Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (২)
তোনিমা খান

মা বোনের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তা; রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটিকে সংসারের টানাপোড়েন ছাড়িয়ে, পড়াশুনার দিকে দূর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর বাবা ছেলের সহায়তায় ম্যাথ নামক জটিল বিষয়টি ইদানিং সহজ হয়ে উঠছে রূপকথার কাছে। যেই মেয়েটি ম্যাথ দেখলে দূরে পালাতো, মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতো— সেই মেয়েটি এখন একা একাই ম্যাথ করে। বেশিরভাগ সময়-ই তাকে ম্যাথ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যায়।

কেটে যায় আরো এক সপ্তাহ। এই দিনগুলোতে চমকপ্রদ এক দূর্ঘটনা ঘটে যায় মেয়েটির সাথে। শাশুড়ির কটুক্তি থেকে রক্ষা করতে বাবা ছেলে দু’জনের ভূমিকা মুগ্ধ করে রূপকথাকে। ইদানিং শাশুড়ি আর তাকে কথায় আঘাত করতে পারে না। কাজ নিয়ে দু একটা ভুলচুক হলে তার জন্য দুটো কথা শোনালেও, ব্যক্তিগত কোনো কারণ নিয়ে কথা শোনাতে আসে না।
সহজ এই জীবনযাত্রায় তানশান নামক ছেলেটির জীবনে জোরপূর্বক মা হয়ে ওঠার যাত্রাটাও বেশ সহজ হয়ে গিয়েছে। কঠিন তো তখন হতো যখন ছেলেটি সহ্য না করত। সে যতোই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করুক না কেন তানশান তা নিরবে গলাধঃকরণ করে। এভাবে করতে করতেই ছেলেটির দিন শুরু এবং শেষ হয় রূপকথার সান্নিধ্যে। তার প্রয়োজনীয় একটা কাজেও তপোবন, জবা কিংবা মৌনতার হাত দিতে হয় না।
তবে চমকপ্রদ ঘটনা এটি নয়। এই চমকপ্রদ ঘটনা তো একটু বেশিই চমকপ্রদ। যখন সদ্য যুবতীর তকমা পাওয়া মেয়েটি বুঝতে পারে; বয়সে দূর্বার গতিতে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া তপোবন সিকদার নামক ব্যক্তিটি তার ছোট্ট মনটিতে প্রেমময় এক দোলা দিয়ে যায়। লোকটির উপস্থিতিতে অন্তঃস্থল কেমন অস্থির হয়ে পড়ে, হুটহাট বোকা বোকা কাজ করে বসে লোকটার সামনে। লোকটার একটু এটেনশন পাওয়ার জন্য সে কতশত প্রয়াস চালায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারংবার তার দৃষ্টি গিয়ে আঁটকায় ধূসর বর্ণের ঐ দৃষ্টিদ্বয়ের উপর। দিনশেষে যখন বিছানায় পিঠ এলিয়ে দেয়, তখন বসে বসে হিসেব করে লোকটা আজ কতবার তার দিকে তাকিয়েছে। না তাকালে— কেন তাকায় নি! তাকে কি দেখতে ভালো লাগছে না?

