Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ১০

নূর ই মহব্বত পর্ব ১০

নূর ই মহব্বত পর্ব ১০
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– এভাবে আর কতদিন আহিল?
আহিল তার বিছানায় হেলান দিয়ে বসে কোলের ওপর ল্যাপটপটা নিয়ে একমনে কী যেন দেখছিল। চুলগুলো একটু উসকোখুসকো, বিছানায় কাগজপত্র জামাকাপড় আর পড়ার টেবিলের ওপর কফির খালি মগটা অবিন্যস্তভাবে পড়ে আছে।
তার মা এসে এসব দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার অগোছালো রুম গুছিয়ে দিতে দিতে বলল কথাটা। আহিল এক পলক মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,

– কিভাবে?
আহিলের মা হাতের কাপড় রেখে ওর দিকে তাকালো। এরপর তিনি ধীরপায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
– কীভাবে মানে? এই যে নিজের চারপাশের একটা দেয়াল তুলে রেখেছিস, দিন নেই রাত নেই শুধু হাসপাতাল আর নিজের এই ঘরের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে রাখা এইভাবে? তোর বয়সের বাকি ছেলেদের দেখ, তারা কত ঘুরে বেড়াচ্ছে, জীবনটাকে উপভোগ করছে। আর তুই একটা বি’ষাদকে বুকে নিয়ে নিজের জীবনটাকে এভাবে শেষ করে দিচ্ছিস। কতদিন আর এভাবে থাকবি?
আহিল থমকাল ঠিকই কিন্তু মুখবিবর স্বাভাবিক রইলো। নওমির খোঁজ পাওয়ার কথা এখন জানালো না সে। বুকের ভেতর এক পলকের জন্য একটা চেনা যন্ত্রণা খেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে পাশে রাখল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

– আমি তো ভালোই আছি মা। কোনো কিছু তো আটকে নেই। আমার কাজ, আমার ক্যারিয়ার আমার জীবন সব তো ঠিকঠাকই চলছে। তাহলে শুধু শুধু কেন এসব ভাবছ?
মা এবার ছেলের পিঠে হাত রাখলেন। ওনার কণ্ঠস্বরটা অনেক বেশি নরম হয়ে এলো,
– মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয় আহিল। তুই বাইরে যতই ভালো থাকার নাটক করিস না কেন, আমি জানি তোর ভেতরের ক্ষতটা এখনো শুকায়নি। কিন্তু বাবা, যা হয়ে গেছে তা তো আর ফিরে আসবে না। নিজেকে এবার একটু মুক্তি দে। আমি জানি না তোদের মধ্যে কি হয়েছে কেন হয়েছে কিন্তু সময়টা তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় আর না তো…

বলতে বলতে থেমে গেলেন। এগুলো গত তিনবছর ধরে করা ওনার নিত্যদিনের আর্তনাদ। প্রথমে ছেলেটাকে ভুল বুঝেছিল। ভেবেছিল নওমি চলে যাওয়ার পেছনে ছেলেটার কোনো হাত আছে কারণ তারা তো দেখেছে আহিল ওকে কতটা ইগনোর করতো, কতটা কষ্ট দিতো। পরে ধীরে ধীরে ছেলের প্রতি নরম হয়ে গেল। মা হয়ে কতদিন আর রাগ ধরে রাখতে পারে? আবার যখন শুনলো নওমির বাবার বাড়ি গিয়ে আহিল সেসব শুনেছে তখন তিনি দোটানায় পরে গেল। নওমিকে চেনে সে কিন্তু নওমির হঠাৎ নিরুদ্দেশও তাকে ভাবাচ্ছিলো। বর্তমানে ছেলের জন্য খব করুনা হয়।
আহিল কাবার্ড থেকে শার্ট বের করতে করতে বললো,
– আম্মু আমি বাইরে যাবো। তুমি খেয়ে নিও আমি বাসায় খাবো না।
– আজ তো তোর অফ ডে তাহলে কোথায় যাবি?
– হুট করে একটা কাজ পড়ে গেছে।
বলে সে বেরিয়ে গেল। মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে তো গেল। কিন্তু কাজ হবে কি? বের হয়েই কাউকে ফোন দিল।

