Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৬৫

এক দেখায় পর্ব ৬৫

এক দেখায় পর্ব ৬৫
সুরভী আক্তার

“ আপনি আমায় এসব আগে বলেন নি কেনো ?
অভিমানী কন্ঠের প্রত্যুত্তরে রাফির নরম অপরাধি স্বর….
“ আমি তোমাকে এসব বলার সুযোগ টা পাই নি মিহি !
“ বারবার সুযোগ পেয়েছিলেন , তবুও বলেন নি !
“ তার জন্য সরি !
“ আমি যখন বলতাম আমরা অবিবাহিত , তখন ও কেনো বলেন নি আমায় ?
“ তখন বললে কি হতো ? তোমাকে বোঝাতে পারতাম না হয়তো , যদি বেঁকে বসতে তখন ? যদি ভুল বুঝতে আমায়…
“ আমি এমনিতেও ভুল বুঝেছি আপনাকে !
মিহি রাফি কে ছাড়লো । পিছিয়ে এসে বসলো । হাতের উল্টো পিঠে আধো ভেজা চোখের কার্নিশ মুছলো । রাফি উৎকন্ঠায় শুধালো…

“ ভুল বুঝেছো মানে ?
“ আপনি দু-দুবার চুমু খেয়েছেন আমায় ! আমি আপনাকে অসভ্য,ইতর, বদমাইশ কতো কি বলেছি । খারাপ ভেবেছি , উল্টো পাল্টা চিন্তা করেছি আপনার নামে । এগুলো ভুল বোঝা নয় ? আপনি আগে বললে আমি কক্ষনো ভুল বুঝতাম না আপনাকে । বকতাম না, বাঁধাও দিতাম না !
মিহি খেয়ালে কথা বলে থামলো । রাফি সবটা শুনে হালকা হলো । ভার বুকে শীতলতা ছেয়ে গেলো । সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে বললো মেকি স্বরে…
“ কি করতে বাঁধা দিতে না ?
মিহি চক্ষু জোড়া বৃহৎ আকারে চায় । রাফি ভ্রু তুলে ফিচেল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । মিহি ঘন পল্লব ভেজা নোনা জলে । কাঁপছে পাপড়ি যুগল । সাথে আধো ওল্টানো ওষ্ঠ জোড়া ‌।
মিহি মুখ বাঁকিয়ে শ্বাস ফেললো ফোঁস করে । ঝট করে উঠে দাঁড়ালো । উল্টো ফিরে রাঙা মুখ আড়াল করে বললো চেঁচিয়ে….

“ বেরিয়ে যান আমার ঘর থেকে !
উঠে দাঁড়ায় রাফিও ‌। গা ঝেড়ে মিহির অতি সন্নিকটে ঘেঁষে দাঁড়ায় ।‌ পিছু থেকে মিহির কানের কাছে ফিসফিস করলো সে …
“ যাচ্ছি , খুব সহজেই যাচ্ছি ।‌ কারন এবার তুমিই আমার ঘরে আসবে । সকলের সামনে দিয়ে আসবে । বলেছিলাম না , বউ রুপে আনবো । বউ রুপে আসবে এবার । আমার বউ রুপে । বউ তো অলরেডি হয়েই গেছো , এখন শুধু বধূ রুপ ধারণ করা বাকি ! আই এম ওয়েটিং ফর নেক্সট টু ডে…!
আর একটা কথা শুনে রাখো , আমি কিন্তু অসভ্য নই ! কোনো অসভ্যতা করি নি তোমার সাথে । যা করেছি, বরং স্বাভাবিকের তুলনায় কম কিছুই করেছি ।
তোমাকে করা একটা স্পর্শ ও নিন্দনীয় নয় । ইটস্ হালাল , স্বামীর স্পর্শ । অতি অল্প কিছুতেই অনেক কিছু ভেবে ফেলেছিলে । এবার অনেক সেই অনেক কিছু গুলো সব হবে । সেই সব কিছুর জন্য প্রিপেয়ার হও ।
কান গরম হয়ে আসে মিহির । রাফি কথা শেষ করে এক মুহুর্ত ও অপেক্ষা করে নি । বড় বড় ধাপে দরজার কাছে এগিয়ে খট করে দরজা খুললো । অমনি হুমড়ি খেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো সবাই । দরজায় আড়ি পেতে ছিলো ওরা । রুহি, শান্ত, আর মেহজাবিন । জেনি ও জুটেছে ওদের সাথে । কান পেতে ভেতরের ফুসুর ফাসুর শোনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলো ওরা । আকস্মিক দরজা খোলার দরুন হুড়মুড়িয়ে পড়েছে ভেতরের দিকে । রাফি দ্রুত সরে এসেছে সামনে থেকে । ওদের চারটে কে আচমকা এভাবে দেখে কপালে তীক্ষ্ণ ভাঁজ ফেললো রাফি । ওদের কার্যকলাপ বুঝে শক্ত কন্ঠে ধমক দিলো……