ক্লাসে তখন বয়স্ক বায়োলজি টিচার নিজের ক্ষীণ কণ্ঠের সাহায্যে শেষ বেঞ্চ পর্যন্ত আওয়াজ পৌঁছনোর যুদ্ধে মগ্ন! সর্বশেষ বেঞ্চে বসা রূপকথা কিছু শুনতে না পেয়ে বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলল টিচারের পানে। এই শক্তি নিয়ে আজ এতবছর যাবৎ শিক্ষাকতা করেছে কি করে?
তন্মধ্যেই নৈমির গুরুগম্ভীর কণ্ঠ তার পূর্ণ মনোযোগ কাড়ে।
–“তারমানে তোমাদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মতো স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই?”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো।
–“তারমানে তোমার স্বামী এখনো তানশানের মাকেই ভালোবাসে।”, নূর চঞ্চল কণ্ঠে বলল।
রূপকথা মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলল,
–“কেন ভালোবাসবে না? তার স্ত্রী, সন্তানের মা। আর এটা তো সত্যি যে—সে থাকলে আমাদের এই পরিস্থিতি হতো না।”
–“তুমি অনেক বুঝদ্বার কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এগুলো বোকামি। আমরা তো বলছি না যে সে তার আগের স্ত্রীরে ভালোবাসতে পারবে না। আমরা বলছি, যা গিয়েছে গিয়েছে এখন যা আছে তা আগলে সুন্দর করে বাঁচতে হবে। তোমার ও তো অনুভূতি রয়েছে।”, নৈমির কথা বেশ ভালো লাগলো রূপকথার। সে মাথা নেড়ে সায় জানায়।
নৈমি ফের শুধায়,

–“এখন পর্যন্ত তার আচরণে তোমার প্রতি একটুও ভালোবাসা ছিল না?”
রূপকথা ভাবুক হলো! সে নিশ্চিত সেদিন লোকটা ইচ্ছা করেই তাকে কাছে টেনেছিল। কিন্তু এটা কি শুধুই দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে? তাকে কি ভালোবাসে না? শুধু দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই কি তার সাথে সুন্দর আচরণ করে?
সে বলল,
–“একটু একটু!”
রূপকথার এহেন কথায় শর্ট টেম্পারড নূর তেতে উঠল। রেগে বলল,
–“কিসের একটু একটু আজ গিয়ে সোজা কলার ধরবে আর জিজ্ঞেস করবে, এই বুড়ো ভালোবাসবি কি বাসবি না বল! বিয়ে করেছিস কি শোকেসে সাজিয়ে রাখার জন্য?”
নৈমি আর রূপকথা সহসা চেঁচিয়ে উঠল।

–“নূররর!”
নূর মুখ বাঁকিয়ে বলল,
–“তোদের মতো এত নাটক আমি করতে পারি না। ভালোবাসবে না তো বিয়ে করেছে কেন? আমার স্বামী আমায় ভালো না বাসলে আমি ঘরেই ঢুকতে দেই না।”
রূপকথা আর নৈমি হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। নৈমি রূপকথার পানে তাকায়। শুধায়,
–“আমায় একটা কথা বলো তো! তুমি কি তাকে ভালোবাসো?”
রূপকথা জবাবহীনতায় ভুগলো। নৈমি আর নূর ফের দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বলল,
–“ভালোবাসো কিনা বলতে পারো না অথচ সে কেন একজন স্বামীর মতো আচরণ করে না তাই নিয়ে তোমার কৌতুহল!”
–“বিষয়টা এমন না…”
রূপকথার কথা থেমে যায় নূরের ব্যগ্র কণ্ঠে। নূর তাকে থামিয়ে বলল,
–“বিষয়টা কেমন আমরা বুঝতে পারছি, বিয়ে করলে এমন একটু আধটু আবেগের ছোঁয়া লাগে। তুমি বুঝতে পারছো না তুমি তোমার স্বামীকে ভালোবাসো। তুমি চাও তোমার স্বামী ও তোমায় ভালোবাসুক কিন্তু তোমার স্বামী তো বুড়ো তাই বোঝে না!”

