এক দেখায় পর্ব ৬৭
সুরভী আক্তার
মুহুর্তেই ধক্ করে চাইলো ড্রইং রুমে উপস্থিত সকলে । মিহি ইতিমধ্যে সিঁড়ি গড়িয়ে নিচে এসে পড়েছে । ওর উচ্চ স্বরের চিৎকারের সাথে সাথে ওকে ওভাবে নিচে গড়িয়ে পড়তে দেখে আঁতকে উঠলো সকলে । এক মুহুর্ত স্তব্ধ হলেও পরমুহুর্তে বৃহৎ ভয়ার্ত নয়নে চাইলো প্রত্যেকে । রুহি অস্ফুটে চিৎকার করলো এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে…..
” পাখি ??
সাবিনা বেগম কিচেনে ছিলেন । বাচ্চাদের জন্য বাকি খাবার গুলো গরম করতে হেনা বেগম কে সাহায্য করছেন তিনি । মেয়ের ঝাঁজালো চিৎকারে কিচেন থেকে ছুটে বেরোলেন তিনি । রুহি হুড়মুড়িয়ে মিহির কাছে বসেছে । বাকিরা ঘিরে ধরেছে মিহি কে । সাবিনা বেগম আতঙ্কিত হয়ে তেড়ে আসলেন মেয়ের নাম উচ্চারণ করে…
” মিহি !
মস্তিষ্ক এক মুহুর্তের জন্য অচল হয়ে পড়লো মিহির । চারদিকে কেমন অস্পষ্টতা ভর করছে । দুলছে আশপাশ । শরীর টা গুড়িয়ে আসলো ওর । পায়ের টাখনুর কাছে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হতেই কুঁকড়ে গেলো মিহি । কুঁচকে আসলো চোখ মুখ । চোখ বন্ধ তখনো । মাথা ভনভন করছে ঝিঁঝিঁ ধরার ন্যায় । আশেপাশে একাধিক উদগ্রীব কন্ঠ কানে ঠেকছে , তবে ঠাহর করতে পারছে না মিহি । চক্কর দিচ্ছে মাথা । যন্ত্রণায় চোখের কোণে আপনা আপনি পানি জমেছে । রুহি ওকে নিজের দিকে টেনে এনে ব্যাস্ত হয়ে ঝাঁকালো….
” পাখি , এই পাখি । ঠিক আছিস তুই ? এই চোখ খোল ! পাখি , পড়লি কি করে তুই ? শুনছিস আমায় ?
সাবিনা বেগম রুহির পাশে বসলেন । মুহুর্তেই নিস্তব্ধতায রুপ নিলো সকলের ভয়ার্ত চিত্ত । পুরুষেরা সকলে বাইরে । হেনা বেগম, হালিমা বেগম, আফসানা বেগম সহ বাকিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন । হেনা বেগম মিহি কে ডাকলেন….
” মিহি , মা চোখ খোল । তাকা আমাদের দিকে !
নিভু চোখ খোলার চেষ্টা করে মিহি । সোজাসুজি সাবিনা বেগমের মুখখানা দৃশ্যমান হতেই ব্যাথার সাথে সাথে ভয়ে ঠোট ভেঙে কেঁদে ফেললো মেয়েটা । সাবিনা বেগম নিজের মেয়ের পায়ের দিকে তাকালেন । ডান পায়ের গোড়ার কাঁচের অংশ নিমিষেই কালচে বর্ণ ধারণ করেছে । পা খানা খানিক বেঁকে গেছে । মিহি কোমরেও ব্যাথা পেয়েছে আকস্মিক পড়ার দরুন ।
সাবিনা বেগম মেয়ের পা লক্ষ্য করে আঁতকে উঠলেন । হালিমা বেগম, হেনা বেগম ভড়কানো গলায় ডেকেই যাচ্ছে মিহি কে । সাবিনা বেগম মিহির মুখ আগলে গালে আলতো চাপড় মারলেন ।
“ মিহি , মা । পড়লি কি করে তুই ? পায়ে ব্যাথা পেয়েছিস ? পা টা এমন কালসিটে হয়ে গেলো কেনো তোর ? মিহি , হুশে আছিস !
