এক দেখায় পর্ব ৪৩
সুরভী আক্তার
বিরক্ত হলো মিহি । ভীষণ অস্বস্তিতে চোখ মুখ বিকৃত করলো । চোখ সরালো অবিলম্বে । মুখ ফিরিয়ে নিলো । তা দেখে ফিচেল হাসলো লোকটা ।
রাফির ধ্যান জ্ঞান নেই । পুরো স্পিডে সামনের গাড়িটা কে ওভার টেক করে ও ব্রেক কষলো গাড়ি টার সামনে । আচমকা রাফির গাড়ি সামনে আসায় দ্রুত ব্রেক কষলো এই গাড়ি টাও । ভড়কালো মিহি । সামনের কালো গ্লাস ভেদ করে রাফির প্রগাঢ় শক্ত চেহারা খানা নজরে আসতেই ছলকে উঠলো মিহি । শুকিয়ে আসলো কন্ঠ নালি । বৃহৎ আকার ধারণ করলো অক্ষি যুগল ।
পাশের জনের ঠোঁটে ক্রুর হাসি । চশমার আড়ালে চোখের দৃষ্টি অদৃশ্য মান । সে বিড়বিড় করলো থেমে থেমে অস্পষ্ট স্বরে…
” ওয়েল কাম,,, ওয়েল কাম ,, ওয়েল কাম রুজান রাফি চৌধুরী…
কথা শেষ করে দাঁত পিষলো । হাসলো পৈশাচিক ।
রাফি ইতিমধ্যে গাড়ি থেকে নেমেছে । ধাম করে দরজা টা লাগিয়ে দিলো ও । চোখ মুখ টাটানো । তাকানো যাচ্ছে না । বিভৎস রেগে আছে সে । গায়ের কালো শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা । কনুই পর্যন্ত গোটানো হাতা । তীর্যক দৃষ্টি ওর গ্লাস ভেদ করে সোজা মিহির দিকে । ঢোক গিললো মিহি । কম্পিত হাত মুঠো করলো ।
রাফি সোজা এসেই গাড়ির দরজা খুলল , এক টানে হিচড়ে বের করলো মিহি কে । টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গেলে কনুই চেপে আটকে ধরলো রাফি । এক ঝটকায় দাঁড় করালো ওকে । মিহির সজল চোখ, কম্পিত মুখ । রাফি ওর দুই নরম বাহু চেপে ধরলো শক্ত করে । টেনে আনলো নিজের কাছে । তীব্র গর্জে উঠে বজ্রের ন্যায় চিৎকার করলো….
” কোথায় পালাচ্ছিলি বল ? কার সাথে যাচ্ছিলি ?
মিহি চমকে উঠলো । ধক্ করে উঠলো বক্ষ স্থল । গরম অশ্রু বিন্দু গড়ালো কর্নিশ ঘেঁষে । শক্ত হাতের খাবলায় ব্যাথা অনুভূত হলো । তার চেয়েও বেশি রাফির তুই সম্বোধনে । ঠোঁট উল্টালো মেয়েটা । হালকা উচ্চারণ করলো ঠোঁট নাড়িয়ে…
” ল.. লাগছে আমার !
” লাগুক । আরো বেশি লাগুক তোর ! নিজের ব্যাথা বুঝিস শুধু ? আমার ব্যাথা ? আমার ব্যাথা বুঝিস না ?
কোথায় যাচ্ছিলি বল ? কে ও ? কার সাথে যাচ্ছিলি ?
মিহি কাঁপল । সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে বাক্ হারালো । মেয়েটা অবাক করুন চোখে তাকিয়ে আছে রাফির রাগান্বিত, ক্ষিপ্ত মুখখানার দিকে । দুজনের সেকেন্ড কয়েক নীরবতার মাঝে তৃতীয় এক ভ্যাঙ্গানো পুরুষালি কন্ঠ….
” আমার সাথে যাচ্ছিলো ও !
রাফি তড়িতে চাইলো । দৃষ্টি একই ক্ষিপ্ত । আরো প্রকট হলো তা । সামনের জনের সাথে চোখাচোখি হতেই হালকা হয়ে আসলো রাফি । দৃষ্টি হলো বিস্মিত । মিহির বাহুর উপর নিজের শক্তি দূর্বল হয়ে আসলো । অবিলম্বে অবিশ্বাস্যে অস্ফুটে শব্দ ফুটলো মুখে…
” সারফারাজ….?
সামনের জন হাসলো । এগোতে এগোতে চশমা খুললো চোখ থেকে । বললো…
” হায় রাফি… মাই বেস্টু … হাউ আর ইউ ব্রো ?
রাফি থমকালো । ছাড়লো মিহি কে । মিহি পিছিয়ে গেল । ঘেঁষে দাঁড়ালো গাড়ির সাথে । তাজ্জব বনে একপলক তাকালো সাফির দিকে , অন্য পলক রাফির দিকে । কি বললো সাফি ?
রাফি চোখ গোল গোল করে মূক বনে তাকিয়ে আছে । সাফি হেসে আরো একটু এগোলো..
বললো একই টোনে…
” আমার দিকে তো তাকাচ্ছিসই না ব্রো । দেখবি কি করে কার সাথে যাচ্ছিলো ও । আর ওকে ওভাবে ধরেছিস কেনো ? ভাবি হয় তোর , রেসপেক্ট হার !