–“আহ্ নূর!”, নৈমি বিরক্ত হয়ে বলল।
–“একজনের সাথে এত বছর ঘর করে আরেকজনকে সেই মনে জায়গা দেয়া খুব কঠিন। সম্পর্কটা জটিল, তাকে সময় দিতে হবে এই সম্পর্ককে মেনে নিতে।”
“তারমানে তপোবন রূপকথাকে মনে জাগয়া দিতে পারছে না” দীর্ঘ কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটলো এই ভাবনা দ্বারা।
হ্যাঁ, তপোবন তো কখনো তার সাথে একজন স্বামীর ন্যায় আচরণ করে না।
কেন তার প্রতি কোনো আগ্রহ, অনুভূতি নেই? কেনো করে না? সদ্য প্রেমে পড়া মেয়েটির মনে এতসব প্রশ্নের জবাব দিলো মানুষটির জীবনে এখনো থেকে যাওয়া কারোর উপস্থিতি।
মানুষটি যে এখনো তার মধ্যেই আঁটকে আছে এবং তার মধ্যেই মুগ্ধতা খুঁজে চলেছে। সেদিন কক্ষে একা একা একটা পুরোনো এলবাম দেখছিল তপোবন। মুখে লেগেছিল স্নিগ্ধ হাসি।
সেই স্নিগ্ধ হাসির রহস্য জানতেই রূপকথা কিছুটা স্বভাব থেকে বেরিয়ে উঁকি দিয়েছিল। বিশালাকৃতির এলবামের পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে এক হাস্যোজ্জ্বল মুখের মিষ্টি নারীর ছবি ভেসে ওঠে। যে কি-না পেছন থেকে তপোবনের ঘাড় জড়িয়ে ধরে ছিল। একজন মৃত মানুষের জন্য হিংসা লালন করার মতো নিকৃষ্ট সে নয়। তবে প্রতিটা বিবাহিত মেয়ে চায় স্বামীর ভালোবাসা, এটেনশন পেতে।

রূপকথার বয়সের এই সময়টাতে প্রেম আসে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। তবে রূপকথা জানে সৃষ্টিকর্তা তার প্রেমে পড়ার গন্ডি বা বলয় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেটা তপোবন নামক মানুষটা জুড়ে। আর মেয়েটির অবুঝ মনটাও যে তপোবনের জন্য ব্যাকুলতা অনুভব করে। তার দিকে‌ একটু তাকালে মনে শত প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। তার সাথে একটু হাসিমুখে কথা বললে তার অন্তঃস্থল চঞ্চল হয়ে পড়ে আরেকটু সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য।
কিন্তু সদ্য প্রেমে পড়া মেয়েটির বুক জুড়ে সূক্ষ্ম হাহাকার দেখা গেল। অনুভূতি গুলো আশকারা পেল না। শত প্রজাপতিরা ডানা ভেঙে পড়ে গেল। ফিকে পড়লো তার প্রেমময় ভাবনাগুলো!
কালো মোটা ফ্রেমের চশমাটিতে স্পষ্ট হাস্যোজ্জ্বল মুখটি। রূপকথা, ফ্যাকাশে নয়নে তাকিয়ে রইল চশমাটির গ্লাসের দিকে। রাত দু’টো এখন। আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস টেস্ট থাকায়, তপোবন আজ সন্ধ্যা থেকে তার পেছনে আঠার মত লেগে আছে। পড়াচ্ছে তো পড়াচ্ছেই। বিরতির কথা বললেই বারান্দা দেখিয়ে বলবে,
–“একটু হেঁটে আসো যাও।”

