Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৯
নওরিন কবির তিশা

সময় থেমে থাকে না; নদীস্রোতের মতোই সে বহমান। কেবল পেছনে ফেলে যায় স্মৃতির পাতায় দোলা দেওয়া কিছু অমলিন মুহূর্ত, যা হৃদয়ের মণিকোঠায় সঞ্চিত থাকে চিরকাল। জীবন তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে, আর মানুষ একসময় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে সেই পরিবর্তনের সাথে।দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে বেশ কিছু দিন। সময়ের নিয়মে স্মৃতির সেই তীব্র আলোড়ন স্তিমিত হয়ে এসেছে, সবাই যার যার চেনা প্রাত্যহিকতায় ফিরে গিয়েছে।আর্য আবার ফিরে গেছে তার চেনা সমুদ্রে, যোগ দিয়েছে নেভির কর্মব্যস্ত জীবনে। অসীম জলরাশির মাঝে সে এখন ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে। অন্য দিকে, তৃষার জীবনও এখন কাটে ঘড়ির কাঁটা ধরে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা;কাঙ্ক্ষিত অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেওয়ার এক কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত সে। পড়ার টেবিল আর বইয়ের স্তূপই এখন তার সারাদিনের সঙ্গী। তার ওপর আবার ছোট্ট টুইংকেলের বার্ষিক পরীক্ষা একেবারে আসন্ন। সব মিলিয়ে, সংসার আর পড়াশোনার এই দ্বিমুখী ব্যস্ততায় তৃষার দিনগুলো যেন এক মুহূর্তও জিরোবার অবকাশ পাচ্ছে না ও। যদিও জাহানারা বেগমের উপস্থিতি কিছুটা উপশম দিচ্ছে ওকে তবুও সময় যত গড়াচ্ছে ব্যস্ততারা ততটাই গ্রাস করছে ওকে।
আজ আবার টুইংকেলের বিদ্যাপীঠে মা সমাবেশ। তৃষার উপস্থিতি আবশ্যক হওয়ায় সকাল সকাল সেই প্রস্তুতিতেই মগ্ন ও। টুইংকেলকে প্রস্তুত করেই কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলো ওরা। সকাল থেকে শরীরটা ভালো না। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়; বমি বমি ভাব মাথা ঘোরানো ইত্যাদি নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ওর।
হয়তোবা আহারের বিলম্বের দরুন এটা ঘটছে ইদানিং। তাই এই খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করছে না তৃষা। চলন্ত গাড়ি;আশেপাশের কোলাহল পিছু ঠেলে সেটি এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখ পানে।জানালার বাইরে সজল মেঘের আনাগোনা। তৃষা নিজের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখের পাতাটা একটু বুজে নেওয়ার চেষ্টা করল।
তৃষার অসুস্থতা হয়তো বুঝলো টুইংকেল। তাই আজ আর কথা বাড়ালো না ও। আলগোছে তৃষার কাঁধ বরাবর মাথা ঠেকিয়ে বসলো। তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকালো তৃষা টুইংকেলের দিকে ফিরে বলল,,

– মাম্মাম? তুমি কি সিক ফিল করছ?
টুইংকেল মাথা নাড়িয়ে বলল,,- নো বানি। বাট আই থিংক ইয়্যু আর সিক। তাই তোমাকে ডিস্টার্ব করিনি।
টুইংকেলের কথায় মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো তৃষার অধরকোণে। মোমের পুতুলের ন্যায় তুলতুলে মেয়েটি কতটা বুঝদার! এতটুকু বয়সে কত কিছু বোঝে ও। তৃষা ঠোঁট ছোঁয়ালো ওর তুলতুলে ললাটে,,
– আমার মাম্মাম টা!
এতক্ষণে প্রিয় বানিকে একটু স্বাভাবিক হতে দেখে আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠল ছোট্ট টুইংকেল। আলতো হাতে তৃষার গলা জড়িয়ে বললো,,
– বানি? আজ একটু ঘুরতে যাবে? প্লিজ!
মেয়ের আবদার ফেলতে পারল না তৃষা। কিছু না ভেবেই বলে দিলো, – ওকে, স্কুল থেকে ফেরার পথে যাব না হয়।
টুইংকেল শব্দ করে চুমু খেলেও তৃষার চোয়ালে,- তুমি পৃথিবীর বেস্ট বানি! লাভ ইয়্যু বানি।
– লাভ ইয়্যু টু সুইটহার্ট।

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি চিরে আর্যর ফ্রিগেটটি তার অজেয় দর্পে এগিয়ে চলেছে। দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলসীমার গভীর আর্যর বর্তমান ঠিকানা। জাহাজের কমান্ডিং ব্রিজে দাঁড়িয়ে আর্য। আকস্মিক জাহাজের রাডার সিস্টেম অদূরে একটি রহস্যময় বস্তুর উপস্থিতি শনাক্ত করল। জাহাজের অপারেশন অফিসার ক্যাপ্টেন সামাদ নিচু স্বরে রিপোর্ট করল,
– স্যার, সাউথ-ওয়েস্ট কোঅর্ডিনেটে একটি অজ্ঞাত যানের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কোনো রেসপন্স আসছে না।
আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন মনিটরের ওপর। ঠান্ডা মাথায় সে আদেশ দিল,,
– ইমিডিয়েট ইন্টারসেপ্ট ট্র্যাক ক্যালকুলেট করো। আমাদের পেট্রোলিং জোন লঙ্ঘন করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। জাহাজকে ফুল রেডিনেস মুডে নিয়ে এসো।
সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়াকে তুচ্ছ করে আর্যর নেতৃত্বে জাহাজটি বিদ্যুতগতিতে লক্ষ্যের দিকে ছুটছে। কমান্ডিং ব্রিজের ভেতরের পরিবেশ এখন ভীষণ থমথমে, কেবল রাডারের যান্ত্রিক বিপ শব্দ আর ওয়্যারলেসের কর্কশ আওয়াজ সেই স্তব্ধতা ভাঙছে। আর্য তার বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন সমুদ্রের বুকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সমুদ্রের ঢেউগুলো জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ে শ্বেতশুভ্র ফেনা তুলছে। সে পাশ ফিরে কঠোর গলায় বলল,
– সামাদ, আমাদের কারেন্ট পজিশন থেকে অবজেক্টটার ডিসটেন্স কত? আইডেন্টিফিকেশন ফ্রেন্ড অর ফো কী বলছে?
সামাদ দ্রুত কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,