রাফি নিজেকে না সামলাতে পেরে আপনা আপনি এক কদম পিছিয়ে গেল । পলক পড়লো চোখে । চোখ সরিয়ে সন্দেহ কাটিয়ে ফের তাকালো ।
” সারফারাজ ? তুই ?
” হুম ! কেনো ? আশা করিস নি আমায় ? দেখ, মরিনি আমি ! বেঁচে আছি , মরেছে তো আমার কলিজার টুকরা ! আমি কিন্তু বেঁচে আছি এখনো । দেশে ফিরেছি , কেনো ফিরেছি বলতো ? তোর ভাবীর জন্য !
এই যে ডার্লিং , এসো এদিকে ! পরিচয় করিয়ে দেই তোমার হাজব্যান্ডের কোনো এক কালের বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে !
শেষের কথা গুলো মিহি কে উদ্দেশ্য করে বলা । রাফি বুঝলো না । ও তাকালো মিহির দিকে । এতক্ষণের ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে অবিশ্বাস । কাঁপছে দৃষ্টি । মিহির ছলছল নেত্রে একেক বার একেক জনের দিকে তাকাচ্ছে । হিসেব মিলছে না । রাফি আর সাফি পূর্ব পরিচিত ? বেস্ট ফ্রেন্ড মানে ? রাফি সাফির বেস্ট ফ্রেন্ড ?
সব গুলিয়ে যাচ্ছে মিহির কাছে । রাফি নিস্তব্ধ । সাফি দাঁত পিষে নিচু স্বরে ধমকে উঠলো…
” কথা কানে যাচ্ছে না ? এদিকে আসতে বলেছি তো ! এসো…
মিহি রাফির দিকে তাকালো । রাফিও তাকিয়ে আছে ওর দিকেই । চোখ নামালো মেয়েটা । নত মস্তিষ্কে পা বাড়াতে গেলে ওর হাতটা খপ করে ধরলো রাফি । মিহি তাকালো ওর চোখের দিকে । অদ্ভুত ! রাফির দৃষ্টি ঘোলাটে ! পানি ছলছল করছে চোখে ! রাফি বললো শান্ত তবে ক্ষিপ্ত কন্ঠে….
” কে ও ?
” ওকে কি জিজ্ঞেস করছিস ? বললাম তো , আমার বউ ও । ও আমার বউ মানে আমি ওর হাজব্যান্ড !
সাফির কথা শুনেও শুনলো না রাফি । ফের শুধালো….
” মিহি … কে ও ?
মিহির কম্পিত ক্ষিণ কন্ঠ…
” স..সাফি !
অবাক হলো রাফি । ভ্রু যুগল গুটিয়ে আসলো । সাফি মানে ? এ কি করে সাফি হয় ? সাফি তো অন্য কেউ ! রাফি নিজেই ব্যাবস্থা করেছে ঐ সাফির ? তাহলে ?
সারফারাজ ? সারফারাজ কোথা থেকে আসলো ? মাথা কাজ করছে না রাফির । এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব !
এলোমেলো মস্তিষ্কে শুধালো রাফি…
” ও , সাফি ?
বাধ্যের ন্যায় হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো মিহি । চোখ টই-টুম্বুর জলে । এক্ষুনি গড়াবে তা !
সাফি চেতে উঠলো এবার…
” মিহি , আমি আসতে বলেছি আমার কাছে !
চমকালো মিহি । নিজের হাত ছাড়ালো রাফির থেকে । অতি সহজেই ছাড়াতে পারলো, কারন রাফি ছাড়লো । মিহি গুটি গুটি পায়ে সাফির কাছে আসলো । তবুও বাঁধা দিলো না রাফি । সাফির পাশে দাঁড়াতেই আচমকা মিহির কাঁধ জড়িয়ে ওকে নিজের কাছে টেনে আনলো সাফি । হেলে পড়লো মিহি । সাফির স্পর্শে অস্বস্তিতে শরীর কেমন রি রি করে উঠলো । মুখ কুচকালো মিহি । সাফির শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়াতে পারলো না নিজেকে । রাফির দিকেও তাকাতে পারলো না । চোখ নামালো, সহ্য শক্তি বাড়ালো ।
এদিকে রাফি হাত মুঠো করেছে । দাঁতের পাটি পিষেছে একে অপরের সাথে । তীর্যক করেছে রক্তিম অক্ষি যুগল । সাফি আগুনে ঘি ঢাললো…
” মিট মাই ফিওনসে… মাহিতা ইসলাম মিহি ! ওরফে মাই বেইবি ডল ।
আর বেইবি ,, ও হলো রাফি,রুজান রাফি চৌধুরী । চেনোই তো । ওর কিন্তু আরো একটা পরিচয় আছে , তোমার হাবির একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল ও , কোনো এক সময় ।
তাই না রাফি , ঠিক বললাম তো ?
জানো বেইবি ,, ওর নামের সাথে নাম মিলিয়েই আমি নিজের নাম সাফি রেখেছিলাম । যে নামে শুধু রাফিই ডাকতো আমায় ।
রাফি হাতের মুঠো আরো শক্ত করলো । হাতের তালুতে দেবে গেছে আঙ্গুল । লাল হয়ে উঠেছে ওর মুখশ্রী । রাফি বললো..
অস্বাভাবিক কন্ঠ ওর…
” সারফারাজ , ছাড় ওকে !
