Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৩
তোনিমা খান

সিকদার কোম্পানি মূলত স্থাপত্য শিল্পের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর প্রতিষ্ঠাতা তকদির সিকদার হলেও সে রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এর মূল চালক হলো তপোবন। তপোবন এবং ইমরোজ শিক্ষাগত যোগ্যতায় দু’জনেই আর্কিটেক্ট ইন্জিনিয়ার। কোম্পানির পরিচালনা তারাই করে। তপোবন অফিশিয়াল দিক সামলায় এবং ইমরোজ ফিল্ডের সকল কাজ। এর জন্যই মূলত ইমরোজকে কাজের জন্য প্রায়শই বাইরে থাকতে হয়। আর তার এই বাইরে থাকার সঙ্গী হয় তার সৃজা। যে কি না সিকদার কোম্পানিতে কর্মরত একজন কর্মী। ইমরোজের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট! আকর্ষণীয় বাহ্যিক দৈহিক গঠন, নজরকাড়া আধুনিক পোশাকে চলাফেরা, চোখমুখের অন্যরকম আঙ্গিভঙ্গি, প্রথম প্রথম ইমরোজের নজর কাড়তে না পারলেও সময় গড়াতেই ঐ প্রলোভনকারী, আবেদনময়ী আঙ্গিভঙ্গি ইমরোজের দৃষ্টি কাড়ে। অচিরেই তার প্রতি মেয়েটির আগ্রাসী আচরনে ইমরোজ বিগলিত হয়ে যায়। মেয়েটি সর্বাবস্থায় বিলিয়ে দিতে থাকে নিজেকে ইমরোজের মাঝে। ইমরোজ ও পাপাচারের ক্ষণিক আনন্দে নিমগ্ন হতে থাকে স্ত্রী, সন্তান ভুলে।
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই সৃজার মুখটি কালো হয়ে গেল। সে দুঃখি দুঃখি মুখ করে তাকায় ইমরোজের দিকে। ইমরোজ ঘাড় কাত করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

–”যাওয়ার ইচ্ছা নেই, ম্যাডাম?”
শার্টের উপরের দিকে খোলা দুটি বোতামে, স্পষ্ট আকর্ষণীয় নারী অবয়বে পাশের আবেদনময়ী নারীটির দিকে প্রলুব্ধ চাহনি ইমরোজের। সৃজা মলিন মুখে বলল,
–”আমার তো তোমাকে ছাড়তেই ইচ্ছে করছে না ইমরোজ। ওখানে গেলেই তো তুমি আমায় ভুলে যাবে তাই না?”
–”এখনো এই কথা? সারাজীবন কি এভাবে ডেটিং করে কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা, ম্যাডাম? আমার বাড়ি ফেরার কথা দুইদিন আগে সেখানে আমি আজ যাচ্ছি আমায় ভাইজানের কত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে জানো তুমি? আর তুমি এখনো অসন্তোষ প্রকাশ করছো?”, ইমরোজ ফিচলে হেসে শুধায়।
–”আমি তো তোমায় ভালোবাসি। তোমাকে হারাতে চাই না। সবসময় তোমায় কাছে পেতে চাই। বছরের শেষ দিন থেকে শুরুর দিন—প্রতিটা দিন তুমি আমার সাথে কাটাবে। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে আর কত ইমরোজ? আমার আর ভালো লাগে না। তোমারো ব্যক্তিগত জীবন আছে, তবে কেন সব বিষয় নিয়ে তপোবন স্যারকে তোমার কৈফিয়ত দিতে হবে?”, সৃজা মলিন মুখে বলল।

–”ভাইজান আমাদের কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি সৃজা। আমায় না চাইলেও তাকে সব বিষয়ের কৈফিয়ত দিতে হবে। করণ এত বড় কোম্পানি আমি একা চালাতে পারব না আর না আব্বু এটা মানবে। তবে তুমি চিন্তা করো না, আমরা শিঘ্রই একসাথে থাকব। আমিও এবার সকলের সামনে মাথা উঁচু করে আমার ড্যামন গর্জিয়াস পার্টনারকে প্রকাশ করতে চাই।”, ইমরোজ নম্র কণ্ঠে বলল।
ইমরোজের কথায় সৃজার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেলো নিজের প্রশংসায়। সে আহ্লাদি গলায় শুধায়,
–”আমি গর্জিয়াস?”
–”কোন সন্দেহ আছে?”
–”না সুইটহার্ট, তুমি বলেছো তো অবশ্যই আমি গর্জিয়াস। তোমার চয়েজের উপর আমার কোন সন্দেহ নেই। তোমার চয়েজ হলো বেস্ট চয়েজ। তার জন্যই তো আমি তোমার পার্টনার।”, সৃজা গদগদ কণ্ঠে বলল।
–”এখন যাও। অফিসে দেখা হবে।”
–”তুমি গিয়ে টেক্সট করবে কিন্তু। আর রাতে তোমায় ফোন দেব। ফোন রিসিভ হয় যেন! আমি যেন বন্ধ না পাই, ইমরোজ।”

–”বাড়িতে অনেক মানুষ থাকে, সৃজা। আমি ব্যস্ত থাকব হয়তো তাদের সাথে। আর ফোন না দেয়াই ভালো। কখন কার চোখে পড়ে যায়। আমি তখন বাজে পরিস্থিতিতে পড়ব। আমি চাইছি সবটা স্মুথলি করতে। তুমি বোঝার চেষ্টা করো।”
–”বাড়িতে অনেক মানুষের সাথে ব্যস্ত থাকবে না-কি মৌনতার সাথে?”, সৃজা শানিত কণ্ঠে ইমরোজ বিরক্ত হয়ে যায়। বিরক্তি নিয়ে বলল,
–”সবসময় তোমার কথা মৌনতার কাছেই এসে থামে কেন, সৃজা?”
–”কারণ আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে মৌনতার সাথে শেয়ার করছি তাই। এটা একটা মেয়ের জন্য কতটা যন্ত্রনার তুমি বোঝ?”, সৃজা কঠোর গলায় শুধায়।
ইমরোজ সৃজার কথার মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা না করলেও হঠাৎ করেই তার মাথায় মৌনতার কথা জেঁকে বসল। মৌনতা যখন জানবে তখন তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? হিসেব মতো সৃজা নয় বরং মৌনতা শেয়ার করছে তাকে। ইমরোজের মাঝে নিরাবতা আচ্ছন্ন হয়। মৌনতার মাঝে কোন দোষ নেই, সে কখনো খুঁজেই পায়নি। মৌনতা স্বামী বলতে পা’গ’ল। স্বামীর সেবা, তার প্রতি একাগ্রতা সংসারের প্রতি দায়িত্ব-ই তার কাজ। অতীত ঘাঁটলে মৌনতার প্রতি তার বিরক্তি এসেছে সৃজার আগমনের পর থেকে। এরপর থেকেই সে মৌনতার মাঝে ত্রুটি, বিরক্তি খুঁজতে শুরু করে। অস্থিরতা অনুভব করল ইমরোজ।

