Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৯
তোনিমা খান

যন্ত্রণাদের থেকে সর্বদা পালাতে থাকা অন্তস্তল বারবার যন্ত্রণাদের কাছে এসেই মুখ থুবড়ে পড়ে। লম্বা লম্বা কদমের সাথে ধূসর নেত্রদ্বয় ক্রমেই লালচে বর্ণের ধারণ করছে। ঈষৎ প্রকম্পিত গুটিয়ে রাখা হস্তদ্বয় ভীষণ ব্যস্ততার সাথে কাঁপতে কাঁপতে সেই যন্ত্রণাদের সাথে লড়তে বিষাক্ত ধোঁয়ার সান্নিধ্যে যায়। লম্বা লম্বা টানে একটা ফিল্টার শেষ করে ফেলল। কিন্তু আদৌ কি এই কৃত্রিম সঙ্গীরা অন্তঃস্থলের নিঃসঙ্গতা দূর করার ক্ষমতা রাখে?
যেমন নিরন্তর প্রবাহিত নদীর জলে ধীরে ধীরে পলি জমে, তেমনি দৈনন্দিন জীবনের কাজের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা অতৃপ্তিগুলোও আজ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। নিজের ঘরে পা দিতেই অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল এরোজের অন্তস্তল। অথচ সে মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারবে না এই যন্ত্রণার কারণ! নিশ্চিত সে জঘন্য রকমের অপরাধী, যার কারণে তাকে কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
ধীরপায়ে ঘরে ঢুকতেই নিঃশ্বাসের গতিবেগ বাড়তে লাগল এরোজের। পাঁচ বছর আগের পিছু ফেলে যাওয়া সেই যন্ত্রণাগুলো একটু একটু করে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছিল তখন! সবকিছু পরিপাটি গুছিয়ে রাখা ঠিক আগের মতো যেমনটা সে পাঁচ বছর আগে রেখে গিয়েছিল।

যন্ত্রণাদের আর প্রশ্রয় দেবে না, দেবে না করেও এরোজ নিজেকে দমাতে পারে না। সে তো অন্য কোনদিক মনস্থির করতেই পারল না, সোজা পা বাড়ায় নিজের কাবার্ডের দিকে। তালাবদ্ধ কাবার্ডটি খুলতেই আঁধার জমে থাকা ভ্যাপসা বাতাস হু-হু করে বেরোয়। গন্ধে মিশে থাকে কাঠের সোঁদা স্মৃতি আর ধুলোর ধূসর ইতিহাস। ভেজা শ্যাওলার আবেশে এক অচেনা সেঁতসেঁতে আভাস। এরোজ বদ্ধ ড্রয়ারটি খুলতেই এক অন্যরকম ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করে। এ গন্ধ কেবল গন্ধ নয়, যেন আটকে থাকা বহু দিনের কাহিনি, ভোলা ঋতুর নিঃশ্বাস, আর পিছু ফেলে আসা সময়ের ক্লান্ত ঘ্রাণ। ড্রয়ারটি খুলতেই কতশত স্মৃতি, আবেগ, অনুভূতিরা ভেসে উঠল। এরোজ হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় ড্রয়ার ভরতি হেয়ার এক্সেসরিজ গুলোকে। ওষ্ঠকোনে বহু কষ্টে এক ঝলক হাসি ফুটে উঠল। করুণার হাসি! এগুলোও আজ তার মতো যন্ত্রণাদ্বায়ক স্মৃতি বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। ধূলোময়, জং ধরা ক্ল ক্লিপগুলো এরোজ নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎকাল! অতঃপর সেগুলো ঘরে থাকা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলল একে একে। পুরো ড্রায়ার খালি করে এরোজ মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে,

