Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২০

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২০

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২০
Raiha Zubair Ripti

কেবিনের চেয়ারে চোখ বুঁজে বসে আছে সিকান্দার। শরীর তার অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। অস্থিরতার মাত্রাটাও তীব্র হচ্ছে। সিকান্দার তার এই শারীরিক অবস্থার মানেটা বুঝতে পারছে না। মাথার চুল টেনে ধরলো। নিজেকে নিজেই বলতে লাগলো-
“ রিলাক্স সিকান্দার রিলাক্স, শান্ত হও। কিচ্ছু হয় নি। এতটা অস্থির হয়ো না। রাগ কন্ট্রোল করো। তুমি এটা খুব ভালো মতোই পারো সিকান্দার। ”
সিকান্দার পাশ থেকে পানির বোতলে কোরআনের একটা আয়াত পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই পানিটা পান কারলো। তারপর এসিস্ট্যান্ট রবিন কে ডেকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মির্জা বাড়িতে এসে নিজের রুমে ঢুকে সেই যে দরজা বন্ধ করে দিলো। সময় নিয়ে গোসল করে নফল নামাজ পড়লো। নামাজ পড়া শেষে কুরআন শরীফ পড়লো। সে নিজেকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। যাতে হৃদয়ে শান্তি মেলে। রাগ কমে গিয়ে প্রশান্তি আসে। কিছুটা হলোও তাই। হৃদয় শান্ত হলো। রাগও কমলো। তখন সে নামাজ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্ত্রী কে ফোন করে তার সাথে কথা বললো।
সেলিম মির্জা আজকে তান্ত্রিকের কাছে গেছে। অফিস থেকে শুনেছে সিকান্দার আজ খুব রুড হয়ে কথা বলেছিল স্টাফদের সাথে। তান্ত্রিক কে সেটা বলতেই তান্ত্রিক বললো-

“ এ ছেলেকে শয়তান বশে আনার চেষ্টা করছে। সফল হচ্ছে শয়তান। যত পারেন তাকে কাজে ব্যস্ত রাখুন। প্রেসার দিন। এতে নামাজ আমল কম করবে। তখন ও ধীরে ধীরে শয়তানের পুরো বশে চলে আসবে। ইতিমধ্যে কিন্তু তার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। ”
সেলিম মির্জা কথাটা শুনে খুশি হলেন। আরো একটা ১০ লাখের চেক দিলেন তান্ত্রিক কে। তান্ত্রিক চেকটা নিয়ে বলল-
“ একটা সমস্যা হয়েছে। ”
সেলিম মির্জা জিজ্ঞেস করলেন –
“ কি সমস্যা? ”
“ সিকান্দারের রুম থেকে কেউ তার তাবিজ টা সরিয়ে ফেলছে। কে সরিয়েছে? ”
“ তাবিজ সরিয়ে ফেলছে! জানতাম না তো। কবে সরালো?”
“ আজই। ”
সেলিম মির্জার মনে পরলো আজ সিকান্দার তার পুরো রুম ক্লিন করিয়েছে। তখনই হয়তো কেউ ফেলে দিয়েছে।

“ আজ সিকান্দার তার পুরো রুম ক্লিন করিয়েছে। ”
“ তখনই সরানো হয়েছে। ”
“ এখন কি করবো? ”
“ কিছু করার দরকার নেই। নিয়মিত ঐ পানি খাওয়ান। আমি চেষ্টা করছি। আপনি তাকে প্রচুর প্রেশারে রাখুন। ”
“ ঠিক আছে। আজ আসছি তাহলে। ”
সেলিম মির্জা চলে গেলেন। এর মধ্যে কেটে গেলো দুটো দিন। সিকান্দার হুটহাট রেগে যায়। কারো ভালো কথাও তার কানে বিষ হয়ে ফুটে। মাঝেমধ্যে কন্ট্রোল করতে পারে আর মাঝেমধ্যে পারে না। যখন পারে না তখন রিয়াক্ট করে ফেলে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই কথা ভুলে যায়। মনে করতে পারে না সে আসলে কি করেছিল। এই তো আজ সকালে অফিসে এসে রবিনের উপর খুব চটে গিয়েছিল। একটা ফাইল রেডি করতে বলেছিল সেই ফাইলে দুটো পেজ মিসিং। ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ফাইল টা ফ্লোরে। আর অপমান করে বের করে দিয়েছিল কেবিন থেকে। তার এক ঘন্টা পর সিকান্দার আবার রবিন কে ডেকে বলে-

