Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১
তোনিমা খান

মর্ত্যধামে শীতের আধিপত্য। মাটির ঘর, গোলপাতার ছাউনি, টিনের দ্বারা পরিবেষ্টিত নড়বড়ে ঘরটির ফাঁক ফুটো দিয়ে ফুরফুরিয়ে শীতল হাওয়া প্রবেশ করছে। উর্ধ্বগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া সেই শীতল হাওয়ার প্রকোপে, দু’টো কাঁথার আড়ালে থাকা দুটো দেহ আরো লেপ্টে গেলো মাতৃদেহে উষ্ণতার খোঁজে। মা’ও আগলে নেন। একটা চৌকি, একটা টেবিল আরেকটা ট্রাঙ্ক ঘর জুড়ে এই স্বল্প কিছু আসবাবপত্রের অবস্থান। চৌকি ঘেঁষা টেবিলটার উপর জ্বলজ্বল করতে থাকা কূপি’র মৃদু সোনালী আভায় আবছা আলোকিত ঘরময়। সেই আলোয় দৃশ্যমান কূপি’র পাশে রাখা ধারালো একটা ব”টি, এক বাটি মরিচের গুঁড়া, আরেকটা বোতলে মরিচ গুঁড়া গলানো। এগুলো কি? এগুলো হলো অস্ত্র! একজন মায়ের অস্ত্র, তার সন্তানদের ঘুম নিশ্চিত করার অস্ত্র! সেদিকেই স্থির একজোড়া নিস্তেজ দৃষ্টি। নিস্তেজ দেহের মস্তিষ্কে চলছে কতশত প্রশ্ন।

আচ্ছা, পালাক্রমে মৌসুমের আগমনে শীত কেন রুক্ষতা, তীক্ততা, বিষাদের প্রতিমূর্ত হয়ে আসে? এই মৌসুমে গাছের পাতা কেন ঝড়ে পড়ে? কেন তাদের সৌন্দর্য বিলীন হয়ে যায়? শীতের রাত কেন এতো দীর্ঘ হয়? পাখিদের সুস্রব্য কিচিরমিচির আওয়াজ কেন রাত নামলেই লুকিয়ে পড়ে? কেন ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা জেঁকে বসে? কেনই বা পেঁচার ঐ গা ছমছমে ঘুৎকার ডাকটি এতো তীব্রতর শোনায় শ্রবণেন্দ্রিয়তে? কেন অন্তঃস্থল সংকুচিত হয়ে আসে অশনি আগমনের আশংকায়? শীতের এই জনমানবহীন নিস্তব্ধতায় জংলি পশুরা কী হিংস্র উন্মাদ হয়ে পড়ে? প্রকৃতির সাথে সাথে কি মানুষের ও সৌন্দর্য কেড়ে নেয়? যেমনটা তার জীবনের সকল সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছিল? ভাবনায় বিভোর ঝিমিয়ে পড়া নুব্জ্য দেহটি পুনশ্চঃ সচকিত হলো মধ্য রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে পেঁচার ঘুৎকার ডাকটি শ্রবণেন্দ্রিয়তে প্রবেশ করতেই। বিরতিহীন টিনের ঘরে অজশ্রবারের মতো দু’টো টোকা পড়ল। ভেসে আসে সমস্বরে কিছু ভ’য়’ঙ্ক’র বি’শ্রী ফিসফিস কন্ঠস্বর। নারীটি সেই ভীতিকর আওয়াজে খামচে ধরলো শাড়ির আঁচল!
“কথা’র মা? ও কথা’র মা? রাত তো পেরুলো বলে। দরজা খানা খোল দেখি। আর কতদিন এইভাবে দরজা আঁটকে রাইখা আমগো তৃ’ষ্ণা বাড়াইবা? যতো তৃ’ষ্ণা বাড়াইবা ততোই তো তোমার আর তোমার মাইয়াগো কষ্ট বাড়িবে। এতো তৃ’ষ্ণা বাড়াইয়ো না কথার মা। শরীরে জ্বলন তো তোমারো হয় না-কি? তবে কেন নিজেরে আর আমগোরে এতো কষ্ট দিতাছো? তুমি কি ভাবছো এই টিনে’র বেরিবাঁধ কতদিন আমগো আটকাবে? ঘরের ঐ কাঠের দরজা কিন্তু খুব বেশি মজবুত নয় কথা’র মা। কতদিন বাঁচাবা নিজেরে আর মাইয়ার ঐ কচি যৌবন। মধু যহন আছে মৌমাছি একদিন না একদিন তাতে মুখ দেবেই। মধুর আশেপাশে ঘুরতেও যদি এতো আনন্দ লাগে, তবে মধু মুখে নিলে কত আনন্দ লাগবে কও তো!”

থেমে গেলো বিশ্রী ঐ কথাগুলো। কানে আসে একাধিক পশুদের হাসির শব্দ। কোলের মাঝে শুয়ে থাকা মেয়েদের মাথা দু’টো আরো জোরালোভাবে আঁকড়ে নিল নিলীমা। শ্বাস প্রশ্বাস আঁটকে নিলো মেয়েদের মাথা বুকে চেপে। পাথরের ন্যায় নিঃশব্দে আরো গুটিয়ে গেলো স্বল্প জায়গার মাঝে। শুকনো একটা ঢোক গিললেও শ্বাস প্রশ্বাসের মৃদু সম্প্রসারণ প্রসারনে পুরোনো চৌকি ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ তুললো। সেই আওয়াজেও হকচকালো নিলীমা বেগম। এই বুঝি টিনে কান পেতে থাকা ন”র”প”শু গুলো শুনে ফেললো তাদের আওয়াজ। হিংস্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের উপর। কলিজা শুকিয়ে আসলো। তবুও চেহারায় নির্লিপ্ততা, নির্ভয়তা, কঠোরতার আভাস। অর্ধেক রাত পেরিয়ে গেলেও চোখে একদম ঘুমের দেখা নেই। চোখের নিচের কালসিটে দাগ, অনুজ্জ্বল শুকনো ধূলোময় মলিন চেহারা নির্দেশ করে কতরাত এভাবে নির্ঘুম কাটিয়েছে, কাটাচ্ছে হয়তো কাটাতে হবে। কিন্তু আর কতদিন? আর যে দেহ মন সয় না। চোখদুটো খোলা চাতক পাখির ন্যায়।