–“তোরা আজ মুক্ত। আমার কাছে তোদের মুক্তি দেয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু আমার মুক্তি নেই—যতদিন না মৃত্যু আসে।”
এরোজের কাছে এই ছোট ছোট জড়বস্তুগুলো জীবন্ত স্মৃতি হিসেবে মূল্যায়ন পায়—অথচ আজ তারা ভীষণ অবহেলায় সেই মূল্যায়নটুকু হারিয়ে ফেলল। ধূসর নেত্রদ্বয় ক্রমশই লালচে আভায় ছেয়ে যেতে লাগল। দম বন্ধকর অনুভূতি থেকে বাঁচতেই তো এতদিন দূর দেশে পড়েছিল, ভেবেছিল অনুভূতিরা সময়ের আড়ালে চাপা পড়েছে। কিন্ত সে ভুল! অনুভূতিরা আজও প্রগাঢ়, সুদৃঢ়, শক্তিশালী—ঠিক প্রথমদিনের মতো! সময়ের তারতম্যে আফসোস, ক্লেশ যেন আরো বাড়ছে, ক্ষিপ্র বেগে।
এরোজ হাঁসফাঁস করে উঠল। দ্রুত হাতে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে তাতে একের পর এক গভীর টান নিতে লাগলো উন্মত্ত হয়ে। অনুধাবন করে দেশের মাটিতে পা রাখা সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত!
রান্নাঘরের এক কিনারায় গুটিসুটি মেরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জবা চোখমুখ কুঁচকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌনতার দিকে। যে কি-না ব্যস্ত হাতে গরুর মগজ ভুনা করছে। সে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,

–“গরুর মগজ না ভুনা কইরা আমার মগজটা ভুনা করেন, ভাবিজান। ভালোমানুষীর একটা সীমা আছে! এই শীতের রাইতে আফনে এই রান্নাবান্না করতাছেন ক্যান? আবার আমারেও খাঁড়া কইরা থুইছেন।”
নিজ কর্মে ব্যস্ত মৌনতা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগন্বিত স্বরে বলল,
–“তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস, জবা? সদর দরজার সামনে রাখা ব্যগগুলো উপরে নিয়ে যা।”
–“আইছে কেডা? মাইজ্জা ভাইজান? হে আইলে তো আর আফনে এইহাতে থাকতেন না।”
–“তোকে তখন যে বললাম ছোট ভাইজান এসেছে, তার ব্যাগগুলো উপরে দিয়ে আসতে। তা এতক্ষণ তোর কানে কথা ঢোকেনি?”, মৌনতা কোমড়ে হাত দিয়ে বলল। চোখেমুখে বিতৃষ্ণা! জবার চোখ এবার খুলে পড়ার উপক্রম! কলিজা কেঁপে উঠল শান্তির দিন শেষ হওয়ার শোকে! সে বড় বড় নেত্রে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল,
–“হাছা কতা? আমি ভাবতেছিলাম আমি দুঃস্বপ্ন দেখতাছি। এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখতাম। কিন্তু আফনে এগুলো কি কইতাছেন? আমার সুখ আফনের সহ্য হয় না, তাই না? আফনে মজা করতাছেন!”

–“আমিও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু মানুষটার অভদ্রতায় বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি—যে সে আসলেই এসেছে। একে তো পাঁচ বছর পর পরিবারের কাছে এসেছে, তাও না বলে। উপরন্তু আমার দিকে এক পলক তাকায় ও নি, আর না জিজ্ঞাসা করেছে “ভাবি কেমন আছেন?” একটা মানুষ এত অভদ্র কি করে হতে পারে? এমন আচরণ করে যেন পরিবার না শত্রু! এত বছরেও কোন পরিবর্তন নেই। কেমন মানুষ?”, মৌনতার কণ্ঠে ভরপুর ক্ষোভ।
তার কথা শেষ হতে না হতেই গমগমে এক স্বর প্রতিধ্বনিত হয় নিস্তব্ধ রজনীতে।
–“জবা! আমার ব্যাগ এখনো আসেনি।”
জবার বুক ধড়ফড় করে উঠল এরোজের গম্ভীর কণ্ঠে। সে হতবাক হয়ে যায় দীর্ঘ পাঁচ বছর বাদ ছোট ভাইজানের এমন হুটহাট আগমনে। মৌনতা ডানে বামে মাথা নাড়ে তার কান্ড দেখে। মেজাজ নিয়ে বলল,
–“এত নাটক করিস না, জবা। ক্ষেপে যাচ্ছে কিন্তু! তাড়াতাড়ি ব্যাগগুলো নিয়ে উপরে যা নয়তো কুরুক্ষেত্র বাঁধবে এই রাতে। সবাই ঘুমাচ্ছে!”
জবা আর কাল বিলম্ব করে না। গায়ে জড়িয়ে রাখা কম্বলটা ছুঁড়ে মেরে এক দৌড় লাগায়। যেতে যেতে আহাজারি করে,

