Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৬৮

এক দেখায় পর্ব ৬৮

এক দেখায় পর্ব ৬৮
সুরভী আক্তার

মিহি আর এক ফোটাও কাঁদে নি ।
রুজান রাফি চৌধুরী, সংগীত শিল্পী রুজান রাফি চৌধুরীর বিয়ে নিয়ে তোলপাড় স্যোশাল মিডিয়া । বিশেষত বিয়েতে রাফির এন্ট্রি , সেটা প্রভাব ফেলেছে সবার মাঝে ।
বিয়ের সব জটিলতা পেরোতে পেরোতে রাত এগারোটার কোঠায় ঘড়ির কাঁটা । বিয়ে বাড়ির গিজগিজ কমে এসেছে । ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ব্যাতীত বাইরের মেহমানরা বিদায় নিয়েছেন সকলে । মিহির পায়ে টান ধরেছে , অনেকক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে ছিল ও ‌। রাফি ওকে কোলে করে ড্রইং রুম পর্যন্ত আসতে পেরেছিল । একেবারে ঘরে উঠতে পারে নি । এর আগেই বাঁধা দেওয়া হয়েছে । ড্রইং রুমেই আটকে ফেলা হয়েছে ওকে । এরপর শান্ত মিহি কে কেড়ে পাঁজাকোলা করে পৌঁছে দিয়েছে ঘরে । রুজান রাফি চৌধুরীর ঘরে । কেমন বড় ভাই শান্ত !

রাফি কিছু বলতেও পারে নি বড়দের সামনে । সব ধকল কাটিয়ে ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে বসেছেন বাড়ির বড়রা । হেনা বেগম, হালিমা বেগম সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসলেন । রাফিও যোগ দিয়েছে সকলের সাথে । খচখচ করছে ও । এখানে থেকে কি করবে ? সবার মাঝে এই মুহূর্তে কেমন অস্বস্তি লাগছে । অস্থিরতা বোধ হচ্ছে । শান্ত টাও ওকে একা ফেলে চলে গেছে উপরে । সেই যে মিহি কে নিয়ে উপরে উঠলো ওকে ফেলে , আর ফেরে নি । মেহজাবিন , রুহি , ওরাও উপরে মিহির সাথে । কি করছে কে জানে ? রাফি এখানে একা একা বসে আছে বড়দের সাথে । বড়রা বিয়ের আয়োজন এটা ওটা নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা করছেন নিজেদের মাঝে । রাফি কোনঠাসা হয়ে বসে আছে গুটিয়ে । না বসে থাকতে পারছে স্থির মতো , আর না সবার সামনে দিয়ে উঠে যেতে পারছে । বারবার অস্থির হয়ে তাকাচ্ছে উপরের দিকে । হেনা বেগম ছেলের জন্য এক কাপ কফি করে এগোলেন ছেলের দিকে । কফির মগটা বাড়িয়ে দিয়ে গলা ঝেড়ে বললেন….

” নে …
রাফি সচকিতে চায় । মগটা হাতে নিয়ে হাসার চেষ্টা করে । নিজের স্বাভাবিকতা বোঝাতে দ্রুত চুমক দেয় মগে । বলে নির্লিপ্ত স্বরে…
” থ্যাঙ্ক ইউ আম্মু !
এতক্ষণে ছেলের মুখে কথা শুনে রাশেদ রায়হান চৌধুরী ছেলের পানে ফিরে চাইলেন । এমন ভাব ধরলেন , যেন এতক্ষন লক্ষ্য করেন নি ছেলেকে…
চমকিত স্বরে বললেন তিনি….
” রাফি , তুমি এখানে কি করছো ? উপরে যাও নি ? সবাই তো উপরে….
মূর্ত বনলো রাফি । এতক্ষণ ধরে এখানে অনাথের মতো বসে আছে , আর ইনি এখন এসে এসব বলছেন ? এতক্ষণে ঘন্টা পেরোতে চললো , অবশেষে চোখে পড়লো ছেলেকে ? রাফি মিনমিন করলো…