–”কিছু বলছ না কেন, ইমরোজ?”
–”এখন বাসায় যাও, সৃজা। পরে কথা হবে আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”, ইমরোজ থমথমে মুখে বলল। সৃজা এতটুকুতেও রেগে যায়। রেগেমেগে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়।
রাত বাড়তেই তপোবন সরোবরে ঢোকে। তার সাথে ঢোকে তকদির সাহেব এবং ইমরোজ। বসার ঘরে বসা সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠলো তিন বাপ ছেলেকে দেখে। বিশেষ করে ইমরোজকে দেখে। নির্জনা বেগমের চোখ টললট করে উঠল ভরা সংসারটা দেখে। বছরের শুরুতে পরিবারের সকল মানুষের আগমনে আনন্দ আরো দ্বিগুন বেড়ে গেল।
মৌনতার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছেয়ে যায় স্বামীর আগমনে। মৌনতা সংসারী, কর্মঠ, দায়িত্বশীল, স্বামীভক্ত একজন মেয়ে। অনার্স চতুর্থ বর্ষে বসে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় সিকদার বাড়ির কথা ছিল এই বাড়ির বউয়েরা বিয়ের পর পড়ালেখা করতে পারবে না‌। মৌনতার ও চাকরি করার খুব একটা ইচ্ছা না থাকায়, সে অনার্স কম্লিট করে বিয়ে এবং সংসারে মনোযোগী হয়। তার ধ্যানজ্ঞান স্বামী সন্তান আর সংসার। তাই এটার গুরুত্ব বর্ণনাতীত তার কাছে। একটা সংসার গড়া অনেক কষ্টের, তার চেয়েও কষ্টকর টিকিয়ে রাখা। তবে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তার সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য। মনস্থির করলো ইমরোজের মনের মতো নিজেকে উপস্থাপন করবে, যখন যেভাবে চায়।
মৌনতা মৃদু হেসে ইমরোজের কাছে এসে দাঁড়ায়। তার কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয়। হাসিমুখে শুধায়,

–”কেমন আছেন?”
ইমরোজ একপলক তাকায় মৌনতার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে। অনাদরে বলল,
–”দেখতেই পাচ্ছো কেমন আছি। উপরে এসো।”
মৌনতা খুব একটা গায়ে মাখে না ইমরোজের গা ছাড়া ভাব। ইমরোজ এমনি সোজাসাপ্টা ধরণের মানুষ! সে মাথা নেড়ে বলল,
–”আপনি যান, আমি আসছি। ক্লান্ত নিশ্চয়ই! কফি নিয়ে আসছি।”
ইমরোজ প্রতিক্রিয়াহীন পা চালিয়ে মায়ের কাছে যায়। মৌনতা জবাকে হাঁক ছেড়ে ডেকে বলল,
–”জবা, এই ব্যাগটা আমাদের ঘরে রেখে আয়।”
–”দেন ভাবিজান।”, জবা ব্যাগটা নিয়ে ছুটলো।
মৌনতা যায় রান্নাঘরে। পায়ে ব্যাথা অনুভব হলেও সংসারের টানাপোড়েনে তা চাপা পড়ে যায়। নির্জনা বেগম ছেলেকে দেখেই হাসিমুখে জড়িয়ে নেয়। ইমরোজ মাকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে শুধায়,

–”কেমন আছো, আম্মা?”
–”সেটা এখন মনে পড়ল, আম্মা কেমন আছি? বাহিরে গেলে মা, ঘর, পরিবার একদম ভুলে যাও। একটাবার মাকে ফোন করে হালচাল জিজ্ঞাসা করার সময় হয়ে ওঠে না তোমার।”, নির্জনা বেগমের অসন্তোষে ভরপুর কণ্ঠ।
ইমরোজ মৃদু হাসলো মায়ের কথায়। অজুহাতের সুরে বলল,
–”কাজে ব্যস্ত থাকি, আম্মা। পরে ক্লান্ত হয়ে যাই ,আর সময় হয়ে ওঠে না ফোন দেয়ার।”
–”ঠিক আছে সমস্যা নেই। মাকে না দাও, মৌনতা আর নায়েলের খোঁজ খবর নিতে কখনো ভুলবে না। তারা তোমার অপেক্ষায় থাকে।”
কথার মাঝেই ইমরোজের চোখ যায় মায়ের পাশে বসা নতুন একটির মুখের দিকে। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–”একি আমাদের বড় ভাবিজান না-কি?”
নির্জনা বেগম মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথার দিকে তাকিয়ে বলল,
–”এই তোমার মেজো দেবর, ইমরোজ।”
রূপকথা বিনম্র কন্ঠে তাকে সালাম দেয়। ইমরোজ মৃদু হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
–”এ তো পিচ্চি ভাবিজান।”
–”ইমরোজ!”, মায়ের গম্ভীর গলায় ইমরোজ হাসলো। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দুই হাজার টাকা বের রূপকথার হাতে দেয় আর বলে,

–”দুঃখিত ভাবিজান, আপনাকে কি উপহার দেব বুঝতে পারছি না। আপাতত এটা রাখুন আপনার দেবরের পক্ষ থেকে।”
ইমরোজের কণ্ঠে রসিকতা, এতো পিচ্চি মেয়েকে না-কি ভাবি ডাকতে হচ্ছে। সে রসিকতার দৃষ্টিতে তাকায় সোফায় বসা ভাইজানের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই তপোবন দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। যা দেখে ইমরোজের হাসি আরো প্রগাঢ় হয়। নির্জনা বেগম রূপকথাকে‌ বললেন,
–”নাও, তোমার দেবর খুশি হয়ে দিয়েছে তোমায়।”
রূপকথা নিলো। নির্জনা বেগম ইমরোজকে বললেন,

