Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (২)
অরাত্রিকা রহমান

-“কিরে মাহির, রায়ান আর রুদ্র কি আদোতেও বর পক্ষের লোক নাকি? ছেলে গুলো এখনো কেন আসছে না?”
সীমা খান ব্যস্ত পরিবেশে মাহির কে প্রশ্ন করলেন। মাহির নিজের ফোন স্ক্রিনে নজর রেখে জবাব দিল-
“আম্মু প্লিজ, এখন আমাকে প্যারা দিও না। ওরা চলে আসবে। আমি বুঝতেছি না ওই বাঁদর দুটোর জন্য আমার থেকে তুমি এতো এক্সাইটেড কেন?”
সীমা খান বিরক্ত হয়ে খটমট করে হেঁটে স্বামী মাহিদ খানের সামনে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন-
“শুনলেন কি বললো আপনার ছেলে? আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে আজ। আর ও আমাকে প্রশ্ন করছে আমি এক্সাইটেড কেন? আমার কি শোক পালন করা উচিত?”

মাহির তৎক্ষণাৎ ফোন স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য কণ্ঠের বলল-
“আরে আমি কখন শোক পালন করতে বললাম? এমনি তেই টেনশনে কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে আমার, খোদা জানে কেন। আব্বু প্লিজ আম্মু কে চিল করতে বলো না। তুমি অন্তত আমাকে বুঝার চেষ্টা করো।”
মাহিদ খান বেচারা বরাবরই পত্নী নিষ্ঠো ভদ্রলোক তবে ছেলের দিকটাও বুঝতে পারছেন। যে ছেলে বিয়ের কথা উঠলেই পালাই পালাই করতো আজ তার বিয়ে তাও আবার প্রেমের বিয়ে- কলিজা শুকিয়ে আসারই বিষয় ছেলেটার জন্য। মাহিদ খান এবারের মতো তার স্ত্রী কেই বুঝিয়ে বললেন-
“ছেলে ভুল কি বলেছে? তুমি নিজের প্রেসার হাই করছো কেন টেনশন করে। রায়ান রুদ্র এই এলো বলে।”
-“চলে এসেছিইইই…!”

রুদ্র মেইন গেট থেকে চিৎকার করে দৌড়ে মাহিরের দিকে এলো। মাহির স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে উঠে দাড়াতেই রুদ্র এক লাফে মাহিরের কোলে চোরে গেল ছেলেটার গলা জড়িয়ে। রায়ান পিছন থেকে স্বাভাবিক হেঁটে এসে রুদ্রর পাঞ্জাবির কলার টেনে তাকে মাহিরের থেকে আলাদা করে বলল-
“বেশি উত্তেজনা ভালো না। সামলে যা। আশেপাশে মানুষ আছে।”
রুদ্র নিজের হঠকারিতা বুঝে নিজের পাঞ্জাবি ঝেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়ানের মুখোমুখি হয়ে অশান্ত গলায় বলল-
“অবশেষে এলি তোরা। আমার যে কি পরিমান নার্ভাস লাগছে সকাল থেকে বলে বোঝাতে পারবো না।”
রায়ান কুটিল হেঁসে সাইড থেকে মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বিশ্বস্ত আশ্বাস দিয়ে বলল-
“আরে বেট্টা, কিসের নার্ভাস? ইউর ভাই ইজ হিয়ার নো নিড টু ফিয়ার।”
মাহির জোরপূর্বক বানোয়াট হেঁসে দ্বিধান্বিত আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-“তাই নাকি?”

-“অফ কোর্স.. চল এবার তোর সাথে এক পাক্ষিক হলুদ দিয়ে হলি খেলবো।”
মাহির তৎক্ষণাৎ রায়ানের দিকে থেকে সটকে গিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল-
“আমার গায়ে হলুদ তোদের ছাড়াও হয়ে যাবে। তোরা ঘরে গিয়ে রেস্ট কর।”
সীমা খান তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে রায়ান কে আদেশ মূলক কন্ঠে বললেন-
“রায়ান..তোরা ওকে পাঁজাকোলা করে হলুদের স্টেজে নিয়ে আয় তো সবাই বসে আছে হলুদ লাগাবে বলে। বেলা চলে যাচ্ছে তো। বিকালে গায়ে হলুদ হবে নাকি!”
রায়ান শয়তানি হাঁসি দিয়ে ভদ্র ছেলের মতো সহমত প্রকাশ করলো-
“হ্যাঁ হ্যাঁ আন্টি, তুমি গিয়ে এক বালতি হলুদ রেডি করো‌। গায়ে হলুদ কাকে বলে আজ সবাইকে দেখিয়ে দেব একবারে।”

মাহির কিছু বলা বা করার আগেই রায়ান আর রুদ্র মিলে মাহিরকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল স্টেজের উপর। এরপর বোধহয় এক ঐতিহাসিক হলুদ অনুষ্ঠানের শুরু হলো। সবাই এলোপাথাড়িভাবে নিজেদের হাতের মুঠোয় হলুদ নিয়ে মাহিরের গায়ে মেখে দিতে শুরু করলো। সকলের মাঝে অসহায়ের মতো বসে আছে বেচারা মাহির। ছেলেটাকে রীতিমতো গোসল করানো হয়েছে হলুদ দিয়ে। মন ভরে হলুদ লাগানো শেষ হলে সীমা খান ছেলেকে দেখে তৃপ্তি নিয়ে বললেন-
“ব্যাস, মিশন কমপ্লিট। এবার ছেলে আমার রাতের বেলায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো গ্লো করবে।”
মাহির মায়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল-
“হয়েছে এবার? খুশি? এবার আমাকে ছাড়ো। আর এই অত্যচার নিতে পারছি না আমি।”
-“আচ্ছা আচ্ছা যা। গোসল করে নে গিয়ে।”
তখনি রায়ান মা ছেলের মাঝে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল-
“আরে এখনি কিসের গোসল। আন্টি..! কি বলছো তুমি? আসল জায়গায়ই তো হলুদ লাগানো হলো না। ওটা গ্লো না করলে আমার শালির সাথে নাইনসাফি হয়ে যাবে।”
মাহির অবাক হয়ে রায়ানের দিকে চাইলো। সীমা খান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন-
“কোন আসল জায়গা?”