” ওমা ছাড়বো কেনো ? ধরেছি কি ছাড়ার জন্য ? হানিমুনে নিয়ে যাচ্ছি ওকে , বিয়ের আগে সেকেন্ড টাইম হানিমুন ? তাই না বেইবি ? ফাস্ট তো কানাডায় ছিলো ।
রাফির ক্ষিপ্ততা বারলো । সংবরন হলো না আর । মিহি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে ভেতর ভেতর । মিশে যেতে ইচ্ছে করছে মাটির সাথে । কি সব বলছে এই লোকটা ? তাও রাফির সামনে ?
রাফি চোখ বুজলো । বললো বন্ধ চোখেই…
” ছাড় ওকে !
ছাড়লো না । উল্টে বলল…
” কদিন পর বিয়ে করবো আমার বেইবি কে । আমাদের মাঝে আসিস না তো । আমাদের একটু সময় কাটাতে দে একে অপরের সাথে । চিন্তা করিস না , একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলি বলে কথা , ইনভাইট করবো তোকে বিয়েতে । চলে আসিস । আর কি যেনো নাম তোর বোনের , রুহি, তাইতো ? ও তো আবার আমার বেইবির বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল , শুধু ছিলো আর ছিলো , আমার বেইবির লাইফেও আর আমার লাইফেও । এক কাজ করিস ওকেও নিয়ে আসিস ।
রাফি হুংকার ছাড়লো…
” সারফারাজ ,, ছাড় ওকে !
ছাড়লো না ! আবার হুংকার রাফির । এবার মিহির উদ্দেশ্যে…
” মিহি ,, এসো আমার কাছে !
মাথা তুললো না মিহি । আর না প্রতিক্রিয়া দেখালো । সাফি ছাড়লো এবার ,, বললো…
” যাবে বেইবি ?
মিহি অনড় । সাফি হাসলো পৈশাচিক । রাফির দিকে তাকিয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো মিহির দিকে । বললো একই ভাবে তাকিয়ে…
” হাত ধরো বেইবি !!
সাথে সাথে কিছুই করলো না মিহি । নিঃশব্দে পানি গড়ালো গাল বেয়ে । ও ঝোলানো হাত খানা কেঁপে কেঁপে তুললো । রোবটের ন্যায় আদেশ তামিল করলো ,, ধরলো সাফির হাত । এটাই যথেষ্ট ছিলো । চড়াও করে উঠলো রাফির মস্তিষ্ক । মস্তিষ্কে দপ করে জ্বলে উঠলো আগ্নেয়গিরি । আর এক মুহূর্ত ও অপেক্ষা করলো না । তেড়ে এসে তীব্র শক্ত হাতের একটা আঘাত ফেললো সাফির মুখে । ছিটকে দূরে সরে গেলো সাফি । এক টানা কয়েক কদম পিছিয়ে ধপ করে পড়লো মাটিতে । আচমকা আঘাতের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না ও । ওর তো কল্পনাতেই ছিল না ।
চমকে উঠলো মিহি । ছলকে উঠলো ভীত নারী সত্ত্বা । রাফি এবার গর্জে উঠলো মিহির উপর…
” নেমকহারামের বাচ্চা …
চল আমার সাথে !!
এক মুহুর্ত দেরি হয় নি । মিহি সবটা বোঝার আগে ওকে এক প্রকার হিচড়ে গাড়িতে তুললো রাফি । নিজে ঘুরে এসে বসে মিহির সাথে সিট বেল্ট বাঁধলো শক্ত করে । ডান হাতের কব্জি ধরলো শক্ত করে । অন্য হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে স্টার্ট করলো গাড়ি । মিহি নির্বোধের ন্যায় চেয়ে । ও পেছনে তাকলো , রাস্তায় নাক চেপে ধরে বসে আছে সাফি । রক্ত হাতে ।
এদিকে রাফির অবস্থা অস্বাভাবিক । চোখ মুখ অস্বাভাবিক । মিহি কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করলো…
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ? ছাড়ুন ! পেছনে সাফি..
কথা শেষ করতে পারলো না । রাফির কন্ঠে বজ্রপাত হলো তার আগেই….
” চুপ !! হারামি !! আর একটা কথা বললে জ্বিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো তোর !
কেঁপে উঠলো মিহি । হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগলো । গাড়ির গতিও রাফির ন্যায় অস্বাভাবিক । একে বেঁকে উগ্র ভাবে চলছে গাড়ি । যেকোনো সময় কিছু ঘটে যেতে পারে এতে । মিহির গলা শুকিয়ে আসছে । শুল্ক ঢোক গিললো ও । রাফির চোখ এই মুহূর্তে গাঢ় লালচে । মুখের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে ।
মিহি ফের বললো….
” ছেড়ে দিন আমায় ! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? ছাড়ুন বলছি…
” …..
মিহি ছোটাছুটি করছে । গাড়ির গতি এক হাতে নিয়ন্ত্রণে নেই রাফির । মস্তিষ্কের তীব্র দহনে খেই, নিয়ন্ত্রণ দুটোই হারিয়ে গাড়িটা ধাক্কা খেলো রাস্তার পাশের গাছে । মিহি সামনের দিকে ছিটকে পড়তে গেলে ওকে নিজের দিকে টেনে আনলো রাফি । ধোঁয়া বেরোচ্ছে ইন্জিন থেকে । মিহি কে ছেড়ে গাড়ি থেকে নামলো রাফি । ঘুরে গিয়ে এক টানে নামালো মিহি কে । গাড়ি থেকে কয়েক কদম দূরে আসতেই গাড়ির গরম ইঞ্জিনে আগুন লাগতে দেরি হয় নি । গাড়ির সাথে সাথে মাথা তেও আগুন জ্বলছে রাফির । গাড়ির দিকে খেয়াল নেই ওর । মিহি ভীত নয়নে পিছনে তাকালো । গাড়িতে আগুন দেখে বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো ওর । রাফি রাস্তায় তুলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওকে । মিহি চলছে ওর শক্তিতেই । একটু এগিয়ে নিজের শক্তিতে এক ঝটকা মারলো রাফির হাত । চিৎকার করে উঠলো….