–“ওরে ভাবিজান, আফনের সাথে কোন জন্মের শত্রুতা ছিল? একটু আগে কইতে পারলেন না? এহন যদি ধমকায় তহন?”
মৌনতা মুখ বিকৃত করে নেয়। পনেরো মিনিট যাবৎ বলে আসছে অথচ ঘুমের ঘোরে মেয়েটার মাথাই কাজ করে না। সে চটজলদি রান্না শেষ করতে লাগল। রাতের খাবার সব শেষ! মানুষটা বাড়ি ফিরেছে এত বছর পর, এসেই যদি প্রথম বেলায় খাবার না পায়, বিষয়টা বড় ভাইয়ের বউ হিসেবে তার জন্য লজ্জাজনক! তাই তো শরীরের ক্লান্তি ভুলে রান্না করতে বসেছে। শাশুড়ির মুখে বহুবার শুনেছে তার ছোট ছেলে গরুর মগজ কতটা পছন্দ করে। সে স্বল্প সময়ে গরুর মগজ আর গরম ভাত রান্না করার সিদ্ধান্ত নিলো।
পরপর তিনটা লাগেজ টেনে উপরে তুলতে জবার কোমড়ের হাড় মড়মড় করে উঠল ব্যথায়। সে এরোজের ঘরের দরজা সম্মুখে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিতে লাগল, সহসা ওয়াশরুম থেকে কেউ ধুপধাপ শব্দ করে বের হয়। ভেজা দেহে কোমড়ে শুধু একটা তোয়ালে প্যাঁচানো এরোজকে দেখে জবার শীত আরো তিনগুণ বেড়ে গেল। জবা চোখ বড় বড় হয়ে যায়, হাতের পুরোনো শ্যাম্পুর বোতলটা এরোজ মেঝেতে ছুঁড়ে মারতেই। এরোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করছে,

–“পুরোনো শ্যাম্পু এখনো বাথরুমে সাজিয়ে রেখেছে!”
বলতে বলতেই এরোজের চোখ যায় জবার দিকে। জবার কলিজা কেঁপে উঠল সেই ক্রুর ক্ষিপ্ত চাহনিতে নিশ্চিত মাতাল অবস্থায় আছে। নয়ত চার বছর পর বাড়ি ফিরে কেউ এমনভাবে তাকায়। সে ভুবনভুলানো হাসি দিয়ে বলল,
–“ছোট ভাইজান, ভালো আছেন?”
এরোজ ভালো মন্দ কোন জবাব তো দিলোই না বরং চাপা আক্রোশে গর্জে উঠে শুধায়,
–“এই পাঁচ বছর পুরোনো শ্যাম্পু এখনো এখানে কি করছে? পুরো ঘর পরিষ্কার অথচ এতোটুকু কারোর চোখে বাঁধেনি? ঘর ও তো ঠিকমতো পরিষ্কার না, জবা। সারাদিন বসে কি করিস বাড়িতে, হ্যাঁ? সারাদিন শুধু গল্পগুজব আর ধেই ধেই করে নাচা, তাই না?”
জবার মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তার চোখে তো সব চকচক-ই লাগছে। প্রতি সপ্তাহে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করে। সে বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বড্ডো সাহস জুগিয়ে বলল,
–“আইসাই এমন ভাবে কেউ কতা কয় ভাইজান? এত বছর পর আইছেন দুইডা ভালো মন্দ কতা কইবেন তা না!”
–“তুই আমায় এখন কথা বলা শেখাবি?”, এরোজ তেড়ে আসে তার দিকে। এরোজ গর্জে উঠতেই জবা ভয়ে সেঁটিয়ে গেল দরজার সাথে। ভয়াল দেহে মিনমিনে স্বরে অনুনয় করে বলে,
–”ভাইজান চেতি যাইয়েন না। একটু আস্তে কতা কন! এমন হাউকাউ করার কি দরকার আছে? আমি তো কানে ভালোই শুনি।”

