে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু সেই অবাকতা বেশিক্ষণ স্থায়ি হলো না। সকালে বলা দ্বীপের কথা গুলো মনে হতেই মাথায় রাগ চাপলো। সে কোনো দূর্বল মানবী নয় যে, কেউ আলতো করো ছুয়ে দিলেই মোমের মতো গলে গিয়ে কান্না কাটি করে বুকে ঝাপিয়ে পরবে। অগত্যা দ্বীপের থেকে সরে যেতে চাইলো, বিষয়টা বুঝে আসতেই ধমকে উঠলো দ্বীপ — এই মেয়ে!! এতো নড়াচড়া করো কেনো? মার খাবা?

,,, অর্পনা সেসব ধমকে পাত্তা দিলোনা বরং ত্যাজ দেখিয়ে বললো– ছাড়ুন আমায়,, সাহস হয় কি করে আমাকে ছোয়ার? আপনি এখানে কি করছেন? আমার সাথে তো আদ্রিয়ান এসেছে। আদ্রিয়ান কোথায়?এন্সার দিন, কি করেছেন উনাকে?
,,, অর্পনার মুখে আদ্রিয়ানের নাম শুনে তেতে উঠলো দ্বীপ,, অর্পনার মুখ চেপে ধরে বলো– আদ্রিয়ান? ঐ ছেলে তর বন্ধু হয়? তর সমবয়সী? নাম নিয়ে কথা বলিস কেনো? থাপরে একদম গাল ফাটিয়ে দিবো। ভালোবাসা দেখাও আমাকে? ভালোবাসা? আর একবার যদি ঐ ছেলেকে নাম ধরে ডাকতে দেখেছি তাহলে মাটির নিচে জেন্ত পুতে ফেলবো। বেয়াদবের বাচ্চা।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩২

,,, ঘারত্যারা অর্পনা আরও ত্যারামি করে বললো– বেশ করেছি বলেছি,, আরও বলবো। আপনার কি? বলুন, কি এসে যায় আপনার? আমি তো উনার ফ্লাটে থাকি ইভেন উনার রুমেও,,
,,, আরও শক্ত করে মুখ চেপে ধরলো দ্বীপ, শাসিয়ে বললো– মিথ্যা বললে মুখ ভেঙে দিবো। কি ভাবিস? তুই কি করিস, কার বাড়িতে থাকিস তার কিছুই আমি জানিনা? বিয়ে করেছি, বউ বানিয়েছি আর বউ কোথায় কি করে খবর রাখিনা?
,,, রাখেন বুঝি? ভালো তো। আমি একটা ছেলের সাথে রাতে একই বাড়িতে থাকি বিষয়টা নিশ্চয়ই আপনার খুব ভালো লাগে? আমারো লাগে

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৩ (২)