প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪১
রোজ ও রুশা
এক সারিতে সাঁই সাঁই শব্দ তুলে ছুটে চলেছে চারটা বাইক। রাতের আধো অন্ধকার রাস্তা কাঁপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। হেডলাইটের আলো কুয়াশা ভেদ করে সামনে ছুটছে, আর প্রতিটা বাইকের চালকের মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। কারো মুখে হাসি নেই, কারো চোখে স্বস্তি নেই। যেন সবাই একই আতঙ্ক বুকে নিয়ে ছুটছে—রোজের জন্য।
অন্যদিকে—
বিকেল থেকে একটানা বকবক করেই যাচ্ছে রোজের মামি।
“ বাপ মায়ের লগে তোরও মরন হইতে পারতো। তুই বের হ আমার ঘর থেইকা। আমার মাইয়ার জামাই আইবো, তোরে দেখলে আবার তারা চইলা যাইবো।
রোজ মাথা নিচু করে সব শুনছিল। সকাল থেকে একা হাতে রান্না করেছে, ঘর গুছিয়েছে। একবারও “না” বলে নি। কিন্তু তবুও তার জন্য একটুও শান্তি নেই।
কারণ এই বাড়িতে সে মানুষ না, বোঝা।
মামাতো বোনের জামাই আসবে বলেই আজ আবার তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। লোকটার নোংরা দৃষ্টি রোজ অনেক আগেই বুঝেছিল। একদিন সুযোগ পেয়ে ওড়না টান দিতেই কষে থাপ্পড় মেরেছিল রোজ। তারপর থেকেই লোকটা নানা ভাবে অপমান করতে থাকে। অথচ সেই কথা নিজের বোনকে বলার পর উল্টো দোষী হয়েছিল রোজ নিজেই। এ বাড়িতে সত্যি বললেও অপরাধ হয়।
মামা কাছে থাকলে হয়তো এমন হতো না। মানুষটা অন্তত রোজকে “মানুষ” মনে করেন । কিন্তু তার চাকরির স্থান বদলি হবার পর এই বাড়িটা যেন ধীরে ধীরে নরকে বদলে গেছে।
রোজ চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না গলায় আটকে দিচ্ছে কথা। তার মনে পড়ে যায় সৃজনের কথা।
– ভালোবাসার নামে যে ছেলেটা একসময় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে করাতো, সেই আজ সবচেয়ে দূরের মানুষ । অথচ আশ্চর্য—মানুষ অভাব, অপমান, মারধর সব সহ্য করতে পারে কিন্তু ভালোবাসার মানুষের অবহেলা সহ্য করতে পারে না। ছলনা মেনে নিতে পারে না। সেই কষ্ট কলিজা ছিঁড়ে দেয়।
রোজ আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে—
“ তোমার ফুল ভালো নেই জান…”
হয়তো সৃজন শুনতে পাচ্ছে না। অথবা পৃথিবীর কোথাও বসে তার বুকের ভিতরও হুহু করে উঠছে তার ফুলের জন্য ।
কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মরে না। দূরে গেলেও কোথাও না কোথাও ব্যথা ঠিকই লাগে।
হঠাৎ করেই মামি এসে রোজের হাত শক্ত করে টেনে ধরে।
“ এই হতচ্ছাড়ি! বের হ কইতাছি! আমার মাইয়া-জামাই আইসা পরবো এখন!
বলেই দরজার বাইরে ঠেলে বের করে দেয়।
রাতের বাতাসে ঝড়ের আবাস । চারপাশে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
রোজ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করে। গন্তব্য—তার বাবা মায়ের কবর।
মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা।
নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানের পাশেই ছোট্ট টিনের ঘর বিন্দু মাসির। নিঃসন্তান হিন্দু মহিলা। কিন্তু পৃথিবীতে যদি কেউ সত্যি নিঃস্বার্থভাবে রোজকে ভালোবেসে থাকে, তবে সে এই বিন্দু মাসি।
রোজকে ছোটবেলা থেকে দেখছে।
মেয়েটার না বলা কান্নাগুলোও বুঝে যায়।
ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে। রোজ দরজার সামনে দাঁড়াতেই বিন্দু মাসি চমকে তাকায়।
“ কিরে গোলাপ! তুই আইছস? এই রাইতে?
রোজ কিছু বলে না। চোখের পানি চুপচাপ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। বিন্দু মাসির বুক মোচড় দিয়ে ওঠে।
“ আবার ওই মহিলা কিছু কইছে তরে?
রোজ এবারও চুপ।
মাসি বুঝে যায়—আজ মেয়েটার মন ভালো না।
সে ধীরে ধীরে রোজকে টেনে নিজের কোলে শুইয়ে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে—
“ কি হইছেরে গোলাপ? মায়ের কথা মনে পরতাছে?
এই একটা প্রশ্নেই যেন ভেঙে পড়ে রোজ।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে—
“ বিন্দু মাসি… আমার কপালটা এত খারাপ কেন? একটা মানুষও কেন রইলো না আমার জন্য? আমার খুব ইচ্ছে করে কেউ আমারে খুব যত্ন করুক। আমরে না দেখলে কারো দম বন্ধ হইয়া আসুক। একটা ভাই থাকুক, একটা বোন থাকুক… একটা মানুষ থাকুক যে আমারে পাগলের মতো ভালোবাসবো…”
কথাগুলো বলতে বলতে বুক কেঁপে ওঠে তার।
“ জানো মাসি… ঢাকায় যাওয়ার পর কিছু মানুষ পাইছি। ওরা আমার জীবনটার অংশ হয়ে গেছে…।
বিন্দু মাসি হালকা হাসে।
“ তাইলে তো ভালো কথা গোলাপ। তুই কান্দস ক্যান? ওরা তরে ভালোবাসে না?
রোজ চোখ মুছে মাথা নাড়ে।
“ ভালোবাসে… অনেক ভালোবাসে…”
“ তাইলে এত কষ্ট ক্যান তোর?
রোজ ফুঁপিয়ে উঠে।
“ জানি না মাসি… কিন্তু খুব কষ্ট হয়। খুব। আমার বাবা মায়ের কাছে যাইতে ইচ্ছে করে…।
বিন্দু মাসি ভয় পেয়ে যায়।
“ আবার উল্টাপাল্টা কইতাছোস গোলাপ । আজকেও কি মাইর দিছে তরে? সত্যি কইরা ক দেহি?
বলেই রোজের হাত-পা দেখতে যায়।
রোজ কাঁদতে কাঁদতেই বলে—
“ দাগ শরীরে না মাসি… দাগ মনে লাগছে। আমি মরে যাইতেছি ভিতর থেইকা। কেন আমার ভালোবাসার মানুষরা দূরে সইরা যায়?
এই বলে হুহু করে কেঁদে উঠে সে।
তারপর আচমকা উঠে দৌড়ে বের হয়ে যায় কবরস্থানের দিকে। বিন্দু মাসি পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখও ভিজে ওঠে।
“প্রভু… এতো সুন্দর মনের মাইয়াডার কপালে এত কষ্ট ক্যান লিখলা? ওরে একটু সুখ দাও…।
বলতে বলতেই দরজার দিকে এগোয়।
কিন্তু দরজার সামনে কয়েকটা ছায়া দেখে থমকে যায়।
চার-পাঁচটা ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে হেলমেট। চোখেমুখে আতঙ্ক।
বিন্দু মাসি টর্চের আলো ফেলতেই দেখতে পায়— তাদের, প্রথমে ভরকে যায়। কিন্তু পোশাক আশাক দেইখে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে সবাই ভদ্র ঘরের সন্তান। কিন্তু প্রত্যেকের চোখ লাল।
যেন তারা অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে।
বিন্দু মাসি ধীরে বলে—
“কে তোমরা বাবা?