তপোবন ততক্ষণ পাশে বসে থাকে যতক্ষণ সে পড়াশুনা করে। আজও সেই নিয়মানুযায়ী তপোবন তার পাশে বসা। সময় পার করার‌ জন্য ফোন দেখছে। ফোন নয় প্রিয় মানুষটিকে দেখছে যেটা তার চশমার গ্লাসে ভেসে উঠেছে।
রূপকথার ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। মাঝেমধ্যে সে ভুলেই বসে লোকটা কারোর ভালোবাসা নিয়ে বিগত দশ বছর একাকী জীবন কাটিয়েছে।
ইদানিং হুটহাট কারোর চোরা দৃষ্টি নজরে আসে তপোবনের। একা একা হাসা, তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার প্রয়াস, তার এটেনশন পাওয়ার প্রয়াস, তার আশেপাশে ঘুরঘুর করা— তার চোখে পড়লেও কখনো বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় না। লজ্জা পাবে ভেবে সে সন্তপর্ণে এড়িয়ে যায় বিষয়টা। মেয়েটির দৃষ্টি নিজের উপর নিবদ্ধ বুঝতে পেরে তপোবন সন্তপর্ণে স্লাইড বদলে নিলো। ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখেই বাম হাত বাড়িয়ে মেয়েটির মাথা ঘুরিয়ে বইয়ের দিকে নুইয়ে দেয়। গম্ভীর গলায় বলে,
–“ঝিমিয়ে না থেকে পড়া শেষ করো।”
রূপকথা কিছুটা হকচকায় তপোবনের আকস্মিক কান্ডে। সে দ্রুত বইয়ের দিকে চোখ রাখে। তপোবন ফোন বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। চোখ রাখে মেয়েটির নিভে যাওয়া, মলিন মুখটির দিকে। হঠাৎ করেই কেন নির্জীব হয়ে পড়ল মেয়েটি?
অতিরিক্ত ঘাঁটায় না সে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। লন্ড্রি বাস্কেটের কাছে যায়। শুকনো কাপড় গুলো গুছাতে নিলে রূপকথা লিখতে লিখতে বলে উঠে,

–“আপনার করার প্রয়োজন নেই। আমি পড়া শেষ করে গুছিয়ে নেবো।”
–“সমস্যা নেই। আমার অভ্যাস আছে, তুমি পড়ো। এগুলো কিছু কিছু কাজ আমি নিজেই করতে পারব।”,
তপোবন মৃদু হেসে বলল। রূপকথা এক পলক তপোবনের কর্মরত মুখটির দিকে তাকিয়ে, নিরুত্তর লিখতে শুরু করে। মুখশ্রীতে মলিনতারা ক্রমশই বাড়তে থাকে। যেই মানুষটা পুরোনো অভ্যাসেই আঁটকে থাকতে চায়। তার জীবনে নতুন অভ্যাসে পরিণত হতে চাওয়া— ব্যর্থ চাওয়া হবে।
টলমলে চোখে রূপকথা নিজের পানে তাকায়। সেদিন তানশানের ঘর গোছাতে গিয়ে একটা ছবি পেয়েছিল। সুন্দর শাড়ি, ভারী ভারী গহনা পড়া নারীটির ছবি দেখে আজ নিজেকে সাজিয়েছিল তেমনি—অথচ লোকটা এসেছে থেকে দেখেও না দেখার ভান করে আছে। তাকে দেখতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না নিশ্চয়ই!
তখন লেখার পাশাপাশি খাতার পাশে আঁকিবুঁকি করছে আর মস্তিষ্কে ঘুরছে অসংলগ্ন কতোশত চিন্তা। হাতের পিঠে সবেগে একটা ব্যথাহীন চাপড় পড়তেই রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকালো তপোবনের দিকে। চশমার ফাঁক দিয়ে লোকটা সরু চোখে তাকেই দেখছে। তপোবন এবার মৃদু ধমকের সুরে বলল,

