অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১০
তোনিমা খান
–“চোল, চকলেট পাঠানো সেই ছোট পাপা?”, নায়েলের কৌতুহলী কণ্ঠ। নেত্রদ্বয় বৃহৎ আকারের ধারণ করেছে।
–“হ্যাঁ, ওটা তোমার ছোট পাপা। সে কিন্তু ভীষণ রাগী। একটুও দুষ্টু করা যাবে না তার সাথে। তাহলে কিন্তু বকা দেবে, তার থেকে দূরে থাকবে।”, মৌনতা মেয়েকে মোজা পরাতে পরাতে বলল। তবে এহেন কথায় রোজ বেজায় রেগে গেল।
–“মৌন বউ তুমি আমার ভাইজানের সম্পর্কে এরকম বলতে পারো না। নায়েলকে ভয় দেখাচ্ছ কেন?”
–“তোমার ভাইজান আমার অবুঝ মেয়েটাকে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিচ্ছিল। আরেকটু দেরি হলেই দিত বকা! বলব না তো কি করব? তোমার ভাই একটু ভালো ব্যবহার করতে পারে না?”, মৌনতার রাগী কণ্ঠে রোজ ফোঁস ফোঁস করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ভাইজান এসেছে কিছুক্ষণ আগেই শুনেছে সে। এখনো দেখা হয়নি।
মৌনতা মেয়েকে মোজা পরিয়ে টুপি বের করতে করতে বলল,
–“মা তুমি এই সকালে উঠে বসে আছো কেন? আরেকটু ঘুমাতে, মাত্র ছয়টা বাজে। বাইরে কি শীত!”
–“ঘুম তো নেই, মাম্মা!”, নায়েল হাত নেড়ে বলল। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এখন থেকে পুরোটা দিন এই মেয়ের পেছনে তাকে আর জবাকে ছুটতে হবে। বেশ কষ্টসাধ্য তার জন্য। ঘরের কাজ সামলে মেয়ের পেছনে ছোটাছুটি করার জন্য শরীরে আগের মতো শক্তি আর পায় না। তাই যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে ততক্ষণ তার জন্য একটু বিশ্রামের হয়।
সে মেয়ের মুখে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে দিয়ে মাথায় টুপি পরাতে গেলে নায়েল তীব্র বেগে নাকোচ করে ওঠে।
–“নো টুপি, মাম্মা।”
–“টুপি পরতে হয় মা। বাইরে খুব ঠান্ডা, তোমার গলা ব্যথা করবে। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
নায়েল কেঁদে উঠল টুপি পরবে না বলে। মৌনতা নিরুপায় হয়ে মেয়ের কোমড় সমান লম্বা চুলের বেনুনী খুলে দেয়। সহসা পুরো মাথা সহ পিঠ ছড়িয়ে গেল ঘন কালো চুলে। সে রেশমের ন্যায় চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে দিল। এখন একটু ঠান্ডা কম লাগবে। অতঃপর সিপার কাপে উষ্ণ গরম করে রাখা দুধ তার হাতে ধরিয়ে দিল। নায়েল স্ট্র মুখে দিয়ে দুলতে দুলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মৌনতা ছুটলো সকলের জন্য নাস্তা বানাতে। ঘরের একেক জনের একেক রকমের চাহিদা থাকায় তার সারাদিন রান্নার উপরেই থাকতে হয়।
তানশানের বয়সের অন্যতম এক সেন্সিটিভ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বয়সের এই টার্মটাতে পজিটিভিটি গ্রহণ করতেও সময় লাগে না, নেগেটিভিটি গ্রহণ করতেও সময় লাগে না। সে ভেবেছিল, সে খুব সহজে নতুন একটা মানুষকে বাবার জীবনে গ্রহণ করে নিতে পারবে। তবে এটাও যে তার বয়সের একটা নড়বড়ে আচরণ। কারণ বিষয়টা সে যত সহজে গ্রহণ করতে চেয়েছিল, বিষয়টা ঠিক ততোটাই কঠিন। এই যে ক্ষুদ্রতম একটা ভ্রান্ত ধারণাও বাবার প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ঘটনাটি প্রাতঃকালের। বুঝ হওয়ার পর থেকে তানশানের মনে পড়ে না—যে সে কখনো বাবার সাথে জামায়াতে গিয়ে নামাজ পড়া মিস দিয়েছে! চরম অসুস্থতায় ও বাবা ছেলে টলতে টলতে মসজিদে গিয়েছে। বাবা সবসময় বলে, অসুস্থতা কখনো নামাজ বাদ দেয়ার কারণ হতে পারে না বরং অসুস্থতা থেকে বাঁচার জন্য হলেও আল্লাহর কাছে হাজির হতে হবে। তবে এর অন্য আরো একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। বাবার ভাষ্যমতে কেউ ভীষণ অপেক্ষায় থাকে, যেন তারা বাবা-ছেলে প্রতিদিন আল্লাহর সান্নিধ্যে হাজির হয়। আর সেই মানুষটি হলো তার মাম্মা। তাই তারা যত অসুস্থ ই থাকুক না কেন—যেকোন মূল্যে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করে। তবে আজ সেই অভ্যাসে প্রথমবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। সে আজ নামাজ পড়তে যেতে পারেনি। এলার্ম ও শুনতে পায়নি, বাবাও ডাকতে আসেনি।
মাম্মা নিশ্চয়ই অপেক্ষায় ছিল বাবা আর তার জন্য। ভারাক্রান্ত ভঙ্গুর মন নিয়ে তানশান নুইয়ে পড়ল যখন ঘুম ভাঙলো। টলটলে নেত্রে বাবার কাছে ছুটে গেল। কিন্তু বাবার দরজা পর্যন্ত গিয়ে বদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়াতেই মাজেদা দাদু তাকে তড়িঘড়ি করে টেনে ধরে বলে,
–“এখন যাইয়ো না তানশান বাবা, নতুন নতুন বিয়া হইছে একটু দেরি কইরা ঘুম ভাঙবে স্বাভাবিক।”
এহেন কথায় তানশান চোখ পিটপিট করে তাকায়।অপ্রস্তুত ভীষণ বিব্রত হয়। সকালের নিয়মানুযায়ী পুরো ঘর ঝাড়ু দিতে থাকা জবা চমকালো মাজেদা চাচির কথায়। ঝাড়ু হাতে জবা তেড়ে এসে চোখে শাসায়। তানশানের দিকে তাকিয়ে বিগলিত হেসে বলল,
–“তানশান বাবা, তোমার দাদু মজা করছে তোমার সাথে। তুমি বাবার কাছে যাইবা? যাও যাও।”
তানশান গেল না বরং মাথা নুইয়ে দ্রুত কদমে ফিরে যায় নিজের ঘরে। তানশান যেতেই জবা তেতে উঠল মাজেদা চাচির উপর।
–“বুড়ি, আক্কেল জ্ঞান সব গিয়েছে না-কি? ঐটুকুন পোলার সামনে তুমি এই কতা কও কোন আক্কেলে, হ্যাঁ? ও কষ্ট পাইছে না? তানশান এমনিই চুপচাপ মানুষ, ছোট ছোট কতা মাথায় গাইথা নেয়। এহন যদি এই নিয়া ও মন খারাপ করছে না? তোমারে আমি দেইখা নিবো। তপোবন ভাইজানকে বইলা দিবো তুমি কি করছ।”
মাজেদা চাচি নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপসে গেল। বয়স্ক মহিলাটা বয়সের তারতম্যে ভীষণ সোজাসাপ্টা! কে কি ভাবলো, কে কি বলল তাতে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করে না। কিন্তু তাই বলে অতোটুকু ছেলের সামনে? তাও আবার এমন বিব্রতকর বিষয় নিয়ে? ছিঃ ছিঃ! জবা নিজ মনে আহাজারি করতে লাগলো।
সকাল আটটা। মুখের ওপর তোয়ালে চেপে রাখা তপোবন অজশ্রবারের মতো ফের বিকট শব্দে হাঁচি দিল। হাঁচির সাথে কাশি সর্দি—একটার সাথে আরেকটা ফ্রি। এলার্জির ধরুন প্রায়শ রাতেই তার নাস্তানাবুদ অবস্থা হয়। আর এটা বেশি বাড়ে ঘুমাতে গেলে। টলটলে লালচে চোখ মুখের উপর থেকে তপোবন তোয়ালে সরিয়ে সদ্য বেজে ওঠা ফোনটি হাতে নেয়। রিসেন্ট যেই ক্লায়েন্টের কাজ করছে তার ফোন। মেজাজ খানিক চড়ে যায়। এমনিতেই ঘুম ভাঙার পর থেকে মেজাজ ঠিক যাচ্ছে না। মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। মাঝরাতে যখন হাঁচি দিতে দিতে বেহাল দশা হয়ে যায়, তখন ওষুধ খেয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঘুম কখন যে গাঢ় হয়ে গিয়েছে বুঝতে পারেনি। চোখ যখন খুলেছে তখন সকাল সাতটা। নামাজ মিস গিয়েছে, আর এটাই তার মেজাজ খারাপের কারণ। সে নামাজ মিস দিলেই পুরোটা দিন তার অদ্ভুত খারাপ কাটে।
শুয়ে শুয়ে পুনরায় মুখে তোয়ালে চেপে কানে ফোন ঠেকায়। সালাম দিতেই অপরপ্রান্ত থেকে অসন্তোষ জনক বার্তা শোনা গেল। সে তৎক্ষণাৎ উঠে বসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“ইমরোজ আপনাকে কোন সাইট হ্যান্ড ওভার কিংবা ফাইনাল পেমেন্টের স্টেটমেন্ট দিয়ে আসেনি?”