“ কি হচ্ছিলো এখানে ?
ভ্যাট ভ্যাট করে চোখ তুলে চাইলো সকলে । রাফির সূচালো রাগান্বিত দৃষ্টির পানে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসলো ওরা । শান্ত গড়গড় করে বললো….
“ কি হচ্ছিলো, সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমরা ! কোথায় তুই আমাদের বলবি এখানে কি হচ্ছিলো , তা না , উল্টে আমাদের জিজ্ঞেস করছিস এখানে কি হচ্ছিলো ?
রাফি কটমটিয়ে তাকালো । মেহজাবিনের দিকে নিরেট দৃষ্টি পাত করলো । ওও বাচ্চা হয়ে গেছে এদের সাথে ! হবে নাই বা কেনো ? শান্তর মতো বুড়ো দামড়া এমনটা করতে পারলে ও আর এমন কি ?
মেহজাবিন কে শাসনের সুরে ধমকালো রাফি…..
“ মেহজাবিন তুই ও ? নিজের অবস্থা জানা নেই তোর ? এক্ষুনি পড়ে গেলে কি হতো ? পেটে বাচ্চা নিয়ে বাচ্চামো করতে এসেছিস ?
“ খবরদার ভাইয়া , একদম ধমকাবে না আমায় । ভুলে যেও না আমি তোমার সম্পর্কে বড় শালি । মিহি আমার বনু । আমাকে ধমকালে ভালো হবে না বলে রাখলাম ।
মেহজাবিনের চড়া কন্ঠে মুখ ফাঁক করলো রাফি । বুকে হাত গুটিয়ে চোখ অত্যাধিক সরু করে তাকালো । রুহিও যোগ দিলো মেহজাবিনের সাথে….
“ অফকোর্স , একদম ঠিক বলেছো আপি । এই যে মিস্টার রুজান রাফি চৌধুরী । মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজে, ওক্কে ? বড়দের সম্মান দিতে শিখুন ।
শান্ত ও বাদ পড়লো না । মুখ বাঁকিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো….

“ হুহহহহ , আমিও সাপোর্ট করছি । আফটার অল আমিও বড় ভায়রা ভাই । তাও আবার দু’পক্ষ থেকেই কানেক্টেড আছি আমি । রুহির হাসবেন্ড হওয়ার দরুন আমি সম্পর্কে বড় । তার থেকেও বড় কথা মিহি পাখি আমার ছোট্ট পরী । সো রাফি , রেসপেক্ট আস…
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো রাফি । শান্ত এক মুহুর্ত সিরিয়াস হলেও পরমুহুর্তে সিরিয়াস থাকতে পারলো না । চট করে বলে উঠলো….
“ আচ্ছা বাই দা ওয়ে , তোরা এতক্ষণ কি করছিলি ঘরে ? আরে ব্রো , তোর তো সাহস কম নয় । বাড়ির এতো গুলো গুরুজনের সামনে দিয়ে ওমন হিরোইনের পেছনে নাচতে নাচতে ছুটে আসলি । বাড়ির সবাই কি ভাবলো , এটা একবারও ভাবলি না তুই ?
রাফির নির্বিকার ভাবভঙ্গি । সে তপ্ত শ্বাস ফেললো এদের কথায় । বেপাত্তার ন্যায় গুটানো হাত নামিয়ে বেরোলো ঘর‌ ছেড়ে ।
ও বেরোতেই ওর থেকে মনযোগ সরিয়ে উঁচু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো রুহি…..

