অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৭ (২)
তোনিমা খান
আকাশে মেঘ জমেছে। সূর্যের ময়ূখ দ্যুতি লুকিয়ে পড়েছে মেঘের ঘনঘনটার আড়ালে। মেঘের আড়ালে সূর্য হারিয়েছে তার তেজ, আর স্মৃতির ধূসরতায় রোজ হারিয়েছে তার লাবণ্য। পুরোনো অনুভূতির সেই বিদঘুটে সতেজতা এক নিমেষেই শুষে নিয়েছে একটি প্রাণোচ্ছ্বল ফুলের সমস্ত প্রাণোচ্ছ্বলতা।
স্কুল বারান্দায় আনমনে দাঁড়িয়ে থাকা রোজের চোখের পলক পড়ে বিনা বারিধারায় আঁছড়ে পড়া বাজের বিকট গর্জনে। তবুও দেহটি নিশ্চল! বৃষ্টি আসার পূর্ব প্রস্তুতিতে যখন গগন পুরোদস্তুর প্রস্তুত তখনি নাসারন্ধ্রে ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করে পুরুষালী দেহের তীব্র সুবাস। রোজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে বিতৃষ্ণা ছেয়ে যায় মুখশ্রীতে। সে পুনরায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে রইল।
অকারণে ছোট্ট সেই বিরূপ আচরণে তৃশানের মুখশ্রীতে দাম্ভিকতার ছাপ দৃঢ় হলো। থমথমে মুখে বলল,
–“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
–“কেন কোনো সমস্যা?”, নিশ্চল রোজের পাল্টা প্রশ্নে তৃশান গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“সমস্যা মানে? বৃষ্টি আসবে দেখছো না? এটা খোলা বারান্দা, মাথার উপর ছাদ নেই ভিজে যাবে।”
–“ভিজলে আমি ভিজব, আপনার তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।”
তৃশান বহুক্ষণ ধৈর্য্য ধরে রাখলেও এবার আর পারলো না। সিনিয়র হিসেবে ভদ্রতাটুকু সন্তর্পণে উড়িয়ে দিয়ে খেকিয়ে উঠল,
–“তুমি তো ভারী বেয়াদব আর জেদি। এখানে আমার সমস্যার কথা কেন আসছে? তোমার জ্বর ছিল, এখন যদি আবার বৃষ্টিতে ভেজো তবে অসুস্থ হয়ে পড়বে না?”
রোজ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। আগের থেকেও ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
–“আমার জ্বর আসলে আমি দেখে নেবো। আপনার এত চিন্তা করতে হবে না।”
–“কচু দেখবে তুমি ইঁচড়ে পাকা বেয়াদব মেয়ে! অসুস্থ হয়ে সেই গতকালকের মতো তুমি আমার কাঁধে এসেই ঝামেলা করবে।”
তৃশানের রাগান্বিত স্বরে রোজ চোখে চোখ রেখে বলল,
–“মরে গেলেও আপনার কাঁধে ঝামেলা করব না এতটুকু নিশ্চিত থাকুন। আর গতকাল যদি আপনাকে কোনো বিরক্ত করে থাকি তবে দুঃখিত! সজ্ঞানে আমি কখনো আপনাকে ঝামেলা দেয়ার চিন্তাও করতে পারি না।”
তৃশান ক্রমেই অবাক হয়ে যাচ্ছে রোজের আচরণে। এক বছর আগেও এই রোজ তার সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকত, কলেজে গেলেই ছুটে আসত তার সাথে কথা বলার জন্য। সে হজম না করতে পেরেই প্রশ্ন করেই বসল,
–“তুমি আমার সাথে এমন ব্যবহার করছ কেন?”
–“আমার ব্যবহার এমনি।”
–“লিসেন রোজ, তুমি যদি মনে করে থাকো আমি তোমার এক্সট্রা কেয়ার নিচ্ছি বলে তুমি আমার সাথে এমন আচরণ করছ, তবে ভুল ভাবছো। তপোবন ভাইজান আর পাপা আমার ভরসায় তোমাদের দু’জনকে পাঠিয়েছে। তাই তোমাদের খেয়াল রাখা আমার দায়িত্ব।”
–“আমি বাচ্চা নই যে আপনার খেয়াল রাখতে হবে। আমি নিজের খেয়াল আর তানশানের খেয়াল রাখতে পারি। দায়িত্বের কারণে এত মেকি চিন্তা দেখাতে হবে না।”
রোজের শীতল রুক্ষ কণ্ঠে তৃশান ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে গটগট করে ডান পাশের সরু পথ ধরে চলে গেল। রোজ আঁটকে রাখা উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ফেলল। অনুভূতিদের সে কখনোই পরিস্থিতি ছাপিয়ে দূর্বল হতে দেবে না।
আজ তানশানের প্রথম পরীক্ষা। মোট চারটা ধাপে দশটা স্কুলের মধ্যে তাদের প্রতিযোগিতা হবে। আর যে এই চারটা ধাপে সর্বোচ্চ নাম্বার পাবে সেই বিজয়ী হবে।
রোজ চোখ বন্ধ করে নিলো। অচিরেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির তেরছা ফোঁটা তার মুখশ্রী ভিজিয়ে নিতে লাগলো। দুই মিনিটের মাথাতেই জড়ো হওয়া মেঘেরা মনমালিন্যের পাঠ চুকিয়ে ঝপঝপিয়ে ধরণীর বুকে আঁছড়ে পড়ল। রোজের একটুও ইচ্ছে হলো না সেখান থেকে সরতে। মুহুর্তেই বৃষ্টির পানির শীতল ছোঁয়ায় দেহের সকল অস্থিরতা, ক্লেশ, অসুস্থতা মিলিয়ে গিয়ে সজীবতায় ছেয়ে যায় দেহ মন। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে গেল ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর বৃষ্টির শীতল স্নিগ্ধতায়।
ডান পাশের গলির ঠিক মোড়ে দাঁড়িয়ে এক জেদি নারীর জেদ দেখতে নিমগ্ন পুরুষটির দৃষ্টি থমকে যায়। ফুঁকতে থাকা সিগারেটটা ভীষণ অবহেলায় সরে যায় মুখ থেকে। ফর্সা মেদহীন মুখশ্রীতে চুইয়ে চুইয়ে একাধারে সিক্ত হয়ে ওঠা বদনে পড়নের পোশাক আঁটসাঁট হয়ে লেগে গেল। তৃশান দৃষ্টি সরাতে গিয়েও সরাতে পারল না। অন্তঃস্থল হড়বড়িয়ে বলে উঠল, এত স্নিগ্ধ দৃশ্য না দেখার অপরাধে সারাজীবন আফসোস করতে হবে।
কিন্তু মুহুর্তের মাঝে সত্যিই আফসোস ছুঁয়ে গেল দৃষ্টির মুগ্ধতায় মুখ হা হয়ে তাকিয়ে থাকা পুরুষটির চোখেমুখে। সুতির ওড়নাটা পুরো গায়ে জড়িয়ে নিয়ে রোজ ত্রস্ত পায়ে ছাউনির নিচে ঢুকতেই তৃশান বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেলে আওড়ালো,
–“সব জায়গায় জেদ! অথচ এখন জেদ দেখিয়ে আরেকটু থাকতে পারল না বেয়াদব মেয়ে!”