মিহি এবার শব্দ করে কুকিয়ে ওঠে । রুহির শরীরে আপন ভার ছেড়ে টলে পড়লো আরো বেশি । ব্যাথা তুর অস্ফুট স্বরে বলল কন্ঠ চিপে…
“ আম্মু , আমার পা…..
কারোর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু । হেনা বেগম চিৎকার করে আদেশ করলেন হালিমা বেগমের উদ্দেশ্যে….
“ তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইস ব্যাগ নিয়ে আয় । যা…
ছুটলেন হালিমা বেগম । রুহি ঠোঁট ভিজিয়ে চিৎকার করে ডাকলো উপরে তাকিয়ে….
“ ভাইয়া….
ওয়াশ রুমে ঢুকেছিলো রাফি । সবে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে । অমনি রুহির চিৎকারের পাশাপাশি মা চাচিদের কোলাহল শুনে তড়িতে ঘর ছেড়ে বেরোলো ও । শান্ত, ইভান , ওরা কেউ এই মুহুর্তে বাড়ির ভেতরে নেই । পুরুষেরা সবাই গার্ডেনে রাফি ব্যাতিত । করিডোর থেকে নিচে তাকাতেই ধক্ করে উঠলো রাফি ।
হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো ওর ব্লোসোমের অর্ধচেতন কাতরানো অবস্থা দেখে । হাতে টাওয়েল ছিলো ভেজা মুখ মোছার জন্য । হাত ফসকে পড়ে গেলো সেই টাওয়েল । হাঁটু কাপলো রাফির । সশব্দে উচ্চারণ করলো তীব্র ঝংকার তুলে…..
“ মিহি ??
সিঁড়ি বেয়ে এলোপাথাড়ি নেমে আসলো রাফি । রুহির কোল থেকে মিহি কে এক টানে নিজের দখলে নিলো । চোখ খিচে ঠোঁট কামড়ে রেখেছে মিহি । ফিকড়ে উঠছে সময় বাদ বাদ । হালিমা বেগম আইস ব্যাগ চেপে ধরে আছেন মিহির ডান পায়ের গোড়ার কাছে । সবার মুখশ্রীতে বিভৎস চিন্তার ছাপ । কপালে ভাঁজ তিন স্তর করে ।
রাফি দ্রুত আইস ব্যাগ সরিয়ে মিহির পায়ের কালসিটে দাগ লক্ষ্য করলো । অমনি চোখ কপালে উঠলো ওর । এর মধ্যেই ফুলে উঠেছে পা খানা । কালচে হওয়ার মাত্রা বাড়ছে । চোখ ফিরিয়ে মিহির ফুঁপিয়ে ওঠা মুখ পানে তাকিয়ে ঢোক গিললো রাফি । ধীরে ডাকলো….
“ মিহি ? এইই , দেখো , তাকাও আমার দিকে । কিচ্ছু হয় নি । মিহি…
হেনা বেগম তাড়া দিলেন ।
“ ওকে আগে তোল রাফি । তুলে বসা ।
রাফি মিহি কে ঝট করে কোলে তুললো । ঘরে না উঠে সোফায় আধশোয়া করে বসালো মিহি কে । চোখ খিচে নিচের অধরে দাঁত চেপে ধরে পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে আছে মিহি । পায়ের চিনচিনে ব্যথা মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত হানছে ধীরে ধীরে ।
রাফি আবার ডাকলো অধীর ব্যাকুল ভাবে…
“ মিহি ,চোখ খোলো প্লিজ । লুক এট মি , মিহি ? প্লিজ তাকাও ।
সদর পেরিয়ে পুরুষদের আগমন ঘটছে । ভেতরে একসাথে সকলের জমাট ভিড় হই হট্টগোলে দেখে ঘাবড়ে গেলেন সকলে । দ্রুত এগিয়ে আসলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । মিহির অমন অবস্থা দেখে সবার ন্যায় আঁতকে উঠলেন তিনিও । শান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো তৎক্ষণাৎ….
“ পরী , কি হয়েছে তোর ?
“ রাফি , মিহির কি হয়েছে ? মিহি মামনি , কি হয়েছে তোমার ? পায়ের অবস্থা এমন হলো কি করে ?
