Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১০
তন্ময়ী তিতিক্ষা

সকাল দশটা। সাঁই সাঁই বাতাস করে বাতাস অবলীলায় প্রবেশ করছে উন্মুক্ত জানালা দিয়ে। ঘুমন্ত আযরানের ছোট ছোট চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে কপালে। আকস্মিক মায়ের ডাকে চক্ষুদ্বয় পিটপিট করে মেলে ধরল আযরান। উন্মুক্ত বলিষ্ট দেহ ঘুরিয়ে পুনরায় বালিশে মুখ গুঁজলো। পরক্ষণেই হুট করে শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো আযরান। নিদ্রা চক্ষুদ্বয়ে বারবার এসে হানা দিচ্ছে। দেরি করে ঘুমানোর দরুন মাথাটাও বেশ ভারী হয়ে আছে। ঘুমঘুম ঝাপসা চক্ষুদ্বয় দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে তাক করতেই ঘুম জানালা দিয়ে ছুটে পালাল। স্তব্ধের ন্যায় বসে রইলো কিছুক্ষণ।

“শীট! এতটা বেজে গেছে। বিয়ে হয়ে গেলো না তো আবার?”
আযরান যেন নির্জীব হয়ে গেল। পরক্ষণেই কিছু মাথায় আসতে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। তড়িৎ গতিতে কোনো মতে ফ্রেশ হয়ে এসে ছুট লাগালো বাইরে। আযরান তড়িঘড়ি করে সিড়ি বেয়ে আসল। নাস্তার টেবিলে বসে আছে নিধি। ভাইকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যেতে দেখে পিছন থেকে হাক ছেড়ে বলে উঠল,
“ভাইয়া কোথায় যাচ্ছিস? নাস্তা করবি না?”
নিধির প্রশ্নটা যেন কানে গেলই না আযরানের। কিছুক্ষণের মাঝেই আযরান পৌছে গেল সেই পার্কে। যেখানে নোমান আর্শিকে অপেক্ষা করতে বলেছিল। আর্শি গতরাতেই তাকে এই পার্কের কথা জানিয়েছিল। আযরান দ্রুত আঁখিদ্বয় বুলিয়ে নিল চারদিকে। নাহ! কোথাও নেই মেয়েটা। তাহলে কি? মাথা দুদিকে নাড়িয়ে কপালে আঙ্গুল ঘষলো আযরান। বুকের ভিতরে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। সবে সাড়ে দশটা। এখন তো বিয়ে হওয়ার কথা না। তাহলে আর্শি কোথায়? আযরান ফোন বের করে কল লাগালো আর্শির নাম্বারে। কিন্তু ফোন বন্ধ পেতেই ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেল আযরানের। আনমনে বিরবির করে বলে উঠল,

“অদ্ভুত! ফোন তো বন্ধ থাকার কথা না।”
কয়েকবার ফোন করেও কোনো লাভ হলো না। এবার বুকটা চিনচিনে ব্যথা করে উঠল আযরানের। হৃদয়ের গহীনে সূচালো কিছু বিধলো। আর অপেক্ষা না করে পুরো পার্ক খুঁজতে শুরু করল আর্শিকে। এর মাঝে নিজের বন্ধুমহলকে কল করতে ভুললো না। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল চারপাশ। আকস্মিক এক ভিক্ষুককে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল আযরান। ফোনে থাকা আর্শির ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করল,
“ভাই একটু দেখুন তো এই মেয়েটাকে দেখেছেন কোথাও?”
লোকটা চোখ কুঁচকে ফোনটার দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নেড়ে বলল,
“এই মাইয়াডারে দেখছি মনে হয়..সকাল বেলা একটা পোলার লগে যাইতাছিল।
আযরানের বুক ধক করে উঠল। না চাইলেও দ্বিগুণ বেড়ে গেল হৃদয়ের যন্ত্রণাটা। কোনোমতে কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“কোন দিক দিয়ে গেছে? ভালো করে বলেন।”
লোকটা যেন বিরক্ত হলো এবার। হাত তুলে সামনের পার্কের গেটের দিকে ইশারা করল। বিরক্তভরা কন্ঠেই বলে উঠল,