সেই দৃষ্টিতে নেই কোন চাওয়া-পাওয়া আর না সুদিন দেখার আশা। আছে শুধুই অসহায়ত্ব, ভয়, শঙ্কা আর কোন বিদঘুটে পরিণতির অপেক্ষা। চারিপাশের মানুষরূপি ন”র”পি”চা”শ গুলো যে মানুষের দূর্বলতা নিয়ে খেলতে খুব ভালোবাসে। তারা অসহায়ত্ব নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। কতদিন সে রক্ষা করতে পারবে তার সন্তানদের? এই একটা প্রশ্ন যখন কোন মায়ের মনে সর্বদা ঘুরপাক খায়, সেই মা ঠিক কিভাবে জীবনযাপন করে তা কেউ আন্দাজাও করতে পারবে না। একজন মায়ের জন্য সবচেয়ে ভ’য়’ঙ্ক’র, কষ্টদায়ক শাস্তি হলো তার সন্তনদের সম্ভ্রম, ও জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়া। কোন মা এটা সহ্য করতে করতে পারবে না। নিলীমাও পারে না সহ্য করতে। নিজের ওপর থেকে যা যাওয়ার যাক, কিন্তু তার সন্তানেরা সুখে থাকুক। কেউ আন্দাজাও করতে পারবে না নিলীমার এক একটা দিন কতোটা দুঃসহনীয় ভাবে কাটছে। আর না পারবে সেই লোকটা! যার সাথে একদিন হাসতে হাসতে বহু স্বপ্ন নিয়ে ঘর বেঁধেছিলো। হয়তো সে আন্দাজা করছেও না। দুনিয়ার মানুষগুলো যে স্বার্থপর। একজন স্বার্থপর পি”শা”চ মাঝপথে ছেড়ে গিয়েছে তাদের, আর কিছু স্বার্থপর পি”শা”চ মজা লুটতে ওঁত পেতে আছে। এটাই নিলীমা এবং তার দুই মেয়ে রূপকথা আর শুকতারার জীবনের মানে।

দিনের আলো ফুটলে তাদের মন থেকে ভয় সরে যায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তারা বাইরে মুখ বের করতে পারে। আর রাতের অন্ধকার নামতেই তারা মুখ লুকায় মায়ের বুকে। আর মা তাদের আগলে নিয়ে চৌকির এক কিনারায় গুটিয়ে বসে থাকে। প্রহর গুনতে থাকে কখন ভোরের আলো ফুটবে আর তাদের মন থেকে ভয় কাটবে। বিশ্রী আওয়াজগুলো আসা বন্ধ হয়ে গেলো। ভোর হয়ে আসলো কি? কোলের মাঝে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েদের মাথায় অনবরত ভরসার হাত বুলাতে লাগলো নিলীমা। মায়ের বা পায়ের উপর সদ্য তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে হওয়া রূপকথা মায়ের কঠোরতার আড়ালে থাকা ভীতু মাতৃমনের তীব্র জোড়ালো হৃৎস্পন্দনে চোখ মেলে তাকাল।
কূপি’র টিমটিমে আলোয়, ধূসর বর্নের একটা পাতলা চাদরে আবৃত অনুভূতি শূন্য মায়ের বিবর্ন মুখটি দেখে রূপকথা ম্লান হেসে, মায়ের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় টেনে আনে। রোজ রাতেই মায়ের এমন বিবর্ন মুখ দেখতে পায় সে। ধিমি কন্ঠে বলল,

–“ভয় পেও না আম্মা। তারা কিছু করতে পারবে না আমাদের। আল্লাহ আছে তো!”
নিলীমা’র দৃষ্টি চঞ্চল হলো। মেয়ের কথা অগ্রাহ্য করে সাহসী কণ্ঠে বলল,
–“আমি ভয় পাচ্ছি কে বলেছে‌ তোকে? আমি ভয় পাচ্ছি না তো, একটুও ভয় পাচ্ছি না। ভয় পেলে কি এত বছর ধরে তোদের এই বুকে আগলে রাখতে পারতাম? আমি একটুও ভয় পাচ্ছি না। তুই ঘুমা, উঠেছিস কেনো? নিশ্চিন্তে ঘুমা। মা যতক্ষন আছি ততক্ষণ তোদের পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারবে না।”
কথা’র মুখশ্রী পাণ্ডুর বর্ন ধারন করলো, চাপা ভয়ের করনে মায়ের কেঁপে যাওয়া কন্ঠ শুনে। মায়ের কণ্ঠনালী কাঁপছে কেনো? মায়ের কণ্ঠে চাপা ভয় স্পষ্ট। কই আগে তো মাকে এতো ভয় পেতে দেখেনি। হাসিমুখে বলতো মা আছি না, সব ঠিক হয়ে যাবে কেউ কিছু করতে পারবে না তোদের। তবে মায়ের চোখেমুখে আজ ভয় কেনো? মাকে এতোটা ভঙ্গুর দেখাচ্ছে কেনো?
কূপি’র আলোয় মেয়ের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলে যেতেই নিলীমা সন্তপর্ণে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। মেয়ের সামনে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলে যেটুকু যা হাসিমুখ রয়েছে সেটুকু ও যে ফুরিয়ে যাবে। রূপকথা নিরুত্তর মায়ের দৃষ্টি চুরি দেখে। নিলীমা রূপকথার ঐ দৃষ্টি উপেক্ষা করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। স্নেহের কন্ঠে বলল,