– স্যার, ডিস্টেন্স মাত্র ফাইভ নটিক্যাল মাইলস। আইএফএফ সিগন্যাল নেগেটিভ। ওটা কোনো কমার্শিয়াল ভেসেল বা রেজিস্টার্ড ফিশিং ট্রলার নয়। সম্ভবত কোনো ফরেন ইনট্রুডার অথবা ইলিগাল কার্গো শিপ। আন্তর্জাতিক জলসীমা পেরিয়ে আমাদের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে ঢুকে পড়েছে।
আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সমুদ্রের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সে কোনো অবস্থাতেই দেশের জলসীমার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হতে দিতে পারে না। সে হেলম-এ থাকা কোয়ার্টার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে আদেশ জারি করল,
– কোর্স অল্টার করো। স্টিয়ার জিরো-নাইন-জিরো ডিগ্রি। স্পীড বাড়িয়ে এইটিন নটস করো।
– ইয়েস স্যার, কোর্স জিরো-নাইন-জিরো, স্পীড এইটিন নটস!
কোয়ার্টার মাস্টার তৎক্ষণাৎ লিভার ঘোরালেন। জাহাজের প্রপেলারের গতি বাড়ার সাথে সাথে পুরো ফ্রিগেটটি এক তীব্র কম্পনে কেঁপে উঠে সমুদ্রের বুক চিরে আরও দ্রুতবেগে ধাবিত হলো।আর্য এবার কমিউনিকেশন অফিসারের দিকে ফিরল,
– ভেসেলটাকে মেরিটাইম ভিএইচএফ চ্যানেল সিক্সটিন-এ শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দাও। যদি রেসপন্স না করে, তবে অ্যাকশন স্টেশন অ্যালার্ম বাজাও। উই মে নিড টু ইন্টারসেপ্ট অ্যান্ড বোর্ড।

– ছেলেকে কেমন বিয়ে দিলে হামিদা? জানানো, শোনানো নাই! তা মা তোমার নাম কি?
অচেনা ভদ্রমহিলা সোফায় আয়েশ করে বসে মেহেসানার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখছিলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিচারকসুলভ মানসিকতা স্পষ্ট। তিনি আবার প্রশ্নবাণ ছুড়লেন,
– হামিদা, মেয়েটার তো কোনো হদিশই জানলাম না! বংশ পরিচয় কী? তোমাদের তো বড় ঘর, তা এমন হুট করে অচেনা কাউকে বউ করে আনলে? মানসম্মানেরও তো একটা ব্যাপার আছে!
মেহেসানা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওর আঙুলগুলো শাড়ির আঁচল নিয়ে অকারণে পাক খাচ্ছে। এই অপমানজনক কথাগুলো ওর বুকের ভেতরটা দপ করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সৌজন্য বজায় রেখে ও কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। হামিদা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করলেন,
– আরে ভাবি, ওসব কথা বাদ দেন না! আর মেহেসানার পরিচয় তো আদ্রিয়ানই ভালো জানে, ও নিজেই পছন্দ করেছে…
কিন্তু সেই আত্মীয় মহিলা থামার পাত্রী নন। তিনি এবার সরাসরি মেহেসানার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– তা মা তুমিই বলো দেখি।
মেহেসানা তখন উত্তরের সন্ধানে মরিয়া কি বলবে কি না বলবে এমন দোলাচলে ভুগছে। এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে নেমে এল আদ্রিয়ান। পরনে সাদা টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল প্যান্ট। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে ও হিমশীতল কণ্ঠে বলল,

– ওকে কি প্রশ্ন করছিলেন আন্টি?
আদ্রিয়ানের উপস্থিতিতে খানিক বিব্রত হলেন বোধ হয় মহিলাটি। আদ্রিয়ান এগিয়ে এসে মেহেসানার পাশে দাঁড়িয়ে আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল। মেহেসানা কিঞ্চিৎ বিস্মিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আদ্রিয়ানের দিকে। তবে আদ্রিয়ান তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে আত্মীয় মহিলাটির দিতে তাকাতেই মহিলা হকচকিয়ে গিয়ে বললেন,
– আরে আদ্রিয়ান! তুই তো শুনলিই না আমি কী বলছিলাম, আমি তো শুধু—!
আদ্রিয়ান ঠান্ডা হাসি হেসে কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
– আমি সবটাই শুনেছি। তো আন্টি আমি মেহেসানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। সো, শ্যি ইজ ইম্পর্ট্যান্ট ফর মি নট হার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস। বাট আপনি যেহেতু শুনছেন তাই বলি, ও এক সম্মানী ফ্যামিলির মেয়ে প্লাস এখন এক সম্মানী ফ্যামিলির বউ। সঙ্গে একজন ফিউচার লয়ার। আশা করি বুঝতে পেরেছেন?
পুরো ঘরে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আদ্রিয়ান এবার মেহেসানার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
– চলো তো,এক কাপ কফি লাগবে আমার।
সে মেহেসানার হাতটা শক্ত করে ধরে সবাইকে একপ্রকার উপেক্ষা করেই রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।

