Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৩
তোনিমা খান

হিমানীর করাল গ্রাস থেকে মুক্ত প্রকৃতি মন্থর গতিতে বসন্তের সুর আর সুবাসে সেজে উঠেছে। হরেক রঙের পুষ্প, বাতাবিলেবুর নব্য কুঁড়ির সুঘ্রাণ আর কোকিলের কলকাকলিতে মুখরিত ধরণী। ঠিক তেমনি নিলীমা নামক মা”টির জীবন থেকেও শীতের রিক্ততা মিলিয়ে বসন্ত এসেছে। বাতাবিলেবুর নব্য কুঁড়ির ন্যায় তার জীবনেও একটু একটু করে সুখ উঁকি দিচ্ছে।
মাতৃত্বের যুদ্ধে নিলীমা জিতে গিয়েছেন। এখন আর সন্তান হারানোর ভয় তাকে তাড়া করে না। দরজার ওপাশে লাগাতার ঠকঠক শব্দে মত্ত ব্যক্তিকে দুটো মন্দ কথা বলার জন্য দরজা খুলতেই নিলীমা খানিক ভড়কালো। সম্মুখে দণ্ডায়মান বিশালদেহী মানুষটাকে দেখে তার দৃষ্টি চমকিত হয়। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠেন,

–“আপনি?”
তপোবন নারীটির চমকানো চাহনি দেখে মৃদু হাসল। তাকে আরেকটু চমকে দিয়ে বাবার পেছন থেকে মাথা বের করে উঁকি দিল তানশান। মৃদু হেসে বলল,
–“আসসালামু আলাইকুম, নানুমনি।”
তানশানের পরেই তপোবনের বাম পাশ থেকে রূপকথা উঁকি দিয়ে তাকাল মায়ের মুখপানে। ছলছলে নেত্রে চেয়ে ডেকে উঠল,
–“আম্মা!”
রূপকথার পাশ থেকে রোজ উঁকি দিয়ে প্রাণোচ্ছল কণ্ঠে বলল,
–“সারপ্রাইজ আন্টিইই!”
রিক্ত জীবনে এই মুখগুলো নিলীমার অস্থির অন্তঃস্থলে ঠিক কতটা প্রশান্তি দেয়, তা স্পষ্ট হলো তার গড়িয়ে পড়া নোনাজলে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল নিলীমা। রূপকথা আর রোজ এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ক্রন্দনরত নারীটিকে। এক নীরব আলিঙ্গনেই যেন কতশত আকুলতা ব্যক্ত হলো! নিলীমা দুজনকে ছেড়ে তানশানের পানে তাকায়। আদুরে স্বরে বলল,

–“নানুভাই, এসো।”
তপোবন নিজ উদ্যোগে লাজুক ছেলেকে টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। জীবনের সাথে জুড়ে যাওয়া আরেকজন স্নেহময়ীর সাথে আলতো আলিঙ্গন করে সে মিহি স্বরে বলল,
–“ডোন্ট ক্রাই।”
নিলীমা গাল ভরে হাসল ছেলেটির কথায়। তিনি তানশান আর রোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
–“তোমরা কি কোনো কাজে এসেছ?”
রোজ নাকচ করে বলল,
–“উঁহু, আমরা আপনার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আজ খুব মজা হবে আন্টি!”
নিলীমার চোখেমুখে খুশির উজ্জ্বলতা ছেয়ে গেল। তপোবনের পানে চেয়ে শুধায়,
–“ওরা সত্যি বলছে?”
তপোবন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। বলল,

–“আগেরবার কথা দিয়ে গিয়েছিলাম শিগগিরই আসব। আজ কিন্তু আমরা এখানে থাকছি।”
–“অবশ্যই থাকবেন, তা কি আর বলতে হয়? এসো, ভেতরে এসো সবাই।”
নিলীমা হন্তদন্ত হয়ে সবাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। রূপকথা শুধু ঘুরে ঘুরে মাকে দেখছে। না, ঠিক মাকে নয়, বরং মায়ের চোখেমুখে সুখের ছোঁয়া দেখছে। তার ফেলে যাওয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভঙ্গুর মায়ের মধ্যে আজ আমূল পরিবর্তন! মাকে জীবনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জিততে দেখে রূপকথার ভেতরকার ভয়টা আরও দৃঢ় হলো। আর একবার যদি ঘৃণ্য বাস্তবতা মাকে ভেঙে ফেলে, তবে সে সামলাবে কী করে? মায়ের এই সুখটুকু দীর্ঘস্থায়ী হোক। বাবা নামক নিকৃষ্ট মানুষটার ছায়াও যেন আর না পড়ে তার মায়ের ওপর!
ঘরের দরজায় একজন লোক তিনটি বাজারের ব্যাগ রাখতেই নিলীমা কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে এলো। তপোবন নিচু স্বরে লোকটিকে বলল,

–“যাও তুমি, বাকিটা আমি সামলে নেব।”
নিলীমা শ্রান্ত কণ্ঠে বললেন,
–“আমার মেয়ে, জামাই আর তার পরিবারের দেখাশোনা করার সামর্থ্য আমার আছে। আপনি আমায় বারংবার এভাবে ছোট করতে পারেন না।”
শাশুড়ির কঠোর গলায় তপোবন চোখ তুলে তাকাল। মিহি স্বরে বলল,
–“আমি জানি আপনার যথেষ্ট সামর্থ্য আছে। কিন্তু হুট করে এসে একজন মানুষকে বিপাকে ফেলার মতো কান্ডজ্ঞানহীন আমি নই। এর পরেরবার যখন আসব, তখন আপনাকে জানিয়ে আসব। তখন আপনি যত ইচ্ছা আপ্যায়ন করবেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আপাতত এতটুকু গ্রহণ করুন।”
বলেই তপোবন ব্যাগগুলো ভেতরে রাখল। পরপরই নিজের সাথে আনা একটি ব্যাগ এগিয়ে দিতেই নিলীমা দেখলো তাতে হরলিক্স, দুধ, গ্লুকোজসহ নানা রকমের পুষ্টিকর খাবার। সে ফের অসন্তোষের দৃষ্টিতে বলল,
–“আমি এখন অনেক কাজ পাচ্ছি, শুকতারাকে এসব আমিই কিনে খাওয়াতে পারব।”
তপোবন স্মিত হেসে বলল,