“ আজকের ফাইল টা নিয়ে আসুন তো রবিন। দেখি সব ঠিকঠাক আছে কি না। মিটিং রুমে গিয়ে ভুল চোখে পরলে তখন বিষয় টা খুবই বিরক্তির হবে আমার জন্য। ভুল থেকে থাকলে আমি সেগুলো ঠিক করে নিব। ”
রবিন তার কথা শুনে চমকায়। একটু আগেই তো ফাইল টা দেখলো। ভুল ছিলো বলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। এখন আবার বলছে ফাইল আনতে! ভুল থাকলে নিজে ঠিক করে নিবে! সিকান্দার রবিন কে এখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল-
“ কি হলো যান। নিয়ে আসুন। ”
রবিন তখন কাচুমাচু করে জানায় –
“ কিছুক্ষণ আগেই তো ফাইল টা দেখলেন স্যার। দুটো পেজ মিসিং ছিলো বলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। বললেন পেজ দুটো নিয়ে আসতে। আমি এখনও বের করতে পারি নি পেজ দুটো। ”
সিকান্দারের কপালে দুটো ভাজ পরলো। তার তো মনে পরছে না এমন কিছু। দুদিন আগেও নাকি সে অফিসের স্টাফ দের সাথে খুব বাজে বিহেভিয়ার করছে। অথচ তার কিছু মনে নেই!

“ আর ইয়্যু শিওর? ফাইল নিয়ে এসেছিলেন? ”
“ হ্যাঁ। আপনার মনে নেই? ”
সিকান্দার কপাল স্লাইড করতে করতে বলল-
“ আপনি আবার নিয়ে আসুন তো দেখি ফাইল টা। ”
রবিন ফাইল টা আনলো। সিকান্দার তাকে চলে যেতে বলে নিজেই ফাইলটা খুলে দেখতে লাগলো। আসলেই দুটো পেজ মিসিং। ফাইলটা শব্দ করে বন্ধ করলো। তার স্মৃতি শক্তি দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে নাকি? মনে রাখতে পারছে না কিছু। আর তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা সে হুটহাট এভাবে রেগে যাচ্ছে কেনো? শান্ত মস্তিষ্ক নিয়ে এটা ভাবার সময় তার খেয়াল হয় যেসব নিয়ে রাগান্বিত হয় সিকান্দার সেগুলো সব নরমাল বিষয়। রাগার তো প্রশ্নই আসার কথা না সেখানে। ডক্টর দেখাতে হবে। কথা গুলো মনে আওড়িয়ে সিকান্দার ফাইলটা আবার রেডি করলো। দুপুরে যোহরের নামাজ পড়ে আড়াইটার দিকে ফাইল টা নিয়ে বিদেশী বায়ার দের সাথে মিটিংটা সাকসেসফুলি করলো। মিটিং রুম থেকে বের হয়ে স্ত্রী কে ফোন করলো।

মুনতাহা তখন মামিদের সাথে ঢেঁকি তে চাল গুঁড়ো করা দেখছিল। আগামী কালই তো চলে যাবে সে। আজ রাতে সিকান্দারের আসার কথা। হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠায় সে ঢেঁকির রুম থেকে বের হয়ে উঠানে আসলো। রিসিভ করে কানে নিয়ে সালাম দিলো। সিকান্দার সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি করছেন? খেয়েছেন সকালে? ”
“ হু খেয়েছি। এখন মামিদের সাথে চাল ভাঙা দেখছি ঢেঁকি তে। পিঠা বানাবে। আজ আসছেন না আপনি? সেজন্য। ”
সিকান্দার ভ্রু কুঁচকালো সে কথা শুনে।
“ আমি আজ আসবো মানে? আমার কি আজ আসার কথা ছিলো? আপনি যে বললেন এক সপ্তাহ থাকবেন? ”
মুনতাহার মুখ চুপসে গেলো।
“ মজা নিচ্ছেন এখনও? আমি যে বললাম দুদিন থাকবো। আর আপনিও বললেন দুদিন পর নিতে আসবেন। কালও তো কথা হলো। বললেন আজ আসবেন। ”

