অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৪
ফাহিমা ইসলাম
দিবাকর এখন ধীরে ধীরে পশ্চিমাকাশের দিকে কাত হয়ে পড়ছে, অথচ তার প্রখরতা এখনো নিঃশেষ হয়নি।সমুদ্রতটজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত স্বর্ণাভ-নীল আভা।দূর দিগন্তে আকাশ আর জলরাশির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াটে নীলিমার এক মায়াবী বিভ্রম।নারিকেল গাছের দীর্ঘ ছায়াগুলো বালুর উপর আঁকিবুঁকি কাটছে।সামুদ্রিক বাতাসে বারবার উড়ে যাচ্ছে তূর্ণার কেশরাশি। তূর্ণা দাঁড়িয়ে আছে কটেজের প্রশস্ত বারান্দায়। বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে, ভীষণ রকমের ভালো লাগা কাজ করছে। কালকে রাতের পর তূর্ণা লজ্জায় রৌদ্রিকের সামনেও যাচ্ছে না। ভাবতেই কেমন লজ্জা লাগছে তার! অথচ রৌদ্রিকে দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি। তাই রুমের ভিতর ভুলেও প রাখছে না। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জ শুনতে ব্যস্ত সে। হুট করেই কারো উপস্থিতি টের পেতেই তূর্ণা পিছন ফিরতে নিলে রৌদ্রিকের প্রস্তর বুকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় পিছিয়ে যায় কয়েক কদম। চোখ তুলে তাকাতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিকে দেখতে পায়।যেকিনা তার গভীর কৃষ্ণবর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকেই। তার দৃষ্টিতে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা।যে কোমলতা সচরাচর প্রকাশ পায় না তার দৃষ্টিতে।
রৌদ্রিকে দেখেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। সেটা দেখে রৌদ্রিক ভ্রু কুঁচকিয়ে হেসে ফেলে হালকা।
“ আদর নিয়ে নিজেই লজ্জার সাগরে ভেসে যাচ্ছো। আবার বেবিও চাচ্ছো বাহ!”
রৌদ্রিকের এমন কথায় তূর্ণার লজ্জা যেনো আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। লজ্জায় হাসফাস করছে সে! রৌদ্রিক সেটা দেখে আর লজ্জা দিলো না তূর্ণাকে। তূর্ণার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের হাতে বন্দী করে নিয়ে, রুমের ভিতরে টেনে আনে। ভিতরে আসতেই তূর্ণার সাদা বেডসিটের উপরে অপরূপ নীলাভ শাড়ি দেখতে পায়। তূর্ণা বুঝলো না এইসব কার, তাই চেয়ে রইলো সেদিকে। রৌদ্রিক ধীর পদক্ষেপে তূর্ণার নিকটবর্তী হলো। তারপর নিজ হাতে তুলে নিলো নীল শাড়িখানা।
“ যাও চেঞ্জ করে আসো।”
“ ক…কেনো?”
” শাড়ি পরাবো তাই!”
রৌদ্রিকের এমন কথায় জমে গেলো তূর্ণা। না চাইতেও শুঁকনো একটা ঢোক গিলে নিলো সে। তূর্ণা কম্পিত গলায় বলে-
“ আ..আপনি পরাবেন?”
“ হুম। যাও এইগুলো পরে আসো।”
বলেই তূর্ণার হাতে পেটিকোট আর ব্লাউজ ধরিয়ে দিলো। তূর্ণা কিছু বললো না কম্পিত পায়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। রোদেলা নিজের মত করে বসে রয়েঢ়ে, রৌদ্রিক এগিয়ে গিয়ে চিরুনি হাতে নিয়ে মেয়ের চুল বেঁধে দিতে থাকে। রোদেলার গায়ে জড়িয়ে দিলো একই রকম নীল রঙের ফ্রক, তুলতুলে শরীরে জামাটা পরার কারণে অসম্ভব রকমে সুন্দর লাগছে রোদেলাকে।
“ আমার রোদ সোনাকে তো পরী লাগছে।”
বাবার প্রসংশায় লজ্জা পেলো রৌদ্রিক, হেসে উঠে রৌদ্রিকের গলা জড়িয়ে বলে-
“ তুনি তাতিয়ে দিয়েতো যে তাই পলীলি মত লাগছি।”
“ তাই বুঝি! আমার আম্মু তো এমনি পরী। তাই পরীকে আর সাজিয়ে দিয়ে আরও সুন্দর হয়ে গেছে।”
রৌদ্রিকের প্রসংশায় রোদেলা পুলকিত হয়ে উঠলো। হেসে উঠলো খিলখিল করে, রৌদ্রিকে মেয়েকে কিছু সময় আদর করে বলে-
“ মা’য়ের জন্য যে সারপ্রাইজ রেখেছি সেটা একদমই বলবে না কিন্তু। ওকে?”