–”এখন যাও, উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”, ইমরোজের বাহুতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল নির্জনা বেগম।
ইমরোজ মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালে তপোবন পিছু ডাকে। ইমরোজ বড় ভাইয়ের দিকে তাকালে তপোবন বললো,
–”এখানে আয়, উপরে পরে যাবি।”
–”ক্লান্ত ভাইজান।”
–”তোকে দিয়ে কি হালচাষ করাব আমি? বস এখানে। তোর উপহার এখনো আমার কাছে। নিজের হাতে দেব বলে মৌনতাকে দেইনি।”, তপোবন গম্ভীর গলায় বলল।
বাধ্যহয়ে ইমরোজ ভাইয়ের পাশে বসে। জবা ততক্ষণে তপোবনের বলা কাঙ্খিত ব্যাগটি নিয়ে আসে। তপোবন সেটি ইমরোজের হাতে দেয়। ইমরোজ মৃদু হেসে ব্যাগটি নিয়ে খুলে দেখে প্রতিবছরের ন্যায় একটা ঘড়ি আর বেল্ট। এই দুইটা জিনিস সে কখনো নিজে কেনে না। ভাইজান কিনে দেয় সেটাই পড়ে। তার ভাষ্যমতে ভাইজানের পছন্দের উপর কোন পছন্দ নেই, অন্তত এই দু’টো জিনিসের ক্ষেত্রে। সে হাতের পুরোনো ঘড়িটা খুলে রেখে নতুন ঘড়িটা হাতে দেয়। হাতটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলল,

–”ধন্যবাদ ভাইজান, সুন্দর লাগছে তাই না?”
তপোবন মাথা দুলিয়ে স্নেহের হাসি হাসলো। তখনি নায়েল ছুটতে ছুটতে এসে ইমরোজের সামনে গতিরোধ করল। উপচে পড়া উৎফুল্লতা নিয়ে শুধায়,
–”পাপা, তুমি এসেছ?”
ইমরোজের ক্লান্ত মুখটিতে হাসি ফুটে উঠল। নায়েলের মাথায় হাত রেখে বলল,
–”এসেছি তো। তুমি এতো ছোটাছুটি করছ কেন? এই শীতেও ঘেমে গিয়েছ।”
–“জবা আন্টিল সাথে লুকোচুলি খেলছিলাম, পাপা।”
–”আর খেলতে হবে না, এখন বিশ্রাম নাও।”, ইমরোজ সোফায় গা এলিয়ে বলল।
–”হু পাপা। তুমি আমাল জন্য কি এনেছ? উপহাল এনেছ নাকি চকলেট এনেছ?”, নায়েল বাবার গায়ের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে শুধায়। ইমরোজ ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–”আমি কাজে ছিলাম। বেড়াতে যাই নি তো। তাই কিছু আনার সময় হয়নি।”
ইমরোজে চেহারায় একটুও অনুতপ্ততা দেখা গেল না। সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল কথাটি। কিন্তু বাবার স্বাভাবিক কথাটি নায়েলের মনে বেশ আঘাত হানলো। তার মুখটা মলিন হয়ে যায়। সে মলিন কণ্ঠে বলল,
–”কিন্তু থাট্টি ফাস্ট নাইটে তো সবাই আমায় উপহার দিয়েছে। তুমি তো আমায় কিছু দাওনি। তুমি কিছু কেন আনোনি?”

–“বললাম না কাজে ব্যস্ত ছিলাম?”, ইমরোজ কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল। নায়েল চুপসে গিয়ে বাবার সাথে লেগেই বসল। ইমরোজ তার চুপসানো মুখ দেখে পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি নোট বের করল। সেটা নায়েলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–”এটা নাও। মন খারাপ করো না। এটা দিয়ে মাম্মার সাথে গিয়ে কিছু কিনে নিও যা প্রয়োজন।”
নায়েল টাকাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। তার মুখে কোন প্রকার আনন্দ দেখা গেলো না। কেননা সে টাকা খুব একটা চেনে না। এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সে জানে না। মা শুধু বলেছে এটা গুরুত্বপূর্ণ কখনো নষ্ট না করতে। কিন্তু কখনোই এর গুরুত্ব কিংবা এর প্রয়োজনীয়তা তাকে শেখায়নি। তাই এই টাকাটা তাকে কোনরূপ আনন্দ দিল না। সে টাকাটা নিয়ে মলিন মুখে চলে যায় সেখান থেকে। বাবা মেয়ের পুরো কথোপকথনটি তপোবন দেখল মনোযোগ সহকারে। এমনকি নির্জনা বেগম ও। নায়েল যেতেই তপোবন গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
–”এটা কি ছিল, ইমরোজ?”
সদ্যই ফোন হাতে নেয়া ইমরোজ বড় ভাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায়। অবুঝ কন্ঠে শুধায়,
–”কোনটা ভাইজান?”
তপোবন থমথমে মুখে বললো,