আজকে স্কুল ছুটি। নওমি, তুহি বসে আছে। আদনান ঘুমোচ্ছে। মাঝে দুদিন কেটে গেছে আর আশ্চর্যজনকভাবে এই দুদিনে আহিলের ছায়াও দেখা যায় নি। ওরা ধরে নিয়েছে আহিল মেনে নিয়েছে যে নওমি আর আদনানকে ও পাবে না।
হঠাৎ ভেতরের ঘর থেকে একটা চেনা, ছোট্ট কান্নার মতো আদুরে আওয়াজ ভেসে এলো। আদনান উঠে গেছে নিশ্চয়ই। নওমি মাত্রই রান্নাঘরে গেল তাই তুহি ভেতরের রুমে গেল। আদনান বিছানার মাঝখানে বসে আছে। চোখ দুটো তখনো ঘুমে জড়ানো। এক হাত দিয়ে চোখ ডলছে আর কান্না করছে। তুহি এগিয়ে গিয়ে বললো,
– কি রে বিচ্ছু কি হয়েছে?
তুহির গলা শুনে পিটপিট করে তাকিয়ে আবার কান্না জুড়ে দিলো। তুহি এগিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললো,
– কি রে কাঁদিস কেন? কাঁদিস না বাপ। চল তোকে মুখ ধুইয়ে দিই
আদনান তুহির কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে শুরু করলো। তুহি ছাড়লে তো? তুহি ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর নরম গালে টুপটুপ করে কয়েকটা চুমু খেল। তারপর আদুরে গলায় বলল,
– কত্ত বড় ঘুম দিয়েছে তবুও ছটফট করছে দেখো!
আদনান দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে কান্না করতে করতে বললো,

– আআ..মাআআ
তুহি হতাশার সুরে বলল,
– ভালো মুডে চকলেট চাইলে টুয়ি আর খারাপ মুডে আম্মা?
আদনান বুঝল কি না কে জানে তবে চোখ পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা চালালো। তুহি আদনানকে কোলে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই আদনান নওমিকে দেখে কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে লাগল। তুহি ওকে নামিয়ে দিলে মেঝেতে পা পড়তেই সে কুচকুচ করে হেঁটে গিয়ে নওমির কোলের ওপর আছড়ে পড়ল। নওমি হেসে ওকে জাপটে ধরে ওর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
– আমার আব্বুর ঘুম শেষ? খালামনি উঠিয়ে দিয়েছে বুঝি?
তুহি রাগ দেখানোর ভান করে বললো,
– তোর ছেলেই উঠে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে। এখন খালামনির দোষ? মা ছেলে মিলে আমার সাথে ষড়যন্ত্র করছিস!
নওমি খিলখিল করে হেসে উঠলো। মায়ের হাসি দেখে আদনানও হাসলো। সে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে বললো,
– টুয়ি পুসা
তুহি চোখ পাকিয়ে বললো,

– আমি পচা? যা চকলেট দিবো না আমি একা একা খাবো।
কথাটা শুনে সে চোখ দুটো গোল গোল করে নওমির কোল থেকে মাথা তুলে তুহির দিকে তাকাল। ছোট্ট মাথায় বোধহয় হিসাবটা চট করে মিলে গেল। সে এবার নওমির কোল থেকে নামার চেষ্টা করলো। নওমি ছেড়ে দিতেই গুটি গুটি পায়ে তুহির কাছে গিয়ে পা জড়িয়ে ধরলো। তুহি অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইলো। তুহি ওকে কোলে নিচ্ছে না দেখে বহু কষ্টে সোফায় উঠে ওর কোলে বসলো জোর করে। তুহি তবু ওর দিকে তাকাচ্ছে না। আদনান কাঁদো কাঁদো মুখ করে নওমির দিকে তাকালো। নওমি ওদের দিকেই তাকিয়ে হাসছে। এই দুইটাই পা’গল!
আদনান এবার নওমির গলা জড়িয়ে ধরে মুখের সামনে তার টুকটুকে লাল ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে এমন এক মায়াবী চাহনি দিল, যা দেখে যেকোনো পাষাণের মনও গলে জল হয়ে যাবে সেখানে তো তুহি! আদনানের চালাকি দেখে নওমি হেসেই কূল পাচ্ছিল না। তুহি মুখ টিপে হেসে চট করে আদনানকে জড়িয়ে ধরল।
– চালাক বিচ্ছু! টুয়ি তো পচা, তার কোলে জোর করে বসা হয়েছে? আবার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে?
তুহি নরম হয়েছে বুঝতে পেরে ওর দুই গালে হাত রেখে আদনান মিষ্টি হেসে বললো,