নিজের কর্মে নিজেই ভড়কালো তৃশান। সিগারেটের ফিল্টার ততক্ষণে আঙুলের নরম চামড়া ছুঁয়ে গেল।
আকস্মিক জ্বলনে মৃদু আর্তনাদ করে উঠে হাত ঝাড়তে লাগল তৃশান। রাগে গজগজ করতে করতে আওড়ালো,
–“নে নে সবাই জ্বালিয়ে মেরে ফেল আমায়, অসহ্য! সব খারাপ। রোজ, বৃষ্টি, সিগারেট, আমি, আমার মন, আমার চোখ সব খারাপ!”
বোকার মতো ক্ষেপতে ক্ষেপতে চলে গেল তৃশান।
যেই সুনেহরা ম্যাথ পরীক্ষা কেঁদে কেঁদে দিত সেই সুনেহরা আজ প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে ম্যাথ পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছে। তানশানের চোখেমুখে মোটেও হেরে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নেই বরং চোখমুখ উপচেপড়া উল্লাস! প্রিয়জনকে জিততে দেখার উল্লাস!
পরীক্ষা দিয়ে বের হতেই কড়িডরে ফুপিকে ভেজা বেড়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তানশান অবাক হয়ে বলল,
–“এ কী অবস্থা করেছ নিজের?”
রোজ কাঁচুমাচু করছে। মূলত অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃশানের শানিত দৃষ্টির কারণে সে হাঁচি চেপে রাখছে। কিন্তু পারল কই। লাগাতার পাঁচটা হাঁচি দিয়ে চোখে পানি এসে গেল রোজের। আর তৃশানের মুখে ফুটে উঠল বিশ্বজয়ের হাসি। সে এগিয়ে এসে বিদ্রূপ করে বলল,
–“হয়েছে কী তানশান বুঝলে, তোমার ফুপি নিজের আর তোমার খুব খেয়াল রাখতে পারে তাই তো বৃষ্টিতে ভিজে এখন হাঁচি দিচ্ছে। ফুপির খেয়াল রেখো। কারণ আমাদের কাছে আর মেডিক্যাল সার্ভিস দেয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হবে।”
রোজ চোয়াল শক্ত করে ভাতিজাকে বলল,
–“তোমার শেষ না? তবে হোটেলে চলো।”
তানশান কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। তৃশানের উপস্থিতি বিরক্ত রাগ জাগালেও তা দমন করেই বলল,
–“চাচু, ফুপি যদি আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে চিকিৎসা করাতে পারব না?”
তৃশান রোজের দিকে বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“আমি তো করাতেই পারব তানশান। কিন্তু তোমার ফুপি বোধহয় আমাদের চিকিৎসা নেবে না।”
–“হ্যাঁ নেবো না। আমার কাছে টাকা আছে, দু’টো পা’ও আছে। আমি নিজেই ডাক্তার দেখাতে পারব।”, রোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
–“হুম, সাথে জেদ কমানোর জন্য ও ডাক্তার ও দেখাবে। এই জেদ নিয়ে জীবনে সংসার তো দূরের কথা, চলতেই পারবে না।”
–“আমার সংসার নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। সারাজীবন এই জেদ নিয়েই চলে আসছি। আগামীতেও চলতে পারব, আর সংসার ও করব। আপনি দেখে নিয়েন।”
–“আমার অত অযথা সময় নেই।”, বলেই তৃশান গটগট করে চলে গেল।
তানশান বিরক্ত হয়ে বলল,
–“তুমি তো ভারী ঝগড়ুটে হয়ে যাচ্ছো। যেখানে সেখানে যার তার সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দাও। আমার সাথে করো সেটা মানা যায়, কিন্তু তৃশান চাচু?”
–“ওনাকে চাচু ডাকবে না। ভুলে গিয়েছ সে তোমার মায়ের সাথে কী করেছে?”
তানশান গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“না ভুলিনি। কিন্তু এটা দেখার জন্য পাপা আছে। আমি কেন কারোর সাথে খারাপ ব্যবহার করব? আমার যতটুকু করার প্রয়োজন ছিল তা আমি ভরা কলেজের সামনেই করেছি। অযথা রাগারাগী করা তোমার বাজে স্বভাব, আমার নয়।”
–“আবার আমায় জ্ঞান দিচ্ছো, রোবোটের বাচ্চা?”