হেরা এগিয়ে আসে।
চোখ মুছে শান্ত গলায় বলে—
“ আমরা … রোজের বন্ধুমহল।
বিন্দু মাসি মলিন মুখে হেসে বলে—
“ আহো বাবা, ঘরে আহো। আমি গোলাপরে ডাকি…।
হেরা ধীরে মাথা নাড়ে।
“ না মাসি… ডাকতে হবে না। আমরা সব শুনছি।
কথাটা শুনে বিন্দু মাসি চুপ হয়ে যায়।
” তা তোমরা এতো রাইতে ঢাকা থেইকা আইছো?
” হ্যাঁ।
তারপর একে একে সব সত্যি বেরিয়ে আসে।
বিন্দু মাসি আর লুকিয়ে রাখতে পারেন না কিছুই। কাঁপা গলায় তিনি খুলে বলেন রোজের জীবনের প্রতিটা কষ্টের কথা—কীভাবে ছোটবেলা থেকে তার মামি তাকে কাজের মেয়ের মতো ব্যবহার করেছে। কীভাবে রোজের মা মারা যাওয়ার পর তার সমস্ত সম্পত্তি কৌশলে নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে।
বিন্দু মাসি নিচের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–
‘ মেয়েটি শুধু যেন ওর পড়া-লেখায় বাধা না দেয় এতোটুকু চাইছিলো । বিনিময়ে সম্পত্তি সব দিয়া দিছিলো।
কথাটা শেষ করতেই তার গলা ভেঙে যায়।
ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
হেরা, রুশা, ঝিনুক—সবাই চোখ মুছতে থাকে।
কারো কল্পনাতেও ছিল না, হাসিখুশি মুখের আড়ালে রোজ এতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখেছিল।
মেয়েটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেতর থেকে মরে যাচ্ছিল। অথচ কেউ বুঝতেই পারেনি।
সৃজন নিঃশব্দে চোখের কোণের পানি মুছে নেয়।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মোচড় দিয়ে উঠছে।
কোনো কথা না বলে সে কবরস্থানের দিকে হাঁটা দেয়।
রোজ তার বাবা-মায়ের কবর আঁকড়ে ধরে কাঁদছে।
মাটির উপর মাথা রেখে অসহায়ের মতো বলতে থাকে–
“ কেন আমায় একা করে চলে গেলে তোমরা…। আমায়ও নিয়ে যাও তোমাদের কাছে… আমি আর পারছি না… এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না… তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো না…।
তার কান্নার শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
“ আমি কীভাবে ভুলে থাকবো আমার ভালোবাসাকে…? কিভাবে…?
সৃজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার বুকের ভেতরটা জ্বলছিল আগুনের মতো।
হঠাৎ সে এগিয়ে এসে রোজকে টেনে দাঁড় করায়।
পরের মুহূর্তেই—
ঠাস!
একটা চড় বসে রোজের গালে।
রোজ চমকে ওঠে। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে সৃজনের দিকে। ছেলেটার চোখ রক্তের মতো লাল।
চিরচেনা হাসিখুশি, হ্যান্ডসাম মুখটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। দেখাচ্ছে বিধ্বস্ত… ক্লান্ত… ভাঙা একজন মানুষ।
রোজ ভয়ে কেঁপে উঠে। নিচের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।
সৃজন দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে—
“ আমায় ভুল বুঝার শাস্তি তোকে পেতেই হবে, ফুল…।
কথাটা বলেই আচমকা রোজকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয় সে। এত শক্ত করে… যেন ছেড়ে দিলেই মেয়েটা হারিয়ে যাবে।
রোজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৃজন তাকে ছেড়ে দেয়।
তারপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে চলে যায়।
হেরা, রুশা আর ঝিনুক দৌড়ে রোজের কাছে যায়।
আর অন্যদিকে সৃজন, নাভান আর অধীর বের হয় আরেকটা হিসাব মেটাতে। রোজদের বাড়ির ভেতর তখন অন্য দৃশ্য।
রোজের মামিকে চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। মামাতো বোনকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে কান ধরে রাখা হয়েছে। আর সেই তথাকথিত জামাইকে মুরগি বানিয়ে হাত আর হাঁটু একসাথে বেঁধে ফেলা হয়েছে।
লোকটার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে একটু পরেই কেঁদে দিবে।
মামি চিৎকার করে উঠল—
“এই গুন্ডারা ! আমাগো ছাড়! আমার মাইয়ারে ছাড় কইতাছি! আমরা কি করছি তোদের?
নাভান ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে বসে।
চোখদুটো ভয়ংকর শান্ত। এই শান্ত চাহনিই বেশি ভয়ংকর। সে নিচু গলায় বলে—
“ নিজের মেয়েকে মেয়ে মনে হয় … আর অন্যের মেয়ে কিছু না… তাই না?
মামির মুখ শুকিয়ে যায়।
নাভান আবার বলে—
“ একটা এতিম মেয়ের জীবন নষ্ট করতে একটুও হাত কাঁপলো না আপনাদের?
এদিকে সৃজনের রাগ তখন মাথার উপর।
সে নিচে পড়ে থাকা জামাইটার কলার চেপে ধরে উপর দিকে টেনে তোলে।
“ আমার ফুলের দিকে ওই নোংরা চোখে তাকাইছিস তুই…?
একটা ঘুষি। লোকটার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয়ে আসে।
সৃজন থামে না। আরেকটা…আরেকটা…।
অধীর পাশ থেকে জুতা খুলতে খুলতে বলে ওঠে—
“ ভাই সর! এই সালারে জুতা দিয়া আপ্যায়ন করি!
তারপর জামাইটার গালে ঠাস ঠাস করে জুতা মারতে থাকে।
“ আমার ভাবি বনুরে খারাপ নজরে দেখছোস? তোরে তো লাল পিপড়ার কামড় খাওয়ানো উচিত !
লোকটা কাদো কাদো কন্ঠে মাফ চাইতে থাকে।
ওদিকে অধীর এবার রোজের মামাতো বোনের সামনে দাঁড়ায়।
“ কি রে? অনেক শখ ফুল বনু ভাবিকে অপমান করা।
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“ ভাই ভুল হইছে…।
অধীর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে—
“ চুপ! আর একটা কথা বললে কান ধরে উঠবস করামু ১ হাজার বার!
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে উঠবস শুরু করে।
মামি এবার ভয় পেয়ে নাভানের দিকে তাকিয়ে কাদো কাদো সুরে বলতে থাকে —
“ বাবা ভুল হইছে… আমাগো ছাড়ো…।
নাভান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চেহারায় কোনো মায়া নেই।
“এদের সবগুলার নামে মামলা দিবি ।
নাভান ঠান্ডা গলায় বলে চলে—
“এমন মামলা দিবি … দশ বছরেও জেল থেকে যেন বের হতে না পারে গট ইট!
কথাটা শুনে মামির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
রাগে কটমট চোখে তাকায় মামি। হাই হোতাশ করে বলে আবার–
“ ঢাকায় গিয়া গুন্ডাগো সাথে চলাফেরা করে ওই মাইয়া! এখন আবার আমার বাড়িতে হামলা দিছে। এই ছিলো এই মাইয়ার মনে!
সৃজন এবার ক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
সে সামনে এগিয়ে এসে দেয়ালে জোরে ঘুষি মারে।
“রোজের নাম আর একবার মুখে নিলে… জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!