“ পাখিইইইইই….
আকস্মিক চেঁচানোতে হকচকিয়ে গেলো মিহি । নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই ওকে হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো রুহি । রুহির চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দ । হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রগাঢ় উজ্জ্বলতা । রুহি উজাড় চিত্তে নিদারুণ কন্ঠে বললো…
“ পাখিইই , আমার ভাবি জান । অবশেষে সত্যি সত্যিই তুই আমার ভাবি জান হয়ে গেছিস । ইশশ্ , আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে । যদি তোকে বোঝাতে পারতাম । দেখেছিস , একসময় তোকে মজার ছলে ভাবি জান ডাকতাম । তখন তুই কতো রেগে যেতিস আমার উপর ।‌ এখন দেখ , তুই আমার একমাত্র ভাবি জান হয়ে গেছিস ।
মিহি লাজুক হাসে ।
রুহি গদগদ হয়ে সবটা খুলে বললো ওকে । নিচে আলাপ আলোচনা চলছে । আগামী পরশু ধুমধাম করে আরো একটা বিয়ে হবে চৌধুরী বাড়িতে ।
রুহি মিহির হাত টেনে সামনে ধরলো । দুহাত উল্টে পাল্টে দেখলো । দুহাতে ভরা মেহেদির গাঢ় রং । হাতের তালুতে রাফির নামটাও লেখা আছে , জ্বলজ্বল করছে পুরো । আলাদা করে আর মেহেদি পড়ার প্রয়োজন নেই কোনো । বর আগে থেকেই তার বধূর হাত সাজিয়েছে মেহেদির গাঢ় রঙে ।

রাত এখন দশটা পেরিয়েছে । সবে রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হলো সকলের । আজ‌ দেরি হয়ে গেছে একটু । সন্ধ্যা থেকে এটা ওটা করতে করতেই সময় পেরিয়ে গেছে । ক্লান্ত সকলে । রেস্ট প্রয়োজন । খেয়ে দেয়ে যে যার ঘরে এখন । মাহিম বাড়িতে ফিরেছিল , সন্ধ্যার পর আবার এসেছে এ বাড়িতে ।
রুহি আর শান্তর জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে । আফসানা বেগম ও আছেন এ বাড়িতে । অতিথিরা মিলিয়ে এখন পুরো বাড়ি জমজমাট ভরপুর । দোতলার বন্ধ ঘর গুলো খুলে দেওয়া হয়েছে । সেগুলোর মধ্যে একটাতে ঠাই দেওয়া হয়েছে রুহি আর শান্ত কে । কেননা রুহির ঘর এখন মিহির দখলে ।
করিডোরে এক প্রকার ছুটতে দেখা গেলো রুহি কে । পিছু পিছু শান্ত ওকে ধাওয়া ধরে ছুটছে । ছুটে এসে মিহির ঘরের দরজা ঠাস করে খুললো রুহি ‌। হাঁসফাঁস করে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো । শ্বাস ফেললো ঘন ঘন । শান্ত ছুটে নাগালে আসার আগেই ধপ করে শান্তর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো রুহি । শব্দ হলো বিকট । দরজা টা লেগেছে একেবারে শান্তর মুখোমুখি । শান্ত থামলো । করুন সুরে দরজায় কড়া ঘাত করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে ডাকলো….