” না, মানে….
” এখানে বড়দের মাঝে থাকতে হবে না তোমায় । বিয়ে করেছো বলে বড় হয়ে যাও নি । যাও উপরে ….
তব্দা খায় রাফি । এখান থেকে সরতে পারলেই সে নিজেও বাঁচে । কেমন জড়তা আসছে এখানে । কফির মগটা সমেত উঠে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো রাফি । দুই সিঁড়ি উঠে পিছু ফিরলো । সবাই জ্বলজ্বল চোখে ঠোঁট চেপে ওর দিকেই তাকিয়ে । রাফি সোজাসুজি রাশেদ রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকালো । ওষ্ঠপূট প্রসারিত করে মৃদু স্বরে বলল….
” থ্যাঙ্ক ইউ আব্বু ….
বলেই বড় বড় ধাপে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠলো রাফি ।
রাফির ঘরে আসর বসেছে । এতক্ষণ ধরে অপেক্ষার পরও রাফির পাত্তা ছিলো না । মিহি ফ্রেশ হয়েছে রুহি আর মেহজাবিনের সহায়তায় ‌। মেকআপ রিমুভ করেছে । রুহি তারপরও আলতো করে একটু আধটু সাজিয়ে দিয়েছে ওকে । মুখে ময়স্টারাইজার লাগিয়ে চোখে মোটা করে কাজল টেনে দিয়েছে । ঠোঁটে হালকা ঠোঁট রঞ্জন লাগিয়েছে ‌। বিয়ের সাজের খোপাটা খুলে ছাড়িয়ে দিয়েছে চুল । বিয়ের ভারি কাজের ওরনাটা ঘোমটার ন্যায় মাথায় টেনে দিয়েছে ।

মিহি কে বসিয়েছে খাটের মাঝ বরাবর । রুহি কিছুক্ষণ টিটকারী মেরে মেরে জ্বালিয়েছে ওকে । মেহজাবিন বড় , ও এসবে নেই । তার উপর মাহিমের চিন্তায় দিশেহারা ও । মাহিম এই রাতেই বাড়ি ফিরেছে । থাকে নি এ বাড়িতে । ছুটি থাকা সত্ত্বেও অফিসের আর্জেন্ট মিটিংয়ে কাল এটেন্ড করতে হবে ওকে । এ বাড়ি থেকে অফিস দূর হবে । তাই নিজের বাড়িতে একলা ফিরতে হয়েছে ওকে ।
রুহি , বর্ষা , মেহজাবিন মিহির সাথেই ছিলো । অবশেষে ওদের মাঝে হামলে পড়লো শান্ত আর ইভান । এরা দুটো ফ্রেশ হতে গেছিলো মিহি কে রেখে । ফ্রেশ হয়ে ডিরেক্ট এ ঘরে হামলে পড়েছে । রাফির খোঁজ নেই ওদের কাছে । খোঁজ নেওয়ার ধান্দাও নেই । রাফির পুরো ঘর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে । সজ্জিত খাটের ঠিক মাঝখানটায় মিহি বসে । আর ওকে ঘিরে বসে ছিলো রুহি, মেহজাবিন আর বর্ষা । শান্ত এসেই প্রস্তাব ছুড়লো…
” চলো লুডু খেলি ।
ব্যাসস , এটাই যথেষ্ট ছিলো । এক ফোনে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ছয়জন । সব ছেড়ে ছুড়ে লুডু খেলতে বসলো ওরা । মিহির লাজ লজ্জা নেই । সব গিলে খেলো এক মুহুর্তে । ও যে নিজের বাসর ঘরে বসে আছে , তা খেয়ালে আছে কার ? শান্ত, ইভান,রুহি, মেহজাবিন আর বর্ষার সাথে এক ফোনে লুডু খেলতে বসলো ও নিজেও । কি আর করবে ? রাফি তো আসছে না । ওর অপেক্ষায় প্রহর গুনবে আর কতক্ষন ? বরের পাত্তা নেই । নতুন বউ বসে পড়লো লুডো খেলতে ।