রান্নাঘরের ভেতর পা রাখতেই এতক্ষণের সেই শক্ত বাঁধনটা আলতো করে ছেড়ে দিল আদ্রিয়ান। মেহেসানার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অপরাধবোধ মাখানো স্বরে বলল,
— স্যরি! আসলে সবার সামনে ওভাবে হাতটা ধরার জন্য…
মেহেসানা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। আদ্রিয়ানের সৃষ্ট এই আকস্মিক দূরত্ব যেন ওর বুকের ভেতর কোথাও একটু আঘাত করছে। নিজেকে সামলে নিয়ে ও আদ্রিয়ানের দিকে তাকাল। ওর দুচোখে তখন কৃতজ্ঞতার রেশ স্পষ্ট;মৃদু স্বরে ও বলল,
— ধন্যবাদ!
আদ্রিয়ান কপালে সামান্য কুঞ্চন ফুটিয়ে একটু অবাক হয়ে তাকাল। প্রশ্ন করল,
— ধন্যবাদ কেন?
— আমাকে ওই অপমানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। আজ আপনি না থাকলে…
মেহেসানার কথা শেষ হওয়ার আগেই আদ্রিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। আমার বাড়িতে কেউ তোমাকে নিয়ে আঙুল তুলবে, সেটা আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না।
’ দায়িত্ব’ শব্দটা কর্ণ কুহরে পৌঁছাতেই মেহেসানার ঠোঁটের কোণে একটা মলিন হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনটা যেন এক নিমেষে কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল ওর। আদ্রিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে যখনই রান্নাঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মেহেসানা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। এক বুক আকুলতা নিয়ে বলে উঠল,
— শুধুই দায়িত্ব?
কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের পথচলা থমকে গেল। ও ধীরপায়ে পেছন ফিরে তাকাল। ওর চোখে এখন গভীর কৌতুহল। মেহেসানার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে ও জিজ্ঞেস করল,

— আরো কিছু চাও?
মেহেসানার কণ্ঠ চিরে আর কোনো শব্দ বের হলো না, যেন এক নিমেষে সব ভাষা হারিয়ে গিয়েছে ওর। বুকের ভেতর চলতে থাকা তীব্র দোলাচল আর মনের ব্যাকুলতা কোনো যুক্তিতেই ও সাজিয়ে উঠতে পারল না। আদ্রিয়ান ওর সেই নীরবতার মর্মার্থ খুঁজতেই যেন উৎসুক চোখে চাতকের মতো চেয়ে রইল।
সেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে মেহেসানা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কেবল এটুকুই বলল,,
— কফিটা নিয়ে আসছি।
মেহেসানার সন্তর্পণে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে আদ্রিয়ান আর দাঁড়াল না, এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। ওর প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল মেহেসানা। ইস কতই না ভালো হতো যদি ও হৃদয় বিদ্যমান কথাগুলো ও ভাষ্যে পরিণত করতে পারত!

হাসপাতাল করিডর জাহানারা বেগমের অস্থির পদচারণায় মুখর। পার্শ্ববর্তী চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে আছে ছোট্ট টুইংকেল। ডাগর চক্ষু কার্নিশে শ্রাবণের মেঘ জমেছে কিঞ্চিৎ।আফজাল সাহেব হাসপাতালের বেঞ্চের কোণায় বসে আছেন, ললাটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।
থমথমে নীরবতা ভেঙে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়েরা। তাঁকে দেখা মাত্রই জাহানারা বেগম অস্থির পায়ে এগিয়ে গেলেন। আফজাল সাহেবও বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে-মুখেও চরম উদগ্রীবতা।জাহানারা বেগম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— ডাক্তার, আমার মেয়েটা কেমন আছে? ওর কী হয়েছে বলুন তো?
ডা. সায়েরা মুখে মৃদু আশ্বস্তকারী হাসি ফুটিয়ে বললেন,
— ভয়ের কিছু নেই, উনার জ্ঞান ফিরেছে । আসলে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা এবং সঠিক সময়ে খাবার না খাওয়া দরুন ব্লাড প্রেশারটা ফল করেছিল, যার কারণে উনি সেন্সলেস হয়ে যান। তবে…
ডাক্তার একটু থামতেই আফজাল সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন,

— কোনো জটিলতা ডাক্তার?
— না, জটিলতা নয়। তবে ওনার শারীরিক কিছু লক্ষণ দেখে আমি একটা বিশেষ বিষয় আশঙ্কা করছি। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু টেস্ট দিয়েছি। রিপোর্টগুলো হাতে পেলেই মেইন রেজাল্ট জানাতে পারব। আপনারা চাইলে এখন ভেতরে গিয়ে ওনার সাথে দেখা করতে পারেন।
ডা. সায়েরা প্রেসক্রিপশনটা নার্সের হাতে দিয়ে কেবিনের দিকে ইশারা করলেন। ডাক্তারের কথায় জাহানারা বেগম আর আফজাল সাহেব যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আফজাল সাহেব পাশে বসা ছোট্ট টুইংকেলের মাথায় হাত রাখলেন। এতোক্ষণ ভয়ে চুপসে থাকা মেয়েটি দাদুভাইয়ের হাত ধরতেই কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,,
— দাদুভাই, বানি ঠিক আছে তো? আমরা কি এখন ভেতরে যাব?
— হ্যাঁ দাদুমণি, তোমার বানি একদম ঠিক আছে। চলো, আমরা ভেতরে যাই।
আফজাল সাহেব টুইংকেলকে কোলে তুলে সম্মুখ পানে অগ্রসর হলেন।

কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল তৃষা বেডে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। স্যালাইনের সুঁই ফোটানো হাতটার দিকে তাকিয়ে ও স্তব্ধ হয়ে আছে। চোখ দুটো এখনো কিছুটা ক্লান্ত ও মলিন। শ্বশুর-শাশুড়ি আর টুইংকেলকে ভেতরে ঢুকতে দেখে ও নিজেকে একটু সামলে নিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করল।
টুইংকেল কোল থেকে নেমেই একছুটে বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তৃষার সুস্থ হাতটা নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে বলল,
— বানি! তুমি এভাবে ঘুমিয়ে গিয়েছিলে কেন? আই ওয়াজ সো স্কেয়ার্ড!
তৃষা আলতো করে টুইংকেলের গালটা ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
— আই অ্যাম স্যরি সুইটহার্ট। বানির একটু টায়ার্ড লাগছিল তো, তাই। দেখো, আমি এখন একদম ঠিক আছি।
জাহানারা বেগম বেডের পাশে এসে বসে তৃষার কপালে হাত রাখলেন। পরম মমতায় বললেন,,
— শরীরটার ওপর এত ধকল দেওয়া কি ঠিক হয়েছে মা? নিজের প্রতি এতটুকু খেয়াল রাখিস না তুই। সংসার, টুইংকেলের পড়াশোনা, নিজের ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা—সব একা হাতে সামলাতে গিয়ে শরীরটাকে এক্কেবারে শেষ করে ফেলেছিস!
শাশুড়ির এই মাতৃসুলভ বকুনিতে তৃষার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় ভিজে উঠল। ও অপরাধী স্বরে বলল,,
— আসলে ইদানীং সকালের দিকে খাবার খেতে ইচ্ছে করত না মা। ভাবিনি এভাবে মাথা ঘুরে পড়ে যাব। শুধু শুধু তোমাদের কষ্ট দিলাম।
আফজাল সাহেব এগিয়ে এসে গম্ভীর-স্নেহশীল কণ্ঠে বললেন,

— কষ্টের কথা বলে আমাদের পর করে দিও না মা। আর্যর অনুপস্থিতিতে তোমার দেখভাল করা আমাদের দায়িত্ব। আজ থেকে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরের যত্নটাও সমানভাবে নিতে হবে। কোনো রকম অবহেলা আমি আর বরদাস্ত করব না।
জাহানারা বেগম যোগ করলেন, — বাবা ঠিকই বলেছেন তৃষা। এখন থেকে তোর খাওয়াদাওয়ার পুরো দায়িত্ব আমার।
টুইংকেলও এবার কোমরে হাত দিয়ে বড়দের মতো সায় দিয়ে বলল,
— হ্যাঁ বানি! দাদুমণি একদম রাইট। তুমি আর ব্রেকফাস্ট স্কিপ করতে পারবে না। আমি নিজে এসে তোমাকে খাইয়ে দেব, আন্ডারস্ট্যান্ড?
টুইংকেলের এমন পাকা পাকা কথায় পুরো কেবিনের থমথমে ভাবটা নিমেষেই কেটে গেল। তৃষা হেসেই ফেলল এবং ওর চিবুক নেড়ে দিয়ে বলল,
— ইয়েস মাই লিটল প্রফেসর, আন্ডারস্ট্যান্ড।
হাসি-ঠাট্টার মাঝেই তৃষার হঠাৎ মনে পড়ে গেল আর্যর কথা। ও কিছুটা শঙ্কিত চোখে জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

— মা… একটা কথা বলব?
— হ্যাঁ মা, বল।
তৃষার এক বুক দ্বিধা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
— বলছিলাম… ওনাকে কি এই ব্যাপারে কিছু জানানো হয়েছে?
আফজাল সাহেব বললেন,
— না, এখনো জানানো হয়নি। ভাবলাম আগে ডাক্তার দেখাই, তারপর…।
তৃষা তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
— বাবা, প্লিজ তাহলে ওনাকে এখন কিছু জানাবেন না। এমনিতেই জাহাজে থাকলে ও বাড়ির জন্য সারাক্ষণ চিন্তিত থাকে। এখন যদি ও শোনে আমি হাসপাতালে, তবে ওখানে ও কিছুতেই মন দিতে পারবে না। ওর কাজের ক্ষতি হোক আমি চাই না। রিপোর্টগুলো আসুক, আমি নিজেই পরে ওকে বুঝিয়ে বলব।
জাহানারা বেগম আফজাল সাহেবের দিকে তাকালেন। তৃষার এই দায়িত্ববোধ ও আর্যর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা দেখে তাঁদের মনটা ভরে গেল। আফজাল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে বললেন,
— আচ্ছা মা, তোমার কথাই রইল। আর্যকে এখন আমরা কিছুই জানাচ্ছি না। তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরো, সেটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া।
তৃষা বালিশে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে কেবিনের জানালার বাইরে তাকাল। আকাশের মেঘগুলো কেটে গিয়ে এক ফালি রোদ উঁকি দিচ্ছে। টুইংকেল ওর পাশে এসে বসলো। আফজাল সাহেব বেরিয়ে গেলেন, জাহানারা বেগমও পিছু পিছু ছুটলো রিপোর্ট আনতে।

