নূর ই মহব্বত পর্ব ১২
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
– আপনি ঘরে বউ রেখে বাইরে সম্পর্ক রাখেননি?
আযলান চিল্লিয়ে বললো,
– হোয়াট! কি বলছো এসব! আমি কেন বাইরে কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে যাবো?
নওমি চুপ করে গেল। তুহি আর আবরার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। আযলান আবার বললো,
– কি বলতে চাইছো পরিষ্কার করে বলো!
নওমি ঠান্ডা স্বরে বলল,
– আপনার ডক্টর একজন ফ্রেন্ড যে ছিলো? ওনার সাথে আপনার সম্পর্ক ছিলো না?
– কে? কার কথা বলছো নওমি তুমি? তুমি ছাড়া অন্য কারো সাথে আমার… কিসব ভেবে নিয়েছো তুমি?
নওমির চোখের সামনে ভেসে উঠলো কিছু ছবি যেগুলো তাকে দেখানো হয়েছিল। আহিলের মধ্যে পরিবর্তন আসার পর নওমি এক প্রকার চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলো। তখন তাদের বাড়িতে আশা যাওয়া করতো ডক্টর সামিয়া রহমান। আহিলের বন্ধু হিসেবে সামিয়াও ভালোই পরিচিত ছিল। হুট করে নওমির সাথে তার ভাব বেড়ে গেল। সব সময় চেষ্টা করতো ওর সাথে থাকতে, কথা বলতে। নওমি ততদিনে আহিলের চিন্তায় ডুবে থাকতো। ওর চোখ মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। আর এইটা চোখে পড়েছিল সামিয়ার। সে একদিন এসে তাকে বলছে,
– কি হয়েছে তোমার? চোখ মুখ এমন হয়েছে কেন নওমি?
নওমি লুকোনোর চেষ্টা করে বললো,
– কিছু না আপু এমনি।
নওমির এই হালকা জবাব সেদিন সামিয়াকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল এক ধূর্ত, বিষাক্ত হাসি যেটা নওমির চোখের আড়ালেই রয়ে গেল।
সে নওমির পাশে বিছানায় এসে বসে অত্যন্ত দরদ মাখানো গলায় বলেছিল,
– আমাকে বোন ভেবে বলতে পারো নওমি! আমি বুঝতে পারছি তুমি কোনো একটা সমস্যায় আছো।
নওমিকে জোরাজড়ি করলে নওমি সবটা বলে দেয়। সামিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
– তোমাকে আজ কিছু সত্যি বলবো কেমন? বিশ্বাস করলে বলবো নাহয় থাক।
নওমি অবাক হয়ে বলেছিল,
– কি সত্যি আপু?
সামিয়া হতাশার সুরে বললো,
– তোমার বিশ্বাস না হতেই পারে কিংবা খারাপ লাগবে আমি জানি কিন্তু তোমার কষ্টও আমি দেখতে পারছি না তাই বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নওমি চুপ করে শোনার প্রস্তুতি নিয়েছে। সামিয়া বলতে শুরু করলো,
– তোমার ভালোর জন্যই আমাকে এই অপ্রিয় সত্যটা বলতে হচ্ছে নওমি। সেটা হলো আহিল আর আমি মেডিকেলের শুরু থেকেই একে অপরকে ভীষণ পছন্দ করতাম। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে ও তোমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল।
বাকিটুকু শুনার আগেই নওমির পায়ের তলার মাটি সরে গেল। তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। সে কিছু বলার ভাষা পাচ্ছিল না, অবশ্য সামিয়া সুযোগও দিচ্ছিলো না। সে নিজের মতো বলতে শুরু করলো,
– আমি জানি তোমাকে এই ব্যাপারে আহিল বলেনি। পুরুষ মানুষ প্রথম প্রথম নতুন নারীর নেশায় ঘোরে নওমি, আহিলও তাই করেছিল। ও ভেবেছিল আমার প্রতি বিরক্ত এসে গেছে তুমি তো নতুন তাই তোমার প্রতি বিরক্ত আসবে না। ইভেন হয়তো চেষ্টাও করেছিল কিন্তু পারে নি তোমার সাথে মানিয়ে নিতে। এরপরই সে সরে আসে। আমার সাথে আগের মতো সম্পর্ক তৈরি হয়। আমিও কি করি বলো আমি তো ওকে ভালবাসি, ফেরাতে পারিনি।
সামিয়া অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নওমির বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু নওমি অবিশ্বাস করার চেষ্টা করে বললো,
– আপনি এসব কি বলছেন! আমি বিশ্বাস করি না! আহিল এমন ছেলেই নয়!
সামিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
– তাই বুঝি তোমাকে অবহেলা করছে? অবিশ্বাস করছে? ছোট বিষয়ে খুঁত ধরছে?
নওমি থমকে গেল। আহিল যে ওকে অবিশ্বাস করছে এই খবর বাইরে গেল কিভাবে! আহিল আর সে ছাড়া এটা কেউ জানার কথা না কিন্তু সামিয়ার কথায় মনে হচ্ছে সবটা জানে সে। কি করে জানলো তাহলে কি আহিলই…? ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে সামিয়া বলে উঠলো,
– তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো আমি কিভাবে জানলাম! তুমি বিশ্বাস না করলেও এটা তো সত্যি যে আহিলের সাথে আমার এমন একটা সম্পর্ক আছে যাতে সে সব আমায় বলে। নাহয় তুমিই বলো তোমাদের ব্যক্তিগত কথা আমি কিভাবে জানবো?
নওমির এহেন বোবা চাহনী দেখে সামিয়া ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে করতে বললো,
– আচ্ছা তোমায় আরও কিছু দেখায়।
কিছুক্ষণ ফোন ঘেঁটে কিছু বের করে নওমির সাথে ফোন ধরল। নওমি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফোনটা হাতে নিলো। আহিলের সাথে সামিয়ার ছবি।
– স্লাইড করো পাশে আরো আছে।
নওমি চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল। আহিল আর সামিয়া ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলেছে। কখনো হাত জড়িয়ে কখনো সামিয়া আহিলের কাঁধে মাথা রেখে আরো অনেক রকম! আরো অনেক রকম ছবি, যা কোনো সাধারণ কলিগ বা বন্ধুর সম্পর্কের পরিধিতে পড়ে না। নওমি বিশ্বাস করবে কি করবে না সে দ্বন্দে ভুগতেই আরেকটা বো’মা ফা’টালো সামিয়া। নওমির বিশ্বাসের শেষ খড়কুটোতেও আ’গুন লাগিয়ে ফোন কেড়ে ওয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে আহিলের সাথে কয়েকটা কনভারসেশন দেখালো। যেখানে আহিলের নম্বর আর প্রোফাইল পিকচার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সামিয়া চ্যাটের ওপরের দিকের মেসেজগুলো স্ক্রল করে দেখাতে দেখাতে বলল,
– এই দেখো, এগুলো কয়েকদিন আগের মেসেজ।
নওমি পাথরের মতো চোখ রেখে চ্যাটের লেখাগুলো পড়তে লাগল। আহিলের নম্বর থেকে সামিয়াকে উদ্দেশ্য করে পাঠানো হয়েছে অজস্র ভালোবাসার কথা। সময় দেখলো, যেই আহিল ডিউটি টাইমে ফোন ধরার সময় পায় না সে নাকি ডিউটি টাইমে সামিয়ার সাথে আলাপে ব্যস্ত! একটা মেসেজে গিয়ে নওমির চোখ আটকে গেল। মেসেজটা সপ্তাহখানেক আগের।
“সামিয়া, আমি এই জবরদস্তির বিয়ে আর এই মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপ থেকে খুব শীঘ্রই মুক্তি চাই। সহ্য হচ্ছে না আমার! নওমির সাথে আমি কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছি না। ও আমার যোগ্যই না।”
নওমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না! তার বিশ্বাসটা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছিল একেকটা মেসেজ দেখে। আরেকটি মেসেজে লেখা ছিল,
“আজ বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না, সারাক্ষণ ওই মেয়েটার মুখ দেখতে ভালো লাগে না। একেকটা প্রশ্ন করতেই থাকে চুপ থাকাই যায় না! তুমি আজ চেম্বারে আসছ তো?”