অপরপ্রান্ত থেকে কি বলল শোনাগেল না। তপোবন শারীরিক দূর্গতি সামলে বিক্ষিপ্ত মেজাজে উচ্চারণ করে,
–“হোয়াট রাবিশ! ইমরোজ আপনাকে কোনরূপ ফাইনাল স্টেটমেন্ট না দিয়ে চলে এসেছে কিভাবে? কিন্তু ও তো বাড়িতে আসেইনি।”
নাকে টিস্যু চেপে আরেকটা বিকট শব্দে হাঁচি দিয়ে তপোবন অধৈর্য্য হয়ে বলল,
–“আচ্ছা, আপনি চিন্তা করবেন না, খান সাহেব। আপাতত আমার কাছে ফাইনাল স্টেটমেন্টের যে কপিগুলো আছে তা আপনাকে পাঠাচ্ছি। আর ইমরোজ আসলেই সাথে সাথে আপনার কাছে আসল পেপারস গুলো পৌঁছে যাবে।”
ফোন কেটে তপোবন তোয়ালে ছুঁড়ে ফেলে তড়িঘড়ি করে চেইঞ্জিং রুমে ঢুকলো। মিনিটের মাঝে চেইঞ্জ করে বের হতেই ভেসে আসলো সতর্ক একটি কণ্ঠ। এতক্ষণ ধরে মূর্তির মত চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি মিনমিনে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“চা করে দেব?”
মাথা ব্যথা, সর্দিতে টলটলে নেত্র তুলে এতক্ষণ বাদ তাকায় মেয়েটির পানে। রূপকথা সেই চাহনিতে মিইয়ে গেল। গতকাল লোকটিকে যতটা নরম মনে হয়েছিল, এখন ঠিক ততোটাই ভয়ঙ্কর লাগছে। এই ছোট্ট কথাটুকু বড্ডো সাহস করে বলেছে সে। কখনো পুরুষ মানুষের সান্নিধ্যে না থাকা কিছুটা ভীতি রয়েছে পুরুষ মানুষের উপর। কখন তারা বদলে যায়। মানুষের বদলে যাওয়া রূপ যে ভয়ঙ্কর হয়। সে ভেবেছিল কোন রাফ ব্যবহারের স্বীকার হবে কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলো না। তপোবন ঘড়ি আর মানিব্যাগ তুলে নিতে নিতে ভারী কণ্ঠে বলল,
–“প্রয়োজন নেই, আমি বাইরে খেয়ে নেব।”
বলেই সে দ্রুত কদমে ঘর থেকে বের হয়। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে স্বচ্ছতা তার একমাত্র অমূল্য সম্পদ! আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না তপোবন সিকদারের দ্বারা কোনপ্রকার অসৎ কাজ হয়েছে কিংবা কারোর সাথে লেনদেনে ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রায়শই তাকে ঝামেলায় পড়তে এই কাজগুলো অন্যের দ্বারা করালে। ইদানিং ইমরোজের কাজে অনেক গাফলতি দেখা যায়, যার কারণে তার মাথা হেঁট হয়।
বের হয়ে পথিমধ্যে ছেলেকে খুঁজল কিন্তু ছেলেকে ঘরে পেল না। এদিকে নিজের স্বচ্ছতা ধরে রাখার ভীষণ তাড়া। ক্লায়েন্টের কাছে সকল স্টেটমেন্ট পাঠিয়ে তাকে ঠান্ডা করাই মূল লক্ষ্য! সে নিচে নামার জন্য উদ্বুত হলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বহু বছর ধরে মানবহীন থাকা বদ্ধ ঘরটি। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা মৌনতা বড়ো ভাসুরকে দেখে শুধায়,
–“ভাইজান চা দেব?”
তপোবন তার দিকে দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
–“এরোজের ঘর পরিষ্কার করাচ্ছো, মৌন?”
মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“না ভাইজান। ছোট ভাইজান এসেছে।”
তপোবন অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো।
–“তুমি মজা করছ, মৌন?”