–“যতদিন শুকতারার ভাইজান জীবিত আছে, ততদিন এগুলো আমি করবই। আপনি বাধা দিতে পারেন না। এটা নিতান্তই আমাদের ভাই-বোনের ব্যাপার!”
তপোবন ভেতরে গিয়ে বিছানায় পা গুটিয়ে বসল। পাশেই বিড়ালের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসা ছেলের ঘর্মাক্ত পিঠ হাতড়ে বলল,
–“জামা খুলে ফেলো আব্বু, ঘেমে ভিজে গিয়েছ।”
তানশান জামা খুলতে নারাজ। হঠাৎ এই আগমনের কারণ হিসেবে তপোবন কাউকেই কিছু বলেনি।
রূপকথা তড়িঘড়ি করে এসে ছেলের পিঠে হাত রেখে বলল,
–“ঘেমে গিয়েছ দেখছি, আমি ফ্যান ছেড়ে দিচ্ছি।”
ফ্যান ছেড়ে দিয়ে রূপকথা শুধাল,
–“কী খাবে?”
তানশান চোখমুখ কুঁচকে বলল,

–“আপনি আমায় আপ্যায়ন করছেন কেন?”
রূপকথাও কপাল কুঁচকে অনুযোগের সুরে বলল,
–“আমি করব না তো কে করবে?”
–“আপনি তো আমাদের সাথেই এসেছেন, আমাদের বাড়ির লোক আপনি।”
রূপকথা কোমরে হাত দিয়ে বলল,
–“আমি তোমাদের বাড়ির লোক না। এটা আমার ঘর, আমি এই বাড়ির মেয়ে।”
বাবা-ছেলের ললাটে ভাঁজ পড়ল। তানশান থমথমে গলায় ফের শুধাল,
–“আর আমাদের বাড়ির কী হন আপনি?”
–“কেন? তোমার মিমি, তোমার পাপার স্টুডেন্ট আর তোমার দাদুর পুত্রবধূ।”
রূপকথার নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বাবা-ছেলের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। রূপকথা মজা করে বললেও তারা বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারল না। তাদের গম্ভীর মুখ দেখে রূপকথা ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“কী হলো, এমন মুখ গোমড়া করে নিলেন কেন দুজন? এখানে ভালো লাগছে না?”
তানশান ভারি গলায় বলল,
–“আপনি আমাদের কিছু হন না?”
রূপকথা ঠোঁট উল্টে বলল,

–“আমি তোমার কিছু হই কি না, সেটা তো তুমি ভালো বলতে পারবে।”
তানশানের চোখেমুখে ঘোর বিরোধ। সে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল,
–“আপনি আমার কিছু হন না? এটা কেমন কথা? আপনি আমার ম…”
হড়বড়িয়ে বলতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল তানশান। রূপকথার হেঁয়ালির কারণ বুঝতে পেরে তার মুখশ্রী বিমর্ষ হয়ে উঠল। ছেলের হঠাৎ মিইয়ে যাওয়া দেখে রূপকথা ম্লান হাসল। বলল,
–“দেখেছ? আমি তোমার কিছু হলে তো তুমি জোর গলায় বলতে পারতে। কিন্তু তুমি পারলে না।”
রূপকথার অভিমান হয় না। নিজের পরিস্থিতি উপলব্ধি করে মনে হয় ছেলেটি ঠিকই করছে; কাউকে এত সহজে বাবা-মায়ের জায়গায় বসানো যায় না। সে হাসিমুখে বলল,
–“এখন বলুন, আপনারা কী খাবেন?”
–“কিছু না,”

তানশান বলতে না বলতেই নিলীমা
নানা পদের খাবার নিয়ে এলো। সাথে রোজও শরবত নিয়ে ঢুকল। হাস্যোজ্জ্বল মুখে রোজ বলল,
–“দেখো ভাইজান, আন্টি পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব তৈরি করে ফেলেছেন!”
তপোবন থমথমে মুখে কৃত্রিম হাসল। মস্তিষ্কে শুধু রূপকথার কথাটুকুই ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কি মন বুঝতে পারা সত্তাটি কারোর মন বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে?
পরবর্তী মুহূর্তগুলো নিলীমার আপ্যায়নের ব্যস্ততায় কেটে গেল। তপোবনের মেজো চাচি তাদের আসার কথা শুনে নিচে নামলেন। নিলীমা মেয়ের সাথে দু-দণ্ড কথা বলার ফুরসত পেল না, ব্যস্ত হয়ে পড়লো দুপুরের রান্না নিয়ে। শুকতারা তখন স্কুলে।
তপোবনের মেজো চাচি দীর্ঘক্ষণ পর শুধালেন,

–“তোমরা যে আসবা, হেইডা তো বড় ভাবি কয় নাই। আইজকা কি থাইকা যাবা?”
–“আজ থাকব চাচি,” তপোবন চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল।
–“হঠাৎ আসলা?”
–“আম্মাকে দেখতে এসেছি। রূপকথাও তো বিয়ের পর আর তেমনভাবে এই বাড়িতে আসেনি।”
–“ওহ্, কিন্তু এই ঘরে তো একটাই খাট, থাকবা কোহানে? তোমরা বরং উপর তলায় যাইয়া ঘুমাইয়ো।”
–“নাহ, এখানেই ঘুমানো যাবে।”
–“কীভাবে?”
–“একটু পরে ব্যবস্থা করব, চাচি। আপনি চা নিন।”
–“না, আমি সকালে চা খেয়েছি। আর খাব না। আমি তবে যাই, রান্না করি। তোমরা তো মনে হয় দুপুরেও এইখানেই খাইবা।”
–“জি।”
–“আচ্ছা আচ্ছা, উপরে যাইয়ো কিন্তু!”

