Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৭
Maha Aarat

সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরী হয় আদওয়ার।আজকে এতোগুলা এলার্ম সেট করার পরও উঠতে দেরী হলো ভেবে নিজেকে মনে মনে বেশ শাসিয়ে নিচ্ছে সে।আজকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তাঁর।এই কাজে তাকে বেশ খাটাখাটুনি করতে হবে।দ্রুত ঘুম ছেড়ে উঠে ঘর গুছিয়ে অল্প নাস্তা সেরেই কুয়াশা মাখতে মাখতে বেরিয়ে পড়ে সে।অথচ বাড়ির সামনে একটাও অটো পাওয়া যাচ্ছে না দেখে একটু সামনে এগোনোর জন্য প্রস্তুত হতেই থমকে যায় আদওয়া।

দূরে ভাসা মানুষটার অবয়ব বেশ পরিচিত লাগে তাঁর।শুভ্র পান্জাবির সাথে খয়েরি চাদর জড়িয়ে মানুষ টা তাঁর দিকেই আসছে।চুলগুলো বেশ লম্বা,তেমনি মানুষটাও লম্বা।আদওয়ার ভ্রু কুঁচকে বসে আছে কপালে।সে যেই হোক,ভাবনা ছেড়ে সামনে এগোতে গিয়ে যেন ব্যর্থ হয় সে।তাঁর পা চলছে না।বুক টিপটিপ করছে।কিন্তু কেন?
আদওয়া মানুষটাকে চিনতে পারলো যখন উনি একেবারে তাঁর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন।কুয়াশার সাদা আবরনে ঝাপসা চশমা,খোঁচা দাঁড়ি আর দূরবীণের মতো চোখগুলোতে একসময় সে অপরিমেয় মায়া খুঁজে পেতো।আর এখন সেখানে ঘৃণার বাস ছাড়া কিছুই নয়।
আদওয়া পথ হটিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইলে ইমান বাঁধা দিয়ে বসেন।ভণিতা ছাড়াই বলতে লাগলেন, ‘আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে এসেছি।কথাগুলো শুনো।আমি বিরক্ত করবো না তোমাকে।’
আদওয়ার চোখে গভীর দৃষ্টি রাখতেই অনুভূত হয় ইমানের ছোট্ট সাইজের হৃদপিণ্ডটাকে যেনো কেউ দুমড়েমুচড়ে একাকার করে দিচ্ছে।তাঁর চোখের এক লক্ষ কোটি মাইলের ঘৃণা পেরিয়েও ইমান একফোঁটা ভালোবাসা খুঁজে পেলেন না।কি অদ্ভুত!অথচ একসময় এই চোখেই সমস্ত পৃথিবীর ভালোবাসা যত্নে গচ্ছিত ছিলো!
‘আদওয়া আমি জানি তুমি অপছন্দ করো আমাকে।সেটাও অনুচিত নয়,আমার ভুলই তোমার চোখে আমি ধ্বংস হওয়ার কারন।