সুখের বন্যা বইছে সমগ্র সুখনীড় জুড়ে।হৃদয়ের গভীর উচ্ছ্বাসে পুরো বাড়ি আজ এক অপার্থিব সুখে মগ্ন। ডক্টর রিপোর্ট অনুযায়ী তৃষা মা হতে চলেছে। এই পরম মাহেন্দ্রক্ষণ যেন চারদিকের বাতাসেও আনন্দের রেণু উড়িয়ে দিচ্ছে। খবর পাওয়ার পরপরই সপরিবারে এসেছে আদ্রিয়ানরা। তবে সুখ নীড়ে এসেই মেহসানা সরাসরি এসেছে তৃষার কক্ষে। তৃষা তখন কপালে হাত রেখে বিছানায় শুয়ে। মেহেসানের দৌড়ে এসে ওর পাশে বসে পড়লো। খপ করে ওর নরম হাতটা নিজের মুঠোয় পুরে বলল,,
—কংগ্রোওওওওও বেইবি! আমি খালামনি হবো! আল্লাহ! আমি তো ভাবতেই পারছি না!
একপর্যায়ে ও প্রায় জড়িয়ে ধরল তৃষাকে। তৃষা তড়িঘড়ি বিছানায় আধ শোয়া হয়ে বসে বললো,,
— আরে আরে, কি করিস?
— তুই মা হবি জানু।
মেহেসানার উচ্ছ্বসিত আলিঙ্গন থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে তৃষা ওর গালে মৃদু টোকা দিল। ওষ্ঠকোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,

— আরে আস্তে! তোর ভাগ্নে বা ভাগ্নি কিন্তু তোর এই এক্সাইটমেন্ট দেখে এখনই ভয় পেয়ে যাবে।
মেহেসানা তৃষার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে চোখের কোণের আনন্দাশ্রু মুছে বলল,
— আই জাস্ট কান্ট বিলিভ ইট, বেবি! তুই মা হতে যাচ্ছিস। ট্রাস্ট মি, খবরটা শোনার পর থেকে আমার হার্টবিট নরমাল হচ্ছে না। আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর ইয়্যু, ডিয়ার!
তৃষা এক গাল হেসে বলল,
— থ্যাংকস আ লট, জানু। বাট তুই খালামণি হবি বলে যেভাবে চিৎকার করলি, পুরো এলাকা মেবি জেনে গেছে। একটু ক্লাম ডাউন, প্লিজ!
— নো ওয়ে! আজকে কোনো ক্লাম ডাউন নেই।
মেহেসানা চিবুকে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
— এখন থেকে তোর সব আবদার, সব ক্র্যাভিংস ফুলফিল করার দায়িত্ব আমার।
তৃষা আলতো হেসে মাথা নাড়ল,,

— আচ্ছা বাবা, তাই হবে।
ঠিক তখনই দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে তৃষার দৃষ্টি গেল। আদ্রিয়ান পকেটে হাত গুঁজে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে মেহেসানার দিকে। কতদিন পর ওর মলিন মুখে এমন বাঁধভাঙা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে! সেই হাসির দ্যুতিতে আদ্রিয়ানের ভেতরের সব অন্ধকার যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ও অপলক চেয়ে রইল চাতকের মতো।তৃষা আদ্রিয়ানের সেই চাউনি লক্ষ্য করে মুচকি হাসল। মেহেসানার কনুইয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
— এই বেডি, একটু পেছনে তাকিয়ে দেখ। কেউ একজন কিন্তু তোর এই কিউট হাসির ওপর ক্রাশ খেয়ে অলরেডি ফ্রিজ হয়ে গেছে!
মেহেসানা চমকে উঠে পেছনে তাকাতেই আদ্রিয়ানের গভীর, জিজ্ঞাসু দৃষ্টির মুখোমুখি হলো। মুহূর্তেই ওর ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ও দ্রুত তৃষার দিকে ফিরে মুখ লুকাতে চাইল। আদ্রিয়ান তখনো দরজায় হেলান দিয়ে মৃদু হেসে শান্ত গলায় বলল,
— কংগ্রাচুলেশনস, ভাবি!
তৃষা ঈষৎ হেসে বলল, — থ্যাংক ইয়্যু ভাইয়া।

মেহসানারা বিদায় নিয়েছে বেশ অনেকক্ষণ। কক্ষের মাঝেই ধীরপায়ে পায়চারি করছিল তৃষা। এক অযাচিত অস্থিরতা গ্রাস করেছে ওকে; কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করছে, বড্ড অস্থির অস্থির লাগছে। মনের এক কোণে তীব্র বাসনা জাগছে আর্যকে একবার ফোন করতে, ওর চেনা কণ্ঠস্বরটা শুনতে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ছে, আর্য অবসর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো ওকে কল করে।
তাই এখন আর্যকে কল করাটা নিছক বোকামি ভিন্ন অন্য কিছু নয়, কেননা ও চাইলেও এখন কল রিসিভ করতে পারবে না। এদিকে জাহানারা বেগমদের যত্ন মুহূর্তের মাঝেই আকাশ ছুঁয়েছে যেন। সদ্য প্রেগনেন্সি রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে মাত্র, অথচ জাহানারা বেগম আর আফজাল সাহেবের যত্নের বহর দেখে মনে হচ্ছে তৃষা বুঝি আট-নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা!
তৃষা জালনার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল দৃষ্টি নিবদ্ধ দূর আকাশে। সহসা এক পশলার দমকা হাওয়ার ন্যায় কক্ষে প্রবেশ করল ছোট্ট টুইংকেল। প্রতিবারের ন্যায় এবারও কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা তৃষার হাঁটু বরাবর গিয়ে জড়িয়ে ধরল পিছন থেকে। তবে এতে তৃষা বিন্দুমাত্র অবাক হলো না, কারণ টুইংকেলের এমন আচমকা ভালোবাসার প্রকাশে ও অভ্যস্ত।
তৃষা আলতো করে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। টুইংকেল ডাগর ডাগর চোখে তৃষার মুখের দিকে চেয়ে আধো-আধো আদুরে গলায় প্রশ্ন করল,

