কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১২
তন্ময়ী তিতিক্ষা
কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে কক্ষের চারপাশ। আযরানের তীক্ষ্ণ চক্ষুদ্বয় জহুরা খানমের দিকে নিবদ্ধ। সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে কিছু একটা। হুট করে নেত্রপল্লব সরিয়ে দরজার পানে চাইল। কয়েকজন মেয়ে উঁকি দিচ্ছে বারবার। যা দেখে সেখান থেকেও দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল আযরান। পরক্ষণেই জহুরা খানমের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি কিছুটা বদলে ফেলল। দ্বিধাগ্রস্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি আসলে..এসব ব্যাপারে খুব একটা অভ্যস্ত না, মাসি।”
জহুরা খানম ভ্রু তুলল। চোখ সরু করে তাকাল তার দিকে।
“মানে?”
আযরান একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথার ক্যাপটা ঠিক করল। গলায় কৃত্রিম একটা হাসি এনে বলল,
“বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছিলাম। তাই এখানে আসা কিন্তু মেয়েটাকে দেখে ভালো লেগে গেল।”
কথাটা বলেই চক্ষুদ্বয় নামিয়ে নিল আযরান। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটিয়ে তুলল মূহুর্তে। যেন সত্যিই খুব লজ্জা পাচ্ছে। জহুরা খানম ভ্রুঁ কুঁচকাল। একবার আযরানের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আঁড়চোখে দেখে নিল। আযরানের বেশভূষা আর বাচনভঙ্গি দেখে আর সন্দেহ করল না। নিমিষেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে পান চিবুতে চিবুতে বলল,
“এতো ভালো কথা সাহেব। তবে এইখানে মানুষ একবারের জন্য আসে। আপনে সারাজীবনের লাইগা কি করবেন?”
“করব কিছু একটা। এবার বলেন কত দিলে নিয়ে যেতে দিবেন। আমার বন্ধু আসবে টাকা নিয়ে।”
লোভে নেত্রপল্লব চকচক করে উঠল জহুরা খানমের। সামনের দাঁড়ানো মানুষটাকে সহজ সরল পেয়ে যেন মনটা আরও দোলা দিল। জহুরা খানম মনে মনে বাঁকা হাসল। আযরানের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“মেয়ে তো একদম নতুন। তাই পাঁচ লাখ দিলেই চলবে সাহেব।”
নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল আযরান। কোনো কথা না বলে ফোন তুলে কাউকে কল করল। কিছুক্ষণ কথা বলে ফের ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। জহুরা খানম কান পেতে শুনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। আযরানকে ফোন পকেটে ঢুকাতে দেখে তড়িৎ গতিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আযরানকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে জোরপূর্বক হাসি দিলো। আযরানের শান্ত দৃষ্টি জহুরা খানমের দিকেই নিবদ্ধ। কিছুটা লহু স্বরে বলে উঠল,
“টাকা আসতেছে..একটু সময় লাগবে।”
একটু থেমে চারপাশে তাকাল। যেন পরিবেশটা নতুন করে বুঝতে চাইছে। তারপর আবার বলল,
“ততক্ষণে একটা কাজ করেন।”
জহুরা খানম প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাইল। বলে উঠল,
“কী কাজ?”
“মেয়েটা একটু সুন্দর করে রেডি করে দেন। নতুন একটা শাড়ি পরিয়ে। এভাবে ভালো লাগছে না।”
জহুরা খানম পান খাওয়া দাঁতে বাঁকা হাসল। মুখে থাকা পানের রসটুকু ফেলে বলে উঠল,
“সাহেবের মনে তো বেশ জায়গা কইরা ফেলছে মাইয়া।”
কথাটা শেষ করেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়েকে ইশারা করল। আযরান একপলক তাকালো মেয়েটার পানে। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। জহুরা খানম মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“এই, ওই নতুন মাইয়াডারে নিয়ে যা। ভালো করে গোসল করাইয়া, শাড়ি পরাইয়া, ঠিকঠাক সাজাইয়া আনবি।”
আকাশে অসংখ্য তারার বিচরণ। তারার ঝলমলে রূপে আর্শির চোখ বারংবার আঁটকে যাচ্ছে। এত সুন্দর রূপ! আর্শির চক্ষুদ্বয় চাঁদ দেখার আকাঙ্ক্ষায় ডুবে আছে। রাত্রি শীতল হাওয়া আর্শির চুলগুলোকে বার বার এলোমেলো করে দিচ্ছে। সেদিকে খবর নেই তার। সে ব্যস্ত রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। আকস্মিক শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল মোহনীয় এক কন্ঠস্বর,
“মাটিতেই চাঁদ থাকতে আকাশে কি খুঁজিস?”
