Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮+৯+১০

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮+৯+১০

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮+৯+১০
ফারজানা মনি

মেঘ: কি হয়েছে আহিয়ার আব্বু??
আবির দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো, মেঘ একটা নীল রঙের লেহেঙ্গা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তানভীর যখন বন্যার জন্য শপিং এ গিয়েছিল, তখন তানভীর একই রকম তিনটা লেহেঙ্গা নেয়। আগের মিম আর মেঘের জন্য নীল রঙের লেহেঙ্গা চয়েস করে দেয়। আর তানভীর বন্যার জন্য মেরুন কালারের লেহেঙ্গা চয়েস করে। নীল লেহেঙ্গা তে আবিরের অষ্টাদশীকে যেন আজ নীল পরী লাগছে।
আবির কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল: আমার নীল পাঞ্জাবি টা খুঁজে পাচ্ছিনা।
যেটা গত পরশু আনলাম।
মেঘ: আলমারিতে খুঁজলে তা কি করে পাবেন।
আমি তো সব আগে আলমারি থেকে নামিয়ে গুছিয়ে রেখেছি। এই নিন.. এখানে আপনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস গোছানো আছে।
আবির মেঘের পিছন থেকে কোমর আঁকড়ে ধরে বলল:

I know my blue fairy আমি আগেই দেখেছি।
মেঘ: তাহলে পাচ্ছিনা বলছে….পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই মেঘ অনুভব করলো আবির তার গলায় কিছু পরিয়ে দিচ্ছে।
তারপর আয়নার সামনে গিয়ে নেষাক্ত কন্ঠে বলল that’s like my sparrow
মেঘ পিছনে গিয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধরল। আবির ঠোঁটের কোন দুষ্টু হাসি এনে বলল:
এবার ছাড়ো না হলে আমার মত পরিবর্তন হয়ে যাবে। নিজের সাজ নষ্ট করতে না চাইলে আমার থেকে দূরে থাকুন।
মেঘ আবির কে ছেড়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল:
জলদি রেডি হন, না হলে রেখে চলে যাবে। আবির মেঘের বাচ্চামু দেখে মুচকি হাসলো।
তারপর আর একটা শপিং ব্যাগ মেঘের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল :
এটাতে বর্নার জন্য একটা নেকলেস আছে।
তোমার পক্ষ থেকে তোমার বেস্টু কে দিয়ে দিও।
মেঘ বলল: আবির ভাই.. আপনি সবার কথা কত ভাবেন। আমার তো মনেই ছিল না যে বেবিকে কিছু দিতে হবে।
উফ..কে যে বলেছে চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে.. সারাদিন ভাই ভাই করে। এত ভাই ভাই করলে বাচ্চার বাপ কখনোই হতে পারব না আর আমার আহিয়াও আসবে না। হায়রে কপাল আমার।

কমিউনিটি সেন্টারে আগেই মেয়ে পক্ষ চলে এসেছে। বন্যা মেঘকে বারবার বলেছে মেঘ যেন একটু আগে চলে আসে। কিন্তু মেঘ বরযাএী হয়ে আসবে। এটা নিয়ে বন্যার মনটা একটু খারাপ। ইতিমধ্যেই তামিম, মিষ্টি ও মিনহাজরা চলে এসেছে। এতক্ষণ বন্যার সাথে ছবি তুলে, এখন নিজেরা নিজেরা তুলছে। সবাই হাসি মজায় ব্যস্ত।
একজন এসে বলল:” বর এসেছে” কথাটা শুনেই বন্যার বুকের মধ্যে থাকা হৃদয় নামক যন্ত্রটা ধপ করে লাফিয়ে উঠলো। বুকের ভেতর অস্বাভাবিকভাবে ডিপ ডিপ করছে। তার এত দিনের জল্পনা কল্পনা পরিপূর্ণতা পাচ্ছে আজ।
সবাই গেট ধরতে চলে গেল। কিন্তু একি মহা সমস্যা এখানে বর কে?
প্রায় ১০০ জন যুবক ছেলে একই রকম শেরওয়ানি পড়ে বর বেশে দাড়িয়ে আছে। পাশেই বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষরা পাঞ্জাবি- পায়জামা মহিলারা গারো বেগুনে রঙের শাড়ি। যুবতীরা নীল লেহেঙ্গা।মনে হচ্ছে মেরুন, সাদা, বেগুনি ও নীল রঙের এক‌ টুকরো বাগান।