–”তুই কি নায়েলের বাবা না-কি বাড়িতে আসা কোন অতিথি? অতিথিরা যেমন এসে বাচ্চাদের হাতে টাকা দেয় কিছু কেনার জন্য, তুই ও কি তোর সন্তানকে সেভাবে টাকা দিলি?”
–”ভাইজান, আমি ওর জন্য কিছু আনিনি। একদমই কিছু না দিলে নায়েলের মন খারাপ হয়ে যেত। এটাকে এভাবে দেখার কি আছে?”, ইমরোজের চোখেমুখে বিতৃষ্ণা।
তপোবন পুরোপুরি অগ্রাহ্য করলো
সেই বিতৃষ্ণাকে বরং আঁকড়ে ধরলো পরিবারের প্রতি ইমরোজে উদাসীনতাকে। অসন্তোষের সাথে বলল,
–”তাই বলে তুই নায়েলের হাতে টাকা দিবি? কিছু আনিসনি যখন কিছু না-ই দিতি। আগামীকাল ওকে নিয়ে গিয়ে কিছু কিনে দিতি। আর তোর কাজের এত ব্যস্ততার কারন তো আমি বুঝতে পারছি না। যেখানে অমি প্রয়োজনের অধিক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছি। তোর কাজ শুধু পরিদর্শন করা প্রজেক্টের কোন জায়গায় খামতি থাকে কিনা! সেখানে তুই এতো ব্যস্ততা দেখাচ্ছিস যেন কর্মচারী তুই। সেটাও বাদ দিলাম কন্সট্রাকশনের কাজ শেষ হয়েছে আরো তিনদিন আগে এই তিনদিন কি করছিলি তুই?”
তপোবনের জেরায় ইমরোজের চেহারায় রাগ, বিচলন দেখা গেল। তবুও গাম্ভীর্যতা বজায় রেখেই বললো,
–”কাজ ব্যতীত ও আমার ব্যক্তিগত একটা জীবন আছে। আমার ব্যক্তিগত কিছু কাজ থাকতে পারে ভাইজান। সব বিষয়ে তো আর কৈফিয়ত চাইতে পারো না তুমি।”
তপোবনের কণ্ঠ থেকে হঠাৎ দৃঢ়তা মিলিয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয় ভাইয়ের কথায়। বুঝতে পারে, সে ভুল করে ফেলছে। ভাইয়েরা এখন বড় হয়ে গিয়েছে সে চাইলেই সব বিষয়ে নাক গলাতে পারে না। সে সামলে নিলো নিজেকে। খানিক দৃঢ়তার সাথে আবার বলল,
–”না পারি না। কিন্তু আমার বাড়ির বাচ্চাদের কাজের কাছে কিংবা ব্যস্ততার কাছে দুঃখি হতে আমি দেখতে পারি না। এরপর থেকে এমন ভুল নাহয় ইমরোজ। যেখানেই যাস না কেন, যতোই ব্যস্ততা থাকুক না কেন নায়েলের জন্য হাতেকরে কিছু নিয়ে আসবি।”, তপোবনের কথায় ইমরোজ চুপ করে রইল। চোখেমুখে বিতৃষ্ণা স্পষ্ট!

নায়েল টাকাটা নিয়ে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কাছে দাঁড়ায়। মৌনতা কাজের ফাঁকেই মেয়েকে দেখে বলল,
–”মা, তুমি এখানে কেন এলে? তোমার বড় পাপা দেখলে চেঁচামেচি করবে। যাও বাইরে যাও।”
নায়েল কিছু বলল না। সে মলিন মুখে মায়ের দিকে হাতের টাকাটা এগিয়ে দেয়। মৌনতা সেটি হাতে নিয়ে শুধায়,
–”টাকা পেলে কোথায়?”
–”পাপা দিয়েছে।”, নায়েল মলিন মুখে বলল।
–”কেন?”
–”উপহাল কিনতে।”
মৌনতা মেয়ের মলিন কণ্ঠে হাঁটু গেড়ে বসল। থুতনি চেপে ধরে শুধায়,
–“মন খারাপ কেন?”
নায়েল মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
–“পাপা আমাল জন্য উপহাল কেন আনেনি?”
মৌনতা ম্লান হাসলো মেয়ের কথায়। মেয়েকে বুকে চেপে ধরে বলল,
–“পাপা তো কাজ থেকে ফিরেছে, মা। ব্যস্ত ছিল তাই আনতে পারেনি। তুমি মন খারাপ করোনা। আমরা কাল পাপার সাথে বাইরে গিয়ে উপহার কিনে নিয়ে আসব, ঠিক আছে?”
নায়েল আনন্দিত হয়ে গেল মায়ের কথায়, জিজ্ঞাসা করে,

–“সত্যিই?”
–“তিন সত্যি, মা। এখন চলো, পাপার জন্য কফি নিয়ে যাই। আজ পাপা তুমি আমি একসাথে ঘুমাবো মজা হবে।”, মৌনতা উৎফুল্লতা নিয়ে বললো। নায়েল আনন্দে হাত তালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
–“ইয়েয়ে, মজা হবে।”
মেয়ের মন খারাপ দূর হতেই মৌনতা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
জবা আর রোজ নিচে নেমে আসে। তপোবন জবাকে বলল,
–”জবা, তানশান আর নায়েলকে নিয়ে আয়।”
–”ওরা এইহানেই আছিলো ভাইজান। আমি দেখতাছি।”, জবা কপাল কুঁচকে বললো। তন্মধ্যেই মৌনতার পিছু পিছু তানশান আর নায়েল আসলো। তানশানের হাতে কফি। মেজো মায়ের পায়ে ব্যাথা তাই সে গিয়েছিল তাকে সাহায্য করতে। তানশান ইমরোজের কাছে গিয়ে কফিটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
–”মেজো পাপা নাও তোমার কফি।”
ইমরোজ প্রগাঢ় হাসল। কফিটা নিতে নিতে বলল,

–“আব্বু, তুমি কেন করছ এগুলো?”
–“মেজো মায়ের পায়ে ব্যথা তাই তাকে সাহায্য করছি মেজো পাপা।”, তানশান হাসিমুখে বলল।
–“তোমার মেজো মায়ের তো বারোমাস অসুখবিসুখ লেগেই থাকে।”, ইমরোজ তিরস্কারের সুরে বলল। রান্নাঘর থেকে মেয়েকে কোলে নিয়ে আসা মৌনতার মুখ মলিন হয়ে গেল সেই কথায়। সারা বারোমাস রোগ চোখে পড়ে কিন্তু সারা বারো মাস যে এই সংসারটিকে একা হাতে সামলাতে সামলাতে তার দেহ ক্ষয় হতে থাকে, ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বিশ্রাম চায়—তা কি কখনো চোখে পড়ে না?
ইমরোজ উপরে এসেই কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। মৌনতা ঘরে এসে ইমরোজের ব্যাগ খুলে কাপড় চোপড় বের করে লন্ড্রি বাস্কেটে রাখে। ফোনের টোন বেজে উঠতেই মৌনতা বেডসাইড ছোট্ট টেবিলটির উপর রাখা ইমরোজে ফোনের দিকে তাকায়। সে ধীরপায়ে এগিয়ে যায় ফোনটির কাছে। মৌনতার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ন্যায় যন্ত্রনা অনুভব হলো লক স্কিনে হোয়াটসঅ্যাপ এর সৃজা নামক একাউন্টটি থেকে ভেসে ওঠা মেসেজটি দেখে।