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কন্ঠ কর্ণপাত হতেই ধীরে ভেজা চোখ খোলার চেষ্টা করে মিহি । নিজের পায়ের দিকে তাকানোর আগেই রাফি ওর মুখটা টেনে নেয় নিজের দিকে । এই মুহূর্তে পায়ের অবস্থা দেখলে আরো বেশি ঘাবড়ে যাবে মিহি । রাফি মিহির মুখখানা নিজের বুকের কাছে চেপে ধরলো । অন্য হাতে সামলানোর ভঙ্গিতে মিহির পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে আদুরে নরম গলায় বলতে লাগলো….
“ কিচ্ছু হয় নি মিহির । শুধু পড়ে গিয়ে পায়ের কাছে ব্যাথা পেয়েছে একটু । এর বেশি কিচ্ছু না । মিহি ডোন্ট ক্রাই প্লিজ । কিচ্ছু হয়নি তোমার । চোখ বন্ধ করে থাকো তুমি , এক্ষুনি ঠিক হয়ে যাবে সবটা ।
মিহির মস্তিষ্ক শূন্য । কন্ঠ নালি রূদ্ধ হয়ে গেছে । কথা বলার শক্তি নেই বিন্দুমাত্র । একেই খিদের চোটে পেট কাতরাচ্ছে । তার উপর এখন পায়ের অসহ্য যন্ত্রণা ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন ডাক্তর এসেছেন । মিহি কে ততক্ষন নিজের থেকে আলাদা করে নি রাফি । ওর মাথা টা সেই তখন থেকে নিজের বুকের মাঝে সেপ্টে ধরে আছে একই ভঙ্গিতে বসে । বাড়ির সবার বুক দূরু দূরু । উদ্বিগ্ন , উত্তেজিত সকলে । ধীরে ধীরে ব্যাথার তীব্রতা বাড়ছে মিহির । কাতরাচ্ছে ও । রাফি তবুও ওকে ছাড়ছে না । ডাক্তার মিহির পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন । বাজে ভাবে মচকে গেছে গোড়ালির কাছে । আপাতত হাটা চলা সব বারন । একটু নড়াচড়া হতে না হতেই রি রি করে ব্যাথা জ্বলে উঠছে । কান্না চেপে রাখতে পারছে না মিহি । যতক্ষণ ধরে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে , ততক্ষণ রাফির বুকে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে মেয়েটা । ডান হাত দিয়ে রাফিকে শক্ত করে জড়িয়ে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে । আর বাকি বাম হাত দিয়ে খামছে রেখেছে রাফির এক হাত । ব্যথার সাথে পাল্লা দিয়ে মিহির হাতের খামচি রাফির হাতের উপর তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে । নখ পুরো দেবে গেছে রাফির হাতের , ঠিক কনুইয়ের নিচটায় ।
রাফি নির্বিকার । বরং সে ব্যস্ত মিহি কে সামলাতে । চিন্তিত প্রত্যেকে । ডাক্তার নিজের কাজ সেরে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়লেন । কাল যে এ বাড়িতে বিয়ে , এটা তার অজানা নয় । বিয়ের কনের এই অবস্থা এখন । তিনি শ্বাস ফেলে খানিক দ্বিধার সহিত বললেন…
“ এই মুহূর্তে ওনার হাঁটা চলা তো দূর , নড়া চড়া করাও যাবে না একটুও । পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে অনেক টা গভীর । গোড়ালির হাড় নড়ে গেছে । সিঁড়ি থেকে বেকায়দায় পা ফসকানোর ফলে মচকেছে এই ঢেড়, ভাঙলে আরো বেশি বিপর্যয় হতো । আপাতত ওনার বেড রেস্ট নিতে হবে । চলা ফেরা এঁকে বারেই নিষিদ্ধ । ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি , কাল আবার অয়েনমেন্ট দিয়ে নতুন করে বাঁধতে হবে ।
কথা শেষ করলেন তিনি । মিহি খানিক আলগা হলো রাফির হাত ছেড়ে । ওর চোখের নোনা জলে রাফির বুকের কাছে টি শার্টের অংশ ভিজে একাকার । নাক টানলো মিহি । পা টা ভার ভার লাগছে । ফুলে গেছে অনেকটা ।
মিহি আড়চোখে নিজের পায়ের দিকে তাকায় , অবস্থা বুঝে ঠোঁট উল্টায় সে । সব নিজের ভুল । নিজের বেখেয়ালে পনার জন্যই এমনটা হয়েছে ।
ডাক্তার চলে গেলেন । শান্ত এগিয়ে দিয়ে আসলো তাকে । মিহি রাফি কে ছেড়ে উঠে বসেছে । মাথা নামিয়ে নত করেছে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী দোটানায় পড়লেন । ডাক্তারের বলা কথা গুলো ঘোরপাক খাচ্ছে মাথায় । তিনি ধীরে মিহির পাশে বসলেন । মিহির মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে নমনীয় স্বরে বললেন….