তার ভয়ংকর কণ্ঠে পুরো ঘর কেঁপে ওঠে।
নাভান সৃজনের কাঁধে হাত রাখে।
কারণ সে জানে— এই মুহূর্তে সৃজনকে না থামালে, আজ সত্যিই ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে।
রোজ বাসায় এসে দেখে এই অবস্থা। ছুটে নাভান এর সামনে যায়। রোজ কে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে মামি। সাথে আরো মেয়েদের দেখে সাহস একটু বাড়ে।
মামি আবার তেজি কন্ঠে বলল—
” এই মাইয়ার চরিত্র এতো খারাপ হইছে! বেটাগো লগে ঘুরে বেড়ায়। ছি ছি… মানুষরে মুখ দেখামু কেমনে! আমার খাইয়া আমার পইরা আমার পিঠে ছুড়ি। জোনাকির বাপ গো! দেহ দেহ তোমার আদরের বাগনী বেটা ছেলে গো বন্ধু বানাইয়া আমাগো সম্মান নষ্ট করতে আইছে।
– কথাটা বলেই সে এমনভাবে মুখ কুঁচকালো যেন রোজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছে ছেলে বন্ধু বানিয়ে!
মামির হাতের বাধন খুলে দিয়ে।
রোজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে পানি টলমল করছে। এত মানুষের সামনে এভাবে অপমানিত হতে হতে মেয়েটা যেন ভেতর থেকে শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু এবার নাভানের ধৈর্য শেষ। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। চোখদুটো ভয়ংকর ঠান্ডা। ঠোঁট শক্ত করে চেপে বলল—
” একটা বাজে কথা আর বলবেন না। অনেক সহ্য করেছি। রোজ কে আর এমন নোংরা মনের মানুষদের সাথে আর থাকতে হবে না।
তার কণ্ঠে এমন একটা ভার ছিল যে মুহূর্তে ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মামি একটু থমকালেও আবার বিষাক্ত গলায় বলল—
– ওরে নিয়ে যাইবা কোন পরিচয়ে শুনি? মানুষ কি অন্ধ নাকি?
নাভান এবার একচুলও না নড়ে সোজা তাকিয়ে বলল–
— আমার বোনের পরিচয়ে। আজ থেকে রোজ, শেহতাজ খান নাভানের বোন।
কথাটা শুনে সবাই স্তব্ধ। রোজ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখে পানি চিকচিক করছে।
কিন্তু মামি এবারও থামল না।
– আমরা কিছু বুঝি না মনে করছো? কিরে রোজ! এতো বড়লোক পোলা পাইলি কই থেকে? ফাঁদ পাতছস নাকি?
রোজ কেঁপে উঠল। অপমানে মুখ রক্তশুন্য হয়ে গেল।
এরপর যা হলো, সেটা কেউ কল্পনাও করেনি।
ঠাসসস!!
হঠাৎ সৃজন পাশের টেবিলটা লাথি মেরে ফেলে দিল। টেবিলের ওপর রাখা গ্লাস, জগ সব ভেঙে চুরমার।
সবাই চমকে উঠল। সৃজন রাগে ফুঁসছে।
— অনেক কথা বলছিস বুড়ি!
-দেয়ালের শোপিস মাটিতে ছুড়ে মারল সে।
নাভান তখনও শান্ত। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সবকিছু আগেই ঠিক করা।
সে ধীরে অধীরের দিকে তাকিয়ে বলল—
” একটা জিনিসও যেন অক্ষত না থাকে।
অধীর ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল—
” এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিলাম ভাই।
বলেই সে আলমারি খুলে একের পর এক প্লেট ছুড়ে মারতে লাগল। ঝনঝন শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
-মামি হতভম্ব। রোজ দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল–
– ভাইয়া প্লিজ! এসব করবেন না। থামুন!
কিন্তু কেউ শুনছে না।
মামি এবার রাগে ছুটে এসে রোজের চুল ধরতে গেল—
– তোর জন্যই সব! অপয়া মাইয়া!
কিন্তু তার হাত মাঝপথেই থেমে গেল।
রুশা ঝটকা মেরে তার হাত চেপে ধরেছে।
– এই মহিলা! এতো তেজ কিসের রে তোর?
বলেই ধপাস করে তাকে মাটিতে বসিয়ে দিল।
মামি চিৎকার শুরু করল—
– ছাইড়া দে! ছাইড়া দে কইতাছি !
রুশা দাঁত বের করে হাসল।
– আজ তোরে চরম শিক্ষা দিবো । শালি বজ্জাত মহিলা!
হেরা তখন রোজকে ধরে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু রোজ কাঁদছে।
– প্লিজ থামা ওদের…!
কিন্তু রুশা তখন পুরো অন্য মুডে।
সে হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে কাঁচি তুলে নিল।
মামি ভয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
এই মাইয়া! কি করবি তুই!
চ্যাঁচচ্যাঁচচ্যাঁচ!
মুহূর্তেই কাঁচি চালিয়ে দিল রুশা।
এক মুঠো চুল মাটিতে পড়ে গেল।
মামি চিৎকার করে উঠল—
– আমার চুল! হায় আল্লাহ আমার চুল!
রুশা থামল না। এদিক-ওদিক কেটে পুরো মাথা এমন অবস্থা করল যে কোথাও চুল আছে, কোথাও একদম টাক! অধীর হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল।
— ও আমার লালগোলাপি ! তুমি তো বিউটি পার্লার খুলে ফেলছে! তোমার এতো প্রতিভা, এতো সুন্দর লুক চেঞ্জ করে দিয়েছো। তোমায় তো অস্কার দেয়া উচিত।
নাভানের ঠোঁটের কোণেও হালকা হাসি ফুটল।
এরপর রুশা মামাতো বোনটার দিকে তাকাল।
– আয় তুইও আয়।
” না না আপু! আমি কিছু করি নাই!
” তোরে কে জিজ্ঞেস করছে?
চ্যাঁচচ্যাঁচ!
তার মাথারও জায়গায় জায়গায় চুল উধাও।
জামাইটা পালাতে যাবে, অধীর গলা ধরে টেনে আনল।
– কই যাস দুলাভাই?
তার মাথার মাঝখানে গোল করে চুল কেটে দিল সৃজন।
সবাইকে দেখে এখন সার্কাস দলের মতো লাগছে।
ঝিনুক হঠাৎ ঘরের সব জুতা একত্রে করে। মালা বানিয়ে গলায় পরিয়ে দিল।
– এই নেন! টাকলা সম্মাননা পুরস্কার!
অধীর হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মামি কাঁদতে কাঁদতে বলছে—
– তোদের দেইখা নিমু ! তোদের আমি পুলিশে দিমু!