–”এই হাতের একটা থাপ্পড় খেলে, ঐ কানে ভালো-খারাপ আর কিছুই শুনবি না, জবা। আমি কিভাবে কথা বলব সেটা তুই শেখাবি? তোর কথার কি ধরণ? এই অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা কবে বন্ধ করবি তুই, হ্যাঁ?”, এরোজ ফের গর্জে ওঠে। জবার কলিজা যাই যাই করে উঠল। নিজের পছন্দের অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সে মিনমিনে স্বরে আর্তনাদ করে ওঠে,
–”ওরা মোর মাতৃভাষা কাইড়া নিতে চায়।”
ক্ষিপ্ত এরোজ ভড়কে যায় এহেন কথায়‌। চোখের তেজ কমে আসে, অপ্রস্তুত নিজেকে কোন স্বৈরাচার মনে হয়।
–“কি বললি?”
–“দুইডা পয়সার জন্য কাজ কইরা খাই দেইখা কি এহন মায়ের ভাষাটাও ত্যাগ করতে হইবো?”, জবা মিনমিনে স্বরে বলল। এরোজের ক্ষিপ্রতা কমে যায়। জবার দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে নিজের কাঙ্খিত লাগেজ ঘরে ঢুকিয়ে মুখের ওপর দরজা আঁটকে দেয়। জবা বদ্ধ দরজার দিকে তাকি কয়েক শ’ গালি দিয়ে পা বাড়ায় রান্নাঘরের দিকে। এই বাড়িতে কেউ তার সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করে না। আজ থেকে কাজ করছে? সে মুখ কালো করে রান্নাঘরে ঢুকতেই মৌনতা শুধায়,

–“কি হলো মুখের অমন দশা কেনো? বকা দিয়েছে না-কি?”
জবা আষ্কারা পেতেই বলবলিয়ে উঠল।
–“বলে কি জানেন? আমি নাকি কোন কাজ করি না সারাদিন গল্পগুজব করি আর ধেই ধেই করে নাচি। আর আমার কাজগুলো উনি আইসা কইরা দিয়া যায়। আস্ত এক মাতাল, তার ছিড়া! এত বছর পর বাড়ি ফিরে মানুষ দুইডা মিডা কতা হয়, উপহার দেয়, বিদেশী চকলেট দেয়, তা না!”
মৌনতা মিটিমিটি হেসে বলল,
–“এ তো কোনো স্বাভাবিক মানুষ না, জবা! উনি হলো পাবনা ফেরত রোগী‌। তার থেকে স্বাভাবিক আচরণ আমি বিয়ের পর পরই ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
বলেই মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল নিজের বুদ্ধিমানের মত কাজে। জবা মুখ বাঁকায়। পরমুহূর্তেই উদগ্রীব হয়ে শুধায়,

–“ভাবিজান, তিনডা লাগেজে কি আনছে? নিজের জামাকাপড় একটাতেই আনুক, আর বাকি দুইটা? আনছে মনে হয় কিছু! একেবারে খালি হাতে আইতেই পারে না। আমার জন্য যদি ছোনো, পাউডার কিংবা মেকাপ আনে, তাহলে আফনে আফনার কাছে নিয়া রাখবেন বুঝছেন? আমি আফনের থিকা নিয়া নেব।”
মৌনতা মিটিমিটি হেসে বলল,
–“এত আশা করিস না, জবা। ছোট ভাইজান আর মেয়েদের জিনিসপত্র? দেখাযাবে ঐ দুই ব্যাগ ভরতি শুধু নেশা করার জিনিসপত্র!”
জবা গম্ভীর গলায় বলল,
–“অসম্ভব কিছু না, ভাবিজান। আমার মনে হয় সে এহনো মাতাল।”
–“হতেই পারে। তবে মানুষটাকে এভাবে দেখলে খারাপ লাগে। আম্মা, আব্বুজান, বড় ভাইজান ভীষণ কষ্ট পায় তাকে এভাবে দেখলে। তুই যখন প্রথম এখানে এসেছিলি তখনো এমন ছিল?”
জবা না বোধক মাথা নেড়ে বলল,

–“তহন ছিল চৌরাস্তার চেয়ারম্যান আর এহন হইছে মাতাল।”
–“চৌরাস্তার চেয়ারম্যান?”, মৌনতার অবুঝ কণ্ঠ। জবা বেশ সাগ্রহে তাকে বুঝিয়ে বলল,
–“আরে তহন তারে একটু সময়ের জন্য ও বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাইত না। সারাদিন বাইরে থাকত, আর মাঝরাইতে ঘরে ফিরত। এরপর আফনেগো বিয়ার কিছুদিন পর নেশায় আসক্ত হইয়া গেছে। আমার মনে হয় আগে থিকাই নেশা করত, নয়ত মাঝরাইত পর্যন্ত বাইরে কি করত?”
–“বাসার মানুষ কিছু বলতো না?”
–“রোজ রোজ ঝামেলা করত, চাচায় আর তপোবন ভাইজান। কিন্তু ঐ ষাঁড়গরু তো কারোর কতা শোনার মানুষ না। এক সময় ত্যক্ত হইয়া গেছে সবাই।”
ক্ষুদ্র কথোপকথনের মাঝেই মৌনতার রান্না শেষ হয়ে গেল। মৌনতা খাবার বেড়ে প্লেট হাতে তুলে নেয়। জবাকে বলল,