রোদেলা হেসে উঠে বলে-
“ না, বলবো না একদত বলবো না!”
“ তুনি মাকে তাতাবে না পাপা?”
“ সাজাবো তো।”
“ মা’কে অনেত তুন্দল করে তাতিয়ে দাও ওকে পাপা!”
মাথা কাত করে মায়া মায়া চোখে বলে ওঠে রোদেলা। রৌদ্রিকে মেয়ের ললাটে চুমু দিয়ে বলে-
“ দিবো তো সোনা।”
“ আত্তা আমি যাই, তুনি মা’কে তাতিয়ে দাও তো তলদি।”
বলেই বুকে পুতুল নিয়ে কটেজের বারান্দায় চলে যায়। কিছুখন পর তূর্ণা বের হয়ে আসে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে। এর আগেও রৌদ্রিক তাকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তখন এতটা লজ্জা কাজ করেনি যতটা না আজকে করছে। কম্পিত পায়ে এগিয়ে আসতেই রৌদ্রিক তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তূর্ণা শিরদাঁড়া অব্দি কেঁপে উঠলো!
রৌদ্রিক শাড়ি নিয়ে তূর্ণার নিকট আসতেই তূর্ণা লজ্জায় পিছিয়ে যেতে নিলেই; রৌদ্রিক তূর্ণার উম্মুক্ত কোমড় আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনে।
রৌদ্রিকের আঙুলের স্পর্শে কেঁপে উঠলো তূর্ণার সমস্ত অস্তিত্ব। খিঁচিয়ে বন্ধ করে নিলো নেত্রপল্লব! রৌদ্রিক তূর্ণার খিঁচিয়ে বন্ধ করে থাকা মুখশ্রীর পানে চেয়ে থেকে ধীর স্বরে বলে-
“ চোখ খোল তূর্ণা।”
তূর্ণা কিছুসময় পর পিট পিট করে চোখ মেলে তাকায়। রৌদ্রিক তার দিলেই তাকিয়ে আছে। তূর্ণা অনেকক্ষণ পর সাহস বলে ওঠে-
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?” মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলো তূর্ণা। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নির্বাক চেয়ে রইলো তার দিকে।পরক্ষণেই গভীর স্বরে বললো-
“ সমুদ্রকে আজ প্রথমবার তুচ্ছ মনে হচ্ছে।”
তূর্ণা ভ্রু কুঁচকালো।
“মানে?”
“ এতদিন ভেবেছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর জিনিস এই সমুদ্র। আজ বুঝছি, আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির নয়নের গভীরতার কাছে সেই জলরাশি নিতান্তই অগভীর।”
তূর্ণা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরলো। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না, রৌদ্রিক তূর্ণাকে ছেড়ে শাড়িটা তুলে নিয়ে, ভাঁজ খুলে রৌদ্রিক ধীরে ধীরে শাড়িটা তূর্ণার শরীরে জড়িয়ে দিতে লাগলো।প্রতিটি ভাঁজ এত নিখুঁত যত্নে ঠিক করছে, যেন কোনো দুর্লভ শিল্পকর্ম নির্মাণ করছে। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে রৌদ্রিক শাড়িটার কুঁচি তৈরি করলো, তারপর কোমরের কাছে আঁচল গুঁজে দিলো। রৌদ্রিকের হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো আবারও। লজ্জায় কেমন লাল হয়ে উঠেছে সে! রৌদ্রিক শাড়ি ঠিকঠাক করে, তূর্ণাকে মাথা থেকে পা অব্দি দেখে ধীর শান্ত স্বরে বলে-
” নীল রঙটা তোমার উপর নিষ্ঠুররকমের সুন্দর লাগে।”
রৌদ্রিক যেনো পন করে নিয়েছে আজকে তার কথা দ্বারা তূর্ণাকে লজ্জায় রাঙিয়ে দিবে। তূর্ণা হালকা হেসে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।রৌদ্রিক আবারও এগিয়ে এসে নিজের হাতে তার খোলা চুলগুলো আঁচড়ে পেছনে সরিয়ে দিলো।কানের পাশে গুঁজে দিলো ক্ষুদ্র সাদা শঙ্খফুল। কপালে পরিয়ে দিলো নীল পাথরের টিপ। একে, একে হাতের মধ্যে সাদা রঙের কাঁচের চুড়ি গুলো অতি যত্নসহকারে পরিয়ে দিতে থাকে। তূর্ণা পুরোটা সময় স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। ঠিক তখনই ছোট ছোট পদক্ষেপে দৌড়ে এলো রোদেলা। তার গায়েও নীলাভ ছোট্ট ফ্রক।চুল দু’পাশে বাঁধা
” মা-মা… তুমি পিনসেস!