নাভান এবার ধীরে সামনে এলো।
তার চোখদুটো মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে পকেট থেকে কিছু একটা বের করে মামির সামনে ধরল। জিনিসটা দেখেই মামির মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে গেল।
কাঁপতে শুরু করল সে। নাভান নিচু গলায় বলল—
” আমাদের নাম মুখে আনবেন না। তাহলে কি হবে, সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না।
তার কণ্ঠে এমন ভয় ছিল যে সবাই চুপ।
এরপর অধীর আর সৃজন সবাইকে উঠানে এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। মুখে কস্টিপ লাগিয়ে দিল।
মামি শুধু “ম্মমম!” শব্দ করছে।
রুশা সামনে দাঁড়িয়ে হাত কোমড়ে দিয়ে বলল—
” এইবার উঠানে বইসা ঠান্ডা বাতাস খান। চরিত্র বিচার পরে কইরেন দজ্জাল মামী।
হেরা তখন রোজকে নিয়ে গেটের দিকে হাঁটছে।
রোজ একবার পিছনে তাকাল।
যে বাড়িতে এতদিন শুধু অপমান পেয়েছে, আজ সেই বাড়ির মানুষগুলোকেই অসহায় লাগছে।
তার বুকটা কেমন ভার হয়ে উঠল। সবাইকে বলেও আটকাতে পারে নি। হেরা ও আজ রোজ এর বিপক্ষে। যে মানুষ গুলা এতো দিন তার ফুল কে অপমান অবহেলা করেছে তাদের একটু শাস্তি না দিতে পারলে মন শান্তি হবে না।
নাভান ধীরে রোজ এর পাশে এসে দাঁড়াল।
– শেষ সব সম্পর্ক আজ থেকে। তুমি আর একা না। আজ থেকে তুমি আমার বোন। এই শেহতাজ খান নাভান এর বোনের পরিচয়ে বাকি জীবন বাচবে। এখানে আর আসার প্রয়োজন নেই।
রোজের চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। নাভান রোজের মাথায় হাত রাখে। রোজ নাভানের হাত ধরে কেদে দেয়। রোজের কান্না দেখে সবার চোখে পানি।
আজ ঠিক এক মাস পূর্ণ হলো গাজীপুর থেকে ফিরে আসার। একটা মাস—সময় হিসেবে খুব বেশি না, অথচ এই এক মাসেই কত কিছু বদলে গেছে।
মানুষ বদলেছে, সম্পর্ক বদলেছে, অনুভূতি বদলেছে।
শুধু বদলায় নি কিছু পুরোনো অভিমান আর কিছু অদ্ভুত টান।
এদিকে পুরোপুরি অন্য মানুষ হয়ে গেছে জাওয়াদ খান। রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে পাকাপোক্ত ভাবে।
দল থেকে নমিনেশন জমা দিয়েছে। সামনে নির্বাচন। চারদিকে এখন পোস্টার, মাইকিং, মিটিং, লোকজনের আনাগোনা। বাড়ির সামনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মীদের ভিড় লেগেই থাকে।
অধীর তো খুশিতে আত্মহারা।
তাদের প্রতীক “বাঁশ মার্কা” পাওয়ার পর থেকেই যেন মাটিতে পা পড়ছে না তার।
সারাদিন ব্যস্ত কর্মীদের সাথে, মিছিল, প্রচারণা, ব্যানার—সবকিছুতেই।
নিলয়ও এবার জোরেসোরে মাঠে নেমেছে বাবার সাথে।
তবে তার রাজনীতির চেয়ে বেশি আগ্রহ এখন হেরাকে ঘিরে।
হেরার জন্য তার পাগলামো দিন দিন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে আশেপাশের সবাই টের পাচ্ছে।
হেরা সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে চলছে।
বরং ইদানিং নাভানের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে খুব সচেতনভাবে। নাভানও কিছু বলে না।
শুধু মাঝে মাঝে তার চোখ দুটো অদ্ভুত নীরব হয়ে যায়।
এদিকে পরীক্ষা চলছে।
পরীক্ষার চাপে সবাই ব্যস্ত।
তার মাঝেই নির্বাচন।
তারপর পরীক্ষা শেষ হলেই ঝিনুকের বিয়ে।
রোজ এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
রুশা আর হেরার কাছ থেকে নুড়ির ব্যাপারে সব শোনার পর থেকে নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার।
নিজের বোকামির জন্য অপরাধবোধে ভুগছে প্রতিদিন।
কিন্তু পরীক্ষার জন্য সৃজনকে বিরক্তও করছে না।
লোকটাকে যতটা কঠিন আর রাগী মনে হয়, ভেতরে সে ঠিক ততটাই অন্যরকম—এটা এই কয়েকদিনে বুঝে গেছে রোজ।
তবুও সেদিনের ঘটনার পর বহুবার ক্ষমা চাইতে গিয়েও সৃজনের মুখোমুখি হতে পারে নি।
কারণ সৃজন ইচ্ছে করেই তাকে এড়িয়ে গেছে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
রোজের কখন কী লাগে, কী দরকার—সব খবর ঠিকই রাখে সে।
একদিন তো পুরো শপিং করে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
দামী দামী ড্রেস, জুয়েলারি, কসমেটিকস।
রোজ সেগুলো ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সৃজন জাওয়াদ খানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সব কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
সেদিন সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।
আগুনের হলুদ শিখায় সৃজনের চোখ দুটো আরও ভয়ংকর লাগছিল।
সেদিনের পর থেকে সৃজন যা পাঠায়, রোজ আর ফেরত দেয় না। নিজের কাছেই রেখে দেয়।
তবে সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মাঝেও সবচেয়ে বেশি অশান্তিতে আছে কাজল খান।
কারণ আজকাল তার অফিসটাই যেন জাওয়াদ খানের দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে গেছে।
লোকটা যখন তখন চলে আসে। কখনো ফুল হাতে।
কখনো কফি হাতে। কখনো আবার শুধু তাকে বিরক্ত করতে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
অফিস রুমে বসে ফাইল দেখছিল কাজল খান।
চোখে ক্লান্তি, মুখে বিরক্তি।
ঠিক তখনই দরজা না নক করেই ভেতরে ঢুকে পড়ে জাওয়াদ খান।
সাদা পাঞ্জাবি, হাতে দামি ঘড়ি, চোখে সেই পুরোনো দুষ্টু চাহনি।
ঢুকেই দরজা ভেতর থেকে লক করে দিল।
কাজল খান চোখ তুলে তাকাতেই কপাল কুঁচকে গেল।
“ আপনি আবার এসেছেন?
জাওয়াদ খান ধীর পায়ে সামনে এসে চেয়ার টেনে বসল।
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
“ না আসলে শান্তি লাগে না।
“ আমার লাগে।
“ তোমার শান্তি নষ্ট করতেই তো আসি কাজল রেখা।
কাজল খান বিরক্তিতে ফাইল বন্ধ করে দিল।
“ আপনার কি কোনো কাজ নেই?
“ আছে তো। তোমাকে ভালোবাসা।
“এই বয়সে এসেও এসব বলতে লজ্জা করে না?
জাওয়াদ খান হালকা হেসে সামনে ঝুঁকল।
তার চোখে এমন এক দুষ্টামি, যেটা বয়সের সাথে কমার বদলে যেন আরও বেড়েছে।
“ আর কিভাবে মাফ চাইলে তুমি আমায় ক্ষমা করবে কাজল রেখা?
“ আপনাকে কে বলেছে ক্ষমা চাইতে?
“ জীবনে কখনো কিছু চাই নি তোমার কাছে। শেষ বয়সে তোমার পাশে থাকতে দাও আমায়।
কাজল খান ঠান্ডা গলায় বলল—
“ আমার শখের বয়স পার হয়ে গেছে মিঃ জাওয়াদ খান। এখন আর ইচ্ছে করে না।
জাওয়াদ খান এবার হেসে ফেলল।
ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে তার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর নিচু গলায় বলল—
“ আমার সাথে এক রাত কাটালে সব ইচ্ছা আবার জাগ্রত হবে কাজল রেখা।
কথাটা শুনে যেন কাজল খানের কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল।
“ আপনি যে অসভ্য, তা আজ বুঝলাম।
“ সেটা তো আরও আগে বুঝার কথা ছিল।
“ মানে?