–“ডোন্ট বি সিলি, ফুপি!”, তানশান ক্লান্ত গলায় বলেই হাঁটা দিলো।
–“এই ছেলে দাঁড়াও। আমায় এটিটিউড দেখাবে না। তোমার পরীক্ষা কেমন হলো? যদি জিততে না পেরেছো তবে তোমার খবর আছে! আমার জীবন ঝাঁঝড়া করে দিয়েছো তুমি।”, রোজ চেঁচাতে চেঁচাতে তানশানের পিছু ছুটলো।
মধ্যাহ্নের নীরব উষ্ণ এক পরিবেশ মর্তধ্যামে। পাহাড়ি জনবসতির সকলে অর্ধ প্রহর খাটুনি শেষে শ্রান্ত গতরে অলসতা ভর করেছে।
কিন্তু সেই নিস্তব্ধ উষ্ণ খরখরে রজনীতে আচমকাই মেঘের আনাগোনা বাড়লো। বসন্তের প্রারাম্ভ! অথচ হুটহাট ধরণী অন্ধকার করে ঝুপঝপিয়ে বারিধারা নামছে। পাহাড়ি পথঘাটে বৃষ্টি যেন এক অশনী সংকেত! দিনমজুর সহ কত কত মানুষ স্যাঁতস্যাঁতে এই পিচ্ছিল পথঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্বীকার হয়!
আকাশের বিরূপ অবস্থা দেখে স্কুটির গতি খানিক বাড়লো। কাঁধে চেপে রাখা ফোনটি থেকে ভেসে আসছে ছেলের প্রশান্তিদ্বায়ক কণ্ঠ।
স্কুটি চালাতে চালাতেই তপোবন ডেকে ওঠে ছেলেকে,
–“আব্বু, এক্সাম ভালো করে দিয়েছ?”
–“একদম সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়েছি পাপা। বাসায় এসে উত্তর মিলিয়েছি।”
–“আগামী পরীক্ষাগুলো কিন্তু আরেকটু টাফ হবে। সেভাবে প্রস্তুতি নেবে। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, জিততে পারা না পারা কোনো বিষয় না, ওকে?”
–“ওকে পাপা। কিন্তু আমি জিতেই আসব।”
–“তোমায় জিততে দেখা পাপার জন্য সবচেয়ে গর্বের দৃশ্য হবে আব্বু। পাপা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব সেই দৃশ্যের জন্য।”
–“আমি জিতবোই। কিন্তু তুমি এই দৃশ্য দেখতে পারবে না।”
তপোবন স্মিত হাসল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আমার তানশানকে জিততে দেখার সৌভাগ্য আমি কখনোই হাতছাড়া করব না।”
–“কী বলছ?”
–“কিছু না। খেয়েছ? ফুপি কেমন আছে?”
–“খেয়েছি পাপা। কিন্তু ফুপি যেখানে সেখানে ঝগড়া করে পাপা। সে বিগড়ে গিয়েছে তাকে বিয়ে দিয়ে দাও।”
–“এই রোবোটের বাচ্চা, মুখ সামলে কথা বলো।”
সহসা শুয়ে শুয়ে ফোন দেখতে থাকা রোজ চেঁচিয়ে উঠল।
–“দেখলে দেখলে পাপা?”, তানশান হতবাক হয়ে বলল। তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“থাক, তুমি ফুপির সাথে তর্ক করো না। ফুপি অসুস্থ তো তাই তার মেজাজ চিরচিরে হয়ে আছে।”
–“মিমি কী করছে পাপা?”
–“তোমার মিমি ঝিমাচ্ছে। পাপা এখন রুইলুই পাড়ায় যাচ্ছি। ওখানেই দুপুরের খাবার খাবো। স্কুটিতে আছি।”
–“ওয়াও পাপা! মিমির খুব ভালো লাগবে সেখানে। মিমিকে ভানু আন্টিদের মতো ড্রেস পড়িও কিন্তু! আর ব্যাম্বু চিকেন ও খাওয়াবে, তার খুব ভালো লাগবে ওই চিকেনটা।”
–“আচ্ছা।”, তপোবন মৃদু হেসে সায় জানালো। ছেলেকে জানিয়েছে। এবং রূপকথা যতটা না আনন্দিত তার চেয়েও সে বেশি আনন্দিত। তার মিমিকে তার পছন্দের জায়গাগুলো দেখাবে বলে।
–“এখন ফোনটা ফুপিকে দাও তো।”
রোজ ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে কানে ধরলো। তপোবন আদুরে গলায় ডেকে উঠল বোনকে,
–“রোজ!”
রোজ কপাল কুঁচকে হড়বড়িয়ে বলল,
–“ভাইজান আমার কোনো দোষ নেই। সামনের মানুষগুলোই বিরক্তিকর।”
তপোবন হালকা হেসে বলল,
–“আমি জানি তো আমার রোজ কখনো শুধু শুধু এমন করে না। কিন্তু এখন তো বাইরে আছো, তোমার সাথে আমার পরিবারের সম্মান জুড়ে আছে। কারোর সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না।”
–“আমি সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করি না তো,ভাইজান।”
–“আমি বুঝেছি তো। কিন্তু তবুও একটু সামলে চলবে।”
–“ওকে।”, রোজ মুখ ফুলিয়ে বলল।
তপোবন ফোন রাখল। পুনশ্চ স্কুটি চালাতে মগ্ন হলে
অনুভব করল কারোর মৌনতা। সে ঘাড় কাত করে তাকায়। পিঠে আঁছড়ে পড়ছে উষ্ণ নিঃশ্বাস। সে ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠে বলল,
–“মুরুব্বি, ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
হাতের শক্ত মুঠো থেকে ঢিলে হয়ে যাওয়া টিশার্টের অংশটুকু আবার শক্ত মুঠোবন্দী হলো। মৃদু তন্দ্রাচ্ছন্ন রূপকথা পৃষ্ঠদেশে মুখ ঘঁষে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
–“উঁহু।”
–“হোটেলে ফিরে যাবে?”