রায়ান মাহিরের দিকে তাকিয়ে কুটিল হেঁসে মাহিরের কোমরের নিচের অংশে লক্ষ্য করে বলল-
“The star of the night…it should glow brighter..”
মাহির রায়ানের দৃষ্টি অনুসরণ করে রায়ানের উদ্দেশ্যে বুঝে বড় বড় নেত্র নিক্ষেপ করলো রায়ানের দিকে। রায়ান মাহিরের দিকে শয়তানি হাসি দিকে এগিয়ে যেতেই মাহির এক চম্পট দিয়ে রিসোর্টের ভিতরে যেতে যেতে বলল-
“রায়ানের বাচ্চা, তোর বারবারির হিসেব আমি শুধে আসলে নেবো দেখিস।”
-“আরে যাস কই, আমার শালির জন্য এতো টুকু তো করতেই পারি। এইদিকে আয় শরীরের সব কিছুই গ্লোয়িং গ্লোয়িং করে দেই।”
মাহির রায়ানের কথায় থামবার ছেলে নয়। সে এক দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। মনে হয় না বর যাত্রীর বের হওয়ার সময়ের আগে আজ সে বের হবে নিজের ঘর থেকে।”

মাহির ঘরের ভিতর ঢুকে ধপ করে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগলো‌। দৌড়ে পালিয়ে এখন শ্বাস আসছে না বুকে। একটু স্থির হয়ে নিজেকে একনজর আয়নায় দেখলো ছেলেটা। হলুদ রঙা এলিয়েন মনে হলো নিজেকে তার। হঠাৎ করে মাথায় এলো সোরায়াকে এমন হলুদ মাখা অবস্থায় ঠিক কতটাই না মিষ্টি লাগছে হয়তো। অথচ তার দেখার সুযোগ টুকু হচ্ছে না। পুরুষ মন ওমনি মোচর দিয়ে উঠলো। মনে হলো, সুপার ম্যানের মতো উড়ে বউয়ের কাছে চলে যেতে পারলে শান্তি লাগতো। মাহির নিরুপায় হয়ে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল। মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের শিরা উপশিরা তাকে উষ্কানি দিল একটি বার কাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখতে ভিডিও কল করার জন্য। মানব দেহের এই বিপরীত অংঙ্গ দ্বয় যখন একসঙ্গে আগ্রহ যোগায় তখন সেই ডাকে সাড়া না দেওয়া অসম্ভব। মাহির নিজেকে সামলে রাখতে ব্যর্থ হলো। কল ট্রান্সফার হলো সোরায়ার ফোনে। রিসিভ ও হলো তবে সোরায়া নয় হলুদ মাখা অন্য এক পরিচিত মুখ ভেসে উঠলো সামনে। মাহির ছোট ছোট চোখ করে চেনার চেষ্টা করতেই তার মুখ থেকে নামটা বেড়িয়ে এলো-“জু.. জুঁই..!”

জুঁই অপর পাশে হঠাৎ মাহিরের হলুদ মুখ দেখে চমকে চিৎকার দিয়ে উঠলো হাত থেকে যেন ফোনটা পড়েই যাবে। মাহির নিজের পরিচিতি যাহির করলো-
“আমি মাহির। তোমার মাহির স্যার। ভয় পেও না।”
বেচারা আনমনে বেশ বকাঝকা করলো নিজেকে অন্তত মুখটা ধুয়ে কল করা উচিত ছিল। একেই মান সম্মান খাদে ঝুলে আছে- নিজের এক স্টুডেন্টের সামনে আরে স্টুডেন্ট কে বিয়ে করছি। তাও আবার দুজন বেস্ট ফ্রেন্ড। কি ডেয়ারিং কাজ কারবার! জুঁই মাহিরকে চেনার চেষ্টা করে উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলো-
“আরে সত্যিই তো মাহির জিজু…হাই! আসসালামুয়ালাইকুম জিজু।”
“জিজু” ডাকটা শুনে মাহিরের কাশি উঠে যাবার উপক্রম। ছেলেটা যেমন অবাক ঠিক তেমনি অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করছে তার মনে। আবেগ সামলে একটু ভাব ধরলো মাহির। জুঁই কে মিষ্টি হেঁসে পটানোর চেষ্টায় বলল-
“ওয়ালাইকুম আসসালাম শালিকা। জিজু তার বউয়ের সাথে একটু কথা বলতে চায়। তাকে ফোনটা দাও তো।”
-“০১৭*********…আমার বিকাশ নাম্বার।”
মাহির হতবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-“মানে কিহ্?”
জুঁই হিহি করে দাঁত বের করে হেঁসে বলল-