তূর্ণা পাশ ফিরে রোদেলাকে দেখতেই গাল ভড়ে হেসে ওঠে।তূর্ণা হাঁটু গেড়ে বসতেই রোদেলা তার গলা জড়িয়ে ধরলো।
” আমি প্রিন্সেস?”
“হুম! আমাল পিনসেস!
তূর্ণা হেসে উঠলো, তূর্ণা রোদেলার দুই গালে টুপটুপ করে চুমু একে দিলো। রোদেলাকে বড্ড আদুরে লাগছে এমন সাজে।
“ আমার পুতুলকে তো পরীর মত লাগছে, সেটা কে বলবে হ্যাঁ!”
রোদেলা হেসে ফেললো তূর্ণার কথায়। তারপর তূর্ণার গালে চুমু দিয়ে বলে-
“ আই নো মা, তুতুল টা কার দেকতে হবে তো।”
বলেই শব্দ করে হেসে পেললো রোদেলা। রোদেলার এমন ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে হেসে ফেললো রৌদ্রিক। রোদেলা খিলখিলি করে হেসে উঠা হাসির শব্দ যেন সমুদ্রের গর্জনের মাঝেও আলাদা করে শ্রুতিমধুর হয়ে উঠলো।
“ বাহিরে চল।”
বলেই রৌদ্রিক তূর্ণা চোখে কালো রঙের একটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে দিলো। তূর্ণা হতবিহ্বল হয়ে গেলো এমনটা করায়। বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে। রৌদ্রিক তূর্ণার হাত আঁকড়ে ধরে অন্যহাত দিয়ে রোদেলাকে কোলে তুলো নিলো।
“ কি করছেন? চোখ বাঁধলেন কেনো?”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিলো না। কটেজ থেকে বের হয়ে বিচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যত সামনে আগাচ্ছে তোত সামুদ্রিক বাতাস আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠছে। সূর্যের আলো এখন নরম কমলাভ আভা ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে।
রৌদ্রিক তূর্ণার হাত আঁকড়ে ধীরে ধীরে নিয়ে চলেছে সমুদ্রতটের দিকে।অপর হাতে রোদেলার ক্ষুদ্র আঙুল। সে কোলে না থেকে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হেঁটে চলেছে পাপার সঙ্গে। কিছু সময় পর কাঙ্ক্ষিত সময় পরর রৌদ্রিক তূর্ণার চোখের বাঁধন খুলে দিতেই তূর্ণা বিস্মিত নয়নে চারপাশ দেখলো। এতক্ষণ ছটপট করছিলো কি হবে সেটা দেখার জন্য। তার সামনে বালুকাবেলার এক নির্জন প্রান্তজুড়ে সাজানো অসংখ্য নীলাভ ও শুভ্র প্রদীপ।বাতাসে দুলছে ক্ষুদ্র আলোকশিখা। চারদিকে ছড়ানো শঙ্খ, সাদা ফুল আর নীল কাপড়ের মৃদু আবরণ। মাঝখানে কাঠের ছোট্ট টেবিল।তার উপর কাঁচের জারে জ্বলছে ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু। তূর্ণা স্তব্ধ হয়ে গেলো এইসব, চারিপাশটা ভীষণ সুন্দর করে সাজানো। না চাইতেও তূর্ণার চোখ আটকে আছে সেদিকেই। নেত্রকোণে অশ্রু চিকচিক করে উঠলো। কম্পিত গলায় বলে ওঠে-
“এ.. এসব কি?