“ওই দিক দিয়া গেছিলো মনে হয়। ওতো দেখছি না বাপু।”
কথাটা শেষ হতেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না আযরান। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। যেন কেউ অদৃশ্যভাবে তার শ্বাসগুলো চেপে ধরেছে। তড়িঘড়ি করে পার্কের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল সে। মাথার ভেতর একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘আর্শি’। রাস্তায় বের হয়েই চারপাশে দৃষ্টি ঘুরালো আযরান। চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। নিজের অজান্তেই পায়ের গতি বেড়ে গেল। সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই থামিয়ে একই প্রশ্ন করছে,
“এই মেয়েটাকে দেখেছেন? প্লিজ একটু বলুন..”
প্রত্যেকটা উত্তরই যেন হতাশায় মুড়ে দিচ্ছে আযরানকে। কেউ দেখেনি, কেউ খেয়াল করেনি, সবাই ব্যস্ত নিজের দুনিয়ায়।
হতাশ হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল আযরান। দু’হাত কোমড়ে রেখে হাঁপাতে লাগল খানিকটা সময়। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে অবলীলায়। বুকের ভিতরে তীব্র কম্পনে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রচন্ড ব্যথায় বুকের বা পাশটা চেপে ধরল আযরান।
“না..কিছু একটা ঠিক নাই। আর্শি ফোন বন্ধ রাখবে না। এটা ওর স্বভাব না..কিন্তু কোথায় গেল মেয়েটা!”
আযরানের ভাবনার মাঝেই পিছন থেকে কারো ডাক ভেসে এলো।

“এই আযরান!”
আযরান পিছু ঘুরে চাইল।।দেখতে পেল মিহির আর প্রহর দৌড়ে আসছে। দু’জনের মুখেই চিন্তার ছাপ। মিহির হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,
“কি হইছে রে? তুই ফোনে এমন ভয় পাওয়া দিছোস কেন?”
প্রহরও পাশে দাঁড়িয়ে চোখ কুঁচকে তাকাল, “আর্শির কিছু হইছে নাকি?”
আযরান একটা সূক্ষ্ণ ঢোক গিলল। নিজেকে কোনো মতে সামলানোর চেষ্টা চালাল কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই ওষ্ঠযুগল ভিজিয়ে সবটুকু খুলে বলল দুইজনকে। মিহির আর প্রহর দু’জনেই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। দু’জনের চক্ষুদ্বয়ই কপাল ছুঁয়েছে। আর্শি এতবড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে অথচ তারা জানতো না। প্রহর কিছুটা ভাবুক হলো। চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠল,
“চল কাজি অফিসগুলায় খোঁজ নেওয়া যাক। হতেও পারে আর্শি ওখানে গেছে।

পুরো ঘর অন্ধকারে ছেঁয়ে আছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে করিডরের মেয়েদের হাসাহাসি। আবার কোথাও দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। সেই শব্দগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে আর্শির কানে। দরজার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আর্শি। চক্ষুদ্বয় ফুলে লাল যাচ্ছে তাই অবস্থা। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে পুরো শরীর। বিধস্তের ন্যায় পরে আছে দরজার সামনে। হুট করে দরজা খুলে যেতেই কেঁপে উঠল আর্শি। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। চোখে মুখে ভয় আর আতঙ্ক। দরজার ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল সেই মাঝবয়সী মহিলা জহুরা খানম। আর্শি ভয়ে দেয়ালের সাথে মিশে রইল। বুকের ভেতর অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠছে। নেত্রপল্লব বেয়ে অনবরত অশ্রু ঝড়ছে তার। জহুরা খানম শীতল চোখে পর্যবেক্ষণ করল আর্শিকে। ঠোঁটের কোণে বিদঘুটে হাসি। যা আর্শির কাছে বিষের মতো মনে হলো।
“কাঁদা শেষ?”

আর্শি আরও খানিকটা দেয়ালে ঠেকে গেল। বার বার দরজার পানে চাইতে লাগলো। এই বুঝি নোমান এসে তাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু কাউকে না দেখে কাঁপা গলায় বলল,
“আমাকে যেতে দিন..প্লিজ। আর নোমান কোথায়? তাকে ডাকুন।”
“নোমানকে ডাকবো? আরে বোকা মেয়ে ও তোকে বিক্রি করে দিয়ে গেছে।”
কথাটা বলেই জহুরা হো হো করে হেসে উঠল। কথাটা শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করতেই ছ্যাৎ করে উঠল আর্শির বুকের ভিতর। পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল নিমিষেই। বিক্রি? তাকে বিক্রি করা হয়েছে? আর্শি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো মহিলাটির পানে। চোখে অশ্রু টলমল করছে। এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না কিছু। একহাতে চোখের কার্নিশ মুছে নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে উঠল,
“আপনি মিথ্যা বলছেন তাই না?”