” ছাড়ুন আমায়….
সঙ্গে সঙ্গে রাফির টাটানো দৃষ্টির সম্মুখীন । মিহির দুই বাহুতে নিজের সর্ব শক্তি উজাড় করলো রাফি ।
উগ্র কন্ঠে বলে উঠলো রাফি….
” ছাড়বো , হ্যাঁ ? আমাকে ছাড়তে বলছিস ? ওকে ধরেছিলি কেনো বল ? ছুঁয়েছিস কেনো ওকে ? ও তোকে ছুঁলো কেনো বল ? কেনো ? তোকে বলেছিলাম না , তোকে ছোঁয়ার অধিকার যেন শুধু আমার হয় ! বল বলেছিলাম কি না ? আমি তো তোকে ছুঁই নি এখনো ! তাহলে ও তোকে ছুঁলো কেনো ?
আর কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে ও তোকে ? হ্যাঁ ? বল ? হানিমুনে গেছিলি ওর সাথে ? কি বললো ও এসব ? কেনো বললো ? নেমকহারাম ! লজ্জা করলো না তোর ? খারাপ লাগলো ওর ছোঁয়ায় ?
মিহিও তেঁতে উঠলো….
” আরে কি সব বলছেন এসব ? ছাড়ুন আমায় ! উনি আমার হবু স্বামী ,, বুঝলেন ? বিয়ে হবে ওনার সাথে আমার….
কথা শেষ হতে না হতেই ঠাস করে একটা শক্ত চড় পড়লো মিহির নরম গালে । ছিটকে খাঁজ কাটা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়লো মিহি । অবিশ্বাস্যে তৎক্ষণাৎ চাইলো রাফির পানে । ব্যাথা অনুভূত হলো কি না কে জানে ? চোখ দিয়ে টপাটপ পানি গড়ালো । রাফি আবারো তুললো ওকে ! বিমূক চাহনি মিহির । একটার টাল সামলে উঠতে না পেরেই ফের একটা বলিষ্ঠ শক্ত চড় পড়লো অপর গালে । আবার হুমড়ে পড়লো মেয়েটা । তীব্র ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো এবার । রাফি আবার একই ভাবে টেনে তুললো ওকে । চোখ ছাপিয়ে পানি গড়িয়েছে পুরুষালি দুটি চোখেও । মিহির শক্তি নেই দাঁড়িয়ে থাকার । রাফি নিজের শক্তিতে দাঁড় করালো ওকে । একটুও নরম হলো না আজ , বরং ক্ষিপ্ততা বেড়েই চলেছে পাল্লা দিয়ে । সে আবারো বললো…
” হবু স্বামী ও তোর ? তাই ওর স্পর্শে খারাপ লাগে নি । আর আমার স্পর্শ ? আমার স্পর্শ পবিত্র হয়েও খারাপ লাগছে তোর কাছে ? জঘন্য মেয়ে ? কেনো এসেছিলি আমার জীবনে ? এই রকম নিচ, মিডেল ক্লাস, মেয়ে কেনো এসেছিলি বল ?
আসলি যখন তখন এমন করলি কেন ? চলে তো গেছিলি , আবার আসলি কেন আমার সামনে ? কেন জড়ালি আমাকে তোর মতো একটা মেয়ের সাথে ?
শোন , যদি তুই আমার না হোস না , তাহলে আমি কিন্তু তোকে কারোর হতে দেবো না । একদম জিন্দা পুঁতে ফেলবো । জানে মেরে ফেলবো তোকে । তোকেও মারবো আমিও মরবো । বুঝলি , মরবো আমি তোর জন্য ? তার আগে তোকে মারবো , মরবি আমার হাতে ? মরার এতো সখ তোর ? তোর জন্য আমি মরতেও পারবো , আর তোকে মারতেও পারবো । তবুও তোকে অন্য কারোর হতে দেখতে পারবো না । বুঝলি ?
আমাকে ছেড়ে অন্য কারোর কাছে যাচ্ছিস ? কি ভেবেছিস , ছেড়ে দেবো আমি তোকে ? কক্ষনো না ! এতো দিন ছাড়ি নি আর এখন ছাড়বো ? তোকে ছাড়লে এতো দূর আসতাম না । কি হয় হোক , তোকে তো আমার হতেই হবে । ছাড়বো না আমি তোকে…
বুঝলি ….
মিহি টলে পড়লো শক্তি হারিয়ে । পরপর দুটো শক্ত আঘাতে নেতিয়ে পড়ল । চোখ দুটো বুজে আসলো আপনা আপনি । টলে পড়লো তো পড়লো , সেটাও রাফির বুকেই ।
এতক্ষণে যেন সম্বিত ফিরল রাফির । ধ্যান জ্ঞান ফিরে আসলো আপন ঠিকানায় । মিহি জ্ঞান হারিয়ে ওর বুকে টলে পড়তেই ছ্যাঁত করে উঠলো রাফি । আলগা করলো নিজের হাতের বাঁধন । কন্ঠ শুকিয়ে এসেছে এতক্ষণে । শুল্ক ঢোক গিললো রাফি । ধীরে ধীরে মিহি সমেত বসলো রাস্তার মাঝে । ডাকলো এবার…
” মিহি ,, এই ? কি হলো ?