তপোবন শুধু মাথা নাড়ল। রূপকথা ঘুরে ঘুরে মায়ের পুরো সংসারটা দেখছে। রান্নাঘরের কৌটাগুলো খুলে মশলা, চাল থেকে শুরু করে সবকিছু ভরপুর দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি প্রগাঢ় হয়। সে ব্যস্ত মাকে বলল,
–“এবার একটা ফ্রিজ কিনলেই তোমার আর কোনো চিন্তা থাকবে না আম্মা। আমি শিগগিরই ব্যবস্থা করব।”
মেয়ের কথায় নিলীমা চোখ তুলে তাকালেন। দৃষ্টি খানিক স্থির হলো মেয়ের পানে। আগের সেই অপুষ্টিতে ভোগা রোগা মেয়েটি আর নেই। স্বাস্থ্য ফিরেছে, চেহারায় আভিজাত্যের জৌলুস আর স্বামীর যত্নের উজ্জ্বলতা জ্বলজ্বল করছে। যেন এক পরিপূর্ণ সুখী নারী।
তিনি বললেন,

–“ওসব লাগবে না। তোর চাচি শাশুড়ির ফ্রিজেই সব রাখতে পারি।”
–“নাহ, কদিন অন্যের ফ্রিজে রাখবে? তুমি চিন্তা করোনা, আমি ঠিক ব্যবস্থা করে নেব। আমার কাছে অনেক টাকা অযথা পড়ে থাকে,” রূপকথা মায়ের পাশে পিঁড়িতে বসে বলল।
তপোবন রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। গলা খাঁকারি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতেই রূপকথা ফিরে তাকাল। নিলীমা তাড়া দিয়ে বললেন,
–“যা যা, দেখ ওদের কী লাগে!”
রূপকথা চঞ্চল কদমে এগিয়ে গিয়ে বলল,
–“কিছু লাগবে?”
পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল,
–“আমি আর তানশান একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
–“এই দুপুরে কোথায় যাবেন? কী রোদ! তানশান এমনিতেই ঘেমে গিয়েছে।”
–“সমস্যা নেই, একটু ঘুরে আসলে ভালো লাগবে। আসার পথে শুকতারাকে নিয়ে আসব। ওর স্কুল তো এক ঘণ্টা পরেই ছুটি।”

–“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
রূপকথা নিরুদ্বেগ মনে উত্তর দিয়েই পুনরায় মায়ের কাছে ছুটল। তপোবন পিছু ডাকল মাকে পেয়ে উল্লাসে মেতে থাকা মেয়েটিকে।
–“রূপকথা?”
ছুটন্ত রূপকথা পা থামিয়ে ফিরে তাকাল।
–“জি, বলুন।”
তপোবন চঞ্চল নেত্রপানে স্থির দৃষ্টি রেখে শুধাল,
–“তুমি আমাদের পরিবারের কেউ হও না?”
বাবা-ছেলে যে তখনো ওই কথাতেই আটকে আছে! তবে আজ আর রূপকথা দ্বিধাবোধ করল না। মিহি স্বরে বলল,
–“নিজেকে প্রশ্ন করুন, এরপর জবাবটা দিন। পরিবারটা আপনার, আমি শুধু হুট করে আছড়ে পড়া এক বলাকা। এখন পর্যন্ত কোনো দৃঢ় স্বীকৃতি তো পাইনি।”
বয়সের দোরগোড়ায় এক পরিণত সত্তাকে কঠিন দোলাচলে ফেলে রূপকথা চলে গেল। তপোবন তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার পথে। নিজেকে প্রশ্ন করল সে। অন্তঃস্থল থেকে একটিই জবাব এল

— “ঘরে ফিরে চোখ দুটো যে মানুষগুলোকে খোঁজে, তারাই তো একান্ত ব্যক্তিগত সুখ; আর সেই সুখের মাঝে এই নারীটি অন্যতম।”
অথচ আজকের আগে কখনো এই উপলব্ধি হয়নি। তপোবন ম্লান হেসে শাশুড়িকে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
স্কুল থেকে বের হতেই শুকতারা পরিচিত দুটো মুখ দেখল। বিশ্বাস করতে তার দুই মিনিট সময় লাগল। তপোবন স্মিত হেসে এগিয়ে গেল শুকতারার কাছে। আচমকা শুকতারা চেঁচিয়ে উঠল,
—”দুলাভাইইই!”
ছুটে আসা ছোট্ট দেহটিকে আগলে নিলো তপোবন। মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
—”কেমন আছেন দুলাভাই?”
শুকতারা চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
—”ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?”
পরপরই তানশানকে দেখে শুধাল,
—”আপাও কি আসছে?”
—”সবাই এসেছে, চলো।”

শুকতারা তানশানের সাথেও কথা বলল। তবে আপার ছেলেটা খানিক গম্ভীর, দুলাভাইয়ের মতো অমায়িক নয়। তাই সে দুলাভাইয়ের সাথেই সেঁটে রইল। তপোবন তাকে আইসক্রিম আর একটা প্রিঙ্গেলস কিনে দিয়ে গাড়িতে ওঠে।
বাড়িতে এসে তপোবন লোক দিয়ে দোতলার স্টোর রুম থেকে একটি খাট আনার ব্যবস্থা করল।
নিলীমা যে বাসায় থাকে, তা বেশ বড়সড়। তপোবনের জোরাজুরিতেই সে এখানে থাকছে। এখন আর নরপশুদের ভয় তাকে তাড়া করে না।
তপোবন খাট সেট করে ওপর থেকে তোশকের ব্যবস্থাও করল। সব ঠিকঠাক করে হাঁফ ছেড়ে বলল,
–“এখন আর টেনশন নেই। এবার যখন-তখন এসে সবাই আরামে থাকা যাবে।”
নিলীমা মুগ্ধ হন তপোবনের এই ক্ষুদ্র কিন্তু বৃহৎ প্রচেষ্টাগুলোতে। তাদের আপন করে নিতে লোকটা কোনো আপস করে না।
রূপকথা আর রোজ তখন মনোযোগ দিয়ে আদা-রসুন কাটছে। নিলীমা অসন্তোষের সাথে বললেন,

–“তোমরা কেন করছ এগুলো? রাখো, আমি করে নিতে পারব।”
রোজ কখনো এসব কাজ করে না, তবুও সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“চিন্তা করবেন না আন্টি। আমরা বাড়িতে সবাই মিলেমিশে কাজ করি। আমি কিন্তু মোটেই কুটনী ননদ নই, তোমার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করে দেখো।”
রোজের কথায় রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। মাকে বলল,
–“সে আমার বড় আপুর মতো, আম্মা। আমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করে, কলেজে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। নিজের পড়াশোনা সামলেও আমাকে ঘরের কাজে সাহায্য করে।”
নিলীমা হেসে তার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন। রোজ রসুন কাটতে হিমশিম খেয়ে ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলল। উঠে গিয়ে ভাইকে বলল,