–“ঘুমিয়ে পড়, কাল সকালে রেজাল্ট আনতে যাওয়া লাগবে তো। সকাল সকাল উঠবি।”
–“তুমি ঘুমাবে না?”
কথা ধিমি কন্ঠে শুধায়।
–“আমার ঘুম আসছে না’রে মা। বিকেলে কতক্ষণ ঘুমিয়েছি না! তাই আর ঘুম আসছে না তুই ঘুমা। একটু পরেই আজান দিবে, নামাজ পড়তে উঠবি আমার সাথে।”
নিলীমা কৃত্রিম হেসে বলল।
রূপকথা আর কথা বাড়লো না মায়ের হাতটি আঁকড়ে চোখ বুঝলো। আরেক হাতটি মায়ের ডান পায়ের উপর ঘুমিয়ে থাকা ছোট বোন শুকতারা’র পিঠে রাখলো। নিলীমা সন্তপর্ণে নিজের মাথা এলিয়ে দেয় টিনে। সাথে সাথেই চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। যেখানে রয়েছে শত শত অভিযোগের হাতছানি। কেনো সে আজ একা? কেনো তার সন্তানেরা আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মতো মুক্ত, স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপন করতে পারে না? তার কি দোষ ছিলো তার? একটাবার জানতে পারলেও তো নিজেকে দোষারোপ করতে পারতো। কিন্তু এখন? কাকে দোষ দেবে? নিজেকে নাকি নিজের ভাগ্যকে, নাকি যে মাঝপথে তাদের সর্বহারা করে একা ফেলে রেখে চলে গিয়েছে তাকে? মানুষরূপি পশুগুলো যে দিনকেদিন হিংস্র হয়ে উঠছে কিভাবে রক্ষা করবে সন্তানদের আর নিজেকে। কি করে বোঝাবে মেয়ে দুটো বড়ো হওয়াই তার সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ! নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে— যে এই মেয়ে দুটোর জীবন জাহান্নাম হয়ে যাবে।

আকাশপাতাল ভাবনা ভাবতে ভাবতেই ফজরের আজান পড়লো। মৃদুমন্দ পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে‌। ঘুমন্ত মেয়েদের মাথা বিছানায় রেখে নিলীমা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। টিনের ঘরটিতে দুটো কামড়া। একটা বারান্দা, একটা বড় ঘর আর একটা ছোট্ট রান্নাঘর। একবার রূপকথার ঘুমন্ত মুখটির দিকে তাকায় নিলীমা, ডাকবে কি? কিছুক্ষণ আগেই তো ঘুমালো। তার সাথে সাথে মেয়েটাও রাত জাগে। মায়ের ঢাল হয়। নিলীমা’র মুখে ম্লান হাসি। সে রূপকথাকে না ডেকেই রান্নাঘরে মাটির হাঁড়িতে জমিয়ে রাখা পানি দিয়ে ওজু করে বেতের একটা জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়ায়। নিলীমা আর ধরে রাখতে পারে না নিজেকে মোনাজাতে তুলে চাপা স্বরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। মিনতি করে বলতে লাগল,
–“আল্লাহ আর কতো? এত গুলো বছর কি কম সহ্য করেছি, যে এখন আমার মেয়েদের এই জঘন্য পরিস্থিতি দিয়ে যেতে হচ্ছে? এর পরিনতি কি? আমি কোনদিন নিজের চোখের সামনে আমার কথার কোন খারাপ পরিণতি দেখতে পারব না। এর থেকে ভালো তুমি আমাদের তিনজনকে নিয়ে যাও, তবুও এইভাবে ঐ পশুদের হাতে লাঞ্ছিত হতে দিও না আমার ফুলদুটোকে। সবাই তো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আমার থেকে। কিন্তু তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না। তুমি ছাড়া আমি আর কার কাছে চাইবো বলো! আমার যে চাওয়ার আর কোন জায়গা নেই। আমার কলিজাদুটোকে রেহাই দাও এই পশুদের জঘন্য প্রলুব্ধ দৃষ্টি থেকে।”

দরজার খুঁটি আঁকড়ে রূপকথা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্রন্দনরত মায়ের। নিগুঢ় পানে পর্যবেক্ষণ করে মাকে। এই মমতাময়ী, সর্বদা সকলের ভালোচাওয়া মানুষটা এতো একা কেনো? তার বাবা কি করে পারল এই মানুষটাকে কষ্ট দিয়ে, একা ফেলে রেখে চলে যেতে?
নিলীমা নামাজ থেকে উঠে দাঁড়াতেই পেছনে কথাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তড়িঘড়ি করে অশ্রুসিক্ত চোখদুটো মুছে নিলো। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“নামাজ পড়বি? যা ওজু করে আয়। ঠান্ডায় বেশিক্ষণ বাহিরে থাকিস না।”
রূপকথা নিরবে মায়ের কথামতো ওজু করে নামাজে দাঁড়ায়। মায়ের মতোই একই দশা তার ও। বলার মতো এই একজন ই তো আছে। তার সামনে দাঁড়াতেই অশ্রু ছেড়ে দিলো আঁখিদ্বয়। বড় মেয়ে হয় মায়ের খুব নিকটস্থ একজন। মায়ের সাথে মায়ের সকল সুখ দুঃখের ভাগিদার রূপকথা। মোনাজাতে একটা কথাই শুধু বললো,
–“আল্লাহ তার মায়ের সকল দুঃখ দূর করে দিক।”