— হাউ আর ইউ ফিলিং নাও, বানি? এখন তোমার কেমন লাগছে?
তৃষা মুচকি হেসে টুইংকেলের কপালে আলতো করে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল,
— আই অ্যাম ফিলিং মাচ বেটার, সুইটহার্ট। তোমার বানি এখন একদম সুপার ফাইন।
তৃষার উত্তর শুনেও টুইংকেলের মুখের সেই চঞ্চলতা ফিরল না। কেমন যেন একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর জড়তা ভর করল ওর ছোট্ট অবয়বে। একটু ইতস্তত করে, নখ দিয়ে তৃষার ওড়নার আঁচল খুঁটতে খুঁটতে আকস্মিক ও বলে উঠল,
— বানি… আমি তোমার কাছে একটা আবদার করব? আই মিন, একটা জিনিস চাইব?
মেয়ের কণ্ঠে এমন অভূতপূর্ব দ্বিধা দেখে তৃষা কিছুটা সরু নেত্রে তাকাল। এই প্রথম এতটুকু একটা বাচ্চাকে কোনো কিছু চাইতে এতটা ইতস্তত করতে দেখল ও। তৃষা আর দাঁড়িয়ে না থেকে একটু ঝুঁকে টুইংকেলের মুখোমুখি উচ্চতায় বসল। ওর তুলতুলে নরম চোয়ালে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে, সেখানে গভীর ভালোবাসায় একটা চুমু খেল। তারপর নরম গলায় বলল,

— কী হয়েছে আমার মাম্মামটার? বলো না, কী চাই তোমার? বানির কাছে চাইতে এত দ্বিধা কিসের, হুম?
ছোট্ট হৃদয়ে চলা অশান্ত ঝড়কে শান্ত করার প্রয়াসে টুইংকেল কয়েক মুহূর্ত মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এক বুক ভরসা নিয়ে তৃষার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর নিষ্পাপ চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত আকুলতা। অনেকক্ষণ পর ও অত্যন্ত মৃদু, কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,

— আমি… আমি কি তোমাকে একটু ‘মা’ বলে ডাকতে পারি বানি? ক্যান আই কল ইয়্যু মা?
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই তৃষার পুরো শরীর যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। এক অপার্থিব অনুভূতিতে ও যেন বাকরুদ্ধ, স্পন্দনহীন। বুকের ভেতর এতদিনের জমে থাকা একটা সুপ্ত হাহাকার যেন নিমেষেই শীতল জলরাশিতে রূপ নিল। তৃষার চোখ দুটো টলটলে পানিতে ভিজে উঠল, চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো।
ও তো কতদিন ধরে মনে মনে এই একটা ডাক শোনার জন্য চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল! কতবার ভেবেছে টুইংকেল যদি ওকে ‘মা’ বলে ডাকত! কিন্তু টুইংকেল বিষয়টাকে কেমনভাবে নেবে, ও ওর জন্মদাত্রী মায়ের বিকল্প হিসেবে ওকে মেনে নিতে পারবে কি না—এই আশঙ্কায় তৃষা কোনোদিন নিজের মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনি। আজ সেই পরম কাঙ্ক্ষিত ডাকটি এই ছোট্ট মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসতেই, তৃষার মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন এই একটা শব্দের মাঝে এসে বিলীন হয়ে গেছে। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, অশ্রুসিক্ত চোখেই টুইংকেলকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ধরা কণ্ঠে আওড়ালো,,

— আচ্ছা!
সম্মতিটা পাওয়া মাত্রই টুইংকেল যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। তৃষার গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর গালে একটা টপটপ শব্দে চুমু খেল। তারপর মুখে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে মায়াবী কণ্ঠে বলল,
— তাহলে আজ থেকে তোমাকে আমি শুধু মা বলেই ডাকব! নো মোর বানি, ইউ আর মাই মাম্মী নাউ!
তৃষা অশ্রুসিক্ত চোখেই হেসে ফেলল। টুইংকেলের নাকটা হালকা টেনে দিয়ে বলল,
— ওরে আমার পাকা বুড়ি! তা হঠাৎ বানির ওপর এত রাগ কেন শুনি? ‘মা’ ডাকটা বুঝি খুব বেশি পছন্দ?
— ইয়েস মা! ‘মা’ ডাকলে মনে হয় তুমি শুধু আমার, একদম আমার নিজের! আই লাভ ইউ সো মাচ, মা!
টুইংকেলের মুখের প্রথম ‘মা’ ডাকটা শুনে তৃষার বুকটা এক পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল। ও আবার ওকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
— লাভ ইউ টু, মাই লিটল অ্যাঞ্জেল। আজ থেকে আমি শুধুই তোমার মা!