ওদিকে নিরব । রাফি এবার ঝাঁকালো । মিহির মুখ খানা দুহাতের আজলে নিয়ে ডাকলো মোলায়েম কন্ঠে…
” মিহি ? কি হলো তোমার ? এই , চোখ খোলো না ? প্লিজ চোখ খোলো মিহি ! মিহি ? এই , জান আমার , প্লিজ চোখ খোল ! আর জ্বালাস না আমায় প্লিজ ! চোখ খোল না রে ! এই মিহি ! মাই ডিয়ার ব্লোসোম , প্লিজ চোখ খোল ! ওঠ না…
মিহির সাঁড়া শব্দ নেই । হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এতক্ষণে লক্ষ্য করলো রাফি । মিহির দুই গাল রক্তিম । পাঁচ আঙুলের দাগ কড়া ভাবে স্পষ্ট । ছ্যাত করে উঠলো রাফি । ও মেরেছে মিহি কে ? কখন মারলো ?
রাফি ওর গালে হাত হাত রাখলো । কেঁপে কেঁপে সরালো হাত । সজোরে মিহিকে আঘাত কৃত নিজের হাত বাড়ি মারলো পিচ ঢালা রাস্তায় । জখম হয়ে রক্ত ঝড়লো তৎক্ষণাৎ ।
রাফি আতঙ্কিত হয়ে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলো…
” মিহি ?
ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট । পায়ের এক লাথিতে দরজা হাট করে খুললো রাফি । পুরোটা ফাঁকা অন্ধকার । আলো জ্বালানোর প্রয়োজন বোধ করলো না , সময় পেলো না সে । মিহি দুহাতের বন্ধনে আবদ্ধ । ছোট্ট শরীর খানা রাফির দখলে । নেতিয়ে আছে মেয়েটা । রাফি ঠাহরে সিড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠলো । এতো দিনের নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে ঢুকলো সোজা । সেটাতে সবুজ রঙা ডিম লাইট জ্বলছে একটা । রাফি বেডে শোয়ালো মিহি কে । লাইট জ্বালালো । হাত পা শিরশির করছে ওর । কাঁপছে পুরুষালি সত্ত্বা । কি করলো ও এটা ? আঘাত করলো ওর ব্লোসোম কে ?
রাফি খাটের পাশে বসলো । বেড সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে তুলে পানি ছেটালো মিহির মুখে । নড়চড় দেখা গেল না মেয়েটার । জড়িয়ে আসলো রাফি । আবারো ঢোক গিললো । ডাকলো…
” মিহি ? এই , চোখ খোলো প্লিজ । শুনছো আমায় , একবার চোখ মেলে তাকাও আমার দিকে ।
সাঁড়া নেই । রাফি এবার দ্বিধাহীন কোলে তুললো মেয়েটা কে । সোজা এগোলো ওয়াশ রুমের দিকে । মিহি কে নামিয়ে ওর নেতিয়ে পড়া শরীর টাকে দাঁড় করালো নিজের বুকের সাথে হেলান দিয়ে । শাওয়ার অন করলো রাফি । ঠান্ডা শীতল পানির ছেটা গায়ে পড়তেই কেঁপে উঠলো অবচেতন মেয়েটা । একটু হুশে এসে শিউরে উঠে দুহাতে আকড়ে ধরলো রাফি কে । আরো সিটিয়ে দাঁড়ালো রাফির প্রসস্থ বুকের সাথে । লুকালো নিজেকে সেখানে । মুহুর্তেই ভিজে জবজবে শরীর । কাঁপল মেয়েটা । রাফি শ্বাস ফেললো দীর্ঘ স্বস্তির । মিহির চোখ বোজা এখনো । জ্ঞানে ফিরেছে , তবে ধ্যানে নয় । রাফি কে আরো শক্ত করে জড়াতেই বাঁধ ছাড়ালো রাফি । শাওয়ার অফ করে হাত রাখলো মিহির পিঠে । ভেজা শরীর খানা কাঁপছে ওর । রাফি শুকনো ঢোক গিললো । হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে তীব্র গতিতে । বাড়ছে হৃৎস্পন্দন । মিহি এতোটা কাছে ওর ? চোখ বুজলো রাফি । অনুভব করলো তার ব্লোসোম কে ! মিষ্টি একটা গন্ধ , একদম পুষ্পের ন্যায় । নাকে লাগছে ভীষণ । চোখ বুজেই মুচকি হাসলো রাফি । চোখ খুললো ধীরে ধীরে । মিহি কে আলতো করে ছাড়ালো নিজের থেকে । টাওয়েল নিয়ে ভেজা শরীরে জড়িয়ে দিলো মিহির । অতঃপর তাকালো পূর্ণ দৃষ্টিতে । মিহি এখনো ওর গায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে । রাফি ওর কোমর জড়ালো সুবিধার্থে । দেখলো সম্পূর্ণ দৃষ্টিতে । ভেজা চুল লেপ্টে মিহির মুখের এখানে ওখানে । রাফি এক হাতে সরিয়ে দিলো সেগুলো । স্পষ্ট করলো মুখখানা । ভেজা মুখে পানির বিন্দু বিন্দু কনা । চোখের বৃহৎ পাপড়িতেও । আর ওষ্ঠ জোড়া তেও । ওষ্ঠ জোড়াও কাঁপছে আলতো তিরতির করে । রাফি বেশ অনেক টা মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে মিহির কপালে কপাল ঠেকালো । শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । আর আটকাতে পারল না নিজেকে । ঠোঁট বাড়িয়ে চুমু খেলো নাকের ডগায় । মিহির বিড়বিড় শব্দ কানে আসলো এই পর্যায়ে….