জাওয়াদ খান ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলল—
“ না হলে আমাদের রাজপুত্র এমনি এমনি আসছে নাকি? একটু আধটু অসভ্যতামি তো করছিই।
“ ছিঃ! এই বয়সে আপনি এতো নির্লজ্জ!
“ শুধু তোমার কাছে।
কাজল খান এবার আর সহ্য করতে পারল না।
সরাসরি ইয়ারপডস কানে গুঁজে তন্নিকে কল দিল।
লোকটা ইচ্ছে করেই তাকে জ্বালাতে এসেছে।
এটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—
জাওয়াদ খানের এই বেলেল্লাপনা কথাগুলো শুনেও কোথাও একটা পুরোনো অনুভূতি এখনও কাঁপিয়ে দেয় তাকে। কথায় আছে না মানুষ বুড়ো হয় ঠিকি কিন্তু মন বুড়ো হয় না।
” আমার থেকে দুরুত্ব বজায় রেখে চলবেন নয়তো বুলেট সত্যি সত্যি চালান হবে আপনার মাথায়।
অফিসে এখন আর শান্তি নেই তার।
আজ জাওয়াদ খান আসে, তো কাল হয়তো শামসুল আজমীর চৌধুরী। একেকবার একেকজন শামসুল ভয় দেখায়।থ্রেট দেয়। চাপ সৃষ্টি করে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো—
শামসুল এত ভয় দেখানোর পরও এখনো কোনো ক্ষতি করছে না। কেন?এই প্রশ্নটাই কাজল খানকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। সবকিছু কেমন ধোঁয়াশা লাগছে তার কাছে। মনে হচ্ছে— কোথাও খুব বড় কিছু ঘটতে চলেছে।
— একটা কল আসায় জাওয়াদ খান তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকায় কাজল খানের দিকে।
” গেলাম আমি। তুমি সাবধানে থেকো কাজল রেখা!
কাজল খান কিছু বলার আগেই জাওয়াদ বেরিয়ে যায়। জাওয়াদ খান বের হতেই মিনিট দু এক এর মধ্যে শামসুল আসে ক্যাবিনে।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি। চোখদুটো আগের মতোই ভয়ংকর শান্ত।
শামসুলকে দেখেই বিরক্ত হয়ে যায় কাজল খান।
” তুই আবার কেন এসেছিস ?
শামসুল বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে ধীরে বলে—
” মরার আগ অব্দি তোমার পিছু ছাড়বে না দেখি ওই জাওয়াদ।
কাজল খান ঠান্ডা চোখে তাকায়।
” যার সাথে আল্লাহ নিজে জুড়ে দিয়েছে… তাকে যত বাধা দেওয়া হোক না কেন, দূরে কি সরিয়ে রাখা যায়?
শামসুল থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে থাকে কাজলের দিকে। সেই দৃষ্টিতে তিব্র রাগ!
” তাহলে নির্বাচন করছে আমার বিপক্ষ হয়ে ?
“সেটা আমি জানি না।
” তুমি বাধা দিলে না কেনো সুন্দরী?
‘ সুন্দরী’ শব্দটা শুনতেই কাজল খানের চোখ কঠিন হয়ে ওঠে।
” যাকে নিজের মানি না বলে ফিরিয়ে দিচ্ছি, সে আমার কথা শুনবে কী করে ভাবলি তুই ?
শামসুল হালকা হাসে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কষ্টটা স্পষ্ট।
” সব তোমার ছেলে করছে?
এই প্রশ্নে কাজল খান থমকে যায়।
মুহূর্তের জন্য তার মুখের রঙ বদলে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়।
” আমি এসবের ভিতর নেই। আমায় একদম জড়াবি না। তাহলে খুনের দায়ে জেলে পুরতে সময় লাগবে না।
শামসুল এবার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
“থ্রেট দিচ্ছো সুন্দরী?
নিচু স্বরে বলে সে।
” আমার কিছু হলে কয়টা জীবন শেষ হবে… সেটা তুমিও জানো।
কাজল খান এবার চোখ সরু করে তাকায়।
” তুই কি বলতে চাস ?
শামসুল কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর নিচু স্বরে বলে—
” জাওয়াদ অনেক কিছু জানে না।
কাজলের বুক কেঁপে ওঠে।
” কিসের কথা বলছিস তুই ?
শামসুল এবার রহস্যময় হাসে।
“যে সত্য এত বছর চাপা পড়ে আছে… সেটা বের হলে নির্বাচনের মঞ্চে শুধু হারজিত হবে না সুন্দরী… রক্ত ঝরবে।
কাজল খান এবার সত্যিই অস্থির হয়ে পড়ে।
” শামসুল, ধাঁধা না বলে স্পষ্ট করে বল।
শামসুল ধীরে মাথা নাড়ে।
” সময় এখনো আসে নাই।
” তাহলে এখানে এসেছিস কেনো ?
শামসুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে বলে—
“শেষবারের মতো সাবধান করতে।
” কিসের সাবধান?
শামসুল আর কিছু না বলে চলে যেতে নেয়। কাজল খান ও বলে উঠে তির্যক কন্ঠে-
” আজ সকালে যে ফাইল পাঠিয়েছি সেটা চেক করেছিস তো। ওয়েল আমি পড়ে শুনাই।
” আমি শামসুল আজমীর চৌধুরী। বাংলাদেশে যতো রকম অবৈধ ড্রাক্স, অস্ত্র আসে সবকিছু আমার কথায়। ১০০ কুটি টাকার বাজেট নিয়ে গত ৩ মাস কাজ করবো, ইন্ডিয়া,পাকিস্তান,আরো কিছু দেশের সঙ্গে। আমার এই মাল প্রত্যেক ভার্সিটির স্টুডেন্ট দের হাতে যাবে। যাবে মাদ্রাসা লাইনের ছাত্রদের হাতে । তিন মাস আমি তাদের সাথে কাজ করবো তাই এই দলিলে সাইন করছি। সাইন শামসুল —
শামসুল ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো কাজল খানের একদম সামনে। চোখে তার রাগের আগুন, অথচ ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি।
“ আমায় ফাঁসিয়েছো মিথ্যার জালে। এসব কাগজে আমি সাইন করিনি!
কাজল খান ভ্রু তুলে তাকালো। ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসির রেখা।
“ আইন শুধু কথা শোনে না, প্রমাণও দেখে শামসুল। আর প্রমাণ আমার হাতেই আছে।
শামসুল মুঠো শক্ত করলো।
“এই দেমাগ একদিন মুছে দিবো, সুন্দরী।
কাজল খান এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখদুটো তখন ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ণ।
“ হাত বাড়ানোর আগে ভেবে নিস। আগুন ছুঁতে গেলে হাত পুড়ে যায়।
শামসুল নিচু স্বরে হেসে উঠলো।
“তোমায় দমাই কীভাবে বলো তো, ডার্লিং?
কাজল খান এবার শামসুলের শার্টের কলার ঠিক করতে করতে নির্ভীক গলায় বললো—
“ আমায় দমাতে পারবি না। কারণ আমি অন্য মেয়েদের মতো ভয় পাই না, শামসুল। আমি কাজল খান। ঝড় এলে মাথা নত করি না। ঝড়ের দিকটাই বদলে দেই। তাই আমায় ভয় দেখিয়ে লস ছাড়া লাভ হবে না তোর।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
শামসুল শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মেয়েটার চোখে ভয় নেই, আছে শুধু তেজ…। আর এক অদ্ভুত রহস্য। যা তাকে বারবার কাজল খানের সামনে টেনে আনে।
রুশার এক কথা — পরীক্ষা পরীক্ষা করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে অধীর । মাঝখানে তিন দিনের গ্যাপ। এই সুযোগে ঘুরতে না বের হলে নাকি জীবনটাই বৃথা প্রেম করাটাই বৃথা!