“আরে জিজু, মানে জিজ্ঞেস করে লজ্জা দেন কেন? এমনি এমনি কি কিছু হয় বলেন তো? কিছু পেতে গেলে তো কিছু দিতে হয়। আচ্ছা বুঝিয়ে বলি- আমার নাম্বারে ১১টা ডিজিট সো আপনি বরং ১১০০০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েন। আমিও ফোনটা আপনার বউয়ের হাতে দিয়ে দিবো।”
মাহিরের বক্ষ পেশি অতিক্রম করে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“এমন জাল্লাদ শালি দিয়ে কি হবে আমার। ধুরু।”
তবু ঠেলায় পড়ে বেচারা শর্ত মেনে নিয়ে বলল-
“আচ্ছা আপাতত বউটা কে দেখতে দাও। কল টা কেটে পরে নিজের নাম্বার টা সেন্ড করে দিও‌। পাঠিয়ে দিবো।”
জুঁই কিছু সময় নিয়ে ভেবে সোরায়ার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল-
“ঠিক আছে। বিশ্বাস করে দিচ্ছি। কাজ শেষে যেন ১১ সংখ্যা টা দেখতে পাই এ্যাকাউন্টে।”
জুঁই সোরায়ার হাতে তার ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলল-

“হলুদ পরে তোল। আগে চেহারা দেখিয়ে নে বরকে।”
সোরায়া জুঁইয়ের কথায় অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকাতেই আতকে উঠলো-“ওমা গো..!”
-“আরে আমি..মাহির..! বিয়ের দিন বর কে চিনো না এই কষ্ট কই রাখবো আমি।”
সোরায়া ভালো করে মাহির কে খেয়াল করে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল-
“সরি, কিন্তু আমার দোষ কোথায়? আমি কি আমার এমন বরকে চিনি? না দেখেছি? এটা কি অবস্থা করেছেন?”
-“তোমার একমাত্র দুলাভাই আর ভাইকে জিজ্ঞেস করো গিয়ে।”
সোরায়া ফিক করে হেঁসে উঠলো মাহিরের কথায়। মাহির গম্ভীর গলায় বলল-
“হাঁসি থামিয়ে এখন একটু ফোনটা রেখে সামনে যাও তো। দেখবো তোমাকে। মাথা কাজ করছে না। ভীষণ অশান্ত লাগছে।”

সোরায়া বাড়তি প্রশ্ন করলো না। এমন টা প্রথম বার নয়। কলেজে যেদিন সোরায়া যেত না অফ টাইমে মাহির এমনই করতো। আর বরাবরের মতো একটা কথাই বললে অভ্যস্ত সে- “তোমাকে দেখবো। ভীষণ অশান্ত লাগছে।” সোরায়া ফোনটা রেখে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির স্তব্ধ থেকে শুধু তাকিয়ে রইল। পাঁচ মিনিট পার হলে সোরায়া ফোনের দিকে আসতে নিলে মাহির করুন গলায় চেঁচিয়ে বলল-
“এই হয়নি হয়নি, দাঁড়িয়ে থাকো। আমি আরো দেখবো তো।‍”
সোরায়া কিছু বলার আগেই জুঁই এসে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে নিল খপ করে। আর হেঁয়ালি করে বলল-
“অনেক হয়েছে। সব শান্তি এখন পেয়ে গেলে বিয়ের পর কোন শান্তির তাল্লাশ করবেন জিজু? এখন আমার এগারো সংখ্যা টা পাঠিয়ে দিন ভালোয় ভালোয়। টাটা। আসসালামুয়ালাইকুম।”
-“আরে কেটে দিলি কেন? উনি তো আরো একটু দেখতে চাইলো।”

জুঁই চোখ পাকিয়ে বলল- “বিয়ের পরে ওনার ঘরে গিয়ে ভালো করে নিজেকে দেখাস কেমন? এইদিকে আমার একটা প্রেম হচ্ছে না আর সে বিয়ে করে ফেলছে। এখন আবার আমার সামনে লুতুপুতু প্রেম করতে চায়। শখ কত..! এই শোন, সিঙ্গেল ব্যক্তি দের অভিশাপ অনেক বাজে। সম্মান দিয়ে চলবে তবেই মিঙ্গেল হয়ে সুখে থাকতে পারবি বুঝলি? যা গিয়ে গোসল কর।”
সোরায়া জুঁইয়ের সাথে তর্কে পারবে না বিধায় সে চুপ চাপ তার কথা মেনে নিয়ে গোসল করতে চলে গেল। জুঁই অপেক্ষা করছিল তার এ্যাকাউন্ট আপডেটের। সেটা হলোও তবে, ১১০০০ এর জায়গায় ১১ দেখে তার মাথায় বাজ পড়লো বোধহয়। সে সঙ্গে সঙ্গে মাহিরকে এই নিয়ে প্রশ্ন করায় উল্টো দিক থেকে মাহিরের জবাব এলো-
“এগারো সংখ্যা চেয়েছিলে তাই দিয়েছি। মন ভরে দেখ। বেয়াদব বিচ্ছু শালিকা। পরীক্ষায় ১১মার্ক কমিয়ে দিবো এবার।”
জুঁই মার্ক কম হওয়ার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে জিভ কামড়ে লিখলো-
“সরি স্যার সরি। আর জীবনেও হবে না। মার্ক কম দিয়েন না প্লিজ। আমি তো উত্তরই করেছি ১১ মার্কের।”
অপর পাশ থেকে আর উত্তর এলো না। নিজের কাজে জুঁই নিজেই ফ্যাসে গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য।

বিকেল~
-“তোরা কি বর পক্ষকে জব্দ করার প্রস্তুতি নিতে নিতেই দিন পার করে দিবি? তোদের সময় জ্ঞ্যান দেখে তো আমার জ্বর চলে আসছে।”
-“উফফ্, চাচি..তুমি ঘরে যাও তো। এতো শখ করে বরযাত্রীর জন্য শরবত বানাচ্ছি ডিস্টার্ব করো না।”
-“মিরু..একটু চিলি সস দিবো?” রিমির প্রশ্নে মিরা রিমির দিকে তাকিয়ে বলল- “এটা জিজ্ঞেস করতে হয়? ঢেলে দে পুরো।”
রোকেয়া বেগম চিন্তিত গলায় বলে উঠলেন-