–“নাআআ!”, রূপকথা মাথা তুলে সরব চেঁচিয়ে উঠল। ঘুমে পড়ে যাচ্ছে তবুও মনে হলো এই মুহুর্তগুলো হারানো যাবে না। দায়িত্ব আর সংসার ছাপিয়ে এই যে একান্তই রূপকথার মানুষটাকে খুব সহজে আর এভাবে পাবে ন।
নারীটির মন বুঝতে পারা তপোবন অনায়াসে বুঝেগেল মনে জেঁকে বসা শঙ্কাটুকু। সে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বলল,
–“মিড টার্ম এক্সাম শেষে আবার আসব তখন আরেকটু সময় নিয়ে আসব।”
রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“তানশানকেও নিয়ে আসব। আমরা একসাথে তো কখনো কোথাও যাইনি।”
–“আচ্ছা।”
কিছুক্ষণের মাঝেই তপোবন নিজ গন্তব্যে পৌঁছে গেল। ততক্ষণে কালচে গগনের বুক চিঁড়ে বারিধারা ঝপঝপিয়ে ধরণী ভিজিয়ে তুললো।
তপোবন মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে রূপকথার হাত ধরে একটা উঁচু বাঁশের মাচাং ঘরে উঠল। উঁচু উঁচু বাঁশের তৈরি শৈল্পিক ঘরগুলো অবাকচোখে দেখতে দেখতেই রূপকথা মোহগ্রস্ত হলো! তপোবন দরজা চাপড়ে কাউকে ডাকলো।
–“ভানু? ভানু আছো?”
–“আপনি কী এখানে আগেও অনেকবার এসেছেন?”
রূপকথার প্রশ্নে তপোবন উৎসুক দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“ছয় বার এসেছি।”
–“ছয় বার? কাকে নিয়ে এসেছেন?”
তপোবন ভীষণ সাগ্রহে বলতে শুরু করল,
–“একবার ভার্সিটির চতুর্থ বর্ষে থাকাকালীন আব্বুকে না জানিয়ে বন্ধুদের সাথে বাইকে করে এসেছিলাম। এরপর…
বলতে গিয়েও থামলো তপোবন। বিরতি নিতে হলো। চোখের সামনে ভেসে উঠল চিরচেনা এক নারীর মরা কান্না আর মাঠের ভেতরে বসে আহাজারি করা। তাকে না নিয়ে সাজেক যাওয়ার অপরাধে সে কী কান্না! এরপর দুই সপ্তাহের দূরত্ব, অভিমান আর মেয়েটির হাড় কাঁপানো জ্বরে তার ঘোরতর শিক্ষা হলো। এতই জ্বর উঠেছিল যে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। সেই শিক্ষা তাকে পুরোটা বদলে দিল। পূর্বাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনার আগে তপোবন দুঃসাহসী এক কাজ করে বসল। দুই সপ্তাহের মাথাতে বাবাকে এক প্রকার জোর করে সম্বন্ধ পাঠালো এবং এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে করল। পারিবারিক নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে মেয়েটিকে নিয়ে বিয়ের তৃতীয়দিনে সাজেক নিয়ে যায়। তা নিয়ে পরিবার আত্মীয় স্বজনের কত কানাঘুষা! বিয়ে করার আগেই ছেলে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে।
তবে এইসব উপেক্ষা করে সে মেয়েটির মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। সম্পর্কের শুরুতে যে কথা দিয়েছিল, মেয়েটিকে কখনো কষ্ট দেবে না। কথার খেলাপ যে তার দ্বারা হবে না।
তপোবন ম্লান হেসে রূপকথার উৎসুক মুখপানে তাকালো। মিহি স্বরে বলল,
–“এরপর তানশান আর পরিবারের সবাইকে নিয়েই প্রতিবার এসেছিলাম।”
–“ওহ্! তাই আপনি এখানকার সব চেনেন তাই না?”
–“হুম। এখানে ভানু থাকে। ও লুসাই সম্প্রদায়ের। তানশানকে খুব ভালোবাসে।”
কথার মাঝেই একটা তেত্রিশ চৌত্রিশ বছর বয়সী নারী দরজা খুলে দিল। তপোবন চমৎকার হাসল ভানুর অবাক দৃষ্টি দেখে। ভানু তাদের নিজস্ব ভাষা মিজো ভাষায় বলল,
–“তপু ভাই, কেমন আছো?” (তপু-পা ই দাম এম?)
তপোবন বোঝে মিজো ভাষা আর বলতেও পারে। সে ভানুর মাথায় হাত রেখে বলল,
–“ভালো আছি, ভানু। তুমি কেমন আছো?( কা দাম ই, ভানু। নাং ই দাম এম?”)
ভানু ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“ভালো আছি , ভালো আছি। ছেলে কোথায়?”
( কা দাম ই, কা দাম ই, তপু-পা। মিপা নউপাং খা খউয়িয়াং ঙে?”)
–“ছেলে সাথে আসেনি।” (মিপা নউপাং চু আ লো কাল ভে লো।)
তপোবনের কথায় ভানু উঁকি দিয়ে চাইলো প্রশস্ত দেহের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটা মেয়ের অবয়বের দিকে। যে কি-না তপোবনের পিঠ ছাপিয়ে শুধু দুই চোখ বের করে তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। মূলত সে ভানুর অদ্ভুত পোশাক দেখছে।
ভানু হেসে বলল,
–“এই সুন্দর পিচ্চি মেয়েটা কে?”
(হে মেইছে নউপাং মেলথা দেউ হি তু ঙে নি?)
তপোবন মৃদু হেসে রূপকথাকে টেনে নিজের পাশে এনে দাঁড় করালো। হাসিমুখে বলল,
–“স্ত্রী! ওকে দেখাতেই আসলাম। ওকে একটু ছোট্ট ভানু সাজিয়ে দাও তো!”
(কা নুপুই আ নি হি। কান রউন ত্ল থ চে উ আ নি হি। ভানু নউপাং আং দেউ হিয়ান চেই ভে তেহ।)
ভানু প্রগাঢ় হাসল তার কথায়। বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“আআআ… এ দেখি একটা ছোট্ট চাঁদ!”
(এ খাই… ত্লাপুই তে রেউতে আ নি হি।)
তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় স্ত্রীর পানে। আলতো হাতে নিজের সাথে আগলে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“হুম, আমার চাঁদ!”(অ, কা ত্লাপুই আ নি হি)
ভানু মুগ্ধ হয় তার কথা শুনে। সে জানে মানুষটার জীবনের গল্প! সে বিমুগ্ধ চিত্তে বলো,
–“খুশি হয়েছি খুব। ভালো থাকো, ভালো থাকো। এসো ঘরে এসো।”
(কা লুয়াম হ্লে মাই। দাম তাকিন অ, দাম তাকিন। লো লুত রহ, ইন ছুঙাহ লো লুত রহ।)
তপোবন রূপকথা ভানুর পিছু পিছু ঢুকলো। বেশ বড় ঘর। চারিদিকে শুধু শৈল্পিক ছোঁয়া আর অভিজাত্য।
ভানু কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করে এসে হড়বড়িয়ে বলল,
–“খাবার দেই?”(চউ কা লো ছপ দন চে এম?)