রৌদ্রিক ধীরে তার সম্মুখে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি বরাবরের মতই অস্বাভাবিক রকম শান্ত।
“ জীবনে তোমাকে খুব কমই কিছু দিতে দিয়েছে, তূর্ণা।
শুধু অস্থিরতা, ভয় আর আক্ষেপ দিয়েছে। তাই আজকের এই সন্ধ্যাটা তোমায় দিলাম। যেখানে তোমার চোখে কোনো দুঃখ থাকবে না। তোমার জীবনে সব আক্ষেপ আমি দূর করে দিতে চাই। আজীবন সুখ হও তুমি।”
তূর্ণার নয়ন ভিজে উঠলো। সামুদ্রিক বাতাসে তার আঁচল উড়ে গিয়ে বারবার রৌদ্রিকের গায়ে আছড়ে পড়ছে। তূর্ণার সত্যি জানা নেই এত সুখ তার জীবনে ছিল। রৌদ্রিক নামক পুরুষটা তার জীবনে না আসলে হয়তো তার জীবনে সুখ কি জিনিসটা সেটা জানতে পারতো না। রৌদ্রিক ধীরে তার মুখশ্রী দু’হাতে আবদ্ধ করলো। তূর্ণার টলমল নয়ন বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুবিন্দু। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো এই আয়োজন শুধুই তার জন্য, তারজন্য নিজের পিতাও একটা সুত এনে দিয়েছি কিনা সন্দেহ। তাই তো মানুষ বলে দুঃখের পরই সুখ আছে। জীবনটা তার কেটেছে মানুষের অবহেলায়, কটাক্ষ,অপমান,অত্যাচারের মধ্য দিয়ে। অথচ তাই অভাগার ভাঙ্গেই এত সুখ লেখা ছিল সেটা কি জানতো? কোনোদিন ভাবেও সে তার বিয়ে হবে, তার সংসার হবে। পাগলের আবার সংসার হয় নাকি! সমাজ তো হাসবে পাগলের এত সুখ দেখে। কেউ বলবে এই পাগলের এত সুন্দর একটা সংসার হয়েছে৷ যে সংসার তাকে আগলে নিয়েছে এতটা আপন করে। সংসার কি জিনিস জানা নেই তূর্ণার, তার চিন্তা জুড়ে দুটো মানুষই জড়িয়ে আছে৷ তার বর, অপরটা তার অতি সখের পুতুল। তূর্ণা টলমলে দৃষ্টিতে রৌদ্রিকের পানে চেয়ে ভেজা গলায় বলে ওঠে-
“ আপনি আছেন বলেই আমি এই পাগলটা হাসতে শিখেছি নতুন করে। আপনি আছেন বলেই জীবনের অপূর্ণতাগুলো পূর্ণতা পাচ্ছে। আপনি আমার জীবনে এক আলো দূত হয়ে এসেছে বর! আপনাকে আমি ভালোবাসি! ভালোবাসি আপনাকে, আমায়ও কি ভালোবাসেন বর?”
অশ্রুসিক্ত জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রিকের নির্লিপ্ত মুখপানে। এত সুখ,এত আনন্দ সত্যিই কি তার জীবনের প্রাপ্য ছিল? হয়তো হ্যাঁ, তাই সে রোজ হাসে, নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা পায়। তার হাসার কারণই তো সামনে থাকা মানুষ দু’টি। রোদেলা তূর্ণা আর রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে হাসচ্ছে। বাচ্চাটাও বাবা-মায়ের এমন দৃশ্য মন ভড়ে উপভোগ করছে। কেউ বলবে তূর্ণার এই বাচ্চাটার কেউ নয়, না আছে তাদের রক্তের কোনো সম্পর্ক আর কোনো বন্ধন। তারাও তারা অদৃশ্য এক সুত্রে গেঁথে গিয়েছে।
“ পাপা বল বালোবাতি! বল বল বালোবাতি!”
রৌদ্রিকর মেয়ের পানে চাইলো, আনন্দ উছলে পরছে। ছোট ছোট ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাদের পা। তূর্ণার শাড়ির আঁচলটা পানিতে ভিজে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে। তূর্ণার চেয়ে আছে রৌদ্রিকের পানে। তূর্ণার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, পানির মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে পরে রৌদ্রিক। চারিপাশে শুধুই ঢেউয়ের গর্জ শোনা যাচ্ছে।
“ ফাল্গুন শেষে যেমন বসন্ত নতুন ফিরে আসে। তুমি আমার জীবনে সেই বসন্ত, যার সুবাস একবার লেগে গেলে মিটানো যায় না। তুমি আমার সেই বসন্তের কোকিল, যে রোজ নিয়ম করে আমার আঙিনায় আমায় মাতিয়ে রাখে। আমার অসময়ের #অবেলার_প্রণয়ভেলা তুমি।”
তূর্ণা আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না।ঝাঁপিয়ে জড়িয়ে ধরলো রৌদ্রিককে। সমুদ্রের উত্তাল গর্জনের মাঝেও তাদের নীরব আলিঙ্গন যেন সমগ্র পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। অল্প দূরে দাঁড়িয়ে রোদেলা হাততালি দিতে লাগলো।
”ইয়য়য়য়ে!!…পাপা-মা ধলাধলি কইতাছে!