“ছেলে গুলো অসুস্থ হয়ে যাবে মিরা। এসব কি শরবত বানাচ্ছিস?”
-“মহব্বতের শরবত চাচি। তাকিয়ে দেখো, কেমন লাল লাল দেখতে হয়েছে।”
-“মিরা আমি তোকে সাবধান করছি। কারো যেন কিছু না হয়। বিয়েটা নইলে ভেস্তে যাবে।”
রোকেয়া বেগমের বকাবকিতে মিরা চাচার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“চাচা..তুমি তোমার বউকে নিয়ে ঘরে যাও তো। কনে পক্ষের হয়ে বর পক্ষের জন্য এতো দরদ থাকা ভালো না। যেখানে নিজের পরাণের স্বামীর জন্য মায়া কাজ করছে না সেখানে এসব শুনতে ভালো লাগে? চাচি কে ঘরে নিয়ে গিয়ে সুন্দর করে সাজাও। যাও। শাশুড়ি বলে কথা একদম ডানা কাটা পরী লাগা চাই।”
শফিক রহমান খুবই দৃঢ়তার সহিত মাথা উপর নিচ করলেন। পিছন থেকে রামিলা চৌধুরী কথা কেটে বললেন-
“এখন তো চাচিকেই ডানা কাঁটা পরী বানাতে চাইবি শাশুড়ির জন্য কি আর চিন্তা আছে?!”
মিরা সাথে সাথে রামিলা চৌধুরীর দিকে ফিরে উনার গলা জড়িয়ে ধরে বলল-
“আরে মামণি, চাচি কে তো ডানা কাটা পরী বানাতে হবে আর তুমি..(খানিক সময় নিয়ে নিজ শাশুড়ি কে দেখে বলল) তুমি তো অলরেডি একটা ডানাকাটা পরী।”
রায়হান চৌধুরী পাশ কেটে যাওয়ার সময় একমত প্রকাশ করে গেলেন-“আই এগ্রি।”
রামিলা চৌধুরী পুত্র বধু আর স্বামীর থেকে এমন কথা শুনে লজ্জায় মুখ চেপে হাসলেন। মিরা খিলখিলিয়ে হেঁসে শাশুড়ির মজা নিয়ে বলল-

“ওওহো! শশুর কে তো আমার পুরো দিওয়ানা করে রেখেছ।”
শফিক রহমান মিরার মাথায় গাট্টা মেরে শাসন করলেন-“চুপ, হাড়ে বজ্জাত মেয়ে। শশুর শাশুড়ি কে নিয়ে এমন মজা করতে আছে নাকি?”
মিরা মাথায় হাত ডলতে ডলতে আহ্লাদী সুরে বলল-
“চাচা..আমি কিন্তু ছোট নেই। মা হয়ে যাবো কিছু মাস পর। আমাকে বোকবে না এখন।”
-“বোকলে কি করবি?”
-“আমার বরকে বলে দেব।”
-“তোর বরকে বুঝি আমি ভয় পাই?”
মিরা তর্কে জোড় দেখানোর জন্য কোমরে দুই হাত রেখে বলল-“ভয় না পেলে, দ্যাং দ্যাং করে নিতে এলো আর মেয়ে দিয়ে দিলে?”
রামিলা চৌধুরী এবার বাপ মেয়ের মাঝে বলে উঠলেন-
“ভয়ে না, ভয় ছিল না বলেই মেয়ে দিয়েছে। ছেলে আমার এক মাস পর জ্ঞান ফিরতেই দৌড়ে এসেছিল বউ নিতে। সেই ছেলেকে মেয়ে না দিয়ে উপায় আছে? এমন ছেলে লাক্ষে মিলবে একটা?”

মিরা মুচকি হাসলো লজ্জায়। মেয়েটার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো রায়ানের কথা উঠতেই। শফিক রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতা শিকার করলেন হাজার বার- ভাগ্যিস সেদিন রায়ানের উন্মাদ প্রেমিক সত্তার সামনে হার মেনে ছিলেন তিনি, নয়তো অনাথ মেয়েটার মুখশ্রীতে এই পূর্ণতার লাজুক চাকচিক্যতা কখনো দেখা হতো না। রোকেয়া বেগম রেগে খটমট করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যেতে যেতে বললেন –
“আমার কথার তো কোনো মূল্যই নেই। যা খুশি কর। কিচ্ছু বলবো।”
রোকেয়া বেগম উপরে চলে গেলে শফিক রহমান ও স্ত্রীর পিছু নিলেন। আর মিরা পুনরায় লেগে গেলো তার দুষ্টু পরিকল্পনায়-
“আরে শরবতে লবণ এতো কম দিচ্ছিস কেন? আরো তিন চামচ দে। এক চুমুকে বমি করা চাই।”
রিমি চোখ বাঁকিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-
“বর গুলো আমাদেরই। বমি করলে পরিষ্কার ও আমাদের করতে হবে। তুই করবি পরিষ্কার?”
মিরা নাক ছিটকে বলল-
“ইয়াক, তোর কথায় তো আমার এমনি বমি পাচ্ছে। থাক থাক, আর দিস না।”