“ এই জান , ভালো হচ্ছে না কিন্তু ! ঘরে এসো বউ ! বিয়ের পর পরের ঘরে থাকতে নেই । পরের ঘরে না থেকে বরের ঘরে এসো, জান ।
রুহি বুকে হাত রেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । মিহি অবাক লোচনে হকচকিয়ে তাকিয়েছে । সবে বিছানায় গা এলিয়ে রাফির কিনে দেওয়া নতুন ফোনটা হাতে নিয়েছে । অমনি সময় ধড়ফড় করে ঘরে ঢুকলো এই মেয়ে । মিহি এখনো দরজা আটকায় নি । লিনা বাকি দিন গুলো এ ঘরেই ছিলো । আজ ও থাকবে হয়তো , কিন্তু এখনো এ ঘরে আসে নি ও । লিনার আসার অপেক্ষায় দরজা খুলেই রেখেছিল মিহি । কিন্তু হঠাৎ রুহির আগমন । শান্তর কথা গুলো মিহির কানেও পৌঁছেছে । মিহি উঠে বসলো । শুধালো…
“ কি হয়েছে পাখি । এ ঘরে আসলি কেনো । আর হঠাৎ এভাবে দরজা আটকালি যে ?
রুহি হাত ঝাড়লো । শান্তর ডাক উপেক্ষা করে করে ভেংচি কাটলো । মিহির দিকে এগিয়ে বললো…

“ আজ এ ঘরে থাকবো আমি !
“ হ্যাঁহহ ? এ ঘরে কেনো ?
“ কেনো আবার কি ? তোর সাথে থাকবো আমি ।
“ ভাইয়া ডাকছে তো !
“ ডাকুক ।
এর মধ্যেই আবার শান্তর কন্ঠ ভেসে আসলো….
“ এই রুহি , দেখো ইয়ার্কি বাদ দাও । দরজা খোলো …
মুখ বাঁকায় রুহি । মিহি ভ্যাবাচ্যাকা ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে । এক বার তাকাচ্ছে রুহির দিকে তো আরেক বার বন্ধ দরজার দিকে ।
কত কসরত করে শান্ত কে ছাড়িয়ে এ ঘরে ছুটে এসেছে রুহি । ঐ লোকটা চিপকে রেখেছিলো রুহি কে । রুহি কোনো রকমে পালিয়ে বেঁচেছে ।
শান্ত পিছু পিছু ছুটে এসেছে তবুও । সে ডেকেই যাচ্ছে চাপা স্বরে…

“ রুহি , দেখো শুনে ফেলবে কেউ । পাশেই চৌধুরী শ্বশুরের ঘর । শ্বশুর শুনলে মান সন্মান থাকবে না আর ।
রুহি চেঁচিয়ে বললো ভেতর থেকে….
“ আমি এ ঘরেই থাকবো আজ । গত দু’দিন অনেক জ্বালিয়েছেন আমাকে । আপনাদের বাড়ি বলে কিচ্ছুটি বলি নি আমি । কিন্তু আজ আমার বাড়িতে আছেন আপনি । এখানে আমি যা বলবো তাই হবে । চুপচাপ ও ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন । আমি এখান থেকে নড়ছি না । আমি আজ পাখির কাছেই থাকবো ।
মিহি মূর্তি বনে বসে আছে ।
শান্ত মলিন হয়ে আসলো । এদিক ওদিক তাকালো । নাহ , করিডোরে কেউ নেই । কেউ দেখে ফেললে প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে আসলেই । কাঁদো কাঁদো হলো শান্ত । মেকি স্বরে বলল আবার , এবার একটু কন্ঠ চিপে….
“ জান , দরজা খোলো প্লিজ । ঘরে চলো , নয়তো তোমার সোয়ামি কে বাঘে খেয়ে ফেলবে । পরে তুমি কার সাথে সংসার করবে বলো ? দুদিনের স্বামী কে এভাবে কষ্ট দিতে নেই জান, তুমি না ভালো মেয়ে । দরজা খুলে বেরিয়ে এসো.
মিহি ফিক করে হেসে ওঠে । শান্ত আবারো ডাকে প্রতিক্রিয়া না পেয়ে…