“ মিহি মামনি , খুব বেশি ব্যাথা করছে পায়ে ?
হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকায় মিহি । গলায় কথা আসছে না এখনো । শত চেষ্টা করেও ও কথা বলতে পারছে না জড়তা আর রূদ্ধতায় । রাশেদ রায়হান চৌধুরী মোলায়েম কন্ঠে আবার বললেন…
“ কিচ্ছু হবে না মা । ঠিক হয়ে যাবে । কাল হতে হতে ব্যাথা সেরে যাবে একেবারে । ডোন্ট ওয়ারি…
কথাটা বলেই তিনি চোখ তাক করলেন রাফির দিকে । ঢোক গিলে বললেন সকলের উদ্দেশ্যে….
“ কালকের অনুষ্ঠান টা ডিসপন্ড করা যাক তাহলে ? মিহি মামনির অবস্থা তো দেখছোই । এই অবস্থায় কাল কি করে….
“ না আব্বু , অনুষ্ঠান পেছাবে না । কালই সব হবে । সব যখন ঠিকঠাক , তখন হঠাৎ করে এভাবে ডিসপন্ড করার কোনো মানেই হয় না । সব তৈরি, কালকে যা হওয়ার আর যেভাবে হওয়ার , সেভাবেই হবে ।
আব্বু কে থামিয়ে বলে উঠলো রাফি । কপাল কুঁচকালো সকলে । হেনা বেগম বললেন….
“ মিহির অবস্থা দেখ , ডাক্তার ওকে চলাফেরা করতে বারন করলো , শুনলি না ? কাল কি করে চলবে ও ? তার চেয়ে বরং , দুদিন পর আবার সবটা হোক । মিহির পায়ের অবস্থা ভালো হোক একটু । বিয়ে তো একবারই হবে , জাঁকজমক হচ্ছে সবকিছু । মেয়েটা এমন ভাঙ্গা পা নিয়ে কাল সবটা সামলাবে কি করে ? হাঁটা চলা করবে কি করে ? মানছি তোদের বিয়ে হয়ে গেছে , কিন্তু ও তো সাজগোজ করে নি । ওর কি নিজের বিয়ে নিয়ে কোনো স্বপ্ন নেই ?
“ সবটা হবে ।
আর কালই হবে । এভাবে এই রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে হুটহাট সব বন্ধ করবে কি করে ? মিহির পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে , আদার’স ও সম্পুর্ন ঠিক আছে । আর আমি তো আছিই ।
তোমাদের ভাবতে হবে না । বিয়ে কালই হবে ।
রাফির সোজাসুজি কথায় আর কথা বাড়াতে পারলেন না কেউ । রাশেদ রায়হান চৌধুরী চোখ নামালেন ।
রাফির হাবভাবে ভীষণ অবাক হন তিনি আজকাল । রাফি সবাইকে তাজ্জব বানিয়ে আচমকা মিহি কে আলতো করে কোলে নিলো । সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো…
“ খাবার নিয়ে এসো আম্মু । মিহি উপরেই খাবে….