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় এখন প্রায় ৭.৩০। অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির গুরুজনেরা ব্যস্ত তাদের স্বাগতম জানাতে এই দিকে এই কাজের দায়িত্ব ছিল মিরা আর রিমির। মেয়েদের সময় জ্ঞানের পরিধি চিন্তা করে রোকেয়া বেগমের মাথা বিরক্তিতে ফেটে যাচ্ছে। রোকেয়া বেগম রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্যে করে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন-
“আপা, বাজে কয়টা দেখেছো? ৮টা বেজে যাবে আর কিছুক্ষণ পরেই। মেয়ে গুলোর কোনো বোধবুদ্ধি নেই। এই সন্ধ্যায় কেউ পার্লারে সাজতে যায়?”
-“আহা, ওদের কি দোষ? মেকআপ আর্টিস্ট রা হঠাৎ বললেন আসতে পারবে না তাই তো তিনজন মিলে ছুটলো পার্লারে এখন বিয়ের দিন কি সাজগোজ করবে না? চলে আসবে তুই টেনশন করিস না।”
-“বললেই তো আর টেনশন কমে যায় না। দু ঘণ্টা হয়ে গেছে। ওদের কল করো। দেখো কত দূর।”
রামিলা চৌধুরী রোকেয়া বেগমকে পেনিক করতে দেখে মিরার নম্বরে কল করলেন। মিরা দুই থেকে তিন বার ফোনটা বাজতেই রিসিভ করে কানে ধরলো-

“হ্যাঁ মামণি বলো..!”
-“কিরে মিরা কতদূর? সময় তো বয়ে চলেছে ঠিকই।তোদের হয় নি?”
-“মামণি, আমি আর রিমি রাস্তায় আছি। এসে যাবো টেনশন করো না‌। একটু সামাল দাও আপাতত।”
-“তুই আর রিমি মানে সোরা কোথায়?”
-“মামণি এই কম সময়ে কি ব্রাইডাল প্যাকেজ হয় বলো? একটু সময় লাগবে বনুর। আমরা এসে যাই পরে ও এসে যাবে সাজা শেষ হলে।”
রামিলা চৌধুরী এই কথায় একটু ভড়কে উঠলেন-
“কিসব কথা এগুলো? কনে কে রেখে তোরা চলে আসছিস মানে? ও একা একা কিভাবে আসবে পরে?”
মিরা রামিলা চৌধুরীর রাগান্বিত হওয়ায় কারণ বুঝে শান্ত ভাবেই বুঝিয়ে বলল-
“মামণি, বনু বাচ্চা না। ওর বিয়ে আজ। পার্লার থেকে এখানে আসতে পারবে না এমনটা হবে না।”
রামিলা চৌধুরী কথা বাড়ানোকে সময় নষ্ট মনে করলেন। আপাতত মিরা আর রিমি চলে এলেও লোক সামাল দেওয়া যাবে। বরযাত্রী চলে আসতে পারে যেকোনো সময়‌। এখানে এখন তাদেরকে দরকার। তিনি ফোন কেটে রোকেয়া বেগমকে সবটা বুঝিয়ে বললে রোকেয়া বেগম মন শান্ত করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন।
মিনিট খানেক পর মিরা রিমি বাড়িতে পৌঁছেই অতিথিদের সাথে কথা বলতে মশগুল হলো। তখনও সব স্বাভাবিক দেখে মিরা রিমির স্বস্তি অনুভব হলো কিছু টা- তাদের দেরি হয় নি এতো টুকু তেই প্রশান্তি।

-“ওয়াহ..! আমার সেই পিচ্চি কালের হাবলা বন্ধুটা আজ কত বড় হয়ে গেছে। আজ নাকি তার বিয়ে! ভাবা যায়! এই আনন্দ আমি কই রাখবো?”
রায়ান মাহিরের মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে দিয়ে ছেলেটার দুই গালে হাত রেখে নাটকীয় সুরে এমন আবেগী কথা বলায় মাহির রায়ানের দিকে বিরক্তিকর চাহনিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা সূচক কণ্ঠে বলল- “সিরিয়াসলি রায়ান?!”
রায়ান মাহিরের গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের ব্লেজার টানটান করে গম্ভীর গলায় বলল- “একটু মজা নিচ্ছিলাম। তোর নার্ভাসনেস কম করার জন্যই।”
মাহির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দুই মুঠো করে অস্থির হয়ে বলে উঠলো-
“রায়ান, আমাকে একটা কথা বলতো, তুই ভাবি কে তুলে নিয়ে কিভাবে বিয়ে করে নিলি? আমার তো নর্মাল বিয়েতেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বিশ্ব যুদ্ধ করতে যাচ্ছি।”
রায়ান হাফ ছেঁড়ে মাহিরের পাশে বসে মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বলল- “কিভাবে করেছি কে জানে! ওকে চেয়েছিলাম, আমার ওকে পেতেই হতো। মন তো এতো টুকুতেই আটকে গেছিল। কিভাবে পেতে হবে, পেতে কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, এসব কিচ্ছু মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছে, ওকে আমার চাই।”
মাহির রায়ানের কথায় ছেলেটার চোখের দিকে তাকালো- তার এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো তথাকথিত পিরিতি উপচেপড়ার বিষয়টা হয়তো ঠিক এমনই যা সে রায়ানের চোখে দেখছে মিরার জন্য। মাহির মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো-

“তুই ভাবিকে অনেক ভালোবাসিস তাই না?”
রায়ানের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি-
“হুম, অনেক। এতোটা ভালোবাসি যে যদি এখন ফোন করে বলে ওর সাথে কনে পক্ষের লোক হয়ে থাকতে সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবো তোকে ফেলে।”
মাহির অফেনসিভ সাইড আই দিলো রায়ান কে-“হারামি..!” রায়ানের হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-“যা সর। চলে যা বউয়ের কাছে। লাগবে না আমার তোকে।”
রায়ান আবার মাহিরের গলা জড়িয়ে বলল-
“আরে প্যারা নিস কেন? তোর ভাবি এটা বলবে না রে।”
ঠিক তখনই রুদ্র দ্রুত পায়ে মাহিরের রুমে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলো-“তোমাদের কি এখনো হয় নি? বরযাত্রী রেডি। এবার বর বেরোলেই রওনা দেবে সবাই।”
রায়ান রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মাহিরের পিঠ চাপড়ে বলল-
“তুই আমাকে জিজ্ঞেস করছিস আমি কিভাবে বিয়ে করে নিলাম। কিন্তু আসল মহাজন তো সামনে‌- ওকে জিজ্ঞাসা কর ও কিভাবে বিয়ে করে নিল।”