–“কতবার বলেছি লেখার সময় খাতায় এমন অযথা আঁকিবুঁকি করবে না, মনোযোগ নষ্ট হয়। আর রাত দুটো বাজে তুমি ঝিমাচ্ছো কেন? ঘুমাতে হবে না?”
রূপকথা আড়চোখে তাকিয়ে নিরুত্তর প্রতিবারের ন্যায় শুনলো। তপোবন সেই আড়চোখ দেখে শুধায়,
–“কি?”
অজশ্র কুচিন্তা সামলাতে না পেরে রূপকথা কলম মুখে নিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“আপনি আমায় পছন্দ করেন না, তাই না?”
তপোবন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল হঠাৎ এহেন কথায়। শুধায়,
–“তোমার হঠাৎ এমনটা কেন মনে হলো?”
রূপকথা সরল দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“আমার এক নতুন বন্ধু হয়েছে। সে বলেছে, বৈবাহিক সম্পর্ক এমন হয় না।”
–“কেমন হয় না? আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন , তুমি তাকে কি বলেছো?”, তপোবনের সুস্পষ্ট শানিত কণ্ঠে রূপকথা ভড়কে যায়। সে মিইয়ে গিয়ে বলল,
–“কিছু বলিনি কিন্তু এমন হয় না। ও বিবাহিত, ও বলেছে বৈবাহিক জীবন কেমন হয়।”
–“সেটাই জিজ্ঞাসা করছি, কেমন হয়?”
–আপনি বোঝেন না?”
–নাহ, তোমাদের মত এতকাছু বোঝার বয়স আছে আমার? তোমরা নিউ জেনারেশন কতকি বোঝো! আমরা তো বুড়ো!”
রূপকথা ফোঁস ফোঁস করতে গিয়েও চুপসে যায় ফের তপোবনের প্রশ্নে,

–”কি হল বলো, বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন হয়?”
–“সুন্দর হয়। একে অপরকে বোঝে, ঘুরতে নিয়ে যায়, সংসারের প্রয়োজনে একে অপরের উপর বিভিন্ন দায়িত্ব থাকে, সেগুলো একসাথে পালন করে।”
–“আমাদের বৈবাহিক জীবন কোত্থেকে অসুন্দর? আমি তোমায় বুঝি না? ঘুরতে নিয়ে যাই না? সংসারের অর্ধেক হাল তো তোমার উপরেই, তবে?”
রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। লোকটা সবই করে… কিন্তু? এই কিন্তুর মানে বোঝাবে কি করে? সে খাতায় কলম খোচাতে খোচাতে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“আরে এভাবে বলিনি তো। বৈবাহিক সম্পর্ক একটু “ই” হয় আরকি!
–“এই “ই” টা কি? সেটাই জানতে চাইছি।”, তপোবন ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়। রূপকথা একিভাবে সলজ্জে নত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“ঐ আরকি সুন্দর হয়, ক্লোজ ক্লোজ হয়!”
তপোবন শান্ত দৃষ্টি ফেলে স্ত্রীর সলজ্জ মুখপানে। বিগত এক সপ্তাহ একদম সজ্ঞানে প্রশস্ত বক্ষমাঝে ঘুমিয়েও এমন কথায় তপোবন তার লজ্জার দূরছাই করে দিয়ে শুধায়,
–“তাকে বলোনি, আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক দূরে দূরে কোথায়?”
রূপকথা কলম রেখে এবার বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় নিজের দিকে ঝুঁকে থাকা বুঝদারের বেশে অবুঝ লোকটার দিকে। বিক্ষিপ্ত মেজাজে ধপ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে,

–“আপনি বোঝেন না। ও ঠিক বলে‌, বৈবাহিক সম্পর্ক এমন হয় না। এটা তো টিচার স্টুডেন্টের মতো সম্পর্ক!”
তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে স্ত্রীর মুখপানে তাকায়। মৃদু হেসে শুধায়,
–“এই কু পরামর্শ দানকারী বন্ধু জোটালে কবে থেকে?”
–“কু পরামর্শ কারী?”
–“তা নয়তো কি? আমার শান্তিপূর্ণ সংসারে আগুন লাগানোর জন্য এমন একটা বিবাহিত ফ্রেন্ড থাকা যথেষ্ট।”
–“আমার একটা না, দুটো বিবাহিত ফ্রেন্ড।”, রূপকথা থমথমে মুখে বলল।
তপোবন চোখ বড়বড় করে তাকালো তার কথার প্রেক্ষিতে। অতিশোকে সে বলে ওঠে,
–“আলহামদুলিল্লাহ! শান্তির দিন তবে শেষ! আমায় দেখছি এখন সংসার টিকানোর যুদ্ধে নামতে হবে।”
রূপকথা আর সহ্য করতে পরল না রসিকতা ভরা কণ্ঠ। লোকটা এমনি করে স্মুথলি সব পরিস্থিতি থেকে তাকে এই সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে দূরে রাখার প্রয়াস করে। অথচ সে সম্পর্কের মারপ্যাঁচে নিজেকে জড়াতে চায়, বুঝতে চায়, লড়তে চায়… দিনশেষে এই বাবা ছেলের ভালবাসা অর্জন করতে চায়।
গতরে থাকা অস্বস্তিকর সাজসজ্জা নিয়েই সে মাথায় বালিশ চেপে রূপকথা ধপ করে বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে পড়ল। তপোবন আড়চোখে রাগান্বিত মেয়েটিকে এক পলক দেখে স্মিত হেসে টেবিল গুছিয়ে নিতে লাগলো।
আলো নিভিয়ে মেয়েটির পাশে শুতে শুতে বলল,