অন্ধকার সরে গিয়ে মর্ত্যধামে তখন ঝলমলে রোদ পুরোপুরি বিস্তৃত। চারিদিকে হীমের প্রভাবে জনজীবন সংকুচিত হয়ে আছে। শহুরাঞ্চলে শীত কম পরিলক্ষিত হলেও গ্রামাঞ্চলে শীত বড্ডো সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। বাগেরহাটের রণবিজয়পুরের অলিগলিতে ও সূর্যের তপ্ত আলো আঁছড়ে পড়তে লাগলো জনজীবনের অলসতা কাটাতে। সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে কেটেছে আ’ত’ঙ্ক। দিনের আলোয় নরপশু গুলো ভদ্রবেশী চেহারায় ঘোরাফেরা করে। স্বীকারীদের শুধু চোখে চোখে রাখে আর রাতের বেলায় হামলে পড়ে। অন্ধকার যে তাদের আশকারা দেয়!
অন্ধকার কাটিয়ে সূর্যের আলোর আগমনের ন্যায় একদিন ভালো দিন আসবে। এই সুপ্ত এক আশা বীজ বুনে রূপকথার ছোট্ট অন্তরালে। ঘড়িতে তখন আটটা বাজে। এমনি এক শীতের সকালে দশ বছরের রূপকথা এবং এক বছরের শুকতারার বাবা তাড়াহুড়ো করে নাস্তা করে মেয়েদের কপালে চুমু দিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল। খুলনা শহরের বড় কোম্পানিতে চাকরি করতো বাবা। তবে প্রতিদিন রাত দশটার মধ্যে বাবা ঘরে ফিরলেও সেদিন আর ফিরলো না। বাবার অপেক্ষায় অপেক্ষায় তিন মা মেয়ে আজ দশটি বছর কাটিয়ে দিলো, তবুও বাবা আর ফিরলো না। রেখেগেলো মাঝপথে কুলকিনারা হীন তিন জনকে। যাদের ছোট্ট সুখী দুনিয়াটা বাবা জুড়েই ছিলো। এরপর থেকে অবশ্য আর কখনো সুখের দিন দেখেনি তিন মা মেয়ে। দেখেছে লড়াই, অন্ন সংকট, স্বজনদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, সমাজের মানুষরূপি কিছু পশুদের ঘৃণ্য মুখোশ, শিখেছে অর্থের গুরুত্ব। বুকভরা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এটাই তাদের জীবন।

কম্বলের সোয়েটার পড়া রূপকথা আর শুকতারা পায়ে কাঁথা জড়িয়ে গুটিয়ে বসে আছে বিছানায়। টিনের দূর্বল বেষ্টনী ভেদ করে শীতল হাওয়া ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করছে ঘরে। স্টিলের প্লেটে তিন কাপ চা দু’টো করে সিদ্ধ আটার রুটি নিয়ে, নিলীমা ব্যাস্ত পায়ে এগিয়ে এসে নিজেও বিছানায় বসলো। মেয়েদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
–“নে নে গরম গরম খেয়ে নে।”
রূপকথা আর শুকতারা হামলে পড়ে রুটি হাতে নিলো। এই খাবার তাদের প্রতিদিনের হলেও তাদের খুব প্রিয় খাবার। চা দিয়ে রুটি ভিজিয়ে খাওয়া। নিলীমা খেতে খেতে রূপকথাকে বলল,
–“তোকে কলেজে এগিয়ে দিয়ে, আমি আর তারা একটু সিকদার বাড়িতে যাবো।”
–“কেন? সেখানে কেন যাবে?”
রূপকথা খাওয়া থামিয়ে শুধায়।

–“মেজো গিন্নির ব্লাউজ, পেটিকোট গুলো বানানো হয়ে গিয়েছে, সেগুলো দিয়ে আসতে যাব।”
–“সেগুলো তো তাদের কাজের লোক এসে নিয়ে যায়। তবে তুমি কেনো যাবে দিয়ে আসতে?” , রূপকথার কৌতুহলী কণ্ঠ। মা মানুষের জামা কাপড় সেলাই করে। এটাই তাদের রোজি রুটির জোগান দেয়।
–“শুনেছি এমপি সাহেব অনেকদিন যাবৎ বাড়িতে আছে । তাকে সব খুলে বলবো, দেখি সে কোন সাহায্য করতে পারে না-কি!”
নিলীমা ম্লান কণ্ঠে বলল। আগেও বলেছে খুব একটা সুফল কখনোই পায়নি। তবুও আশা রাখতে দোষের কি? আশায় বাঁচে চাষা!
–“কতবার তো গেলে কোন কি সাহায্য পেলে? তারা আসনে বসে শুধু টাকা ইনকাম করার জন্য, জনগনের সেবার জন্য নয়।” বরাবরের মতো ব্যর্থতাই তাদের সঙ্গী, এটাই ছিল রূপকথার কথার মানে। নিলীমা তবুও আশা ছাড়ে না। সে আরেক লোকমা মুখে তুলে বললো,,
–“তখন তো আর এমপি সাহেবের সাথে দেখা হয়নি, হয়েছে তার ভাইদের সাথে। শুনেছি এমপি সাহেব নরম মনের‌ মানুষ, সবাইকে সাহায্য করে। ”
–“তাই তো তার নিজের জেলা ই এতো অনুন্নত।” রূপকথা বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলে পুনরায় খাবারে মনোযোগ দিলো।

