নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৪
রূপন্তী সরকার
ইয়াশফা একদম চুপচাপ ঋষভের দিকে চেয়ে রইল,
আর ঋষভও কেমন যেন একটা ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইয়াশফার দিকে।ঋষভের হাত থেকে তখনো টপটপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। ঋষভ আচমকা নিজের পুরো শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে ইয়াশফার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। ইয়াশফা নিজের ভালো হাতটা দিয়ে ঋষভকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। ঘরের ভেতর একদম পিনপিনে নীরবতা। ইয়াশফা খেয়াল করল ঋষভের কোনো সাড়া শব্দ নেই। ও আস্তে করে ডাকল
“এই বলদা পাডা?” কিন্তু কোনো উত্তর এল না। ঋষভ ক্লান্তিতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইয়াশফা নিজের মচকানো হাতটা সামলে অনেক কষ্টে ঋষভকে টেনেটুনে বিছানায় শুইয়ে দিল।এরপর গুটিগুটি পায়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলে দিল।
দরজার বাইরে সবাই তখনো ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল।
দরজা খুলতেই মিহি তড়িঘড়ি করে রুমে ঢুকে দেখল ঋষভ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ও গিয়ে ঋষভের মাথার কাছে বসল। ওদিকে ইয়াশফা এক হাত দিয়েই ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো আস্তে আস্তে পরিষ্কার করতে শুরু করল।
মিহি সেটা দেখে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “তুমি এসব করতে যেও না মা, এক হাত তো এমনিতেই মচকে আছে, অন্য হাতে আবার কাঁচ ফুটে যাবে। এসব করার দরকার নেই, তুমি নিজের ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নাও।”
মিহির কথা শুনে ইয়াশফা আর কথা বাড়াল না, চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। যাওয়ার আগে মিহিকে বললো “উনার হাত থেকে রক্ত পড়ছে কিন্তু, একটু দেখবেন”
মিহি মাথা নাড়িয়ে “আচ্ছা” বললো
পরের দিন সকালবেলা…
ইয়াশফা খাবার টেবিলে বসে আছে। ওর ঠিক পাশেই বসে শুভ্র মনের সুখে গপগপ করে সকালের নাস্তা খাচ্ছে।
রিদ ড্রইংরুম থেকে হেঁটে এসে ইয়াশফার সামনে দাঁড়ালো। ইয়াশফাকে উদ্দেশ্য করে বললো “তাড়াতাড়ি খেয়ে রেডি হয়ে নাও, আমরা একটু বাইরে বের হব।”
ইয়াশফা মুখভর্তি খাবার নিয়ে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল “কোথায় যাব বাবা?”
রিদ একদম গম্ভীর মুখে জবাব দিলো, “গ্রামে। ওখানে গিয়ে কয়েকটা দিন থেকে এসো, দেখবা তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
রিদের কথা শুনে মিহি রান্নাঘর থেকে এক প্রকার তেড়ে এল।
সে রিদের সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে রেগে বলল, “তুমি কি একদম পাগল হয়ে গেছো নাকি? কালকে রাতে ছেলেটা চোখের সামনে কী কাণ্ডটা করল সেটা দেখলে না? এখন যদি তুমি আবার ইয়াশফাকে জোর করে গ্রামে পাঠাতে যাও, ঋষ কিন্তু এবার আরও বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসবে। আমি এসব অশান্তি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে একটু শান্তি দাও আমি খুব ক্লান্ত”
রিদ কড়া গলায় মিহিকে ধমকে উঠে বলল,
“করলে করুক! ওর কথায় কি দুনিয়া চলবে নাকি? আমি এটাম বোম কিছুতেই ওর মতো বেয়াদবের কাছে রাখব না, ব্যস!”