–“তোমার কু পরামর্শ কারী বান্ধবী কি যেন বলছিল? সম্পর্ক নাকি ক্লোজ ক্লোজ হয়? তবে অতদূরে ঘুমালে কেন? এখানে এসো তাড়াতাড়ি।”
রূপকথা মাথার উপর থেকে বালিশ সরিয়ে চোখমুখ কুঁচকে তাকায়। তপোবন বাহু ছড়িয়ে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডেকে বলল,
–“ক্লোজ ক্লোজ!”
রূপকথা কচ্ছপের মতো ঘষতে ঘষতে একটু কাছে গিয়ে ঘুমালো। তপোবন ফের বলল,
–“ক্লোজ ক্লোজ হয়নি! এতে সংসারে আগুন জ্বলবে।”
রূপকথা তাকায় এক বাহু ছড়িয়ে রাখা লোকটির পানে। সে নিরুত্তর তপোবনের বাহুতে মাথা রাখতেই তপোবন শক্ত হাতে মেয়েটিকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“কাল গিয়ে তোমার কু পরামর্শ কারী বন্ধুদের বলবে, তোমার বৈবাহিক সম্পর্ক ও ক্লোজ ক্লোজ। ঠিক আছে?
রূপকথা রাগ ভুলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। তপোবন ও স্মিত হাসে স্ত্রীর হাসির মিষ্টি শব্দে। হাসতে হাসতেই হাত বাড়িয়ে ভারী ভারী গহনা গুলো খুলতে নিলো। রূপকথা চকিতে মুখ তুলে তাকায়। তপোবন তার কুঁচকানো দৃষ্টি দেখে মৃদু হেসে বলল,

–“তুমি কি জানো প্রতিটা মানুষ নিজ সৌন্দর্যে বলীয়ান? কারোর সৌন্দর্য গা ভরতি গহনায় কারোর সৌন্দর্য ছোট ছোট অলংকারে। তোমার সৌন্দর্য ঐ ছোট ছোট গহনাগুলোতে, আর সাদামাটা শাড়িতে। এমন ভারী শাড়ি আর ভারী গহনা আর পড়বে না। আম্মা পড়িয়েছে তাই না? তার কথায় নিজের কোনোকিছু পরিবর্তন করতে হবে না। তুমি এমনি সুন্দর!”
নির্জনা বেগম পড়ায়নি। রূপকথা নিজেই পড়েছিল ভেবেছিল লোকটার এমন সাজ পছন্দ! মুখশ্রী থেকে মলিনতা সরে যায় লোকটির কথায়। প্রগাঢ় হেসে নিজমনে আওড়ায়, সে যেমন তেমনি সুন্দর!
অন্তঃস্থলে পুনরায় ডানা মেলা শত প্রজাপতি নিয়েই রূপকথা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। অন্ধকারাচ্ছন্ন আবছা আলোয় বক্ষমাঝে লেপ্টে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি। আর কেউ ভীষণ যত্নে বুকে আগলে রেখেছে। অথচ মেয়েটির অভিযোগ সে তাকে ভালোবাসে না! স্মিত হাসে তপোবন। চুলের গোছায় হাত গলাতে গলাতে ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় ঠিক ষষ্ঠ বারের মতো। মেয়েটি যদি জানতো সে তার গভীর ঘুমের কত প্রকার সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে তবে কেমন হতো?