দৈত্যাকার এক গেটের আড়ালে তিনতলা বিশিষ্ট একটি দালান। নেইমপ্লেটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “সিকদার নিবাস”। শুকতারার হাত ধরে নিলীমা ধীরপায়ে ঢোকে। বাগানে বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে আর তাদের পেছনে আভিজাত্যে মোড়া সুন্দর দেখতে একটি বউ ও ছুটছে। ঝলমলে আনন্দময়, সুখী জীবন বোধহয় একেই বলে। নেই কোন জীবনের তাগিদ!
–“দেখো নিলা, বড় ভাইজান জনগনের সেবার জন্য ই এমপির আসনে বসিছে। কিন্তু তার মানে তো আর এই না যে সে ঘরে ঘরে গিয়ে দেখিবে কাকে কে বিরক্ত করতিছে, কার মেয়ের পিছনে কোন ছেলে ঘুরতিছে। এইগুলা সে সমাধান করিবে। ”

শয়নকক্ষের সোফায় বসে পান বানাতে থাকা মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা অনাদরে কথাগুলো বললেন। বেশভূষায় তার আভিজাত্য। ইনি-ই হলেন সিকদার বাড়ির মেজো গিন্নি। এই সিকদার বাড়িতে তার বেশ নামডাক। তবে আজ আর সে একা নয় কক্ষের বিছানায় আরো একজনের উপস্থিতি রয়েছে। যে হাতের কুশিকাটা রেখে তাদের সূচালো দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। নিলীমাকে অপ্রস্তুত জড়তায় আচ্ছন্ন হতে দেখা গেলো। সে জড়তা নিয়েই বললো,
–“আমি তেমনটা বলিনি ভাবিজান। তবে দিনকেদিন আ’ত’ঙ্ক বেড়েই চলছে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। মেয়ে দুটো বড়ো হয়েছে, আপনাকে খুলে বলার প্রয়োজন নেই। আপনি বোঝেন সবটা! এমপি সাহেব যদি কাউকে দিয়ে একটু কোন ব্যাবস্থা করতে পারতো। তবে আমি মেয়েদুটোকে সহিসালামত নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।”
–“স্বামী কোথায়?”
কথার মাঝেই জলদগম্ভীর নারী কন্ঠে নিলীমা সপ্রতিভ চাহনিতে তাকায় বিছানায় বসা মহিলাটির দিকে। তার ও বেশভূষায় আভিজাত্য। হাতে কানে গলায় স্বর্নালংকার ভরতি। সে ইতস্তত করল কিছু বলার জন্য, তার আগেই মেজো গিন্নি বলে উঠল,,

–“স্বামী সে অনেক বছর আগে দুই মাইয়া আর বউ রাখি চলি গেছে, কোথায় যেন! আর খোঁজখবর নাই।”
–“কেমন জাতপাত ছাড়া পুরুষের কাছে বিয়ে দিয়েছে পরিবার? আত্মীয় স্বজন নেই?”
কুশিকাটা চালাতে চালাতে তিরস্কারের সাথে বললেন ভদ্রমহিলা।
–“স্বামী না থাকিলে সেই মাইয়ার আত্মীয় স্বজন হইয়া যায় প্রতিবেশী। প্রতিবেশী তো তাও বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ায় কিন্তু আত্মীয় স্বজন গিরগিটির মতো রং পাল্টায়। একটা ভাই আছে, সে ও আর ভাই নাই পরের মেয়ের জামাই হইয়ে গেছে। বোইন হইয়া গিয়েছে এখন বোঝা। ”,মেজো গিন্নি রসিয়ে রসিয়ে বললেন। বিছানায় আধশোয়া হয়ে‌ পা লম্বা করে রাখা মহিলাটি আর কিছু বললেন না। সে মনোযোগ দেয় তার কুশিকাটায়। সোয়েটার বুনছে। নিলীমা কৌতুহলী পানে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে পরপরই মেজো গিন্নির দিকে তাকায় সে। মেজো গিন্নি তার কৌতুহলী দৃষ্টি দেখে বললো,

–“কি হলো চেনোনি? বড় ভাবি, তোমাগো এমপি সাহেবের বউ।”
নিলীমা সালাম দেয় তাকে। ভদ্রমহিলা চশমার আড়ালে একবার দৃষ্টি ফেলে শুধু হু বললেন। চেহারা, কণ্ঠের দাপটে আত্মগরীমা, অহংকারের আভাস। মেজো গিন্নি পান মুখে নেয়। কিছুক্ষণ আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে নিলীমার। মস্তিষ্কে চমকপ্রদ কিছু হানা দিতেই সে তার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। সে হাসি দমিয়ে নিয়ে, পান চিবুতে চিবুতে নম্র কণ্ঠে বললেন,,
–“শোন নিলা, তোমারো বেশি বয়স না, অমন কচি মাইয়া নিয়া থাকো বস্তির অমন নির্জন আস্তাকুঁড়ের ভেতরে। আজকে যদি ভাইজান কারোর দিয়ে হুমকি দেয়, কালকে রাগের বশে গিয়ে কিছু করি ফেলবে তোমাগো। মাইয়া কলেজে যায় তুমি থাকো ঘরে, কিছু দেখিবা? আজ একজন কাল দুইজন এমন করে বাড়তেই থাকিব। রোজ রোজ তো আর এমপি সাহেব তোমাকে সাহায্য করিতে পারিবে না। আর না সে থাকে বাগেরহাটে। মাতাল, নেশা করা ঐসব পুরুষগো গতরে থাকে দৈত্যের মতো শক্তি‌ তিনজন মাইয়া মানুষ কতোক্ষণ আটকাবা তুমি মানুষকে? এমন জীবন চলে? তাই তোমার উচিৎ এইটার কোন চিরস্থায়ী সমাধান বাইর করা। মাইয়ারে একটা মানসম্মত জীবন দেওয়া।”