কিন্তু আমি তোমাকে পছন্দ করি।আমি সত্যি তোমাকে চাই।জানি আমার ভুলগুলো মস্তো বড়ো আর ক্ষমার অযোগ্য। তবুও একটা সুযোগ দিয়ে দেখো।আমার ভুল শোধরাবার জন্য আজীবন আমি ক্ষমা চাইবো।আমার বিশ্বাস,একদিন না একদিন তুমি বুঝবে।গত তিনটা বছর আমি পুড়েছি।আমি ভেবেছি তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছো।মানছি আমার সমস্ত ভাবনা ভুল।ফাঁসির আসামীও তো শেষ একটা সুযোগ পায়।আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিও না।
ওইদিন ইমরানের মিথ্যে কথাগুলোর মধ্যে এই মিথ্যেটাও ছিলো যে, ‘তুমি ওকে পছন্দ করো।’আই রিপিট , ‘তুমি ওকে পছন্দ করো’।একটাবার আমার জায়গায় এসে চিন্তা করে দেখো আমার কতোটা দূ:খ লেগেছিল ,যাকে আমি আমার সবটা দিয়ে আগলে রাখি,সে কি না অন্যের বুকে সুখ খুঁজে’ এমন ভাবনার মতো সত্যি টা মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিলো।আদওয়া প্রতিটা রাত আমার যন্ত্রণায় কেটেছে।সালিশে বসে তোমার কান্নাভেজা সেই চোখ আজ ও আমার হৃদয়ে বাঁধাই করা।আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি।সব ভুল আমার!’
কথাগুলো বলতে গিয়ে কন্ঠ বসে যায় ইমানের।তবুও তিনি থামেন না।বোঝাতে থাকেন নিজের ভুলের পরিধি,হিসাব কষতে থাকেন অতীতের সোনালি সেই দিনগুলোর।চাইলেই তো ফিরে পাওয়া যায়।তবে কেন এতো ক্রোধ?
ইমানের এতো কথার পিঠে আদওয়া এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও ফিরে আসার সময় সে তাঁর উচিত জবাবটা দিয়ে এসেছে।
ইমানের চোখে আঙ্গুল তুলে বলেছে,অতীতের চ্যাপ্টার তাঁর জীবনে অনেক আগেই ক্লোজ।ধূলো জমে পড়ে থাকা স্মৃতির সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছেকে অনেক আগেই সে দাফন করেছে।বাকি থাকলো সুযোগের।সুযোগ পাওয়ার সুযোগ টাও ইমান হারিয়েছেন সেই তিন বছর আগেই!

দিনের পর দিন পেরোচ্ছে।প্রতিটা দিন পেরিয়ে রাত আসছে।রাত পেরিয়ে আবার নতুন এক ভোর।অথচ তাঁর থেকে কোনো বার্তা আসে না।অবশ্য আসার কথাও না।তাকে বিদায় দিয়ে এসে আরহাম দেখেছিলেন ফোনটা বাসায় থেকে গেছে।তাও একেবারে চোখের সামনেই।আরহাম শুধু হজম করছিলেন নীরব।এতোটা দৃঢ় আঘাত!বেশ!
গত দূটো দিন বাসায় খুব বেশী থাকার সুযোগ হয়নি।ব্যবসার কাজে সময় দিতে হয়েছে।হিসাব নিকেশ বা ব্যবসায়িক আলাপ আলোচনা,প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেছেন।অথচ উনার জন্য অঘুমা হয়ে কেউ জেগে থাকে নি বা উনার কখন কি প্রয়োজন সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়নি।
মাহেরের সাথেও বাড়তি আলাপের সুযোগ নেই।খুব সকালে বা রাতে যখন মাহের আইরার সাথে কথা বলেন আরহাম বোনের কাছে যান।ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন হাফসার কথা।উমায়ের কেমন আছেন,ভালো থাকছেন তো’ এই উত্তরগুলো প্রতিবার পাওয়া হয় না আরহামের।চুপচাপ রুমে ফিরতে ফিরতে ভাবেন,আপনি যদি অন্তত একটি বার্তা পাঠাতেন আমি গোটা একটা সপ্তাহ নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম।

অনেক চেষ্টার পর অবশেষে ফার্মগেটের জায়গাটা অল্ড হোমের জন্য বরাদ্দকৃত থাকছে।মাহেরের এই সপ্তাহ টা কেটেছে বহুল প্রতীক্ষিত এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শোনার জন্য।দূপুরের দিকে শেষ শোনানি শেষে কোর্ট থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে সোফায় হেলান দিয়ে রইলেন।ঘাড় বাঁকা করে চোখমুখ কুঁচকাচ্ছেন ব্যথায়।এলোমেলো ,উষ্কোখুশকো চুলে ভাইকে দেখে মায়া হলো হাফসার।মাহেরের থেকে চূড়ান্ত খবর শুনে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সে।এখন একটু শান্তিতে আলাপ করতে পারবে।