মেহজাবিন এসবে একবার বারন করেছে । শুনলো না কেউ….
ওরা মত্ত লুডু খেলতে । রাফির খোঁজ নেওয়ার ও ফুরসৎ বা খেয়াল আসলো না কারোর মাথায় ।
তাইতো এতক্ষণ ধরে নিচে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছিলো রাফি । ও কোথায় আশায় ছিল , কেউ ওকে ডাকতে আসবে সাধ করে , তা না । শেষে ওকে নিজে থেকেই উঠে আসতে হলো ।
করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো রাফি । হাতে এখনো কফির মগ । এটার আর কি প্রয়োজন ? রাফি মুখ ভেংচি কেটে কফির মগটা করিডোরের একটা শেলফের উপর রাখলো । উৎফুল্ল চিত্তে নিজের ঘরের দিকে এগোলো ও । রুহির ঘরটা পেরোনোর সময় খটকা লাগলো একটু । এই উচ্চিংড়ে গুলো কোথায় ? কারোর কোনো সাড়া শব্দ , দেখা নেই কেনো ? কোথায় পান্ডবের দল ? সবকটা একসাথে উবে গেল ?
রাফি পরোয়া করলো না । নিজের ঘরের পথে কদম এগোতেই হাঁসফাঁস লাগছে । দরজা চাপানো । দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে সশব্দে চিৎকার ভেসে আসলো শান্তর কন্ঠে….

” এএএ ছক্কা….
চমকালো রাফি । হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল দরজার দিকে । আকস্মিক চিৎকারে ঝট করে ঘাবড়ে গিয়ে হাত সরিয়ে নিলো । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো নিজে । ভেতর থেকে হুটোপাটি ভেসে আসছে । সবার কন্ঠ একসাথে । কপাল গুটায় রাফি । দ্রুত হাত বাড়িয়ে চাপানো দরজা ঠেলে খুলতেই চোখ কপালে ওঠে ওর । খাটের উপর গোল হয়ে বসে আছে চার রমনী আর দুই যুবক । ছয়টা মাথা একসাথে ।
শান্ত লাফিয়ে উঠলো ওর তাকানোর মাঝেই । রুহির গুটি কাঁটা পড়েছে । মিনতি করলো রুহি…
” এই , আমি না আপনার বউ হই । আমার গুটি কাটবেন না প্লিজ ..নয়তো ভালো হবে না বলে দিলাম ।
শান্ত শুনলে তবে তো ? খচাৎ করে গুটিটা কাটলো ও । কেটেই লাফাচ্ছে রুহিকে খুঁচিয়ে । রুহি মুখ শুকিয়ে ফ্যাচ ফ্যাচ করলো । সজোরে চিমটি কাটল শান্তর বাহুতে । বাকিরা হাসছে । গভীর মনযোগ দিয়ে নিজেদের চালে ব্যাস্ত ওরা । রাফি আহম্মক বনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল । ও যে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছে, কারোর খেয়াল আছে ? কেউ তো উপস্থিতি বুঝে ফিরেও চাইছে না ওর দিকে । পাঁচ টাকে টপকে রাফি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো মিহির দিকে । চিকচিকে মুখে চোখ সরু করে সবার মাঝে বালিশের উপর রাখা ফোনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে মিহি । ওর চাল আসতেই তড়িঘড়ি করে হাত চালালো ও । পা ভেঙেছে সেটাও ভুলতে বসেছে বেমালুম । ব্যাথাও অনুভুত হচ্ছে না এখন । রাফির দৃষ্টি থমকালো কয়েক মুহূর্ত । তবে থমকানো দৃষ্টি দেখার জন্য কেউ রইলো না । রাফি চেয়েই রইলো তার ব্লোসোমের পানে । সদ্য বিয়ে করা বউয়ের পানে । যার বউ রুপ ভিন্ন এখন । সাজ প্রসাধনী হীন সুচিশুভ্র,কোমল সৌন্দর্যের পানে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো রাফি ।