–“না ভাইজান, গতকাল রাত একটার পরে এসেছে। আমরা সবাই চমকে গিয়েছিলাম।”
তপোবনের ভীষণ তাড়া থাকলেও সেই তাড়া খানিক অবহেলিত হলো ভাইয়ের আগমনের আকস্মিক সংবাদে। সে কোনরূপ বাক্য ব্যয় না করে উল্টোপথে ছুটলো।
নিজের মেজাজ ঠান্ডা করার প্রক্রিয়ায় মত্ত থাকা এরোজের অবসন্ন দেহে বিরক্তির উদ্রেক হয় দরজায় কেউ নক করতেই। ঘুম আর নেশা প্রিয় হওয়ায় এগুলোতে ঘাটতি পড়লেই তার মেজাজ খানিক চড়ে যায়। এখনো তার ব্যতিক্রম হলো না। সে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে দরজা খুললে বিরক্তিতে ভাটা পড়ল। সম্মুখের মানুষটা একটুও কাল বিলম্ব করল না সবেগে বুকে জড়িয়ে নেয় ছেলেটাকে। এরোজ ভারী এক নিঃশ্বাস ফেলে ভাইজানকে জড়িয়ে ধরে। তপোবনের নেত্রদ্বয় খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। অনবরত ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“ভাইজানের কথা রাখার জন্য ধন্যবাদ, এরোজ। কতগুলো বছর পর একটু বুকে পেলাম। ভাইজানের কথা একটুও মনে পড়ে না।”
–“মনে পড়েছে বলেই তো এসেছি।”, এরোজের নিস্তেজ অনুভূতিহীন কণ্ঠ। তপোবন ভাইকে ছাড়তে নারাজ। বারবার শুধু ছুঁয়ে দেখছে ছেলেটাকে। ক্লায়েন্ট ফের ফোন দিয়েছে। সে হাসিমুখে ছেলেটাকে আরেকদফা জড়িয়ে ধরল।
–“আম্মা আর আব্বুর সাথে দেখা করে আয়। আম্মা রোজ রোজ কান্নাকাটি করে তোর জন্য। ভাইজানের একটু জরুরী কাজ আছে, সেরেই আসছি।”
এরোজ যেন জীবন থেকে মানুষ দূর করতে পারলেই প্রশান্তি পায়। যেদিন জীবন তার পিছু ছুটে গিয়েছে সেদিন থেকে কাউকে আঁটকে রাখার তাড়া তার মাঝে দেখা যায় না। তপোবন অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
ভীষণ মন খারাপ থাকলেই তানশানকে ছাদে দেখা যায়। মন খারাপেরা যেন ভিন্ন মাত্রা পায় একাকিত্বে। আজো তার ব্যতিক্রম হলো না। একাকী ছাদের এক কিনারায় দোলনায় বসে অংক করতে থাকা ছেলেটা মাঝেমধ্যেই উদাসীন হয়ে পড়ে, নানা অসংলগ্ন চিন্তা জুড়ে বসে মস্তিষ্ক জুড়ে আবার নিজেকে সামলায় মনোযোগ দেয় ম্যাথে। ম্যাথ করতে করতেই তার দৃষ্টি আটকায় গ্যারেজ থেকে বাবার গাড়ি বের হচ্ছে। তার কৌতুহল বাড়লো। গাড়ি বের হতেই বাবা ব্যস্ত কদমে গাড়িতে উঠে গেল। গাড়িটি নিমিষেই চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল। তানশান উদাসীন নেত্রে দেখলো বাবার বদলে যাওয়া আচরণ! বাবা যে কখনো তার সাথে দেখা না করে বাইরে যায় না। সে উদাসীন কণ্ঠে বিড়বিড় করে,
–“পাপা ইজ চেইঞ্জিং!”
সকাল থেকে একের পর এক সদস্য দেখা করতে এসে এরোজের মেজাজ ক্রমশই বিগড়ে দিচ্ছে। মাত্রই রোজকে বিদায় দিয়ে এরোজ তখন অধৈর্যতার সাথে তিনটা বোতলে রাখা নিষিদ্ধ পানি একটি গ্লাসে মিশিয়ে নিলো। ভীষণ উত্তেজনার সাথে খাওয়ার জন্য উদ্বত হলেই হাট করে দরজা খোলার শব্দ হলো। সে এবার ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে গর্জে উঠল,
–“কি অবস্থা রোজ! নক করে ঘরে ঢোকা যায় না?”
সে জ্বলন্ত চোখে ফিরে তাকালে, তার তেজি কণ্ঠ আর দৃষ্টি দুটোই নিভে গেল নাক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আড়াই ফুটের একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখে। ফোলা ফোলা ধূসর ঐ দৃষ্টিদ্বয়ে সরব স্থিরভাবে এঁটে যায় মেয়েটির দোদুল্যমান কোমড় সমান লম্বা ঘন চুলগুলো। বারবার ছোট ছোট হাত দিয়ে কপালের উপর পড়া বেবি হেয়ার গুলোকে বিরক্তির সাথে সরিয়ে দিচ্ছে। প্রচন্ড বিক্ষিপ্ত মেজাজের মাঝে ঐ দৃশ্যটুকুতে ছেলেটির মস্তিষ্কের সকল উত্তেজনা বিলীন হয়ে যেতে লাগলো মন্থর গতিতে।
নায়েল চঞ্চল কদমে ঢুকতেই নাকমুখ চেপে ঘৃণিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“ইউউউ ইয়াক! তোমাল ঘলে কি পঁচা গন্ধ!”