‘আইরাকে কল দিয়েছিলে?’
মাহের খাপছাড়া ভঙ্গিতে বললেন , ‘নাহ।’
‘কেনো?’
‘ব্যস্ত ছিলাম।’
‘আইরা কি বেড়ানোর জন্যই বাড়িতে গিয়েছে নাকি অন্য কোনো কারনে?’
‘অন্য আবার কি কারণ থাকবে?’
‘তুমি শিওর?’
‘ডাউটে থাকার তো কথা না।’
‘তুমি একদম রং করছো ভাইয়া।ওকে একটুও বুঝতে চাওনি।তোমার অবহেলায় ও তোমার থেকে দূরে সরে গেছে।’
মাহের ভ্রু কুঁচকালেন।নিশ্চিত স্বরে বললেন , ‘কি আবোলতাবোল বলছো?সে বেড়ানোর জন্য গিয়েছে।বিয়ের পর গিয়ে থাকা হয়নি।এজন্যই দেটস ইট।’
‘এজন্য যায়নি।তোমার থেকে কষ্ট পেয়ে গিয়েছে।’
‘ইম্পসিবল।আমি তাকে কষ্ট দিইনি।কোনো খারাপ আচরণ করিনি।সেদিন একটু রোড হয়েছিলাম পরে ক্ষমা চেয়েছি।এর বেশী কিছু হয়নি।’

‘না হলে যেতো ও?যাবার আগের দিন সে তোমার জন্য যত্ন করে নিজ হাতে বিরিয়ানি রান্না করেছে ,তুমি মুখে নিয়েও দেখো নি।কষ্ট পেয়ে খিদে নিয়ে ঘুমিয়েছে তুমি টের পাওনি। ওইদিনের ওই ইন্সিডেন্টের জন্য ওর মনে হচ্ছিলো তুমি কষ্ট পেয়েছো,সারারাত ঘুমায়নি এটা ভেবে যে তুমি কষ্ট পেয়েছো।ক্লাসে সবাই নিশ্চয়ই রেগুলার হোমওয়ার্ক করে না,কিন্তু ওর বেলায় শাস্তিতে তুমি একটু বেশী রোড হয়ে যাও।আমার নিকাহের পর তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলে আমাকে বাসায় নিয়ে আসার জন্য,কারন তুমি বুঝতে পেরেছো হুট করে কোনো নতুন পরিবেশে আমি মানিয়ে নিতে পারবো না বা তোমাকে ভীষণ মিস করছি।কিন্তু বিয়ের হাফমান্থ হয়ে গেছে তুমি তাকে ফিরানির পর একটাবারও বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলোনি।তুমি সারাদিন বাইরে থাকো,কলেজের পর সেও সারাদিন একাই থাকে।সন্ধ্যায় আসার পর ও চায় ওর সাথে একটু গল্প করো,কথা বলো আর তুমি প্রয়োজন ব্যতীত কথাই বলো না।বেশ কয়েকটা দিন হলো সে বাড়িতে গিয়েছে ,আমি জানি তুমি ব্যস্ত বাট এতোটাও ব্যস্ত নয় যে একঘন্টা সময় নিয়ে তাকে দেখে আসতে পারবে না।’