ঝটপট পিছু ফিরে চাইল আর্শি। মৃদু আলোয় আযরানের মুখশ্রী স্পষ্ট হলো। সারামুখে ম্লান হাসির রেশ। হুট করেই আর্শির মনে হলো আযরানের ধূসর চক্ষুদ্বয় চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। কেমন অদ্ভুত মোহনীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। পারল না বেশিক্ষণ চোখে চোখ রাখতে। চক্ষুদ্বয় নামিয়ে নিল আর্শি। মনে মনে কতশত কথার জাল বুঁনে চলেছে। কি হতো যদি আজ আযরান তাকে ওখান থেকে উদ্ধার না করতো? আযরানের জায়গায় যদি অন্য কোনো পুরুষ হতো তাহলে তার পরিণতি কি হতো ভাবতেই শরীরে কাঁটা দিলো আর্শির। নিমিষেই চক্ষুদ্বয় জ্বলতে শুরু করল। চোখের কোণে জল জমবে জমবে ভাব এমন সময় আযরান এগিয়ে এলো। তাদের থেকে কিছুটা দূরেই প্রহর আর মিহির দাঁড়িয়ে। কিছু একটা করছে তারা। আযরান একদম আর্শির নিকটে এসে থেমে গেল। বাতাসের তোড়ে আযরানের পারফিউমের ঘ্রাণ আর্শির নাসারন্ধ্র ভেদ করে যায়। আর্শি মাথা তুলে চাইল। আযরানের পানে তাকিয়ে হুট করেই বলে উঠল,
“আমার জন্য তোর অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাই না রে আযরান?”
“হুম তো?”
নির্লিপ্ত কন্ঠে কথাটা বলে এককদম এগোলো আযরান। নজরে এলো আর্শির বিস্ময়ে ছেঁয়ে যাওয়া চক্ষুযুগল। তার কথায় যে মেয়েটা অবাক হয়েছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। আযরানের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা দেখা গেল। যা দেখে কপাল কুঁচকাল আর্শি। নিমিষেই নাক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“আমি জানি আমার জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাই বলে তুই এভাবে বলবি? আর আমাকে এত সহজে তোর সাথে আসতো দিলো কিভাবে? সত্যি করে বলতো।”
“টাকা দিতে হয়েছে। পাঁচলক্ষ!”
“কিহহ!”
আর্শি যেন আকাশ থেকে পড়ল। চক্ষুদ্বয় বিশাল আকার ধারণ করল তৎক্ষনাৎ। আর্শির এহেম দৃষ্টিতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি প্রস্ফুটিত হলো আযরানের। আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো আর্শি। এতগুলো টাকা দিতে হয়েছে? আর আযরান কোথায় পেল এত টাকা? অবাক হয়ে বলে উঠল,
“এতটাকা কোথায় পেলি ভাই?”
সাথে সাথে কপাল কুঁচকে গেল আযরানের। এতক্ষণে ঠোঁটে বহমান হাসিটাও মিলিয়ে গেল নিমিষেই। ভাই! তার কোন জন্মের ভাই লাগে ও? আযরান চোয়াল শক্ত করে রাগী দৃষ্টিতে চাইল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“থাপ্পড় না খেতে চাইলে চোখের সামনে থেকে সর।”
“আমি আবার কি করলা?”
আর্শি প্রচন্ড অবাক হলো। সে কি করেছে কিছুই বুঝলো না। তবুও আযরানকে পাত্তা না দিয়ে মিনমিন করে বলে উঠল,
“বল না কোথায় পেয়েছিস এত টাকা।”
আযরানের অভ্যন্তর ভেদ করে তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে এলো। সামনে থাকা মেয়েটাকে তার মাথায় তুলে আছাড় মারতে ইচ্ছা করছে। তবুও বহু কষ্টে নিজের ইচ্ছেটাকে দমিয়ে বলে উঠল,
“টাকা গুলো নকল ছিল।”
“এহহ!”
বিস্ময়ে হতবাক আর্শি। আযরানের কথায় হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো। অবাকতায় ঠোঁট দু’টো আলাদা হয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আযরানের পানে। এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো ছেলেটা। হুট করে আর্শির হাত টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। তড়িৎ গতিতে ঝুঁকে এলো আর্শি দিকে। অন্যমনস্ক আর্শি আকস্মিক আযরানকে এতো নিকটে অনুভব করতেই হতভম্ব হয়ে পড়ল। শরীরে প্রত্যেকটা লোপ দাঁড়িয়ে গেল ইতিমধ্যে। আযরান আরেকটু এগিয়ে এসে আর্শির দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি স্থির করল। ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকাবি না। একদম খেয়ে ফেলবো।”
“হুহহ?”
শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিউরণ অনুভব করল আর্শি। হৃদস্পন্দনের গতিও অস্বাভাবিক। পুনরায় আযরানের কথা শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করতেই স্তব্ধ হয়ে পড়ল আর্শি।
“চল বিয়ে করবো আর্শি।”
মুহুর্তে থমকে গেল আর্শির পুরো পৃথিবী। নিজের কানেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এই মাত্র আযরান কি বললো। চক্ষুদ্বয় বড় বড় অবাক নেত্রে তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা মানুষটার পানে। এই মাত্র কি সে ঠিক শুনলো? নাকি পুরোটাই তার ভ্রম? আযরানের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল ব্যাপারটা। নাহ! আযরান মজা করে বিয়ের কথা বলল? আর্শির চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হতে শুরু করল। মাথা এসে হানা দিলো নোমানের বেইমানির কথা। নিমিষেই ফুঁপিয়ে উঠল সে। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল,
“কেন মজা করছিস আমার সাথে আযরান? এমনিই তো মনের অবস্থা জানিস।”
“তোর কি মনে হয়? আমি মজা করছি?”
থমথমে নিরবতা গ্রাস করে ফেলেছে পুরো জায়গাটাকে। শুধুমাত্র আর্শির নাক টানার শব্দ প্রতিফলিত হচ্ছে। রাত্রির শীতল বাতাস ক্ষণে ক্ষণে আযরান আর আর্শিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর্শির মাথায় টানা ঘোমটা সেই কখন ধসে পড়েছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে তখনও সামনে থাকা ছেলেটার পানে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। কোনোমতে নাক টেনে বলে উঠল,
”তুই কি আমাকে ভালোবাসিস?”
আযরান শান্তচোখে তাকাল। আর্শির দিকে দৃষ্টি স্থির করেই বলে উঠল,
“উঁহু! এইসব পাগলের কাজ আমি করি না।”
আর্শি অঝরে কেঁদে চলেছে। চোখের পানি নাকের পানি একাকার অবস্থা। সেইদিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আযরান। এবার আর্শি ফুঁপিয়ে উঠল। হুট করে এগিয়ে এসে আযরানের পকেট থেকে রুমাল বের করল৷ পরক্ষণেই নাক মুখ মুছে পুনরায় রুমাল গুঁজে দিল আযরানের পকেটে। নাক টেনে বলে উঠল,
“তাহলে বিয়ে করতে চাস কেন বেয়াদব।”
অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা ছেলেটা। গভীর দৃষ্টি আযরানের। আকস্মিক তুচ্ছ কন্ঠে বলে উঠল,
“ইচ্ছে হলো।”
“ইচ্ছে হলেই বিয়ে করতে হবে? আমি করবো না।”
“তুই করবি না তোর ঘাড় করবে।”
কিরূপ প্রতিত্তর করবে বুঝতে পারছে না আর্শি। সে এখনোও বিশ্বাসই করতে পারছে না। প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আযরানের পানে। আযরানের দৃষ্টিও স্থির আর্শির অশ্রুসিক্ত আঁখিদ্বয়ে। তাদের মাঝে দূরত্বও খুব কম। আর্শি আপনমনে ঢোক গিলল। আযরানের হাতের মুঠোয় থাকা নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে উঠল,
“হাত ছাড়! তোর মাথা খারাপ হয়েছে? তুই আমার ছোট। কিসব উল্টো পাল্টা বলছিস।”
সাথে সাথে আর্শির দু’হাত প্যাচিয়ে পিছনে মুচড়ে ধরলো আযরান। সচকিত চোখে তাকাল আর্শি। চক্ষুদ্বয় এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে। একরাশ বিস্ময় এসে জমলো চক্ষে। হাত পায়ে কম্পন ধরল তীব্রভাবে। তার হৃদপিন্ডের গতিতে আরও বাঁড়িয়ে দিতে আযরান ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১১
“আমি ছোট? কোনদিক দিয়ে ছোট দেখা। বিয়ে করার জন্য যা যা বড় হওয়া চাই। আগাগোড়া সবটাই বড় আছে।”
আর্শি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। আযরানের কথায় যেন কর্ণদ্বয় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। এই আযরানকে সে চিনতেই পারছে। আযরান কখনো এভাবে কথা বলেনি। লজ্জায় পুরো শরীর কেঁপে উঠছে তার। কি সাংঘাতিক! আকস্মিক আযরানের দৃষ্টি পড়ল আর্শি হালকা গোলাপি ওষ্ঠের পানে। সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলল। পরক্ষণেই তড়িৎ গতিতে আর্শিকে নিয়ে হাঁটা ধরল। আঁড়চোখে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠল,
“চল আগে বিয়ে করবো পরে তোকে ঠেসে একটা চুমু খাবো। নাহলে আজকে আমি দম আঁটকে মারা যাবো সিউর।”