কারোর প্রতিক্রিয়া না দেখে খানিক বাদ নিজে থেকেই দৃষ্টি সংযত করলো । চোখ নামিয়ে ঢোক গিললো । পরমুহূর্তে মুখ শক্ত করলো । এগুলো সব কটা কি করছে এখানে ? ও এতক্ষণ চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হচ্ছিল , আর এগুলো সব ওকে ভুলে লুডুর আসরে মেতেছে এখানে । এটা রাফির বাসর ঘর , নাকি আড্ডা খানা ?
কটমটিয়ে এগিয়ে আসলো রাফি । বিছানার পাশে দাঁড়ালো । তবুও কারোর নড়চড় নেই । সবাই মজেছে পুরো । ইভানের গুটি কাঁটা পড়ার পথে বর্ষার গুটি দ্বারা । ইভান মুখ কাচুমাচু করে কাকুতি করলো….
” এএএ বইন , একটা মাত্র গুটি আমার । এইটারে খাইস না বইন । খাইলে তোর পেট খারাপ হবে । একটাই সন্তান জন্ম দিছি কেবল , বাকি গুলো এখনও মায়ের গর্ভে । একটু মায়া কর । এই একমাত্র সন্তান টারে মারিস না বইন । নাইলে আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো ।
বলতে বলতে বাঁধ সইলো না । ক্যাচ করে বর্ষার গুটি চাললো শান্ত । ইভানের গুটি কাঁটা পড়ে ফুসসস করে ঘুরে গিয়ে মায়ের গর্ভে পতিত হলো আবার ।
ক্ষুব্ধ হয়ে শান্তর দিকে তাকালো ইভান । বর্ষা মায়া দেখিয়ে চালতো না গুটিটা । শান্ত মাঝে বাঁ হাত ঢোকালো কেনো ? ইভান দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো….

” শালা , তুই আমার গুটিরে মারলি ক্যান ?
” তোর গুটি মারা পড়ছে , কোনো চিটিং বাজি হবে না এখানে । একটু আগে দেখলি তো আমি আমার বউকে খেলাম , মায়া দেখিয়েছি আমি । চুপচাপ খেল হতভাগা….
শান্তর কথা শেষ হতেই রাশভারী কন্ঠের ধমক ভেসে আসলো রাফির পুরু গলা ভেদে….
” এখানে কি হচ্ছে টা কি ?
অমনি ধক্ করে উঠলো সকলে ।
তড়িতে ছয় জোড়া দৃষ্টি পাশ ফিরে চাইলো একই দিকে । চোয়াল শক্ত করে শিরদাঁড়া সোজা করে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাফি । ওর রগরগে দৃষ্টি শান্তর দিকে । রাফি কে আচমকা দেখে থতমত খেলো মিহি । মেহজাবিন সহসা বলে উঠলো বোকার ন্যায়…
” ভাইয়া তুমি ? তুমি এখানে কি করছো ?
রাফি চোখ মাত্রাধিক সরু করে । বেফাঁস বেরিয়েছে মুখ থেকে এটা বুঝতেই পরমুহূর্তে মেহজাবিন জিভে কামড় বসিয়ে নিজেকে শুধরে বললো মিনমিন করে….

” না মানে ? ভাইয়া তুমি কখন এসেছো ?
শান্ত পাত্তা দিলো না । খেলায় টানটান উত্তেজনা এখন । ওর তিনটে গুটি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে । বাকিদের দুটো নয়তো একটা করে । ছয়জন এক ফোনে খেলছে । হিজিবিজি লাগছে , তবুও বেশ জমেছে খেলাটা । রাফি কে উপেক্ষা করে সকলের মনযোগ খেলায় ফেরাতে শান্ত বললো….
” এক্সকিউজ মি গাইস…
খেলায় এটেনশন দাও সবাই । পরী , এবার তোর চাল পড়েছে । জলদি চাল….
রাফি হতবাক হলো ।
মেহজাবিন পরিস্থিতি বুঝলো এতক্ষণে । ফোনের দিকে তাকাতেই সময় নজরে আসলো , বারোটা বাজতে চলেছে । রাত হয়েছে অনেক । সময় খেয়ালই ছিল না এতক্ষণ । বাঁধা দিলো মেহজাবিন…..
” ভাইয়া , আজ থাক । কাল‌ আবার খেলবো ।
অনেক রাত হয়েছে এখন ? চলো যে যার ঘরে যাই !