হাফসার বিরতিহীন কথাগুলো শুনে মাহের নীরব হয়ে গেলেন।হাফসার চোখেমুখে দূ:খের চাপ।আইরার কান্না তার এখনো কানে বাজছে।কি হতো তার ভাই যদি মেয়েটাকে একটু আগলে নিতেন!
‘ওর বুঝ কম।আসলেই কম।বাস্তবতা থেকে সে একশো হাত দূরে।কারন সে দূ:খ পায়নি কখনো।আদর-আহ্লাদে বড় হওয়া সে বাইরের নির্মমতা একটুও অনুভব করেনি।তুমি দেখোনি,খেলনা নিয়ে ও আম্মুর সাথে খেলতো।কষ্ট পেলে ছুটিয়ে কান্না করে বাসা মাথায় তুলে ফেলতো।আব্বু প্রতিরাতে কথা না বলে ঘুমালে অভিমান করে অনেকদিন আর কথাই বলতো না।দায়িত্ব ,ম্যাচুরিটি, বা বুঝ ওর মধ্যে নেই বলতেই সারে।ভাইয়া শাসনের চেয়ে ভালোবাসার শক্তি বেশী।কড়াসুরে ওকে কথা না শুনিয়ে সুন্দরভাবে ওকে সাথে নিয়ে বুঝিয়ে বললে সে কথা শুনতো।তুমি একটা অস্ফুটিত ফুল পেয়েছো যার সুবাস ছড়িয়েছে কিন্তু কলি ফোটেনি।ও এতোটুকু অবুঝ যে তোমার থেকে দূ:খ পেয়ে সে আমার কাছে এসে শেয়ার করেছে।আমার কাছে কান্না করেছে।আর তোমার সাথে দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে ফোনে কথা বলেছে।বুঝতে পারছো, তুমি ওকে কতোটা কঠিন বানিয়ে ফেলছো?’

হাফসা নীরব।অনেক বেশী বলে ফেলেছে সে।অনেকক্ষণ হয় গেলো মাহের কোনো রিয়্যাকশন দিচ্ছেন না।একসময় গায়ের স্যুট টা কাঁধের পেছনে ফেলে মাহের উঠে দাঁড়ালেন।হাতঘড়ি খুলতে খুলতে চুপচাপ রুমের দিকে এগোলেন।হাফসা ঠায় তাকিয়ে রইলো।রুমে প্রবেশ করার আগে বোনের দিকে তাকিয়ে কেবল উত্তর দিলেন , ‘ঠিক এজন্য এতো বড় সিদ্ধান্ত আমি এড়িয়ে গেছি কতোটা বছর।একজন যোগ্য স্বামী হতে হলে আমাকে পুরোপুরি বদলে যেতে হবে।আর নিজেকে বদলাতে গেলে আমি আর আমি থাকবো না।’

গোধূলি মিশে গেছে আঁধারের ছায়ায়।পথিকের পথ ফুরিয়েছে ,পাখিরা নীড়ে ফিরেছে,গৃহস্থরা বাড়ি ফিরেছে ,প্রকৃতিও তাঁর প্রতিমূর্তি বদলে দিন থেকে রাতের গভীরে এগোতে ব্যস্ত।দিব্যি ব্যস্ততা,পরিবার পরিজন পড়াশোনা আর তোষামোদে ব্যস্তে জীবনের ক্ষণ ফুরিয়ে আসছে মৃত্যুর দুয়ারে।চারিদিকে শূন্যতা,না পাওয়ার আর্তনাদ,মিছে আশা নিয়ে ছুটছে একেকটা প্রাণ।দিনশেষে ফলাফলটুকু কেবল শূন্যেরই কোটায়।
মাগরিবের নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলো আদওয়া।ঘুমটা যখন বেশ জমে উঠেছিলো তখন ড্রয়িং থেকে আসা আওয়াজে বিপত্তি বাঁধে তাঁর।তাই রুমের দরজা লক করে জোর আওয়াজে নাশিদের সুর লাগিয়ে ঘুমের দেশে হারায়।ঘন্টাদূয়েক পর তাঁর ঘুম ভাঙ্গে বাইরে থেকে আসা ক্রমাগত কিছু ডাকে।আম্মু ডেকেই চলেছেন তাকে।ততক্ষণে ঘুমটাও বেশ হালকা হয়।আম্মুর ডাকের কোনো সাড়া না দিয়ে ঘড়িতে চোখ বুলায় সে।ইশারের নামাজটা সময়মতা পড়তে না পারার জন্য বেশ আফসোস হচ্ছে এখন।নামাজই এখনো অসম্পূর্ণ , তাহলে ডিনার করবে কীভাবে।ভেবে আম্মুর ডাক ওকান দিয়ে বের করে অযু করতে যায়।
খানিক পর ফিরে এসে হিজাব গায়ে জড়িয়ে ডোর খুলে।মিসেস শেমু তাকে রুমে ঠেলে দরজা সেটিয়ে দিয়ে নীচু আওয়াজে বললেন , ‘একটা কথা রাখবি মা’য়ের?’
‘নিশ্চয়ই আমার অপছন্দের কিছু তাই এতো তালবাহান করছো।বলে ফেলো মা আমার সময় নেই।’
‘আসলে আ্ আমরা তোর জন্য একজন যোগ্য পাত্র পেয়েছি।তুই সত্যি সুখী হবি।কোনো প্রশ্ন করতে পারবি না।রাজি হয়ে যা, মা।’