অন্তরীক্ষের বক্ষপটে কাস্তের ন্যায় ঝুলে আছে একফালি চাঁদ। টুইংকেল গভীর নিদ্রায় মগ্ন। তৃষা একঝলক ওর মায়াবী মুখশ্রীতে চেয়ে একটুকরা চুমু বসিয়ে দিলো ওর ছোট্ট ললাটে।
সহসা নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে বেজে উঠল তৃষার ফোনটা। স্ক্রিনে ‘মাই ক্যাপ্টেন’ নামটা ভেসে উঠতেই অস্থিরতায় দুলতে থাকা তৃষার বুকটা যেন শান্ত হয়ে এল। ও দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে আর্যর চেনা, গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
— হ্যালো জান? আই অ্যাম সো সো স্যরি মাই লাভ! আজকে একটা মারাত্মক ঝামেলায় ফেঁসে গিয়েছিলাম। সেটা সলভ করতে করতে একদম সময় পাইনি। খুব রাগ করে আছ আমার ওপর?
তৃষা পাশ বালিশ একহাতে চেপে ধরে অভিমানী গলায় বলল,
— রাগ করব না তো কী করব? আপনার ফোনের জন্য আমি কখন থেকে ওয়েট করছি জানেন? আর আপনি এখন কল দিলেন!
ওপাশের আর্য একটু হাসল;নরম গলায় বলল,

— আচ্ছা বাবা আই অ্যাম রিয়েলি সরি। কান ধরছি, যদিও তুমি দেখতে পাচ্ছ না। ট্রাস্ট মি, সারাদিন ওই ডেকের ওপর দাঁড়িয়েও আমার মনটা শুধু তোমার কাছেই পড়ে ছিল। এই যে ডিউটি শেষ করেই কিন্তু এক কাপ পানি ও না খেয়ে আগে তোমাকে কল দিয়েছি। এখনো কি রাগ থাকবে, হুম?
আর্যর এমন আদুরে কথায় তৃষার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। ও বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে, এবারের মতো মাফ করলাম। ডিনার করেছেন?
— উঁহু, এখনো করিনি। মেস-এ যাব এখন। তোমার গলাটা কেমন যেন একটু ভারী লাগছে মাই লাভ? শরীর খারাপ নাকি তোমার? সত্যি করে বলো তো?
আর্যর কণ্ঠে চট করে তীব্র উদ্বেগ আর ভালোবাসা টের পাওয়া গেল। তৃষা মুচকি হেসে পেটে হাত রাখল। ভেতরের সুখবরটা যেন এখনই উপচে পড়তে চাইছে। ও নিজেকে সামলে নিয়ে একটু রহস্যের সুরে বলল,

— ধুর, কী যে বলেন! আমি একদম পারফেক্ট আছি।
— সত্যি তো?
— একদম তিন সত্যি।
— ওকে! বাই দ্য ওয়ে, মাম্মাম কি করছে?
তৃষা এক ঝলক পাশে শুয়ে থাকা টুইংকেলের দিকে চাইলো,
— ও আমার পাশেই তবে ঘুমিয়ে আছে।
— আচ্ছা।
— আচ্ছা শুনুন?
— জ্বী বলুন?
তৃষা খানিক আমতা আমতা করে বলল,,
— আসলে… আপনাকে একটা ভীষণ বড় গুড নিউজ দেওয়ার আছে। শুনবেন?
— কী গুড নিউজ?
তৃষা ঠোঁট কামড়ে হেসে মাথা নাড়ল, যেন আর্য ওপাশ থেকে তা দেখতে পাচ্ছে। ও চোখ দুটো বন্ধ করে বলল,

— উঁহু, এত সহজে বলব না। অনেক বড় নিউজ, একটু সাসপেন্স তো থাকা দরকার। আপনি জাস্ট একটু গেস করেন না!
— মাই লাভ, প্লিজ এভাবে আটকে রেখো না! এমনিতেই কতদিন তোমার থেকে দূরে আছি, তার ওপর এমন করলে তো আমার কিউরিওসিটিতে আজ রাতে ঘুমই আসবে না। কী হয়েছে বলো? তোমার ইউনিভার্সিটির কোনো ভালো খবর? নাকি অন্য কিছু?
আর্য ওপাশ থেকে রীতিমতো আকুল হয়ে জোরাজোরি শুরু করে দিল। তৃষা ফিসফিস করে বলল,
— না, ইউনিভার্সিটির কিছু না। তবে তার চেয়েও হাজার গুণ বড় খবর। কিন্তু আমি এখন ফোনে কিচ্ছু বলব না। আপনি যখন নেক্সট টাইম পোর্ট-এ ব্যাক করবেন, তখন একদম সামনাসামনি জড়িয়ে ধরে বলব।
আর্য ওপাশ থেকে একটা গভীর শ্বাস ফেলে একটু নিচু, মাদকতাভরা কণ্ঠে বলল,
— তৃষা, দিস ইজ নট ফেয়ার! তুমি কিন্তু একজন দূর দেশে থাকা হাজব্যান্ডের ওপর টর্চার করছ। এমন করলে কিন্তু আমি এখনই স্পীডবোট নিয়ে চলে আসব তোমার কাছে।

— উমম…..আসুন। আমি কি মানা করেছি নাকি?
— দেখো বউ!
তৃষা থমকালো; জীবনে প্রথমবারের মতো আর্যর মুখে বউ সম্বোধনে ও স্তব্ধ,নির্বাক! হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে পরক্ষণেই দ্বিগুণ বেগে ছুটতে লাগল।গালের ওপর একঝলক তপ্ত লালিমা ছড়িয়ে পড়ল ওর।ফোনের ওপাশ থেকে আর্য হয়তো তৃষার এই নীরবতার পেছনের লাজুক মনোভাবটা টের পেল; তাই ওকে জ্বালাতে আরো মাদকতা মিশ্রিত কন্ঠে নেশাক্ত সুরে বলল,,
— কী হলো বউজান? একদম চুপ মেরে গেলে যে?
তৃষা বালিশে মুখ গুঁজে নিজের লাল হয়ে ওঠা গাল দুটো লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। হৃদপিণ্ডের ধকধক আওয়াজটা ও নিজেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু জড়তা জড়ানো গলায় বলল,