” কিছুতেই না । এই খেলা শেষ হবে , তারপর ঘরে যাবো । এখন আমি জিতে যাচ্ছি বলে বাহানা দিচ্ছিস তোরা ? খেলবি , তারপর এখান থেকে উঠবি । এই পরী , বসে আছিস কেনো ? শুরু কর…
মিহি থম মেরে বসে রয় । রাফি ফোনের স্ক্রিনে তাকালো । ছয়জনের লুডু । কেবল শুরু হয়েছে । চোখ বড় বড় হয়ে আসলো ওর । এই খেলা শেষ হবে কখন । শেষ হতেই তো রাত কাবার হবে । রাফি পুরু কন্ঠে বললো….
” এই খেলা আজ শেষ হবে তোদের ? উঠবি এখান থেকে ? যাবি তোরা ? এটা আমার বাসর ঘর নাকি অন্য কিছু ? লজ্জা নেই , এখানে কোন আঙ্কেলে বসে আছিস ? মিহি না তোর ছোট বোন । আবার ফোন খুলে দলবল নিয়ে লুডু পেতে বসেছিস ? যাবি এখান থেকে ?
” এহহহ্ , যাবো না । খেলা শেষ হবে তারপর যাবো । নয়তো যাচ্ছি । তোর বাসর ঘরে তুই থাক । এই পরী চল , আমার ঘর আছে এ বাড়িতে একটা । সেই ঘরে গিয়ে সবাই লুডু খেলবো !
রাফি কে খোঁচাতে উঠে পড়ে লেগেছে শান্ত । ঠোঁট চেপে কথা গুলো বললো ও । রুহি মুখ খিচে ঝাড়ি মারলো….
” চুপ করবেন ? চলুন ঘর থেকে….

” এইই জান । হেরো হয়ে যাচ্ছো বলে খেলা ভাঙ্গতে চাইছো এখন ? খেলা শেষ হবে তারপর বাকি সব ‌। তাই না পরী ?
মিহি বোকার মতো মাথা নাড়ালো শান্তর সাথে তাল মিলিয়ে । ওর বোকামো দেখে ফিক করে হাসলো শান্ত । রাফির দিকে তাকালো পরমুহূর্তেই । রাফি বুকে হাত গুটিয়ে চক্ষু শীতল করে তাকিয়ে আছে মিহির দিকে ।
মেহজাবিন আর পারলো না এখানে বসে থাকতে । বর্ষা কে সাথে করে মানে মানে কেটে পড়লো ও । রুহিও মুখ ভেংচি কেটে বিছানা থেকে নামতে নামতে মুখে হাসি ফোটালো । হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভাইয়ার পানে তাকিয়ে আবদার করলো হাত বাড়িয়ে…..
” টাকা দাও । ঘর সাজিয়েছি আমরা !
পরিস্থিতি হাতে ছিলো না বলে ঘরে ঢুকে পড়েছো । নয়তো টাকা না দিলে ঢুকতে দিতাম না । এখন টাকা দাও ভালোয় ভালোয়….
রাফি মৃদু হাসে । বলে….

” কত টাকা চাই ?
” উমমম , বেশি না । মাত্র এক লাখ…..
” এক লাখ ! তাও আবার মাত্র…..?
আমার ঘরে আসার জন্য আমাকেই টাকা দিতে হবে ?
” হুম হবে । ঘরের সাথে সাথে তোমার বউটা কেও সাজিয়েছি , সেটা কে দেখবে ? দিয়ে দাও ঝটপট ।
রাফি কথা বাড়ালো না । পিছিয়ে আলমারি খুলে চেকবুক বের করলো । সাইন করে এমাউন্টের জায়গা ফাঁকা রাখলো । চেক কেটে রুহির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো…..
” এই নে , আমার সবটাই তো তোর !
থ্যাঙ্ক ইউ আমার ঘর আর নিজের ভাবি জান কে সাজানোর জন্য । এখানে ইচ্ছে মতো এমাউন্ট বসিয়ে নিস… । বাকিটা তোর ইচ্ছে…
খুশিতে গদগদ হয়ে উঠলো রুহি । উৎফুল্ল চিত্তে বললো…
” থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া…
বলেই শান্ত কে চোখ পাকিয়ে ছুটে বেরোলো ঘর থেকে । শান্ত তাকিয়ে রইল ফ্যাল ফ্যাল করে । ইভান ও কেটে পড়েছে কখন জানি । ও এখন একলা এই জোড়া দম্পতির মাঝে । ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শান্ত । লজ্জা লজ্জা ভাব টানলো মুখে । মুখ নামিয়ে নিজেও জায়গা ছাড়লো । চটপট পা বাড়াতে বাড়াতে বললো….