–“এখন এটা গিয়ে উপরে দিয়ে আয়। এসেছে কতক্ষণ খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। এই রাতে ডাইনিং রুমে এসে একা একা খাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
জবার কলিজা আবার কেঁপে উঠল এহেন অসংলগ্ন কথায়। সে তেতে উঠল।
–“আমি জীবিত আছি আফনের ভালো লাগে না তাই না? আপনে এই রাইতে আমারে যা করতে কইবেন আমি সব করব কিন্তু ঐ দুয়ারে আমি আর যাব না। না মানে, না।”
–“আমার পায়ে ব্যথা বাড়ছে ইদানিং, জবা। এই নিয়ে উপরে ওঠা আবার নিচে নামা আমার পক্ষে সম্ভব না। যা, কথা বাড়াস না।”
–“একবার একটু কষ্ট করেন ভাবিজান। আমি আর কোনদিন কিছু বলব না। কিন্তু ঐ জল্লাদের মুখে একলা আমি যাইতেই পারব না।”, জবা অনুনয় করে বলল।
মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়ায়। যেতে যেতে বলল,
–“পুরো রান্নাঘর পরিষ্কার করে রাখবি।”
–“একদম চকচকে ঝকঝকে করে রাখব, আফনে চিন্তা কইরেন না।”, জবা হাঁফ ছেড়ে বলল।
মৌনতা ধীরপায়ে হেঁটে হেঁটে উপরে যায়। ইদানিং পায়ের ব্যথা ইদানীং বেশ উৎপীড়ন করছে। সে এরোজের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যেতেই দেখল এরোজ ঘর থেকে বের হয়ে কড়িডরের বাম দিকে পা বাড়িয়েছে। সে পিছু ডাকলো।
–“ছোট ভাইজান, আপনার জন্য খাবার এনেছি।”
এরোজ পা না থামিয়েই জবাব দেয়।

–“খিদে নেই।”
–“খেয়ে এসেছেন? আপনার পছন্দের গরুর মগজ রান্না করেছিলাম।”, মৌনতা গলা উঁচিয়ে বলল।
এরোজের আর সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না সে তানশানের ঘরে ঢুকে গিয়েছে। মৌনতা রেগে গেল এহেন আচরণে। এই শীতের রাতে ঘুম বাদ দিয়ে কষ্ট করে রান্না করাটাই ভুল হয়ে গিয়েছে। সব জায়গায় যেচে দাঁয়িত্ব পালন করতে নেই। এটা আরেকবার অনুধাবন করল সে। সে শাশুড়ির অবর্তমানে দায়িত্বটুকু পালন করতে চেয়েছিল। শাশুড়ি জেগে থাকলে নিশ্চিত ঘর মাতিয়ে তুলত, খাবার টেবিলে ভরিয়ে দিত ছোট ছেলের জন্য! কেউ যেন তার উপর প্রশ্ন না তুলতে পারে তার জন্য রান্না করেছিল। সে মনে মনে ঠিক করল, এরপর থেকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে। এতে যদি কেউ বলে, বড় ভাইয়ের বউ খারাপ, তবে সে খারাপ। মৌনতা ফোঁস ফোঁস করতে করতে নিচে চলে যায়।