কথাটা বলেই রায়ান হেঁসে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। মাহির ও উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্রর দিকে এগিয়ে গেল। রুদ্র একটু অবাক রায়ান মাহির কি প্রসঙ্গে কথা বলছে সেই নিয়ে কোনো ধারণাই নেই ছেলেটার। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর কোর্টের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার রুদ্রর শার্টের কলার টা ঠিক করে দিয়ে রায়ান কে বলল-
“এই মহাপুরুষ কে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাই না বাবা। তোদের দুই ভাইয়ের পা থেকে মাথা সম্পূর্ণ টাই কলিজা।”
রায়ান নিজের চুল সেট করতে করতে-
“আমাদের পুরো শরীর কলিজা তাহলে তোরটা কই।”
মাহির এক সেকেন্ড সময় না নিয়ে বলে দিল-
“তোর শালিকে দিয়ে দিয়েছি। বকবক করে এমন ভাবে মায়ায় ফেলেছে যে চেয়েও নিজের কাছে রাখতে পারি নি।”
রুদ্র মাহিরের হাত নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“নেকামি দেখলে গা জ্বলে। পুরো কলেজ দাওয়াত দিয়ে নিজের স্টুডেন্টকে বিয়ে করছে সে আবার কলিজার কথা বলে।”

আর কিছু সময় দাঁড়ালে ভালো রকম একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়ে যাবে এই ঘরে বুঝে রায়ান মাহির আর রুদ্র কে তাড়া দিয়ে বলল-
“হয়েছে, চল চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের প্রচুর ঝামেলা এখনো বাকি।”
এরপর আর কি বিশাল তোরজোর করে বের হলো বরযাত্রী। ছেলের বিয়েতে সবচেয়ে আমোদ হয়তো সীমা খানই করছেন। একমাত্র ছেলের বিয়েতে কোনো শখ বাদ রাখেনি তিনি। বরযাত্রীর কেউ যাত্রাপথে নিজেদের নাচ থামালো না। বাড়িতে নতুন সদস্য আসবে এই খুশিতে সকলে ডগোমগো। মাহিরের হৃদস্পন্দন এখন আকাশ ছোঁয়া। প্রিয়শীকে আপন করতে তার দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথ যত ক্ষীণ হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি গতি যেন চূড়ান্ত সীমা পার করছে।

-“বর এসেছে, বর এসেছে.. বরযাত্রী চলে এসেছে। কে কোথায় আছো? জলদি গেইটে আসো।”
একঝাঁক চার চাকা গাড়ি দেখে জুঁই চিৎকার করে উঠলো। মিরা এই কথা শুনে এক হাতে রিমির হাত ধরে অন্য হাতে নিজের লেহেঙ্গা সামলে ছুটলো গেইটের দিকে-
“তাড়াতাড়ি চল মরা, গেইট ধরা মিস করা যাবে না।”
-“আরে তুই ধীরে দৌড়া। রায়ান ভাইয়া আমাকে বলে গেছে তোকে দেখে রাখতে। পরে বোকবে আমাকে।”
মিরা রিমি কে টানতে টানতে গেইটের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল-
“ভাইয়ার চামচি, একটা মারবো। চুপচাপ চল জলদি।”

আলোকসজ্জায় ঝলমল করা গেট পেরিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে প্রবেশ করলো বরযাত্রীর দল। সামনে বন্ধুদের হইহুল্লোড়, মাঝখানে আত্মীয়দের ব্যস্ততা পূর্ণ তিন চারটা বড় বড় গাড়ি। আর সবার কেন্দ্রে ফুলে আবৃত সুসজ্জিত বরের গাড়ি যেটা রায়ান ড্রাইভ করছে। ছোটরা আতশবাজির আলোয় মেতে উঠেছে, বড়রা ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। আর কনের বান্ধবীরা? তারা তো বরপক্ষকে আটকানোর নতুন নতুন ফন্দি আঁটতেই ব্যস্ত। পুরো পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই এক টুকরো উৎসবে পরিণত হলো। মিরা, রিমি আর জুঁই সহ রিমি সোরায়ার আরো কিছু বন্ধু বান্ধবরা বিশাল বড় গেইট ঘিরে দাঁড়ালো। সবার চোখে মুখে বিয়ে বাড়ির চেনা পরিচিত দুষ্টুমি ভরা ছাপ। বরযাত্রীর গাড়ি গুলো সামান্য দূরত্বে থামলো কেবল বরের গাড়ি ড্রাইভ করে রায়ান গেইটের দিকে এগোলো। গাড়ির ভেতর থেকেই সামনে থাকা এক ঝাঁক মানুষের ভীড়ে রায়ানের নজর গিয়ে থামলো মিরার উপর। ছেলেটার চোখ জোড়া যেন আকুল হয়ে ছিল তার হৃদপাখিকে প্রাণ ভরে দেখার জন্য। রায়ান মিরাকে আপাদমস্তক একনজর দেখে শুকনো ঢোক গিললো। গোলা শুকিয়ে এলো তার, অন্তরে ঢাকঢোল বাজতে লাগলো এমন ভাবে যেন বিয়েটা সেই করতে এসেছে। মাহির রায়ানের দিকে দেখলো আবার সামনে মিরার দিকে তাকালো। তার মন চাইলো রায়ানের মাথাটা ধরে স্টেয়ারিং-এ ঠুকে দিতে। কিন্তু নিজের বিরক্ত ভাব সংবরন করে মাহির শান্ত গলায় রায়ানকে বলল-