কথাটা বলেই রিদ ইয়াশফার হাত ধরে সোজা গাড়ির দিকে রওনা দিল। ইয়াশফাও আর কোনো কথা না বলে রিদের পেছন পেছন বাধ্য মেয়ের মতো চলে গেল। ওদিকে মিহি রিদ আর ইয়াশফার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রিদ ইয়াশফাকে নিয়ে গ্রামে পৌঁছাল।সারাটা রাস্তা ইয়াশফা একটা কথাও বলেনি। শুধু চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু গ্রামে ঢুকতেই ইয়াশফার মলিন মুখে এক টুকরো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
ওর এই গ্রামটা সত্যি ভীষণ সুন্দর।
পাকা ধানের গন্ধ আর পাখিদের কিচিরমিচির। শহরের ওই চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে এখানে আসতেই ওর মনটা যেন এক নিমেষে জুড়িয়ে গেল।
ইয়াশফা রিদের দিকে তাকিয়ে আবদারের সুরে বলল “বাবা, গাড়িটা কি এখানে একটু দাঁড় করাবেন? আমি বাকি পথটুকু একটু হেঁটে হেঁটে যেতে চাই।”
রিদ ইয়াশফার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। ও মুচকি হেসে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে বললো, “আচ্ছা যাও মা। তুমি এগোও, আমি গাড়িটা পার্ক করে আসছি।”
গাড়ির দরজা খুলতেই ইয়াশফা এক প্রকার দৌড় দিল।
ইয়াশফাকে দেখার সাথে সাথেই ঝোপের আড়াল থেকে ওর প্রিয় ছোট হরিণ ছানা “কিসমিস” লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে ওর গায়ের ওপর চড়ে বসল। ইয়াশফা হরিণকে কিসমিস বলেই ডাকে।
সাথে সাথে কোত্থেকে যেন হুটোপুটি খেতে খেতে সাদা পশমের বিড়াল “ম্যাও ম্যাও” ছুটে আসলো।
লেজ নাড়তে নাড়তে একটা ছোট দেশি কুকুর ছানা ‘বাঘা’ ছুটে এসে ইয়াশফার পায়ে গা ঘষতে লাগল। ঠিক তখনই পাশের চালতা গাছের ডাল থেকে একটা সবুজ টিয়া পাখি উড়ে এসে বসল ইয়াশফার মচকানো হাতের ওপর। ইয়াশফা ওই টিয়াটার নাম রেখেছে “পিপাই”।এতদিন পর নিজের এই অবুঝ বন্ধুদের কাছে পেয়ে ইয়াশফার চোখ দুটো আনন্দে ছলছল করে উঠল।
ওরা সবাই যার যার নিজের ভাষায় ইয়াশফাকে ডাকছে, আর ইয়াশফাও ওদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কত জনমের চেনা বন্ধু ওরা।
ঘর থেকে তেড়ে বেরিয়ে এলেন ইয়াশফার মা। মহিলার মুখ দেখেই বোঝা গেল ইয়াশফাকে হুট করে এভাবে ফিরে আসতে দেখে তিনি বিন্দুমাত্র খুশি হননি। তিনি ইয়াশফার দিকে কটমট করে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বললেন,
“কীরে, তুই এখানে কেন?”
ইয়াশফা ওনার কথার কোনো উত্তর দিল না। ও তখনো ব্যস্ত নিজের বন্ধুদের আদর করতে। উনি হনহন করে এগিয়ে এসে ইয়াশফার সেই মচকানো হাতটাই খপ করে চেপে ধরলেন। ব্যথার চোটে ইয়াশফা আকাশফাটানো একটা চিৎকার দিয়ে উঠল।মহিলা তাতেও থামলেন না,
“কী রে? কথা কি কানে যাচ্ছে না তোর? এই অসময়ে এখানে এসেছিস কেন শ্বশুরবাড়ি থেকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে? এখন আবার আমাদের ঘাড়ে এসে চাপতে এসেছিস, তাই তো?”
ইয়াশফা একটা মুচকি হাসি হাসল। ও জানত এখানে আসলে ওকে এই কথাই শুনতে হবে। মহিলা ওর হাসির দিকে তাকিয়ে আবার মুখ বাঁকিয়ে বললেন
“জানতাম তো আমি। তোর মতো অলক্ষ্মীর কপালে আর ঘর সংসার হবে না!”