তারপর ছোট্ট পায়ে দৌড়ে এসে দু’জনের মাঝখানে ঢুকে পড়লো।
”আনাকেও ধলো! আনি ও আছি!
রৌদ্রিক আর তূর্ণা একসঙ্গে হেসে উঠলো।
পরক্ষণেই দু’জন মিলে নিজেদের ক্ষুদ্র পৃথিবীটাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো। দূরে অস্তগামী সূর্য তখন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে নীলাভ জলরাশির অন্তরালে।
আর সমুদ্র, সে যেন নীরব সাক্ষী হয়ে রইলো তিনটি প্রাণের অপার্থিব সুখমুহূর্তের।
সময়ে কেটে নতুন দিবার সুত্রপাত করেছে। সকালটাও খিলখিল করে হেসে উঠেছে, নরম উষ্ণ রোদের আলোয় আলোকিত হয়েছে সারা ধরণী। ফর্দার ফাঁক দিয়ে লুকোচুরি করে আলো প্রবেশ করেছে কক্ষে। গম্ভীর নিদ্রায় মগ্ন রৌদ্রিক। ফজরের নামাজের পর আবারও ঘুমিয়ে পরেছে। এখনো ঘুম কাটেনি, হালকা অন্ধকারে আচ্ছন্ন কক্ষে পা টিপে টিপে, দু’টো চঞ্চল পা এগিয়ে আসচ্ছে বিছানার কাছে। হাতে রয়েছে ছোট একখানা কাঁচের বাটি। বাড়িতে ফিরেছে আজ নিয়ে এক সপ্তাহ হলো। রোজকার নিয়মে জীবন চলছে সবারই। রোদেলা তার ছোট্ট হাত দ্বারা হাতের মধ্যে সাদা আটা মাখিয়ে নিয়েছে। তূর্ণা নিঃশব্দে কিছু একটা ইশারা করতেই রোদেলা তার ছোট হাত দ্বারা রৌদ্রিকের গালে আটা মাখিয়ে দিতে থাকে। রোদেলা ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো, রোদেলার কাজ শেষ হতেই সেও কিছু ইশারা করতেই তূর্ণাও একই ভাবে হাত বাড়িয়ে রৌদ্রিকের গালে হাত রাখতেই যাবে।অমনি ঝরের গতিতে তূর্ণার হাতের কব্জি টেনে নিজের উপর সম্পূর্ণ টেনে নিলো। হঠাৎ এমন কিছুর আশা করেনি তূর্ণার, চোখ দু’টো বড়ো বড়ো হয়ে এসে তার! কল্পনাও করেনি রৌদ্রিক জেগে যাবে। রৌদ্রিক তার বুঁজে থাকা নেত্রপল্লব মেলে তাকালো। রোদেলা তো খাটের নিচে ঢুকে পরেছে রৌদ্রিককে জাগনা দেখে। রৌদ্রিক হালকা কাত হয়ে খাটের নিচ থেকে রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। রোদেলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।
“ আমার ঘুমের সুযোগ নিচ্ছিলে দু’জন। ”
” না, না কই তুতোগ নিলাম।”
রোদেলা হেসে কুটিকুটি হয়ে গেছে। সারা বিছানায় বাটিতে থাকা আটা দিয়ে ভড়ে গেছে, রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকাতেই তূর্ণা নজর লুকালো। হঠাৎই রৌদ্রিক বিছানায় ছড়ানো আটা নিয়ে তূর্ণা আর রোদেলাকে মাখিয়ে দিলো। রোদেলা তো হাসতে হাসতে শেষে, হাসতে মানা করছে তবুও রৌদ্রিক শুনছে৷ তূর্ণা অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখলো রৌদ্রিকে। তিনজনের অবস্থা নাজেহাল হয়ে গেছে কয়েক মুহূর্তেই। তিনজনকে আটার ভূত লাগছে!
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৩
“ আরও করবে এমন?”
“ এটা কিন্তু ঠিক না।”
তূর্ণা কথা শুনে রৌদ্রিকে নিজের আটায় মাখানো গালটা তূর্ণার গালের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বলে-
“ কোনটা ঠিক নয়?”
এমন ভাবে বললো যেনো কিছুই হয়নি। রোদেলা আর তূর্ণা একসঙ্গে রুটি বানাচ্ছিলো নিচে, হঠাৎ তূর্ণার মাথায় শয়তানি বুদ্ধি আসে। তারপর আর কি রোদেলাকে নিয়ে সেই বুদ্ধি সফল করতে এসে নিজেরাই ফেঁসে গেছে।”