“ভাই আল্লাহর রস্তে নিজের বউরে এইভাবে চোখ দিয়ে খাওয়া বন্ধ কর।”
রায়ান বোধহয় মাহির কথা শুনতে পেল না। কোনো প্রতি উত্তর নেই, শরীরের নড়াচড়া বন্ধ, চোখ জোড়া এখনো মিরার উপর স্থির। মাহির এবার বাধ্য হয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠলো-“রায়াননন..!”
-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, হুয়াট..কে..?” হকচকিয়ে উঠলো রায়ান।
মাহির তার চোখ দুটো ছোট ছোট করে দাঁত বের করে হেঁসে বলল- “আমি..মাহির..তোর বন্ধু..আজ আমার বিয়ে..মনে পড়ছে কিছু?”
রায়ান এমন সময় মাহিরের হেঁয়ালি করে বলা কথা পছন্দ হলো না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা কিছু সেকেন্ডের জন্য নিচু করে মাহিরের উদ্দেশ্যে করুন গলায় বলল-
“ভাই…মনে হচ্ছে তোর সাথে এখন নিজেও বিয়ে করে নিই আবার।”
মাহির কিছু বলল না। পিছন থেকে রুদ্র কিছু বলছে না দেখে মাহিরের পিছন সিটে তাকালো। সে হতাশ হলো রুদ্র কেও একই অবস্থায় দেখে। মাহির বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো-
“ধুর বিয়েই করবো না আমি। বসে থাক তোরা।”
বেশ অনেকক্ষণ যাবত কাউকে গাড়ি থেকে নামতে না দেখে মিরা অধৈর্য হয়ে চিকিৎসা করে বলে উঠলো-
“আরে আরে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? এখনো তো কি করলামই না। গাড়ি থেকে তো নামুন। একটু আপপায়ন করার সুযোগ টুকু তো দিন।”

রায়ান নিজের মাথা তুলে একটু ঝাঁকিয়ে বলল-
“লেট’স গো বয়েজ। এখন দূর্বলতা দেখানো যাবে না।”
রায়ান গাড়ি থেকে নামলো। রায়ানের দেখা দেখি রুদ্র আর মাহির ও নামলো। মাহির কে মধ্যমণি করে রায়ান ও রুদ্র পাশ থেকে নিজের কোর্ট টানটান করে এগিয়ে গেল গেইটের দিকে। মিরা রিমি রায়ান আর রুদ্র কে এক নজর দেখে একে অপরের কাছে কাছে ঝুঁকে এলো। মিরা রিমি কে অস্থির গলায় বলল-
“বিয়েটা কার রে? আমার বিয়ে বিয়ে পাচ্ছে কেন?”
রিমি হাসতে হাসতে বলল-“বিয়ে বিয়ে তো আমারও পাচ্ছে। কিন্তু এখনকার মতো সামলে যা।”
-“হুম হুম…!” মিরা সম্মতি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরকার অদৃশ্য সত্তাকে বুঝিয়ে বলল-
“পাপা কি প্রিন্সেস..মাম্মা কে উষ্কানি দিও না। মাম্মা এখন পাপাকে ওভাবে দেখতে পারবো না। পরে দেখবো ওকে?”
-“আরে রুদ্র, মানুষ কই? কাউকে দেখছি না কেন? এখানে দূর দূর পর্যন্ত কাউকে চোখে পড়ছে না রে। কেউ কি আমাদের লেভেলে নেই?”

রায়ানের হঠাৎ কথায় মিরা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। রায়ান নিজের উচ্চতার প্রেক্ষিতে নজর ঘুরিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে বলল কথা টা। তবে তা দেখে মিরার বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো যে রায়ান ইচ্ছে করে তাদের উচ্চতার মজা উড়াচ্ছে। সাইড থেকে রিমি মুখ টিপে হেঁসে বলে উঠলো-
“আহা রে, এতো সুদর্শন পুরুষরাও চোখে কম দেখে? এটা তো অনফেয়ার।”
সকলে হেঁসে উঠলো। রুদ্র রায়ান কে ডেকে তার নজর নিচু করিয়ে বলল- “আরে ভাইয়া উপরতলায় কি দেখো? মানুষ তো গ্রাউন্ড ফ্লোরে।”
-“ওহো তাই তো , তাই তো..!”
মিরা রায়ানের উদ্দেশ্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। রায়ানের চোখ মিরার চোখের পড়তেই বাকি সবাই তার জন্য অদৃশ্য হলো। সে মিরার দিকে ঝুঁকে খোঁচাখুঁচি খেলার শুরু করলো-
“আসসালামুয়ালাইকুম, বেয়াইন সাহেবা?”
মিরাও তাল দিলো মুচকি হেঁসে-“ওয়ালাইকু আসসালাম, বেয়াই সাহেব।”
-“বেয়াইন সাহেবা, আমাকে একটা কথা বলুন তো। খোদা যখন উচ্চতা দিচ্ছিলেন তখন আপনি কোথায় গেছিলেন? শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যান।”