“ এই পরী , তোর ভাবি কে পাঠিয়ে দে বোন । তোকে আশির্বাদ করবো , শত পূত্র বতী হবি । সেখান কার একটা পূত্রের সাথে আমার কন্যার বিয়ে দেবো । কিন্তু বিয়ে দেওয়ার জন্য কন্যা লাগবে । না মানে , বেশি কিছু কমু না । আমি না তোর ভাইয়া হই । তোর ভাবি কে পাঠিয়ে দে পরী । ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দে ঘর থেকে ।
রুহি ভেতর ভেতরে হাসি চেপে মুখে শক্ত ভাব ফোটালো । বিছানা থেকে কোল বালিশ তুলে গটগটিয়ে গিয়ে দরজা খুললো । শান্ত চিকচিক করে উঠলো এতেই । মুখ খোলার আগে রুহি কোলবালিশ টা ছুড়ে মারলো শান্তর দিকে । রগরগে গলায় বলল…

“ যান , এবার গিয়ে ঘুমান । আমি তো এ ঘরেই থাকবো । আপনি আপনার জায়গা বুঝে নিন । যদি আর একবার ডাকেন , তাহলে চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবো বলে রাখলাম ।
ফের খটাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো রুহি । শান্ত স্তম্ভের ন্যায় থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল । হাতের কোল বালিশটার দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । সিঁড়ির দিকে কারোর পায়ের শব্দ ভেসে আসছে । শান্ত চমকালো , এই মুহূর্তে ওকে এভাবে দেখলে মান সন্মান থাকবে না আর । বউ ঘর থেকে বের করে দিয়েছে , এটা জানা জানি হলে আর‌ রক্ষে নেই । শান্ত দ্রুত পা চালালো উল্টো দিকে । ফোঁস করে বিড়বিড় করলো রুহিকে স্বরন করে….

“ পাষন্ড বউ‌, জল্লাদ বউ , জালিম বউ , মামুর বেটি , ছাড়বো না তোমায় । একবার খালি ধরতে পারি । তোমার ছেলেকে যদি আমাকে বাপ ডাকতে না শিখিয়েছি , তাহলে আমিও শাহরিয়ার শান্ত নই । ও থুরি , আমি তো ওর বাপই হবো ।‌
শোকে কাতর শান্ত উল্টো পাল্টা বকতে বকতে পাশের ঘরের দরজা ঠেললো । রাফি আর ইভান শুয়ে শুয়ে ফোন ঘাটছে । কানে এয়ার ফোন । দরজা খোলার আভাস পায় নি ওরা । পুরোপুরি ফোনে মগ্ন হয়ে আছে দু’জনে । শান্ত ফুসলো ওদের দেখে । এদিকে ও বউ বিহনে গত তিন মিনিটে শুকিয়ে গেছে , আর এরা দুটো আরামে ফোন টিপছে ।
শান্ত দরজায় ধাম করে শব্দ করলো । হাতের কোলবালিশ টা খাটের উপর শুয়ে থাকা রাফি আর ইভানের উপর ছুড়ে মারলো । যেটা গিয়ে পড়লো দুজনের পেটের উপর । অমনি চমকালো ওরা । রুমের সবুজ আলোয় শান্তর রুষ্ট মুখাবয়ব দেখে তড়িতে উঠে বসলো দুজনে ।
শান্ত তেড়ে আসলো । কথা নেই বার্তা নেই , ওদের দুটোর মাঝে লাফিয়ে উঠলো । রাফি কে না পেরে বেচারা ইভান কে বেধরম পেটাতে লাগলো । হকচকিয়ে গেল ইভান । শান্ত কে থামাতে চেষ্টা করলো দুহাতে ডিফেন্স করে । শান্ত ইচ্ছে মতো বেশ কয়েকটা কিল ঘুষি বসালো ইভানের পিঠে, বাহুতে । চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো ইভান । শক্ত কন্ঠে রাগ ঝাড়লো…