আদওয়া বেশ রূঢ়স্বরে জবাব দেয়, বেশ আমিও রাজি’ এতো সহজে বলে ফেলবো?সম্ভবই নয়।আমার জীবনসঙ্গী আমি নিজে খুঁজে বুঝে নিব।তোমাদের ভাবতে হবে না।’
‘তোর ইমান ভাইকে ক্ষমা করে দিতে পারবি না?ছেলেটা তোকে সত্যি পছন্দ করে।এতোগুলা বছর আলাদা থাকার কারন মনের ভেতর কিছু ভুল ধারণা পুষে রাখার জন্য আর…
আদওয়ার কপালে তীর্যক ভাঁজ পড়ে।এতোগুলা বছর তাঁর যে মা ইমান নামক মানুষটার পরিবার থেকে পাওয়া অপমানে পাথর হয়ে ছিল সে হঠাৎ করে গলে গেলো কীভাবে।বিষয়টা গোলমেলে লাগে তাঁর।মুখ বাড়িয়ে ড্রয়িং এ উঁকি দিতেই মনের সন্দেহ সত্যি হয়।মা’য়ের হাত শক্ত করে ধরে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে , ‘ওই লোক তোমাদের উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে হাতে নিয়ে নিয়েছে তাই না?মা কীভাবে ভুলে যাচ্ছো।এই মানুষটার জন্য প্রতিদিন তোমার আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতাম।কতোটা দিন ছটফট করেছি তাকে এক নজর দেখবো বলে।কতোগুলো রাত বাচ্চাদের মতো কেঁদেছি,চিৎকার করতে করতে সেন্সলেস হয়ে পড়েছি।আমি তো ভুল ছিলাম না।না কোনো মিথ্যে ছিল আমার প্রতিশ্রুতিতে।তাও কতোগুলো দিন আমি পুড়েছি।আর এখন যখন স্বাভাবিক হলাম তোমাদের কারোর সহ্য হচ্ছে না তাই না?’

আদওয়ার চিৎকারে ড্রয়িং রুম নীরব।সবার চোখে দ্বিধা,অথচ একজনের চোখে ভয়।তাঁর বুলবুলিকে আবারো হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে হন্নের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে।ইমানকে দেখে মিসেস শেমু চুপচাপ রুমত্যাগ করলেন।ইমান পিছন ফিরে তাকালেন একবার।ড্রয়িং রুমে থাকা দূই পরিবার তাঁর চোখে আশা খুঁজতে ব্যস্ত।আদওয়াকে ফেরাতে পারে একমাত্র ইমান,এটাই তাদের আশ্বাস।
আদওয়াকে পানির বোতলটা এগিয়ে দেন ইমান।আদওয়া ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেটা।তাঁর চোখে আগ্নেয়গিরির রক্তিম গোলা।এই মুহুর্তে তাঁর মনে হলো,তাঁর কাছে যদি একটা আলাদিনের পিদিম থাকতো,সামনের এই মানুষটাকে সে নিঃশ্বেষ করে দিতো।
আদওয়া যতটুক হাইপার,ইমান যেনো তাঁর চাইতেও নীরব।উনার আদওয়ার কাছে তিনি এতো অপছন্দের ,ঘৃণার ভাবতেই নিজের সবটুকু ঘৃণাও পড়ছে নিজের উপরেই।তাকে শান্ত হতে কিছু সময় দিয়ে ধীরস্বরে বললেন , ‘তুমি সময় নাও।ভেবে তারপর রাজি হও।’
‘আপনাকে কখনোই আমি বিয়ে করবো না!’–আদওয়ার রাগী কন্ঠস্বর।
‘একটু বুঝো আমি..
‘আমি একজনকে পছন্দ করি।তাঁর জায়গা কাউকে দিতে পারবো না।বিয়ে করতে হয় আমি তাকে করবো! আর কাউকে না!’