–“জান, পৌঁছে গিয়েছো? কি করছো?”
অত্যাধিক যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে অন্তঃস্থল জমে গেলো মৌনতার।পৃথিবীটা শূন্য হয়ে আসছে কি তার? চোখের সামনে ভেসে উঠলো মেয়ের নিষ্পাপ মুখটি। মেয়েটার স্বাভাবিক জীবন বহাল থাকবে তো? মনে হচ্ছে কেউ যেনো গলা চেপে ধরেছে এতো কষ্ট কেন হচ্ছে?
মৌনতা কম্পিত হাতে বাড়িয়ে দেয় ফোনটার দিকে। ইমরোজ জানে সে ফোনের লক জানে না তাই নির্দিধায় ফোনটি রেখে গিয়েছে। তবে লক খুলতে গেলে তার হাত থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। চোখ টলটল করছে, অন্তঃস্থলে একটাই প্রার্থনা সবটা দুঃস্বপ্ন হোক! এসব যেন তার ভ্রান্ত ধারণা হোক! সে অত্যাধিক যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে সে আঙুল চালালো ওমনি কেউ খপ করে ফোনটা টেনে নিয়ে নেয়। মৌনতা চমকে পিছু ফিরে তাকায়। ইমরোজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে শুধায়,

–“কি হলো, আমার ফোন দিয়ে কি করছিলে?”
মৌনতা অতিদ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। মৃদু হেসে শুধায়,
–“কেন আপনার ফোন ধরতে পারি না?”
–“তোমার ফোনে কি হয়েছে?”
–“স্বামীর ফোন আর আমার ফোন এক হলো?”
ইমরোজের ভ্রু টানটান হয়ে আসে মৌনতার কথায়। বলে,
–“এখন যদি উল্টাপাল্টা টিপে আমার কোন গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস ডিলিট করে দিতে তখন?”
–“আমি আবুঝ নই, ইমরোজ। কেউ মেসেজ দিয়েছে বোধহয় তার টোন বেজে উঠেছিল। তাই দেখতে এসেছিলাম।”
–“এমন হাজারটা মেসেজ প্রতিদিন আসে।”, বলেই ইমরোজ ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে। আর তোয়ালেটা মৌনতার হাতে ধরিয়ে দেয়। সদ্য গোসল করে বের হওয়া ইমরোজের চুল বেয়ে তখন টপটপ করে পানি ঝরছে। মৌনতা শুকনো ঢোক গিলে নিরুদ্বেগ তোয়ালে দিয়ে ইমরোজের‌ মাথা মুছিয়ে দিতে লাগল। ইমরোজ ওষ্ঠকোনে হাসি ফুটে মৌনতার কাজে। মৌনতার এই একটা জিনিস তাকে মুগ্ধ করে, সে না বলতেই মৌনতা তার সব চাওয়া বুঝে যায়। স্বচ্ছ টলমলে নত আঁখি দ্বয়ের পানে স্থির দৃষ্টি রেখেই অভ্যাস অনুযায়ী ঠান্ডা হাত দু’টো হাত শাড়ি ছাপিয়ে আঁকড়ে ধরে উন্মুক্ত উদর। শীতের রাতে ঠান্ডা স্পর্শে মৌনতা কুঁকড়ে গেল। ইমরোজ সন্তপর্ণে কুঁকড়ে যাওয়া দেহটিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। হাস্কি স্বরে বলে,

–“আমি না থাকলে সৌন্দর্য বাড়ে না-কি? আমি থাকলে তো চোখেমুখের দিকে তাকানো যায় না।”
–“তাহলে মনে হয় আপনার উপস্থিতি আমার উপর ভারী পড়ে। তাই চোখমুখের দিকে তাকানো যায় না।”, মৌনতা নিজ কর্মে মগ্ন থেকেই বলল। ইমরোজের মাঝে খুব একটা উদ্বেগ দেখাগেল না সে মত্ত হতে চায় মৌনতার মাঝে। ভেজা চুলসহ মস্তক ডুবিয়ে দেয় উন্মুক্ত গলদেশ জুড়ে। স্বামীর আচরণে অভ্যস্ত মৌনতার মাঝে কোনরূপ নড়চড় দেখাগেল না। কিয়ৎকাল বাদ ভেসে আসে জড়ানো কণ্ঠ,
–“ভালো বুলি ফুটেছে দেখছি।”
–“আপনার উচিৎ ছিল কোন বোবা মেয়েকে বিয়ে করা। আমি তো বোবা নই। বুলি আগে থেকেই জানি শুধু সেটা পরিস্থিতি ভেদে প্রকাশ পায়।”
সরব ইমরোজ ঘাড় থেকে মুখ তুলে তাকায় শক্ত হয়ে থাকা মুখটির দিকে। মৌনতার এহেন আচরণে সে অনভ্যস্ত। সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধায়,
–“কি হয়েছে?”
–“কিছুনা।”, মৌনতা দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো। ইমরোজের‌ থেকে সরে এসে তার কাপড় এগিয়ে দেয়। ইমরোজ কাপড় পড়ে নিতেই দরজায় খটখট আওয়াজ আসে। নায়েলের কন্ঠে মৌনতা দরজা খুলে দেয়। নায়েল লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢোকে। নায়েলকে দেখতেই ইমরোজের ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে কপাল কুঁচকে মৌনতার দিকে তাকিয়ে শুধায়,