তপোবন মাথা নেড়ে বলল,
–“তোমার হাতের খাবার খাবো বলেই তো ছুটে আসলাম।”
(ই কুৎছুয়াক এই চাক ভাং আলওম কা লো তলান ভাং ভাং নি।)
বলতেই ভানু গাল ভরে হেসে ছুটল। তার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবারের হোটেল রয়েছে কিছুটা দূরেই। তার স্বামী চালায় আর সে রান্না করে। তার দু’টো সন্তান। দুটোই ছেলে।
দশ মিনিটের মাঝে ভানু মজাদার মজাদার পাহাড়ি গরম গরম খাবার সাজিয়ে দিলো মেঝেতে। নিজ ভাষায় বলল,
–“আগে খাও, তারপর পোশাক পড়বে।”
রূপকথা ভীষণ সাগ্রহে জুম চালের ভাত আর ব্যাম্বু চিকেন মুখে তুললো। অনুভব করল এক ভিন্ন জাতির অতুলনীয় স্বাদের খাবার। তপোবন তাকে তৃপ্তি সহকারে খেতে দেখে বলল,
–“ভালো লেগেছে?”
–“খুব খুব।”
–“ভানুর রান্না খুব ভালো। আমরা ওর খোঁজ পেয়েছিলাম ওদের হোটেল থেকে। এত মজা পেয়েছিলাম যে ওর বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছিলাম। ও খুব আপন করে নেয় আমাদের।”
রূপকথা খেতে খেতে শুনলো আরো গল্প। খাওয়া শেষে ভানু তাকে লুসাইদের মতো পোশাক পড়িয়ে সাজিয়ে দিল। তপোবন অন্য ঘরে অপেক্ষা করছিল, তন্মধ্যেই দরজা খুলে কেউ ঢুকলে সে পিছু ফিরে তাকায়। ফিরতেই চোখমুখ উপচে চমৎকার হাসি ফুটে উঠল ছোট্ট চিকন চাকন শুভ্র হাসিমাখা মুখটি দেখে।
পড়নে তার কোমরতাঁতে বোনা লাল, সাদা ও কালো রঙের নকশা করা ‘পুয়ানফেল’ (থামি বা স্কার্ট) এবং ‘করচুং’ (ব্লাউজ)। যার সাথে ভারী ধাতব গয়না ও পুঁতির মালা ব্যবহার করা হয়েছে।
রূপকথা নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলল,
–“এগুলো কী সুন্দর দেখুন! আমায় সুন্দর লাগছে না?”
তপোবন ঘুরন্ত মেয়েটির কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে বলল,
–“তোমায় সবকিছুতে সুন্দর লাগে। কিন্তু এটাতে একটু বেশিই আদুরে লাগছে।”
ভানু এসে তপোবনকেও পুরুষদের পোশাক পড়তে বলল। কিন্তু তপোবন নাকচ করল। সে কখনো পাঞ্জাবী আর টিশার্ট ব্যতীত তেমন কোনো পোশাক পরে না। রূপকথা অনুনয় করে বলল,
–“একটু পরুন না। দু’জন একসাথে ছবি করে টানিয়ে রাখব দেয়ালে।”
মেয়েটির আবদার ফেলার উপায় আর ইচ্ছে না থাকায় অগত্যা তপোবন ও লুসাই পুরুষদের পোশাক
পুয়ানবি (লুঙ্গি) আর করচুর (শার্ট) পরিধান করে। তপোবন কাঁচুমাচু করে বের হতেই রূপকথা কোমরে হাত দিয়ে আপাদমস্তক অবলোকন করল। সহসা মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
তপোবন অসন্তোষের সাথে বলল,
–“হাসবে না মেয়ে! তুমিই আমায় জোর করেছো এগুলো পরতে। আমি তো জানি এগুলো পরলে আমায় জোকারের মতো লাগবে।”
রূপকথা হাসতে হাসতে নাকচ করে বলল,
–“উঁহু, আপনাকে এখন একদম রূপকথার বরের মতো লাগছে।”
তপোবন কাঁচুমাচু ভুলে আড়চোখে তাকালো মেয়েটির পানে। চুলে হাত গলাতে গলাতে এগিয়ে আসে। চাপা স্বরে বলল,
–“আগে কেমন লাগত? আগে কী রূপকথার বর বর লাগতো না?”
–“উঁহু, আগে তানশানের পাপার মতো লাগতো।”
তপোবন স্মিত হাসল তার জবাবে। এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির পাশে মেয়েটির কোমর আঁকড়ে দাঁড়ালো। ভানুকে মিজো ভাষায় বলল,
–“ভানু, রূপকথা আর তার বরের একটা ছবি তুলে দাও তো।”
ভানু হেসে উঠল। দু’জনকে ছবি তুলে দিল। বেশ খানিকক্ষণ বাদ তারা বিদায় নিলো। বিদায় কালে তপোবন ভানুর হাতে পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিলো। ভানু রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালে তপোবন তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“ভাই দিয়েছি রাখো। ছেলেদের কিছু কিনে দিও। আর আমাদের জন্য দোয়া করো।”
ভানু আবার আসতে বলল। তপোবন নামতে নামতে বলল,
–“আমি না আসতে চাইলেও মা ছেলে আমায় অবশ্যই আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, ভানু। তারা ফ্যান হয়ে গিয়েছে এখানকার।”
হোটেলের ফেরার পথে তপোবন আর স্কুটিতে আসল না। ওটা চালকের হাতে সপে দিয়ে স্থানীয় চাঁদের গাড়িতে করে ফিরল। আগামীকাল ভোরবেলায় তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবে। ভাবতেই রূপকথার মন খারাপ হয়ে গেল।
দীর্ঘ এক সপ্তাহ পর যখন নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর সৌভাগ্য হলো, ঠিক তখনই টের পেল বিগত দেড় মাসে মেয়ের গড়ে ওঠা এক আশ্চর্য অভ্যাসের উপস্থিতি। রাত তখন তিনটা; বাইরে হাড়কাঁপানো শীতের দাপট থাকলেও ঘরের ভেতরটা তখন কৃত্রিম উষ্ণতায় ভরপুর।
বুকের মাঝে জড়িয়ে রাখা দেহটি নড়েচড়ে উঠতেই সদ্য তন্দ্রাগ্রস্থ মৌনতা তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকালো। নায়েল বদ্ধ নেত্রে কেঁদে উঠতেই মৌনতা তার চোখেমুখে হাত ছুঁয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধাল,
–“কী হয়েছে মা? ঘুম ভেঙে গিয়েছে? মাম্মা ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি তোমায়।”
অলস হাতে মায়ের ফ্রকের কলার আঁকড়ে ধরল নায়েল। ড্রিম লাইটের আলোয় পিটপিট করে চোখ মেলে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“পাপা?”