“তাই নাকি? আমি মিথ্যা বলছি? একটু পর যখন কাস্টমার রুমে আসবে তখন বিশ্বাস করো মোনা।”
কথাটা বলেই আর্শির গাল শক্ত চেপে ধরল জহুরা খানম। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল আর্শি। ছটফট করতে শুরু করল আর্শি। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। কিছুক্ষণ পরে আর্শিকে ছেড়ে দিতেই জহুরা খানমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল সে। নিমিষেই বুক ফাঁটা আর্তনাথ বেরিয়ে এলো কন্ঠনালি ছিঁড়ে। হাতের সাহায্যে জহুরা খানমের পা জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। মিনতি করে বলে উঠল,
“দয়া করুন আমার ওপর। আমাকে যেতে দিন প্লিজ। আপনি যা চাইবেন তাই করবো। তাও আমার এত বড় ক্ষতি করবেন না। আপনি তো আমার মায়ের মতো।”
জহুরা খানমের চক্ষে একফোঁটাও মায়া দেখা গেল না। উল্টো চিল্লিয়ে ডেকে উঠল,
“শিলা! এই শিলা! এইদিকে আয়।”

সাথে সাথে কক্ষে প্রবেশ করল শিলা নামের মেয়েটা। তাকে উদ্দেশ্য করে জহুরা খানম বলে উঠল,
“এরে রেডি করবি। রাতে কাস্টমার আইবো। নতুন মাল চওড়া দাম পামু। সুন্দর কইরা সাজাবি।”
কথাটা শুনেই আর্শি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। চক্ষুদ্বয় হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়ল। চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল তাকে। ‘কাস্টমার’ শব্দটা মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জহুরা খানম বেরিয়ে গেল। অসহ্য পীড়ন হচ্ছে তুলি বক্ষস্থলে। কান্নাগুলো দলা পাঁকিয়ে আঁটকে গেল। অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল শিলা নামক মেয়েটার পানে। কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“তুমিও তো একজন মেয়ে। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের জীবন কিভাবে নষ্ট করবে? আমাকে প্লিজ সাহায্য করো।”

শিলা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। চোখেমুখে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা। আর্শির কাঁধে হাত রাখতেই কেঁপে উঠল সে। শিলা শান্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“আমাকে বলে লাভ নেই। এখানে একবার চলে আসলে আর কোনো উপায় নেই। নিজের বিপদ না চাইলে ভালো মেয়ের মতো রেডি হতে চলো।”
“আমি মরে যাবো। তাও এটা করবো না।”
চিল্লিয়ে উঠল আর্শি। শিলা একটুও বিচলিত হলো না। ধীরে ধীরে আর্শির হাত ধরে টেনে তুলল মেঝে থেকে। নিস্পৃহ স্বরে বলল,
“মরে যাওয়া এত সহজ না এখানে। আর না তারা মরতে দিবে।”

নিস্তব্ধ রাত। খাটের ওপর বসে আছে আর্শি। পরনে উজ্জ্বল শাড়ি। যা এমন ভাবে পরানো হয়েছে কোমড়ের অর্ধেক অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট টিপ, চুলগুলো খোলা করে সাজানো একটা পুতুলের মতো বানিয়ে ফেলা হয়েছে তাকে।ঘ রের ভেতর হালকা লালচে আলো। সেই মৃদু আলোয় গুটিসুটি মেরে হাটুতে মুখ গুঁজে আছে আর্শি। কান্নার তালে তালে শরীর দুলে উঠছে। দু’হাত দিয়ে নিজের শরীরটা জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। বিরবির করে উন্মাদের মতো বলে উঠল,

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৯

“আল্লাহ বাঁচিয়ে দেও আমাকে। এখান থেকে মুক্তি দেও।”
হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা। আকস্মিক দরজার লক খোলার শব্দ হলো। নিমিষেই আর্শির পুরো শরীর কেঁপে উঠল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে। চোখ দুটো আতঙ্কে বিস্ফারিত। মাথা উঠানোরও সাহস হলো না। ঘরের দরজা খুলে যেতেই ভয়ে বিছানার দেয়ালের সাথে লেগে গেল আর্শি।আতঙ্কিত চক্ষুদ্বয় নিক্ষেপ করল দরজার পানে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটাতে শুরু করেছে। ঠিক তখনই শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল,
“কি সুন্দরী..বিয়ে করবি না?”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১১