–“ও এখনো জেগে আছে কেন? ওকে ঘুম পাড়াও নি?”
–“না, ও আপনার সাথে ঘুমাবে দেখে জেগে আছে এখনো।”, মৌনতা মৃদু হেসে বলল। নায়েল ও চিৎকার করে বলল,
–“ইয়েস পাপা, আমলা একসাথে ঘুমাব। অনেক মজা হবে।”
–“ও এখানে ঘুমাবে মানে?”, ইমরোজ চোয়াল শক্ত করে শুধায়। মৌনতা হাতের কাজ থামিয়ে ইমরোজের শক্ত মুখটির দিকে তাকালো। স্বাভাবিক কন্ঠেই বলল,
–“হু আমাদের সাথে ঘুমাবে। কতদিন পর আসলেন, সবাই একসাথে মজা করে ঘুমাব। সমস্যা কি?”
–“সমস্যা কি মানে? ওকে রোজের কাছে ঘুম পাড়িয়ে আসতে বলেছিলাম না, আমি?”
–“ও এখানে ঘুমাতে চাইছে, ইমরোজ। কতদিন পর আপনাকে পেল। আপনার সাথে ঘুমাতে ইচ্ছে করে না ওর?”
–“মৌনতা কথা বাড়বে না। আমি ক্লান্ত। আমি এখন একটু শান্তিমতো বিশ্রাম নেব, ওকে চুপচাপ রোজের ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসো।”, ইমরোজ মৃদু রাগান্বিত স্বরে বলল। মৌনতার মুখশ্রীতে মলিনতা ছেয়ে গেল ইমরোজের কথায়। ঠিক এমনি বদলে যাওয়া আচরণের স্বীকার সে আর নায়েল। এবং প্রতিবারের ন্যায় এবারেও মৌনতা ঝামেলা চায় না, স্বামীর ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। নায়েল অশ্রুসিক্ত অভিমানী নয়নে মায়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। মৌনতার দৃষ্টি ছলছল করে উঠল মেয়ের মুখ ফিরিয়ে নেয়া দেখে। সে পুরো মুখশ্রীতে আদর করতে করতে বলল,

–“পাপা অনেক দূর থেকে এসেছে, মা। অনেক ক্লান্ত আজ পাপাকে একটু রেস্ট করতে দেই। কাল আমরা একসাথে ঘুমাব, ঠিক আছে? রাগ করোনা।”
নায়েল জবাব দেয় না মায়ের কাঁধে পড়ে থাকে। মৌনতা বুক ভেঙে আসে নির্জীব হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে দেখে। যেই বয়সে সন্তানরা বাবা মায়ের ছায়াতলে উড়ে বেড়াবে সেই বয়সে তার মেয়েটা নিজেকে গুটিয়ে নিতে শিখছে। শিখছে না-কি শিখতে বাধ্য করা হচ্ছে? কেন তাদের মা মেয়েকে এভাবে কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হচ্ছে? তারা কাউকে সব ছেড়ে ভালোবেসেছে বলে?
তখন ঘুটঘুটে অমানিশায় ধরণী নিস্তব্ধ। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন ধরণীর এই প্রান্তে সবাই বিশ্রাম নিতে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন, তখনো একজন মানুষ নির্ঘুম দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট! সারাদিনের সংসারের দায়িত্ব পালন করে ক্লান্ত মৌনতা তখন স্ত্রীর দায়িত্ব পালনে নিমগ্ন। বিছানার মাঝ বরাবর পাথরের ন্যায় শরীরে ইদানিং কোন অনুভূতির জাগরণ হয় না। বরং দায়িত্ব থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ক্লান্ত ভঙ্গুর দেহটা বিষিয়ে আসে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এই ধকল তার দেহ নিতে না পারলেও তাকে নিতে হয়। কেননা এই দেহে কেউ কখনো একটু ভরসার হাত রাখে না। কেউ বলে না যে,
–“মৌনতা, সারাদিন অনেক কাজ করেছ, এখন একটু ঘুমাও। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”
জেগে জেগে দেখা স্বপ্নে মৌনতা ম্লান হাসলো। যেখানে তার চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা একটু আদর পায় না, সেখানে সে কি-না এই মানুষটার থেকে নরম স্পর্শ আশা করে?
নিজ চাহিদা মিটিয়ে তখন ক্লান্ত ইমরোজ স্ত্রীর গলদেশে মুখ গুঁজে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আর দৈহিক ক্লান্তিতে ভেঙে আসা দেহ নিয়ে মৌনতা পাথরের ন্যায় পড়ে থাকে। অন্তঃস্থল চিৎকার করে অভিযোগ জানালেও, অভিযোগ করার সুযোগ নেই। কারণ সকলের ভাষ্যমতে,“স্বামীর ইচ্ছামত চললে নাকি সংসারে সুখ বজায় থাকে। স্বামী হলো ধরে রাখার জিনিস। আর যত কষ্টই হোক না কেন একজন স্ত্রীকেই একার প্রচেষ্টায় তার স্বামী-সংসার ধরে রাখতে হবে।”

নতুন বছরের নতুন সকালগুলো রূপকথার জন্য অন্যরকম হয়। প্রতিদিন ভোরে তার ঘুম ভেঙে যায় সালাতের প্রস্তুতি নেয়া একজন মানুষের নিঃশব্দ বিচরণে। আজো তার ব্যতিক্রম নয়! এক স্নিগ্ধ সকাল, সাথে স্নিগ্ধ অনুভূতি। নতুন ভোরের শুরুটা হয় স্বামী নামক মানুষটির করা আরেকটি মনোমুগ্ধকর কাজে। কুয়াশা সরে যেমন ধীরে ধীরে সূর্যের আলোর দেখা মিলে, তেমনি তপোবনকে নিয়ে রূপকথার মন থেকেও নেতিবাচক ধারণা গুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রূপকথার ঘুম ভাঙে তপোবনের ডাকে। পুরুষালী ভারী কণ্ঠে রূপকথা লাফিয়ে ওঠে। তপোবন তড়িৎ গতিতে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–”ভয় পেয়ো না, আমি।”
রূপকথা কিছুটা আ’ত’ঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
–”জি, কয়টা বাজে? আমি কি বেশি ঘুমিয়ে ফেলেছি?”
তপোবন মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। মাথা থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
–”এত ভয় পাওয়ার কিছু হয়নি। সকাল হতে এখনো অনেক দেরি। আর তাছাড়া তুমি দেরি করে উঠলেও একদম খুব বেশি অপরাধ হয়ে যাবে না।”

–”ওহ্।”, রূপকথা নিভন্ত স্বরে বলল।
–”তুমি কি ফজর নামাজ আদায় করবে? করলে, উঠে পড়ে নাও। ওয়াক্ত নাহলে পেরিয়ে যাবে, এর জন্য ডাকলাম।”, তপোবন পুনরায় বলল। রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
তপোবন সোফা থেকে চাদর তুলে নিতে নিতে রূপকথার নিভে যাওয়া মুখটির দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–”তুমি কি বিরক্ত হয়েছ? আমি জানি না তুমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো কি-না! তাই অনিশ্চয়তা নিয়েই ডাক দিয়েছি। যদি পড়ে থাকো তাহলে না ডাকলে তোমার ওয়াক্ত মিস হয়ে যেতো, তাই।”
রূপকথা ঘুরে তাকায় তপোবনের দিকে। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–”আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। ধন্যবাদ ডেকে দেয়ার জন্য। আমি বিরক্ত হয়নি।”
–”আচ্ছা।”