মেসেজগুলো পড়া শেষ হতেই সামিয়া নওমির হাত থেকে ফোনটা আলতো করে সরিয়ে নিলো। তারপর নওমির বরফ শীতল হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরে, মুখে এক কৃত্রিম মায়া আর কান্নার ভান ফুটিয়ে বলল,
– প্লিজ নওমি, তুমি আবার আহিলকে এই বিষয়ে কিছু বলতে যেও না। ও আমাকে কঠোরভাবে বারণ করেছে যেন তোমাকে কিছু না জানাই। ও নিজেই সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা কিন্তু কী করব বলো, তোমার এই নিষ্পাপ আর মরা মুখটা দেখে আমার খুব মায়া লাগছিল, একজন মেয়ে হয়ে অন্য মেয়ের এই ঠ’কে যাওয়াটা আমি আর সহ্য করতে পারলাম না, তাই নিজের মুখে সত্যটা জানালাম।
সামিয়া সান্ত্বনা দিয়ে নওমির পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু নওমির কানে তখন আর কোনো কথা পৌঁছাচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল চারপাশের চেনা পৃথিবীটা এক নিমেষে কোনো এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। আহিলের হুটহাট পরিবর্তনের কারণ তবে এটা? কেন ও বিয়ের আগে বললো না সে বিয়ে করতে চাই না। এই কষ্ট তো সৎ মায়ের ব্যবহার থেকে ভালো ছিলো!
নওমির কথা শুনে আযলান হতবাক। হাড়হিম করা সত্যিটা যখন নওমি এক এক করে উগরে দিচ্ছিল, তখন আযলান যেন চমকে চমকে যাচ্ছিল। তার নিজের অজান্তেই রাগে হাত-পা কাঁপতে শুরু করল, চোখ দুটো মস্ত বড় বড় হয়ে গেল। সে কিছু বলতে যাওয়ার আগে নওমি শক্ত কণ্ঠে বললো,
– আপনি আমার ছবি আর আননোন নম্বরে কল দেখে আমায় জেরা করে ফেললেন আর আমি কিভাবে এত কিছু দেখে বিশ্বাস করতাম?
আযলান বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো,
– তুমি আমাকে তখন বলো নি কেন? আমি নাহয় তুমি রিয়েক্ট করবে ভুল বুঝবে ভেবে বলিনি কিন্তু তোমার তো উচিত ছিলো সামিয়ার কথা না শুনে একবার আমাকে জিজ্ঞেস করা দরকার হলে তুমিও জেরা করতে!
নওমি একটা বড় শ্বাস নিয়ে নিজের ভেতরের কষ্ট লুকিয়ে বললো,
– সামিয়া আপু যেতেই আমি রুমে গিয়েছিলাম কিন্তু তখনই আপনি আমাকে আবরার ভাইয়ার সাথে ছবি দেখে জেরা করতে শুরু করলেন আর আমিও নিজেকে সামলাতে না পেরে চেঁচালাম এর থেকেই শুরু হলো ঝগড়া এরপর আর কিছু বলার সুযোগ হয়নি। যদিও আমার রুচি ছিলো না। একদিকে আপনার ওই সন্দেহবাতিক রূপ, আমাকে অবহেলা করা আর অন্যদিকে সামিয়া আপুর দেখানো আপনাদের ওই নিখুঁত মেসেজ আর ছবি! আমি পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম! আমি আর একটা মুহূর্তও এই সম্পর্কটা রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আপনি সামিয়ার কাছে ফেরার জন্যই আমাকে তাড়ানোর এই নোংরা নাটকটা সাজিয়েছেন!
একটু থেমে আবার বলল,
– পরবর্তীতে আদনান আসার খবর জানার পর আমি ভেবেছিলাম আপনাকে বলবো চেষ্টাও করেছিলাম কিন্তু আপনি শুনেন নি। পরবর্তীতে আমি কিভাবে বিশ্বাস করতাম আমার বাচ্চাটা সুস্থ ভাবে দুনিয়াতে আসবে? আপনি যে আমায় নতুন অপবাদ দিবেন না এটার কি গ্যারেন্টি ছিলো? হয়তো বলতেন এই বাচ্চাটাই আপনার না!