তাই সকাল থেকেই সে পুরো বাসা মাথায় তুলে রেখেছে।
কিন্তু রুশা একবার কিছু মাথায় নিলে সেটা করিয়েই ছাড়ে। শেষমেশ তার জেদের কাছে হার মানে সবাই ।
গন্তব্য — পূর্বাচল ৩০০ ফিট।
একেবারে গ্রামের দিকটায়, নদীর পাড়ে।
যেখানে শহরের কোলাহল নেই, আছে কেবল বাতাসের শব্দ আর পানির ঢেউ। সবচেয়ে বেশি অনীহা ছিলো হেরার।
মেয়েটা মুখ গোমড়া করে বসেছিলো সোফায়। বারবার বলছিলো সে যাবে না।
রুশা প্রায় আধা ঘন্টা বুঝিয়ে, আদর করে, জোর করে শেষমেশ রাজি করিয়েছে। তবুও মুখের বকবকানি বন্ধ হয় নি।
ব্যাগের চেইন টানতে টানতে বিরক্ত মুখে বলে উঠে—
“তোদের মধ্যে আমায় কাবাবের হাড্ডি বানাতে চাচ্ছিস।
রুশা সাথে সাথে নাটকীয় ভাব নিয়ে বুক চেপে ধরে।
“এ মা! তুই হাড্ডি হতে যাবি কোন দুঃখে? তুই তো কাবাবের মধ্যেই ডুবু থাকবি!
হেরা থমকে যায়।
“ মানে?
রুশা ভ্রু নাচিয়ে রহস্যময় হাসি দেয়।
“ সময় আসলে বুঝবি।
হেরা আর কিছুই বুঝলো না। উল্টো মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করতে লাগলো—
“এই মেয়ে সবসময় ধাঁধার মতো কথা বলে কেন আল্লাহ জানে!”
অধীর আর সৃজন তখন রেডি হয়ে নিচে নামছিলো।
দু’জনেরই প্ল্যান ছিলো নাভানকে একবার বলে যাবে।
যদিও তারা প্রায় নিশ্চিত ছিলো নাভান আসবে না।
কারণ সকাল থেকেই নাভান কোনো একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
কালো শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে রুম থেকে বের হচ্ছিলো সে। চোখেমুখে সেই চিরচেনা রাশভারী ভাব।
সৃজন গিয়ে সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বলে—
“ ভাই, আমরা পূর্বাচল যাচ্ছি। নদীর পাড়ে। যাবি?
নাভান একবারও তাকালো না।
ঘড়িটা হাতে পরতে পরতেই নির্লিপ্ত স্বরে বললো—
“তোরা যা। আমার কাজ আছে।
অধীর ঠোঁট টিপে হাসলো।
ঠিক তখনই সৃজন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে ফেললো-
“ হেরাও যাচ্ছে।
শব্দটা কানে যেতেই নাভানের হাত থেমে গেলো।
মাত্র এক সেকেন্ড।
কিন্তু সেই এক সেকেন্ডই যথেষ্ট ছিলো।
অধীর আর সৃজন দু’জনেই সেটা খেয়াল করলো।
নাভান এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো।
“ কোথায় বললি?
“পূর্বাচল। নদীর পাড়ে।
সৃজন এর কথায়, কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে গলা পরিষ্কার করে বললো—
“তোরা যা। আমি কিছুক্ষন পর আসছি।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে ফেলে।
“ কি ব্যাপার মামা? কি ভালোবাসা! বনু যাবে বলে তুমিও যাবে। উফফ কি টান।
নাভান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“ হোয়াট নন্সেস! নিন্মবিত্ত চিন্তাভাবনা। ভালোবাসা এটা যায় না আমার সাথে।
সৃজন হাসি চেপে অন্যদিকে তাকায়।
অধীর তো থামার ছেলে না।
“ ও আচ্ছা! তাহলে সবার সামনে ‘আমার বউ’ বলে স্লোগান দেওয়া, জোর করে বিয়ে করা, অধিকার ফলানো — এইসব কি মানবসেবা ছিলো?
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
“ আমার ওই মিসাইল গার্লের প্রতি কোনো কিউরিওসিটি নেই।
অধীর এবার হো হো করে হেসে উঠে।
“ এএএ! বিয়ে করে আড়ালে ‘আমার অধিকার’ বলে চিল্লাস। সবার সামনে ‘আমার বউ’ বলে ঘুরিস। এখন আবার বলিস ভালোবাসা নেই! মুখে স্বীকার করলে কি এমন ক্ষতি হয় ভাই?
নাভান এবার সরাসরি অধীরের দিকে তাকালো।
সেই চাহনিতে সতর্কবার্তা ছিলো।
কিন্তু অধীর ভয় পেলো না। কারণ সে জানে — এই মানুষটার রাগ যত বড়, ভিতরের অনুভূতিটা তার থেকেও অনেক বড়।
নাভান আর কোনো উত্তর দিলো না।
চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।
কিন্তু তার চলে যাওয়ার পরও অধীর আর সৃজনের মুখে চাপা হাসি লেগেই রইলো।
কারণ তারা সব জানে।
গায়ে প্রচণ্ড জ্বর নিয়েও নাভান ভার্সিটিতে গিয়েছিলো।
কার জন্য? শুধু একবার হেরাকে দেখবে বলে।
সেদিন ক্লাস না করে মেয়েটাকে দেখেই ফিরে এসেছিলো সে। কউকে বুঝতে দেয় নি কিছু।
কিন্তু চোখ দুটো লাল হয়ে ছিলো জ্বরে। আর সেই চোখে লুকানো অস্থিরতাটা অধীর স্পষ্ট দেখেছিলো।
এমনকি হেরা যে তার রুমে শুয়েছিলো। তারপর থেকে তিন দিনও— নিজের বিছানায় ঘুমায় নি নাভান।
কারণ বিছানাটায় হেরার গন্ধ লেগে ছিলো।
মেয়েটার ছোঁয়ার স্মৃতি ছিলো।
সেই স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে ছেলেটা সোফায় শুয়ে রাত কাটিয়েছে। তাদের রুমে কাউকে ঢুকতেও দেয় নি।
কাজের লোক পর্যন্ত না।
সবকিছু এত স্পষ্ট হওয়ার পরও সে কিভাবে নির্বিকার মুখে বলে— ভালোবাসা নেই।
সৃজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—
“ মানুষটা আসলে ভয় পায়।
অধীর ভ্রু তোলে।
“ কিসের ভয়?
“যেটাকে সবচেয়ে বেশি নিজের মনে হয়, সেটাকেই হারানোর ভয়।
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে যায় চারপাশ।
দূরে রুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে।
হয়তো নাভান শুনে ফেলেছে।
হয়তো শুনেও না শোনার ভান করছে।
কিন্তু একটা সত্যি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না—
হেরা নামের মেয়েটা ধীরে ধীরে নাভান নামের মানুষটার সমস্ত রাগ, অহংকার, একাকীত্বের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে।
এমন একটা জায়গা… যেখান থেকে তাকে আর সরানো সম্ভব না।
নদীর পাড়ে বিকেলের আলোটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়েছে, বাতাসে কাঁচা ঘাস আর নদীর পানির গন্ধ। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টা বাজছে, মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে পাখির ডাক। পুরো জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি, অথচ তাদের ছোট্ট দলটার মধ্যে চলছে একেবারে হই হুল্লোড়।
সবাই মিলে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শুধু ঝিনুক নেই। তুষার তাকে নিয়ে আজ লং ড্রাইভে বেরিয়েছে। এই নিয়ে রোজ অন্তত দশবার আফসোস করেছে।
“দেখছো? আমাদের ফেলে রেখে নিজেরা রোমান্স করছে। বন্ধুত্ব বলে কিছু নাই!