মূক বনে রইলো সকলে । মুখ চেপে হাসলো কেউ কেউ । হেনা বেগম খানিক হেসে দুদিকে মাথা নাড়ালেন । মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে স্মিথ হাসলেন সাবিনা বেগম ।
এদিকে একের পর এক রাফির এমন লজ্জা হীন দুঃসাহসী কারবার দেখে বারবার চোখ কপালে উঠছে শান্তর । এই ছেলে তো দেখি কাউকেই পরোয়া করছে না । যখন তখন বউয়ের পেছনে ছুটছে , সবার সামনে বউকে জড়িয়ে ধরছে , কোলে তুলছে বারবার । কি শুরু করেছে ও ? শান্তর ও তো দুই দিনের একটা বউ আছে ? কই,ও তো এমন করছে না ।
গলা ঝাড়লো শান্ত । বুখ ফুলিয়ে শিরদাঁড়া টানটান করলো ।
পাশে ইভান দাঁড়িয়ে । শান্ত চাপা স্বরে বললো…
“ বউয়ের দোষে রাফি ভাসে ।
আমার বউয়ের কোনো দোষ নেই , তাই আমি ভাসি না । কিন্তু আমার তো দোষ আছে , তাহলে আমার দোষে আমার বউ ভাসে না ক্যান ভাই ? তোর ফুফুর মেয়ে এতো আনরোমান্টিক ক্যান ইয়াররর ?
দুঃখী শোনালো শান্তর কন্ঠস্বর । ফিক করে হাসলো ইভান ।
এই রাতেই বাড়ির সবাই এখনও তৎপর মিহি কে নিয়ে । ব্যাথার চোটে এতক্ষণ কুকিয়েছে মিহি । হেনা বেগম খাবার উপরে নিয়ে এসেছিলেন । নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছেন মিহি কে । ঔষধ খাইয়েছে রাফি । ছটফট করতে করতে এখন একটু শান্ত হয়েছে মেয়েটা । রাত্রি বারোটা পার হয়েছে অনেক আগেই । এ ঘরে হেনা বেগম আর সাবিনা বেগম ছিলো বিধায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের ঘরে যেতে হয়েছে রাফি কে ।
এদিকে ক্লান্ত সকলে । রুহি আজকেও মিহির কাছে থাকবে । আজ আর শান্ত বাঁধা দেয় নি ওকে । হেনা বেগম নিজের ঘরে গেছেন । সাবিনা বেগম ও টলছেন । যদিও মেয়ের চিন্তায় মাথা ভার । ধরেছে মাথাটা । এখানে এক খাটে মিহির কাছে যেকোনো একজন থাকতে পারবে । আজ বেশি স্পেস লাগবে মিহির । রুহি সাবিনা বেগম কে নিজের ঘরে যেতে বললো অবস্থা বুঝে । ও থাকবে মিহির কাছে । আর এখন মিহিও ঘুমিয়েছে । কোন চিন্তা নেই আর । এখানে বেকার বেকার জেগে থেকে লাভ কি ?:তার উপর কাল বিয়ে , অনেক ধকলের ব্যপার আছে । রুহি অনেক বুঝিয়ে ঠেলে ঠুলে সাবিনা বেগম কে তার নিজের ঘরে পাঠালো । অতঃপর দরজা আটকে নিজে এসে উঠে বসলো মিহির মাথার কাছে । মিহির মাথায় কয়েকবার হাত বুলিয়ে দিলো । নড়ছে না মিহি । রুহি দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । মুচকি হেসে মিহির কপালে একটা চুমু খেলো ।
শরীর খানা বিছানায় এলিয়ে দিতে যাবে , এমন সময় দরজায় আলতো টোকা মারলো কেউ । লাফিয়ে উঠলো রুহি । চমকেছে আচমকা ।
নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত খাট থেকে নেমে দরজার দিকে অগ্রসর হলো রুহি । মনে মনে ভেবেছে হয়তো শান্ত । তবে রুহি বিরক্ত হলো না । বরং মুচকি হাসলো । সন্তর্পণে দরজা খুলতেই ভাবনার মোড় ঘুরলো , শান্ত নয় রাফি ! ভ্যাবাচ্যাকা খেলো রুহি । হাসার চেষ্টা করে বললো…
“ ভাইয়া , তুমি ?
ইতস্তত রাফি । বোনের সামনে কথা বলতে গলায় বাঁধলো প্রথমে । খানিক সময় বাদ জড়তা কাটিয়ে ধীর কোমল কন্ঠে বলল রাফি….
“ তুই ঘরে যা , আমি এখানে মিহির সাথে আছি !
চোখ কপালে তুললো রূহি । মুখ ফাঁক করে বললো সন্দিহান হয়ে….
“ হ্যাঁ ?
“ হুম , ঘরে যা । আমি আছি এখানে ….