সদ্য পুনরুজ্জীবিত যন্ত্রনাগুলোকে দূর করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা এরোজ আজ আর তৎক্ষণাৎ কোন নেশা দ্রব্যের সান্নিধ্যে গেল না। বরং খুঁজে নেয় আরেক প্রশান্তি! অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে প্রবেশ করতেই আবছা আলোয় অস্পষ্ট দেখা যায় এক অবয়ব। এরোজ টলটলে নেত্রে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। সাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় কম্ফোর্টারের আড়ালে থাকা ঘুমন্ত মানুষটাকে। বড্ডো স্নেহের সাথে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“আমার তানশান কত বড় হয়ে গিয়েছে। ছোট পাপার সমান হয়ে গিয়েছে!”
সে কাল বিলম্ব করে না ধীরস্থির কম্ফোর্টারের আড়ালে ঢুকে গেল। শক্ত হাতে বুকে আগলে নেয় ঘুমন্ত ছেলেটিকে। চুলের গোছায় ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখে দীর্ঘক্ষণ। ছেলেটার নবজাতক থেকে শৈশবের সাথে সে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কতদিন নাকে কাপড় বেঁধে ডায়পার চেইঞ্জ করেছে। যখন মায়ের জন্য আর্তনাদ করত তখন পুরো খুলনা বাইকে করে ঘুরে বেড়াত, আর তানশান ভুলে যেত মায়ের কথা।
সর্বদা শৌখিন, চাপা স্বভাবের ছেলেটি বড় হওয়ার সাথে সাথেই ব্যক্তিসত্তার ভীষণ পরিবর্তন ঘটে। খুব জড়াজড়ি তার পছন্দ নয়। কিন্তু মাঝরাতে এই গভীর আলিঙ্গনে তারমধ্যে কোনোরূপ বিরক্তি দেখাগেল না। তানশান বদ্ধ নেত্রে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বিড়বিড় করে,

–“পাপা?”
এরোজ তার গালে চুমু দিয়ে বলে,
–“না, ছোট পাপা।”
তানশান ঘুমের মধ্যেই বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর বলল,
–“ওহ্, আমি স্বপ্ন দেখছি।”
এরোজ হেসে ফেলল। সেই ফেলে যাওয়া ছোট্ট তানশান আর নেই। সে নিজের আর ভাইয়ের অবিকল ছেলেটাকে এত বছর পর বুকে পেয়ে আপ্লুত। স্নেহের সাথে বলল,
–“আফসোস এটা তোমার স্বপ্ন নয়, তানশান। হ্যাপি নিউ ইয়ার, প্রিন্স! ছোট পাপা মিসড ইউ আ লট!”
দীর্ঘ ভারী কণ্ঠের সংলাপে তানশানের ঘুম হুড়মুড়িয়ে পালায়। সে তড়াক চোখ মেলে তাকাতেই ছোটখাটো এক বিস্ফোরণ করল। সে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধায়,
–“ছোট পাপা?”
–“ইয়েস!”, এরোজ প্রগাঢ় হেসে বলল। তানশান অনতিবিলম্বে উল্লাসে ফেটে পড়ল। প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলো। হড়বড়িয়ে বলে,

–“ছোট পাপা? তুমি? কখন এসেছো? আমি কি সত্যি দেখছি?”
এরোজ নিরবে তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। কিছুটা পল দু’জনে নিরবে অনুভব করে। তানশানের ঘুম চলে গেল। সে উঠতে গেলে এরোজ তাকে হাতের আজলায় আগলে নিয়ে আবদার করে বলল,
–“এখন লাফালাফি করার কোন প্রয়োজন নেই, তানশান। এখন ঘুমাও, ছোট পাপা ভীষণ ক্লান্ত।”
তানশান ভদ্র ছেলের মতো পুনরায় চাচার বুকে লেপ্টে গেল। এরোজ তাকে আদুরে হাতে জড়িয়ে নিতে নিতে আক্ষেপ করে বলল,
–“বুকের নিচে রেখে যাওয়া ছোট্ট তানশান দেখি চাচার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে উচ্চতায়। আমি এখন আদর করব কি করে?”
তানশান মলিন হাসে প্রত্যুত্তর করে না। চাচার উষ্ণতায় কখন যে তানশান ঘুমিয়ে গেল খেয়াল ই হলো না। কিন্তু এরোজ ঘুমাতে পারল না তবে সে খুব প্রয়াস করে ঘুমানোর।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত শীত নিবারণকারী সাদা একটা রমপার পরিহিতা নায়েল সদ্য ঘুম থেকে ওঠা জড়ানো চোখ ডলতে ডলতে গুটি গুটি পায়ে ভাইজানের ঘরে ঢুকলো। দ্বিধাহীন কদমে কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে বিছানায় গুটিয়ে শুয়ে থাকা ভাইজানের উপর গিয়ে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। জড়ানো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“ভাইজান, ওঠো! সকাল হয়ে গিয়েছে।”
ভাইজান নড়েচড়ে উঠলেও কোনরূপ সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। নায়েল এবার ভাইজানের গা থেকে নেমে পা গুটিয়ে তার পাশে বসে, আর লাগাতার ডাকতে শুরু করে।
–“ভাইজান ওঠো, সকাল হয়ে গিয়েছে। তুমি তো দেখছি ব্যাড বয় হয়ে গিয়েছ, ওঠো!”
লাগাতার এমন ডাকাডাকিতে কম্ফোর্টারের আড়ালে থাকা মানুষটা নড়েচড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙল। নায়েল চমকে গেল গুটিয়ে থাকা ভাইজান সোজা হতেই। সে আবাক চোখে ভাইজানকে দেখতে দেখতে বলে,
–“একি লাতেল মধ্যে ভাইজান বলো হয়ে গিয়েছে কি কলে? লাতে কি বনভিটা খেয়েছ?”
নায়েল ভাইজানের পেট চাপড়ে বলল। লাগাতার এমন হঠকারিতায় এরোজ প্রচুর বিরক্তিসমেত চোখের উপর থেকে কম্ফোর্টার সরায়। সরাতেই মুখের উপর ভেসে ওঠে হ্যাংলা পাতলা ফর্সা ছোট্ট আদল। এরোজ ভড়কে যায় অতি নিকটে ছোট্ট একটি কৌতুহলী মুখ দেখে। নায়েল চোখমুখ কুঁচকে তাকায়। ভাইজানের চোখ তো ঠিকই আছে। এটা তো ভাইজান কিন্তু এত লম্বা হয়ে গেল কি করে?
সে ফের পেট চাপড়ে বলল,