রূপকথা অলসতা ভেঙে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলে তপোবন আবার পিছু ডাকে তাকে। রূপকথা ফিরে তাকায় তার দিকে। তপোবন রূপকথার দিকে এগিয়ে এসে নিজের পায়ের জুতো জোড়া খুলে দিয়ে বলল,
–”এটা পড়ো। ঠান্ডায় খালি পায়ে হেঁটো না। তোমার অনেক কিছু কেনার প্রয়োজন। আমি সময়করে তোমায় নিয়ে যাব, আপাতত এটা পড়ো।”
–”আপনি কি পড়বেন? আপনার ও তো ঠান্ডা লাগছে।”, রূপকথার প্রত্যুত্তরে তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–”আমি তো এখনি বেরিয়ে যাব মসজিদের উদ্দেশ্যে।”
রূপকথা আর কিছু বললো না জুতো জোড়া পড়ে নেয়।
তপোবন যেতে যেতে আলমারি থেকে জায়নামাজ বের করে রেখে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। রূপকথা লক্ষ্য করে লোকটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দিকে নজরদারি। এই দুদিন ঘুম থেকে উঠে কাউকে পায়নি, তবে নিঃশব্দ বিচরণে তার ঘুম হালকা হয়ে যেত। সে নিজে নিজেই উঠে নামাজ পড়েছে। রূপকথা মৃদু হেসে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। মস্তিষ্কে চলে লোকটির কর্মকাণ্ড। লোকটি বয়স্ক দেখেই কি এতো দায়িত্ববোধ, সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দিকগুলোতে নজর?
রূপকথা নামাজ পড়ে আর ঘুমালো না। যদি ঘুম না ভাঙে? সে ঘর থেকে বের হয়ে কড়িডরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তখনি দেখল মৌনতা নিজের ঘর থেকে বের হয়ে ননদের ঘরের দিকে যাচ্ছে। সেও অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গেল ননদের ঘরের দিকে।
রোজের কম্ফোর্টারের ভেতর ঢুকে মৌনতা ঘুমন্ত মেয়েকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো। ঘুমন্ত মেয়ের কপালে ঠোঁট চেপে চুপটি করে শুয়ে রইলো। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথা মৃদু হাসলো মা মেয়ের ভালোবাসা দেখে। অন্তঃস্থল মলিনতায় ছেয়ে যায় কিছুদিন আগে সেও এমনি মায়ের উষ্ণতায় আরামে ঘুমাতো, আজ যেটা স্মৃতি শুধু!
সে ধীরপায়ে ঘরে ঢুকতেই মৌনতা অবাক হয়ে শুধায়,

–“একি রূপকথা, এত সকালে ঘুম থেকে উঠে বসে আছো কেন?”
রূপকথা স্মিত হাসলো তবে ব্যক্ত করল না অন্তঃস্থলের ভয়। শাশুড়ি নিশ্চয়ই বরদাস্ত করবে না বেলা করে ঘুমানো। সে বলল,
–“ফজরের পর আর ঘুম আসে না ভাবি।”
–“আচ্ছা, ভাবির কাছে এসে বসো। নাও কম্ফোর্টারের ভেতর ঢোকো। শীতে বাইরে থাকার প্রয়োজন নেই।”
–“সকালের নাস্তা বানাতে হবে না, ভাবি?”, রূপকথা সতর্ক কণ্ঠে শুধায়। মৌনতা লক্ষ্য করে মেয়েটির চোখে অদ্ভুত ভীতি সংসার জীবন নিয়ে। সে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। রূপকথা গিয়ে তার পাশে পা গুটিয়ে বসল। মৌনতা তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
–“নাস্তা বানানো নিয়ে এত চিন্তা নেই—যে না ঘুমিয়ে উঠে বসতে হবে। আমি আছি, জবা আছে, মাজেদা চাচি আছি সবাই মিলে চট করে বানিয়ে ফেলব। তুমি এই নিয়ে মোটেও চাপ নেবে না। আমি জানি তুমি আম্মাকে ভয় পাচ্ছ। ভয়ের কিছু নেই। সে উপর থেকেই কঠোর হলেও ভেতরটা নরম!”
রূপকথা ম্লান হেসে ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাওয়া বড় বোনকে দেখছে। তার জীবনের পথগুলো যতোই রুক্ষ হোক না কেন! সঙ্গীরা হয় আগলে রাখার মত শক্তিশালী সত্ত্বা!

তপোবন ফজরের সময় ঘর থেকে বের হয় আর ঘরে ঢোকে না অফিসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। তখন নয়টা বাজে। তপোবন বাবার সাথে দশটার দিকে অফিসে যাবে। তারা ফজরের নামাজ পড়ে, হেঁটে আটটার দিকে বাসায় ফিরেছে। সরোবরের সামনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা রয়েছে। যেখানে বাগান রয়েছে। আর সেখানেই বেতের চেয়ার টেবিল রয়েছে। যেখানে রোদে বসে আছে তকদির সিকদার, নির্জনা বেগম আর তপোবন। তিনজনের হাতেই চা। তপোবন বাবা মায়ের সাথে কথা বলছিল আর অলস দৃষ্টিতে চারিদিক অবলোকন করছিল। সেভাবেই হঠাৎ করে তার দৃষ্টি আটকায় দালানের পশ্চিম পাশে দোতালার বারান্দাতে। তপোবনের মাঝে অলসতা, আড়ষ্টতা ভঙ্গ হলো। সে চায়ের কাপটি রেখে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে। মুহুর্তেই তার চোখে মুখে বিস্ময় খেলে গেল বারান্দার একদম কিনারায় রেলিংয়ের ওপর এক শাড়ি পরিহিতা নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। উপরন্তু ঐ ঘরটা তার!
সে তড়িৎ গতিতে চেয়ার ছেঁড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার হঠাৎ করে তপোবনের এমন দৌড়ে হতবাক হয়ে গেল। তারা আ’ত’ঙ্ক নিয়ে উচ্চস্বরে শুধায়
–“কি হলো তপোবন এভাবে দৌড় দিলে কেন?”