সিকান্দার মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়ছে না তো এমন কথা। তার মনে আছে মুনতাহা বলেছিল এক সপ্তাহ থাকবে। এক হিসেবে ভালোই হলো দিন এগিয়ে এসেছে। বউ চলে আসতে চাইছে। সেজন্য বলল-
“ ওহ্ আচ্ছা আচ্ছা, আমি আসবো। রাতে রওনা দিব। ”
“ আচ্ছা তাহলে দেখেশুনে নিয়ে আসবেন আমার স্বামী টাকে। ”
সিকান্দার সে কথা শুনে হেঁসে বললো –
“ জ্বি,জ্বি চিন্তা করবেন না। নিশ্চিন্তে থাকুন ম্যাডাম। একদম রেপিং প্যাপারে মুড়ে নিয়ে আসবো আপনার স্বামী কে যাতে কোনো দাগ না লাগে। ”
আরো কিছুক্ষন কথাবার্তা বলে বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে পরিচিত ডক্টরের কাছে গেলো। শরীরে ঐ দাগ গুলো এখনো সরে নি। ডক্টর এলার্জির ঔষধ দিলো। সাথে সিকান্দার তাকে এটাও বললো যে মাত্রাতিরিক্ত রেগে যাচ্ছে সাথে মাঝেমধ্যে নিজের করা কর্মকাণ্ড সে ভুলে যায়। মনে করতে পারে না। ডক্টর এটার জন্যও কয়েকটা মেডিসিন দিলো। সিকান্দার চাচ্ছে সব দিক দিয়ে তার শরীর মন মস্তিষ্ক টাকে সুস্থ রাখতে।
সিকান্দার হসপিটাল থেকে বেরিয়ে মির্জা বাড়িতে এসে নিজের রুমে একটু রেস্ট নিয়ে রাতে বেরিয়ে পরে সারিয়াকান্দির উদ্দেশ্যে।

মুনতাহা তখন তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আর ঠিক তখনই বাহির থেকে গাড়ির শব্দ শুনে সাথে সাথে রুমের জানালা খুলে দেখে সদর দরজার বাহিরে একটা কালো গাড়ি। গাড়িটা চিনতে অসুবিধা হলো না। সে চিনে এই গাড়িকে আর এই গাড়ির মালিক কে। মাথায় ওড়না দিয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখলো হুমায়ুন আলী সদর দরজা খুলে দিয়েছে। সিকান্দার হেঁটে ভেতরে আসছে। মুনতাহার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তার ইচ্ছে করলো ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে থাকতে কিছুক্ষণ। কিন্তু লোকজন থাকায় ইচ্ছে টা দমিয়ে রাখলো। সিকান্দার এগিয়ে এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ এসে গেছি। এখন বলুন কেমন আছেন মিসেস সিকান্দার? ”
মুনতাহা নজর মাটিতে রেখে মৃদু স্বরে বলল-
“ আপনাকে দেখার পর এখন আমি ভালো আছি। আপনি? ”
“ সারিয়াকান্দি আসার পর এখন শ্বাস নিতে পারছি ঠিকমতো। ”
হুমায়ুন আলী ভেতরে আসতে বললো। সিকান্দার হাত পা মুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে তারপর রুমে আসলো।
পেছন পেছন মুনতাহাও আসলো। দরজার সিটকানি লাগাতেই সিকান্দার তাকে একটানে এনে বুকের উপর ফেললো। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো কিছুক্ষণ। তারপর কপালে হাতে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো।
“ আমাকে ছাড়া আর থাকবেন কোথাও কখনো? ”