– টুয়ি ভালু
তুহি হেসে বললো,
– চকলেটের জন্য খালামনি এখন আবার ভালো হয়ে গেল, তাই না? দেখলি তোর ছেলের কাণ্ড?
নওমি হেসে বললো,
– ছেলে আমার হলে কি হবে? কোলে পিঠে বড় তো তুমি করেছো তাই তোমার কত হয়েছে!
তুহি মুখ বাকিয়ে সোফার পাশে রাখা ওর হ্যান্ডব্যাগ থেকে ছোট একটা ছোট ক্যাডবেরি চকলেটের বার বের করল। সেটা আদনানের চোখের সামনে দোলাতেই বাচ্চার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। প্যাকেটটা ছিড়ে ওর হাতে দিলে ও খুশি মনে খেতে শুরু করলো। চকোলেটের শেষ অংশ খেয়ে এক টুকরো তুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– কাও টুয়ি
তুহি হেসে খেয়ে নিলো। তারপর বলল,
– হয়েছে অনেক চকলেট খেয়েছিস। এবার চল কাজ করবি। কাজ করে খেতে হয় বুঝেছিস?
তুহি আদনানকে কোলে তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। আদনান গোল গোল চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে। তুহি ওকে স্ল্যাবের উপর বসিয়ে সিঙ্কের দিকে ইশারা করে বলল,
– এই যে তোমার ফিডারগুলো জমে আছে, এগুলো ধুতে হবে। ফাও ফাও খাওয়া বন্ধ!
আদনান তো ভারী খুশি! পানি নিয়ে খেলতে কার না ভালো লাগে? তুহি ওর হাত ধরে বোতলের মধ্যে ঢুকিয়ে বোতলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে লাগল। আদনান খিলখিল করে হাসতে শুরু করলে নওমিও উপস্থিত হয় ওখানে।লেখিকার নামে তার আসল পেজে গল্প পড়ুন। বোতল ধোয়া শেষ হতেই তুহি ফিডারের নীল রঙের ক্যাপ আদনানের হাতের কবজিতে চুড়ির মতো গলিয়ে দিতে গেল। আদনান নিজের পুচকে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মহা আনন্দে পা দোলাতে দোলাতে আধো-আধো বোলে হাসতে হাসতে মোবাইলে দেখা ছড়া বলতে লাগলো,

– হাই আই উই হাহা….
তুহি তো আদনানের এই নতুন ছড়া শুনে হেসেই খু’ন। সে আদনানের এই পাগলামিকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য নীল ক্যাপটা ওর কবজিতে আটকে দিয়ে ওর হাতটা ধরে ডুগডুগির মতো নাড়াতে নাড়াতে সুর মেলালো,
– ডবোপট্টি ডবোপট্টি ডবোপট্টি…
আদনান হেসে চিলিয়ে বললো,
– ডাবুপতি ডাবুপতি
নওমি ওদের কাণ্ড দেখে বিড়বিড় করল,
– পাগ’লাগারত থেকে পালিয়ে এসেছে বোধহয়!
ও এগিয়ে এসে বললো,
– হয়েছে থামো। কি শুরু করেছো দুটো?
– কাচ কলি
– তোমার কাজ করা লাগবে না নামো।
আদনান নাকচ করে বললো,
– নাআআ।
– তুহি আপু ওর ঠান্ডা লেগে যাবে তো!
– একটুতে ঠান্ডা লাগে না বুঝেছিস। আদনান নাম তো। ধোয়া শেষ।
– নাআ
– চল খেলবি না?
ধরে বেঁধে ওকে নিয়ে আসলো। এরপর আদনানকে অর্ধেক নাস্তা খাওয়াতেই ঘরের বেল বেজে উঠলো। নওমি ভ্রু কুচকে বললো,

– এখন আবার কে এসেছে?
– আমি দেখছি।
তুহি উঠে পিপহোল দিয়ে দেখে বললো,
– আবরার এসেছে।
নওমি আদনানের দিকে এক চামচ নাস্তা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– ভাইয়া আসবে আগে বলেনি তো?
নওমি কাঁধ উঁচিয়ে বললো,
– জানি না, আমায়ও কিছু বলে নি।
তুহি দরজা খুলতেই আবরার ভেতরে এলো। ভেতরে এসে থেমে আবার পেছনে ফিরে কাউকে ডাকলো,
– আসুন।
তুহি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আবরারের এই কথায় নওমিও তাকালো ওদের দিকে। হঠাৎ দরজা দিয়ে একজনকে ঢুকতে দেখে চমকে গেল ওরা। তুহি এক প্রকার চেঁচিয়ে বললো,

নূর ই মহব্বত পর্ব ৯

– আপনি!! আবরার ওনাকে কেন নিয়ে এসেছো?
নওমি চট করে দাঁড়িয়ে গেল সাথে আদনানকে কোলে নিয়ে দূরে সরে গেল। আর কেউ নয় ডক্টর আযলান আজওয়াদ এসেছে। কিন্তু আবরার কেন ওনাকে এনেছে? কেন এসেছে? নিশ্চয়ই আদনানকে নিয়ে যেতে? এত ভাবনার মাঝে তুহির উচ্চস্বর শুনতে পেল। সে আবরারের সাথে তুমুল তর্কে লিপ্ত হয়েছে। তার গলার আওয়াজ স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক পর্দা ওপরে চড়ে গেল।

নূর ই মহব্বত পর্ব ১১