মেয়ে পক্ষ পড়লো বিপাকে বর কই? বিয়ে বাড়ির গেটের শোরগোল শুনে বন্যার বোন বলল: কি হয়েছে??
রাকিব বলল: আপু আপনি ভেতরে যান। নতুন বিয়ানদের সাথে আমাদের কথা আছে। বন্যার বোন হেসে দিয়ে বলল:ঠিক আছে ভাই… আমি যাচ্ছি…কিন্তু বড়দের নিয়ে যেতে দাও।
তোমরা দুষ্টামি করো।
বলেই বন্যার বোন সকল বয়োজৈষ্ঠদের নিয়ে ভেতরে বসালো। বন্যার ফ্যামিলি ছাড়া আর কেউ তানভীর কে চিনে না। যার ফলে বন্যার মামাতো-খালাতো বনেরা টেনশনে পরে গেছে। মিষ্টি, মিনহাজ ও তামিম মুখ টিপে হাসছে। কারণ, আগেই আবির ওদের ইসারায় চুপ থাকতে বলেছে।
বন্যার এক মামাতো বোন বলল: আমাদের দাবি মেনে নিন আর ভেতরে যান।হঠাৎ বর পক্ষের সবাই একসাথে চিৎকার দিয়ে।

বলল:
মানি না.. মানবো না…. মানি না.. মানবো না..
সাকিব জোড়ে বলল: পথ ছাড়ুন…..
বাকিরা জোরে বলল:বেয়াইন সাব….
সাকিব: খিদা লাগছে
বাকিরা: বেয়াইন সাব..
সাকিব:বউ আমাদের.
বাকিরা: বেয়াইন সাব….
সাকিব:তাড়াতাড়ি বর খোঁজেন….
বাকিরা: বেয়াইন সাব….
বর পক্ষের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। বন্যা চুপি চুপি ছাদে চলে গেল। বন্যার তো চক্ষু চড়কগাছ। এদের মাঝে আমার ভিলেন কই??
বন্যা ভালোকরে খেয়াল করে দেখলো তানভীর
সকলের পিছনে আবিরের পাশে দাড়িয়ে আছে।
হঠাৎ তানভীরের সাথে চোখে চোখ পড়লো বন্যার। তানভীর চোখ মাড়লো বন্যাকে।
আবির বুঝতে পেরে মেঘকে নিয়ে অন্য সাইডে দাড়াল। তানভীর এই সুযোগে বন্যাকে ফ্লাইংকিস দিল। বন্যাও তা হাত বাড়িয়ে কুড়িয়ে নিল।
এদিকে রাসেল বলল: বেয়াইন সাব….
আপনাদের দাবী আমরা অবশ্যই মানবো কিন্তু তার আগে আমাদের একটা শর্ত আছে।
মেয়েরা চিৎকার দিয়ে বলল:কী শর্ত??

রাকিব বলল:আপনাদের বর খুজে বের করে সম্মানি নিতে হবে। আর যদি না পারেন। তাহলে, আমাদের নতুন ভাবিকে ডাকবেন। সে নিজে তার বরকে খুজে বের করবে এবং সে সম্মানি পাবে। যতই হোক সে তো এখন থেকে আমাদেরই লোক। এটা শুনে সকল মেয়েরা ছড়িয়ে পড়লো বড়যাত্রীর মাঝে। কিন্তু বর কই সবাই তো বরের মতো দেখতে। শুধু দূরের এক কর্ণারে গাড়ির সাথে হেলাল দিয়ে ফোনে কথা বলছে নিল পাঞ্জাবী পরুয়া এক ছেলে।
সবাই আবিরের সামনে এসে জোরে একসাথে বলল: এটাই ব…র
আবির ওদের হঠাৎ চিৎকারে ফোনে কথা বলারেখে অবাক হয়ে দাড়িয়ে আছে।
তারপর কিছুটা বুঝতে পেরে বলল আপিরা.. আমি নতুন বর না। আমার একটা পরীর মতো বউ আছে।
মেয়েরা হতাশ হয়ে হার মানলো। তারপর কয়েকজন মিলে বন্যাকে আনলো বর খুজতে।
হঠাৎ আরিফ বন্যাকে দেখে আবার স্লোগান দিল: নতুন ভাবি… নতুন ভাবি…
বাকিরা: জিন্দাবাদ.. জিন্দাবাদ…