মুনতাহা ডুকরে কেঁদে ফেললো। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল-
“ আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি নি এই দূরত্ব সহ্য করার ক্ষমতা যে আমার নেই। আমি আর কখনো আপনাকে ছাড়া থাকবো না কোথাও। খুব কষ্ট হয়েছে। ”
সিকান্দার মুনতাহার চুল গুলো ঠিক করে চোখের জল মুছে দিলো। বা হাত টা বাড়িয়ে সুইচ টিপে বাতি নিভিয়ে দিলো। তারপর মুনতাহা কে জড়িয়ে ধরে শান্তির একটা ঘুম দিলো। পুরুষ মানুষের এই এক সমস্যা হয় বিয়ের পর। বউ জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে তাদের সেই রাতে ঠিকমতো ঘুমই আসে না চোখে।
পরের দিন আলী বাড়িতে অনেক ধরনের পিঠা বানানো হলো,চিতই পিঠা,দুধ পিঠা,পাটিসাপটা, মাংস পিঠা,ছিট পিঠা,সাথে গরুর মাংস,পোলাও,সাদা ভাত আর লাচ্ছা সেমাই। দুপুরে তারা সেগুলো খেলো। খাওয়া শেষে বিকেলে রিয়া আর হিয়া বায়না ধরলো তারা কুতুবপুর ঘাটে যাবে। ওখানে বিকেলে ফুচকা চটপটি,ঝালমুড়ি সহ বিভি ভাজাপোড়ার জিনিস বসে।
সিকান্দার মানা করতে পারে নি। বউ আর বোনদের নিয়ে আসলো। রিয়া হিয়া চটপটি, ঝালমুড়ি, পেয়াজু, বার্গার খেলো। দেখতে চিকন শুকনো লাগলেও তারা খেতে অনেক ভালোবাসে। আর খেলেও তাদের শরীরে মাংস হয় না। সিকান্দার মুনতাহার খাবার গুলো নিয়ে গাড়িতে আসলো। গাড়ির ভেতরই মুনতাহা চটপটি আর ঝালমুড়ি টা খেলো। বার্গারের অর্ধেক খেয়ে বাকি অর্ধেক সিকান্দার কে খাইয়ে দিলো। পানি খেয়ে ঘাট দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে সেই রাতেই ঢাকা ফিরলো তারা। মির্জা বাড়িতে এসে জানতে পারলো সিমরান রাগ করে বাবার বাড়িতে চলে গেছে। অর্নব নাকি খুব অপমান করেছে সিমরান কে।
মুনতাহা দাদির কাছে জানতে চাইলো-

“ কি জন্য অপমান করেছে? ”
দাদি বলল-
“ সিমরান বাচ্চা নেওয়ার লাইগা অর্নব রে বলছিল। অর্নব রাজি না বাচ্চা নিতে। সেটা নিয়াই এক কথায় দুই কথায় তর্কাতর্কি হয়ে যায়। তখন বজ্জাতে বলে বসছে- তোরে আমার পছন্দ না। সেখানে তোর গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া বাচ্চারে আমি কিভাবে পছন্দ করি? তোর সন্তানের বাবা হতে চাই না আমি। ভালো লাগে না তোকে আমার। ডিভোর্স দিব তোকে। সে কথা শুনেই রাতে সিমরান বাড়ি চলে গেছে । ”
সিকান্দার চুপচাপ শুনলো। কিছু বললো না তৎক্ষণাৎ। একবার মুনতাহার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর রুম ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে অর্নবের রুমের সামনে গেলো। অর্নব তখন বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। সিকান্দার রুমে ঢুকে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল-

“ উঠো, কথা আছে আমার তোমার সাথে। ”
অর্নব বিরক্ত গলায় বলল-
“ তুমি যাও তো ভাইয়া। তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। ”
সিকান্দারের কপালে দু ভাজ পরলো এ কথা শুনে। কেমন একটা রাগ এসে বাসা বাঁধলো। গম্ভীর গলায় বলল-
“ উঠো বলছি। কথা বলবো আমি তোমার সাথে রাইট নাউ। ”
অর্নব বিরক্ত নিয়ে উঠে বলল-
“ সমস্যা কি তোমার? জ্বালাচ্ছ কেনো আমায়? কি কথা আছে আমার সাথে তোমার? ”
“ সিমরান কে কি বলেছো তুমি এসব? ”
“ আমার স্ত্রী কে আমি যা ইচ্ছে তাই বলবো। তোমার কি তাতে? ”
সিকান্দার চেষ্টা করছে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার।
“ ডিভোর্স দিবে বলে শুনলাম? ”
“ ঠিকই শুনেছো। ”
“ ডিভোর্সরে কারন কি? ”
“ সব শুনেছো এটা শুনো নি?”
“ আমি তোমার মুখে শুনতে চাই। বলো। ”