–“আমার সাফোকেশন হয় এই ঘরে, এই দেশের মাটিতে। আমার এখানে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, ভাইজান। এখানকার সবকিছু খারাপ, সবাই শুধু আমার থেকে আমার প্রিয় জিনিস কেড়ে নিতে চায়। আমি এখানে থাকবো না।”, এরোজ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল।
আধখাওয়া মদের বোতলটির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললো। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বক্ষমাঝে আঁকড়ে ধরলো অস্থির দেহটিকে। অনুনয় করে বলল,
–“প্লিজ, এরোজ আর দু’টো মাসই তো। ততদিন ও থাকতে হবে না তুই অন্তত নায়েলের জন্মদিন পর্যন্ত এখানে থাক। এই ছোট ছোট বাচ্চা গুলোর কি অপরাধ বল? ওরা কেন চাচার আদর থেকে বঞ্ছিত হবে? এই কটা দিন অন্তত পরিবারের লোকদের সাথে একটু হাসিখুশি সময় কাটা। এরপর আমি আর তোকে আটকাবো না, প্লিজ। বড় ভাইজান তোর কাছে অনুরোধ করছি। বড় ভাইজানের ও তোরা ছাড়া আর কেউ নেই। আমার ও তো ইচ্ছে হয় দিনশেষে ভাইদের কাছে পেতে।”
এরোজ ম্লান দেহে পড়ে রইলো বক্ষমাঝে। সবাই তাকে যন্ত্রণা দিতে বেশি ভালোবাসে ভীষণ তীক্ত এই উপসংসার কি আদৌ তার প্রাপ্য? দিনের শুরুটা যেমনি হোক না কেন! কি হতো অপরাহ্নে উপসংহারটা যদি একটু সুখময় হতো?
সে ফিসফিসিয়ে বলল,

–“ভাইজান, কি হতো উপসংহারটা অন্যরকম হলে?”
তপোবনের স্থির দৃষ্টি নড়ে উঠল। ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“ভাইজান স্যরি, এরোজ!”
এরোজ স্মিত হাসলো। পুনরায় ফিসফিসিয়ে বলল,
–“Your apology is accepted by my death.”
তপোবনের বুঝতে বাকি থাকে না ছেলেটিকে ভাগ্য ঠিক সর্বশেষ পর্যায়ে এসে ভেঙে দিয়েছে, যেখানে স্বপ্নরা সদ্যই সুখের দেখা পেয়েছিল। সে টলটলে নেত্রে বলল,
–“ভাইজানকে, এত কঠিন শাস্তি তুই দিতে পারিস না, এরোজ!”
–“আমায় যেতে দাও প্লিজ।”
তপোবন জানে এইবার যদি যেতে দেয় তবে আর সুস্থ সবল ভাইকে ফিরে পাবে না। তাকে অতি শিঘ্রই কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে। সে ঘোরগ্রস্থ ভাইয়ের মাথায় ঘন ঘন হাত বুলিয়ে বাচ্চাদের মতো মন ভুলানো কথায় সায় জানিয়ে বলল,