মাইমুনার সাথে গল্পে ব্যস্ত সে।আসলে গল্পে নয়,বিষন্নতা কাটানোর একটা উপায় খুঁজে নেওয়া।আম্মুর সঙ্গ ইগনোর করছে আইরা।কারন আম্মুর কাছে গেলেই কেন যেনো তাঁর অঝোরে কান্না চলে আসে।আম্মু সবকিছু বুঝে যাবেন ঠিক ঠিক।যেটা সে চায় না।তার সাক্ষাতে আম্মু আব্বু কতো খুশি।এই খুশিমাখা মুখ মলিনতায় ভরে উঠুক এটা সে কখনোই চায় না।আপুর সাথে খোশগল্পের আড়ালে মাঝে মাঝে ফোন চেক করছে সে।গতকাল সারাদিনে লোকটার একটা টেক্সটও নেই,তেমনি আজও নেই।এতক্ষণে নিশ্চয়ই রেডি হয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন কাজে।
আইরার চোখ টলমলে হয়।এই পরিবর্তনের কারন কি।নাহ,এটা পরিবর্তন নয়।উনি তো এমনই।শুরু থেকেই!
মাইমুনা আলাপ করে যাচ্ছেন।এই ফাঁকে ভাইয়ের কন্ঠ শুনতেই চুপচাপ ফিরে এলো।ভাইয়া নিশ্চয়ই আপুর সাথে দেখা করতে এসেছেন।তাকে দেখলে আর দেখা করবেন না ভেবেই চলে আসে আইরা।রুমে এসে চুপচাপ নিজের শেলফ থেকে বই বের করে উদাস মনে বেলকনির সোফায় গিয়ে বসছিলো।এ মুহূর্ত তার ভীষণ কান্না আসছে এখন সে কাঁদবেই।

কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে কারো কন্ঠের আওয়াজ আসতেই ভ্রু কুঁচকায় তাঁর।কিছু কি হয়েছে ভেবেই উপরের বারিন্দা থেকে নিচে চোখ বুলাতেই চমকালো সে।লোকটা এসেছেন!সত্যিই এসেছেন কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিলো না তাঁর।খুশিতে কান্না থামার কথা অথচ সে কেঁদেই যাচ্ছে।একটা সময় অভিমান করে বসে আইরা।তিনি নিশ্চয়ই কোনো প্রয়োজনে আসছেন।এতোটা খুশি হওয়ার কিছু নয়।দেখাই করবে না সে,ভেবে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।কিন্তু ভেতরটা কেন জানি টিপটিপ করছে তাঁর।কিন্তু কেন?খুশিতে না কি আবারো কোনো অবহেলার আগাম পূর্বাভাসে! দ্বিধায় পড়ে গেলো সে।