মৌনতার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে গেল ঘুমের ঘোরেও বাবার জপ করা মেয়েটির অসহায় মুখশ্রী দেখে। বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ তো কম বোঝায়নি, তার বাবা আর নেই। তবুও মেয়েটি মানতে নারাজ। সে শুকনো ঢোক গিলে বলল,
–“পাপা নেই, মা। পাপা আর কখনো আসবে না তোমার কাছে।”
সহসা নায়েল বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে কেঁদে উঠল। জেদি কণ্ঠে বলল,
–“পাপা আছে।”
বলেই সে মায়ের বুক থেকে সরে যায়। বিছানা থেকে নামতে নামতে জড়ানো কণ্ঠে ‘পাপা’ ‘পাপা’ বলে ডাকতে লাগল। মৌনতা তার পিছু পিছু যেতে যেতে বলল,
–“পাপা এখানে নেই, মা।”
নায়েল শোনে না। নব খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় পাপা বলে ডাকতে ডাকতে। সে সোজা গিয়ে থামলো এরোজের ঘরের সামনে। চোখের পানি মুছতে মুছতে জোরে জোরে দরজা চাপড়ে ডাকল,
–“পাপা? পাপা ওপেন দ্যা ডোল। ঘুমি পেয়েছে। পাপাআআ?”
দরজাটি কেউ খুলল না বরং একা একাই খুলে গেল। দরজা চাপিয়ে রাখা ছিল। পেছন পেছন আসা মৌনতা অবাক হয়ে গেল নায়েলকে এরোজের ঘরে যেতে দেখে। পা বাড়াতে গিয়েও দ্বিধাবোধ হলো। নায়েলের চাচু সকলকে সাফ না করে দিয়েছে ষ, তার ঘরে যেন কেউ না ঢোকে কখনো। তবুও সে সাহস করে পা বাড়ায়। দরজার সম্মুখে যেতেই দেহ সর্বশান্ত হয়ে গেল অপ্রত্যাশিত বিব্রতকর দৃশ্যে। তবে সেই দৃশ্যে স্নিগ্ধ এক চিত্র ও রয়েছে। যদিও সেই সৌন্দর্য মৌনতার দৃষ্টিতে বিধল না। তার চোখে শুধু বিধল, মোনাজাতরত এরোজের বুকের সাথে লেপ্টে যাওয়া মেয়ে।
পুরুষালী গলদেশ আঁকড়ে ধরে নায়েল বুকে সেটে বসল যতক্ষণ না এরোজের নামাজ শেষ হয়। আর অলস কণ্ঠে ডাকতে লাগল,
–“পাপা, আল্লাহ দেয়া হয়েচে? আমাল ঘুমি ঘুমি পেয়েচে। ঘুম পালিয়ে দেবে? স্টোলি বলবে?”
দরজার কপাট আঁকড়ে মৌনতা অস্বস্তিতে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নায়েল কেন এরোজকে পাপা ডাকছে? মৌনতা তখনো জানে না, খুব ঘুমের ঘোরেই নায়েলের বাবা হয়ে ওঠে এরোজ। এরোজের নামাজ শেষ হতেই এরোজ দু’হাতে বুকে জড়িয়ে নিলো নায়েলকে। আদুরে কণ্ঠে বলল,
–“কী হলো পাপা? তুমি এখানে কেন?”
নায়েল তার বাহুডোরে ভর ছেড়ে দিয়ে বলল,
–“ঘুমি ঘুমি কলবে?”
–“করব তো, মা। কিন্তু তুমি না ঘুমিয়ে পড়েছিলে? মাম্মার কাছে ঘুমাওনি?”
নায়েল না বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
–“তোমাল কাছে ঘুমি ঘুমি কলব।”
–“আচ্ছা তুমি পাপার কাছে ঘুমাবে।”, এরোজ নায়েলকে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই মৌনতা ঝট করে সরে গেল দরজার সামনে থেকে। অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করতে করতে দ্রুত কদমে এগিয়ে যায় পোর্চের দিকে। চোখের সামনে তখনো ভাসছে এরোজ আর নায়েলের ঘনিষ্ঠতা আর কানে বাজছে আদুরে কথোপকথন। রাতের আঁধারে যেন দু’জন বাবা মেয়ের নিখুঁত অভিনয়ে মত্ত। কিন্তু এই ছল কেন নায়েলের অভ্যাস হয়ে উঠল? কেন এরোজ প্রস্রয় দিচ্ছে?