–“ভাইজান ওঠো, তুমি এতো লম্বা হয়ে গেলে কি কলে? আমায় ও বলো, আমিও লম্বা হবো।”
ঘুম জড়ানো অচল মস্তিষ্কে এরোজ কপাল কুঁচকে মেয়েটিকে অবলোকন করে। বিরক্তি নিয়ে শুধায়,
–“কে তুমি?”
ভারী গম্ভীর রুক্ষ কণ্ঠে এবার নায়েল ভয়ে চুপসে গেল। এ তো ভাইজান নয়। সে এবার টেনে এরোজের মুখের ওপর থেকে কম্ফোর্টার সরাতেই চেঁচিয়ে উঠল।
–“আমাল ভাইজান কোথায়? তুমি কে? চোল? বালিতে চোল ঢুকেছে, ভাইজানকে নিয়ে গিয়েছে। মাম্মা, বালিতে চোল এসেছেএএএএ! মাম্মাআআ!”
নায়েল ভয়ার্ত কণ্ঠে চেঁচাতে চেঁচাতে বিছানা থেকে নেমে ছুটে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। এরোজ তখনো বিভ্রান্ত চোখে দরজার পানে তাকিয়ে আছে। কোন প্রকার নেশাদ্রব্যের সান্নিধ্যে না থাকায় খুব বড্ডো পাতলা। সে কপাল কুঁচকে বিছানা ছেড়ে নেমে যায়। তানশানকে ঘরময় খুঁজে পেল না। লম্বা লম্বা পায়ে ঘর থেকে বের হতেই দেখলো সেই পিচ্চি মেয়েটা রেলিং আঁকড়ে ধরে সবাইকে ডাকছে আর বলছে,
–“বালিতে চোল ঢুকেছে, ভাইজানেল মতো দেখতে চোল।”
মৌনতা ছুটে এসে নায়েলকে কোলে তুলে নিলো। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজের দিকে তাকিয়ে বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৮

–“দুঃখিত ভাইজান! আসলে ও হয়তো আপনাকে চিনতে পারেনি।”
মৌনতা এক ছুটে নায়েলকে নিয়ে পালায়, মেয়েটার উপর চিৎকার চেঁচামেচি করেনি এটার শুকরিয়া আদায় করতে করতে। এরোজ সেদিকে এক পলক তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। বেডসাইড টেবিলের উপর রাখা নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে গ্যালারিতে ঢোকে। গ্যালারি ঘেঁটে একটা অস্পষ্ট ছবি বের করল। নিগূঢ় চোখে পর্যবেক্ষণ করল সেই ছবিটা। মেলাতে চেষ্টা করল সদ্য দেখা মেয়েটিকে। ছবিতে ছোট্ট নায়েল কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। এটা তানশান তাকে পাঠিয়েছিল। ছবির থেকে বাস্তবতা দ্বিগুণ সুন্দর!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১০