–“ভাইজান, রসুন কুচি করা তো বেশ ঝামেলার। আন্টির অনেক কষ্ট হয়। তুমি একটা চপার আর ব্লেন্ডার আনাও তো তাড়াতাড়ি।”
তপোবন উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“এখনি?”
–“হ্যাঁ, এখনি। ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলো আজকেই দিয়ে যেতে।”
–“আচ্ছা, ব্যবস্থা করছি। কিন্তু এখন কী করবে?” তপোবন চিন্তিত কণ্ঠে শুধাল।
–“এখন মেজো চাচির থেকে ধার আনব। এত রান্না, আন্টি একা বাটাবাটি করবেন কীভাবে!”
বলেই রোজ ছুটল। নিলীমা কপাল চাপড়াতে লাগলেন। রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“তাকে আটকাতে যেয়ো না। সে এমন সবার জন্যই ভাবে।”
–“সে তো আগেই বুঝেছি। এসেই কেমন আমার হাত থেকে শরবতের গ্লাসগুলো নিয়ে নিলো। ভারি মিষ্টি মেয়ে! মৌনতার সাথে যখন লেগে থাকত, তখন ওর কথা শুনলে গা শিউরে উঠত। এতগুলো বছর যার সাথে ঘর করল, সেই মানুষটা যদি এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে তা শুনলেই তো রক্ত ছলকে ওঠে। ও কীভাবে সহ্য করেছে? আল্লাহ কাউকে এমন বিদঘুটে জীবন না দিক!”

মায়ের কথায় রূপকথার হাত থেমে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কীভাবে বলবে যে, এক হতভাগ্য নারীর যে চরম পরিণতির কথা ভেবে মায়ের বুক ফেটে যাচ্ছে, সেই একই বিভীষিকার শিকার সে নিজেও? সত্যটা গলায় এসে আটকে রইল। চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের এক যন্ত্রণাময় প্রতিচ্ছবি।
তপোবনের মেজো চাচির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে রুশান ঢাকাতে অনার্সে পড়ে। ভাগ্যক্রমে আজ সে বাড়িতে থাকায় তাদের আরও একজন সঙ্গী হলো। দালানের সামনের বিশাল উঠোনে হট্টগোল শুরু হলো। তপোবন আর তানশান টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরে নামল। রোজ ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুশান এসে তার মাথায় চাটি দিয়ে ব্যাটটা কেড়ে নিল। বিদ্রুপ করে বলল,

–এই ছেরি তুই দুধভাত, তুই ব্যাট ধরে আছিস কেন?”
রোজ ফুঁসে উঠে দু-হাতে তার চুল টেনে ধরল।
–“আমি দুধভাত না! ভাইজান আসুক, আমি অনেক সুন্দর ব্যাটিং করি।”
রুশান ঝাড়া মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। দাঁত কেলিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ, তারপর দেখব ব্যাটের সাথে তুইও উড়ে গিয়েছিস।”
তপোবন হেসে বলল,
–“ওকে ক্ষেপিয়ে লাভ নেই রুশান, ও খুব ভালো খেলে।”
–“সেটাই তো বলছি ভাইজান, প্রত্যেক শটে ছক্কা হবে, কিন্তু বলের বদলে আমাদের রোজু উড়ে যাবে!”
তপোবন হো হো করে হেসে উঠল। রোজ রেগে পুনরায় রুশানের চুল টেনে ধরল। রুশান চেঁচিয়ে উঠল,
–“ওরে পেতনি ছাড়! ভাইজান, এটাকে বিয়ে দাও না কেন?”
–“আমার বিয়ে নিয়ে তোমার মাথা ব্যথা কেন?” রোজ ফুঁসে উঠল।
–“বহু বছর কারও সর্বনাশ হতে দেখি না। তোকে রানি থেকে কারও চাকরানি হতে দেখলে আমার চিত্ত ঠান্ডা হবে রে রোজ!”
তপোবন স্টাম্প গাড়তে গাড়তে বলল,

–“উঁহু, আমার রোজকে যে রানি করে রাখতে পারবে, তার কাছেই ওকে দেব।”
–“তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও ভাইজান, নয়তো আমার মাথায় একটা চুলও থাকবে না। কথায় কথায় চুল টানে বেত্তমিজ ছেরি!”
তানশান নীরবে তাদের ঝগড়া দেখল। শুকতারা খাবার খেয়ে ছুটে এল খেলা দেখতে। ব্যাটিংয়ের শব্দ আর ছক্কা মারার উল্লাসে মুখরিত হলো মধ্যাহ্ন প্রহর।
রূপকথা আর তার মা ততক্ষণে রান্না শেষ করেছেন। রূপকথা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। সবাইকে ঘর্মাক্ত দেখে বলল,
–“গোসল করে নিন সবাই, রান্না শেষ!”
তপোবন আর তানশান আজ বহুদিন বাদ অন্যরকম এক উদ্দামতায় খেলছে, তাই তারা খেলা থামাতে নারাজ। রুশান চেঁচিয়ে বলল,

–“ভাবিজান, আজ আরও খেলা হবে। খেলা শেষে দিঘিতে গিয়ে গোসল করব।”
তপোবনও সায় দিল। রূপকথা, শুকতারা আর রোজ আগে গোসল করতে গেল। বোনকে পেয়ে শুকতারা আনন্দে আত্মহারা।
বেলা দুইটা নাগাদ তাদের খেলা শেষ হলো। রুশান, তপোবন ও তানশান গোসল সেরে তড়িঘড়ি নামাজ পড়ে এল। ফিরতেই তপোবন রুশানকে নিয়ে খেতে বসল। মেঝেতে বিছানো শীতল পাটিতে বাবা-ছেলে, রুশান ও রোজ সানন্দে বসল। নিলীমা লজ্জিত কণ্ঠে বললেন,
–“আমি বিছানায় বসতে বলেছিলাম, কিন্তু রোজ বলল নিচেই খাবে।”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“এখানেই ভালো লাগছে আম্মা। দেখুন, আপনার নাতি খুব খুশি।”
নতুন অভিজ্ঞতায় তানশানকে সত্যিই খুব খুশি দেখাচ্ছিল। প্রিয়জনদের সাথে থাকলে বাঁশ তলায়ও কোনো দুঃখ থাকে না। নিলীমা তানশানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন, নাতির প্লেট ভরিয়ে দিলেন হরেক খাবারে।
রূপকথা মৃদু হেসে বোনকে খাইয়ে দিতে লাগল। মানিয়ে নিতে পারলে অভিশাপও আশীর্বাদে পরিণত হয়।
বোনের মুখে ভাত তুলে দিতে দিতে সে শুধাল,