” উনি আমাকে ভালোবাসে নি ,, ভালোবাসে নি উনি আমায় ।
রাফি কান পেতে শুনলো । চোখ মেলে তাকালো মিহির পানে । অভিমানী মুখখানা দেখলো ওর । মিহির কানের কাছে মুখ গুজে ফিসফিস করলো…
” উঁহু…বেসেছে ভালো । উনি ভীষণ ভালোবেসেছে তোমায় …
মিহির দুই গাল লালচে । মারের দাগ স্পষ্ট । জঘম হয়ে আছে এক প্রকার । রাফি বাম গালে হাত রাখলো । নরম স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিলো সেখানে । অন্য হাতে কোমর জড়ানো । অনুতাপ জাগলো রাফির মনে । কি ভাবে মারতে পারলো এই মেয়েটাকে ? হাত উঠলো কি করে মিহির উপর ? কোন ধ্যানে ছিলো ও ? নিজের প্রতি ভীষণ রাগ উঠলো রাফির । মিহি কেঁপে কেঁপে ফুঁপিয়ে উঠছে নিজের ঘোরে । রাফিও মগ্ন ওকে চোখ ভরে দেখতে । মিহি ওর কাঁধ সমান । রাফি ওর জখমকৃত গালে হাত বুলিয়ে একটু হেলে ঠোঁটের স্পর্শ আকলো সেখানে । অপর কপোলেও তাই । কপালেও । ওর মুখশ্রীর পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিকচিকে বিন্দু কণা গুলো শুষে নিলো রাফি ।
ধীরে ধীরে বন্ধ দুচোখেও অধিকার ফলালো নিজের । অবচেতন মেয়েটা সুপ্ত অনুভূতিতে আরো বেশি আঁকড়ে ধরলো রাফি কে । সিটিয়ে গেলো । চেতনা হীনে অনুভূতির মাত্রা কতটুকু অনুভূত হলো কে জানে ?
রাফি একটু থেমে প্রগাঢ় বিমূর্ত হয়ে আরো কিছুক্ষণ তাকালো । তিরতিরে কম্পিত ওষ্ঠাধরের দিকে অগ্রসর হলো ঘোরের বশে ।
আলতো স্পর্শ আকলো সেখানে । খেই হারিয়ে স্পর্শ গভীর হওয়ার আগেই সামলালো নিজেকে । সংবরন করলো নিজের বেসামাল সত্ত্বাকে । কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজলো । পরমুহূর্তে মিহিকে জড়ালো নিজের সাথে । কাঁপছে মেয়েটা । রাফি ওকে ফের কোলে তুলে নিয়ে আসলো ঘরে । ভেজা শরীরেই শোয়ালো বিছানায় । হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে । ভড়কালো রাফি । দুই হাত একসাথে ধরে চুমু খেলো দুহাতের তালুতে । কিছু একটা ভেবে উঠতে গেলে তড়িতে ফিরলো পিছনে । গুটিয়ে আসলো ভ্রু যুগল । ফের বসলো রাফি । সুক্ষ্ম নেত্রে তাকালো মিহির দিকে । মেয়েটার গলা থেকে জামার অংশ সরে গেছে অনেকটা । ঠিক গলার নিচে দৃষ্টি পড়লো রাফির । সুচালো তা । রাফি হাত বাড়ালো । আর একটু উন্মুক্ত করলো মিহির গলার অংশ । যা দেখলো তাতে কপালে বেশ কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো ওর । নিঃশ্বাস থমকালো এক মুহুর্তের জন্য । ঝট করে উঠলো রাফি । দ্রুত বেরোলো ঘর থেকে ।
সকাল আটটার কোঠায় । পিটপিট করে চোখ খুললো মিহি । মাথা টা ভীষণ ভার । জ্বলছে চোখ দুটো । কম্ফোর্টারের উষ্ণ আরাম থেকে উঠলো ধীরে ধীরে । মাথা চেপে চোখ ধীরে ধীরে মেললো সম্পূর্ণ । আশপাশ টা নজরে আসতেই ছলকে উঠলো । ভড়কালো ঝট করে । বৃহৎ হলো পিটপিট অক্ষি যুগল । ছ্যাত করে উঠলো মিহি । কোথায় ও ? অচেনা জায়গা , কার ঘর এটা ? মিহি আশপাশ থেকে এবার নিজের দিকে চোখ ফেরাল । আঁতকে উঠলো দ্বিগুণ । কিসব পড়নে ওর ? ওর ড্রেস কোথায় ?