দীর্ঘ এই সংলাপে নিলীমার আ’ত’ঙ্ক আর বিদঘুটে এক পরিণতির শঙ্কা আরো তরতর করে বাড়িয়ে দিলো। মনে হলো কেউ কলিজা খামচে ধরলো। তার উপর থেকে যাই চলে যাক না কেনো, তার কথার কোন বিদঘুটে পরিনতি সে দেখতে পারবে না। কি করে পারবে? সে যে মা! কোন মা’কি পারবে এটা সহ্য করতে?
চোখদুটো ছলছল করে উঠলো অনতিবিলম্বে। মিনতির সুরে বললো,,
–“আমিও চাই আমার মেয়ে দুটোকে একটু মানসম্মত জীবন দিতে কিন্তু কি করে করব? আমাকে একটু সাহায্য করা যায় না ভাবিজান?”
–“আমি আর কি সাহায্য করবো নিলা। তোমার সাহায্য তোমার নিজের করতে হইবো। তোমার লক্ষ্য থাকা উচিৎ সমাজের নিয়ম নীতির উর্ধ্বে গিয়ে মাইয়াকে একটা সুন্দর জীবন দেয়া। দেখাগেল এতো কষ্ট কইরা মাইয়া বড় করলা, পড়ালেহা করাইলা কিন্তু মাইয়ার সম্মানটাই থাকলো না। তখন কি হইবো এই পড়াশুনা আর বড় করার।”
আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত মাতৃ ভীতু মনটিকে দুমড়েমুচড়ে দিলো ভয়ঙ্কর এই শব্দগুলো। নিলীমা লহু স্বরে শুধায়,,
–“আপনি কি বলতে চাইছেন ভাবিজান।”

ভদ্রমহিলা একটু নড়েচড়ে বসলো। বিছানায় বসা বড় গিন্নি কপাল কুঁচকে চশমার ফাঁক দিয়ে শানিত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে মেজো জা কে। মেজো জা এর আদ্যোপান্ত সম্পর্কে অবগত সে। এটাই তার শানিত দৃষ্টির কারন। মেজো গিন্নি বড় জা এর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পানের ডালাটা পাশে রাখল অত্যন্ত নম্র কন্ঠে বললো,,
–“এখনো পর্যন্ত সব ঠিকঠাক আছে নিলা। কিন্তু কতোক্ষণ থাকবে? তুমি নিজেই তো বললা, মাতাল গুলো দিনকে দিন হিংস্র হয়ে উঠছে। তাই আমি বলি কি মেয়ের সম্ভ্রম আর নিজের সম্মান সহিসালামত থাকতে মেয়েকে একটা ভালো যোগ্য পাত্রস্থ করো। দেখো আমি জানি তুমি তোমার মাইয়াকে পড়াশুনা করাইতে চাও, বড় কিছু বানাতি চাও। কিন্তু মেয়েই যদি না থাকে তবে এসব দিয়ে কি হবে? তোমার কোল লাঞ্ছিত,খালি হওয়ার আগে মেয়ের একটা সুন্দর জীবন নিশ্চিত করো। আর তোমরা নাহয় আমগো দালান সংলগ্ন একটা কাছারি ঘর আছে ছোটখাটো দালান আছে না? সেখানে দুই মা মেয়ে নাহয় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে থাকলা। তোমরা সাধ্যমতো তুমি যা ভাড়া পারো দেবে আর আমগো জামাকাপড় বানালে। এখানে কিন্তু অনেক নামি দামি মানুষ পাইবা। তারা ও তোমার কাছে জামাকাপড় বানাইতে আসিল। তোমার ছোট মেয়ে নিয়ে দু’জনের জীবন তাতে বেশ চলি যাবে। আমার সাধ্যের মধ্যে যতোটুকু আছে আমি তা করিলাম। এখন এমপি সাহেব তো আর তোমার আর তোমার মাইয়াগো সুরক্ষার্থে দারোয়ান বসাইবে না।”