–“মজা হয়েছে তারা?”
–“খুব মজা হয়েছে, বুবু।”
শুকতারা প্রাণোচ্ছ্বল হেসে বলল। কতগুলো মাস বাদ আপার হাতে খাচ্ছে।
নিলীমা খাওয়া শেষ করেই পিঠা বানাতে বসলেন। রোজ অনুযোগের সুরে বলল,
–“আন্টি, এত ঝামেলার কী দরকার? একটু আমাদের সাথে বসুন।”
নিলীমা ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,
–“আবার কবে আসবে তা তো ঠিক নেই, পিঠা না খাওয়ালে হয়? তোমরা গিয়ে আড্ডা দাও, আমি ততক্ষণে পিঠা বানিয়ে ফেলব।”
রূপকথা আর রোজ গেল না, বরং তাকে সাহায্য করতে লাগল। আসরের নামাজের পর তপোবন এসে বলল,
–“চলো, সবাইকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি।”
নিলীমা হাসিমুখে বললেন,

—”যান, ঘুরে আসুন। ওদের ভালো লাগবে।”
তপোবন নাকচ করে বলল,
—”গেলে আপনাকে সাথে নিয়েই যাব, নয়তো না।”
তপোবনের জেদি কণ্ঠ। রোজ অনুনয় করে বলল,
–“আন্টি ঘুরে এসে সবাই মিলে ঝটপট পিঠা বানিয়ে ফেলব, চলো না।”
অগত্যা আধাআধুরা পিঠা বানানো ছেড়ে নিলীমাকেও যেতে হয়। তপোবন একদিন থাকার প্রস্তুতি নিয়েই সকলের পোশাক এনেছিল। এতে রূপকথার মন যেমন ভালো হবে, শাশুড়ির মাতৃত্বের হাহাকারও শান্ত হবে; আর যারা এই মানুশগুলোকে দুঃখ দিতে মরিয়া, তাদের সব হীন প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হবে।
তবে আজ তাদের ঘোরাঘুরির সঙ্গী গাড়ি নয় বরং পাঁচটি রিকশা নিয়ে তারা ঘুরতে বের হলো। আজ রূপকথা মা আর বোনের হাত ছাড়বে না। সে মায়ের কনুই আঁকড়ে ধরে বোনের সাথে বসল। তপোবন ছেলেকে পাশে নিয়ে বসল।
রোজ থমথমে মুখে রুশানের দিকে তাকাল। রুশান মেকি হেসে বলল,

—”তোকে যদি এখান থেকে ঠেলে ফেলে দেই, তবে কেমন হবে রোজু?”
রোজ চেঁচিয়ে উঠল,
—”ভাইজাননন! এই ইবলিশ শয়তানের সাথে আমায় কেন বসিয়েছ? আমি তোমার কাছে বসব।”
তপোবন গম্ভীর মুখে রুশানকে বলল,
–“রুশান, ওকে বিরক্ত করো না।”
রুশান দাঁত কিড়মিড় করে রোজের চুল ধরে দিল এক টান। ন্যাকা সুরে বলল,
–“কথায় কথায় ভাইজাননন বলে চার আলিফ টান দিস কেন বেয়াদব ন্যাকা মেয়ে? তোকে কি আমি চিমড়ি দিয়েছি? কিছু করেছি?”

–“তো চুপচাপ বসতে পারো না?”, রোজ রাগান্বিত স্বরে বলল। রুশান বিরক্তি নিয়ে নিজের ফোনে মুখ গুঁজল।
ফুচকা, পানি পুরি খেয়ে ষাট গম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলী মাজার ঘুরলো। কিছু ফল কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরল। নারীরা মত্ত হয় আবার রান্নাঘরের কাজে। পিঠা, মাংস আর রুটি দিয়ে রাতের ভোজন শেষ হয়।
অতঃপর একটা সুন্দর দিনের প্রশান্তিময় সমাপ্তি ঘটে গভীর রাতে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে। রুশান যখনো পিছু ছাড়েনি তাদের। বালিশ কাঁথা নিয়ে নিচ তলায় হাজির হতেই তপোবন হেসে উঠল। নিজ উদ্যোগে নিজের পাশে জায়গা করে দেয়। নরীরা সবাই অন্য রুমে ঘুমাবে।
বাবার পাশে শুয়ে তানশান প্রগাঢ় হেসে বলল,
–“পাপা, এই নানুর বাসাতেও অনেক মজা হয়, আমরা আবার ও আসব ঠিক আছে?”
তপোবন মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। বলল,
–“যখন ইচ্ছে হবে তখন আসবে।”
উঁকি দিয়ে দেখতে থাকা রূপকথা হাঁফ ছাড়লো ছেলের হাসিমুখ দেখে। তাদের তো আর বিলাসী জীবন নয়। ভেবেছিল ছেলেটা যদি এখানে এসে খুশি নাহয়? কিন্তু তপোবন সিকদার যে ছেলেকে সব পরিবেশে খুশি হতে শিখিয়েছে।
আঁধারে ধূসর এক জোড়া চোখে চোখ পড়তেই রূপকথা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায়। ইশারায় কৃতজ্ঞতা জানায়, হুটহাট শ্রান্ত জীবনে এক ঝুলি সুখ নিয়ে আসায়।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের পরিকল্পনা মাফিক চলে না। দিনশেষে প্রতিটি ফলাফলও আমাদের মনের মতো নিখুঁত হয় না। যেখানে আমরা জীবনের দীর্ঘ দৌড়ে দুঃখ থেকে পালাতে চাই, সেখানে আমাদের শেষ গন্তব্যই হয় দুঃখ।
তেমনি তপোবনের অভিপ্রায়গুলোও পূরণ হলো না। যে দুঃখ থেকে রূপকথাকে আড়াল করতে এত এত পরিকল্পনা, সেই দুঃখই তখন সশরীরে রূপকথার সামনে দণ্ডায়মান।
সকাল দশটা নাগাদ রূপকথারা বাগেরহাট থেকে বাড়ি ফিরল। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে রূপকথা ছেলের ঘরে ঢুকে তার প্রয়োজনীয় সবকিছু বের করে দিল। এখন এই নারীটি অবাধে, বিনা অনুমতিতে ছেলের ঘরে ঢোকে, নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। আর এতে গুরুগম্ভীর ছেলেটি একটুও দ্বিরুক্তি করে না; বরং মা আধিপত্য বিস্তার না করলে সে আরও অস্থির হয়ে পড়ে।
ছেলের ঘর থেকে বের হয়ে রূপকথা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু করিডোরের গলি পেরিয়ে ব্যস্ত কদমে এগিয়ে আসা মানুষটিকে দেখে তার দৃষ্টি থমকে যায়।
পোর্চে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াহেদের ফোনে কথা বলা শেষ হতেই সে কড়িডরে পা বাড়ায়। কিন্তু তার ব্যস্ত কদমদুটি ভীষণভাবে থমকায় সম্মুখে দণ্ডায়মান অতিপ্রিয় মুখটিকে দেখে। মুহুর্তেই চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে।
সে একপ্রকার ছুটে আসে। আদুরে গলায় ডোকে ওঠে,