রায়ানের হাঁসি মুখে বলা এই খোঁচা মারা কথার প্রতি উত্তর ও হাঁসি মুখেই দিল-
“আর বলবেন না, আসলে আমি তখন কিছু মানুষের জন্য এক্সট্রা ব্রেইন নিতে গেছিলাম। কিছু কিছু মানুষের কাছে শুধু ওই নিচ তলার উচ্চতা টুকুই আছে উপর তলা তো খালি।”
রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো ধৈর্য ধরতে। মিরা থামলো না-
“এ্যান্ড গেছ হুয়াট বেয়াই সাহেব, এক্সট্রা ব্রেইন নিয়েও কোনো লাভ হলো নি।”
রায়ানের ইচ্ছে হলো জোরছে একটা চুমুতে মিরার মুখটা বন্ধ করে দিতে। বেচারা না পারতে, সহ্য করে নিল স্ত্রীর দিকের মিষ্টি অপমান। রিমি একটা বড় ট্রেতে করে কয়েকটা গ্লাস ভর্তি শরবত নিয়ে এলো। মিরা চমকিত ভাব ধরে এক গ্লাস শরবত তুলে নিয়ে রায়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল-
“বেয়াই সাহেব, এতো দূর থেকে এসেছেন। হয়তো ভীষণ পিপাসা পেয়েছে তাই না। এটা নিন। প্রাণ জুড়ানো লবণে পোড়া, চিলি সস এর শরবত।”

মাহির রুদ্র বড় বড় চোখে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান কুটিল নজরে মিরার দিকে তাকালো। মিরা শরবতের গ্লাসের দিকে ইশারা করাতে রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরার হাত থেকে শরবতের গ্লাস টা নিল-“থ্যাঙ্কস বেইবি..!”
মিরা একটু লজ্জায় পড়লো বোধহয়। শুধু মিরা নিজ হাতে দিয়েছে বলে রায়ান এক চুমুক খেলো। এক ফোঁটা মুখে পড়তেই রায়ানের মাথা ঘুরে গেল মনে হলো। মিরা মনে মনে একটু অপরাধবোধে ভুগলো। রিমি রুদ্রর দিকে শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়েও আবার ফিরতে নিয়ে নিল। রায়ানের মুখ দেখে তার আর সাহস হলো না রুদ্র কে সেটা খেতে দেওয়ার। যতই হোক মায়া তো লাগছে ছেলে গুলোর জন্য। মাঝ থেকে জুঁই রায়ান কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো-
“ভাইয়া..আপনার কি মাথা ঘুরে গেছে?”
রায়ান নিজের মুখ মুছে চোখের পলক ফেলে বাস্তবে ফেরার চেষ্টায় মিরার দিকে তাকিয়ে জুঁইয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল-

“হ্যাঁ, একটু। এক মহারানি কে পৃথিবী মনে করে এমন ভাবে তার পিছনে ঘুরেছি যে মাথাটাই ঘুরে গেছে।”
মিরা একটু ইতস্তত বোধ করে রায়ানের হাত থেকে শরবতের গ্লাস কেড়ে নিলো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে অধৈর্য স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-
“আপুরা..দাবি বলুন..!”
মিরা রিমি আর জুঁইয়ের সাথে চোখাচোখি করে বলল-
“১ লাখ..!”
মাহির আর কথা কাটাকাটি করলো না। এমনি তেই জান চলে যাচ্ছে ভেতরে গিয়ে সোরায়াকে এক নজর দেখবে বলে। বউ সাজে কত সুন্দরই না হয়তো লাগছে তাকে। মাহির মেনে নিল দাবি-“ওকে ডান। ১লাখ। তবে আমারও একটা শর্ত আছে।”
-“কি বলুন..!”

-“৫০ হাজার এখন আর বাকি ৫০ বউ দেখার পর দিবো।”
মাহিরের শর্তে মিরা ঘাবড়ে রিমির দিকে তাকালো- সোরায়া তো এখনো এসে পৌঁছায় নি। আর এমন সময় নতুন বউকে পার্লারে যেতে হয়েছে যেখানে মেকাপ আর্টিস্টের বাসায় আসার কথা জানাজানি হলে ৫০ হাজারো হাত থেকে যাবে। মিরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল-“ওকে ডান ডিল।”
মাহির মুচকি হেঁসে রায়হানকে ইশারা করতেই রায়ান পকেট থেকে ৫০ হাজার টাকার বান্ডেল বের করে মিরার দিকে এগিয়ে দিল। মিরা সেটা নিতে গেলে রায়ান সেটা পুনরায় নিজের দিকে নিয়ে মিরার কানের কাছে ঝুঁকে কানে কানে ফিসফিস করে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬

“বেয়াইন সাহেবা, ওই শরবতের তিক্ততার মিটমাট আপনার ঠোঁটের মিষ্টতা দিয়ে করবো আমি। বি রেডি ফর দ্যাট।”
মিরার চোখ এক মূহুর্তের জন্যও ছানাবড়া হলো। ভয়ার্ত নজরে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান মিরাকে চোখ টিপে ইশারা করলো। মিরা শুকনো ঢোঁক গিলে চট জলদি রায়ানের হাত থেকে টাকার বান্ডিল টা ছিনিয়ে নিল। এরপর আর কি, জামাই আদর করা হলো। বাচ্চারা গেইট ছাড়লে রোকেয়া বেগম এবং রামিলা চৌধুরী মাহিরকে মিষ্টি মুখ করিয়ে স্বাগতম করেন। কিছু টা সময় পর মাহির স্টেজের উপর একা বসে অপেক্ষা করতে থাকলো সোরায়ার জন্য। বারবার ছেলেটা আশপাশ দেখে যাচ্ছে অধির আগ্রহে। মনের ব্যাকুলতা বেড়েই চলেছে তার। মিরা করিডরে দাঁড়িয়ে টেনশনে পায়চারি করছে এটা একা বকবক করতে করতে। হঠাৎ তার কেউ এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো এক ফাঁকা পরিবেশে।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (৩)