নিলীমা মৃদু চমকালো বিয়ের কথা শুনে। বিয়ে নামটি এবং এর গভীরতাকে যে সে আর কথা দু’জনে ই ঘৃনা করে। তবুও মস্তিষ্কে ক্ষীণ সময়ের বিনিময়েই একটি হিসাবনিকাশ করে নিলো। যার ফলাফল হিসেবে একটা বাক্য ই মস্তিষ্কে ঠাই পেলো, দিনশেষে সে তার মেয়েটিকে যেকোন মূল্যে সুস্থসবল দেখতে চায়। শুকনো এক ঢোক গিলল নিলীমা। প্রচুর সাহস জোগায় অন্তরালে। ধিমি কন্ঠে বললো,,
–“আমি কৃতজ্ঞ ভাবিজান আপনার কাছে—যে আপনি আমায় সাহায্য করার জন্য এতটুকু ভেবেছেন। কিন্তু সঠিক পাত্র খোঁজাটাও তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ততোদিন অন্তত একটু নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করে দিতেন! ”
মেজো গিন্নির ওষ্ঠদ্বয় বেঁকে গেলো খানিক। সে পুনশ্চঃ নম্র কন্ঠে বললো,
–“আমি তোমায় স্নেহ করি নিলা। তোমার হাতের কাজ সুন্দর ,কর্মঠ, সচ্চরিত্রবান একজন নারী। স্বামী ছাড়ি চলি গেছে তারপরও তুমি ঐ মেয়ে দুটোকে নিয়েই দাঁত কামড়ে পড়ি আছো। তোমায় দেখিলে আমারো মায়া হয়। তুমি চাইলে আমি এই ব্যাপারেও তোমায় সাহায্য করিতে পারি।”
–“আপনার কাছে কি কোন পাত্রের সন্ধান আছে ভাবিজান?”,নিলীমা আগ্রহী কন্ঠে শুধায়।
মেজো গিন্নি তার জা এর দিকে তাকায়। যে কি-না এখনো তাকে শানিত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। মেজো গিন্নি বড় জা কে দেখিয়ে বললেন,,

–“তুমি তো আমাগো তপোবনের কথা জানোই। সুপুরুষ একজন। দায়দায়িত্ব, ন্যায় নীতি, দয়া-মায়া, বড় মন ,আলাপ ব্যবহারে কতোটা প্রসিদ্ধ। বয়স কতোই বা হইছে চেহারা শরীরে এখনো তাগড়া জোয়ানের ছাপ। অথচ অকালে বিপত্নীক এর তকমা নিয়ে ঘুরছে। তোমার মেয়ের আর তোমার মাথার উপর এখন শক্তপোক্ত একটা ছায়ার প্রয়োজন। আর আমার মনে হয়না তোমার মেয়ের জন্য এই মুহূর্তে তপোবনের থেকে যোগ্য আর কেউ হতি পারে না। দেখো আমার বুঝে যা মনে হইছে আমি বলিছি বাকিটা তোমার ইচ্ছা। একটা কথা মাথায় রাখিবা তপোবন একজন সুপুরুষ, অন্তত কাপুরুষের মতো মাঝপথে তোমার মেয়ের হাত ছাড়ি দেবে না। সে নিজের জীবনসঙ্গীর জন্য এতোটাই বিশ্বস্ত আর যোগ্য যে যৌবনের প্রথম পর্যায়ে বিপত্নীক হয়েও আজ পর্যন্ত বিয়ে করেনি।”

নিলীমা থমকায় তপোবন সিকদারের নাম শুনে। তপোবন সিকদার বাগেরহাটের তিন নং আসনের এমপি তকদির সিকদারের বড় ছেলে। চোখেমুখে তার ছোটখাটো এক বিস্ফোরন খেলে গিয়েছে তা বেশ বুঝলো মেজো গিন্নি। তবুও নির্বিকার পান চিবুতে থাকে সে। বড় গিন্নির ঠোঁটের কোনে বাঁকা তাচ্ছিল্য হাসি, তার মেজো জা যে সঠিক সময়ে সঠিক চাল দিতে সক্ষম সে আগে থেকেই জানতো তবে এটা আশাতীত ছিলো। সে একপলক নিলীমার বিস্ফোরিত মুখটির দিকে তাকিয়ে পুনরায় কুশিকাটায় মনোযোগী হলো। তার মেজো জা এর এই চাল যে বৃথা যাবে!
নিলীমা নির্বাক প্রতিক্রিয়াহীন বসে থাকলো। মেজো গিন্নি তখনো তার থমকানো মুখটির দিকে তাকিয়ে। উক্ত প্রস্তাব যে নিলীমার কর্ণকুহরেই এখন পর্যন্ত গ্রহনযোগ্যতা পেলো না তা ভদ্রমহিলা বেশ বুঝতে পারলো। আত্মসম্মানে আঘাত লাগলেও দাঁত কামড়ে বসে রইল সে। ফাঁকা ঢোক গিললো নিলীমা। গাল গলা ঘেমে উঠলো অপ্রস্তুত পরিস্থিতি আর অপ্রস্তুত প্রস্তাবের সম্মুখীন হয়ে। আকাশপাতাল ভাবনা ভাবতে পারলো না তার আগেই সেই কক্ষে দ্রতবেগে একজন কাজের মহিলা ঢুকলো। রুদ্ধশ্বাস আঁটকে আ’ত’ঙ্ক নিয়ে বলল,

–“বড় আম্মা তপোবন ভাইজানের পোলা গাছ থিকা পইড়া গেছে।”
–“কি বললি? দাদুভাই গাছ থেকে পড়ে গিয়েছে?”
বড় গিন্নি থমকানো কন্ঠে শুধায়।
–“জি আম্মা কমলা গাছ থিকা পইড়া গেছে।”
মহিলাটি ভয়ার্ত কন্ঠে বললো।
সহসা বড় গিন্নির হাতের কুশিকাটাটা থেমে গেলো। স্থবির দেহে আচমকা চঞ্চলতা আ’ত’ঙ্ক জেঁকে বসলো। সে তড়িৎ হাতের সোয়েটার টা ছুঁড়ে ফেলে বিছানা থেকে নামলো। আ’ত’ঙ্কে জর্জরিত কন্ঠে হুঙ্কার ছাড়লো,
–“বাড়িতে এতো মালি থাকতে আমার দাদুভাই গাছে উঠেছে কেন? আর গাছ থেকে পড়েই বা কিভাবে? সবকটা মালি কোথায় ছিল?”
মেজো গিন্নি ও তড়িৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দ্রুত পা চালাতে চালাতে আহাজারি জুড়ে দিলো,
–“আয়হায় আমার দাদুভাই! হাত পা ভাঙিলো নাকি রে! কয়টা দিনের জন্য আসিছে বেড়াইতে, এখন না আবার হাত পা ভাঙি বসে।”
সকলে কক্ষ থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যায়। আর শুকতারার হাত আঁকড়ে নিলীমা তখনো আকাশপাতাল ভাবনা নিয়ে সেখানে ঝিমিয়ে বসে থাকে। কেননা এই আকাশপাতাল ভাবনার মাঝে এখন আরো একটা ভাবনা যুক্ত হয়েছে, সেটা হলো তপোবন সিকদারের একমাত্র ছেলে।