ঠিক তখনই রিদ সেখানে এসে হাজির হলো।
রিদকে দেখে ইয়াশফার মা চুপ হয়ে গেলো। তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে উঠোনে পাতলেন। আঁচল দিয়ে চেয়ারটা মুছতে মুছতে একগাল হেসে বললেন,
“আরে ভাই আসুন। বসুন এখানে।”
রিদ ঠান্ডা গলায় বললো
“না, ঠিক আছে। বসতে হবে না।”
রিদ গাড়ি থেকে নামানো কয়েক কেজি মিষ্টি, ফলমূল, ইয়াশফার প্রেসক্রিপশনের কিছু মেডিসিন আর ওর পছন্দের একগাদা চিপস চকলেট মহিলার হাতে বাড়িয়ে দিলো। এতসব জিনিসপত্র দেখে ইয়াশফার মায়ের চোখ তো চড়কগাছ লাজুক হাসি টেনে বললেন, ” এসব আবার কেন আনতে গেলেন? এসবের কোনো দরকারই ছিল না। আপনি দয়া করে একটু বসুন, আমি আপনার জন্য একটু জলখাবারের ব্যবস্থা করি”
রিদ ভারী গলায় বললো “আজকে বসবো না, আমার একটু জরুরি কাজ আছে, এখনই বেরোতে হবে। তবে যাওয়ার আগে কিছু কথা বলছি, একদম মন দিয়ে শুনুন। আমি আজকে এখানে আমার বাড়ির বউমাকে রাখতে আসিনি। আমি এসেছি আমার সন্তানকে রাখতে, আমার এটাম বোমকে রাখতে। ও কিছুদিন এখানে থাকবে, তারপর আমি এসে ওকে নিয়ে যাব।”
রিদ একটু থামলো। ইয়াশফার মচকানো হাতটার দিকে একবার তাকিয়ে মহিলার চোখে চোখ রেখে আবার বললো
“ওর ডান হাতটা মচকে গেছে, প্রচণ্ড ব্যথা। ওকে ঘরের একটা ছোট কাজও করতে দেবেন না। সময় মতো এই মেডিসিনগুলো খাইয়ে দেবেন। আর এই টাকাগুলো নিজের কাছে রাখুন।”
কথাটা শেষ করেই রিদ পকেট থেকে একটা মোটা টাকার বান্ডিল বের করে ইয়াশফার মায়ের হাতে গুঁজে দিলো। রিদ ওনার দিকে তাকিয়ে কড়া সুরে বললো,
“ওর যেন এখানে কোনো অসুবিধা না হয়। আমি আমার মেয়েকে আজকে যেমন রেখে যাচ্ছি, এসে যেন ঠিক তেমনই পাই। এক চুল যেন এদিক ওদিক না হয়!
“কথাটা বলেই রিদ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। গটগট করে হেঁটে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসলো।
চোখের পলকে কালো গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে চলে গেল।উঠোনে আর রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের মানুষজন এতক্ষণ হা করে রিদকে দেখছিলো।
গাড়িটা চলে যেতেই পাড়ার মহিলারা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষো শুরু করে দিল “ওরে বাবা। এটাই ইয়াশফার শ্বশুর নাকি? যেমন সুন্দর চেহারা, তেমনই তো দেমাগ ইয়াশফায় কী এমন তাবিজ করল যে এত বড়োলোকের বাড়িত বিয়া হইলো?”
রায়ান কুঞ্জ একদম থমথম করছে। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা পার হয়ে গেছে।
ঋষভ সবেমাত্র ঘুম থেকে চোখ ডলতে ডলতে উঠল।ও বাথরুমে গিয়ে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এল। দুই হাতে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, মুখ বরাবরের মতোই গম্ভীর।ডাইনিং টেবিলে মিহি চুপচাপ বসে ছেলের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ঋষভকে আসতে দেখে আর কথা না বাড়িয়ে প্লেটে খাবার বেড়ে ওর সামনে এগিয়ে দিল
ঋষভ চেয়ার টেনে বসল, আশেপাশে তাকালো। কিন্তু কোথাও একজনকে দেখতে পাচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড় কোথায় গেলো?
পুরো বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, ঋষভ মিহির দিকে তাকাল। ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল “মাম্মা ইয়াশ কোথায়?”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৩
মিহি মুখে কোনো কথা বললো না।
এরমধ্যেই রিদ এসে হাজির। ঋষভের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো “তোমার বউকে গ্রামে রেখে এসেছি। আগে ভদ্রতা শিখবা তারপর বউ পাবা। কি রাগ করলা?”

Plz 25 number porbota taratari den