নওমির গলা ধরে এলো। এদিকে আযলান স্তব্ধ। নওমির শেষ কথার পিঠে কথা বলার জন্য কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। তার মাথার ভেতরটা তখন পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। তুহি আর আবরারও এক প্রকার থ হয়ে আছে। তীব্র স্তব্ধতায় আযলানের দিকে তাকাল। লেখিকার আসল পেজ লেখিকার নামে। আযলানের অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না আযলান নিজেও কিছু জানে না। সে নিজেও এই জঘন্য চালের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল।
আযলানের নিশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। নিজের অজান্তেই তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। আযলান একটা গভীর, যন্ত্রণাদায়ক শ্বাস নিয়ে নিজের চুলগুলো খামচে ধরল। বিড়বিড় করছে চোখ বন্ধ করে। নওমি বুঝতে পারছে না আযলান ঠিক কোন অবস্থায় আছে। সে ও তার মানে কিছু জানতো না! একটু পরই আযলানের নিচু স্বর শোনা গেল।
– তার মানে সব ঘটনা সামিয়ার বানানো।
তুহি বললো,
– আর কি ঘটনা?
আযলান সময় নিয়ে নওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– একবার মনে আছে তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম কোথায় গিয়েছিলে একা? সেই প্রথমবার তুমি একা বেরিয়েছিলে। সেদিন ডিউটি চলাকালীন আমার কাছে নতুন নম্বর থেকে কল আসে এবং বলা হয় দ্রুত শপিং কমপ্লেক্সের সামনে যেতে। প্রথমে যেতে না চাইলে আমাকে অনেক কিছু বলা হয় যে তোমার ব্যাপারে কথা আছে। আমি সিরিয়াস কিছু ভেবে গিয়েছিলাম কিন্তু গিয়ে দেখলাম শপিং কমপ্লেক্সে তুমি একটা ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছো! আর দুইজন ছেলে আড়ালে দাঁড়িয়ে আমায় বলছিল যাতে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারিনি।
আরেক দফা অবাকের পর্যায়ে পৌঁছে গেল ঘরের বাকি লোকেরা। তুহি আর আবরার তো দফায় দফায় চমকে উঠছে। আযলান আবার বললো,
– বাসায় ফিরে যখন আমি তোমায় জিজ্ঞেস করলাম তখন তুমি আমায় বলেছো স্টেশনারি দোকানে গিয়েছিলে অথচ আশেপাশে কোনো স্টেশনারি শপ ছিলোই না! এতে আমার মনে আরেকটা সন্দেহের বীজ বোনা হয়েছিল।
– আমি সত্যিই স্টেশনারি দোকানেই গিয়েছিলাম যেটা শপিং কমপ্লেক্স থেকে কিছুটা দূরে ছিলো। কিন্তু ওখানে এক লোক এসে আমাকে বলল আব্বু এসেছে একটু দূরেই আছেন আমাকে যেতে বলল। প্রথমে সন্দেহ করলেও পরে বুঝিয়ে আমাকে নিয়ে যায়। এরপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও আব্বুর দেখা পাইনি আমি। ওরা বললো হয়তো চলে গেছে। একটু মন খারাপ নিয়েই বাসায় ফিরলাম। কিন্তু আপনি যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমার তখন একটুও মনে ছিলো না এটা বলার!