এরোজের কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল সেই ঘৃণিত কণ্ঠে। চোখ ঘুরিয়ে নিজের হাতের গ্লাসের দিকে তাকায়। সে মোটেই এই আড়াই ফুটের বাচ্চা মেয়েটির কাছে কৈফিয়ত দেবে না! সে গ্লাস রেখে পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। রমপার পড়া পুতুলের মতো বাচ্চা মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে গম্ভীর গলায় বলল,
–“তোমার নাক পঁচা তাই তুমি পঁচা গন্ধ পাচ্ছো।”
নায়েল বড়ো বড়ো নেত্রে তাকায়। চোখে তার বিস্ময়। সে আরশিতে নিজের সহিসালামত নাকটিকে তৎক্ষণাৎ দেখে নিল। কই নাক তো ঠিকই আছে! সে জেদি কণ্ঠে নাকোচ করে বলল,
–“মোটেই না, আমাল নাক একদম ঠিক আছে। তোমাল চোখ পঁচা, তাই তোমাল মনে হচ্ছে আমাল নাক পঁচা। তুমি চোখেল ডাক্তাল দেখাও।”
–“তুমি বেশি কথা বলো।”, এরোজ চতুর মেয়েটির প্রতি নিদারুণ বিরক্তি নিয়ে বলল।
–“বেবিরা বেশি কথাই বলে।”, নায়েল কপাল কুঁচকে বলল। এরোজ গম্ভীর নেত্রে দেখে মুখের উপর জবাব রেডি থাকা মেয়েটিকে। অতঃপর জানা পরিচয় জানতে শুধায়,
–“কে তুমি?”
–“আমি নায়েল, নায়েল ছিকদাল। এই বালিটা যে দেখছো না? এটা আমাল বালি।”
–“ওটা সিকদার হবে।”, এরোজের থমথমে কণ্ঠ।
–“হ্যাঁ ওটাই, তুমি বুঝে নেবে।”
–“পারব না।”, এরোজের ত্যাড়া কণ্ঠে নায়েল ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল,
–“আলসে! মাম্মা বলেছে তুমি না-কি অনেক লাগী। কেন এত লাগ কলো?”
–“তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে না গেলে, দেখতে পারবে আমি কেন রাগ করি।”
নায়েল চুপ হয়ে গেল। পরপরই ভাবুক কণ্ঠে বলল,
–“তুমি আবাল লেগে গিয়েছ, তাই না? এত লাগ কলে না, মানুষ ব্যাড বয় বলবে তোমায়।”
পরপরই শুধায়,
–“তুমি কে?”
তার প্রশ্নে এরোজ ভ্রু উঁচিয়ে দাম্ভিকতা নিয়ে বলে,
–“আমি এই বাড়ির মালিক, এরোজ সিকদার।”
নায়েল বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। বিস্ময় নিয়ে বলল,
–“এক বাড়িল দুইজন মালিক হয় না তো!”
–“হয়।”, এরোজের কথায় নায়েল হাঁফ ছেড়ে বলল,
–“ওহ্ আচ্ছা! তবে আমি উপর তলার মালিক আর তুমি নিচ তলার, ঠিক আছে? আর তুমি ঘলে এয়াল ফেশ দাও পঁচা গন্ধ দূল হয়ে যাবে।”
–“তোমার এই র আর ল এর সাথে এত দ্বন্দ্ব কেনো?”, এরোজের থমথমে কণ্ঠে নায়েল অবুঝ কণ্ঠে বলল,
–“বুঝিনি, আবার বলো।”
এরোজের বিরক্তির মাত্রা এবার বাড়তে লাগল। শরীর অস্বাভাবিক ভাবে গরম হয়ে উঠছে। সে অস্থির কণ্ঠে বলল,
–“কেন এসেছ এখানে? বের হও!”
ভারী রুক্ষ আচরণে নায়েলের মুখ ছোট হয়ে গেল। থমথমে মুখে বলল,
–“মাম্মা বলেছে, আমি যেই বুবু লুবু চকলেট পছন্দ কলি তা তুমি পাঠাতে। তোমাল কাছে সেই চকলেট আছে। আমায় দুটো চকলেট দাও। বেশিও দিতে পালো আমি অনেক খুশি হবো।”
এরোজ নির্লিপ্ত চিত্তে আবদারটুকু শুনলো। মিহি স্বরে শুধায়,
–“তোমায় খুশি করে আমার কি লাভ?”
–“মাম্মা বলে, যালা অন্যকে খুশি করে তালা গুড বয় হয়। তুমিও তবে গুড বয় হবে।”
শত বিরক্তির মাঝে এরোজের ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়। সে নিরুত্তর লাগেজ খুলে এক বক্স চকলেট বের করে নায়েলের দিকে এগিয়ে দিল। নায়েল চকলেট পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। এরোজ তার হাসিমুখ এক পলক দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
–“চকলেট পেয়েছো , এখন বের হও।”
–“ওকে!”, বলেই নায়েল ছুটতে গেল। এরোজ ফের মগ্ন হয় নিজের কাজে কিন্তু পুনরায় তার কার্যরোধ হলো নায়েলের চঞ্চল কণ্ঠে,
–“এই ব্যাড বয়, এদিকে তাকাও।”
এরোজ তাকায়। রুক্ষ কণ্ঠে শুধায়,
–“আবার কি চাই?”