–“রূপকথা আম্মা, এসেছো? আব্বু অপেক্ষায় ছিলাম তোমার। আব্বুর একটু কথা শোনো।”
চোখের সামনে শুধু মানুষটার ঘৃণ্য কৃতকর্ম ভাসছে, মস্তিষ্কের এক একটা নিউরনে প্রদাহ সৃষ্টি করছে মায়ের দূরবস্থা। মুহুর্তেই অস্থির হয়ে পড়া রূপকথা লালচে নেত্র তুলে তাকায়। কম্পিত হাত তাক করে কঠিন স্বরে বলে,
–“একদম আমায় মা বলে ডাকবেন না। আপনার ঘৃণ্য মুখে আপনি আমার নাম নেবেন না। দূরে সরুন, কাছে আসবেন না। আমি আপনাকে চিনি না।”
বলতে বলতেই রূপকথার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই তো সেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রিয় মানুষটা! অথচ আজ চেয়েও তার প্রতি একটুও ভালোবাসা আসছে না বরং ঘৃণায় বিষিয়ে আসছে অন্তঃস্থল!
ওয়াহেদের ব্যস্ত কদম থেমে যায়। ছলছল নেত্রে শুকনো ঢোক গিলে অনুনয় করে বলল,
–“আম্মা, আব্বুর একটু কথা শোনো। আমি দোষী আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আব্বুর কাছে কৈফিয়ত আছে। সেইটুকু একটু শোনো। এরপর যা শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেবো। কিন্তু একটু বলার সুযোগ দাও নয়তো আব্বু মরেও শান্তি পাব না।”
রূপকথা বলহীন দেহে চেয়ে রইল অতিপ্রিয় মুখপানে। আফসোসের সুরে বলে,

–“কৈফিয়ত? কি কৈফিয়ত দেবেন আপনি? আমার মা থাকা অবস্থায় বিয়ে করেছেন, বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, আপনাদের সুখের জীবনের একটা জীবন্ত অংশ আছে। আপনি বিপদে পড়ে আমাদের সাথে দেখা করতে পারেননি? এগুলোর কৈফিয়ত দেবেন? আপনি কি এগুলো কোনো বিপদে পড়ে করেছেন? এগুলো আদোতেও বিপদে পড়ার ফলাফল? দয়াকরে আমায় এমনকিছু বলে হাসাবেন না।”
ওয়াহেদ বলহীন দেহে চেয়ে বলল,
–“আমি সত্যিই বিপদে পড়েছিলাম, রূপকথা।”
রূপকথা সরব ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রাগে ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠে বলল,
–“আমি যদি ভুল না হই, আপনি আগামী দশ বছরেও নিজের মুখোশ খুলে বাইরে বের হতেন না, যদি না আমি সেদিন আপনাকে দেখে ফেলতাম। এখন বিপদে পড়ে এসেছেন কৈফিয়ত দিতে? আপনার বুকের ভেতরে কি মন নেই? একটাবার ভেবেছেন কখনো—আমরা একটা কুঁড়েঘরে তিনটা মেয়েমানুষ টাকাপয়সা ছাড়া বিগত দশটা বছর কীভাবে কাটিয়েছি? লোভ এত বিদঘুটে যে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি হরণ করে ফেলে? আপনিই কি সেই বাবা, যে আমায় বুকে জড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিত? একটা মানুষ এত নিখুঁত অভিনয় কীভাবে করতে পারে?”
রূপকথা হেঁচকি তুলতে তুলতে এক পল থামে। ফের অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,

–“বিপদ? এমন বিপদ যা আপনাকে বিলাসবহুল জীবন দিয়েছে? বড়লোক সুন্দরী কমবয়সী স্ত্রী দিয়েছে, আপনার সুখের সংসার হয়েছে, আপনাদের সুখের সংসারে একটা সন্তান রয়েছে। আর আপনি বিপদের পড়ে বিগত দশ বছরে নিজের ফেলে আসা স্ত্রী সন্তানের একটা খোঁজ নিতে পারেননি। এটাকে বিপদ বলেন আপনি? আমায় বোকা ভাবছেন? আমার মা আপনার জন্য এমন একটা মানুষ ছিল যে কি-না সকল বিপদে নিজের সর্বস্ব দিয়ে আপনার পাশে থেকেছে। আপনি বিপদে পড়েছিলেন তা যদি একটাবার আমার মাকে গিয়ে জানাতেন আমার মা মেনে নিতো। কিন্তু আপনি? বিপদে পড়ে এমন বিলাসী জীবন পেলেন যে আমার মাকেই ভুলে গিয়েছেন, ভুলে গিয়েছেন নিজের অবুঝ দুটো মেয়েকে।”
রূপকথার চিৎকার আর কান্নায় মুহুর্তেই ঘরময় ভারী হয়ে উঠল। সদ্য ওয়াশরুম থেকে বের হওয়া তানশান ছুটে ঘর থেকে বের হয়। ছুটে বের হয় ঘরের বাকি মানুষগুলোও। নিঝাম আর নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার কারোর চিৎকারে উপরে উঠতেই অবাক হয়ে যায়। রূপকথাকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে ওয়াহেদের সাথে। রোজ অবাক হয়ে গেল ওয়াহেদকে দেখে।
নিঝাম হতবাক হয়ে গেল। ক্ষিপ্র কদমে ছুটে যায় ওয়াহেদের কাছে। ওয়াহেদের হাত ধরে হতভম্ব হয়ে বলে ওঠে,