“ আরে ভাই কি হয়েছে ? এভাবে পেটাচ্ছিস কেনো ? সরকারি মাল পেয়েছিস আমায় ?
শান্ত থেমে চটচটে গলায় বলল….
“ কেমন তোর ঐ ফুফুর মেয়ে ? স্বামী কে সম্মান দিতে জানে না । ঘর‌ থেকে বের করে দেয় স্বামী কে । স্বামীর মর্ম বোঝে না । স্বামীর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয় । তোরই তো ফুফুর মেয়ে ! ও এমন কেনো হলো বল ? সব তোর জন্য হয়েছে ! একটা মার ও মাটিতে ফেলবো না আমি । সব তোর পিঠের উপর পড়বে….
শান্ত কে ধাক্কালো ইভান । দ্রুত লাফিয়ে খাট থেকে নামলো শরীর ঝাড়া মেরে । বক্ষ স্থল সীমান্ত ছাড়িয়েছে ওর । শান্তর এলোমেলো মারের চোটে নিঃশ্বাস আটকে এসেছিল । বুকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস ফেললো ইভান । চোখ মুখ পাকিয়ে খেকিয়ে উঠলো..
“ শালা মেরে পাছা লাল করে দেবো । বউকে সামলাতে পারিস না , এখানে এসে মাতব্বরি করছিস ? আমাকে ভোলা ভালা নাদান পেয়ে অত্যাচার করতে এসেছিস । গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবো একদম ।
যা এখান থেকে….

“ ওরে বিটকেল , আমি যাবো কোথায় ? তোর বোন ঘর থেকে বের করে দিয়েছে আমায় । সব তোর জন্য হয়েছে , দাঁড়া তোকে তো ছাড়বো না আমি….
শান্ত তেড়ে যেতে নিলে রাফি স্বশব্দে একটা হুংকার ছাড়লো । তপ্ত ধমক ফেললো…..
“ স্টপ , ননসেন্স । কি শুরু করলি তোরা ?
“ আমি না , শুরু করেছে তোর এই বোনের জামাই !
“ শান্ত , এখানে কি করছিস তুই ?
শান্ত মুখ কাচুমাচু করলো । রাফির শক্ত মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে বললো হুতাশ হয়ে…
“ কি আর বলবো দুঃখের কথা ? কইতেও পারি না , সইতেও পারি না । তোর ঐ খাটাস বোন ঘর থেকে বের করে দিয়েছে আমায় ।
রাফি দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো ।
শান্ত কাঁদো কাঁদো হয়েছিল । তবে রাফির পরবর্তী কর্মকান্ড আন্দাজ করে দ্রুত পিছিয়ে গেল । এক্ষুনি শক্ত কিল পড়তো ওর শরীরে । শান্ত মুখ কাঁদো কাঁদো করলো…

“ সত্যিই বলছি ভাই । তোর বোন ঘর থেকে বের করে দিয়েছে আমায় । ছাড়ছিলাম না বলে উত্তম মধ্যম দিয়েছে কয়েকটা । এই দেখ , কামড়েছে আমার হাতে ।
হাত বাড়িয়ে দেখালো শান্ত । রাফি হাতের দিকে তাকালো না । শান্ত আবারো বললো…
“ কিন্তু আমি কিছু মনে করিনি । ভালোবাসা চরমে পৌঁছালে এমন লাথি ঝাটা, কামড় , পেটানি , খেতে কোনো আপত্তি নেই আমার । কিন্তু তোর ঐ বোন ভালোবাসা চরমে না নিয়ে গিয়ে নরমে নিয়ে গেছে । তোর বোন তোর বউকে বাজেয়াপ্ত করেছে আমাকে ছেড়ে ‌। হায়য়য় , এই দুঃখ কোথায় লুকাবো আমি …
রাফি কথা পাল্টে রুক্ষ স্বরে বলল….