–“আমাল কাছে এসো।”, নায়েল হাত বাড়িয়ে ডাকলো তাকে। এরোজ বিরক্তি নিয়ে কাছে যায়। নায়েল মুখের ওপর পড়া চুলগুলোকে সরাতে সরাতে ফের বলল,
–“তোমাল মাথা নিচে নামাও।”
এরোজ মাথা নুইয়ে দিতেই তাকে অবাক করে দিয়ে ছোট্ট দুটি ওষ্ঠ আলতো ছুঁয়ে গেল তার ডান গাল। এরোজ চমকালো। নায়েল হাসিমুখে বলে,
–“মাম্মা বলে, কেউ উপহাল দিলে তাকে আদল কলে দিতে হয়। কিন্তু তোমাল মুখেও গন্ধ! ব্লাশ কলো তালাতালি।”
বলেই সে উল্টোপথে পা বাড়ায়। স্থবির এরোজ নায়েলের চুলগুলো একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতেই পিছু ডাকলো।
–“নায়েল?”
নায়েল তখন বেশ দূরে চলে গিয়েছে। সে পিছু ফিরে বলে,
–“বলো বলো!”
–“কাছে এসো।”
–“তুমি এসো, তোমাল ঘলে পঁচা গন্ধ, আমাল বমি আসে।”
বিক্ষিপ্ত মেজাজের এরোজ এহেন আদেশে চমৎকার বাধ্যগত আচরণ করল। সে হেঁটে গিয়ে নিজের ব্যাগ খুললো। ব্যাগের একটা মিনি প্যাকেট খুলতেই ভীষণ বদ অভ্যাসেরা ভেসে উঠল। পকেট ভরতি মেয়েদের হেয়ার ক্লিপ। সে সেখান থেকে দু’টো ক্লিপ পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ধীরপায়ে নায়েলের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। নায়েল হাসিমুখে শুধায়,
–“কি?”
এরোজ জবাব দেয় না। হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে মুখের উপর পড়া চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। ঠিক একিভাবে অপর কানেও উড়তে থাকা চুলগুলো গুঁজে দিল। অতঃপর নিজের সাথে করে আনা ক্লিপদুটো দিয়ে বেবি হেয়ার গুলো আঁটকে দেয়। এখন আর চুলগুলো বিরক্ত করছে না নায়েলকে। এরোজের চোখমুখ ঠিকরে স্মিত হাসি ফুটে উঠল অবাধ্য চুলগুলোকে দমন করতে পেরে। নায়েল ভীষণ আনন্দিত হয় এহেন কাজে। সে চমৎকার হেসে বলল,
–“ওয়াও সুন্দল ক্লিপ! আমাল চুল আল বিলক্ত কলছে না। তুমি তো দেখছি খুব সুইট। মাম্মা তবে তোমায় ব্যাড বয় বলল কেন? তুমি তো গুড বয়।”
বলেই নায়েল ফটাফট এরোজের দুই গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর সে এক ছুট লাগায় নিচের তলায়। এরোজ সেভাবেই ধীরস্থির নিজের দু গালে হাত বুলায়। অতঃপর স্মিত হেসে নিজের ঘরে চলে যায়। ঢুকতেই চোখে বাঁধে কাঁচের গ্লাসে থাকা নিষিদ্ধ পানীয়। তবে এখন আর ইচ্ছে হলো না ঐ পানি পান করার। ওটা খেলেই তো সদ্য অনুভব করা বিশেষ ঐ অনুভূতিগুলো হারিয়ে যাবে নেশার আড়ালে। সে মোটেই হারাতে চাইল না খুব ভাগ্যের জোরে পেয়ে যাওয়া অনুভূতি গুলোকে। সে বেসিনে ফেলে দিল গ্লাসের নিষিদ্ধ পানি। অতঃপর ধপ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। অচিরেই মিনিটের মাঝে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। প্রয়োজন পড়ল না কোন ঘুমের ওষুধের আর না প্রয়োজন পড়ে কোন নেশা দ্রব্যের।
নির্জনা বেগম প্রবল উত্তেজনার সাথে দোতালায় উঠলেও তা ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়, অতি উল্লাসে। সে ধীরপায়ে হেঁটে এরোজের ঘরে ঢুকলো। ঢুকতেই উটকো বিশ্রী গন্ধ এসে নাকে ঠেকল। তার তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি আঁটকে যায় বিছানায় শায়িত সুবিশাল দেহপানে।
চুলগুলোতে স্নেহের স্পর্শ অনুভব করতেই এরোজ নিভু নিভু চোখদুটো মেলে। মাকে দেখে সে মৃদু হেসে তার হাত টেনে বুকের সাথে আগলে ধরল। জড়ানো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“আম্মা? কেমন আছো?”