” বেস্ট অফ লাক শালা বাবু….।
হ্যাভ এ সুইট নাইট , আই মিন ড্রিম ।
বলেই বেরোলো ও । রাফি তপ্ত শ্বাস ফেললো ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে । দরজা থেকে বাইরে বেরিয়ে রাফির দিকে ফিরে তাকিয়ে চোখ মারল শান্ত । অতঃপর নিজেই দরজা চাপিয়ে দিলো ‌।
রাফি মিহির দিকে তাকালো না । গিয়ে দরজাটা আটকে আসলো । মিহি হাঁটু জড়িয়ে মাথা নামিয়ে নিয়েছে ।
রাফি পিছু ফিরতেই বাঁকা দৃষ্টিও তড়িতে নামিয়ে নিলো নিচুতে । ওষ্ঠ পিষে হাসে রাফি ।
ধীরে ধীরে এগিয়ে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । ফুলের গন্ধে সুবাসিত ঘর । রাফি চোখ বুজে সুবাসের মিষ্টতা টেনে নিলো নাসারন্ধ্রে ‌।
চিবুক গলায় ঠেকানো মিহির পানে দৃষ্টি রাখলো । গলা খাঁকারি দিলো এক মুহুর্ত পর । মিহি পিটপিট করে চোখ তুলে চায় , অমনি চোখাচোখি হতেই ভ্রু নাচায় রাফি ।
সম্মুখ পানে অগ্রসর হয় । ধীরে বসে মিহির সম্মুখে ।
মিহির লালিত মুখখানা দেখে চক্ষু শীতল হয়ে আসে ওর । মৃদু হাসে রাফি । ডাকে আবেশিত হীম কন্ঠে…

” ম্যাডাম ?
চোখ চুরিয়ে নেয় মিহি । রাফি হেসে বলে সাজানো খাট টাতে চোখ বুলিয়ে…..
” নিয়ে কিন্তু এসেছি ম্যাডাম । ডিরেক্ট বাসর ঘরে ।
মিহির মুখ খানি রাঙিয়ে উঠলো লাজুক লাল আভায় ।
রাফি ওর হাত দুটো টেনে ধরে আলতো করে । মেয়েলি নরম হাত দুটো নিজের পুরুষালি হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে । ধীরে চুমু খায় হাতের পিঠে ।
তৃপ্ত হয়ে আসে শ্বাস । মিহির ডাগর চোখের সাথে দৃষ্টির মিলনে কিছুটা মুহুর্ত পার করলো রাফি ।
মচকে যাওয়া পায়ের ব্যান্ডেজের দিকে তাকালো এক ঝলক । মিহির দূরু দূরু অবস্থা । উত্তাল বুকে হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে । খচখচ করছে ও । শুষ্ক ঢোক গিলছে বারংবার । রাফি ওর বেসামাল অবস্থা বুঝলো । পরিস্থিতি সাপেক্ষে এটা হওয়া স্বাভাবিক । ঠোঁট কামড়ে হাসলো রাফি । আকস্মিক চমকে দিয়ে বললো ঝট করে….

” চলো লুডো খেলি ।
তড়িতে ছলকে চায় মিহি । রাফি এক সেকেন্ড থেমে আবার বলল….
” না মানে , তোমার যা অবস্থা , এতে অন্য কিছু করার চেয়ে লুডো খেলাটাই বেটার হবে ‌। রাতটা তো শেষ করতে হবে নাকি ? রোজ তো ঘুমাই , আজ না হয় লুডো খেলে রাত কাবার করবো দু’জনে । নতুন বউয়ের সাথে বাসর ঘরে লুডো খেলাটা মন্দ হয় না । আমরা না হয় ইউনিক ভাবে বাসর রাত সেলিব্রেট করবো ? লেটস গো….
ওষ্ঠ পিষে ফিচেল স্বর রাফির । মিহি গোল গোল চোখে তাজ্জব বনে চেয়ে রইলো । একটু লাজুক আভা ফুঠেছিলো চেহারায় । ফুসস করে নিভে গেলো তা । রাফির চেহারা দেখে ভেবেছিল হয়তো বেফাঁস কিছু বলবে । ইদানিং যা ঠোঁট কাটা হয়েছে রাফি । কিন্তু না , ওর ভাবনায় জল ঢাললো রাফি । মিহি কে ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে বললো আবার….
” হোয়াট ? দেখছো টা কি ? অফার পছন্দ হয় নি ?
ভ্যাবাচ্যাকা খায় মিহি । বাক রুদ্ধ হয়ে আসে । কি বলছে এই লোক । আর ওই বা কি উত্তর করবে এর ?
একই দৃষ্টিতে বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মেয়েটা । রাফি হেসে ফেললো । হাসি সংবরন করলো পরমুহূর্তেই…
ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো…..