এরোজ ভ্রু কুঁচকে তাকায় আলতো খোলা দরজার দিকে। ওখানে কেউ ছিল! সে এগিয়ে গিয়ে দরজার বাইরে উঁকি দিল। কেউ নেই। দরজা লাগিয়ে দিয়ে সে নায়েলকে ঘুম পাড়াতে লাগল।
শরীরের অসহ্য যন্ত্রণায় এমনিতেও রাতে ঘুমাতে পারে না মৌনতা। আজকেও পারল না। তবে শারীরিক অসুস্থতা নয় বরং মানসিক অস্থিরতায়।
আনমনা দৃষ্টিতে গ্লাস ভেদ করে এক দৃষ্টিতে ল্যাভেন্ডার ফুলের গার্ডেনে এঁটে ছিল। তন্মধ্যেই নিঃশব্দে কেউ পাশে দাঁড়ালো। মৌনতা চাপা নিঃশ্বাস ফেলে ঘাড় কাত করে তাকায়। প্রশস্ত বক্ষে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে নায়েল।
ধূসর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখার সাহস হলো না ক্ষণকাল পূর্বের অস্বস্তি মনে করে।
মৌনতার দৃষ্টি চুরি দেখে এরোজ স্মিত হাসল। পুরো পৃথিবী তার সাথে লুকোচুরি খেলতে পারবে কিন্তু এই ল্যাভেন্ডার এর সুবাস কখনোই তার থেকে লুকিয়ে থাকতে পারবে না।
মৌনতা থমথমে মুখে বলল,
–“নায়েল আপনাকে অনেক বিরক্ত করে তাই না?”
–“আপনি কী সবসময়ই না জেনেবুঝে কথা বলেন?”
পাল্টা প্রশ্নে মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকালো।
–“মানে?”
এরোজ দৃষ্টি নামিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
–“আপনাকে কে বলল নায়েল আমায় বিরক্ত করে?”
–“করে না?”
–“নাহ। বরং আপনার এই ধরণের কথাগুলো বিরক্ত করে। এগুলো আর বলবেন না আমার সামনে।”
–“আপনি আগে আপনার রুমের চারিধারেও মানুষ সহ্য করতে পারতেন না।”
–“আগে আমার কাছে আমার দুনিয়া ছিল ঘুম আর নেশা। তার জন্য বদ্ধ নিরিবিলি রূম খুব প্রয়োজনীয় ছিল। এখন দুনিয়া বদলেছে।”
–“কীভাবে?”, মৌনতার উৎসুক কণ্ঠে এরোজ শীতল কণ্ঠে বলল,
–“আগে দেশে ছিলাম এখন বিদেশে আছি।”
অসন্তোষজনক জবাবে মৌনতা বিরক্তি নিয়ে বলল,
–“বলতে না চাইলে বলবেন না। কিন্তু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলবেন না।”
–“আমি সহজ কথাই বলি কিন্তু আপনি বোঝেন না আর না কখনো বুঝতে চান। কখনো বোঝার চেষ্টা করতেই পারেন।”, এরোজের কণ্ঠ বিমর্ষ শোনালো।
মৌনতা ঠোঁট উল্টে বলল,
–“আমি কী বোঝার চেষ্টা করব?”
এরোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“কিছু না। ঘুমাচ্ছেন না কেন?”
–“ঘুমাতে পারছি না।”
–“পায়ে ব্যথা করছে?”
–“উহু, ঘুমালেই বমি পাচ্ছে। ভেতর থেকে মনে হচ্ছে সব বেরিয়ে আসছে।”
কেমোর প্রতিক্রিয়া তখনো একটু আধটু রয়ে গিয়েছে। এরোজ অস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। মৌনতার ক্যান্সার কোষ পাঁচ পার্সেন্টের নিচে নামলেও শরীরের অন্যসব কার্যক্রম বড্ড ধীরগতিসম্পন্ন। আঠাশ দিনের মাথায় রক্তে শ্বেতকণিকা লোহিত কণিকা এবং প্লাটিলেটের মাত্রা পুনরায় বাড়তে শুরু করে। তবে এই ‘কাউন্ট রিকভারি’ মৌনতার ক্ষেত্রে বড্ড ধীরগতি সম্পন্ন। শরীর ও অস্বাভাবিক দূর্বল, খেতেও পারে না তেমন কিছু।
সে দুশ্চিন্তা লুকিয়ে নিলো। তন্মধ্যেই কানে এলো অ্যালেক্সার যান্ত্রিক কণ্ঠ।
–“A light snowfall is expected in Toronto at 3:40 AM. Please stay home and be safe.”
এরোজ ফিরে তাকায় দেয়াল ঘড়ির পানে। তিনটা ত্রিশ বাজে। মৌনতার মুখশ্রী চকচক করে উঠল। এসেছে পর থেকে একবার ও স্নোফল দেখার সৌভাগ্য হয়নি। নার্সরা বলেছে আর সে শুধু শুনেছে।
সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“তিনটা চল্লিশে সত্যি স্নোফল হবে?”
এরোজ তাকায় উজ্জ্বল মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“হু, বাইরে যাবেন?”
–“এখন?”
–“হু।”
–“আচ্ছা।”, মৌনতা উত্তেজিত হয়ে জবাব দিল। পরপরই বলল,
–“স্নো পড়ে কী করে? শুরুটা হয় কী করে? বাহির তো এখন একদম শান্ত।”
–“একটু পরেই দেখতে পারবেন। পোশাক বদলে নিট যে ক্রপ টপ গুলো আছে সেগুলো আর জিন্স পড়ে নিন। জিন্সের নিচে ল্যাগিন্স পরবেন। মাফলার, টুপি, হ্যান্ড গ্লাভস আর ওভার কোর্ট পরে আসুন আমি পোশাক পরে আসছি।”
আদেশের সুরে বলেই এরোজ পা বাড়াতে নিলে মৌনতা অবাক হয়ে বলল,
–“জিন্স আর ক্রপ টপ? এসব আমি পরি না।”
এরোজ ফিরে তাকায় নারীটির মুখপানে। কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি ছাড়া থমথমে মুখে বলল,
–“আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যতটুকু পরামর্শ দেয়ার আমি দিয়েছি। মানবেন কি-না সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। পরে পস্তালে আমি কিছু করতে পারব না। অলরেডি তিনটা পঁয়ত্রিশ বাজে।”
বলেই এরোজ নায়েলকে নিয়ে ঘরে চলে গেল। দু’জন একদম শীতের পোশাক পড়ে তৈরি হয়ে বের হতেই দেখল মৌনতা আড়ং কটনের এর থ্রিপিস সাথে ওভার কোর্ট পরে নিচে দাঁড়িয়ে আছে। রেলিং আঁকড়ে ধরে এরোজ ডানে বামে মাথা নেড়ে আওড়ালো,
–“বিদঘুটে শিক্ষা ছাড়া আপনি কখনো শুধরাবেন না, মৌন।”
দুই মিনিট বাদ এরোজ নিচে নামলো। নায়েলকে গাড়ির ব্যাকসিটে শুইয়ে দিয়ে গাড়ি বের করল গ্যারেজ থেকে। মৌনতা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। এরোজ গাড়ি বের করে জানালা থেকে উঁকি দিতেই দেখল মৌনতা আড়চোখে চেয়ে জড়সড় হয়ে আছে। নাক ঠোঁট লাল হয়ে আছে, চোখে রীতিমতো পানি টলটল করছে।
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
–“কী?”