–“আমার ছেলে যেমন আছে আমিও তেমন আছি।”
এরোজ হাসলো। বদ্ধ নেত্রেই বলে,
–“আমি তো ভীষণ ভালো আছি।”
–“কিন্তু আমি তো ভালো নেই এরোজ। আমার ছেলে মিথ্যা কেন বলে মায়ের কাছে।”, নির্জনা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল।
–“মিথ্যা বলছি না, আম্মা। আমি সত্যিই ভীষণ ভালো আছি। তাই তো তোমাদের সাথে দেখা করার জন্য চলে এসেছি।”
নির্জনা বেগম একহাত মাথায় রেখে নম্র কন্ঠে শুধায়,
–”এরকম আর কতদিন এরোজ? এভাবে কে জীবনযাপন করে? নিজের জন্য কোন চিন্তা নেই মানলাম, বুড়ো এই মা বাবার দিকে তো একটু খেয়াল করবে? বয়স হয়েছে আমাদের। তোমায় এভাবে দেখা আমাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ। নায়েল, তানশান বড় হচ্ছে। ঘরের পরিবেশ যদি এমন থাকে তবে ওদের সুষ্ঠবিকাশ হবে কি করে?”
এরোজ চোখ খুলে তাকায়। সিলিংয়ের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। ম্লান কণ্ঠে বলে,
–“আমি অল্প কিছু সময় থাকব তোমাদের মাঝে আম্মা। তারপর চলে যাব, নায়েল তানশানের বিকাশে কোন বাঁধা আসবে না।”
–“কিন্তু আমি চাই ওরা তোমার সান্নিধ্যে, তোমার ভালোবাসায় বেড়ে উঠুক। আমাদের বয়স হয়েছে এরোজ। এখন তোমাকে খুব প্রয়োজন।”
এরোজের ভালো লাগে না এমন কথা শুনতে। কারোর জন্য কারোর জীবন যে থেমে থাকে না। সে যন্ত্রণা ভরা ভারী কণ্ঠে বলল,
–”আমার থেকে নিরাশায় ভরপুর এক ভঙ্গুর মানুষ আম্মা। আমার থেকে কোন আশা রেখো না। বড় ভাইজান, মেজো ভাইজান তো আছে তোমাদের জন্য। আমি এক মৃত্যুর পথ চেয়ে থাকা শূন্য পথিক।”
–”এসব কেমন কথা এরোজ?”, নির্জনা বেগম ধমকে উঠলেন। এরোজ ম্লান হাসে মায়ের ধমকে।
–”কার জন্য নিজেকে শেষ করে দেবে? পরিবার পরিজনের কোন মূল্য নেই তোমার কাছে? আমি মেয়ে দেখি এরোজ?”
এরোজ নিরুত্তর। চোখের কোনা ইতিমধ্যেই লালচে বরন ধারন করেছে। বিয়ে, অন্য মেয়ের কথা কেন সে শুনতে পারে না? ভেতরের এক একটা স্নায়ু ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, বিভ্রাট লাগিয়ে দেয়। এরোজ কখনোই কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। কেনো পারবে না? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে বহুবার তবে আশানুরূপ জবাব পায় না। শুনতে পায় শুধু হাহাকার মিশ্রিত কিছু ফিসফিসানি, সে তার রুপাঞ্জেলকে ছেড়ে অন্য কাউকে কি করে ভালোবাসতে পারে? পারে না, কখনোই না।
ছেলের সাথে না পেরে নির্জনা বেগম চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সে এরোজকে তাড়া দিয়ে বললেন,
–”উঠে পড়ো এরোজ। দুপুর হয়ে গিয়েছে, আজ সকলে একসাথে দুপুরের খাবার খাবো। কতদিন হয়েছে মায়ের হাতে খাও না। আজ মা খাইয়ে দেব ওঠো।”
–”তুমি যাও, আমি আসছি।”, এরোজের নিরুদ্বেগ কণ্ঠ। নির্জনা বেগম বেরিয়ে আসে। বের হতেই দেখলো তকদির সিকদার থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নির্জনা বেগম চোখের পানি মুছে নেয়। তকদির সিকদার গমগমে স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
–“এখনো শুধরায়নি তাই না?”