তকদির সিকদারের প্রশ্নের কোন জবাব আসল না। তারাও চেয়ার ছেড়ে দ্রুত ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
আর মাত্র এক ইঞ্চি। রেলিংয়ের উপর পা দু’টো দৃঢ়ভাবে চেপে , বারান্দার দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে রূপকথা নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আর মাত্র এক ইঞ্চি দূরত্বে টক বড়ইয়ে জড়ানো কান্ডটি ধরার। সফলতা আর বেশি দূরে নয় ভেবেই তার মুখে হাসি প্রগাঢ় হলো। কিন্তু যেই না কান্ডটি একটু ছুঁতে পারলো ওমনি কেউ ক্ষিপ্র গতিতে এসে তার কোমড় আঁকড়ে ধরে রেলিংয়ের উপর থেকে নামিয়ে নিলো। দৈবাৎ আক্রমনে রূপকথা চিৎকার দিয়ে উঠল। সেই চিৎকার উপেক্ষা করে তপোবন ক্ষিপ্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
–”পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি? কি করতে যাচ্ছিলে ওখানে? মরতে যাচ্ছিলে? জীবন এত সস্তা তোমার কাছে? একবারো মনে পড়ল না নিজের অসহায় মা-বোনের কথা? কি হতো তাদের? কেন করতে যাচ্ছিলে এমন? আমি কি কখনো তোমায় কোনকিছুর জন্য জোর করেছি? জোর করে সংসার করতে বলছি? তুমি যখন চাও এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি নিতে পারবে, সেটা তো আমি প্রথম দিন-ই বলেছি তবে কি ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিলে? তোমার মুক্তির প্রয়োজন তুমি আমায় বলতে?”
রাগান্বিত স্বরে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে একাধারে বলা কথাগুলোয় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল রূপকথার কর্নদ্বয়। রাগে রীতিমতো কাঁপছে তপোবন, ফর্সা মুখশ্রীতে লালচে আভা সুস্পষ্ট। বদ্ধ নেত্রে রূপকথা তখনো দু’হাতের সাহায্য তপোবনের কাঁধ ঠেলে তাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করছে আর বলছে,

–”ছাড়ুন, ছাড়ুন।”
তপোবনের হুঁশ ফিরলো রূপকথার মিনিমিনে কণ্ঠে। সে তাকায় নিজের এবং রূপকথার অবস্থানের দিকে। চোখের সামনে মেদহীন ফর্সা উদর ভেসে উঠতেই তপোবন দ্রুত রূপকথার কোমড় ছেড়ে নিচে নামিয়ে দেয়।
এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে পাঞ্জাবির আস্তিন ঠিক করতে লাগল। নত মস্তকে রূপকথা নিজের শাড়ি ঠিক করে পুরো দেহে আঁচল জড়িয়ে নিলো। আড়চোখে একবার রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকা তপোবনের দিকে তাকিয়ে, সে নিচের দিকে তাকায়। মেঝেতে টক বড়োই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে নির্লিপ্ত শান্ত বদনে সেগুলো কুঁড়াতে লাগলো।
কোমড়ে হাত দিয়ে তপোবন কপাল কুঁচকে রূপকথার কার্যক্রম। মূলত বোঝার চেষ্টা করছে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটি!

মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টক বড়ই গুলো সব কুড়িয়ে ফের নিজের শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে নিয়ে রূপকথা চুপ করে রুমে ঢুকে যায়।
ঘটনাটির প্রেক্ষাপট বুঝতে পেরে বাঁক হারা তপোবন অবাকপানে তাকায় বারান্দা সংলগ্ন দাঁড়িয়ে থাকা টক বড়ই গাছটির দিকে, আরেকবার রূপকথার দিকে। ডালে ডালে পাঁকা টক বড়ইয়ের সমাহার। তারমানে মেয়েটা বড়ই পাড়ছিল! তপোবন ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভেবেছিল আজ কারোর মৃত্যুর কারণ হতে হবে। সে লম্বা এক নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে রুমের ভেতরে ঢুকে যায়। নির্জনা বেগম সহ তকদির সিকদার ছুটতে ছুটতে আসে। তপোবন তাদেরকে আশ্বস্ত করল কিছু হয়নি।
তার ঠিক এক ঘন্টা পর। রূপকথা তখন রান্নাঘরে ছিল, জবা তার কাছে ছুটতে ছুটতে আসে।

–”বড় ভাবিজান, দেহেন আপনার জন্য কি পাঠাইছে বড় ভাইজান।”, জবার উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলেই রূপকথা তার দিকে এগিয়ে যায়। রূপকথার হাতে একটা ঝুড়ি দিয়ে বলল,
–”এই নেন, ভাইজান কইছে এইডি আফনারে দিতে।”
রূপকথা চকচকে দৃষ্টিতে তাকায় এক ঝুঁড়ি কাঁচা পাঁকা টক বড়োইয়ের দিকে। তার টক বড়ই খুব পছন্দ। এখানে এসেছে থেকেই দেখেছে ঐ গাছটিতে অনেক টক বড়ই পেঁকে বসেছে কিন্তু কেউ খায় না। তার ভীষণ লোভ হয়েছিল তাই সে গিয়েছিল পারতে। সে ঝুড়ি ভরতি টক বড়োই নিয়ে প্রসন্ন মনে হাসল।
জবা কাজ করতে করতে মাজেদা চাচিকে দেখিয়ে প্রসন্ন কণ্ঠে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১২

–“এহনি কি ভালোবাসা, দেখছেন? ভাবিজান সকালে টক বড়ই খাইতে চাইছিল তাই সে গাছ থিকা এক ঝুড়ি টক বড়ই পাড়াইয়া পাঠাই দিছে।”
এহেন মন্তব্য ছোট্ট রূপকথা সরব চোখমুখ কুঁচকে নিলো! ভালোবাসা? এটা কি এতোই সহজ বিষয়? ভাবনার বিষয়বস্তু খানিক কঠিন মনে হলো তার। সে আবার রান্নায় মগ্ন হয়।
দেখা যাক এই কঠিন বিষয় আদৌ রূপকথার জীবনে কঠিন থাকে নাকি সবচেয়ে সহজ একটি বিষয় হয়ে ওঠে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৪