মিহির পড়নে ঢিলে ঢালা একটা ফুল হাতা টি শার্ট । যেটার গলা কাঁধে নেমেছে । ঢিলে হয়ে খুলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । ঢিলে ঢালা একটা প্যান্ট পড়নে । মিহি তলিয়ে গেছে মনে হচ্ছে । বৃহৎ নয়নে তাকালো ও , শ্বাস আটকে গেছে গলায় । কোথায় ও , আর এসব কি ? কি করে হলো ? মিহি শ্বাস টানলো , স্থির হলো । ওর পড়নের টি শার্ট থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে । যেটা পরিচিত । মিহি শার্টের কলারের অংশে নাক ডোবালো । চোখ বুজে টেনে নিলো গন্ধটা । আন্দাজে ঠেকতেই আঁতকে উঠলো পুনরায় । ধারনা জাগলো অনেক কিছু । গলা শুকিয়ে আসছে মিহির । ও পুরো ঘর দেখলো ভালোভাবে । খানিক অন্ধকার ঘর । লাইট নেভানো । বারান্দার পর্দা টেনে রাখা । যাতে মিহির ঘুমে বিভ্রান্তি না ঘটে তাই এসব । মিহি নামলো ধীরে ধীরে । সোজা হয়ে দাঁড়াতেই টিশার্ট নামলো হাঁটু পর্যন্ত । প্যান্ট পেরিয়েছে পায়ের গোড়ালি । টিশার্টের গলা নেমে যাচ্ছে কাধ থেকে । মিহি নিজেকে দেখে ঠোঁট উল্টালো । পিটপিট করে বেরোলো ঘর থেকে । করিডোর থেকে নিচে তাকালো । কাউকে নজরে আসলো না নিচে । সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো মিহি । কেঁপে কেঁপে পা বাড়ালো এদিক ওদিক চেয়ে চেয়ে । বিশাল ড্রইং, পুরোটা ফাঁকা । ঢোক গিললো মিহি । চোখে মুখে আতংক ।
এক জায়গায় থমকে ঘুরলো চারপাশ । আচমকা একটা পুরুষালি ভরাট কন্ঠ….
” উঠে পড়েছো ?
আঁতকে উঠলো মিহি । চাইলো তড়িতে ঝট করে । কেঁপে উঠলো পুরো চিত্ত । বিশাল আকার সিঙ্গেল সোফায় রাফি বসে । উপর থেকে দেখা যায় নি । হাতে ল্যাপটপ । পড়নে ধুসর রঙা টি শার্ট । মিহির আতংকিত ভীত মুখ খানা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো রাফি । ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়ালো । ও এগিয়ে আসতেই পেছালো মিহি । বললো থেমে থেমে….
” আমি , আমি এখানে কেনো ? কোথায় নিয়ে এসেছেন আমায় ?
” জানি না কোথায় , রাস্তার পাশে একটা পরিত্যক্ত সাজানো গোছানো বাড়ি পেলাম । ফাঁকা ছিল , তাই তোমায় নিয়ে ঢুকে পড়েছি ।
মিহি পেছাতে পেছাতে নিচু স্বরে ভয় জড়িত কন্ঠে বলল..
” আমার, আমার ড্রেস , ড্রেস চেঞ্জ কে করেছে আমার ? এসব কোথা থেকে আসলো ?
রাফি এদিক ওদিক তাকালো । খানিক ভাবুক করলো মুখো ভঙ্গিমা । থুতনিতে দুই আঙ্গুল রেখে বললো ভনিতা হীন…
” আশে পাশে তো কাউকে দেখছি না । তুমি খুঁজে দেখো, যদি কাউকে পেয়ে থাকো । আর যদি না পেয়ে থাকো তাহলে যাকে একমাত্র দেখছো সেই চেঞ্জ করেছে হয়তো ।
মিহি থামলো । সজল হয়ে আসছে চোখ । মাথা ভনভন করছে । চেঁচিয়ে উঠলো ও….
” কি সব বলছেন ? বলুন আমার ড্রেস চেঞ্জ করেছে কে ?
রাফি উত্তর করলো না । উল্টো ঠোঁট কামড়ে বললো…
” আমার টিশার্ট আর প্যান্টে তোমাকে কিন্তু দারুণ মানিয়েছে !
বিরক্ত হলো মিহি । কটাক্ষ করলো….
” অসভ্য লোক !
কালকের কথা মনে পড়তেই ফুঁপিয়ে উঠলো মিহি । এই লোকটা মেরেছিল ওকে । কি না কি বলেছে ! আর এখন ?
চোখ মুখ কুঁচকে নাক টানলো মিহি । পিছনে পিছিয়ে ধপ করে বসলো সোফায় । দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো । রাফি জিভে কামড় বসালো । বেশি বেশি হয়ে গেছে । ও এগিয়ে বসলো মিহির সম্মুখে । ওর হাত দুটো সরাতেই ছ্যাত করে উঠলো মিহি…
” ছোঁবেন না আমায় ! দূরে যান ।
রাফি বললো আলতো স্বরে…
” আমি চেঞ্জ করি নি । ফিমেল হাউস সিটার আছেন , উনিই করে দিয়েছেন ।
থামলো মিহি । হেচকি তুলে বললো…
” তাহলে বললেন কেনো ?
” এমনি ! সত্যিই বলছি , আমি চেঞ্জ করি নি ! হাউজ সিটার আসলে ওনাকেই জিজ্ঞেস করে নিও ,,
একটু থেমে রাফি ধীর কন্ঠে ডাকলো…
” মিহি ?
চোখ তুলে তাকালো মিহি । রাফির অদ্ভুত দৃষ্টি ।
চেয়ে থেকেই প্রশ্ন করলো রাফি…
” সারফারাজের সাথে কি সম্পর্ক তোমার ?
ফোপাচ্ছে মেয়েটা । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বাচ্চাদের ন্যায় বাধ্যের মতো উত্তর করলো…
” কোনো সম্পর্ক নেই ।
” তাহলে ও এসব বললো কেনো কাল ?
” জানি না !