“ তো এখানে কি চাই ?
“ এখানে তোকে চাই । তুই ছাড়া তো আমার আর গতি নেই । কোথায় যাবো আমি ! আয় ভাই , গলা ধরা ধরি শুয়ে পড়ি । আজকের জন্য ভুলে যাবো আমি বিবাহিত । তুই ও ভুলে যা । একদিন পর না তোর বিয়ে , তখন আর এই সুযোগটা পাবি না । আয় শালা…
তিনটে মিলে হুটোপাটি বেপরোয়া পনা বাচ্চামো করলো কিছুক্ষণ । এরা একসাথে হলে এদের আর পায় কে ।
রাত্রি এখন দুটো পেরিয়ে তিনটের কোঠায় । বিছানায় একেকটা একেক মতো করে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে । ঘুমিয়েছে শান্ত আর ইভান । রাফি ঘুযোয় নি । ওদের দুটো কে এক পলক করে দেখে উঠে বসলো রাফি । বালিশের নিচ থেকে ফোন টা বের করলো । তখন মিহির ফোনে সবে কল করতে যাচ্ছিলো , ঠিক সেই মুহূর্তে শান্তর আগমনে সবটা ঘেঁটে গেছে ।

এখন নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে মিহি । ঘুমোক , আজ না হয় একটু ডিস্টার্ব করা যাক ? রাফি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । পাশের ব্যালকনির দরজা ভেতর থেকে লাগানো । ওদিকটায় খেয়াল দিলো একবার । অতঃপর চোখ সরিয়ে বেশি না ভেবে মিহির নতুন নাম্বারে ফোন লাগালো । প্রথম বার রিসিভ হলো না । দ্বিতীয় বার ও হলো না । লাগাতার কল করতে লাগলো রাফি ।
এদিকে বালিশের নিচে ফোন ভাইব্রেট হয়ে কাঁপছে । ঘুমের ভারে এতে করে প্রচন্ড বিরক্ত হলো মিহি । হাতড়ে ফোনটা খুঁজলো । হাতে পেয়ে চতুর্থ বারের বেলায় রিসিভ করলো ফোন । আন্দাজে কানে ঠেকালো । সবটা ঘোরের বশে ।
ফোনের ওপাশ থেকে মৃদু পুরুষালি হীম কন্ঠের ডাক ভেসে আসলো খানিক পর…

“ ম্যাডাম ? শুনছেন ?
মিহির সাঁড়া নেই । ডাক শুনলেও উত্তর করার জন্য মস্তিষ্ক এখনো সজাগ হয় নি পুরোপুরি । রাফি মৃদু হেসে আবার ডাকলো….
“ ম্যাডাম , ঘুমিয়েছেন ?
“ হু ।
মৃদু স্বরে উত্তর আসলো । রাফি ধীর কন্ঠে বলল…
“ উঠুন !
একটু পর আবার..
“ কি হলো উঠছেন ?
“ উঁহু !
“ খুব ঘুম পাচ্ছে ?
“ হুম !
“ উঠতে পারবেন না ?
“ হুম !
“ আমার যে ঘুম পাচ্ছে না । একটু উঠুন । অপেক্ষা করছি আমি ।
মিহি ঘুমে অচেতন । তলিয়েছে পুরোপুরি । রাফি এবার কন্ঠ উঁচালো একটু…
নাম সম্বধনে ডাকলো…