এতো ভয়ংকর সত্যি যে থাকতে পারে তুহি বা আবরার কেউই কল্পনা করেনি। ঘরের মধ্যকার থমথমে পরিস্থিতি, আযলানের অবস্থা আর নওমির শূন্য চোখের ভাষা দেখে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে একটু ভেবে অত্যন্ত গম্ভীর এবং বাস্তববাদী গলায় সে বলে উঠল,
– এখানে দোষ আযলান ভাইয়ের একার ছিল না, আর না ছিল নওমির! খেলাটা আসলে প্রথম দিন থেকেই অন্য কেউ খেলছিল। একজন ঠান্ডা মাথার খু’নি যেমন নিখুঁত ছক কষে খুন করে, ঠিক তেমনি ডক্টর সামিয়া নামের ওই মেয়েটা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তোমাদের দুজনের ভালোবাসার সম্পর্কটাকে খু’ন করেছে। এখানে তোমরা দুজনই পরিস্থিতির শিকার, দুজনকেই সমানে ভুল বোঝানো হয়েছে! তবে…
তুহি ভ্রু কুঁচকে বললো,
– আমার মনে হয় সামিয়া মেয়েটা একা নয়। আপন কেউ ওর সাথে যুক্ত ছিলো। এত গুলো কাজ কি একা করতে পারবে? ভেবে দেখো দুইজনকেই দুইদিকে প্যাঁচে ফেলা তারপর বিশ্বাস করানো বিভিন্ন ছবি বানানো আর যা যা একা সম্ভব না।
তুহি এবার সোফার হাতলে হাত রেখে স্তব্ধ গলায় বলল,
– কী ভয়ঙ্কর জঘন্য মানসিকতা! একটা মেয়ে নিজের স্বার্থের জন্য এতটা নিচে নামতে পারে? দুটো মানুষের সাজানো সংসার, একটা অনাগত বাচ্চার ভবিষ্যৎ সব কিছু ও স্রেফ নিজের জে’দ আর হিংসার আ’গুনে পু’ড়িয়ে ছা’রখার করে দিল?
আবরার আযলান আর নওমির দিকে তাকাল। দুজনের চেহারাই এখন বিধ্বস্ত, এতদিনের জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়টা ভে’ঙে পড়ার পর তারা দুজনেই এখন মানসিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে গলা খাকারি দিয়ে উঠে দাঁড়াল তারপর তুহির হাত ধরে আলতো করে টেনে বলল,
– তুহি, চলো আমরা একটু ভেতরে যাই। ওদের নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলা দরকার। এতগুলো বছরের জটলা তো, একটু সময় দেওয়া উচিত।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তুহি আর দ্বিমত করল না। রুমে এখন শুধু আযলান, নওমি আর কোলে বসে থাকা পুচকে আদনান।
আযলান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে একটু সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে মুখটা মুছে সে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো নওমির দিকে। কিন্তু খুব কাছে যাওয়ার সাহস পেল না, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই নওমির সোজাসুজি সোফায় বসলো। দৃষ্টি মেঝেতে রেখে সময় নিয়ে আযলান নিচু স্বরে বললো,
– নওমি… নওমি দেখো, আমাদের দুজনকেই ফাঁ’দে ফেলা হয়েছে। আমি আজ নিজেকে পুরোপুরি দোষী বলতে পারছি না, আর না পারছি তোমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে। এই সকল সত্যের দিকে তাকিয়ে আজ আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজনই আসলে এক নির্মম পরিস্থিতির শিকার! কাউকেই এককভাবে দোষী বলা যায় না।
নওমি আক্ষেপের সঙ্গে বললো,
– সত্যিটা নাহয় আজ সামনে এলো কিন্তু এই যে তিনটে বছর কেটে গেল, এর হিসাব কে দেবে? এতগুলো বছর বছর যে অপবাদ, আর তীব্র কষ্ট যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আমি কাটিয়েছি, তা কি আর কোনোদিন ফিরে আসবে? আমার কষ্ট বাদই দিলাম, আমার ছেলেটা তো নিষ্পাপ তাহলে ও যে বাবার আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হলো সেটা? এই একটা আক্ষেপ তো আমার সারা জীবন থেকে যাবে আহিল!
নূর ই মহব্বত পর্ব ১১
নওমির মুখে এতদিন পর নাম শুনে আহিলের বুকটা হুহু করে উঠলো। তার চোখ গেল আদনানের দিকে যে চোখ বড় বড় করে তাকেই দেখছে এতক্ষণ। বহু কষ্টে এতক্ষণ ওর থেকে চোখ সরিয়ে রেখেছিল। দেখলেই ইচ্ছে হয় কোলে তুলে আদর করতে কিন্তু নওমি কি দিবে? সব চিন্তা একপাশে ফেলে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে খুব আকুল হয়ে বললো,
– এক বারের জন্য কি আমি ছেলেটাকে একটু কোলে নিতে পারি? আমার কলিজাটা যে একটুখানি ওকে আদর করতে ছটফট করছে নওমি! একটা বার শুধু ছুঁয়ে দেখতে দাও? প্লিজ?