ক্ষিন স্বর রাফির । রুহি বুঝলো পরিস্থিতি । অস্বস্তিতে পড়লো ও । চোখ ঘুরিয়ে একবার মিহির পানে তাকালো । আর কথা বাড়ানোর মতো বোধ পেলো না । চোখ নামিয়ে তড়িঘড়ি করে রাফি কে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত কদমে গেস্ট রুমের দিকে এগোলো ঝটপট ।
ও চলে যেতেই হাঁফ ছাড়ল রাফি । আস্তে ধীরে ঘরে ঢুকে দরজা আটকালো । লাইট অফ করে হলদে ডিম লাইট জ্বালালো । হলদে টিমটিমে আলোয় নীরব হয়ে শুয়ে থাকা মিহি কে দূর থেকে পরখ করলো কিছুক্ষণ । অতঃপর এগিয়ে অতি সন্তর্পণে মিহির পায়ের কাছে বসলো । আলগোছে ওর পায়ের ব্যান্ডেজের উপর দুই আঙ্গুল বুলিয়ে দিলো । ঝুঁকে চুমু খেলো পায়ের ব্যান্ডেজের উপর ।
মিহি সজ্ঞানে এখনো । সবটা ঠাহর করতে পারল ও । তবুও চোখ খুললো না । রাফি ঘুরে এসে মিহির পাশে বসলো । আধশোয়া হয়ে ওর মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিলো ।
দীর্ঘ একটা উষ্ণ শ্বাস পড়লো মিহির মুখের উপর । ঠোঁট বাড়িয়ে উষ্ণ পরশ ও স্থায়ী হলো কপালে ।
রাফি শুয়ে মিহি কে টেনে নিলো নিজের কাছে । অতি আলগোছে মিহির মাথা টা তুলে নিজের সুঠাম বুকের মাঝে মেশালো । আগলে নিলো মিহি কে । জড়িয়ে নিলো শক্ত করে । মিহি চোখ বুজেই খানিক হাসে । স্পষ্ট অনুভব করে রাফির হৃৎস্পন্দন । দ্রিম দ্রিম করে হৃদ কোঠরে হৃৎপিন্ড লাফাচ্ছে । হার্ট স্পন্দিত হচ্ছে তীব্র গতিতে ।
মিহি শীতল হাসে । হাত খানা দিয়ে আলতো করে রাফি কে জড়িয়ে ধরে নিজেও । সবে তৃপ্ততায় চোখ বুঝেছিল রাফি , মিহির প্রতিক্রিয়া দেখে চট করে চোখ মেললো ও । তৎক্ষণাৎ মিহির কাঁদো কাঁদো ক্ষিণ স্বর ভেসে আসলো…
“ কাল আমাদের বিয়ে ! আর এখন আমার এই অবস্থা । কি হবে কাল…..
রাফি চকিতে চায় । আলতো মাথা তুলে তাকায় । বলে নির্লিপ্ত স্বরে….
“ ঘুমাও নি ?
“ উঁহু !
“ যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে ?
“ একটু !
“ ডোন্ট ওয়ারি , ঠিক হয়ে যাবে ।
মিহি কে ছাড়লো রাফি । ভেবেছিল ঘুমিয়েছে , তাই একটু আগলে নিয়েছিল ।
এখন ওর অস্বস্তি আন্দাজ করে ছাড়লো । নিজে মাথা এলিয়ে দিলো বালিশে । রাফি বাঁধন আলগা করতেই কপাল গুটায় মিহি । নিজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে….
“ বললেন না তো ?
“ কি ?
“ আমি তো হাঁটতে পারছি না !
“ তো কি হয়েছে ?
“ কালকেও হাঁটতে পারবো না !
“ হাঁটার প্রয়োজন পড়বে না তোমার !
“ তাহলে ?
“ আমি বুঝে নেবো ! আমার বউয়ের এন্ট্রি হবে ইউনিক ভাবে । তাকে কষ্ট করে পায়ে হেঁটে সবার সামনে যেতে হবে না । সে যাবে সবার সামনে , তবে অন্য ভাবে ।
“ কিভাবে ?
“ কাল দেখে নিও !
“ একটা মেয়ের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন থাকে জানেন ? আব্বু তো ঠিকি বলেছিলো , ক’দিন পিছিয়ে নিলে কি এমন হতো ?