–“আমার স্বামীর সাথে দুর্ব্যবহার করার সাহস কি করে হয় তোমার, রূপকথা?”
তানশান ওয়াহেদকে দেখেই দুহাতে আগলে নেয় ক্রন্দনরত রূপকথাকে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
–“শান্ত হন, মিমি।”
পরক্ষণেই ওয়াহেদের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল তানশান। দাদুর সামনেই দুঃসাহসিক কণ্ঠে ওয়াহেদকে বলল,
–“আপনি কেন আবার আমার মিমিকে বিরক্ত করতে এসেছেন? সে আপনার মতো মানুষের সাথে কথা বলতে চায় না আপনি কি বুঝতে পারছেন না, নানু?”
হতবাক নির্জনা বেগম কঠোর গলায় ধমকে উঠলেন নাতিকে,
–“তানশান? তুমি কোন সাহসে বড়দের সাথে এমন আচরণ করছো?”
তকদির সিকদার ও প্রথমবার নাতির এমন দুঃসাহসিক আচরণে অবাক হয়ে গেলেন।
নিঝাম হতভম্ব হয়ে বলল,

–“আপা, দেখলে মা ছেলে কীভাবে অপমান করলো আমার স্বামীকে?”
“আমার স্বামী“ রূপকথার দেহটা ঢলে পড়তে নিলো কঠিন শব্দটি শুনে। তানশান শক্ত হাতে আগলে নিলো রূপকথাকে। রোজ ও ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরল রূপকথাকে।
তানশান দাদুর দিকে চেয়ে ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“যে যেমন তার সাথে তেমনি আচরণ করেছি, দাদুমনি। তাকে বলো, আমার মিমির থেকে দূরে থাকতে। নয়তো আমি ম্যানার্স ভুলে যাবো।”
নির্জনা আর নিঝাম অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় তানশানের দিকে। তপোবন গাড়ি পার্ক করে ঘরে ঢুকলো। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে উপরে উঠতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল ওয়াহেদকে দেখে। তারা এখনো এখানে? সম্মুখে ভঙ্গুর রূপকথাকে দেখে বুঝতে বাকি রইল না তার সব পরিকল্পনা ফিকে পড়েছে ঘৃণ্য বাস্তবতার কাছে। সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। তপোবন বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল।
নিঝাম তেতে উঠল তানশানের উপর,

–“একটুখানি ছেলে তুমি আমার স্বামীর সাথে বেয়াদবি করার সাহস কি করে পাও? এখুনি ক্ষমা চাইবে তানশান নয়তো আমিও ভুলে যাবো আমি তোমায় কখনো স্নেহ করতাম।”
তানশান চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“তোমার মতো মানুষের স্নেহ আমার একদমই চাই না, ছোট নানু। আমি ক্ষমা চাইব না। সে আমার মিমিকে কষ্ট দিতে চেয়েছে বলেই আমায় খারাপ ব্যবহার করতে হয়েছে। আমি কোনো অপরাধ করিনি। এত দুঃখ দিয়েও সে কেন বারবার ফিরে আসে মিমিকে আর তার পরিবারকে দুঃখ দিতে?”
নিঝাম রাগে ফেটে পড়ে তানশানের দিকে তেড়ে যেতেই পেছন থেকে ভেসে আসে বজ্রকঠিন কণ্ঠ।
–“আমার স্ত্রী সন্তানের গায়ে হাত দেয়ার দুঃসাহস দেখাবে না, ছোট খালামনি।”
নিঝামের গতিশ্লথ হয়। নির্জনা বেগম উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“এসব হচ্ছে কী তপোবন? রূপকথা আর তানশান খারাপ ব্যবহার করেছে ওয়াহেদ আর নিঝামের সাথে। আর তুমি তাতে প্রশ্রয় দিচ্ছো?”
তপোবন ধীর কদমে এসে স্ত্রী সন্তানের পেছনে দাঁড়ায়। ওয়াহেদের আনত মুখপানে চেয়ে গনগনে স্বরে বলল,

–“আমি খুব করে চেয়েছিলাম দুই দিকেই একটা শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি ধরে রাখতে। কিন্তু তা তুমি করতে দিলে না, খালু। এখন সত্যটা তুমি বলবে, নাকি আমি বলব?”
ওয়াহেদ মাথা তুলে তাকায়। আজ আর কোনো দ্বিধা নেই ওই মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আমি বলছি ,তপোবন।”
নিঝাম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে স্বামীর কাছে। হাত ঝাঁকিয়ে বলল,
–“কি বলবে তুমি, হ্যাঁ? ওরা কিসের কথা বলছে ওয়াহেদ? আর রূপকথা কোন সাহসে তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করল, তুমি কষিয়ে একটা চড় মারোনি কেন?”
ওয়াহেদ শ্রান্ত নয়নে তাকায় নিঝামের দিকে। মিহি স্বরে বলে,
–“এই হাত দিয়ে যেদিন আমার মেয়ে আঘাত পাবে সেদিন আমার শেষ দিন হোক, নিঝাম।”
–“অথচ গোটা আপনিটা দ্বারাই আমি আর আমার পরিবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছি।”, রূপকথা ম্লান দৃষ্টিতে চেয়ে বলে উঠল। ওয়াহেদ শুধু নতশির চেয়ে রইল মেয়ের দিকে। তকদির সিকদার অস্ফুট স্বরে আওড়ায়,“মেয়ে?”
নিঝামের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “তোমার মেয়ে?”
ওয়াহেদ লালচে নেত্রে চেয়ে মাথা নেড়ে বলল:

— “হ্যাঁ, আমার মেয়ে। আমার ছোট্ট রূপকথা এখন কত বড় হয়ে গিয়েছে, দেখেছো? আমার মেয়ে এখন কারও স্ত্রী, কারও মা; এই গোটা সংসার সামলায় সে। আমার অবর্তমানে নীলিমা ওকে খুব ভালোভাবে বড় করেছে, কখনো আঁচ লাগতে দেয়নি। এই জন্যই আমার সবসময় নীলিমার ওপর গর্ব হতো, জানো? ও অনেক শক্তিশালী। আমার দুঃসময়ে শক্তভাবে আমার পাশে ছিল সবসময়। কিন্তু আমি? আমি তো কাপুরুষ! ওর দুঃসময়ে আমি থাকতে পারিনি, বরং ওর সকল দুঃখের কারণ আমি নিজেই।”
বলতে বলতেই ওয়াহেদের চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু গড়ায়। নির্জনা বেগমের মাথা ঘুরে গেল, চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে আসতেই তকদির সিকদার তাকে আঁকড়ে ধরেন। নির্জনা অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“এসব কি বলছো ওয়াহেদ? রূ…রূপকথা তোমার মেয়ে? দশ বছর আগে রূপকথার মাকে ফেলে যাওয়া মানুষটা তুমি?”