–“এত বছর পর এসেছে ছেলেটা। দয়াকরে ঝামেলা করো না।”
–“আমায় না দমিয়ে ওটাকে দমাও, নির্জনা। এবার ওকে একটা পরিণতিতে করতেই হবে, নির্জনা। নয়ত আমি রিহ্যাবে পাঠাবো। বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ওখানে পরে থাকুক।”
নির্জনা বেগম রাগান্বিত দৃষ্টি ফেলে গটগট করে নিচে নেমে যায়।
এরোজ যখন নিচে নামে তখন সকলে খাবার টেবিলে বসে গিয়েছে। তবে তপোবন ছিল না। মৌনতার পিছু পিছু রূপকথাও টেবিল সাজাচ্ছে। এরোজ এক পলক রূপকথার পানে তাকায়। কিছুটা চমকায় কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের ভাবভঙ্গি সামলে নিলো।
নির্জনা বেগম ছেলেকে পেয়ে টেবিল ভরিয়ে দিয়েছে। সে এটা ওটা ছেলের দিকে এগিয়ে দিলেও ছেলেটা কিছুই পাতে তুললো না। বরং টেবিলের এক কিনারয় ছোট বাটিতে রাখা গরুর মগজ দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে গেল। নির্জনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, পছন্দের খাবার থাকলে আর কিছু মুখে তুলবে না ছেলেটা।
রূপকথা তাকিয়ে রইল অদ্ভুত মানুষটার দিকে। মৌনতা আর জবা এতেও ক্ষেপে যায়। জবা মৌনতাকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলে,
–“দেখলেন ভাবিজান, সারাদিন আমগো দিয়ে খাটাইয়া এত কিছু রান্নাবান্না করাইছে। আর একটা কিছু মুখে না তুইলা হে ঐ গতকালকের বাঁশি খাবার খাইয়া উইঠা গেল। এই কোন স্বাভাবিক মানুষের কাজ? এই বড় ভাবি কন, এইরকম কাজ তার ছিঁড়া মানুষ করে না?”
রূপকথা ভড়কে যায় তার কথায়। মৌনতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“চিনে রাখো, রূপকথা। এই তোমার সবচেয়ে ছোট দেবর। যার মাথার তিনটা তার ছিঁড়া, নেশাখোর, মাতাল, উগ্র, পাবনা ফেরত রোগী। যত পারবে এড়িয়ে চলবে।”
অন্যদিকে রোজ ভস্ম করে দিচ্ছে জবা আর মৌনতাকে। রূপকথা তাদের আচরণে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে শুধু।
তপোবন বাড়িতে ফিরলো একদম রাতে। সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে তপোবন। তখন শরীরের অবস্থা বেশ ভালো। সে এসেই উদ্বিগ্ন চিত্তে ছেলের কক্ষে ঢুকলো। সকাল থেকে কতবার ফোন দিল একবারো ফোন ধরেনি ছেলেটা। সে কক্ষে ঢুকতেই অবাক হয়, পুরো কক্ষ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তানশান বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তানশান কখনো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না। তার চিন্তা বেড়ে গেল। সে ঘুমন্ত ছেলের কপাল গলা হাতিয়ে দেখল, নাহ টেম্পারেচার ঠিক আছে। তবে এত তাড়াতাড়ি ঘুমালো কেন? তাদের তো অনেক ম্যাথ করার কথা ছিল। সে বের হয়ে আসে ছেলের কক্ষ থেকে। মৌনতাকে জিজ্ঞাসা করে,
–“মৌন, তানশানের কি শরীর খারাপ করেছে? ও এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল কেন?”
মৌনতা সাবলীল ভাবে বলল,
–“ভাইজান আমায় বলল, ওর ঘুম পাচ্ছে তাড়াতাড়ি খাবার দিতে। তাই আমি তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিয়েছিলাম। শরীর খারাপের কথা তো কিছু বলেনি।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে। ইমরোজ কি তোমাকে ফোন দিয়েছিল?”
মৌনতা না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“না ভাইজান। গতকাল আসার কথা ছিল আসলো না তো। ফোন ও বন্ধ!”
তপোবন চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
–“ইমরোজ কন্সট্রাকশন সাইট থেকে বেরিয়েছে গতকাল কিন্তু ক্লায়েন্টকে তার সাইট হ্যান্ডওভারের ফাইনাল স্টেটমেন্ট, পেমেন্টের স্টেটমেন্ট কিছু দিয়ে আসেনি। এটা কেমন কান্ড জ্ঞানহীন কাজ বলতো! ও আমাকে কিছু তো জানাবে।”
–“আমি তো এই বিষয়ে কিছু জানি না ভাইজান।”
–“সমস্যা নেই, মৌন। তোমার জানার কথা নয়। কিন্তু ও কাজ নিয়েও এমন কান্ড জ্ঞানহীনতা কিভাবে করতে পারে। আমায় অন্তত ফোন করে কিছু জানাবে কোথায় আছে, কি করছে? রিডিকিউলাস!”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৯
তপোবন পুনরায় ছেলের ঘরে ঢুকলো। চিন্তা চোখমুখ জুড়ে ছেলেটার কি মন খারাপ? নয়ত এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে কেন? সে বহুক্ষণ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে যায়। দরজা চাপানোর শব্দ হতেই তানশান চোখ মেলে তাকায়। ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক দেখে বদ্ধ দরজা। অতঃপর বেডসাইড ল্যাপ জ্বালিয়ে কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মায়ের ডায়রিটা বের করে। শেষ পাতাটা খুলে ছলছল নেত্রে তাকায় মায়ের আর তার হাস্যোজ্জ্বল একটা ছবির দিকে। যেখানে মায়ের কোলে ছোট্ট সে হাসিমুখে বসে আছে। সে ছবিটি ছুঁয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে,
–“মাম্মা, আই মিস ইউ।”