–“যাবি কিন্তু আর কিছু দিন পর ঠিক আছে? আগামী মাসেই তো নায়েলের জন্মদিন, তারপরেই চলে যাবি। ভাইজানের এতটুকু কথা একটু রাখ, ভাই।”
এরোজ চোখ বন্ধ করে নেয়। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। একটু ঘুমের প্রয়োজন! তপোবন ভাইয়ের থেকে সরে না, বিছানায় পা গুটিয়ে বসে ভাইয়ের পাশে। কোলে মাথা রেখে এরোজ ততক্ষণে বেঘোরে ঘুম! কতদিন কেউ মাথায় হাত রাখেনা, আরামের ঘুম হয় না। মাঝেমধ্যে অসহ্য লাগে ঘুমের ওষুধ, নেশা দ্রব্যের সাহায্যে ঘুমাতে ঘুমাতে।
যেখানে ভঙ্গুর এক সংসার একটু একটু করে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেখানে একটা সাজানো গোছানো সংসার একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে তা কি টের পেল কেউ?
চার দেয়ালের মধ্যে দৃশ্যমান এই ভিন্ন দৃশ্যের সুখ আর যন্ত্রণাটুকুর তুলনা পরিমাপ করতে গেলে গেলে সুখ যে হেরে যাবে যন্ত্রণার কাছে। নিজের সাজানো গোছানো সংসারটাকে একটু একটু করে শেষ হতে দেখে মৌনতা ঠিক গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে করতে এক একটা দিন কাটায়। নিজের ক্লান্তি, অসুস্থতা ভুলে দিনরাত পরিশ্রম করে যায় সংসারের প্রতি স্বামীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য। কিন্তু কখনো কি সফল হয়?
ল্যাপটপের স্ক্রিনে অবচেতনে অন করে রাখা। সেই স্ক্রিনে ভাসতে থাকা ছোট পোশাক পড়া এক নারীর উন্মুক্ত বন্ধনগুলো নিগুঢ় চোখে দেখে মৌনতা। এমন পোশাক পড়লে খুব কামনীয় লাগে কি?
সে আরেক পলক তাকায় নিজের বদনের দিকে। আড়ং কটনের শাড়িতে আবৃত, মাথায় ঢিলেঢালা হাত খোঁপা, হাতে কানে অলংকার ব্যাকডেটেড লাগছে কি?
সে উদাসীন কণ্ঠে রোজকে ডেকে ওঠে। পড়াশুনা করতে থাকা রোজ ফিরে তাকায়। ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,

–“বলো মৌন বউ।”
–“ঐ মেয়েটাকে কি বেশি সুন্দর লাগছে আমার থেকে?”
রোজ কপাল কুঁচকে নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকায়। সহসা সে চোখমুখ বিকৃত করে বলল,
–“ছিঃ বিশ্রী দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কার সাথে কার তুলনা করছো? কোথায় পরী আর কোথায় পেত্নী!”
রোজের কথায় মৌনতা উদাসীন চিত্তে হাসল। ধিমি কণ্ঠে আওড়ায়,
–“সবাই যদি তোমার মতো ভাবতো তবে কত ভালো হতো বলতো!”
রোজের কলম থামে। পুনরায় ফিরে তাকায় মৌনতার পানে। সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“এমন কথা কেন বলছো? কিছু হয়েছে মৌন বউ? কেউ কিছু বলেছে?”
মৌনতা চোখ তুলে তাকায়। দৃষ্টি বড্ডো করুণ! সন্তানের খাবার আনতে বললে বাকবিতন্ডা লেগে যায়— অথচ তৃতীয় ব্যক্তির একটা ফোনে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে যায়। সে কি করে আঁকড়ে ধরবে এই সংসারটাকে? সাহায্য চাইবে কি কারোর থেকে?

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯

তবে কি হবে? সিনক্রিয়েট হবে, সম্পর্কে ফাটল ধরবে, নায়েলের মাথা থেকে বাবার ছায়া সরে যাবে। ঘেমে ওঠে মৌনতা! এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে জোরপূর্বক কৃত্রিম হেসে বলল,
–“নাহ, কিছু হয়নি রোজ। তুমি পড়াশুনা করো, আমি দেখে আসি নায়েল পড়ছে নাকি রূপকথাকে বিরক্ত করছে।”
রোজ তাকিয়ে রইল তার গমনের পথে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব  ২৯ (৩)