বন্যা এসে সবার মাঝে গেল। দেখল, একটা ছেলে অন্য একজনের সাথে কথা বলছে। ছেলেটার শুধু পিছন দিক দেখা যাচ্ছে। বন্যা দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধড়লো।
তানভীর হতভাগ!!!! সমনে ঘুরে দেখল “বন্যা”
তানভীর মুচকি হেসে বলল: মাশাআল্লাহ…
আসমানের পরি নিচে নেমে এসেছে। বাকিরা সবাই হই বলে চিৎকার দিল। ছেলেরা আবার স্লোগান দিচ্ছে……
আমাদের ভাবি… জিন্দাবাদ….
সন্ধ্যা ৬টা বাজে।
একটু আগে তানভীর বন্যার বিয়ে শেষ হলো। এখন দুজনকে একসাথেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। তখনই মেঘ, মিম, মিষ্টি এবং আরো কিছু মেয়ে একটি আয়না নিয়ে আসলো। দুজনের সামনে রেখে তানভীরকে বলল: বলোতো ভাইয়া…
কী দেখছো?
বন্যা লাজুক হেসে বলল: আমার রাজপুত্র..
আমার ভিলেন

বিয়ে মাত্র দুটি অক্ষরের শব্দ। কিন্তু এর বিশালতা অনেক। যারা এই শব্দের গুরুত্ব বোঝে তারা জীবনে সুখী। আর যারা না বোঝে তাদের জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদ নামক কালো আঁধার। বিয়ে মানে একটা মেয়ের জীবনে সম্পর্কের সমীকরণ পরিবর্তন হওয়া। আপন কে পর করা আর পরকে আপন এই মুহূর্তটা একটা মেয়ে কেবল উপলব্ধি করতে পারে।

এই যে বন্যা এখন পাগলের মত হাউমাউ করে কাঁদছে। বারবার মা বোন ভাইকে বলছে, আমি যাব না….. আমি ওই বাড়িতে যাব না…… আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না…. প্লিজ, তোমরা ওদের চলে যেতে বলো। আম্মু…. ওই আম্মু…. তুমি ওদের চলে যেতে বলোনা, আমি কোথাও যাচ্ছি না। বন্যা কাঁদছে….. হাউমাউ করে কাঁদছে…… আজ যেন তার চিৎকার কোন বাঁধ মানছে না। বন্যার বোন বন্যাকে জড়িয়ে ধরে সেও হাউমাউ করে কাঁদছে। বোন…. ও বোন……. তোকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো। তখনই বন্যার ছোট ভাই কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল: আপু…. তুই চলে যাবি…… আমি কাকে নিয়ে ফুচকা খেতে যাব…. কে আমাকে চকলেট এনে দেবে…..
বন্যার কান্না যেন আরো বেড়ে গেল। সেও তার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। তার মা যেন আজ নিশ্চুপ, কাঠের পুতুলের মত এক জায়গা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে বারবার। হঠাৎ তার মা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আকস্মিক ঘটনায় বন্যা জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে। ছুটে গেল মায়ের কাছে বলল: আম্মু…. ও আম্মু….. কথা বল তোমার বন্যা চলে যাচ্ছে। বন্যা তোমাকে আর সকাল সন্ধ্যা জ্বালাবে না। ফুচকা খাওয়ার অনুমতি চাইবে না। বারবার বলবে না আজকে খাইয়ে দাও কাল থেকে আমি খাব।
বন্যার কান্নায় প্রকৃতি যেন ভারী হয়ে উঠেছে। চার দিকটা কেমন থেমে গেছে। শুধু বন্যার আহাজারি শোনা যাচ্ছে। তানভীর দূর থেকে টলোমলো চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার এই মুহূর্তে কিছুই বলার নেই। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। মেঘ সহ আরো কয়েকজন বন্যার মায়ের মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরতে তিনি বর্নাকে জড়িয়ে ধরে বলল: মা… আমার মা…. আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না…. তোকে ছাড়া কিভাবে থাকবো….. তুই ছাড়া আমার ঘরটা শূন্য হয়ে যাবে……