“ আমার পছন্দ না সিমরান কে। ও কোন সাহসে বাচ্চা নিতে চায়? ওর বাচ্চার বাপ তো আমি হতে চাই না। ওকে তো বউ হিসেবেই মানতে পারি না আমি। কোনো কিছু ফিলই করি না ওকে নিয়ে। নেহাত শুধু মায়ের কথায় ওকে বিয়ে করছি। তা না হলে ওর কি যোগ্যতা আছে আমার স্ত্রী হওয়ার? ”
কথাগুলো শুনে সিকান্দার আর নিজের রাগ কন্ট্রোল ই করতে পারলো না। ঠাস করে শক্ত হাতে পরপর কয়েকটা চড় বসিয়ে দিলো অর্নবের গালে।

“ তোমার কোন যোগ্যতা আছে ওর স্বামী হওয়ার? নিজের দিকে তাকিয়েছো কখনো? পুরুষ মানুষের সবচেয়ে বড় অলংকার আর অহংকার হচ্ছে তার ব্যক্তিত্ব । যেই পুরুষে এটা নেই সেই পুরুষ কুকুরের চেয়েও অধম । তুমি মূলত এটাই। কুকুরের চেয়েও অধম হয়ে গেছো। আর সেই তুমি কি না অন্যকে জাজ করো! সিমরান কি ভোগ্যপণ্য যে তোমার ইচ্ছে হলো ব্যবহার করলে আর ইচ্ছে ফুরিয়ে গেলে তুমি ছুঁড়ে ফেলে দিবে। তুমি কি ফিটার খাওয়া বাচ্চা যে তোমার মা তোমাকে বিয়ে করতে বললো আর তুমি নাচতে নাচতে যাকে বউ হিসেবে মানতে পারবে না তাকে বিয়ে করে নিলে। এতটা ব্যক্তিত্বহীন কেনো তুমি? ভালোমন্দ বুঝো না? সেই বয়স হয় নি তোমার? যাও চাচার বাড়িতে গিয়ে সিমরানের কাছে ক্ষমা চেয়ে সিমরান কে ফিরিয়ে নিয়ে আসো। ”
অর্নব গালে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে বলল-
“ না, কখনোই না। কিসের ক্ষমা হু? আমি সিমরান কে আনবো না। ওর সাথে সংসার করবো না। তুমি আর একবার আমার গায়ে হাত দিলে এর ফল ভালো হবে না। ”
অর্নবের চিৎকার শুনে সেলিম মির্জা আর সাইদা মির্জা ছুটে বসে। সিকান্দার এগিয়ে গিয়ে আরো দুটো চড় মেরে বলল-

“ কি করবে কি তুমি আমাকে? মারলাম। এবার ফল দেখাও। ”
সাইদা মির্জা সিকান্দারের হাত টেনে নিয়ে অর্নবের থেকে দূরে সরালো। মুনতাহাও ততক্ষণে দৌড়ে এসেছে। সিকান্দার সাইদা মির্জার হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো। রাগে পুরো শরীর জ্বলছে তার। নিজের কন্ট্রোলে নেই বললেই চলে। সাইদা মির্জা রেগেমেগে বলছে-
“ তুমি আবার আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছো সিকান্দার! তোমার এত বড় স্পর্ধা! পাল্টা চড় যদি অর্নব দিয়ে বসতো ছোট ভাই হিসেবে তখন? তখন তোমার মানসম্মান টা কোথায় থাকতো? ”
সিকান্দার দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“ চড় মারার জন্য হাত তোলার সাথে সাথে ওর হাতটা আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতাম। ওর সাহস কি করে হয় সিমরানের সাথে অসভ্যতামি করার? ”
“ সিমরান ওর বউ। যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। তোমার স্ত্রীর সাথে তো করে নি। তাহলে তুমি কথা বলার কে তাদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে? অসভ্যতামি তো তুমি করছো। ”
“ অসভ্যতামি আমি করছি? ”
সিকান্দারের গলাটা এতটাই ঠান্ডা শোনালো যে সেটা আরো ভয়ংকর লাগলো। চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে আছে। চোয়াল শক্ত। সে ধীরে ধীরে সাইদা মির্জার দিকে এগিয়ে এলো।

“ একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনে দিনের পর দিন অপমান করবে, বলবে তার গর্ভের সন্তানের বাবা হতে চাও না, বলবে তাকে দেখে কিছু ফিল করো না, তারপর ডিভোর্সের ভয় দেখাবে এগুলো আপনার চোখে স্বাভাবিক? ”
সাইদা মির্জা একটুও দমলেন না। উল্টো তেড়ে এসে বললেন-
“ হ্যাঁ স্বাভাবিক। সংসারে ঝগড়া হয়। তাই বলে তুমি আমার ছেলের গায়ে হাত তুলবা? তুমি কে? ”
“ আমি ওর বড় ভাই। আর বড় ভাইয়ের দায়িত্ব আছে ভুল করলে থামানোর। ”
“ অর্নব যদি সিমরানরে না পছন্দ করে তাহলে জোর করে সংসার করাইতে হবে? ”
“ তাহলে বিয়ে করিয়ে ছিলেন কেন? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার অধিকার কে দিয়েছে আপনাদের? বিয়ে খেলনা? মন চাইলো করলাম, মন চাইলো ফেলে দিলাম? ”
অর্নব এবার চেঁচিয়ে উঠলো—
“ ভাইয়া তুমি বাড়াবাড়ি করছো! আমি বলেছি আমি সিমরানকে চাই না। ব্যস। ”
সিকান্দার ঘুরে তাকাতেই অর্নব থমকে গেলো।
“ তুমি যদি আজকের ভেতরে সিমরান কে না নিয়ে আসো ক্ষমা চেয়ে তাহলে এই বাড়িতে তোমার শান্তিতে থাকা আমি হারাম করে দিবো। ”

“ তুমি আমার ছেলেকে হুমকি দিচ্ছো? ”
“ হুমকি না। জাস্ট সতর্ক করছি এই আরকি। আর অর্নব তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছো যে? যাবে না? ক্রিকেট স্ট্যাম্প টা নিয়ে আসবো?
ঠিক তখনই সেলিম মির্জা দ্রুত এসে সিকান্দার কে শান্ত করার জন্য বলল-
“ হ্যাঁ যাবে,অর্নব আজই যাবে। গিয়ে ক্ষমাও চাইবে। সিমরান কে নিয়েও আসবে। আমি কথা দিচ্ছি। তুমি শান্ত হও। মুনতাহা সিকান্দার কে নিয়ে যাও রুমে। ”
মুনতাহা এগিয়ে এসে বলল-
“ চলুন,রুমে চলুন। রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে আপনার। ”
সিকান্দার আর একবার অর্নবের দিকে তাকিয়ে চলে যাওয়ার সময় বলল-
“ কথার খেলাপ হলে খবর আছে। ”
“ না না হবে না। তুমি যাও। ”
সিকান্দার চলে গেলো। সাইদা মির্জা কিছু বলার জন্য উদ্যোত হলে সেলিম মির্জা তার হাত চেপে ধরলেন। কণ্ঠে আতঙ্ক মিশে আছে।

“ তুমি চলো আমার সাথে। এখনই চলো। ”
সাইদা মির্জা বিরক্ত হয়ে বললেন-
“ ছাড়েন আমাকে! দেখতেছেন না আপনার ছেলে কি বলে গেলো? ”
সেলিম মির্জা প্রায় টেনে তাকে দূরে নিতে নিতে নিচু গলায় বললেন-

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৯

“ তুমি বুঝতেছো না। এটা কালো যাদুর প্রভাব। সিকান্দার নিজের ভেতরে নেই। রাগলে ও নিজের কন্ট্রোলে থাকে না এখন। ছেলেটার মাথা ঠিক নাই। আর উসকিও না তুমি! তখন অর্নবই আরো মার খাবে। নিজের ছেলের ভালোর জন্যই বলছি। চুপ হয়ে যাও। ”
সাইদা মির্জা রেগে ফেটে যেতে লাগলেন। কালো যাদুতো তাদেরও ছাড়ছে না দেখি। নিজেদের করা ফাঁদে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিজের ছেলেটাই মার খাচ্ছে। ধূর!!

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২১