মিহি একটু থেমে বললো…
” আব্বু ওনার সাথে বিয়ে ঠিক করেছিল আমার । আমি জানতাম না । আব্বুর শেষ ইচ্ছে এটা । এখন আমার আর কিচ্ছু করার নেই ।
কথা শেষ করেই ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে উঠলো । রাফি বললো…
” কে বলেছে তোমাকে এসব ?
” উনি ও বলেছে , আর আম্মু ও । তাইতো সবার থেকে দূরে চলে এসেছিলাম । আব্বুর মৃত্যুর পর আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ উনি বাড়ি ছাড়ালেন আমাদের । তারপর দিনই দেশ ছাড়ালেন । আমি কারোর সাথে কন্টাক্ট করি নি , কেনো জানেন ? কারন, আম্মু কছম দিয়েছিল আমাকে । যেন কারোর সাথে সম্পর্ক না রাখি । রুহির সাথেও না । ফোন ও নেই আমার কাছে । আমি আম্মুকে হারাতে চাই না । কথার অবাধ্য হতে চাই না তার । আব্বু কে হারালাম । তার শেষ ইচ্ছে টা না হয় পূর্ণ করি ।
” নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ?
সারফারাজ কে বিয়ে করবে তুমি ?
মিহি উত্তর করলো না । ফোপালো শুধু । পানি গড়িয়ে পড়ছে চোখ থেকে গাল বেয়ে । রাফি হাত বাড়িয়ে ওর গালে রাখলো । ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো মিহি । অনুভুত হলো চিনচিনে ব্যথা । চোখ মুখ ব্যাথায় বিকৃত করতেই তৎক্ষণাৎ হাত সরালো রাফি । বললো…
” আমিও যদি মরে যাই , তাহলে আমার শেষ ইচ্ছে টা থাকবে তোমাকে পাওয়ার ! বেঁচে থাকতে আমার শেষ ইচ্ছে টার মুল্য দাও , মরে গেলে কিন্তু পাবে না আমায় ।
কেঁপে উঠলো মিহি । বললো থতমত স্বরে…
” কি সব বলছেন ?
” মরে যাওয়ার কথা ! যদি মরে যাই….
কথা শেষ করতে পারলো না । আটকে দিলো মিহি । বললো নিজেকে স্বাভাবিক করে…
” আমার জন্য মরবেন ?
” তোমাকে পেলেই বাঁচবো ! আন্টিকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার । তুমি শুধু একটু প্রশ্রয় দাও আমায় ।
” কি আছে আমার মাঝে…?
” তোমার মাঝে তুমিই আছো , যে অন্যদের মাঝে নেই । আর আমার এই তোমাকেই চাই , অন্যদের নয় ।
” যদি আমি আপনার না হোই ?
” মরে যাবো !
” লিনা আপু কে বিয়ে করে নিন ! উনি আপনাকে চায় । আমাদের তাকেই বেছে নেওয়া উচিত,যে আমাদের চায় !
” তাহলে তুমি আমাকে নিয়ে নাও , আমি তো তোমাকে চাই ।
মিহির কন্ঠ জড়িয়ে আসছে । পানি পড়ছে চোখ থেকে । মন মানছে না । রাফি হাত বাড়িয়ে ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি টুকু মুছিয়ে দিতেই আহ্ সূচক মৃদু আর্তনাদে কুকিয়ে উঠলো মেয়েটা । গাল জ্বলছে এখনো । রাফি স্বশব্দে আঁতকে উঠলো…
” সরি… লেগেছে ভীষণ ? সরি জান…. আমি মারতে চাই নি তোমায় । মাথা ঠিক ছিল না আমার । কখন হাত উঠে গেছে নিজেও বুঝতে পারি নি । সরি ,, এবারের মতো ক্ষমা করে দাও ! কাল রেগে ছিলাম একটু..
নাক টেনে অভিমানী কন্ঠ ভেসে আসলো মিহির…
” কেউ একজন বলেছিলো , আমার প্রতি নাকি তার রাগ আসে না !
রাফি নরম হাসলো । আরো একটু দুরত্ব ঘুচলো । বললো হিম শীতল কন্ঠে…
” সেই একজন আজ আবার বলছে , আর কক্ষনো সে রাগবে না তোমার উপর ! এটাই শেষ …
মিহির অভিমানী কন্ঠের তোপ বাড়লো । ঠোঁট উল্টে অভিযোগ করলো…
” আপনি মেরেছেন আমায় !
” আর মারবো না !
” বকেছেন !
” আর বকবো না !
” ধমকেছেন !
” আর ধমকাবো না !
” রাগ দেখিয়েছেন !
” আর কক্ষনো দেখাবো না !
” কষ্ট দিয়েছেন !
” আর একটুও দেবো না !
মিহি সজল চোখে ঠোঁট উল্টে মুচকি হাসলো । অভিমানী কন্ঠ ঠেলে খাদে নামালো কন্ঠ । কথার টোন একই রেখে বললো চোখে চোখ রেখে…
এক দেখায় পর্ব ৪২
” ভালোবেসেছেন ?
” আরো বাসবো । অনেক অনেক বেশি বাসবো । সারাজীবন বাসবো । ভালোবেসেছি, বাসি আর বাসবো । জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি শুধু তোমাকেই ভালোবাসবো । তুমি চাইলেও বাসবো না চাইলেও বাসবো । এই রুজান রাফি চৌধুরী শুধু তোমাকেই ভালোবাসবে…
শুধু তার ব্লোসোম কেই ভালোবাসবে ।