অধীর সাথে সাথে বলে উঠেছিল,
“ ভাবি জি আপনি তাদের সাথে গেলে পাঁচ মিনিট পরই বলতেন ‘তুষার ভাইয়া গাড়ি থামান, আমি ভুট্টা খাবো!
সবাই হেসে উঠেছিল। অধীর কখন কি নামে সম্মোধন করে লজ্জায় ফেলে দেয়। একবার বোন তো একবার ভাবি।আসলেই ছেলেটা সবার হাসির কারন!
তারপরই হঠাৎ রুশা লাফিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠে—
“এইইই! লাইভ টেলিকাস্ট দেখুন! কতো সুন্দর ফুল! এনে দিন না প্লিজ!”
মুহূর্তে সবার দৃষ্টি ঘুরে যায় তার দিকে।
রুশা দুই হাত সামনে তুলে রাস্তার পাশের বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। গাছভর্তি লাল-কমলা ফুল। বাতাসে দুলছে। যেনো আগুন লেগেছে ডালে ডালে।
রুশার চোখ চকচক করছে।
ফুলের প্রতি মেয়েটার দুর্বলতা সবাই জানে। সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন ফুলগুলো তাকে নাম ধরে ডাকছে। রুশা আয় আমায় তোর হাতে মানাবে আমায় ছিড়ে নিয়ে যা। আয় রুশা আয় জলদি আয়!!
অধীর প্রথমে রুশার দিকে তাকালো, তারপর ধীরে ধীরে গাছটার দিকে। তারপরই তার মুখের রং উধাও।
“লাল গোলাপি… আমি কিভাবে এত বড় গাছে উঠবো? পড়ে হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেলে পরে তুমি-ই বলবা— ‘আমার ল্যাংড়া আতুরা বয়ফ্রেন্ড!’
রুশা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
“উফ! একটা ফুল আনতে বলছি, মাউন্ট এভারেস্টে উঠতে তো বলি নাই!
“ মাউন্ট এভারেস্টও মনে হয় এর চেয়ে ছোট!
অধীর মুখ মলিন করে রাখে।মেয়েটা একেক বার একেক বায়না করে। যদি পূরণ না করতে পারে তখনি শুরু করে দেয় উপন্যাস এর নায়ক দের নিয়ে পেন পেন। রুশা থামার মেয়ে না। কিছুক্ষণ পরই পাশের একটা ছোট্ট বাগানের দিকে তাকিয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠলো—
“ওইইই দেখুন লাইভ টেলিকাস্ট ! গোলাপ ফুল ! প্লিজ এনে দিন না! প্লিজ প্লিজ! আর কিছু চাইবো না!
মূল কথা হলো— সে ফুল চায়, কিন্তু ফুলটা অধীরের হাত থেকেই চায়। এতেই তার ছটফট মন শান্ত হয়ে যাবে।
অধীর আশেপাশে কোনো ফুলের দোকান নেই।
সৃজন নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো।
“ কিরে লাইভ টেলিকাস্ট ভালোবাসার মানুষ এর জন্য একটা ফুল এনে দিতে পারিস না? কি এমন বীরপুরুষ হইছিস?
অধীর চোখ ছোট করে তাকালো।
সৃজন থামলো না।
“ আমারে বললে এখন পুরো বাগান হাজির করতাম ফুলের সামনে। এতো ভাবা ভাবির সময় আছে নাকি। মনের মানুষ চেয়েছে মানে তাকে যে করেই হোক দিতে হবে।
অধীর বিরক্ত নিয়ে বলে
“এই চুমুর সাপ্লাই ম্যান চুপ কর।
“ না করবো না। মেয়েদের সামনে ইমেজ নষ্ট করছিস।
সৃজনের কথায় রোজ অন্যমনস্ক হয়ে তাকালো তার দিকে।
“ ফুল…”
শব্দটা আজ অনেকদিন পর শুনলো সৃজনের মুখে। নাম টা কতো মানায় তার মুখে। কিন্তু
আজকাল আর ডাকে না সৃজন।
তবুও আজ সেই শব্দটা শুনে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপন উঠলো রোজের। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। সৃজন চাপা হাসে রোজের দিকে তাকিয়ে।
এদিকে অধীর বেশ অপমানিত বোধ করছে।
সে উঠে দাঁড়িয়ে গলা ঝাড়লো।
“ তুই পারিস আর কেউ পারে না— এমন কি কাজ? এই যাচ্ছি এই আসছি! লাল গোলাপি তুমি বসো। তোমার কয়টা ফুল লাগবে বলো?
রুশা সাথে সাথে খুশিতে হাত চাপড়ালো।
“এই তো আমার বীরপুরুষ! হিরো।
এই হাসি মুখ দেখার জন্য সব করা যায়। অধীর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে মাথা চুলকিয়ে চলে যায় ফুল আনতে।
অধীর যেতে পিছন থেকে কেউ বলে উঠে সৃজন কে উদেশ্য করে।
“ আমার বোনও ওই বরই গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিলো তখন থেকে।
সবাই ঘুরে তাকালো। নাভান দাঁড়িয়ে আছে।
কখন এসেছে কেউ টেরই পায়নি। হেরা কেঁপে উঠলো প্রায়। লোকটা মানুষের মতো আসে না। হুট করে উদয় হয় ভুতের মতো।
তার উপর আজ গলাটাও কেমন ভাঙা ভাঙা।
হেরার সত্যি মাঝে মাঝে মনে হয়— লোকটা ভূত।
নাভান শান্ত গলায় আবার বললো—
“ মনে মনে খেতেও ইচ্ছে করছে। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছে না। তুই এক কাজ কর… রোজের জন্য ওই গাছ থেকে বরই নিয়ে আয়। যা আমরাও দেখি কেমন বিরপুরুষ তুই।
রোজ কাশতে কাশতে প্রায় মরে যাওয়ার অবস্থা।
সে তো বরই গাছটাই খেয়াল করেনি!
কিন্তু নাভানের চোখের দিকে তাকাতেই বুঝলো— কিছু গরবর করতে যাচ্ছে । সে সঙ্গে সঙ্গে নাটক শুরু করলো।
“হ্যাঁ হ্যাঁ! আমার খুব ইচ্ছে করছে! ইসস টসটসে বরই! জিভে জল চলে আসছে!