তাঁর মন বলছিলো লোকটা তাঁর সাক্ষাতের জন্য আসবেন।কিন্তু উল্টো তাকেই যেতে হলো।জোর করে উনাকে নাস্তার টেবিলে বসানো হয়েছে।উনি বারবার বলে চলেছেন বাসা থেকে নাস্তা করেই এসছেন তবুও আরহাম উনাকে জোর করে বসালেন।আম্মু এসে আইরাকে নিয়ে গেলেন।সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় প্রথমবারের মতো লোকটার সাথে চোখাচোখি হলো তাঁর।কয়েক সেকেন্ড পেরোলেও লোকটার দৃষ্টি যখন তাঁর থেকে নামছিলো না তখন লজ্জ্বায় মাথা নিচু করে নেয় সে।পরক্ষণেই নিজের মনের জিভ চেপে ধরে।এতো বেহায়া মন তাঁর!এতো অবহেলার পরও উনার দিকেই মনটা ঝুঁকে আছে!তাঁর মনকে হাতে ধরা গেলে সামনে এনে ঠাঁটিয়ে কয়টা চড় বসাতো সে।
আইরা আর মাহের মুখোমুখি বসলেন।একসাথে বসতে বললেও আইরা খুব সতর্কে আম্মুর সাথেই বসে পড়েছে।আরও আলোচনার মধ্যে আরহাম জিজ্ঞেস করলেন , ‘উনি তো একা।ভয় পাবেন না মাহের?’
‘একা নয়।সাথে আছে একজন।আর সার্ভেন্ট আছেন।’
আরহাম অতিরিক্ত কিছু জিজ্ঞেস করলেন না আর।আইরা অনুভব করছে তাঁর গলা দিয়ে কোনো খাবার নামছে না।কেনো জানি তাঁর ভেতরে এক ভয়ানক অনুভূতি হচ্ছে! তাদের এতো কথোপকথনের মধ্য দিয়েও সে স্বাভাবিক হতে পারছে না।
আম্মু বললেন , ‘হাফসাকে নিয়ে আসলে না কেন?কতোদিন হলো দেখিনি।’

‘জ্বি আসবে।’
‘আরহাম তুমি গিয়ে নিয়ে আসো ওকে।আজ একসাথে থাকবো আমরা।’
মাহের তৎক্ষনাৎ বললেন , ‘অন্য একদিন ইন শা আল্লাহ।আজকে থাক।’
‘আমার মেয়ে একা থাকছে।আজক এসেছো তাও বলছো অন্যদিন!’
মাহের কিছুটা বিপাকে পড়ে গেলেন।উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না।
নাস্তা শেষে আইরা রুমে আসার কিছুক্ষণ পরই মাহের আসলেন।বেলকনিতে ঠিক তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন।আইরা অন্যদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।মাহের তাঁর মনোযোগ পেতে হালকা কাশি দিয়ে বললেন , ‘ভালো আছো?’
সে কেবল মাথা ঝাকায়।মাহের উসখুস করছেন।কীভাবে এই বাচ্চা মেয়ের রাগ ভাঙ্গাবেন তিনি!হাফসা কতো কিছু শিখিয়ে দিয়েছিলো,সময়মতো কিছুই মনে পড়ছে না।
কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছেন না মাহের।জিজ্ঞেস করলেন , ‘বাসায় আসবে না?কবে আসবে?’

নাহ!আইরার থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
মাহের আবারও বলতে লাগলেন ‘ আই এম সরী।’
এবারও তাঁর কোনো রেসপন্স নেই।আইরা ভাবছে,কোথায় ভেবেছিলো লোকটা কথা বলে তাঁর মন ভালো করে দিবেন।অভিমান ভাঙ্গাবেন।সবসময় একধাপ বেশী ভাবার জন্য নিজের কাছেই নিজে লজ্জ্বিত হচ্ছিলো এমন সময় অনুভব করে এক উষ্ণ স্পর্শ।অতপর এক দৃঢ় আলিঙ্গন!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৬

বুকসমান মেয়েটাকে মাহের বুকে টেনে নিলেন।অনুভব করলেন উনার ভেতরে হৃদপিণ্ড নামক যন্ত্রটা অস্বাভাবিক কাঁপছে!কেন তার উত্তর খুঁজে পেলেন না।
‘বলেছিলাম না আমাকে শিখিয়ে দাও,তুমি আমাকে কেমন দেখতে চাও।অভিমান করে ফেলে এসেছো।
আই এম সরী।আমি বুঝতে পারিনি।একদিন ঠিক বুঝে নিবো।সে পযন্ত আমাকে শিখাও তুমি।পারবে না?

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here