মৌনতা দুই পা এগিয়ে জানালার কাছে আসল। মিনমিনে স্বরে বলল,
–“অনেক শীত করছে। চোখ মেলে তাকাতে পারছি না।”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেললো অনুতপ্ত মুখটি দেখে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখুন মৌন। নয়তো সময় ফুরিয়ে গেলে আফসোস ছাড়া ঝুলিতে কিছুই থাকবে না।”
মৌনতা মাথা নিচু করে নিলো। এরোজ ড্রাইভিং সিট থেকে বের হয়ে বলল,
–“ব্যাকসিটে কালো ব্যাগে আপনার পোশাক আছে, পরে নিন। বাহির থেকে আমার গাড়ির ভেতরে কিছু দেখা যায় না। কিন্তু ভেতর থেকে বাহিরে সব দেখা যায়। তাই চিন্তা নেই।”
মৌনতা এবার আর তর্ক করল না নীরবে গাড়িতে ঢুকে পোশাক বদলে নিলো। চার স্তরের পোশাক পরতে পরতে অম্বরে মৃদুমন্দ তুলোর ন্যায় তুষারের দেখা গেল। এরোজ জানালায় টোকা দিল। মৌনতা পোশাক টেনেটুনে টুপি পরে জানালা খুলে বলল,
–“হয়ে গিয়েছে, আসুন।”
এরোজ উঁকি দিয়ে বলল,
–“বাইরে আসুন, স্নো পড়া শুরু হয়েছে।”
–“সত্যি?”, মৌনতা হুড়মুড়িয়ে বের হতেই মুখ থুবড়ে পড়তে নিলো। এরোজ রুগ্ন এক বাহু আঁকড়ে ধরে বলল,
–“আপনাকে নিয়ে কোথায় যাব আমি? স্নো কী চলে যাচ্ছে?”
মৌনতার সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তো বড় বড় নেত্রে ছোট ছোট বরফকুচি পড়তে দেখছে। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
–“আকাশ থেকে বরফ কী করে পড়ে? আশ্চর্য বিষয়! এটা কী সুন্দর!”
বলতেই মৌনতার নাক বরাবর ছোট্ট একটু বরফ কুঁচি উড়ে এসে পড়ল। মৌনতা বিস্ময়ে আর আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল।
–“আরে আরে আমার নাকে বরফ পড়েছে। নায়েল ওঠো, মা দেখো কী সুন্দর বরফ পড়ছে।”
মৌনতা আকাশপানে চেয়ে চঞ্চল কদমে ছুটছে এদিক সেদিক। এরোজ বিমুগ্ধ চিত্তে দেখেছে উল্লাসে মত্ত নারীটিকে। নারীটিকে দেখতে দেখতেই স্মিত হেসে সদ্য ক্যামেরাবন্দি ছবিটা চোখের সামনে তুলে ধরল। ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,
–“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীটি এখন আমার।”
ক্যান্সার নামক বিষাক্ত প্রাণঘাতী কোষে আক্রান্ত অর্ধমৃত বিদঘুটে সৌন্দর্যের অধিকারী নারীটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী! ভালোবাসা কী অদ্ভুত তাই না….ধর্ম, বর্ণ, রূপ, কোনোকিছুর তোয়াক্কা করে না। ভাগ্যিস ধরণীতে ভালোবাসা নামক কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব ছিল, তাই তো কোনো এক ‘অর্ধমৃত’ নারীও কারোর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনিন্দ্যসুন্দরী হয়ে ওঠে।
মায়ের উল্লাসে আজ নায়েলের ও ঘুম হলো না। মা মেয়ে তখন বাচ্চাদের মতো বরফ নিয়ে খেলছে। স্নোম্যান বানাচ্ছে। দুটো গাজর আর চারটা ব্লুবেরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে এরোজ। অপেক্ষা করছে কখন মা মেয়ের বানানো স্নোম্যানের নাক চোখ বানিয়ে দেবে। সফলভাবে স্নোম্যান বানাতে সক্ষম হতেই মা মেয়ের সে কী উল্লাস!
স্নোম্যানের দুই পাশে হাস্যোজ্জ্বল দুটি মায়াবী মুখ। তার নিচে ছোট্ট একটা ক্যাপশন।
“দে স্মাইলড, এন্ড মাই এন্টায়ার ওয়ার্ল্ড স্মাইলড।”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৭
দশ মিনিট আগে আপলোড করা ভাইয়ের প্রোফাইল পিকচার দেখে তপোবন ছলছল নেত্রে তাকালো। তার জীবনের অন্যতম এক স্বপ্ন এই স্নিগ্ধ সত্তাদুটিকে হাসতে দেখা, সুস্থ সবল বাঁচতে দেখা।
এরোজ ঠিক বলে, প্রিয়জন হাসে তো দুনিয়া হাসে। ঠিক যেমন রূপকথা আর তানশানের হাসি তার পুরো দুনিয়ার সকল দুঃখ শুষে নেয়। বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ঘুমন্ত দেহটি আরো দৃঢ়ভাবে আগলে নেয় তপোবন। ভীষণ কৃতজ্ঞতা আর আদরের সাথে রূপকথার ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার দুনিয়াকে আরো একবার পরিপূর্ণ করার জন্য ধন্যবাদ মুরুব্বি।”