— আপনি না… বড্ড দুষ্টু হয়ে গেছেন!
— তাই নাকি বউজান?
— ক্যাপ্টেন!!!!
— হুমমমমমমম.?
— দেখুন, এমন করছেন কেন?
— কেমন করছি?
— এভাবে কেউ ডাক শুনে?
— তাহলে কিভাবে শোনে মিসেস?
— ধুর!
আর্য এবার একটু শব্দ করেই হেসে উঠলো,,— ওকে ওকে মাই লাভ! বাট,একটা রিকোয়েস্ট করব!
তৃষা আনমনে বলল,,— হুম, করুন।
— আই ওয়ান্না সি ইয়্যু ওয়ান্স। ক্যামেরাটা অন করো তো!
তৃষা একটু ইতস্তত করল। ঘড়িতে তখন মাঝরাত ছুঁইছুঁই। ও মৃদু স্বরে বলল,

— ভিডিও কল? এখন দেখতে একদম ভূতের মতো লাগছে আমাকে। লাইটও অফ করে দিয়েছি।
— উঁহু, কোনো বাহানা শুনব না। আমার চাঁদের আলো দেখার জন্য ঘরের লাইটের দরকার হয় না। কাম অন তৃষা, অন করো। অবাধ্য হয়ো না প্লিজ!
আর্যর আকুলতা এড়ানো গেল না আর। তৃষা উঠে বসে আলগোছে ফোনের ভিডিও কল অপশনটা অন করল। তবে আলো নিভিয়েই রাখল টুইংকালের স্বস্তিদায়ক ঘুমের কথা ভেবে। স্ক্রিনে তৃষার লাজুক মুখচ্ছবি ভেসে উঠতেই আর্যর চোখের পলক যেন থমকে গেল। চাঁদের আলোয় তৃষার চোখের কোণের ওই লজ্জা আর ওষ্ঠকোণের মৃদু হাসি আর্যকে এক নিমেষে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। ও স্ক্রিনের দিকে অপলক চেয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আবিষ্কার করল অন্য কিছু। তৃষার পরনে রয়েছে আর্যর নেভি ব্লু কালারের শার্ট, যেটা আলগা হয়ে ওর কাঁধের একপাশটা ছুঁয়ে আছে।
আর্য কিঞ্চিৎ সরু নেত্রে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল; গাঢ় কণ্ঠে বলল,

— এটা কিন্তু চরম অন্যায়, তৃষা!
তৃষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে বলল,
— কী… কী অন্যায় করলাম?
আর্য স্ক্রিনের দিকে আরও একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বলল,
— অন্যায়টা হলো, আমি হাজার মাইল দূরে এই অশান্ত সমুদ্রে একা একা ছটফট করছি, আমার বউকে আমি ছুঁতে পারছি না। অথচ আমার শার্টটা কত অবলীলায় তোমার ওই নরম শরীরটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে!‌ ওটা তো আমার জায়গা দখল করে বসে আছে, বউজান। দিস ইজ নট ফেয়ার!
আর্যর এমন সরাসরি স্বীকারোক্তিতে তৃষার পুরো শরীর জুড়ে যেন এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেল। ও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল, লালচে আভাটা গাল বেয়ে যেন ওর কান অবধি পৌঁছে গেল। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে বউয়ের এমন নিখাদ, লাজুক রূপ দেখে আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ওর চোখের চঞ্চলতা নিমেষেই এক বুক গভীর ভালোবাসায় রূপ নিল।
আর্য স্ক্রিনে তৃষার অবয়বটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,,

— ওভাবে চোখ বন্ধ করে থেকো না, মাই লাভ। বউয়ের এমন রূপে বরের হার্ট অ্যাটাকে জোগাড় হয়,বউজান। আই রিয়েলি মিস ইউ, জান।
তৃষা আস্তে আস্তে চোখ মেলল। আর্যর চোখের ওই আকুলতা ওর মনের ভেতর গিয়ে লাগল। ও শার্টের হাতাটা আঙুল দিয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে ফিসফিস করে বলল,,
— আই মিস ইউ টু, ক্যাপ্টেন। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন না প্লিজ!।
আর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘড়ির দিকে তাকাল। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। ও আর তৃষাকে জাগিয়ে রেখে কষ্ট দিতে চাইল না। কন্ঠস্বরে একরাশ আদর মিশিয়ে ও বলল,,
— খুব জলদি আসব, বউজান। বাট এখন অনেক রাত হয়েছে, সো নো মোর টর্চার। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো। টেক কেয়ার অফ ইয়োরসেলফ অ্যান্ড আবার প্রিন্সেস মাই লাভ।
তৃষা আলতো করে মাথা নাড়িয়ে বলল,,

— হুম, আপনিও মেস-এ গিয়ে আগে ডিনারটা করে নিন প্লিজ। একদম অবহেলা করবেন না নিজের ওপর। টেক কেয়ার, ক্যাপ্টেন। গুড নাইট।
— গুড নাইট, মাই লাইফ। আই লাভ ইয়্যু।
— আই লাভ ইউ টু।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮ (২)

কলটা কেটে যেতেই পুরো ঘরটায় আবার সেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। তৃষা ফোনটা বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আর্যর রেখে যাওয়া শার্টের সুবাস আর ওর ওই ‘বউজান’ ডাকটা যেন এখনো ঘরের বাতাসে ভাসছে। ও এক হাত পেটের ওপর রেখে পরম শান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করল।

ফিরে এসো অনুরাগে শেষ পর্ব