ডিসেম্বরের ঊনত্রিশ তারিখ। উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের রেজাল্ট কার্ড হাতে রূপকথা কলেজের মাঠে এসে দাঁড়ায়। মুখে তার মৃদু হাসি। সব‌ বিষয়ে পাশ করেছে সে। ক্লাস পজিশন ও পাঁচ নাম্বার এগিয়েছে। আগে ছিলো বিশ এখন পনেরো। আম্মা খুব খুশি হবে শুনলে। বিজ্ঞান শাখায় পড়ে সে। বাবা তাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আম্মা প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলো কতোদিন মামা বাড়ি কতোদিন চাচাদের বাড়ি করতো। সকলেই বিতৃষ্ণা নিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিতো। তখন তার পড়াশুনায় দুই বছর গ্যাপ যায়। ধীরে ধীরে মা সুস্থ হয় সে আবার পড়াশুনা শুরু করে। সে রেজাল্ট কার্ডটা নিয়ে প্রবল আগ্রহের সহিত কলেজ সংলগ্ন গ্রন্থাগারের দিকে যায়। কলেজ আর দুইদিন বন্ধ আছে এর পরে পাঠ্যবই ব্যাতীত আর অন্য কোন বই পড়তে পারবে না। তাই এই দুদিন পাঠ্যবইয়ের সাথে সাথে একটা গল্পের বইও পড়বে।

সে গ্রন্থাগারে ঢুকে সব ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। বইয়ের সংরক্ষণে খুব একটা উন্নত না হলেও অল্পের মাঝেও বেশ কিছু ভালো বই আছে। সে সেল্ফ খুঁজে খুঁজে সাতকাহন বইটি দেখতে পায়। উঁচু সেল্ফের একদম শীর্ষের সাড়িতে রয়েছে। সে পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর করে হাত বাড়িয়ে বইটি নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করলো। তবে অনেক চেষ্টা করার পরেও সে বইটি নামাতে পারলো না। তবুও সে প্রচেষ্টা থামায় না। সাধ্যের‌ মধ্যে যা আছে করে। ছোট্ট এই গ্রন্থাগারটিতে কোন লাইব্রেরিয়ান ও নেই যে সাহায্য করবে।
রূপকথা লাফিয়ে লাফিয়ে বইটি ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলো, হঠাৎ করেই তার হাতের ক্ষিপ্ত থাবায় উপরের সেল্ফের সবগুলো বই হেলেদুলে উঠলো। ঐ সেল্ফের সব বইগুলো স্থানচ্যুত হয়ে রূপকথার মুখের উপর পড়ে যেতে নিলো। রূপকথার আঁখিদ্বয় বৃহৎ আকার ধারণ করলো। বইগুলো একে একে সেল্ফ থেকে পড়তে দেখেই সে তড়িৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ভয়ার্ত কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে মিনিট এক পেরিয়ে গেলেও রূপকথার থোবড়া ফাটানোর জন্য কোন বই’ই পড়লো না। চোখমুখ চেপে ধরা রূপকথা চমকায়। সে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাকাতেই ভড়কে গেলো। তার মাথার উপর দু’টো বিশাল হাত। যেই হাতের আজলায় সবকটা বই। বইগুলো গুছিয়ে রাখতেও শুরু করেছে মানবটি। রূপকথা ঘোর থেকে বের হতে পারে না, তৎক্ষণাৎ ভারিক্কি এক কন্ঠস্বর খুবই সন্নিকট থেকে তার কানে আসলো। নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে তীক্ষ্ণ এক আতরের গন্ধ। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে যাবে তার আগেই, পুরুষালী ব্যাস্ত কন্ঠে কেউ পেছন থেকে তাকে জিজ্ঞেস করলো,

–“সাতকাহন?”
–“হু।”
রূপকথা অস্ফুট স্বরে বললো। সাথে সাথেই একটা লম্বা হাত পেছন থেকে তার মাথা টপকে খুব সহজেই সাতকাহন বইটি নামিয়ে তার হাতে দিলো। রূপকথা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, ধন্যবাদ জানিয়ে পেছন ফিরলেও কাউকে দেখতে পেলো না। সে তাকায় নিজের বাম সাইডের সরু গলির দিকে। সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পড়া বিশাল দেহি এক লোক ফোনে কথা বলতে বলতে ব্যস্ত পায়ে গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। রূপকথা কিছুপল সেদিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করলো তবে মুখ দেখতে পেলো না। সে নির্বিকার ঠোঁট উল্টে হাসিমুখে বইটি নেড়েচেড়ে দেখলো। বিপদ থেকে বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি চোখমুখ জুড়ে!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২