” এভাবে দেখবেন না ম্যাডাম !
আমি কিন্তু কন্ট্রোলে আছি । কন্ট্রোললেস হয়ে গেলে পার পাবেন না । চাইছি আপনাকে ছাড় দিতে । অনেক তো অপেক্ষা করেছি , আর একটু না হয় করলাম । আপনাকে ট্রাবেল সিচুয়েশনে ফেলতে চাই না নিজের সুখের জন্য ।
মাথা একটু পিছিয়ে নেয় রাফি । অতিব সন্নিকট থেকে মিহির চোখে চোখ রাখে । একই হাস্কি স্বরে বলে….
” তবে….
যদি চান,, তাহলে….
কথা সম্পুর্ন হওয়ার আগেই রাফির বুকে আলতো ধাক্কা মেরে নিজের সন্নিকট থেকে রাফি কে ঠেলে দূরে সরালো মিহি । অমায়িক লজ্জায় কান গরম হয়ে আসছে । চোখ খিচে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে মুখ লুকালো মিহি । শরীর দুলিয়ে মৃদু হাসে রাফি ।
ও মিহিকে অস্বস্তিকর কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় ওর অবস্থার জন্য । হাত বাড়িয়ে মিহির মুখ উঁচায় রাফি । মিহি তাকাতে পারে না । নিভু চোখ বুজে নেয় । হীম শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করে রাফি…

” লজ্জা পাচ্ছো ?
” ধ্যাত , সরুন তো !
আমার গিফট কোথায় ?
কথা ঘোরাতে পাল্টা প্রশ্ন করলো মিহি । রাফি যেনো অবাক হলো । গা ছাড়া ভাবে বললো….
” কিসের গিফট ?
” বাসর রাতে বউকে গিফট দিতে হয় , জানেন না ?
” কই , জানতাম না তো ?
গিফট দিতে হয় বুঝি ? জানা ছিলো না । আমি তো আগে কখনো বাসর করি নি , তাই এক্সপেরিয়েন্স নেই এই নিয়ে ।
মিহি মুখ মলিন করে কাঁচুমাচু মুখে তাকালো । রাফি ঠাট্টা করছে বুঝতে বাকি নেই । রাফি মৃদু হাসলো । টেনে ধরলো মিহির হাত । আবার চুমু খেলো হাতের উল্টো পিঠে । অধীক ঝুঁকে মিহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠোঁটের কোণে ভিজে ঠোঁট ছোঁয়ালো । সম্পুর্ন শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো মিহির । রাফি কিছুটা মুহুর্ত নরম পরশটুকু স্থায়ী করলো ‌। ধীরে সরে আসলো । বললো…..
” যেদিন তুমি পুরোপুরি আমার হবে । সেদিনই আমার থেকে সর্বোৎকৃষ্ট উপহার টা পাবে । সেদিন আমার উপহার হিসেবে থাকবে তুমি । আর তোমার উপহার হিসেবে থাকবে বিশেষ কিছু । আমি যেমন প্রতিক্ষায় আছি, তুমিও থাকো একটু অপেক্ষায় ।
সরে আসলো রাফি ।
মিহি বিরল নেত্রে চেয়ে রইল ।

এক দেখায় পর্ব ৬৭ (২)

রয়ে সয়ে রাফির ওকে জড়িয়ে নিলো । রাত্রি একটা পেরিয়েছে । রাফি ওর ছিমছাম শরীরটা আগের রাতের ন্যায় আলগোছে জড়িয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে । চোখে ঘুম নেই । বুকে উদগ্রীবতা ।
চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে মিহিও । সে নিঃশব্দে রাফির বুকের বাম পাশে কান পেতে অনুভব করছে জোরালো হৃৎস্পন্দন । রাফি ওকে সজাগ দেখে মাথায় ওষ্ঠ ছুঁইয়ে ভালো করে জড়ালো । পুরোপুরি মিশিয়ে নিলো বুকের মধ্যিখানে । সংস্পর্শের তৃপ্ততায় দুচোখ বুজে আসলো । চোখ বুজে আওড়ালো রাফি..
” ঘুমাও ।

এক দেখায় পর্ব ৬৯