হেরা একবার রোজের দিকে তাকায়, একবার নাভানের দিকে।
তার মাথায় কিছু ঢুকছে না।
এর মধ্যে সে বুঝতেই পারেনি কখন নাভান এসে তার পাশেই বসেছে।
মেয়েটা উঠে যেতে চাইলেই নাভান ধীরেসুস্থে তার হাত ধরে ফেললো। হেরা থমকে গেল। চারিদিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে।
“ হাত ছাড়ুন…।
নাভান শুনলোই না যেন।
বরং আরো শক্ত করে ধরলো।
অথচ মুখে একদম স্বাভাবিক ভাব নিয়ে সৃজনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন হেরা বলে কেউ তার পাশে বসেই নেই। হেরার বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক করছে।
লোকটার স্পর্শটা অদ্ভুত।
জোর করেও শান্ত।
রাগ লাগে।
আবার অকারণে ভালোও লাগে।
সে চুপচাপ হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই নাভান খুব নিচু গলায় বললো—
“চুপচাপ বসে থাকো।
কথাটা আদেশের মতো।
তবুও হেরা আর নড়লো না।
এদিকে সৃজন কিছুই বুঝতে না পেরে বীরদের উঠে দাঁড়িয়েছে।
“এইটা আবার কোনো ব্যাপার নাকি? বরই নিয়ে আসছি ।
নাভান মাথা নেড়ে বললো-
“যা”
সৃজন যে মাইনকার চিপায় পরেছে।বেটা অসভ্য গিটার ওয়ালাকে সুবিধের মনে হচ্ছে না। অধীর কে ফাসাতে গিয়ে আবার নিজে না ফেসে যাচ্ছে।
অধীর কে যে ফুল আনতে উৎসাহ দিয়েছে সেখানে আসার সময় সাইনবোর্ডে লিখা দেখেছে –
“ফুল ছিড়া নিষেধ।”আর এই বাগানের মালিক যে দর্জাল তা জানতো। সৃজন ইচ্ছে করে ফাসিয়েছে অধীর কে। নাভান সবি জানে।
আর এই বরই গাছটার পাশেই থাকে সেই ভয়ংকর বুড়ি মহিলা। যে গাছের নিচে কাউকে দেখলেই ঝাড়ু হাতে তেড়ে আসে। দুই টাই তার।
সৃজন অবশ্য গাছ যে ওই দর্জাল মহিলার তা জানে না।
সে নায়ক সাজার ভঙ্গিতে গাছের দিকে এগোচ্ছে।
রোজ ফিসফিস করে বললো,
“ আমার কেন মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে?
নাভানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো।
“ হবেই।
দুইজন দুই মিশনে যায়। রোজ আর রুশা সেলফি তুলতে বেস্ত। হেরা পরেছে মহা বিপাকে।কটমট করে তাকায় নাভানের দিকে?
” আরে ভাই কি হচ্ছে!
হেরার আরে ‘ ভাই ‘ কথা শুনে মুহূর্তেই নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
গাঢ় কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, চোখে সেই ভয়ংকর দৃষ্টি— যেটা দেখলে বড় বড় মানুষও দুবার ভাবতে বাধ্য হয়। অথচ সামনের মেয়েটা একটুও ভয় পাচ্ছে না। তাকে দেখে বিরক্ত তো দূর একটু হাত মিলাতে পারলে মেয়েরা সেদিন হাত অব্দি ধোয় না। আর এই মেয়েকে দেখো।
বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ ভেসে আসছে। থেমে থেমে জোরে বাতাস আসছে। নদী আর ক্ষেত থাকার কারনে বাতাসের বেগ এখানে অনেক। বাতাসে হেরার চুল উড়ছে, আর সেই চুল বারবার এসে নাভানের মুখে লাগছে। হেরা হাতের বাধন ছুটাতে চাইলো কিন্তু পারলো না। বেশ বিরক্ত নিতে বলে।
” কি ব্যাপার? অসভ্যতামী করছেন কেনো!
হেরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। কিন্তু কণ্ঠে বিন্দুমাত্র ভয় নেই।
নাভান নিচু গলায় বলে উঠে—
” বউয়ের হাত ধরা অসভ্যতা এই কথা কে শিখিয়েছে তোমায়?
” এতো বউ বউ করেন কেনো?একদম এই নামে সম্মোধন করবেন না।
” বউকে বউ বলবো না তো কি বলবো?
হেরা এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের উপর হাত রাখলো।
” বোন বলবেন। কারণ আমি সম্পর্কে আপনার বোন হই।
দুই সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
” হোয়াট!!
নাভান এমনভাবে বললো যে পাশ দিয়ে যাওয়া একটা বাইকও স্লো হয়ে গেল ধমকে।এদিকে রোজ আর রুশা প্রেমিক পুরুষের পিছু নিয়েছে।
” এক থাপ্পড়ে গাল লাল করে দিবো।”
নাভান কে বিরক্ত হতে দেখে বেশ মজা পায় হেরা।
লোকটা রেগে গেলে তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। চোখ দুটো কেমন আগুনের মতো জ্বলে উঠে। আর সেই জিনিসটাই হেরার ভীষণ পছন্দ।
সে আরো উসকানি দিয়ে বললো—
” ভাইয়া হন আপনি আমার। বিগ ব্রাদার। এখন থেকে সবসময় বিগ ব্রাদার বলে ডাকবো। দরকার হলে মাইক নিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে পুরো জেলায় জেলায় লাগিয়ে দিবো—!
হেরা এক হাত ছড়িয়ে নাটকীয় গলায় বলতে থাকে।
” ঢাকার কিং শেহতাজ খান নাভান— মাই বিগ ব্রাদার!
নাভানের কপালের রগ ফুলে উঠলো।
” মিসাইল গার্ল ”
” জি ভাইয়া?
” স্টপ ননসেন্স!
” আচ্ছা বিগ ব্রো।
” এটোম বোম এর মতো মুখ চলে কেনো তোমার?
” কি হয়েছে ভাইটু ?
এক সেকেন্ডের মধ্যে নাভান তাকে নিজের সাথে সাথে মিশিয়ে নেয়। হেরা থমকে যায়।
লোকটার দুই হাত তার দুপাশে। নিঃশ্বাস গরম হয়ে এসে পড়ছে মুখে। সেই ভয়ংকর চোখদুটো এবার সরাসরি তার চোখে আটকে।
নাভান দাঁত চেপে বলে উঠে—
” আমি তোর সাইয়া… ইটস বেটার দেন ভাইয়া। গট ইট, মিসাইল গার্ল?
হেরার বুক ধক করে উঠে।
এই লোকটা যখন হঠাৎ করে এমন গম্ভীর হয়ে যায়, তখন তার নিজেরই কেমন এলোমেলো লাগে।
কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করলে তো চলবে না।
তাই সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
” না। আপনি ভাইয়া। বড় ভাইয়া। সম্মানিত ভাইয়া।”
” মিসাইল গার্ল ইচ্ছে করে আমার ধৈর্য পরীক্ষা নিচছো ?”
” না তো ভাইজান।
নাভান চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। তারপর আবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে—
” ইউ নো আমি কত কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করছি!
হেরা এবার একটু থেমে যায়।
নাভানের গলায় হঠাৎ অন্যরকম কিছু ছিল। ভারী… গভীর… অদ্ভুত।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার দুষ্টুমি ফিরে আসে তার চোখে।
” আচ্ছা একটা কথা বলি?”
হেরাকে সিরিয়াস হতে দেখে নাভান বলে।
” হোয়াট?
হেরা ভাবুক ভঙ্গিতে বলে।
” আপনি যদি আমার ভাইয়া হন, তাহলে আপনার সম্পত্তিতে আমারও ভাগ আছে।
” হোয়াট?
” এই যে গাড়ি, বাড়ি, টাকা— সবকিছুর অর্ধেক আমার।
নাভান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হেরা আঙুল তুলে গুনে গুনে বলতে থাকে—
” আর ভাইয়া হিসেবে প্রতি ঈদে আমাকে সালামি দিতে হবে। শপিং করাতে হবে। চকোলেট কিনে দিতে হবে।
নাভান কটমট চোখে তাকায়, দাতে দাত পিষে বলে–
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪০
” তুমি একটা যন্ত্রণা ।
” আপনারই যন্ত্রণা ভাইয়া।
রাগে বিরিক্তিতে নাভান গট গট পায়ে প্রস্থান করে।
এখন এখানে থাকলে কখন জানি ঠাসিয়ে দেয় থাপ্পড়।