– “হ্যাঁ আপা। আপনার আদরের বোন দশ বছর আগে আমার সাথে এত জঘন্য খেলা খেলেছে যে আমি আর বের হতে পারিনি। একটাবার দেখা করতে যেতে পারিনি আমার ফেলে আসা পরিবারের সাথে।”
নিঝাম দরদর করে ঘামছে। সবটা যেন আজ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। ওয়াহেদ ফের কিছু বলতে গেলেই সে তার কলার চেপে ধরে বলল:
– “একদম চুপ ওয়াহেদ! কোনো পরিবার নেই তোমার। কিছু বলবে না তুমি।”
দম ফেলে সে বড় বোনের দিকে তাকাল। ঘর্মাক্ত মুখে জোর করে হেসে বলল:
– “কিছু না, কিছু না আপা। ও মজা করছে। এইসব মিথ্যা। এই ওয়াহেদ, বাড়ি চলো। আমি একদম তৈরি। চলো, চলো।”
ওয়াহেদকে এক প্রকার টেনে নিয়ে যেতে চাইলে সপাটে এক চড় পড়ল নিঝামের গালে। নিঝাম স্তব্ধ হয়ে গেল গালে হাত দিয়ে। ওয়াহেদ রক্তচক্ষু নিয়ে ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“অনেক হয়েছে নিঝাম। এবার সবাইকে জানতে দাও এই সুন্দর চেহারার পেছনে একটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ রয়েছে।”

রূপকথা আর তপোবন ভ্রু কুঁচকে নিল দুজনের অদ্ভুত আচরণ দেখে। ওয়াহেদ সকলের দিকে চেয়ে বলতে শুরু করল দশ বছর আগে তার জীবন বদলে দেওয়া সেই বিদঘুটে মোড়ের কথা। তপোবন, তকদির সিকদার আর নির্জনা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু রূপকথা! সে তখনও পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে আছে। মনে মনে শুধু একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে—’বাবারা শক্তিশালী হয়, বাবারা চাইলে সব করতে পারে।’
কিন্তু সামনের মানুষটা কখনো প্রকৃত বাবা ছিলেনই না। প্রকৃত স্বামী হওয়া তো আরও হাস্যকর ব্যাপার! নয়তো দশ বছরে যেভাবেই হোক সে তার স্ত্রী-সন্তানের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। এই কৈফিয়তগুলো রূপকথার মাঝে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তৈরি করল না।
নিঝাম কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর দরদর করে ঘামছে। অস্থির দৃষ্টিতে সে পালাতে চাচ্ছে ওয়াহেদকে নিয়ে। সে বোন আর দুলাভাইয়ের থেকে দৃষ্টি লুকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ওয়াহেদের হাত চেপে ধরে বলল:

— “বলা হয়েছে? এখন চলো। যেভাবেই হোক না কেন, তুমি আমার স্বামী ছিলে, আছো। আর সব মিথ্যা। আমাদের একটা সুখী সংসার আছে, সন্তান আছে। আমরা ভালো আছি। চলো ওয়াহেদ।”
ওয়াহেদ এক পা-ও নড়ল না। নির্জনা বেগম স্বামীর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন। ধীর কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন বোনের সামনে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদারই হয়ে ওঠেন মাহমুদ পরিবারের একমাত্র গুরুজন। সবাই তাকে শ্রদ্ধা, ভয় করে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করে তার মুখনিঃসৃত প্রত্যেকটা বাক্য।
নিঝাম গুটিয়ে গেল। বোনের থেকে দূরে সরতে সরতে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। নির্জনা বেগম এগিয়ে গিয়ে চেপে ধরলেন নিঝামের হাত। নিঝাম হাত মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,
— “আপা ছাড়ো, আমি ওয়াহেদকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাব। আর কখনো আসব না তোমার বাড়িতে। তোমরা সবাই খারাপ।”
নির্জনা বেগম ভ্রুক্ষেপ করলেন না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ক্ষীণ স্বরে শুধালেন,

–”ওয়াহেদ যা বলছে তা কি সত্যি?”
— “না না, কিছু সত্যি না! সব মিথ্যা, সব মিথ্যা!” নিঝাম হড়বড়িয়ে বলল।
নির্জনা বেগম এবার বজ্রকণ্ঠে শুধালেন:
— “তুই ওকে ফাঁসিয়ে বিয়ের জন্য বাধ্য করেছিস? ও বিবাহিত, দুই বাচ্চার বাপ জেনেও তুই ওকে ফাঁসিয়েছিস? তুই একটা নারীর ঘর ভেঙেছিস? আমি জবাব চাই নিঝাম। নয়তো এক পা-ও এখান থেকে নড়তে পারবি না, আর ওয়াহেদও এখান থেকে কোথাও যাবে না।”
অস্থির নিঝাম এবার রাগে নির্জনা বেগমকে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে উঠল,
— “হ্যাঁ, ফাঁসিয়েছি আমি! ইচ্ছে করে ফাঁসিয়েছি। আমার ওকে ভালো লেগেছে, আমি বিয়ে করতে চেয়েছি। আমি ওকে একটা সুন্দর বিলাসবহুল জীবন দিয়েছি, সুখ দিয়েছি—যা ওই সংসারে ও পায়নি কখনো। যা করেছি বেশ করেছি। আমরা সুখে আছি, তোমরা আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাতে আসবে না একদম। তোমরা আমার কেউ হও না।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই বাম গালে সপাটে আরেকটা চড় পড়ল। নিঝাম মুখ থুবড়ে পড়ল রেলিংয়ের ওপর। চোখ তুলে তাকাতেই বিলম্বহীন আরও একটা চড় পড়ল ডান গালে।
পুরো ঘরময় সকলে নির্বাক, নিস্তেজ। ওয়াহেদ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলের বাহুডোরে থাকা রূপকথা বলহীন, দুর্বল দেহে শুধু তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে।
ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসা নিঝাম অবাক পানে তাকাল বোন আর দুলাভাইয়ের দিকে। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫২

– “তোমরা কোন সাহসে আমার গায়ে হাত তুললে?”
তকদির সিকদার কঠিন দৃষ্টিতে বললেন:
— “তোমাদের মতো সমাজের কিছু কীটদের দমাতে সাহসের প্রয়োজন হয় না, নিঝাম। তোমরা তৈরিই হও ধ্বংস করার জন্য। তাই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করতে তোমাদের মতো কীটদের নিধন করাই একমাত্র উপায়।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here