বলেই উনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।
হঠাৎ বন্যা তার মায়ের বুকেই লুটিয়ে পড়ল।
মেঘ দৌড়ে সামনে আসলো। চেষ্টা করল জ্ঞান ফেরানোর। কিন্তু ফিরছে না। তখনই আবির বলে উঠলো মেঘ…. মেঘ ওর জ্ঞান ফেরানোর প্রয়োজন নেই। ফিরলেই আবার কাঁদবে। তার চেয়ে ভালো ওকে এভাবে নিয়ে চলি। তানভীর শোন,,, তুই বন্যাকে কোলে করে গাড়িতে নিয়ে তুলো।
বন্যার বাবা বলে উঠলো: কিন্তু বাবা…
আবির তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল:
আঙ্কেল…. টেনশন করিয়েন না। আমরা আছি তো, কোন প্রবলেম হবে না।
তানভীর বনার কাছে এসে, বন্যাকে কোলে নেবে এমন সময় বন্যার বাবা দুহাত চেপে ধরে,

বলল:
বাবা… ও আমার অনেক আদরের মেয়ে। দুই হাতে ওকে অনেক যত্নে বড় করেছি। তুমি ওকে কখনো কষ্ট দিও না। আমার অবুঝ মেয়েটাকে দেখে রেখো।
তানভীর: আঙ্কেল… আপনি প্লিজ এভাবে বলবেন না। আমি ওকে ভালো রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। কোন অভিযোগ করতে দেবো না।
বলে তানভীর বন্যা কে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসালো। তারপর বরযাত্রীর গাড়ি ছুটলো আপন গতিতে আপন ঠিকানায়।
কিছু লোক আগে বাড়িতে ফিরে গেছে।
তারা বরণ ডালা সাজাতে ব্যস্ত।
তখনই আদি দৌড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো
বলল:বউ এসেছে…. বউ এসেছে….
কথাটা শোনা মাত্রই মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান, মাহমুদা খানসহ অনেক মহিলারা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

মালিহা খানের হাতে রঙিন এক বরণ ডালা। যা নানান উপকরণে সাজানো। বউ নিয়ে দরজায় আসতেই তারা বরণ করে ভিতরে ঢুকলো। সবাই আস্তে আস্তে বাড়ির ভিতরে ঢুকছে।
তখনি হালিমা খান বলে উঠলো: মিম… বৌমাকে তোর রুমে নিয়ে যা….. আজ বৌমা তোর রুমেই থাকবে। দরজা দিয়ে ঢুকতেই এই কথা শুনে তানভীরের চক্ষু চড়ক গাছ।
তানভীর: মনে মনে আওরালো আমার বউকে ওরা নিয়ে কোথায় যাচ্ছে। আবির তানভীর এর কাধে হাত রেখে বলল : কি সুমন্ধী ভাই… কেমন লাগছে…. আমার কিন্তু এমনই লেগেছিল…. কিন্তু তখন আপনি আমার পক্ষে কোন প্রতিবাদ করেননি। তখন যদি প্রতিবাদ করতেন, তাহলে আপনাকেও আজ এই দিন দেখতে হতো না।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫+৬+৭

বলেই আবির দাঁত কেলিয়ে হাসলো। তানভীর মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকই তো… যেদিন মেঘ আর আবিরকে আলাদা থাকতে বলা হয়েছিল সেদিনও কিছু বলেনি। কিন্তু আবিরের সাথে মজা নিয়েছিল ঠিকই। আজ একই ঘটনা তার সাথে ঘটলো।
মিম বন্যাকে নিয়ে তার রুমে বসালো। ভাবলো, বন্যা আপুর লাগেজটা নিয়ে আসি। আপুকে চেঞ্জ করতে বলব।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ১১+১২+১৩