রাফি মৃদু হাসে । শ্বাস ফেলে শীতল কন্ঠে বলে…
“ তোমার স্বপ্নের সীমানা যতদূর, আমার চিন্তা ভাবনা তার চেয়েও বেশি দূরে । তোমার বোনা স্বপ্নের সীমান্ত পেরিয়ে গেছে আমার চিন্তা ভাবনা । তোমাকে ভাবতে হবে না । আমি আছি তো , জান ।
মিহি শিহরিত হয়ে ওঠে জান সম্বোধনে । নারী অঙ্গে কাঁটা দেয় । এতক্ষণ খেয়ালের বশে ও কেমন বেশরমের ন্যায় রাফির বুকে নিজেকে সপে দিয়েছে । এখন টনক নড়তেই ইতস্তত হলো মিহি । গুটিয়ে গেলো । কম্পন উঠলো শরীরে । রাফির মতো উত্তাল হলো নিজের হৃৎস্পন্দন ও ।
চোখ বুজলো মিহি । শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে আসলো । এতোটা কাছ থেকে রাফির শরীরের সেই মাদকীয় ঘ্রাণ নাকে বিঁধতেই ছন্নছাড়া হলো মিহি । রাফির টিশার্টের অংশ খামচে ধরলো চোখ খিচে । রাফি ওর শরীরের কম্পন অনুভব করে মৃদু হাসলো নিঃশব্দে । শক্ত করে জড়িয়ে ডাকলো হাস্কি স্বরে….
“ ম্যাডাম ?
আর ইউ ওকে ?
নড়েচড়ে ওঠে মিহি । অস্ফুটে উচ্চারণ করে…
“ চুপ করুন । কথা বলবেন না ।
“ কেনো ?
বাঁধ ভেঙে মাথা তোলে মিহি । রাফির মুখ পানে তাকায় । হলদে আলোয় রাফির ঘোরে মূহ্যমান মুখখানা দেখতে পায় । চোখ সূক্ষ্ম করে মিহি । হাত বাড়িয়ে আচমকা রাফির চোয়ালের পাশে রাখে । খোঁচা খোঁচা দাড়ি তালুতে বিদ্ধ হয় । ঠোঁট পিষে ভ্রু নাচায় রাফি । মিহি খানিক হাসে । আচমকা টুপ করে বিদ্যুতের গতিতে ঠোঁট ছোঁয়ায় রাফির অপর কপোলে !
অতঃপর ঝট করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে । মুখ গুজে নেয় রাফির সুঠাম বুকের মধ্যিখানে ।
হেসে ওঠে ফিক করে ঠোঁট চেপে । রাফি বিমূঢ় বনে যায় । চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে….
“ সিডিইউস করছেন আমায় ?
“ উহুম !
“ মনে নেই , আমাকে কেউ কিছু দিলে আমি তাকে সেটা হাজার গুণ করে ফিরিয়ে দেই । আগের হাজার গুণ বাকি আছে । এখন যোগ হলো আরো হাজার গুণ । হাজারে হাজারে হিসেব ভুল করে কোটি গুণ ফিরিয়ে দেবো । মনে থাকে যেনো ।
ফিসফিসিয়ে বললো রাফি । মিহি মিইয়ে যায় ।
সকালে বিয়ের আয়োজন । মিহির অবস্থা বেগতিক । পায়ের ব্যথা শেষ রাত থেকে বেড়েছে ।
একে বারেই পা নাড়ানো দায় । এদিকে সব দিক থেকেই ভরপুর হয়ে উঠছে বিয়ে বাড়ি । সমাগম বাড়ছে একে একে । দুপুরের পর পার্লার থেকে লোক এসেছে । মিহি তখনো সেই একই অবস্থায় পড়ে আছে খাটে ।
সাজানো হবে ওকে । ডক্টর এসেছিলেন একই সাথে । ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করে পুনরায় শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে পা খানা ।
এক দেখায় পর্ব ৬৬
একেবারে টনটনে হয়ে গেছে মিহির পা ।
ওভাবেই সাজানো হয়েছে ওকে । নিজে তো নড়তে পারছে না । শুধু শুধু পাথরের মূর্তির ন্যায় বসে আছে ও ।
সন্ধা গড়াতে সময় লাগলো না । ঝিকঝিকে আলোয় জ্বলে উঠলো পুরো বাড়ি ।