“ মিহি ?
অমনি টনক নড়ে মিহির । নড়েচড়ে ওঠে ও । ঝট করে চক্ষু মেলে তাকায় । নিভু চক্ষু চড়কগাছ ফোনের দিকে দৃষ্টি যেতেই ‌। রাফি নিজের নাম্বার টা মিহির ফোনে ঠিক সেই নামেই সেভ করে দিয়েছে , যেই নামে আগে থেকে সেইভ ছিলো । জামাই জান ! স্ক্রিনে তাকাতেই ঝটপট করে তব্দা খেয়ে উঠে বসলো মিহি । মাথা টা চক্কর দিয়ে উঠলো এতেই । আকস্মিক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতেই ঝিমঝিম করে উঠলো পুরো শরীর । মিহি খেয়াল দিলো না । তড়িঘড়ি করে ফোন কানে লাগালো ।
“ হ..হ্যালো ?
আপনি ?
“ হুম !
“ ফোন করেছেন কখন ! কটা বাজে ?
“ তিনটে ।
“ এতো রাতে ঘুমান নি ?
“ ঘুম আসছে না ।
ছাদে যাবে ? প্লিজ !
মিহি এখনো চমকানো ভঙ্গিতেই রয়েছে । ধ্যান কাটেনি পুরোপুরি । ও সন্দিহান । ঘুমের ঘোরে ভুলভাল আজগুবি স্বপ্ন নয়তো এসব ? মিহি কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজলো । শ্বাস টানলো দীর্ঘ । রাফি ডাকতেই হুশে ফিরলো…

“ মিহি ?
“ হুম ।
“ আমি যাচ্ছি । দুমিনিটে ছাদে এসো ।
“ এতো রাতে ?
“ হুম । রাখলাম ! তাড়াতাড়ি এসো ।
ফোন কেটেছে রাফি । মিহি দ্রুত ওয়াশ রুমে ছুটলো । ঘুম তাড়ানোর জন্য চোখে মুখে পানি ছেটালো প্রথমে । বেরিয়ে এসে ঘুমিয়ে থাকা রুহির পানে তাকালো । ওরনায় মুখ মুছে সন্তর্পণে দরজা ভিজিয়ে উদ্দ্যত পায়ে ছুটলো ছাদের দিকে ।
সিঁড়ির লাইট জ্বলছে । মিহি চটজলদি ছাদে উঠলো । দরজার কাছ থেকে চোখ ঘোরালো এদিক ওদিক । ছাদের এক কোণে রেলিং ঘেঁষে রাফি দাঁড়িয়ে । মাথা টা খানিক উঁচিয়ে শূন্য আকাশের পানে তাকিয়ে আছে । আকাশের অর্ধ রুটির ন্যায় চাঁদ উঠেছে । অর্ধেক চাঁদই উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে আশেপাশে ।
চাঁদের তীর্যক রশ্মি এসে পড়েছে রাফির উপর । মিহি দরজার কাছ থেকেই দেখলো । পা টিপে এগোলো সামনে । মৃদুমন্দ বাতাস বইছে । মধ্য রাত্রির শীতল বাতাসে দেহ কাঁপে মিহির । ও কম্পন ভুলে সামনে এগোয় । রাফির পেছনে দাঁড়িয়ে চিকন কন্ঠে গলা খাঁকারি দেয় । চকিতে চায় রাফি । উপস্থিতি বোঝানোর প্রয়োজন হয় নি । সে বুঝেই নিয়েছে অনেক আগে । মিহির নাজুক চোখে চোখ পড়তেই মুচকি হাসলো রাফি । মিহি চোখ নামিয়ে পাশে দাঁড়ালো । রাফি মোলায়েম কন্ঠে শুধালো….

এক দেখায় পর্ব ৬৪

“ ডিস্টার্ব করলাম ?
না বোধক মাথা নাড়ালো মিহি ।
“ ঘুমিয়েছিলে তো , এতো রাতে জাগিয়ে তুললাম । ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালাম । আর বলছো ডিস্টার্ব করি নি ?
“ ডিস্টার্ব হই নি । কেনো ডাকলেন সেটা বলুন ।
“ তোমার সাথে চন্দ্র বিলাস করার জন্য !

এক দেখায় পর্ব ৬৬